রুপোর চামচ

লেখক:

তিলোত্তমা মজুমদার

বড় সংস্থার বড়মাপের কর্মকর্তা। সংসারে কোনো কিছুর অভাব তো নেই-ই, বরং নানা সামগ্রীর আধিক্য চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। তবু, বিমানে পরিবেশিত খাবারের থালা থেকে তিনি তুলে নিলেন কারুকার্যময় চামচখানি। ঠান্ডা মালাই খাওয়ার জন্য দিয়েছিল। রুপোর চামচ। সত্যিই রুপোর নাকি? লোকে তো তাই বলে। এই বিমানে আইসক্রিম খাওয়ার চামচটি রুপোর। এদিক-ওদিক তাকিয়ে তিনি সেটি পকেটস্থ করলেন। কেউ লক্ষ করল নাকি? যাকগে! অন্যমনস্কভাবে ঢুকিয়ে ফেলেছেন এমন ভাব করতে হবে। তিনি অকারণে এধার-ওধার খোঁজাখুঁজি প্রদর্শন করলেন। যেন কিছু হারিয়েছেন। যেন প্রয়োজনীয় বস্ত্তটি খুঁজে পাচ্ছেন না। রুমাল বা কলম বা চশমা! কেউই তাঁকে নজরবন্দি করেনি দেখে আশ্বস্ত হয়ে সুন্দর নকশা করা হাত-মোছা রুমালখানিও ভাঁজ করে প্যান্টালুনের পকেটে চালান করে দিলেন। বিমানবালাকে তলব করে আরো দু-চারটি দুধ-চিনির মোড়ক চেয়ে নিয়ে হাতব্যাগের চেন খুলে পুরে ফেললেন। মুফতে যা পাওয়া যায়। এত দাম দিয়ে বিমানের টিকিট ক্রয় করা – সে কি এমনি এমনি? যদিও খরচ তিনি করেননি। সংস্থার ব্যয়েই বিমানভ্রমণ করেন। তবু প্রতিবার চামচ, কাঁটা, ছুরি – যা সুযোগ পান, হরণ করেন। তাঁর বাড়িতে, বাসন রাখার দেরাজে, বহুবিধ বিমান সংস্থার প্রতীক-অাঁকা ছুরি-কাঁটাচামচ এবং হাত-মোছার রুমাল মিলবে।
আজকের ঠান্ডা মালাইয়ের চামচখানি নিখাদ রুপোর, এই রটনা তাঁর গপ্পো বলেই মনে হয়। দেখতে কিন্তু একেবারে রজতকান্তি! সঙ্গে ওই সূক্ষ্ম কারুকৃতি। রুপোর না হলেও চামচটি মনোহরক, সন্দেহ নেই। এমনকি রুপোর বলে অনায়াসে চালান করে দেওয়া যায়। আর খাঁটি স্টিলের হলেই বা কী! বিমান সংস্থা ভারী স্টিলের জিনিস দেয়। এত বছর ধরে যত চামচ-কাঁটা তিনি সংগ্রহ করেছেন, কোনোটিতে মরচে পড়েনি। বড়মাপের কর্মকর্তা হওয়ার পথে তিনি শিখেছেন, হরণ বা সংগ্রহ – সমস্তটাই উচ্চমানের হওয়া চাই। এই চামচটিও ফেলনা নয়। তিনি খোশমেজাজে পানীয়তে চুমুক দিলেন। যে-মেয়েটি পানীয় পরিবেশন করছিল তাকে দেখতে দেখতে তাঁর একবার বকুলবালার কাছে যেতে ইচ্ছা করল। মেয়েটির চুল, চোখ, ঠোঁট, গলা, বুক, কোমর, এমনকি উঁচু খুর তোলা জুতোয় মোড়া পায়ের পাতা পর্যন্ত মসৃণ যত্নে গড়া, সাজানো। তার সপ্রতিভ চলনে যে-ছন্দ, যে-দোলা তা মনোযোগসহকারে দেখলে স্নায়ুগুলি মদিরামদির করে দেয়। এবারের ভ্রমণে বড় পরিশ্রম হয়েছে। বকুলবালা তাঁকে খানিক চাঙ্গা করে তুলতে পারে। তিনি স্থির করলেন, বাড়ি যাওয়ার আগেই একবার বকুলবালার কাছে যাবেন। দেরি করে বাড়ি ফেরার জন্য বউ কৈফিয়ত চাইতে পারে। তাকে ঠান্ডা করার জন্য রুপোর চামচ ধরিয়ে দিলেই হবে। সেটি আসল না নকল, বোঝার ক্ষমতা বউয়ের নেই। তাঁর ধারণা, কোনো মেয়েরই থাকে না। আর যদি সত্যি চামচটা রুপোর হয়ে থাকে তবে তো কথাই নেই। একবার স্বর্ণকার দিয়ে যাচাই করিয়ে নিতে হবে। যদি সত্যি রুপো হয়! বিমান সংস্থার পড়তায় পোষায় কী করে? যাত্রী পরিষেবার পুরোটাই অবশ্য তারা টিকিটের মূল্যের মধ্যে ধরে নেয়। সতর্ক এবং হিসেবি কর্তা অঙ্ক কষতে লাগলেন, যদি এই চামচ সত্যি রুপোর হয় তবে কত টাকা এই বাবদ বাড়তি নেওয়া হয়েছে! বিমানে অন্তত আড়াইশো যাত্রী। তার মধ্যে যদি একশজনই চামচ অপহরণ করে, করবেই তিনি নিশ্চিত, তবে সংস্থার কত ক্ষতি হতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই তারা রুপোর চামচ দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে।
বিমানবন্দরে তাঁর জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে তিনি শহরের পার্ক সার্কাস অঞ্চলে বকুলবালার বাড়ির দিকে চললেন।
বকুলবালা একজন অভিজাত গণিকা। রুচিসম্পন্ন তার বাসভবন। আচরণ মার্জিত। সে নিয়মিত টেলিভিশনে খবর দেখে। গীতা দত্ত এবং লতা মুঙ্গেশকরের গান শোনে। খদ্দের নির্বাচনের ব্যাপারে সে সতর্ক। এমনকি নিজের স্বাস্থ্যের বিষয়েও।
এই কর্তাব্যক্তিও অতীব সুভদ্র। আচম্বিতে তিনি গণিকালয়ে উপস্থিত হবেন, তা হতে পারে না। যদি তিনি বিমানের চামচ হরণ করেনও, তবু কেউ তাকে অমার্জিত বলতে পারবে না। বকুলবালা তাকে সময় দিতে পারবে কিনা তিনি ফোন করে জেনে নিয়েছেন।
বিমানবন্দর থেকে পার্ক সার্কাসের দূরত্ব কম নয়। এই দীর্ঘ পথ এসে কর্তার স্নানের ব্যাকুলতা জাগল। বকুলবালা তাকে সবরকমে সহায়তা করল। তার পরিষেবায় তৃপ্ত হয়ে কর্তাব্যক্তি ঘুমে ঢলে পড়লেন। বকুলবালা তার প্যান্টালুনের পকেট হাতড়াতে লাগল। পোশাকটি বকুলবালার আলমারিতে ঝুলছিল। তাই তার কোনো অসুবিধে হলো না। সে কর্তার টাকার থলেটি পেয়ে গেল। সে চোর নয়। লোভী বা বোকাও নয়। কর্তাব্যক্তি তাকে ভরসা করেন বলেই নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাচ্ছেন।
বকুলবালা কেবল কয়েকটি বড় টাকা সরাল। থলেটি টাকায় ঠাসা, যেমন থাকে বড়মানুষদের, এবং তারা কখনোই গরিব লোকের মতো পাই-পয়সার হিসাব রাখেন না। বকুলবালা তার পরিশ্রমের দাম পাবে। তবু এই গোপন উপার্জন সে তার হক বলেই মনে করে। কেন নয়? তার যা করার কথা, ততোধিক সে দেয়। কার্পণ্য করে না। পরিশ্রম যত ন্যায্যমূল্যই পাক, উপরি পাওনার আনন্দই আলাদা।
টাকার থলেটি যথাস্থানে রাখতে গিয়ে শক্ত কিছুতে তার হাত ঠেকল। সেই চামচটি। সে টেনে বের করল। দেখল আর মুগ্ধ হয়ে গেল। এ তো রুপোর চামচ। সে নজর করল, চামচে বিমান সংস্থার প্রতীক খোদিত আছে। এই প্রতীক সে চেনে। আরো কয়েকটি প্রতীক। তার এক খদ্দের তাকে মাঝে মাঝেই বিমানবন্দরের রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায়। সে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে তখন। সে কখনো বিমানে চাপেনি। যেখানে এত দামি আর সুন্দর চামচ দেয়, না জানি সেসব কত আনন্দের! ফিল্মে দেখা বিমানের অন্দর তার মনে পড়ল। সে চামচটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে মোহে পড়ে গেল! স্থির করল, চামচটি সে আত্মসাৎ করবে। এই বড়মানুষের কাছে এই চামচের মূল্য আর কী! তার পকেটে চামচ এলোই বা কী করে! হয়তো বিমানে উঠলেই এমনসব অপূর্ব জিনিস উপহার দেয়। কর্তা অবহেলায় পকেটে রেখে দিয়েছেন। এ দিয়ে তার কোনো কাজ হবে? তার গৃহিণীর কাছেও এর কোনো মূল্য নেই। একটা চামচ গলিয়ে একজোড়া পায়ের নূপুরও হবে না।
সে চামচটি লুকিয়ে ফেলতে ফেলতে ভাবল, যদি এই বাবুটি তাকে ধরেন! যদি অন্য কোনোদিন এসে বলেন, আমার পকেটে যে রুপোর নকশাদার চামচ ছিল, সেটি কোথায়?
‘ওহ্! এটি আপনার বুঝি! মাটিতে পড়ে ছিল তো। কার না কার ভেবে আমি তুলে রেখেছি।’ খাসা উত্তর। তার মাথায় এসে যাওয়ায় সে স্বস্তি বোধ করল। অবশ্য বাবু ফিরে তার চামচের খোঁজ করবেন এই সম্ভাবনা তার সুদূরপরাহত বলে মনে হলো না। একবার বাবু তাকে সিঙ্গাপুরের টাকা দেখতে দিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরের এক টাকা। তিনি যখন বিদায় নিলেন তখনো টাকাটি টেবিলে কাচের খন্ডে চাপা ছিল। বকুলবালা ভেবেছিল, কর্তা বুঝি টাকাটি তাকে দানই করে গিয়েছেন। সে অমূল্য সংগ্রহ হিসেবে তুলে রেখেছিল। আসলে কিন্তু টাকাটি নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। পরেরবার এসে প্রথমেই তা চেয়ে নিলেন। ‘তোমাকে দেখতে দিয়েছিলাম না? ওটা ফেরত দাও।’
সেই রাতে, বকুলবালার সান্নিধ্যে তুষ্ট কর্তাব্যক্তিটির চামচের কথা কখন মনে পড়েছিল কে জানে। বউকে চামচ উপহার দিতে গিয়ে যখন সেটি পাওয়া গেল না তখন কী হয়েছিল সে-সংবাদও কেউ জানে না।
পরদিন সকালে গণিকা বকুলবালার ঝি এলো কাজ করতে। কাজের মাঝে এটা-ওটা হাতড়ে দেখা তার স্বভাব। এভাবে অনেক সময়ই সে টাকা-পয়সা পেয়ে যায়। একবার শোবার ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে সোনার বোতাম পেয়েছিল। পুরুষের পাঞ্জাবির বোতাম। পাওয়ামাত্র সে ব্লাউজের ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। প্রথমে ভাবল এ গিল্টি জিনিস। কিন্তু পাড়ার স্যাকরার দোকানে যাচাই করতে লোকটা বলল, ‘খাঁটি সোনা। বেচতে চাও তো বলো। ভালো দাম পাবে। জিনিসটা কার?’
সে বলে, ‘কার আবার! আমার!’
‘তোমার তো কী জিনিস তা-ই জানো না? যাচাই করতে এসেছ! মিছে কথা কইছ কেন? পুলিশে ধরলে বুঝবে মজা।’
‘পুলিশ! কেন? আমি কি চোর?’
‘সে আমি কী জানি! তবে জিনিস তোমার নয়। তার ওপরে খাঁটি সোনা। দেখো বাপু, আমিও তোমায় গিল্টি জিনিস বলে দুটাকায় হাতিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু ব্যবসা করতে হয় সততার সঙ্গে। এখানে ছ্যাঁচড়ামির কোনো জায়গা নেই। তাই তোমার ভালোর জন্যই বলছিলাম।’
‘সত্যি বলছি, এ চুরির মাল নয়। কুড়িয়ে পেয়েছি। বিশ্বাস করো।’
‘বিশ্বাস আমি করলাম, পুলিশ করবে কী? যার জিনিস সে তো চুপ করে বসে নেই, পুলিশের খাতায় লিখিয়েছে। তাই বলছিলাম, পাঁচশো টাকা দর দেবো। আমায় বেচে দাও। গলিয়ে ফেলি। কাকপক্ষী টের পাবে না।’
‘পাঁচশো!’
ঝি আজো ঠাহর করতে পারেনি পাঁচশো পেয়ে সে লাভ করেছিল, না লোকসান। স্বামীকে সে সোনার বোতামের দর শুধিয়েছিল। সে মুখ খিঁচিয়ে জবাব দেয়, ‘কেডা কবে? আমি জানি?’
পাড়ার এক বিশ্বস্ত সখীকেও সে শুধোয়। সে বলেছিল, ‘ম্যা গো! সে হবে ক’হাজার! ওসব বড়নোকের বস্ত্ত।’
‘ক’হাজার! একজন বলছিল – পাঁচশো।’
‘পাঁচশো! তা হবেও বা! পেতি সোনার এক ফিনফিনে কানমাকড়ি মা আমায় গড়িয়ে দেসল। তখন দর ছিল দেড়শো। মা বলে।’
ঝি আর যাচাই করার চেষ্টায় যায়নি। পাঁচশো টাকা তার কাছে অনেক। সে হাজার টাকা পর্যন্ত হিসাব রাখতে পারে। তারপর গুলিয়ে ফেলে। লাভ-লোকসান সে শিকেয় তুলে রাখল।
বকুলবালার গৃহে স্বভাবমতো এটা-ওটা দেখতে দেখতে পেতলের ফুলদানিতে সে পেয়ে গেল সেই চামচ। দেখামাত্র সে বুঝে গেল, এ রুপোর না হয়ে যায় না। আর জিনিসটা দেখতেও কী সুন্দর! অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে সে স্বভাবমতো চামচটা ব্লাউজের অভ্যন্তরে চালান করে দিলো। তার মনে পড়ল, স্যাকরা বিগলিত হেসে তাকে বলেছিল, এমন জিনিস আরো যদি কুড়িয়ে পাও তো এনো।
ঝি স্থির করল, এই রুপোর চামচ সে আজই স্যাকরার কাছে নিয়ে যাবে না। আগে দাম যাচাই করবে।
লম্বাটে গড়নের ছোট ধাতব চামচটি তার বুকে অস্বস্তি সৃষ্টি করছিল। সে তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বিদায় নিল। ভাবতে লাগল, চামচের বিষয়ে তার কর্ত্রী তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে বলবে, সে কিছু জানে না। এ-বাড়ি ও-বাড়ির কত মেয়ে আনাগোনা করে। সে একলা সন্দেহভাজনের তালিকায় পড়বে না।
পার্ক সার্কাস এলাকার একটি ঝুপড়িতে ঝিয়ের বাস। হোগলার চাটাই-ঘেরা ঘরে সে যখন চামচটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছিল, কোন ফাঁক গলে রোদ্দুর ঢুকে চামচটিকে ঝলমলিয়ে তুলল। ঝি সেটি চালের হাঁড়িতে লুকিয়ে। কিন্তু ঝুপড়ির একটি ছোট মেয়ে সেই ঝলকানি দেখে ফেলেছিল। জিনিসটার প্রতি ভারী লোভ হলো তার। মনে হলো, অমন চমকানো জিনিস না পেলে তার রাতে ঘুম আসবে না। তাছাড়া, ওই মাসি ওটা লুকিয়েই বা রাখল কেন! নিশ্চয়ই খুব দামি জিনিস! পথে-মাঠে-ইস্টিশনে চকচকে বস্ত্ত পেলেই কুড়োতে সে ওস্তাদ। তার চোখ সারাক্ষণ ঘুরছে, সারাক্ষণ সন্ধানী। সে তক্কে-তক্কে রইল। ঝি ঘরের ঝাঁপ ফেলে বালতি নিয়ে টাইমকলে জল আনতে বেরোল। এখন সে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করলেই অপর কেউ তার বালতি পিছিয়ে নিজেরটা এগিয়ে দেবে। জীবনে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা সর্বত্র এরকম। চিলনজরে আগলে রাখো অবস্থান। নইলে তা বেদখল হয়ে যাবে। ছোট মেয়েটি এই কথা জানে। সে তার সুযোগ নিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সে ঝাঁপ সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। অব্যর্থ তার লক্ষ্য। চালের হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে সে চামচটি তুলে নিজের জাঙ্গিয়ার গার্টারে সেটি আটকে ফেলল। তারপর ফ্রকের ওপর দিয়ে চেপে ধরে পা টিপে-টিপে বেরিয়ে এলো বাইরে। সন্তর্পণে এদিক-ওদিক দেখল। ঝাঁপ খোলা রেখেই চোঁ-চাঁ দৌড় দিলো। একেবারে নিজেদের ঝুপড়িতে ঢুকে পরিশ্রম ও উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল। তার মদিরাসক্ত বাপ সকালবেলাতেই কয়েক পাত্তর মদ গিলে এসে ঘরের কোণে শুয়ে ঝিমুচ্ছিল। মেয়ের দিকে ভ্রূক্ষেপ মাত্র করল না। তখন জলের হাঁড়ি মাথায় করে তার মা ঢুকল। মা-ও পাঁচবাড়ি খেটে সংসার টানে। হাড়-জিরজিরে শরীরে নিরন্তর ক্লান্তি। দুশ্চিন্তা, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, দিবারাত্র মারামারি কামড়া-কামড়ি করে বেঁচে থাকার গ্লানিতে, পরিশ্রমে, মদ্যপ স্বামীর অকর্মণ্য স্বার্থপরতায় সে খিটখিটে। তবে মেজাজের ঝাঁঝ ছোট মেয়েটিকেই সইতে হয় বেশি। প্রায়ই কপালে বেধড়ক প্রহার জোটে। মায়ের রোগা-রোগা পরিশ্রমী হাড়সর্বস্ব হাতদুটি বেজায় শক্ত। মারলে লাগে। লালচে রুখু চুল, পায়ে হাজা, নোংরা শাড়ি পরা, গায় ঘাম আর বাসি বাসনের এঁটো-পচা গন্ধ। সিঁথির বাসি সিঁদুর দগদগ করে। সংসারের শখ এখন মায়ের বিষম আপদ। মাথার ওপর থেকে জলের ভার নামিয়ে সেও হাঁপাতে লাগল।
অন্য সময় পিটুনি খাওয়ার ভয়ে মেয়ে মাকে এড়িয়ে চলে। আজ সে কাছ ঘেঁষে বলল, ‘মা, মা, দেখো কী পেয়েছি।’
সে ফ্রকের তলা থেকে চামচটি বের করে মাকে দিলো। মায়ের মুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল। মেয়ের হাত থেকে চামচটি নিয়ে দেখতে দেখতে সে বলল, ‘এ তো মনে হচ্ছে রুপোর চামচ। কোথায় পেলি রে?’
‘রাস্তায় কুড়িয়ে পেলাম।’ মেয়ে মিথ্যে করে বলল। যদিও তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। সত্যি বললেও তার মা বস্ত্তটা ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ করত না। নিদারুণ পরিশ্রমও যখন ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে ব্যর্থ হয়, নিরাপত্তা জোগাতে পারে না, মানুষ তখন উঞ্ছবৃত্তির মধ্যে বাঁচে। তাতে গ্লানি বোধ করে না।
মা বলল, ‘যেমন সুন্দর তেমন ওজনদার। বেচলে ভালো টাকা পাওয়া যাবে।’
মেয়ে বলল, ‘এটা বেচে দেবে?’
‘ঘরে রেখে কী হবে? চুরি যাবে।’
‘এটা সত্যি রুপোর।’
‘তাই তো মনে হয়।’
‘এটা দিয়ে তুমি কানের মাক করো মা।’
‘মেয়ের কথা শোনো! দশ বাড়ি খেটে খাই। গয়নায় আমার কী হবে? তার চেয়ে তোর পায়ের নূপুর গড়িয়ে দেই। পরবি? হাঁটবি, ছুটবি, আর ঝুমঝুম শব্দ বাজবে।’
মেয়ে হাসি-হাসি লজ্জা-লজ্জা মুখ করে ফ্রকের কোণ চিবোতে লাগল। একজোড়া রুপোর নূপুর কল্পনা করে সে বিভোর হয়ে উঠল।
মা চামচটি দেখছে তো দেখছেই। এ জগৎ কতসব দামি ও সুন্দর সামগ্রীতে ঠাসা। তাদের কিছুই নেই। অনেকদিন পরে মায়ের মন ক্ষণিকের খুশিতে ভরে উঠল। যেন তাদের ঝুপড়িঘরের অন্ধকারে সাতরাজার ধন ঝলমলাচ্ছে।
মাতাল বাপ কখন জেগে উঠেছিল। সে বলল, ‘দেখি।’ বউয়ের হাত থেকে চামচটি সে কেড়ে নিল। মেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাপের গায়ে। কঁকিয়ে বলল, ‘ওটা তুমি নেবে না। ওটা আমার। আমি পেয়েছি।’
‘লে চল! হঠ্!’
বাপ এক ধাক্কায় ফেলে দিলো মেয়েকে। মা চামচটা কেড়ে নিতে গেল।
‘দিয়ে দাও! দিয়ে দাও ওর জিনিস! সব খেয়েছ। সংসারে একটা টাকা দাও না, এখন মেয়ের জিনিস ধরে টান দাও! তোমার লজ্জা নেই!’
‘হঠ্ শালি!’
মায়ের গতিও হলো মেয়ের মতোই। সে মেঝেয় আছড়ে পড়ল। বাপ খুব বলবান নয়। কিন্তু পুরুষের বলবান না হলেও চলে। সে যে পুরুষ এই বিক্রমেই সে রোজ মদ খেয়ে এসে বউ পেটায়। সে টলমল-পায়ে দরজার দিকে গেল। জীর্ণ, নোংরা, ঝলঝলে প্যান্টালুনের পকেটে চামচটি ঢুকিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। ভাবল, বেচে যা পায় তাতে কিছু মদ গেলা যেতে পারে। ভালো টাকা পেলে ভালো মদ খাবে, তার অনেককালের শখ। রুপোর চামচ শখ মেটাবে না তো কী। এমনকি সে ভদ্দরলোকের শুঁড়িখানায় গেলেও কারো কিছু বলার থাকতে পারে না।
সে লটর-পটর করতে করতে সেই স্যাকরার দোকানে উপস্থিত হলো। তার চোখে বাসি পিচুটি। মুখে গড়ানো নালের শুকনো সাদাটে মামড়ি। গায়ে মদের টোকো দুর্গন্ধ। হাতে রুপোর চামচ। কারুকার্যময়। উজ্জ্বল। সে চামচটা স্যাকরার হাতে দিয়ে বলল, ‘কত দাম?’
স্যাকরা দেখেশুনে বলল, ‘মাল তো বিমানের দেখছি। পেলি কোথায়?’
‘তাতে তোমার কী? খাঁটি রুপোর জিনিস। ওজন করো, দাম দাও।’
‘খাঁটি রুপো? কে বলল?’
‘আমি বলছি। আমি রুপো চিনি না? পাক্কা সিলভার।’
স্যাকরা জানাল, এটা সিলভার নয়। স্রেফ সিলভার প্লেটেড। লোহার ওপর হালকা রুপোর পরত। যা দাম, ওই নতুন কেনার সময়। এখন এটার জন্য কানাকড়ি দামও সে দিতে পারবে না।
মাতাল লোকটা হতাশ মনে পথ চলতে লাগল। পকেটে চামচ। কত স্বপ্ন দেখেছিল দামি মদ খাবে। হঠাৎ তার খুব রাগ হলো। সে চামচটা ছুড়ে ফেলল রাস্তায়। কী করে দু-পাত্তর মদ বাগানো যায়, তার ফন্দি করতে করতে চলে গেল।
এক ভিখারিনি যাচ্ছিল পথ দিয়ে। কোলে রোগা নোংরা শিশু। পেট ঢাক। ভিখারিনি গর্ভবতী। চকচকে বস্ত্তটা দেখতে পেয়ে অনেক কষ্টে নিচু হয়ে সে কুড়িয়ে নিল। হাতে নিয়ে নিজের সৌভাগ্যে সে পুলকিত হয়ে উঠল।
‘এ রুপোর চামচ। নিশ্চয়ই রুপোর।’ ভাবল সে। ময়লা শাড়ির ছেঁড়া অাঁচলে চামচের ধুলো মুছে সে তাড়াতাড়ি পেটকাপড়ের গোপন থলেয় চামচটা চালান করে দিলো। ঠিক করল, এ-চামচ সে বেচবে না। কাউকে দেবে না। পেটেরটা যদি ছেলে হয় তো এই রুপোর চামচে মন্দিরে দেবতার চরণামৃত খাওয়াবে।
ছেলের বাপ কে, সে জানে না। তবু, ছেলে মুখে রুপোর চামচ নিয়ে জন্মাবে… একদিন বাবুমশায় হয়ে উঠবে হয়তো, সে ভাবল।