রাস্তা কোথাও যায় না

লেখক:

শুভদীপ মৈত্র

– কী হচ্ছে বলো তো আমাদের সঙ্গে? একসঙ্গে সবার এত খারাপ সময় আসে কী করে?
– হা-হা, এটা মজার ব্যাপার। হয়তো দেখো সোমালিয়ার রিফিউজিরাও এমন ভাবছে, আফগানিস্তানেও। নীলাদ্রি দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে উঠল। তারপর দুটো আঙুল দিয়ে একটা গ্লোব ঘুরিয়ে দিলো। অর্ণবের রাইটিং ডেস্কে রাখা গ্লোবটা লাট্টুর মতো পাক খাচ্ছে। নোম্যাডিক মাইগ্রেশন; হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে…
ওরা দুজনে বাড়ির ছাদে উঠল। জলের ট্যাঙ্কের ওপর চড়ে বসে আছে নীলাদ্রি। আধশোয়া হলো, চোখ আধবোজা। তোর গল্পটা জানা, সে নৈর্ব্যক্তিকভাবে বলে চলেছে। অর্ণবের মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। মাথা নেড়ে কথাগুলো অস্বীকার করতে শুরু করল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তোর গল্পটা জানা, সেদিনই বলছিলাম বাকিদের। এখন এরকম ল্যাদ খেয়ে বিলিকছিলিক করে বেড়াচ্ছিস, কিছুদিন পর আবার একটা চাকরিতে ঢুকে পড়বি। জানা গল্প।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। অর্ণব সত্যি জানে না, ও কী করছে। অফিসের চাপ আর নিতে পারছিল না। রোজ রোজ কাগজের অফিসের ডেস্কে একই খবর লিখে যাওয়া। গত শনিবার আর সে পারেনি, বিকেল অবধি বাড়িতে বসে ছিল। দোনামোনা, যাবো কি যাবো না। আগে থেকে না জানিয়ে ডুব মারলে পেজ এডিটরের খিস্তি শুনতে হয়। আর কামাইটাও প্রায়ই হচ্ছিল। সেদিন তো পেজ এডিটর রমেনদা বললেনই, শোন বাবা, কামাইটা কমা। ডেস্ক হেডের কানে কিন্তু পৌঁছে গেছে। তোর হয়েছেটা কী বল তো? বাগার, মনে মনে অর্ণব খিস্তি দিয়েছিল, তোমার থেকে ভালো আমি সাব করতে পারি, ইন্ট্রো যা লেখো, আর ইনজিনিয়াস এবং ইনজেনুয়াসের পার্থক্য জিজ্ঞেস করলে তো ভিরমি খাবে, ওয়ার্থলেস একটা। কিন্তু ও জানে, শাসানিটা ফাঁকা আওয়াজ নয়।
এরপরও ওর শনিবার বেরোতে ইচ্ছে করছিল না। কী করবে, আবার কামাই? সেই ফিরে গেলে খিস্তি অথবা ঠাট্টা, কেন এরা মিডিয়ায় আসে, অথচ বালের ওই মিডিয়া একটা চিড়িয়াখানা ছাড়া আর কিছুই না, আসলে একটা কল সেন্টার – অর্ণবের এখন এটাই মনে হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছিল, পরপর ছটা সিগারেট শেষ করেও যাওয়ার ইচ্ছেটা আনতে পারছিল না। তারপর ও হঠাৎই মোবাইল থেকে এসএমএস করে, আই অ্যাম নট কামিং টু অফিস ফ্রম টুডে। সরি ফর দ্য ইনকনভিনিয়েন্স।
বোলপুরে যাবি? জয়দেবের মেলায় একবার গিয়েছিলাম মনে আছে? অনেকদিন আমরা একসঙ্গে বেরোই না। উদাস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে অর্ণব বলল। আনমনা, বিকেলের আকাশের রং বদলে যাওয়া দেখছে। এখন ও অনেকটা হালকা। তবে একটা ভয়ও রয়েছে, কীরকম যেন ভাসমান লাগছে নিজেকে। কোনো শেকড় নেই।
– বাজে বকিস না, বল তুই যাস না। আমরা যখন লেপচা গেলাম তোকে তো বলা হয়েছিল, অফিসের চাপের দোহাই দিয়ে গেলি না। চাকরি আছে বলে যাসনি, এখন বড় বড় কথা বলছিস।  যা চাকরি কর।
– না রে সত্যি, কোথাও একটা যাওয়া দরকার।
– এখন পয়সা নেই।
– কত আর লাগবে?
– যতই লাগুক, নেই।
অর্ণব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীলাদ্রিকে রাজি করানো কঠিন, বিশেষ করে একবার যদি ও কিছু ঠিক করে ফেলে, আর রাজনীতি করতে করতে কেমন খিঁচিয়ে থাকে এখন। অথচ এখন ওর বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে, কিছু টাকাও রয়েছে, যেটা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে দিন গুজরান করতে গিয়ে। কিছুটা স্বগতোক্তির সুরে বলল, তোরা বেশ মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে পড়িস, লেপচা তো তোদের সেকেন্ড হোম হয়ে গেছে। তারপর থেমে যোগ করল, এই, সিদ্ধার্থের খবর কী রে?
– জানি না। ফোন করেছিলাম, ধরল না।
– অনেকদিন সবাই মিলে আড্ডা মারিনি। কী বিশ্রী ব্যাপার। ঋষিটা সেদিন ফোন করেছিল রাতে, মাল তো না ঘুমিয়ে রাত জেগে কাজ করে। ফোন করে কীসব হাবিজাবি বকছিল। মদ খেয়ে অসংলগ্ন যা-তা আর কী। বাধ্য হয়ে ফোন কেটে দিলাম।
– হুম্ম, সেদিন রাতে আমাকেও করেছিল হতভাগা। ফোন কেটে দিই, তারপর রিসিভারটা নামিয়ে দিই। কী যে হয়েছে ওর?
অর্ণব আবার কিছুক্ষণ চুপ। হাতের মোবাইলটা খুটুরখুটুর টিপছে, খানিকটা অভ্যাসেই যেন একটা নম্বর ডায়াল করে ফেলল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল, কলিং শ্রুতি। বেজে গেল ফোনটা। ওপার থেকে সাড়া এলো না। অর্ণবের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না, শুধু নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আনসার্টেনটি, আনসার্টেনটি।
ন্যাকামি, ন্যাকামি – নীলাদ্রির প্রতিধ্বনি ভেসে এলো।
গোলপার্কের কফি-শপটায় বেশ ভিড়, ওরা পেছনদিকের স্মোকিং জোনে বসে আছে। ঋষি সিগারেট টানছে দ্রুত, সিদ্ধার্থ একটা কাপুচিনোর পেয়ালায় চামচে নেড়ে চিনি গুলছে। ঋষির ছাড়া ধোঁয়ায় ঋষিরই মুখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, জায়গাটাও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সিদ্ধার্থের সঙ্গে একটা র‌্যাকস্যাক রয়েছে। ওটাতেই আপাতত ওর জামাকাপড়, দরকারি সব জিনিস ভরা। তার পরনের কাপড় কোঁচকানো, কিছুটা নোংরাও, না-কামানো গালে অল্প দাড়ি। দেখেই মনে হচ্ছে, কিছুটা কাহিল।
– ব্যাপারটা বোঝ, আমি তিনদিন হলো বাড়ি ছেড়েছি। একদিন হাওড়া স্টেশনে, একদিন রাস্তায়, আর কাল থেকে রবির গ্যারেজে।
হুম্ম করে একটা শব্দ ছাড়ল ঋষি।
– কিছু একটা করো ঋষি, কিছু একটা করো।
ভাবছি, বলে সে শরীরটা এলিয়ে দিলো চেয়ারে, একটু থেমে তারপর সুর করে বলল, চলো যাই, মাল খাই।
সিদ্ধার্থ উত্তেজিত হয়ে বলে চলেছে, ইয়ার্কি মারিস না শোন, আমি বম্বে চলে যাব, ওখানে একটা চাকরি জুটে যাবে, কথা হয়েছে। বাইক, মিউজিক সিস্টেম, কম্পিউটার – সব বেচে দিয়েছি। সেই টাকায় বম্বেতে ইনিশিয়ালি কিছুদিন চলবে, বন্ধুরাও আছে ওখানে।
সিদ্ধার্থ যখন এসব বোঝাচ্ছে, ঋষি সমাহিতের মতো বসে ধোঁয়ার রিং ছাড়ছে, যেন এটাই ওর উত্তর।
– কী রে, শুনছিস কী বলছি?
হেসে ফেলল ঋষি, হাতটা মুখের কাছে এনে হাসি চাপার চেষ্টা করতে করতে বলল, সরি, সরি। আচ্ছা আমাকে বলবি, তোকে বাড়ি থেকে কেন ভাগিয়ে দিয়েছে?

 

দুই

শনিবার রাত্তিরে শহর বড় গুলজার থাকে, পানের খিলির দোকানে বেল লণ্ঠন আর দেওয়ালগীরি জ্বলছে। ফুরফুরে হাওয়ার সঙ্গে বেলফুলের গন্ধ ভুরভুর করে বেরিয়ে যেন শহর মাতিয়ে তুলছে। রাস্তার ধারের দুই-একটা বাড়িতে খেমটা নাচের তালিম হচ্ছে, অনেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘুমুর ও মন্দিরার রুনু রুনু শব্দ শুনে স্বর্গসুখ উপভোগ করছেন। কোথাও একটা দাঙ্গা হচ্ছে। কোথাও পাহারাওয়ালা একজন চোর বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে – তার চারিদিকে চার-পাঁচজন চোর হাস্চে আর মজা দেখছে এবং আপনাদের সাবধানতার প্রশংসা করছে, তারা যে একদিন ওই রকম দশায় পড়বে তায় ভ্রুক্ষেপ নেই।
ঋষি একটা বার থেকে বেরোল। পার্ক সার্কাসের এই রাস্তায় এখন সে একা। রাত ভালোই হয়েছে। আজ বিকেল থেকে সে মদ খাচ্ছে। প্রথমে অফিস কলিগদের সঙ্গে বসে ছিল। সেখানে তিন-চার পেগ মারার পর বাকিরা উঠে যায়। তারপর এক বন্ধুকে ফোন করে ও আবার অন্য একটা বারে বসে। আজ থামতে ইচ্ছে করছিল না।
ধুর শালা, এক-দুই পেগ মেরেই সবাই বাড়ি যাব বাড়ি যাব করে। এটা ভেবে ও বিরক্ত। এখন ও একা। ধীরে ধীরে হাঁটছে, খানিকটা দুলকি চালে। ওর ছয় ফুট লম্বা শরীরটা একটু ঝুঁকে কুঁজো হয়ে, একটা নেড়ি কুত্তা ওর দিকে এগিয়ে আসতেই ও মুখে চুকচুক করে আওয়াজ করল। সারমেয় না কী যেন একটা বলে এদের শুদ্ধ ভাষায়? কুকুরটা ওর পা চাটছে, ও একটু নিচু হয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলো। আহ্, নীলাদ্রি দেখলেই চটে যেত, সুজনও। শালারা এখানে নেই ভাগ্যিস।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা রোলের দোকান খোলা দেখতে পেল ঋষি। এগিয়ে গিয়ে দরদাম করতে শুরুর করল, কাবাব দাও। আরে এত রাতে যা পড়ে আছে, দাও না ভাই।
মাতালের সঙ্গে তর্ক চলে না, দোকানের ছেলেটা একটা ঠোঙায় করে কিছুটা ঠান্ডা মাংস দিলো। ঋষি একশ টাকার একটা নোট দিয়ে ফেরত কিছু না নিয়ে হন্হন্ করে এগিয়ে গেল। কুকুরটা আগের জায়গাটাতেই ছিল। ফুটপাতে কিছুটা মাংস ছুড়ে দিতেই সে থমকে গেল, তারপর লেজ নাড়তে নাড়তে মাথা নিচু করে গন্ধ শুঁকল। আরো দুটো কুকুর হাজির। কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। ঋষি ওদের মাঝখানে। সবাই যাতে ভাগ পায় কাউকে ধমকাচ্ছে, সরিয়ে দিচ্ছে। একটা পাগল গোছের লোক ওর দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রয়েছে। আরো কিছু লোক ওকে দেখছে। এ অবস্থায় মাংসের গন্ধে ওর গা গুলিয়ে উঠল। আর নয়, এবার ও বড় রাস্তা ছেড়ে একটা গলির ভেতর সেঁধল। গলির ভেতরটা আলো-অাঁধারি। একটা বাড়ির কোণ দেখে ঋষি দাঁড়াল, ঝুঁকে বমি করতে শুরু করল। কেউ একটা চেঁচিয়ে খিস্তি দিলো ওকে, ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। রাতের শহরটা ওর কাছে একমাত্র আশ্রয়।
বমি করে গা গুলানো আর শরীরের অস্বস্তি ভাবটা কমেছে। ঋষি এখন হেঁটে বেড়াচ্ছে, ছটফট করছে কিছু একটা করার জন্য। এরপর সে মোবাইলটা পকেট থেকে বের করল। একটার পর একটা নম্বর কন্ট্যাক্ট লিস্টে, বাটন টিপতেই গান ভেসে আসতে শুরু করেছে – মেহবুবা, মেহবুবা। পরের নম্বর – আনসার মাই ফ্রেন্ড, ইজ ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড। পরের নম্বর – আমি বাংলায় গান গাই। বেশিরভাগই ফোন তুলছে না, ঋষির রাগ হচ্ছিল।
সুজনের ফোনটা লাগল। হ্যালো কী করছিস…

– ঘুমোচ্ছিলাম, এত রাতে ফোন করছিস কেন?

– এমনি, আড্ডা মারতে।

– শোন এখন হ্যাজাতে ইচ্ছে করছে না তোর সঙ্গে।

– সব তোর ইচ্ছায় চলবে নাকি?

– শালা মাতাল, এটা একটা অসুখ জানিস, মদ খেয়ে ফোন করে সবাইকে বিরক্ত করা? যা, কাউন্সেলিং করা, বিরক্ত গলায় এই বলে ওপাশ থেকে ফোন কেটে দিলো সুজন। ঋষির কষ্ট বোধ হলো। ও কি সত্যি মাতাল নাকি? ও তো এমনি কথা বলার জন্য ফোন করেছিল। ও আবার একটা নম্বরে কল করল। এবার নীলাদ্রি।

– শোন, আমি তোকে ফোন করে বিরক্ত করছি হয়তো, কিন্তু কী করব কিছু কথা মাথায় এলো, মানে না বললে বুঝলি তো…। নীলাদ্রি উলটোদিকে নিরুত্তর। ঋষি বলে চলে, আচ্ছা আমি যে এরকম, সেটা তোরা যা মনে করিস সেটা বলে না, আমি নিজেকে এরকম দেখি না, তোরা যা দেখিস সেটাই আমি মানি।

নীলাদ্রি ফাঁপরে পড়ে গেছে, কী উত্তর দেবে, দিয়েও লাভ নেই। শুধু ঠান্ডা গলায় বলল, দ্যাখ, তোর কথা পুরোটা বুঝলাম না, তবে তুই যেটা মনে করবি সেটাই।

ঋষি আবার ওকে বোঝানোর চেষ্টা শুরু করল। কিন্তু তেমন সাড়া না পেয়ে ও কিছুক্ষণ পর নিজেই রাখছি বলে ফোনটা কেটে দিলো। কিছুক্ষণ পর ঋষির হুঁশ হলো, সে একটা ভ্যাটের পাশে ভাঙা মোড়ার ওপর বসে আছে। রাস্তা প্রায় সুনসান, ওর উঠতে ইচ্ছে করছে না, ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। ভ্যাটের থেকে উড়ে আসা কয়েকটা মাছি ওকে বিরক্ত করছে। ও হাত নেড়ে সেগুলো তাড়ানোর চেষ্টা করল।

 

অলিপাব থেকে অর্ণব বেরোচ্ছে, সঙ্গে পিকু ও রুনা। রাত ১১টার ফাঁকা পার্ক স্ট্রিট দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর স্পিড বেড়ে গেছে। আর ওরা ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছে। রুনা আজ ওদের মদ খাইয়েছে, ফেয়ারওয়েল পার্টি। এই আমাকে একটু গাঁজা দে তো। আমার স্টক শেষ, রাতে লাগবে, বলে রুনা হাত বাড়াল পিকুর দিকে। পিকু এদিক-ওদিক দেখে পেছনের পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের খাম বের করল।

তাহলে তুই সত্যিই দিল্লি যাচ্ছিস? অর্ণব প্রশ্নটা ছুড়ে দিলো রুনার দিকে, কেন?

– জানি না, জিজ্ঞেস করিস না। অনেকগুলো কারণ দিতে পারি, বেশি টাকা, জার্নালিজম স্টিঙ্কস, আর ভালো লাগছে না, রুনা একটু থামে, তবে সত্যিই জানি না।

অর্ণবেরও মনে হলো, ইশ্ যদি এভাবে চলে যাওয়া যেত। এত পাঁচ-প্যাঁচালিতে জড়িয়ে পড়েছে, ক্রমে সবকিছু খুব ছোট হয়ে আসছে। সেই চাকরি, প্রেম নয়তো সংসার – বীমা কোম্পানির বিজ্ঞাপনের মতো ওর জীবনের গল্পটা। আর পাঁচজনেরই মতো ঘটনাবিহীন। কী করবে ও, চাকরিটায় ফিরে যাবে? রমেনদা ফোন করেছিল। সিক লিভ দেখিয়ে এখনো ফিরে যাওয়া যায়। আরো অনেক কিছু করা যায়। শ্রুতিকে জানানো যায়, ও সম্পর্কটা নিয়ে সিরিয়াস। লোন নিয়ে একটা গাড়ি কেনা বা এমন অনেক কিছু।

রুনা একটা ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে উঠে পড়ল। ট্যাক্সি চলতে শুরু করেছে সমুদ্রের মতো রাস্তা দিয়ে, ভেতরে খোলের মধ্যে রুনা।

জাহাজের খোলের মধ্যে একা শুয়ে আছে পাবলো, এই লোকটা, মানে ক্যাপ্টেনটা পাগল। নতুন দেশ খুঁজছে ইন্ডেজ না ইন্ডি, কী একটা, প্রাচ্যের ঐশ্বর্যের খনি নাকি। কিন্তু আমিই বা এলাম কেন? কেন লিসবন থেকে জাহাজে উঠলাম এমন একটা ভয়েজে, এ প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে সে। এখন জাহাজের  খোলে শুয়ে, জাহাজ এগিয়ে চলেছে দুলুনিতে বুঝতে পারছে, কিন্তু ওঠার ক্ষমতা নেই। বুঝতে পারছে আর কোনোদিনই সে হয়তো উঠবে না, কোনো সাধের দেশ দেখতে পাবে না, যদি অবশ্য             সেটা থাকে।

নীলাদ্রি হেস্টিংসের সামনে দিয়ে হাঁটছিল, আলিপুর পেরিয়ে, কালীঘাটের দিকে; ব্রিজে উঠল আস্তে আস্তে পা ফেলে। কোনো তাড়া নেই। হালকা হাওয়ায় ওর বড় চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। উকিল, কেরানি, বেশ্যা – সবার সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটতে হচ্ছে, প্রত্যেকের নিজস্ব গল্পের ঝাপটা গায়ে এসে লাগছে, গড়াচ্ছে গা বেয়ে নিজের ঘামের সঙ্গে, আবার শুকিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু মিশে যাচ্ছে না। যা ব্যক্তিগত তা-ই পবিত্র। ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টি মিশে যাচ্ছে। আমার জীবনটা আর কতটুকু আমার, আমি যতটা তৈরি করছি, ততটাই অন্যরা মিলে আরেকটা অবয়ব তৈরি করছে। ন হন্যতে আবার হন্যমানও বটে। নীলাদ্রি ভাবছিল।

আজ একটা ব্রাঞ্চ মিটিং ছিল, নীলাদ্রি যায়নি। ভালো লাগছিল না। ওর কমরেডরা একটু বিরক্ত ওর ওপর। বেশ কিছুদিন হলো ও এড়িয়ে যাচ্ছে অথচ ওর ওপর অনেক ভরসা সবার। ছাত্র-যুব সংগঠনের অনেক দায়িত্ব ওকে সোমেশদারা, মানে রাজ্য কমিটির সদস্যরা দেবে ঠিক করে রেখেছিল। ওকে ভুল বুঝেছে, ও যেভাবে রাজনীতিটা দেখে তাতে এ ধরনের দায়িত্ব, কাজ, ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উঠে একটা হায়ারার্কি তৈরিতে ও বিশ্বাস করে না। ভয়ও পায় হয়তো। অথচ কীভাবে যেন ধরেই নেওয়া হয়েছে, ও ওই বাঁধাধরা পথেই হাঁটবে।

এসব ভাবতে ভাবতে নীলাদ্রি হঠাৎ দেখল, সে উত্তম মঞ্চের সামনে। কী খেয়ালে টিকিট কেটে ঢুকেও পড়ল, নাটকের অন্ধকার দর্শকাসন ওর ভালো লাগে।

 

অর্ণবের মুখ শ্রুতির চুল থেকে ঘাড়ের ওপর নেমে এলো, কতদিন পর তুই এলি, আই মিস ইউ।

দুপুরের পর্দা-টানা আধো অন্ধকার ঘর। বাইরে মেঘ, গুমোট। বালিশে মাথা দিয়ে উপুড় হয়ে শ্রুতি শুয়ে, তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে অর্ণব, পিঠের ওপর আঙুল বোলাচ্ছে। ভুলভাল লেখা আর চেঁচামেচি ছাড়া আমাদের আর কিছুই নেই? সে বলে উঠল ভিজে গলায়, আমি পরোয়া করি না এসবের। কিন্তু তুই ভালো থাক শ্রুতি, বি হ্যাপি অ্যাজ ইউ অলওয়েজ আর…।

বাইরে তখন সবে বৃষ্টি থামল। একপশলা মাত্র। অলস শরীর দুটো জড়িয়ে রয়েছে। আবার অলসও নয়। খোঁজাখুঁজি, খোঁড়াখুঁড়ি, ভাঙাচোরাও চলছিল ততক্ষণ।

অনেক হয়েছে, উঠুন, এবার বাড়ি যাব, শ্রুতি অর্ণবকে সরিয়ে উঠে বসল। তারপর সে আয়নার সামনে দাঁড়াল, অবিন্যস্ত অবস্থা থেকে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে। চুলটা ঠিক করতে করতে হঠাৎই অর্ণবের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, তুই তিস্তাকে এখনো ভালোবাসিস?

– চল ফোট, ভ্রু কুঁচকে অর্ণব সিগারেটের প্যাকেট হাতড়ায়, ইট ডাজন্ট ম্যাটার নাও।

– তাই-ই!

অর্ণব সময় নেয়। সিগারেট ধরায়, কী বলবে ভাবছে।

– এসকেপ করছিস কেন?

কী এসে যায়, অর্ণব ধোঁয়া ছাড়ল, কিছুই তো আটকাচ্ছে না, বলে আরো কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। শ্রুতি চুপ, ওর কোঁচকানো কামিজে হাত বুলিয়ে পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা করছে।

চল, তোর সঙ্গে একটু হেঁটে আসি, অর্ণব উঠে দাঁড়িয়ে বলল। শ্রুতি ঘাড় ঘুরিয়ে অল্প হাসল।

 

তিন

পাটলিপুত্রের রাস্তা আজ বড় বেশি নিস্তব্ধ। তাম্বুল বিক্রেতার সামনে আজ বিকেলে ভিড় নেই। সে বসে বসে ঢুলছে। তার সামনে এসে একজন দীর্ঘকায় পুরুষ দাঁড়াল। পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে ভিনদেশি। পূর্ব দেশের লোক সম্ভবত।

– এত ফাঁকা কেন রাস্তা? ওরা কারা হলুদ কাপড় গায়ে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছে? সেই বিদেশি প্রশ্ন করল তাম্বুল বিক্রেতাকে।

– ওদের গুরু মারা গেছেন। সে জড়ানো গলায় উত্তর দিলো।

– কে তিনি?

– গৌতম বুদ্ধ।

– তিনি কে, মানে আমি এদেশে নতুন, কিছু বুঝতে পারছি না।

– খুব ভালো বলতে পারব না, আমি সামান্য দোকানদার। শুনেছি রাজপুত্র ছিলেন, কম বয়সে বাড়ি থেকে পালান।

বিস্মিত বিদেশি এবার উৎসুক হয়ে উঠল, তো তিনি গুরু হয়ে উঠলেন কী করে?

পানওয়ালা নিরুৎসাহ গলায় বলল, নানা লোক নানা প্রশ্ন করত, ইচ্ছেমতো তিনি উত্তর দিতেন। কত আর বানাবে, এক কথা             চার-পাঁচজনকে বলতে বলতে কথার কথা কথকতা হয়ে উঠল। সবাই তাকে ডাকতে লাগল, ফাঁদে পড়ে গেলেন।

– তাহলে পালানো আর হলো কই?

– সেটাই তো, পালাতে গিয়ে বুঝতে পারল, পালানোটা সম্ভব নয়। বলে সে হেসে উঠল। তারপর চোখ গোল গোল করে বলল, দেখো বাপু, তোমায় বললাম বিদেশি বলে; রাজার গুরু কিন্তু, সবার সামনে এসব বলো না।

সিদ্ধার্থ একটা বাড়ির লাগোয়া গ্যারেজে শুয়ে আছে, মাথার নিচে র‌্যাকস্যাক, সকালের একচিলতে রোদ বোধহয় ভোরবেলা মুখে পড়েছিল, তাই হাত দিয়ে চোখ আড়াল করা। ঘুম ভেঙে গেছে, তার রেশটুকু নিয়ে সে শুয়ে। এভাবে আর কতক্ষণ থাকা যায়, একসময় উঠে পড়তেই হয়, বিশেষ করে বিছানা যখন মাটির ওপর স্রেফ একটা চাদর। সিদ্ধার্থ আড়মোড়া ভাঙল, তারপর ব্যাগ থেকে পেস্ট, ব্রাশ বের করে রাস্তায় বেরোল, সামনে একটা চাপা কল আছে।

সকাল গড়িয়ে দুপুরে পড়েছে। সুজন এসে হাজির হলো ওই গ্যারেজে। কী রে, তোকে আমি খুঁজছি কাল থেকে? তোর ফোন লাগছে না কেন? সুজন গ্যারেজের ভেতরের অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে নিতে প্রশ্ন করল, ঋষি না বললে তোর খোঁজই পেতাম না।

একটা চাদরের ওপর সিদ্ধার্থ বসে, পাশে ওর সেই র‌্যাকস্যাকটা খোলা, কয়েকটা জিনিস বাইরে ছড়ানো। দেয়ালে হেলান দিয়ে সে ফিকফিক করে হেসে উঠল।

– বেচে দিয়েছি।

– মানে?

– মানে মোবাইলটা বেচে দিয়েছি।

সুজন বসল না, পকেটে হাত দিয়ে ওর উলটোদিকে রাখা পুরনো মারুতিটায় হেলান ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। মানে ঋষি যা বলল তা সত্যি! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না, চোখ বড়বড় করে সে বলে উঠল, ঘটনাটা কী?

– ঘটনা কিছুই নয়। বাড়ি থেকে বিতাড়িত। খিচমিচ। তাই ভাবলাম, বাড়ি যখন ছাড়ব কলকাতা কেন নয়। বেচে দিলাম সবকিছু, মুশকিল হলো টিকিট পাচ্ছি না বম্বে যাওয়ার।

– তা বলে মোবাইলও! কিন্তু বম্বে কেন?

– কোথাও তো একটা যেতে হবে। পুনেতে কয়েক বছর তো চাকরি করেছি, বম্বে শহরটাও তখন খারাপ লাগেনি।

– ফালতু রোমান্টিসিজম ছাড়। কী করবি ওখানে।

– চাকরি।

– সে তো এখানেও করা যায়?

– যায় কি?

– কিছু বলার নেই আমার।

– দাঁড়া, লাঞ্চটা সেরে ফেলি, বলে সিদ্ধার্থ উঠে দাঁড়াল। গ্যারেজের কোণে রাখা একটা প্লাস্টিকের মধ্যে মাটির ভাঁড় আর কাগজের মোড়কে কয়েকটা রুটি, সিদ্ধার্থ সেগুলো নিয়ে এসে বসল, আয়, বস না? খাবি একটু?

– না, খেয়ে বেরিয়েছি, বলে মাদুরের একটা কোণে সুজন উবু হয়ে বসল। সিদ্ধার্থ কাগজের মোড়কটা খুলে রুটি বের করেছে, সামনে মাটির ভাঁড়ে একটা ঝালঝাল মেটের তরকারি। সুজনের মোবাইল বেজে উঠল। …হ্যাঁ ঋষি, পেয়েছি ওকে… হাহ্… তাই, আচ্ছা কখন? আমার প্রবলেম নেই, চলে আসব।

মোবাইলটা হাতে নিয়েই সিদ্ধার্থের দিকে তাকাল সুজন, শোন, আজ সন্ধ্যায় অর্ণবের বাড়ি চল। ওখানেই থাকব, ওর বাড়ি ফাঁকা, নীলাদ্রিও আসছে। তারপর ফোনে বলল, ঠিক হ্যায়, না-না আমি তো খাই… শালা কী ঢ্যামনা, ফোন কেটে দিলো।

– ঋষিটা চিরদিনই এভাবে কথা হয়ে গেলেই দুম করে ফোন কেটে দেয়, সিদ্ধার্থ বলে হাসল। খাবার চিবোতে চিবোতে তারপর বলল, অর্ণবের বাড়িতে? মদের পেছনে বাজে খরচ করতে পারছি না।

– আহ্, চল না। তোকে এসব কে ভাবতে বলেছে। তোর ব্যাপারে কিছু ভাবা দরকার, সবার ব্যাপারেই। আমরা প্রত্যেকেই সমস্যায় রয়েছি। একটা আলোচনা করা দরকার।

– মাল খেতে খেতে? আজ রাতে আলোচনা করবি নেশায়, কাল সব ভুলে যাবি, এসব সিনেমাতে ভালো হয় ডিরেক্টরসাব।

সিদ্ধার্থ বাড়ির পুরো ব্যাপারটা বলে উঠতে পারবে না বন্ধুদের, বলা যায় নাকি? ওর বাবা ওকে কী ভাষায় অপমান করেছে, কী অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে মা-বোন সবার আচরণ, সেটা বলা সম্ভব নয়। চাকরি ছাড়ার পর থেকেই, যখন ও ঠিক করে যে ফটোগ্রাফিটাই করবে, তখন থেকে সব অন্যরকম। পুনে থেকে ইস্তফা দিয়ে আসার পর থেকেই চাপ বাড়ছিল বাড়িতে। রোজ অশান্তি। প্রথমে ভালো করে বোঝানো, তারপর রাগ, আর শেষের দিকে প্রায় খেউড়ের পর্যায় নেমে এসেছিল। তাদের বক্তব্য, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরি ছেড়ে এসব কী? ও বোঝে, রিস্ক একটা ও নিচ্ছে, রিটায়ার্ড বাবার ভয়টাও, কিন্তু তা বলে এভাবে ব্যবহার করবে?

প্রথমদিকে যেটা হচ্ছিল সেটা একটা অদ্ভুত ঠান্ডা ব্যবহার। ওকে দেখলেই মুখ গম্ভীর, বিড়বিড় করে বিরক্তি প্রকাশ। বাড়িতে ফিরতে দেরি হলে রাগারাগি। আসল কারণটা ধামাচাপা দিয়ে ছোটখাটো বিষয়ে খিটিমিটি। মা রোজ ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, তুই ছবি তোল না ছুটিছাটার দিনে। একেবারে দুম করে চাকরি না করার সিদ্ধান্ত নিলি? এত ভালো একটা ক্যারিয়ার তোর। খাবার টেবিলে বসে সবাই নিশ্চুপ। এমনকি বোনটাও ভালো করে কথা বলে না, অসন্তোষ প্রকাশ করে। যেন আমি একটা কুষ্ঠ রোগী – বারবার এটাই মনে হচ্ছিল সিদ্ধার্থের। অথচ ও বাড়ি থেকে যে কোনো টাকা দাবি করেছে ফটোগ্রাফি কোর্স করার জন্য বা সরঞ্জাম কেনার জন্য, তা নয়। বরং চাকরি করে টাকা জমিয়ে ও এসব কিনেছে। তবু শান্তি।

সেদিন যেটা হলো সেটা ভাবলেও ওর ঘেন্না করছে। নিজের ওপরই কিছুটা। সিদ্ধার্থ রাত্রিবেলা কম্পিউটারে কিছু ছবি এডিট করছিল। এমন সময় ওর বাবা ঘরে ঢোকেন। তুই আর কতদিন আমার পয়সায় ফুর্তি করে বেড়াবি? দাঁতে দাঁত চেপে বলেন ভদ্রলোক। ও চমকে ওঠে, এই সেই ব্যাংকে চাকরি করা আপাদমস্তক ভদ্রলোক, যিনি কখনো তাকে তুমি ছাড়া সম্বোধন করেন না।

– আমি কোনো ফুর্তি করে বেড়াই না। তুমি ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই বুঝবে।

– তাহলে এটা কী? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর সময় কী খরচ হয়েছে আমার জানো না। তখন মনে পড়েনি নির্লজ্জ, বেহায়া কোথাকার!

সিদ্ধার্থের রাগ হতে শুরু করে। ও তো খারাপ কিছুই করছে না, নিজের যা ভালো লাগে, করতে চায়। আর এটা লোকটা কেন বুঝছে না। ও শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে। অসম্ভব। ওর বিরক্তি বাড়ছিল, ও তো বাচ্চা নয় যে এভাবে কথা বলবে ওর সঙ্গে। এটা বলাতেই বিস্ফোরণ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, দরজার সামনে  মা-বোন ছুটে এসেছে। বাস্টার্ড কথাটা ওর কানে গেল, ওর হাত চলে গেছে বাবার কলারে…।

সিদ্ধার্থ সেদিনই র‌্যাকস্যাক গুছিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। রাতটা হাওড়া স্টেশনে কাটায়। মাথায় ঘুরছিল, কী করে এসব ছেড়ে চলে যাওয়া যায়।

নীলাদ্রি আর অর্ণব একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে। অর্ণবেরই পাড়ার দোকান, বাড়ি থেকে একটু এগিয়েই। নীলাদ্রি একটা পুরনো ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল। অর্ণব কষাটে চায়ে একটা চুমুক দিলো, তারপর প্রশ্ন করল নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে, তুই এবার ফিল্ম ফেস্টে গেলি না।

– না, যাওয়া হয়ে উঠল না। জ-বাবুর নতুন সিনেমাটা কেমন লাগল? কেমন হয়েছে?

বিরক্ত মুখে সে তাকাল নীলাদ্রির দিকে, এসব বাঙালি ফিল্ম মেকারদের কথা আমায় বলিস না, এদের সিনেমা আমি আর হলে গিয়ে দেখব না।

– কেন, কী হলো রে? ম্যাগাজিন থেকে চোখ না তুলেই প্রশ্ন করল নীলাদ্রি। সে তার বন্ধুর এসব বিরক্তির উচ্চারণের সঙ্গে পরিচিত।

অর্ণব কোনো উত্তর দিলো না। চোখ চলে গেল সামনে দিয়ে যাওয়া মেয়েটার পুরুষ্টু বুকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, তারপর হাতের ফাঁকা ভাঁড়টা ছুড়ে দিলো রাস্তায়, শালা ভাঙল না। আচ্ছা বল তো, এই যে সুজনরা সিনেমা বানানোর চেষ্টা করছে, কী হবে, কী লাভ, এই টালিগঞ্জের হদ্দ বাংলা সিনেমা করে কী করবে?

নীলাদ্রি একটু সময় নিলো, একটু গুছিয়ে নিলো নিজের ভাবনাটা। তারপর বলল, দ্যাখ, ওরা সিনেমা বানাল কি ছবি অাঁকল, যা ইচ্ছে করল, আমার কিছু এসে যায় না। আমি জানতেও চাই না। কিন্তু ওরা সত্যি সত্যি ছিটকোচ্ছে কিনা, সেটা বড় ব্যাপার। মানে আর্টফার্ট নয়, স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য যে স্বাভাবিক ছিটকোনোগুলো দরকার, সেগুলো। মানে ওসব উৎসাহ-টুৎসাহ ঠিক আছে, আর্ট, শিল্প সব বড় বড় ব্যাপার, কিন্তু ছিটকোচ্ছে কিনা ওরা, জানি না।

– চল খিস্তি মারি, বিশুদ্ধ খিস্তি, গম্ভীর গলায় অর্ণব বলল, তারপর নিজেই হেসে উঠল। নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলল, তুই ছিটকোচ্ছিস তো?

নীলাদ্রি কোনো উত্তর দিলো না। কারণ, উত্তরগুলো ওর নিজের কাছেও গুলিয়ে গেছে। যে রাজনীতির আবর্তে ও পড়ে আছে, সেটার সঙ্গে ওর কোনো সংযোগ নেই। অর্থহীন একটা পুরনো প্র্যাকটিস, কতগুলো পুরনো বুলিকে পুঁজি করে চলছে। এখনো ও মিছিলে  যায়, একটা কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার, কিন্তু ওর কাঁধেও সেই বিশাল ব্যর্থতার জোয়াল। যে ব্যর্থ বিপ্লবের সময় ও জন্মায়নি,  তার অংশীদার হয়ে উঠছে ক্রমে। অথচ সেটা তো ওর প্রয়োজন ছিল না। একটা প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল। এবং তার সঙ্গে হয়তো আরো কিছু।

ওর মনে পড়ল প্রথমদিককার সেই দিনগুলোর কথা, ক্যাম্পাসে, হোস্টেলে, সারাদিন, সারারাত উত্তেজনা, আন্দোলনের পন্থা নিয়ে আলোচনা, হইহই করে মিছিল, অবরোধ। বহু মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। তারপর? যে যার সুবিধা বুঝে নিয়ে ঢুকে গেছে শিবিরের নিরাপত্তায়। আর ওর দল বা ওরকম কিছু ছোটখাটো নখ-দাঁতহীন বামপন্থী দল নিজেদের ক্ষীণ অস্তিত্ব বজায় রাখার খোলসে ঢুকে পড়েছে। ও জানে ওর ভাবনা, বোধ এগুলো রাজনীতির সঙ্গে মেলানো প্রয়োজন, সেটাই দরকার এই সময়ে দাঁড়িয়ে, অথচ উপায়হীন হয়ে দেখছে তার প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

চল, মদটা কিনে নিই, ওরা আসবে একটু পরেই। একটু খাবারও কিছু কিনতে হবে, অর্ণব চায়ের দাম মিটিয়ে উঠে পড়ল। কোনো কথা না বলে নীলাদ্রিও এগোল।

 

অর্ণবের বাড়িতে যাচ্ছে ঋষি আর সিদ্ধার্থ, বাসে চেপে। সুজনের ওপর খুব খেপে রয়েছে ঋষি। সিদ্ধার্থ বোঝাচ্ছিল, কী ভয়ংকর চাপে রয়েছে সুজন।

– আরে সিনেমা বানাতে গিয়ে এত সত্যজিৎ, ঋত্বিক করে, তারপর যদি টেলিভিশনে গানের শোর কাজ করতে  হয়, কেমন লাগবে? বেচারা তাই খুবই কষ্টে রয়েছে।

কন্ডাক্টরের বাড়ানো হাতে টাকা গুঁজে দিলো ঋষি, তারপর বলল, কে করতে বলেছে ওকে? শালা তোমরা নিজেরা প্রত্যেকে কিছু একটা ভেবে এগোবে, তারপর সেগুলো না হলেই, ঝামেলা হলেই অন্যের ওপর ঝাল ঝাড়বে। অর্ণবকেই দেখো। মালটা চাকরি করতে গিয়ে কেলিয়ে গেছে, আবার ছেড়েও ফ্রাস্ট্রু খাচ্ছে – ডিসাইড করতে পারছে না, কী করবে। অথচ এমন ভাব আর বুলি যেন এটা কী এক ইউনিক সমস্যা। মাল যেন ভ্যান গঘ, গ্যালিলিও আর সবাই শালা ওর পেছনে লেগেছে, কেউ ওকে বুঝছে না।

গুনে গুনে টাকা ফেরত নিলো ঋষি। গজরগজর করছে এখনো। সিদ্ধার্থ হেসে ফেলল, জববর বলেছিস কাকা, ওই তো চাই। সিদ্ধার্থের ভালো লাগছে, অনেকদিন পর বন্ধুরা একসঙ্গে বসবে। এরপর কী হবে ওর, সেটা ও জানেও না। কাজেই একবার দেখা হওয়াটা দরকার। ঋষিকে ও ভীষণ পছন্দ করে। মদ খেয়ে মাঝেমধ্যে মাত্রা ছাড়ানো নিয়ে সুজনরা রেগে গেলেও ও কিছু বলেনি ঋষিকে কখনো। ঋষির নিঃসঙ্গতাকে ও বোঝে। ক্রমে একা হয়ে যাচ্ছে, কারো সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারছে না, এটা তো আমাদেরও সমস্যা, কিন্তু বাকিরা সেটা বোঝে না। কারণ, তাদের অন্য সমস্যাগুলো হয়তো আরো বেশি। এটা ভেবে সিদ্ধার্থের একটু খারাপই লাগল। কিন্তু ঋষিকে ও কিছু বলতে চায় না।

 

চার

হারিকেন আছড়ে পড়েছে বসতিতে, সব ভেসে গেছে, কালো মানুষ, সাদা মানুষ পরিচয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশের মানুষ, আবার সব ছাপিয়ে গরিব মানুষ। সরে যেতে হচ্ছে তাদের। মাথার ওপর চপার পাক খাচ্ছে, সঙ্গে টিভির ক্যামেরা, রিপোর্টারদের স্যুট অবিন্যস্ত কিন্তু কমেন্ট্রি চলছে। সেইন্টস আর কামিং, বোনো লাফাচ্ছে স্টেজের ওপর, লোকগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঘেটোয়, কারখানায়, বেশ্যাপট্টিতে।

কেউই সিদ্ধার্থের যাওয়া নিয়ে কথা বলছিল না। অর্ণবের বাড়ির ছাদটায় মাতাল হাওয়া। নীলাদ্রি, ঋষি, সুজন আর অর্ণব সেখানে বসে আছে। গ্লাসে গ্লাসে মদ, রক্তিম গেলাসে চিকচিক করছে                 অস্ত-যাওয়া সূর্য। তবু শহর নগ্ন নির্জন নয়, ক্ষীণ হলেও শোনা যাচ্ছে পাখির ডাক, ট্রেনের হুইসেল মাঝেমধ্যে, গাড়ির হর্ন, এফএম রেডিওয় ভেসে আসা সুর; নিতান্ত কলকাতা। সিদ্ধার্থ শান্ত, অর্ণব বিরক্ত, সুজন উত্তেজিত, ঋষি বিষণ্ণ আর নীলাদ্রি ভাবনায় বুঁদ। এভাবেই ওরা পরস্পরকে দেখছে, নতুন কিছু নয়, আবার একেকটা নতুন ঘটনা জন্মায়, দৃশ্যের জন্ম হয়।

অর্ণব খবরের কাগজ ছিঁড়ে রকেট বানিয়ে ছাদ থেকে ছুড়ছিল, ঋষি ওই হাওয়ার মধ্যেই সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ছাড়ার চেষ্টা করছিল। আসলে ওরা কেউই যে খুব কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারছিল, তা নয়। প্রত্যেকের সমস্যা আলাদা। আর ওরা বিচ্ছিন্ন নিজেদের থেকে। হইহুল্লোড়, মদ খাওয়া, বেড়াতে যাওয়া – এসব একসঙ্গে চলতে পারে, এর চেয়ে বেশি কিছু ওদের একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। তাই সিদ্ধার্থের যাওয়া নিয়ে সরাসরি কোনো কথা হয়নি, যেমন কথা বলা যায় না নীলাদ্রির রাজনীতির অন্তঃসারশূন্যতা নিয়ে বা অর্ণবের সিদ্ধান্তের কমজোরিপনা সম্পর্কে। সবই ব্যক্তিগত থেকে যায়।

মদের বোতল খালি হয়ে এলো। ওদের মধ্যে পুরনো হৃদ্যতার ওম কিছুটা সঞ্চারিত হয়েছে। এত ঘনিষ্ঠ সবাই, অথচ নিজেদের আসল কথাগুলো কেউ কাউকে বলছে না। বলতে পারছে না। এটা ওরা বুঝতে পারছিল আস্তে আস্তে।

– চলে যাবি তুই তাহলে? আড়মোড়া ভেঙে শেষমেশ প্রশ্ন করল নীলাদ্রি। এতক্ষণ সে কোনো কথা বলেনি। আসলে সবাই যেন অ্যারেনার মধ্যে বসে, বুল ফাইটিং চলছিল, এবার এই প্রশ্নে দর্শকের উত্তেজিত নিশ্চুপ অপেক্ষার বাঁধ ভাঙল, উল্লাসমঞ্চের গর্জন কানে এলো। প্রশ্নের মধ্যে যে অনিবার্য উত্তর ছিল, সেটা সেঁধিয়ে যাচ্ছিল মাতাদোরের তলোয়ারের মতো সবার মধ্যে, আর বিকেলের শেষ আলো রক্তের মতো ভাস্বর হয়ে উঠল, তার থেকে একাকিত্বের দুঃখ সঞ্চারিত হলো, প্রত্যেকের বোধে।