রায়নার মারিয়া রিলকে – পুনর্বার

লেখক:

পূর্বাভাস : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

প্রাক্কথন : শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

কবিতার অনুবাদ : সমর রায়, সুনন্দা বসু ও শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

 

 

পূর্বাভাস

সদ্যই আমার একটা গোটা দিন রায়নার মারিয়া রিলকের সান্নিধ্যেই কেটে গেল। ভোরের দিকে মিউনিখের একটি বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের কাছে কবির জন্মশহর প্রাগে সংখ্যালঘু জার্মান ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের বিচ্ছিন্নতার মাঝখান থেকেও স্বকীয় তাঁর কাব্যভাষার স্ফুরণের কথা শোনাতেই ওরা জানতে চাইল, বাংলা ভাষায় রিলকের তেমন কোনো কদর হয়েছে কিনা। প্রত্যুত্তরে আমি বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু করে সমর-সুনন্দা-শুভরঞ্জনের সম্পন্ন রিলকের রচনার ভাষান্তরের কিছু অমূল্য নিদর্শন পেশ করলাম। ওরা তো মুগ্ধ। অতঃপর অটোবানে আড়াই ঘণ্টার পথ উজিয়ে যখন স্টুটগার্টে আয়োজিত একটি অ্যাকাডেমিক সেমিনারে রিলকের কাব্যাদর্শের মহিমা নিয়ে কথা বলছি, তখনই তিউনিসিয়া থেকে জার্মানিতে আগত শরণার্থী এক কবি-অধ্যাপক আমাকে মনে করিয়ে দিলেন যে, রিলকের মতো একজন বিশ্বকবিকে কবিতার তথাকথিত বিশুদ্ধতার শর্তে আবদ্ধ করে রাখতে-চাওয়াটা আজ আর সমীচীন কিনা। এই বলেই, বলা নেই-কওয়া নেই, কবির প্রহরপুঁথি (Das Stunden Buch) থেকে ভাঙা-ভাঙা জার্মানে তিনি আবৃত্তি করে শোনালেন নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিগুলো :

আমি না থাকলে, তুমি বাস্ত্তহীন, ঈশ্বর তোমাকে

ঊষ্ণ ও মধুরতম অভ্যর্থনা জানাবে না কেউ,

খসে যাবে অবসন্ন তোমার চরণ থেকে সব

ভেলভেটের আস্তরণ, লোকে যাকে ‘আমি’ বলে থাকে।

 

সঙ্গে-সঙ্গে চিদ্ঘন আমিত্বের (egotistical sublime) সবচেয়ে মহান প্রতিভূ রবীন্দ্রনাথের কথা আমার মনে পড়ে গেল; ভাবানুষঙ্গে তাঁর মন্ত্রমদির গানের কলি ‘তাই তোমার আনন্দ আমার পর’। আমি পরক্ষণে বুঝে নিতে পারি যে, আমাদের এই বিকেন্দ্রিত ও বিপন্ন সময়ে যে-কোনো মহাকবিকেই তাঁর ধ্রম্নপদী নান্দনিকের জায়গাটা থেকে এক ঝটকায় বেরিয়ে এসে জগৎব্যাপী শরণার্থীদের ছাউনিতেও মাথা গুঁজতে হবে আর সেখানেও ঈশ্বরের পুনর্বাসন ঘটাতে হবে। দূরভাষে আমি শুভরঞ্জনকে বলি, ‘সেদিক থেকে দেখলে রিলকে কালোত্তীর্ণ হয়েও এই মুহূর্তে কিরকম যুগউপযোগী।’

দ্রষ্টব্য : অতন্দ্র গোলাপ এবং রায়নার মারিয়া রিলকের জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে একটি রঙ্গমায়া-১৯৮৬।

লেখক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রাক্কথন

অনেক কাব্যবিশারদই দাবি করে থাকেন যে, রায়নার মারিয়া রিলকে গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইউরোপীয় কবি। ইউরোপ বলতে আমি অবশ্যই বোঝাচ্ছি সমগ্র পশ্চিমবিশ্ব। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তো সরাসরি বলেই দিয়েছেন যে, রিলকে তাঁর প্রিয়তম কবি। আমিও এই মতের সমর্থক, যদিও আমি হয়তো রিলকের পাশেই উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস্কে স্থান দেব। রিলকের কবিতায় যন্ত্রণাবোধ ও শোকানুভূতি অনায়াসে প্রবেশ করে, যদিও এই যন্ত্রণা আর শোকই কবিতার cathartic প্রভাবে জীবনের জয়গানে রূপান্তরিত হয়। শোক থেকে আনন্দ অভিমুখী এই যাত্রা সবথেকে বেশি পরিস্ফুট তাঁর বিখ্যাত কবিতাদ্বয় ‘The Sonnets to Orpheus’ এবং ‘Duino Elegies’-তে। অন্যদিকে তাঁর অনবদ্য ক্ষুদ্র কবিতাগুলো বস্ত্তস্বরূপ থেকে অতীন্দ্রিয়ের দিকে ধাবিত হয়। এই আরোহণ ও উত্তরণের প্রতীক রিলকের বৃক্ষবন্দনা। ক্ষণে-ক্ষণেই আমরা এই বৃক্ষের সম্মুখীন হই, যে-বৃক্ষ শিকড় থেকে উঠে ধেয়ে চলে চিদানন্দ আকাশের দিকে। অনুবাদের জন্য নির্বাচিত ‘হেমন্তসন্ধ্যা’ শীর্ষক কবিতায় আমরা পড়ি Wind aus dem Mond, ploetlglich ergriffene Baume। ইংরেজিতে এর অনুবাদ দাঁড়াবে Wind from the moon/ trees suddenly sieged.

একদিকে কবির সুদীর্ঘ কবিতাগুচ্ছ ‘Duino Elegies’ এবং অন্যদিকে ছোট কবিতা ‘হেমমেত্মর দিন’ একই দ্বান্দ্বিকতার সৃজনমুখী ফসল। অতীন্দ্রিয়, মায়াময় কবি রিলকে মাটি ও সান্দমান বিশ্বকে অস্বীকার করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে মাটি ও আকাশকে গেঁথে রেখেছে এক সচেতন দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া। এর উত্থান মানবভূমি ও বস্ত্তরূপের মিলিত বৃত্ত থেকে এবং গন্তব্য সেই বিমুক্ত খোলা আকাশ, যার প্রামেত্ম দাঁড়িয়ে অতৃপ্ত কবিসত্তা মর্মভেদী প্রশ্ন উচ্চারণ করেছে, ‘Who, if I cry, will hear me among the angelic order?’ এই মূল প্রশ্নটি বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে বারবার ঝংকৃত হয়েছে রিলকের কবিতায় এবং তার উত্তর নেমে এসেছে আকাশের প্রান্ত থেকে মরমি, ইন্দ্রিয়াতীত ভাষায়। এই সামগ্রিক কাব্যিক পরিকল্পনায় মায়াবী, সংগীতমুখর, বর্ণোজ্জ্বল বৃক্ষই মিলিয়ে দিয়েছে মাটি ও আকাশকে। soil এবং sky-এর এই মিলনযন্ত্রণার দগ্ধতাকে অতিক্রম করে রচনা করেছে এক ঐশ্বরিক শান্তি, যেখানে টি. এস. এলিয়টের ভাষায় – the fire and the rose are one.

অনুবাদের জন্য আমরা রিলকের প্রসিদ্ধ কবিতা বেছে নিইনি। অর্থাৎ ‘The Sonnets to Orpheus’ এবং ‘Duino Elegies’-কে আমরা সচেতনভাবেই দূরে রেখেছি কারণ এই কবিতাদ্বয়ের অনবদ্য ইংরেজি অনুবাদ অনেককেই আন্দোলিত করেছে। যে-দুজন কবি অনুবাদক Sonnets এবং Elegies-এর সার্থক অনুবাদ করেছেন – J. B. Leishman ও Stephen Mitchell – তাঁদের কৃত পাঠই রিলকেকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য যথেষ্ট। এমনকি তাঁর প্রখ্যাত ক্ষুদ্র কবিতা ‘Panther’ও আমরা সচেতন-মনে বাদ দিয়েছি যেহেতু অনেকেই এই কবিতাটি মুখস্থ বলতে সমর্থ। সত্যি বলতে, ‘Panther’-এর মতো realistic কবিতাই আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, ভাস্কর রদ্যাঁর (Rodin-র) সান্নিধ্য তাঁকে অবশ্যই প্রভাবিত করেছিল।

যে-কবিতাগুলোর ভাষান্তর করেছি, সেগুলোর মধ্যে ‘Herbsttag’ বা ‘হেমমেত্মর দিন’ সুপরিচিত। বাকিগুলো ততটা নয়। আমাদের লক্ষ্যও ছিল তুলনায় স্বল্পপরিচিত কবিতা পেশ করা। উপরন্তু, ‘হেমমেত্মর দিন’, ‘হেমন্ত সন্ধ্যা’ এবং ‘প্রাক্বসমেত্মর গান’ প্রকৃতির প্রতি কবির অনুভব ও দৃষ্টিকে পরিস্ফুট করে। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের (William Wordsworth) সঙ্গে রিলকেও প্রকৃতির অভ্যন্তরে জীবনের হৃৎস্পন্দন শুনতে পেয়েছিলেন এবং সেই অনুভূতিময় প্রকৃতিকেই তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন তাঁর নিজস্ব অতীন্দ্রিয় সত্তার সঙ্গে।

এ-প্রসঙ্গে ‘The Marriage’/ ‘বিবাহ’ কবিতাটি বিশেষ উলেস্নখের দাবি করে। রিলকে যে কতটা বস্ত্তনিষ্ঠ ছিলেন, এই কবিতা তারই প্রমাণ। একদিকে নারী-পুরুষের স্বপ্নহীন ক্লান্তিকর বৈবাহিক সম্পর্ক তিনি ছেনে-ছেনে দেখেছেন এই কবিতায়; অন্যদিকে এক নিমেষে চলে গেছেন দেবদূতদের পবিত্র অঙ্গনে তাঁর বিশুদ্ধ একাকিত্বকে সম্বল করে। রিলকের অসামান্য কাব্য এই দুই প্রান্তরের ভেতরেই অনুপম দ্বান্দ্বিকতার সৃষ্টি করে।

 

 

হেমমেত্মর দিন

 

প্রভু, এই তো সময়

গ্রীষ্ম বড় দীর্ঘ ছিল

এবার সূর্যঘড়ির উপর

নামুক তোমার ছায়া

এবং বিসত্মীর্ণ প্রান্তরে

ঘূর্ণিত হোক উন্মত্ত বাতাস।

 

আনত ফলগুলি তুমি পূর্ণতর করো

তারা শেষত্ব প্রাপ্ত হোক তোমার আজ্ঞায়

তবুও দুটি দক্ষেণ দিন এবং শেষ মধুরতা

তাদের লুব্ধ করুক ভরা আঙুরগুচ্ছ।

 

সে এখন নির্মাণ করবে না যার কোনো গৃহ নেই

সে এখন নিঃসঙ্গ… এবং আরো বহুদিন

শেষ রাত্রে বসা, চিঠি লেখা আর পুনরায়

প্রত্যাবর্তন সেই অস্থির যাত্রায়

পার্কে আঁধারে পাতাঝরা ছায়াচ্ছন্ন রাস্তায়।

 

অনুবাদক : সমর রায়

 

 

হেমন্তসন্ধ্যা

 

বাতাস এল চাঁদের থেকে

আর সহসা আক্রান্ত হল বৃক্ষরাজি,

এবং একটি পাতা ঘুরতে ঘুরতে

ঝরার সময়ে পথ খুঁজলো।

লণ্ঠনের মৃদু আলোর মধ্য দিয়ে

বহুদূরের গাঢ় কৃষ্ণ নিসর্গ-

জোর করে প্রবেশ করলো

সিদ্ধান্তহীন শহরের ভিতর।

 

অনুবাদক : সুনন্দা বসু ও শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

 

 

প্রাক্বসমেত্মর গান

 

কাঠিন্য অদৃশ্য

হঠাৎ নেমে এল দাক্ষেণ্য

উন্মুক্ত প্রান্তরের ধূসরতার উপর।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলধারা

তাদের গতি পালটালো

এবং আকাশ থেকে নেমে আসা

ভালবাসার ছোঁয়াগুলি

স্পর্শ করলো ভূমি।

গভীর পথগুলি প্রবেশ করলো

মাটির নিসর্গের ভিতর দিয়ে

এবং সহসা পত্রহীন গাছের মধ্যেই-

তার উত্তরণ ও প্রকাশ।

 

অনুবাদক : সুনন্দা বসু ও শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

 

 

উৎসর্গ

 

আমাদের সর্বোত্তম কাজ হল :

এমন একটি লিখিত ভাষার সৃষ্টি

যা কিনা আমাদের অশ্রু সহ্য করতে পারবে

এবং আমাদের সামনে আবার সৃষ্টি করবে

-সুস্পষ্ট, নির্মাণ, সুনিশ্চিত-

রমণীয় বিদায়সম্ভাষণ তাদেরই জন্য

যারা সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল।

 

অনুবাদক : সুনন্দা বসু ও শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

 

 

 

বিবাহ

 

সে এখন বিষণ্ণ

সে নীরব, শব্দহীন, নিঃসঙ্গ।

দেখো – সে যন্ত্রণায় বিদ্ধ।

তোমার রাত্রিগুলি

তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল

অনেকটা স্থানচ্যুত পাথরের মতো

আর তার রাত্রিগুলি ছিল মৃদু উত্তেজনাময়।

 

তোমার ভোঁতা কামনা দিয়ে তুমি শতবার

তাকে বিনষ্ট ও বিষাক্ত করেছিলে।

অবশ্য তুমি শুধু একবার

যেন মধ্যযুগের দাতা হয়েছিলে

এবং নীরব নিঃশব্দ আঁধারে

তার পাশে নতজানু ছিলে,

এখানেই তোমার পৌরুষ

তোমার নিজস্ব বৃত্ত থেকে নিষ্ক্রমণ।

 

অনুবাদক : সুনন্দা বসু ও শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

 

শেয়ার করুন