রোকেয়ার অপ্রকাশিত-অগ্রন্থিত চিঠিপত্র ও রচনার সন্ধানে

লেখক:

আবুল আহসান চৌধুরী
তখনও জাগেনি কেহ, পিঞ্জরে বন্দিনী এক পাখী
আর্ত কণ্ঠে বার বার উঠেছিল ডাকি
নিশীথ তিমির বিদারি বিদারি সে ক্ষীণ কণ্ঠ তার
আঘাতি আঘাতি ফিরিয়া এসেছে। অনেক রুদ্ধ দ্বার
কেঁপে উঠে গেছে থেমে
আবার প্রাণের স্পন্দন জাগা সে সুর এসেছে নেমে
যেন সে অলখ হতে
আলোকের দ্যুতি নামিয়া আসিয়া প্রাণবন্যার স্রোতে
গাহিয়া উঠিল গান।

– সুফিয়া কামালের (১৯১১-৯৯) এই পঙ্ক্তি কয়টি তাঁর এক মহান পূর্বসূরির উদ্দেশে নিবেদিত – যাঁকে তিনি ‘আলোর দুহিতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। সেই অসামান্য তেজস্বী দ্রোহী নারীর নাম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)। তাঁর জীবন এক নাটকীয় বিন্যাসে রচিত। তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা, মুক্তির আকাক্সক্ষা, সমাজহিতব্রত, নারীর শিক্ষা ও জাগৃতির প্রয়াস, সাহিত্যের চর্চা – তাঁকে সমকালেই বিশিষ্ট করে তোলে – উত্তরকাল তাঁর কাছ থেকে লাভ করে বিশেষ প্রেরণা। তাঁর অবদানকে মুসলিম সমাজের কেন্দ্রে রেখে যে-মূল্যায়ন করা হয় তা যথার্থ নয়,             সে নিছকই খণ্ডিত বিচার। আসলে সম্প্রদায়নির্বিশেষে বাঙালিসমাজের প্রেক্ষাপটেই তাঁর বিশ্লেষণ ও বিচার হওয়া উচিত।  সেই বিবেচনায় বলতে হয়, রোকেয়া শুধু মুসলমান সমাজ নয়, সমগ্র বাঙালিসমাজের  নারীপ্রগতির এক মহান উদ্যোক্তা ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিষয়টি বুঝেছিলেন মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২)। ‘রোকেয়া-জীবনী’ পাঠ করে তাই তিনি সহজেই বলতে পারেন :

নানা কুসংস্কার, কুপ্রথা এবং অশিক্ষাজনিত মনোভাবের বিরুদ্ধ প্রভাব অতিক্রম করিয়া তাঁহার আত্মা যে স্থানটিতে আরোহণ করিয়াছিল তাহা যে কত সত্য ও ধ্র“ব তাহার এই প্রমাণ পাই যে – আমি বাঙ্গালী হিন্দু ঠিক যে নীতি ও ধর্মকে প্রাণের মধ্যে গ্রহণ করিয়াছি এই বাঙ্গালী মুসলিম দুহিতাও ঠিক তাহাকে প্রাণে প্রাণে অনুভব করিয়াছেন, বাঙ্গালী জাতির জাতীয় প্রেরণাই তাঁহাকে পরিচালিত করিয়াছিল।… একালে হিন্দু সমাজেও এমন নারীচরিত্র বিরল। কিন্তু তজ্জন্য হিন্দু আমি কিছুমাত্র লজ্জা বোধ করিতেছি না; কারণ বেগম রোকেয়া শুধুই মুসলিম মহিলা নহেন, তাঁহার জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে তিনি খাঁটি বাঙ্গালীর মেয়ে (শামসুন নাহার মাহমুদ-রচিত রোকেয়া-জীবনীর আলোচনা, সওগাত, জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪)।
বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ও অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন রোকেয়া। মাত্র ৫২ বছরের জীবনে তাঁর কৃতি-কীর্তির বৈশিষ্ট্য ও অর্জন বিস্ময় জাগায়। বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১) বিধবাবিবাহ প্রচলন-চেষ্টাকেই তাঁর জীবনের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ সৎকর্ম’ বলে উল্লেখ করেছিলেন – তেমনি সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠাই বোধকরি রোকেয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ – তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার স্কুলটা আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়।’ তাঁর নারীমুক্তির প্রয়াস ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূলে ছিল এই বিদ্যাপীঠ। এই স্কুলকে আশ্রয় করেই তাঁর নারীকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনা মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যক্তিজীবনেও তাঁর সান্ত্বনার অবলম্বন ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। তাঁর নিঃসন্তান বৈধব্যজীবনের নিঃসঙ্গতা মোচনেও এই স্কুলের ভূমিকা কম নয়। রোকেয়ার ভাবনা ও কর্ম মূলত তিনটি ধারায় বয়ে গেছে – মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা-পরিচালনা, নানা সামাজিক সংগঠন-সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও লেখালেখির মধ্য দিয়ে।
রোকেয়া সারাজীবনে গদ্য-পদ্য মিলিয়ে একেবারে কম লেখেননি, – চিঠিপত্রের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। বেঁচে থাকতে তাঁর পাঁচটি বই বের হয় : দুই খণ্ডে বিভক্ত প্রবন্ধ-সংকলন মতিচূর (১৩১১ ও ১৩২৮), উপন্যাস পদ্মরাগ (১৩৩১), অবরোধ-বাসিনী (১৯৩১) নামে কাহিনি-কণিকা এবং একমাত্র ইংরেজি-পুস্তিকা Sultana’s Dream (1908)| )। তাঁর রচনা – বিশেষ করে গদ্যরচনা প্রসঙ্গে বলা যায়, নিছক সাহিত্যচর্চার আগ্রহে তিনি এসব লেখায় হাত দেননি, মূলত সমাজশিক্ষার প্রয়োজনেই তাঁর এই লেখালেখির প্রয়াস।
রোকেয়া হিন্দু ও মুসলমান-পরিচালিত অনেক পত্র-পত্রিকাতেই লিখেছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য : নবপ্রভা, মহিলা, পুণ্য, নবনূর, অন্তঃপুর, ভারত-মহিলা, আল-এসলাম, বঙ্গীয়-মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা, সওগাত, ইসলাম-দর্শন, সাধনা, এডুকেশন গেজেট, পরিচারিকা, ধূমকেতু, বঙ্গলক্ষ্মী, সোনার ভারত, সাপ্তাহিক সত্যাগ্রহী, আহ্মদী, মাতৃ-মন্দির, নওরোজ, মোহাম্মদী, সাহিত্যিক, সবুজপত্র, মোয়াজ্জিন, গুলিস্তাঁ, Indian Ladies’ Magazine, The Mussalman প্রভৃতি। এই তালিকা প্রস্তুত করতে আবদুল কাদির সম্পাদিত রোকেয়া-রচনাবলী (ঢাকা, ১৯৭৩), মুহম্মদ শামসুল আলমের রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন : জীবন ও সাহিত্য (ঢাকা, ১৯৮৯), আবদুল মান্নান সৈয়দের বেগম রোকেয়া (ঢাকা, দ্বি-সঃ, ১৯৯৬) ও মালেকা বেগমের রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (কলকাতা, ১৪১৭) বই থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পত্রিকার কোনো কোনো সম্পাদকের সঙ্গে চিঠিপত্রে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এর মধ্যে মহিলা পত্রিকার সম্পাদক ব্রাহ্মসমাজের ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের (১৮৩৫-১৯১০) কথা সবচেয়ে বেশি করে বলা দরকার। মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি কারো সঙ্গে। তবে টেলিফোনে ও পর্দার আড়াল থেকে সওগাত-সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের (১৮৮৮-১৯৯৪) সঙ্গে নানা বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ আলাপ হয়েছে।
রোকেয়ার অনেক লেখাই গ্রন্থভুক্ত হয়নি। গদ্যপদ্য অনেক রচনাই নানা পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। রোকেয়ার মৃত্যুর অনেক পরে কবি আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪) তাঁর রচনাবলি সংগ্রহ ও সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারই ফলে ১৯৭৩-এ বাংলা একাডেমী থেকে কাদিরের সম্পাদনায় রোকেয়া-রচনাবলী প্রকাশিত হয়। পাঠক-চাহিদার কারণে এ-বইয়ের অনেকগুলি সংস্করণ হয়। আবদুল কাদিরের মৃত্যুর পর একাডেমী থেকে ভিন্ন বিন্যাসে নতুন কিছু রচনার সংযোজনসহ সম্পাদনা পরিষদের তত্ত্বাবধানে রোকেয়ার ওই রচনাসংগ্রহ প্রকাশ পায়। তবে আবদুল কাদির যে শ্রম, যতœ ও নিষ্ঠায় রোকেয়ার প্রকাশিত বই, অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত রচনা সংকলন করেন, মূলত তাই-ই অন্যদের উপকরণ সংগ্রহের উৎস ও সম্পাদনার আদর্শ হয়। এরপরেও রোকেয়ার অনেক রচনা অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত থেকে যায়। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ সেইসব রচনা উদ্ধার ও প্রকাশ করেন। এখনও যে রোকেয়ার অনেক লেখা ও চিঠিপত্র আমাদের নজরের বাইরে আছে তার প্রমাণ মেলে নতুন নতুন চিঠি ও রচনার আবিষ্কারে।
নিরন্তর সন্ধানের ফলে রোকেয়ার কিছু অপ্রকাশিত-অগ্রন্থিত রচনা সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে। তার মধ্যে নমুনা হিসেবে রোকেয়ার দুটি অগ্রন্থিত গদ্যরচনা এবং অপ্রকাশিত দুটি চিঠি ও একটি অগ্রন্থিত চিঠি এখানে সংকলনের সুযোগ আমাদের ঘটেছে। গদ্যরচনা দুটি বইয়ের ভূমিকা এবং চিঠি তিনটি দুই পত্রিকা-সম্পাদক ও এক ছাত্রীর অভিভাবককে লেখা। যে-দুটি বইয়ের ভূমিকা রোকেয়া লিখেছিলেন তার একটি আহ্মদর রহমানের নারী-তীর্থ নামের কবিতার বই এবং অপরটি মোহাম্মদ মোদাব্বের-রচিত (১৯০৮-৮৪) মুক্তিমন্ত্রে মুস্্লিম-নারী প্রবন্ধগ্রন্থ। রোকেয়ার এই ‘ভূমিকা’ দুটি আশির দশকের শেষদিকে বাংলা একাডেমীর গ্রন্থাগারিক আমিরুল মোমেনীন আমার নজরে আনেন এবং তাঁরই সহায়তায় তা সংগ্রহ করি। কিন্তু যথাসময়ে অগ্রন্থিত ‘ভূমিকা’ দুটি ছাপার সুযোগ হয়নি। পরে মালেকা বেগম কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত তাঁর রোকেয়া-জীবনীতে তা সংযোজন করেন। এখন ‘ভূমিকা’ দুটি মালেকা বেগমের সৌজন্যে এখানে সংকলিত হলো।
আহ্মদর রহমান সাহিত্যক্ষেত্রে কোনো পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন না। তবে তাঁর সঙ্গে যে সমকালীন লেখক-কবিদের বিশেষ  সম্পর্ক-সৌহার্দ্য ছিল তা তাঁর বইয়ের ভূমিকা থেকে বেশ জানা যায়। এই লেখকের পরিচয় উদ্ধার সম্ভব হয়নি। তবে বইয়ের ভূমিকায় ‘কাটাছরা’ গ্রামের উল্লেখ আছে, হয়তো এই গ্রামেরই মানুষ ছিলেন তিনি, কিন্তু গ্রামটি কোন জেলায় অবস্থিত তার হদিস পাওয়া যায়নি।  কৈফিয়ৎ  নামে লেখকের ক্ষুদ্র কলেবরের এই কাব্য-পুস্তিকার নিবেদনটি পুরোই এখানে তুলে দেওয়া হলো, যাতে তাঁর সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যসঙ্গীদের সম্পর্কে সামান্য কিছু ধারণা পাওয়া যায় :

নারী-তীর্থের পাণ্ডুলিপিখানি বহুদিন আমার ভাঙ্গা-তোরঙ্গের এক কোণে অবগুণ্ঠিতা নববধূর মতো লাজ-কুণ্ঠায় আত্মগোপন করেছিল। সে দিন কী কুক্ষণেই না আমার আব্্দারী বন্ধুদের নজরে পড়ে। এ’কে লোকের ভীড়ে টেনে আনবার – খামখেয়াল এদের মাথায় কেন গজাল জানিনে। দোস্তদের অহেতুক আবদার রাখ্তে গিয়ে আজ আমাকে কী লাঞ্ছনা আর উপহাসই না সইতে হবে!
আমার জীবন-বন্ধু মৌলবী মোহাম্মদ মুছা, কবি নজরুল ইস্লাম ও মৌলবী জসিমউদ্দিন সাহেব, এই বই প্রকাশে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। মা মিসেস্্ আর, এস্্, হোসেন সাহেবা এ’র রিক্ত ললাটে আশীষ-চুম্বন এঁকে দিয়েছেন। এঁরা যে এত শ্রম স্বীকার করেছেন, ধন্যবাদের প্রত্যাশায় নয়, – স্রেফ্্ আনন্দের প্রেরণায় ও আমার প্রতি এঁদের ঐকান্তিক øেহাবেগে।
এ নবজাত শিশুর দেহে বিস্তর ধূলাবালি লেগেছে। তবু, – বাণীর শতদল ধূলি ঝেড়ে এ’কে কোল দিতে হয়ত কুণ্ঠিত হবেন না – এই আমার আশা ও ভরসা।

কবির কৈফিয়ৎ-এর শেষে স্থাননাম হিসেবে ‘কাটাছরা’ এবং তার নিচে তারিখ দেওয়া আছে ‘২৪শে কার্ত্তিক, ১৩৩৭’।
নারী-তীর্থের প্রকাশক ছিলেন মোহাম্মদ মুছা – তাঁর ঠিকানার উল্লেখ পাওয়া যায় – ‘১২/১ নং এস্্প্লানেড ইষ্ট, কলিকাতা’। প্রথম সংস্করণের এই বইটি মুদ্রিত হয়েছিল কলকাতার ৯ এন্টনি বাগান লেনের করিম বকস্্ ব্রাদার্সের মাধ্যমে ‘গভর্মেন্ট অব ইন্ডিয়া এ-জেনারেল প্রিন্টার্স’ থেকে এম. ই. কে. মজলিস কর্তৃক। একটি চৌপদী দিয়ে ‘মা’-কে বইটি উৎসর্গ করা হয় :
এনেছি অশ্র“, মরম-বেদনা
অনুশোচনার চিত্ত; –
তোমার চরণ-তীর্থে ভুলের
করিতে প্রায়শ্চিত্ত।
বইটি কীটদষ্ট হওয়ায় মূল্য কত তা জানা সম্ভব হয়নি।

রোকেয়া নারী-তীর্থ কবিতা-পুস্তিকার যে-পরিচায়িকা লিখে দিয়েছিলেন, তাতে তাঁর নারীবাদী মনের পরিচয় অনুক্ত থাকেনি। বহু বছর আগে নারীর দুঃখ-বেদনা-লাঞ্ছনা নিয়ে তিনি যা ভেবেছিলেন তা এখন সমাজের পুরুষেরাই ভাবতে শুরু করেছেন, এই বিষয়টি তাঁকে আনন্দ দিয়েছিল। নারী-তীর্থ তাঁর মনোযোগ পেয়েছিল এর কাব্যমূল্যের জন্য নয়, নারীর প্রতি একজন পুরুষের সহমর্মিতা ও সহানুভূতির কারণে।  ‘ভূমিকা’টি  এখানে  সংকলিত হলো :

ভূমিকা

গ্রন্থকার মহোদয় আমার ন্যায় লোককে ‘নারী-তীর্থে’র  ভূমিকা লিখিতে অনুরোধ করিয়া বুদ্ধিমানের কাজ করিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। কোন নরবর ইহার ভূমিকা লিখিলেই সুশোভন হইত। কারণ “নারী-তীর্থ” আমাদের ভাল লাগিবে, ইহা ত স্বাভাবিক; সুতরাং অপর একজন পুরুষে কি বলে, তাহাই শুনিবার মত হইত।
নারীর ব্যথা এই পুস্তকে যেমন ফুটিয়া উঠিয়াছে, এমন আর কোন পুরুষের লেখায় দেখিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না। সমস্ত পুস্তকখানি পাঠ করিয়া মনে হয় লেখক একজন আদর্শ মুসলমান। তিনি মাতৃজাতিকে ঠিক বুঝিয়াছেন –
“তুমি আপনি তপ্ত আতসে পুড়িয়া সুশীতল ছায়া ঢালো।
তুমি মোমের প্রদীপ আপনি জ্বলিয়া অন্দর কর আলো।”
তাই তিনি ভক্তিভরে মাতৃ চরণে নমস্কার করিতে পারিয়াছেন।

১৮টী কবিতা লইয়া এই পুস্তক রচিত হইয়াছে। আমার মুস্কিল হইয়াছে এই যে, কোনটী ছাড়িয়া কোন কবিতার উল্লেখ করিব? “বাল-বিধবা” “অভিশাপ” ও “অবিচার” পাঠ করিয়া সমাজের বিবিধ ক্ষত অঙ্গের কথা মনে পড়িল। “অভিশাপ” কবিতাটা আমারই শৈশব-কালীন লাঞ্ছনার কথা মনে করাইয়া দিল; তবে ঘরের বাহির হইয়া পাঠশালা গমনের সৌভাগ্য এ জীবনে কখনও হয় নাই। “মেয়ে-মানুষ শিখ্ছে সে কি আংরেজী আর বাংলা ‘জবান’?” এরূপ কথার বিরুদ্ধে কিছু বলার জন্য “পিকভরা পাকা দাড়ী”ওয়ালা পীর সাহেবেরা লেখককে কাফেরের ফতোয়া দিয়া সশরীরে ‘হাবিয়া’য় পাঠাইবার যোগাড় করিবেন, সন্দেহ নাই। কিন্তু আমাদের ধ্র“ব বিশ্বাস, ইসলামের জয় অনিবার্য্য।
আমি ২৫ বৎসর পূর্ব্বে যে সব কথা বলার জন্য (অর্থাৎ “মতিচূর” লেখার জন্য), মুসলিম-বিদ্বেষী (কিন্তু মুসলিম নামে পরিচিত) পুরুষদের নিকট হইতে জঘন্য গালাগালি লাভ করিয়াছি, এখন সেই কথা স্বয়ং পুরুষেরা অম্লান বদনে বলিতেছেন। ইহা লক্ষ্য করিয়া আমি অনেকটা আত্মপ্রসাদ লাভ করিলাম। এখন পুরুষজাতিই মুক্ত কণ্ঠে বলিতেছেন,
“- নারীরে শৃঙ্খলি,
জাতির মৃত্যুর পথ খুঁড়িছ কেবলি”
সুতরাং আমাকে আর অধিক কিছু বলিতে হইবে না, যেহেতু এখন আমার মতের অনুসরণকারী নরবরেরাই আমার বক্তব্য শতকণ্ঠে প্রচার করিতেছেন।
“নারী-তীর্থ” ঘরে ঘরে নর নারী উভয়ের জন্য কল্যাণ বিতরণ করিবে। আমি গ্রন্থকারকে অন্তরের সহিত ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। আল্লাহ্্ তাঁহার লেখনী সফল করুন, ইহাই প্রার্থনা।
আর, এস, হোসেন,
“পদ্মরাগ” রচয়িত্রী –

মোহাম্মদ মোদাব্বেরের মুক্তিমন্ত্রে মুস্লিম-নারী বইটি প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার ৯১ আপার সারকুলার রোডের মোহাম্মদী বুক এজেন্সি থেকে। লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে মোহাম্মদ মোদাব্বের  যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন।  তাঁর  লেখা  নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। এর আগে তাঁর বইও প্রকাশ পেয়েছে। শিশুতোষ গল্পসংকলন হীরের ফুল (১৯৩১) তাঁর প্রকাশিত প্রথম বই। ১৩৪০ (১৯৩৩) সালে প্রকাশিত মুক্তিমন্ত্রে মুস্লিম-নারী বইয়ের ‘ভূমিকা’ লিখতে গিয়ে রোকেয়া একদিকে যেমন তাঁর বিনয় ও সৌজন্য প্রকাশ করেছেন, অপরদিকে লেখকের প্রয়াসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁর লেখায় নিজের বহুকাল আগের চিন্তার সাদৃশ্য লক্ষ করে – ‘এই লেখাগুলি যে আমারই প্রাণের উক্তির প্রতিধ্বনি, তাই ইহা আমার মর্ম্মস্পর্শ করিয়াছে।’ এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই ‘ভূমিকা’ লেখার মাত্র নয় দিন পরেই (৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) রোকেয়ার মৃত্যু হয়। রোকেয়া-রচিত ‘ভূমিকা’টি এখানে উদ্ধৃত করা গেল :

ভূমিকা

“মুক্তিমন্ত্রে মুস্লিম নারী” পুস্তকের ভূমিকা লেখার ভার পড়িয়াছে আমার ন্যায় অবরোধ-বন্দিনীর উপর! এ পুস্তকের সমস্ত লেখাই আমি পূর্ব্বে পাঠ করিয়াছি। এই লেখাগুলি যে আমারই প্রাণের উক্তির প্রতিধ্বনি, তাই ইহা আমার মর্ম্মস্পর্শ করিয়াছে। বঙ্গের পাঠকসমাজ নিশ্চয়ই ভুলিয়া যান নাই যে, সুদীর্ঘ ২৮ বৎসর পূর্ব্বে আমি “মতিচূরে” ঐ ধরনের কথাই লিখিয়াছিলাম। (মতিচূরের ৩৩ পৃষ্ঠা দেখুন)। তখন আমার কথা বঙ্গীয় মুসলিম সমাজ কাণে তুলেন নাই। কানে তোলা দূরে থাকুক, কতকগুলি মুসলিম চালিত পত্রিকা (“মিহির ও “সুধাকর” প্রভৃতি) আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়াছেন।
মতিচূরের ২৩ পৃষ্ঠায় আমি লিখিয়াছি – “সে দিন একখানা উর্দ্দূ কাগজে দেখিলাম : –
তুরস্কের স্ত্রীলোকেরা সুলতান সমীপে আবেদন করিয়াছেন যে, চারি প্রাচীরের ভিতর থাকা ব্যতীত আমাদের আর কোন কাজ নাই। আমাদিগকে অন্ততঃ এ পরিমাণ শিক্ষা দেওয়া হউক, যাহার সাহায্যে যুদ্ধের সময় আমরা আপন আপন বাটী এবং নগর পুরুষদের মত বন্দুক কামান দ্বারা রক্ষা করিতে পারি। তাঁহারা ঐ আবেদনে নিুলিখিত উপকারগুলি প্রদর্শন করিয়াছেন : –
(১) প্রধান উপকার এই যে, নগরাদি রক্ষা করিবার জন্য অনেকগুলি সৈন্য নিযুক্ত থাকায় যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য সংখ্যা কম হওয়ায় যে ক্ষতি হয়, তাহা আর হইবে না। (যেহেতু “অবলা”গণ নগর রক্ষা করিবেন)।
(২) সন্তানসন্ততিবর্গ শৈশব হইতেই যুদ্ধবিদ্যায় অভ্যস্ত হইবে। পিতামাতা উভয়ে সিপাহি হইলে শিশুগণ ভীরু কাপুরুষ হইবে না।
(৩) তাঁহারা বিশেষ এক নমুনার উর্দ্দি (Uniform) প্রস্তুত করিবেন,  যাহাতে চক্ষু ও নাসিকা ব্যতীত মুখের অবশিষ্ট অংশ এবং সর্ব্বাঙ্গ সম্পূর্ণ আবৃত থাকিবে। * * *
বলি  এ দেশের  সমাজপতিগণ,  “লেডি কেরাণী”  হওয়ার প্রস্তাব শুনিলে চমকাইয়া উঠেন, তাঁহারা ঐ লেডী যোদ্ধা হওয়ার প্রস্তাব শুনিলে কি করিবেন? মূর্চ্ছা যাইবেন না ত?
কালের বিচিত্র গতি – যে তুরস্কনারী ১৯০৪ খৃষ্টাব্দে চক্ষু ও নাসিকা ব্যতীত মুখের অবশিষ্ট অংশও অনাবৃত রাখিবার প্রস্তাব করেন নাই, তাঁহারাই ১০/১২ বৎসর পরে (অর্থাৎ ১৯১৬ খৃঃ) সম্পূর্ণ হেরেম প্রথা হইতে মুক্তি লাভ করেন। এখন ত তাঁহারা থিয়েটারের অভিনয় পর্য্যন্ত করেন।
২৮ বৎসর পূর্ব্বে আমি মুসলিম নারীর জন্য যাহা ভিক্ষাস্বরূপ চাহিয়াছিলাম – আজ তাহার চেয়ে অনেক বেশী তাঁহারা আদায় করিতেছেন। আমার ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলিয়াছে দেখিয়া আমি যারপরনাই আনন্দিত হইয়াছি।
আমাকে এই অতি সুন্দর হৃদয়গ্রাহী পুস্তকের ভূমিকা লেখার ভার দিয়া মৌঃ মোহাম্মদ মোদাব্বের সাহেব আমাকে যে সম্মানিত করিয়াছেন, সেজন্য তাঁহাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। বঙ্গে এখন বিদূষী মহিলার অভাব নাই, তবু যে লেখক সাহেব মাদৃশী বিদ্যাবুদ্ধিহীনাকে এই কাজের ভার দিলেন, ইহা আশ্চর্য্যই বলিতে হইবে [।] আমার দৃঢ় বিশ্বাস “মুক্তিমন্ত্রে মুস্লিম নারী” বঙ্গের ঘরে ঘরে আদৃত হইবে। সমাজের গৃহকোণে যেটুকু তন্দ্রা বা আলস্য আছে; তাহা এই পুস্তক পাঠে বিদূরীত হইবে।
বিনীতা –
(মিসেস্্) আর. এস. হোসেন

সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল
কলিকাতা।
৩০/১১/৩২

দুই
রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন নানা প্রয়োজনে বিভিন্নজনকে অনেক চিঠিপত্র লিখেছেন। এসব চিঠিতে তাঁর মন-মনন-মানসের অন্তরঙ্গ পরিচয় ফুটে উঠেছে। রোকেয়ার চিঠিপত্র সংকলনের প্রথম প্রয়াস মোশ্ফেকা মাহমুদের (১৯৩৩-৮৬) পত্রে রোকেয়া পরিচিতি (ঢাকা, ১৯৬৫) বইটি। তারপর আবদুল কাদির রোকেয়া-রচনাবলীতে তাঁর আরো কিছু চিঠি ছাপেন। এক্ষেত্রে গোলাম মুরশিদ, লায়লা জামান, সেলিনা বাহার জামান, মাজেদা সাবের ও আরো কারো কারো সৌজন্যে রোকেয়ার অপ্রকাশিত চিঠিপত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমরা এখানে রোকেয়ার তিনটি চিঠি সংকলিত করেছি – যার দুটি অপ্রকাশিত এবং একটি অগ্রন্থিত। অগ্রন্থিত চিঠিটি ঢাকার সচিত্র সন্ধানী (২১ অগ্রহায়ণ ১৩৮৭/৭ ডিসেম্বর ১৯৮০) পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। অপ্রকাশিত একটি চিঠি শিশুমহল পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ আফজাল-উল হক ও অপরটি মোয়াজ্জিন পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ আবদুর রবকে (১৯০৩-৬৯) লেখা। অগ্রন্থিত চিঠিটির প্রাপক তাঁর এক ছাত্রীর পিতা পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবর আলী খান।

রোকেয়ার অপ্রকাশিত চিঠি

পত্র : ১
SAKHAWAT MEMORIAL GIRLS’ SCHOOL
86-A, Lower Circular Road,
Calcutta, the 31-8-1927
সালাম পর আরজ,
এই মাত্র আপনার অনুগ্রহ-প্রেরিত “শিশুমহল” এবং পত্র পাইয়া সুখী হইলাম। আমি আপনাদের নিকট অত্যন্ত লজ্জিত আছি – আল্লাহ্্ ব্যতীত আমার ত্র“টী আর কেহ মাফ করিবে বলিয়া আশা করিতেও সাহস পাই না।
আমার কপালে আজ পর্য্যন্ত একটা হেডমিসট্রেস জুটে নাই। যিনি আসাম হইতে আসিতেছিলেন, তিনি রোগ লইয়া আসিয়া হাসপাতালে গিয়াছেন! যাহা হউক, নিজের অসুবিধার কথা বলিয়া আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করিতে চাহি না।
আমি একটা রসাল গল্প “বলিগর্ত্ত” লিখিতে আরম্ভ করিয়াছি – তাহার যেটুকু পেন্সিলে লিখিয়াছি, তাহাই অদ্য পাঠাইলাম। বাকী অংশ বাঁচিয়া থাকিলে পরে লিখিব। প্রথম খসড়াই আপনাকে পাঠাইলাম। কারণ পরিষ্কার করিয়া লিখিবার সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকিলে বোধ হয় এবারও লেখা দিতে পারিব না। দোয়া করিবেন যেন, বাকী অংশ শীঘ্রই লিখিত পারি।
একটী ছাত্র “শিলংএ দুই মাস” শীর্ষক একটী প্রবন্ধ দিয়াছে। যদি আপনাদের পসন্দ হয় ত প্রকাশ করিতে পারেন। “বলিগর্ত্ত” সম্বন্ধেও ঐ কথা।
আজ তবে আসি। আশা করি, আমাকে ক্ষমা করিতে চেষ্টা করিবেন। ইতি।
বিনীতা
R.S. Hossein
পত্র : ২
Calcutta
1-9-1930
সালাম পর আরজ,
আপনার ১৬ই জুনের পত্রখানি আমি প্রায় ২ মাস হইল পাইয়াছি। আমি আপনার নিকট বড্ড অপরাধিনী আছি; ক্ষমা চাহিবারও মুখ নাই। গত ফেব্র“য়ারী মাসের শেষ ভাগে আমি মাদারীপুর থাকাকালীন “সুবেহ্ সাদেক” শীর্ষক একটী লেখা শ্রীমতী আসাদন্নেসা চৌধুরানীর নিকট রাখিয়া আসিয়াছিলাম। আপনার পত্রে তাহার পরিণাম ফল জানিলাম। এত দিন অবসর অভাবে পুনরায় সেটা লিখিতে পারি নাই।
যাহা হউক, অদ্য নূতন করিয়া “সুবেহ্ সাদেক” লিখিয়া দিলাম। আশা করি, ইহা আপনার মনঃপুত হইবে।
ক্ষমা চাহিবার ত মুখ নাই, সুতরাং চাহিব না। আরজ ইতি
বিনীতা
আর, এস, হোসেন।
রোকেয়ার অগ্রন্থিত চিঠি
পত্র : ৩
86-A, Lower Circular Road,
Calcutta.
26-6-31
সালাম পর আরজ,
শ্রীমতী রাবিয়া খাতুনের পত্রে জানিলাম, সে খোদার ফজলে আরোগ্য লাভ করিয়াছে এবং এখন এখানে আসিতে চাহে। আগামী সোমবার (২৯শে জুন) স্কুল খুলিবে। দয়া করিয়া মেয়েকে শীঘ্রই লইয়া আসিবেন।
ইতি।
বিনীতা
R.S. Hossein
রোকেয়া প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। প্রথম পর্যায়ে অগ্রজ-অগ্রজার যতœ ও উৎসাহে বাংলা শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর। পরে ইংরেজি শেখার জন্যে মূলত তাঁর স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের অবদানই প্রধান। স্বামীর সৌজন্যে উর্দু ভাষাও রপ্ত করেছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নিজের চেষ্টা। ফলে কি বাংলা কি ইংরেজি উভয় ভাষাতেই তাঁর যথেষ্ট দখল জন্মেছিল।  তাঁর  ইংরেজি  লেখার  প্রশংসা  অনেকেই করেছেন।  আর বাংলা তো সাবলীলভাবেই লিখতে পারতেন – নিজের একটা গদ্যভঙ্গিও আয়ত্ত করেছিলেন। বাংলার পাশাপাশি তিনি ইংরেজিতে প্রবন্ধ কিংবা চিঠি লেখায় যথেষ্ট দড় হয়ে উঠেছিলেন।
এখানে সংকলিত প্রথম চিঠিটি শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হকের (১৮৬০-১৯৩৩) পুত্র আফজাল-উল হককে লিখেছিলেন মূলত লেখালেখির প্রসঙ্গে। আফজাল-উল হক মোসলেম ভারত, শিশুমহল ও নওরোজ নামে পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করতেন। শেষের দুটি পত্রিকা স্বনামে সম্পাদনা করলেও প্রথম পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে কবি-পিতার নাম ব্যবহার করতেন। কলকাতায় মোসলেম পাবলিশিং হাউস নামে একটি প্রকাশনা সংস্থাও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন – কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) ও আরো অনেক খ্যাতিমান ও প্রতিশ্র“তিশীল লেখকের বই এখান থেকে বের হয়। তিনি ছিলেন নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই সূত্রে নজরুল-পরিচালিত ধূমকেতু পত্রিকার প্রকাশকও হয়েছিলেন। রোকেয়ার সঙ্গে চিঠিপত্রে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তাঁকে লেখা রোকেয়ার এই চিঠিটিতে তাঁর সম্পাদিত শিশুমহল পত্রিকা প্রেরণের কথা আছে। এই পত্রিকাটির মাত্র কয়েকটি সংখ্যা বেরিয়েই বন্ধ হয়ে যায়। নিতান্ত স্বল্পজীবী শিশুমহল কিশোর পত্রিকা হিসেবে লেখক-পাঠকদের যথেষ্ট মনোযোগ পেয়েছিল। রোকেয়া এই চিঠিতে ‘বলিগর্ত্ত’ নামে একটি ‘রসাল গল্প’ তাঁর পত্রিকায় পাঠানোর উল্লেখ করেছেন। এই লেখাটি আফজাল-উল হক-সম্পাদিত নওরোজ নামের মাসিকপত্রে আশ্বিন ১৩৩৪-এ প্রকাশিত হয়। এই চিঠির সঙ্গে একজন ছাত্রের একটি ভ্রমণ-বিষয়ক লেখাও পত্রিকায় ছাপার অনুরোধ জানিয়ে পাঠিয়েছিলেন। রোকেয়ার বিনয় ও সৌজন্যের তুলনা হয় না – উক্ত ছাত্রের লেখা ও তাঁর ‘বলিগর্ত্ত’ গল্পটি পাঠিয়ে তিনি সবিনয়ে জানিয়েছিলেন : ‘যদি আপনাদের পসন্দ হয় ত প্রকাশ করিতে পারেন। “বলিগর্ত্ত” সম্বন্ধেও ঐ কথা।’
অপ্রকাশিত দ্বিতীয় চিঠিটির প্রাপক ছিলেন ফরিদপুরনিবাসী সমাজসেবক ও সাময়িকপত্র-সম্পাদক সৈয়দ আবদুর রব। ইনি ছিলেন সেকালের বিখ্যাত সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা ‘খাদেমুল এনসান সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের দুটি পত্রিকা – মোয়াজ্জিন ও Servant of Humanity-এর সম্পাদক। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত আবদুর রবের এই দুটি পত্রিকার সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নবীন-প্রবীণ লেখকদেরই যোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) আশীর্বাণী ও নজরুলের রচনালাভের আনুকূল্য ও সৌভাগ্য এই পত্রিকা দুটির হয়েছিল। আবদুর রবকে লেখা চিঠিতে রোকেয়ার ‘সুবেহ্্ সাদেক’ প্রবন্ধটির উল্লেখ আছে। মোয়াজ্জিন পত্রিকায় লেখাটি আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৩৭ সংখ্যায় প্রকাশ পায়। ঐ একই পত্রিকায় রোকেয়ার আরেকটি লেখাও – ‘বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল’ (অগ্রহায়ণ ১৩৩৯) ছাপা হয়েছিল। এই চিঠিতেও রোকেয়ার সৌজন্য-বিনয়ের পরিচয় মেলে – যেমন, লিখেছেন – ‘আমি আপনার নিকট বড্ড অপরাধিনী আছি; ক্ষমা চাহিবারও মুখ নাই’। রোকেয়ার মৃত্যুতে মোয়াজ্জিন (পৌষ ১৩৩৯) পত্রিকার সম্পাদকীয় রচনায় তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁর স্মরণে গদ্য-পদ্য রচনাও প্রকাশিত হয়।
তৃতীয় চিঠিটি অপ্রকাশিত না হলেও অগ্রন্থিত। রোকেয়া এটি লিখেছিলেন বর্ধমানের মন্তেশ্বরের পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবর আলী খানকে। তাঁর কন্যা রাবিয়া খাতুন ছিলেন সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের ছাত্রী। এই পীড়িত ছাত্রীর আরোগ্যলাভের পর স্কুলের নিয়মিত শ্রেণি-কার্যক্রমে যোগদানের জন্যে অভিভাবক হিসেবে তাঁকে অনুরোধ জানান চিঠিতে। একজন ছাত্রীর প্রতি কতটুকু মমত্ব ও কর্তব্যবোধ থাকলে এই ধরনের অনুরোধসূচক চিঠি স্কুলের পরিচালক হিসেবে লেখা সম্ভব, তা সহজেই অনুমান করা চলে।

তিন
রোকেয়ার অপ্রকাশিত লেখার সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অথচ রচনাবলিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন রচনার হদিস মেলা দুরূহ, তবে অসম্ভব নয়। রোকেয়া আত্মীয়স্বজন, লেখক-সম্পাদক কিংবা ছাত্রী-অভিভাবক-সহকর্মীদের যেসব চিঠিপত্র লিখেছিলেন তার সংখ্যাও অনেক বলে অনুমান করা চলে – যার সামান্যই সংগৃহীত ও প্রকাশিত হয়েছে। পত্রপ্রাপকদের স্বজন বা উত্তরাধিকারীদের কাছে কিছু কিছু চিঠিপত্র থাকার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। তালিকা তৈরি করে অনুসন্ধান চালালে হয়তো তার কিছু অংশ উদ্ধার সম্ভব এবং তা হলে রোকেয়ার জীবন-কর্ম-সাহিত্য সম্পর্কে অনেক নতুন ও মূল্যবান তথ্য আবিষ্কৃত হবে।

চার
রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন ছিলেন কালের অগ্রগামী এক সমাজহিতবাদী এবং সৃজনধর্মী ও মননশীল লেখক। চিন্তা-চেতনা-কর্মে তিনি একদিকে ছিলেন যুগন্ধর, অপরদিকে যুগোত্তীর্ণ মনীষী। তাঁর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল নীরব থাকলেও প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬) ছিলেন উচ্ছ্বসিত। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের (১৮২৪-৯৮) কৃতী পুত্র মুকুন্দদেব মুখোপাধ্যায় পাঁচমুখে বন্ধুপতœী রোকেয়ার প্রশংসা করেছেন। মোহিতলাল মজুমদার তাঁর বন্দনা করেছেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭) মন্তব্য  করেছেন : ‘রোকেয়ার মানসচিত্রকে নিবেদিতার চিত্রের পার্শ্বে স্থাপন করিতে ইচ্ছা হয়।’ আর সবশেষে ‘মার্জিত অথচ প্রতীভা-দীপ্ত চিত্ত’ রোকেয়ার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সমাজভাবুক কাজী আবদুল ওদুদের বক্তব্য দিয়ে এই ‘পুণ্যময়ী’র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি :
জীবিত ও মৃত বুড়োদের মধ্যে সত্যিকার মুসলমান সাহিত্যিক সংখ্যায় অতি অল্প – মীর মশাররফ হোসেন, পণ্ডিত রেয়াজউদ্দীন, কায়কোবাদ, কাজী ইমদাদুল হক ও মিসেস আর. এস. হোসেন। এঁদের মধ্যে কাল মিসেস আর. এস. হোসেনকে বোধহয় সর্বশ্রেষ্ঠ আসন দেবে। শুধু মুসলমান সাহিত্যিকদের মধ্যে নয়, গোটা বাংলার নারী সাহিত্যিকদের মধ্যে মিসেস আর. এস. হোসেনের স্থান অতি উচ্চে – সর্বোচ্চ কিনা, তা এখন পুরোপুরি বলতে পারছি না, কিন্তু সময় সময় তাই মনে হয়। এমন একটা মার্জিত অথচ প্রতীভা-দীপ্ত চিত্ত বাংলাদেশে দুষ্প্রাপ্য না হলেও সুপ্রাপ্য নয়।