রোগী লেসলি স্টুয়ার্ট

লেখক:

আনোয়ারা সৈয়দ হক

ডাক্তার অজিত কুমার ব্রাহামা যখন রেগে যান, সে এক দেখার মতো দৃশ্য। বিশেষ করে হাসপাতালের সাপ্তাহিক ওয়ার্ড রাউন্ড দিতে বসলে তিনি কোনো না কোনো সময় একবার রাগবেনই। ডাক্তার ব্রাহামা লন্ডনের একটি অতিব্যস্ত জেনারেল হাসপাতালের মানসিক বিভাগের প্রধান। মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত রোগীদের জন্যে ওয়ার্ড রাউন্ড একটু ভিন্ন ধরনের হয়। শারীরিক ব্যাধিগ্রস্তদের মতো খোলা ওয়ার্ডের ভেতরে রোগীর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে কুশল জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে এবং জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ওয়ার্ড রাউন্ড শেষ হয় না।

শারীরিক অসুখের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা যখন তাদের অসুস্থ রোগীদের বিছানার পাশে এসে দাঁড়ান, অধিকাংশ রোগী তখন যেন আকাশের চাঁদ হাতে পান। এবং অনেক রোগী ডাক্তারের মনোযোগ বিশেষভাবে আকর্ষণ করার জন্যে যতদূর সম্ভব মুখ করুণ করে রাখেন। অনেক সময় রোগীর নাকের সামনে ডাক্তার যখন তার রোগীর ফুসফুস বা অন্ত্রের ছবি মাথার ওপর উঁচু করে ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখেন, রোগী তখন উদ্বিগ্ন হয়ে একবার তার নিজের শরীরের এক্স-রে আরেকবার ডাক্তারের দিকে তাকান। সে-সময় ডাক্তারের যেমন বেশ লাগে হয়ত রোগীরও তেমনি লাগে।

মানসিক ব্যাধিগ্রস্তদের ব্যাপারে অবস্থাটা একেবারে ভিন্ন। সেখানে এরকম রোগী জরিপ পদ্ধতি অচল। অধিকাংশ মানসিক রোগীদের রোগ নিয়ে আলোচনা হয় ফিসফাস, চুপিচুপি, রোগীকে অনেক সময় বুঝতেও দেওয়া হয় না যে আমরা তার সম্পর্কে কী বুঝেছি। শুধু মন দিয়ে তার কথা শুনি। তেমনি উলটো দিকে রোগীও ডাক্তারকে বুঝতে দেয় না যে সে ডাক্তারকে কীভাবে বুঝে উঠেছে! অনেকটা যেন হাইড অ্যান্ড সিক গেমের মতো। অনেক সময় বাধ্য হয়ে অবশ্য এরকম ব্যবহার করতে হয়। নইলে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে। রোগীর নয়, ডাক্তারের। তা না হলে মানসিক রোগগ্রস্ত রোগীর বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার যখন তার এক্স-রে মন দিয়ে দেখবে, রোগী তখন রেগে গিয়ে হয়ত তিড়িং করে লাফ মেরে ডাক্তারের কাঁধে চেপে বসবে। আর তা দেখে অন্য রোগীরা সাহায্য করবে কী, হা-হা, হি-হি করে হেসেই বাঁচবে না। যেন কী মজার কান্ডটাই না হচ্ছে।

আমার মনে আছে আমি যখন কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের অন্য একটি হাসপাতালে চাকরি করতাম, তখন রোগীর তাড়া খেয়ে  একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার চোঁ-চাঁ দৌড় মেরেছিলেন হাসপাতালের চত্বর ধরে। তিনি ছিলেন তার ইউনিটের চিফ কনসালট্যান্ট। আমরা জুনিয়র ডাক্তাররা হাসপাতালের চত্বরে দাঁড়িয়ে তার সে-দৌড় গোপনে হাসতে হাসতে উপভোগ করেছিলাম।

ডাক্তার ব্রাহামার পদবি শুনতে যত অপরিচিত শোনাক, আসলে তিনি কলকাতার বাঙালি। অজিত রঞ্জন ব্রাহ্ম তাঁর নাম।  ইংরেজরা ব্রাহ্ম শব্দটি উচ্চারণ করতে পারে না, তাই ব্রাহামা বলে সম্বোধন করে। বহুবছর ধরে তিনি ইংল্যান্ডে চাকরি করছেন, লেখাপড়াও সব বিদেশে। এতবছর বিদেশে থেকে যত বড় বড় ডিগ্রি আছে সব আয় করেছেন। এবং এইসব ডিগ্রি আয়ত্ত করার সাথে সাথে তার মেজাজও ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। এখন এমন অবস্থা যে তার সাথে কথা বলতেই আমাদের ভয় করে। বিশেষ করে আমার। কারণ আমি তার রেজিস্ট্রার, পুঁচকে একটি পদবি, ভয় আমার করতেই পারে, কিন্তু ওয়ার্ডের সকলে এমনকি হাসপাতালের অন্য ডাক্তাররাও তাকে সমীহ করে চলে।

সেই ডাক্তার ব্রাহামাকেও মানসিক ব্যাধিগ্রস্তরা ভয় করে না!

আমার মনে আছে মাসদুয়েক আগে একবার ডাক্তার ব্রাহামা একজন রোগীর বিছানায় বসে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন, ফল হয়েছিল নিম্নরূপ :

ডাক্তার ব্রাহামা : হাউ ডু ইউ ফিল টুডে মিস্টার উইলিয়াম?

রোগী : হাউ ডেয়ার ইউ আস্ক মি দি কোয়েশ্চেন? ডু ইউ থিংক আই অ্যাম ম্যাড?

ডাক্তার ব্রাহামা : ওঃ নো, নট অ্যাট অল! আই মিন –

রোগী : ওঃ, শাট আপ ইউ বাগার! আই নো হোয়াট ইউ মিন। নাউ গো টু হেল, আই অ্যাম রেস্টিং।

এ-কথা বলে রোগী কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকল বিছানায়।

আমি তখন হাসপাতালের একজন পাতি রেজিস্ট্রার। আমার কি সাধ্য আছে যে হাসি? কিন্তু অন্য বিছানার রোগীরা যাদের আমরা মাথা খারাপ বলে চিহ্নিত করেছি, তারা দিব্যি হো-হো করে হাসল।

এবং আমার কাছে মনে হলো এই হাসি খুব স্বাভাবিক।

আসলে মানসিক অসুখ মানুষকে যে কতভাবে স্বাভাবিক আচরণের একজন মানুষ করে তুলতে পারে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না!

এদিকে ডাক্তার ব্রাহামার যত চোটপাট সব ছিল আমাদের ওপর। যেমন তুখোড় ইংরেজি বলতেন তেমনি তুখোড় জ্ঞান মেডিসিনে। আর ওয়ার্ডের নার্সগুলোকে পুতুলনাচের মতো নাচাতেন। অথচ ওদেশে নার্সদের এত দাপট। নার্সদের দাপটের ভয়ে পাতি ডাক্তাররা, অর্থাৎ আমাদের মতো ডাক্তাররা মনে মনে কাঁপতাম।

আমি নিজে খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। একে তো ও দেশে নতুন,  তার ওপর ওদেশের মানুষদের  ইংরেজি বুঝিনে।  আর এক ইংরেজ থেকে আরেক ইংরেজের চেহারা একেবারে আলাদা করতে পারিনে। আমার কাছে সব ইংরেজের চেহারাই এক মনে হতো। একটু আগে যাকে মিস্টার স্টুয়ার্ট বলে ডাকলাম, কিছুক্ষণ পরেই তাকে হাসপাতালের অন্য একটা করিডোরে হাঁটতে দেখে মিস্টার ক্রলি বলে সম্বোধন করে উঠলাম। তখন সেই ভদ্রলোক অপ্রতিভ হয়ে আমার ভুল শুধরে দিলেন। সে এক বিষম লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত।  এর পরে আরও ছিল, আমার পঠিত বইয়ের যত ইংরেজি জ্ঞান সব হুড়মুড় করে ডাউন দি ড্রেন চলে গিয়েছিল। তবু হ্যাঁচর-প্যাঁচড় করে নিজের স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। আর সর্বক্ষণই মনে মনে চিন্তা করতাম এই ডাক্তার ব্রাহামার হাত এড়িয়ে কবে অন্য আরেক হাসপাতালে চাকরি ধরবো।

এই সময় একদিন একজন রোগী ভর্তি হলো হাসপাতালে। রোগী একজন মহিলা ইংরেজ। চেহারা যেমন ফর্সা অবয়ব তেমনি লম্বা-চওড়া। মহিলার বয়স তিরিশ-বত্রিশ। সেই বয়সেই সে  অ্যালকোহলিক, অর্থাৎ মদাসক্ত। কিন্তু যেদিন সে আমাদের ওয়ার্ডে ভর্তি হলো, সেদিন তার সে কী বিনয়। পারে তো ডাক্তার ব্রাহামার পা ছুঁয়ে পানি খায়।

এরকম ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তার রোগের চিকিৎসা করা, নইলে চারদিকে এতসব মদাসক্ত রোগী যে তাদের ঠাঁই দেবার জায়গা নেই হাসপাতালে। রোগীর সাথে ইন্টারভিউ শেষ করে ডাক্তার ব্রাহামা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, শোনো ডাক্তার, এদেশের অ্যালকোহলিক আর ড্রাগঅ্যাডিক্টদের স্বয়ং ঈশ্বরও বিশ্বাস করেন না, এ-কথাটা জানো তো?

বলা বাহুল্য ইংরেজিতেই তিনি কথাগুলো আমাকে বললেন। আমি বাঙালি জেনেও তিনি কোনোদিন এমন ভাব দেখান নি যে তিনি নিজেও বাংলা বলতে পারেন! অথচ আমি গোপনে জেনেছি এই হাসপাতলে চাকরি নেবার আগে ইন্টারভিউ বোর্ডে অনেক ইংরেজ জুনিয়র ডাক্তারকে বাতিল করে তিনি আমাকেই তার অধীনে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

তার কথা শুনে আমি মাথা নেড়ে বললাম, জি, সে-কথা জানি। আর মনে মনে এটাও বললাম যে, মদাসক্ত এবং মাদকাসক্তরা পৃথিবীর সব দেশেই সমান। স্বয়ং আল্লাও তাদের বিশ্বাস করেন না।

ডাক্তার ব্রাহামা আমার উত্তর শুনে একটু গর্ব করে মাথা নেড়ে বললেন, কিন্তু আমি করেছি!

শুনে আমি মনে মনে ভাবলাম, এটা খুব ভালো কথা; কিন্তু আমাকে এ-কথা বলা কেন?

ডাক্তার ব্রাহামা আমার নীরবতা লক্ষ্য করে বললেন, কেন করেছি জানো?

উত্তরে আমি মাথা নেড়ে বললাম, না।

আমার মাথা নাড়ানো দেখে বিরক্ত হয়ে ডাক্তার ব্রাহামা বললেন,  এই হচ্ছে তোমার দোষ বুঝলে, ডাক্তার? প্রশ্ন শুনে চিন্তা-ভাবনা  না করে ফট্ করে না বলে দিলে, না! না, মানে কী? না, বললেই কি হয়ে গেল উত্তর?

শুনে আমি চুপ করে থাকলাম। কারণ ডাক্তার ব্রাহামা উত্তেজিত হয়ে উঠলে ওটাই ছিল উত্তম পথ।

ডাক্তার ব্রাহামা কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, হ্যাঁ, আমি তাকে বিশ্বাস করেছি! এবার সে পানাভ্যাস বর্জন করার জন্যে বাইবেল পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখিয়েছে।

ওয়ার্ডের হেড সিস্টার মার্গারেট এতক্ষণ আমাদের সঙ্গেই বসে ছিল, সে আমার কানে কানে বলে উঠল, ডাক্তার ব্রাহামাকে বলো, এরকম বাইবেল ওরা ভর্তি হবার আগে অনেকবার ছোঁয়।

আমি সিস্টার মার্গারেটের কথায় কান না দিয়ে বললাম, তাহলে তো খুব ভালো।

ডাক্তার ব্রাহামা এবার সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, বেশ, এবার তাহলে তুমি মহিলাকে ভর্তি করার ব্যবস্থা করো।

আমি আগামীকালই তাকে ভর্তি হতে বলেছি। বেশি দেরি করলে বন্ধুবান্ধবদের উস্কানিতে মন ঘুরে যেতে পারে!

আমি তাই করলাম, কারণ কর্তার ইচ্ছায় কাজ।

পরদিন হাসপাতালে ভর্তি করার সময় লেসলি স্টুয়ার্ট আমার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল, হাই ডক্ ।

উত্তরে আমিও বললাম, হাই লেসলি।

লেসলি তার সোনালি চুল ঝাঁকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, আজকের আবহাওয়াটা বেশ ভালো, তাই না ডাক্তার?

আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে লেসলির শরীর থেকে মদের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বললাম, এখানে ভর্তি হতে আসার আগে ক’পেগ গিলে এসেছো লেসলি?

বেশি না আমার সোনামণি, এই অল্প একটু। আজ আমি আমার পাড়ার পাবটাকে চিরদিনের জন্যে বিদায় জানিয়ে এসেছি। বলেছি, বাই বাই পাব, বিদায় পাব, বিদায় পাবের বন্ধুরা, আর তোমাদের সাথে এখানে দেখা হবে না।

শুনে আমি কৃত্রিম হেসে বললাম, খুব ভালো কাজ করেছো লেসলি। আসলে শুঁড়িখানায় ঢোকা মাত্রই তো মদ খেতে ইচ্ছে করে, তাই না লেসলি?

আমার কথা শুনে লেসলি মাথা নেড়ে বলল, আমার অবশ্য করে না! জানো, অনেক সময় পাবে ঢুকেও আমি মদ খাইনি?

কথা শেষে লেসলি গর্ব করে আমার মুখের দিকে তাকালো।

আমি বিস্মিত হবার ভান করে বলে উঠলাম, তাই নাকি?

লেসলি বলল, হ্যাঁ, এবং আমি ইচ্ছে করলে জানো এখনো এই হাসপাতালের উলটোদিকের পাবে ঢুকতে পারি, কিন্তু তবু মদ স্পর্শ করবো না?

তার কথা শুনে মনে মনে আমি বললাম, খুব একটা বীরত্বের কাজ বইকি সেটা, বোকা কোথাকার। বাইরে শুধু হেসে উঠলাম। ইন্টারভিউ নেবার ছলে বললাম, তুমি কীভাবে এরকম মদ খেতে শিখলে লেসলি?

লেসলি আমার প্রশ্নে একটু বিস্মিত হয়ে বলে উঠল, তার মানে?

মানে, আমি জিজ্ঞেস করছি কীভাবে তুমি মদাসক্ত হলে? আমি জানি তোমার সংস্কৃতি তোমাকে সামাজিকভাবে মদ পান করার অনুমোদন দেয়। বন্ধুরা পাবে বসে মদ খেতে খেতে গল্প করে। পরিবারের লোকজন রাতে নৈশভোজের সময় লাল মদ দিয়ে প্রথমে গলাটা ভিজিয়ে নেয়। তবু তো তোমার দেশের অধিকাংশ মানুষই সাধারণ জীবন যাপন করে। তারা মদ খায় কিন্তু মদাসক্ত নয়।

লেসলি আমার কথা শুনে বলল, মানে আমার মতো নয়, এই তো বলছো?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ। তাই।

এরপর অনেকক্ষণ ধরে লেসলি কীসব ভাবতে লাগল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, আসল কারণটা কি জানো ডাক্তার?  আসল কারণ হলো আমি খুব লোনলি মানুষ। ছেলেবেলায়  মা-বাপ হারিয়েছিলাম। এতিমখানায় মানুষ। লেখাপড়াও বেশি শিখতে পারিনি। বড় হয়ে যখন কারখানায় কাজ করতে শুরু করলাম, কাজ শেষে একমাত্র পাব ছিল আমার সময় কাটাবার জায়গা।

আমি চুপ করে লেসলির কথা শুনতে লাগলাম। লেসলি বলতে লাগল, আমার আরো কিছু অসুবিধে ছিল। মানুষের সঙ্গে আমি সহজে বন্ধুত্ব করতে পারতাম না। কিন্তু মদ খাবার সময় বা তার পরপর আমার আত্মবিশ্বাস সাংঘাতিক রকম বেড়ে যেত। মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারতাম, হাসিঠাট্টা করতে পারতাম। এমন একসময় একটা বয়ফ্রেন্ডও জোগাড় করেছিলাম পাব থেকে।

লেসলির কথা শুনে উৎসাহ দেখিয়ে আমি বলে উঠলাম, তাই নাকি?

হ্যাঁ, ডাক্তার। কিন্তু তারও অনেক সমস্যা ছিল। তার ওপর সে  ছিল অ্যালকোহলিক। তার সাথে মিশে আমি আরো বেশি করে মদ খেতে লাগলাম। এরপর আর পাব এ না গিয়ে বাড়িতে বসেই আমরা মদ খেতে শুরু করলাম। ততদিনে হুইস্কি হয়ে গেছে আমাদের পরম লোভনীয় পানীয়। অ্যালকোহলিক মানুষেরা তো শুধু হুইস্কি পান করতেই ভালোবাসে, ডাক্তার। আর সব পানীয় তাদের কাছে তখন নিরামিষ বলে মনে হয়। তুমি বুঝতে পারছো আমি কি বলছি?

আমি নিজে কোনোদিন মদ খাই না। কোন মদ খেতে কীরকমের স্বাদ তা আমার জানার বাইরে। অথচ মানসিক ব্যাধি বিভাগে কাজ করতে এসে শুধু শুনছি রোগীর কষ্ট-দুঃখ ঠিকমতো অনুধাবন করতে গেলে তার জুতোর ভেতরে নিজের পা দুটো ঢুকিয়ে তবে রোগীর কষ্টটুকু অনুভব করবে! নইলে রোগীকে সাহায্য করা তোমার পক্ষে অসম্ভব! বিষয়টা রূপক সন্দেহ নেই, কারণ এসব করতে হবে আমাদের কল্পনায়। কিন্তু লেসলির কথা শুনে আমি এখানে কিছু না বুঝেই সবজান্তার মতো মাথা নাড়লাম। এখন ওর কষ্ট বুঝতে গেলে হুইস্কিতে চুমুক দেয়া আমার পক্ষে বর্তমানে সম্ভব নয়।

তাছাড়া আরো একটা কথা। আর সেটা হলো যারা অ্যালকোহলিক, তারা সকলেই লোনলি বা একাকী মানুষ নয়। তাদের অধিকাংশ হলো সাধারণ মানুষ। তারা সাধারণত বন্ধুবান্ধবদের সাথে আনন্দের সময় কাটাবার জন্যে মদ্যপান করতে শেখে।  অনেকে  এদেশে এত হাইফাই চাকরি করে যে বড় বড় ব্যবসায়ী বা বড় বড় বসদের সাথে ওঠাবসা করার সময় তাদের সঙ্গ দেবার জন্যে মদ খায়। আর মদ এমন বস্ত্ত সে পানীয় হলেও তার ভেতরে জ্বলন্ত ফার্নেসের মতো আগুন জ্বলে। বস্ত্তত কেউ মদ খাবার প্রথম দিন থেকেই মদ তার দিকে টার্গেট ঠিক করে ফেলে। ছিপ ফেলে রাখার মতো। সেই হিসাবে মদেরও মানুষের মতো চোখ আছে! সেই চোখের চাহনি কখনো বা বাঘের মতো। বাঘ যেমন নৌকা করে চলে যাওয়া মানুষদের বাদাবন থেকে উঁকি মেরে দেখতে দেখতে নদীর পাড় দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যায়, এবং নৌকাভর্তি মানুষের ভেতরে একজনকে সে থাবা মেরে তুলে নেবে বলে শনাক্ত করে, হয়ত সবুজ জামা পরা লোকটিতে তার মনে ধরেছে, তেমনি মদও শনাক্ত করে কাকে সে নিজের থাবার ভেতরে ভরে নেবে! তাই তো  সাতজন মানুষ মদ খেলে তার ভেতরে হয়তো দুজন হয়ে যায় অ্যালকোহলিক। আর পাঁচজন থাকে স্বাভাবিক মানুষ।

এরকম সাধারণভাবে কথাটা বললেও মনে মনে আমরা সকলেই জানি অ্যালকোহলিকের জীবন একটি অভিশপ্ত জীবন। একাকী একটি জীবন। বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন,  স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা সকলেই তাকে পরিত্যাগ করে।

আমি এরপর জিজ্ঞেস করলাম, কতটুকু হুইস্কি তুমি পান করতে পারো সারাদিনে, লেসলি?

লেসলি উত্তর দিলো, প্রথমে একটা বোতল দুজনে ভাগ করে খেতাম। অর্ধেক আমার, অর্ধেক ওর। কিছুদিন পরে এতে আর মন উঠল না। পরে ওর বোতল আলাদা, আমার বোতল আলাদা।

হুইস্কি এত দামি মদ লেসলি, এত টাকা কোথায় পেতে তোমরা? আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

কেন, আমরা দুজনে কাজ করতাম যে। আমি কারখানায়, আর আমার বয়ফ্রেন্ড জুতোর দোকানে। তারপর একদিন আমার বয়ফ্রেন্ড তার চাকরি হারালো। ওর বস একদিন ওকে ডেকে বলল, হেই স্টিভ্, ইউ স্মেল অ্যালকোহল অল দি টাইম। আওয়ার কাস্টমার ইজ অ্যাভোয়ডিং ইউ। ইউ বেটার লিভ দি জব্ ফ্রম টুডে। ব্যস, এরপর সব শেষ।

তাই নাকি? খুব দুঃখের কথা তো! তারপর?

তারপর আমার নিজের রোজগারের পয়সায় কতদিন আর ওকে মদ খাওয়াবো, বলো?

সেটাও তো ঠিক। আমি লেসলির কথা শুনে বুঝদারের মতো মাথা নাড়লাম।

তবু আমি তাকে প্রথমে ছাড়তে চাইনি, জানো? হাজার হোক ভালোবাসতাম তো। কিন্তু ও হঠাৎ করে অন্য এক মেয়ের প্রেমে পড়ে গেল।

বলো কী, এত বড় বিশ্বাসঘাতক! আমি অবাক হলাম।

হ্যাঁ, এর কারণ হলো ওর জুতোর দোকানের চাকরি। দোকানে মেয়েদের পায়ে জুতো পরাতে পরাতে একটা বাচ্চা-মেয়েকে তার মনে ধরে গেল। পুরুষদের তো মেয়েদের বয়স নিয়ে কোনো বাছবিচার নেই, তুমি জানো।

তা অবশ্য ঠিক, তবে মেয়েটিকে তার মনে ধরল, না চোখে? মাথা নেড়ে আমি বললাম।

ওই একই হলো, মন বা চোখ। তুমি তো দেখি বেশ রসিক ডাক্তার, হা-হা। যা হোক, স্টিভ চলে যাবার পর আমি একেবারে একা হয়ে গেলাম। আমাদের দেশে লিভ টুগেদারেরর মুশকিলটা কি জানো ডাক্তার, একে অপরের প্রতি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যার যখন ইচ্ছা, মন ঘুরে যেতে পারে। এমনকি দশ বছরের লিভ টুগেদার করা দম্পতিও চোখের নিমেষে সবকিছু ভন্ডুল করে ফেলে। তখন তাদের বাচ্চাদের অবস্থার কথা চিন্তা করো। এতিমখানায় গিয়ে তখন বাচ্চারা আশ্রয় নেয়।

তার কথা শুনে আমি একটু মাথা চুলকে বললাম, কিন্তু লিভ টুগেদারই তো তোমরা ভালোবাসো আজকাল, তাই না?

হ্যাঁ, তোমার কথাটাও ঠিক। কারণ বিবাহিত জীবন ধারণ করা আজকাল খুব এক্সপেনসিভ হয়ে যাচ্ছে। বিবাহিত জীবনের দায়বদ্ধতাকে মানুষ আজকাল আর নিতে ইচ্ছা করে না। মানুষের ভেতরে স্বাধীনতাবোধ তীব্র হয়ে উঠছে। তারা বিবাহিত জীবনটাকে ঝামেলা বলে মনে করছে।

লেসলির কথা শুনে আমি মাথা নেড়ে বলে উঠলাম, তাও তো ঠিক, লেসলি।

মনে মনে বললাম, এদিকেও ঝামেলা, ওদিকেও ঝামেলা, তাহলে কোনটা ঠিক?

লেসলি বলল, তবে আমি তাকে বিয়ে করতে মনে মনে আগ্রহী ছিলাম। এমনকি ওর বাচ্চাকে আমার গর্ভে ধারণ করতেও মনে মনে খুব আশা ছিল। কিন্তু স্টিভের ভেতরে আমার প্রতি কোনো প্রেম বা আগ্রহ জন্মায়নি, সেটা আমি বুঝতে পারতাম।

তারপর কী হলো, লেসলি?

স্টিভ চলে গেলে আমি একাই বাড়ি বসে মদ খেতে লাগলাম। এরপর থেকে আমার কারখানা কামাই হতে লাগল। একদিন মালিক নোটিশ দিয়ে পাওনা টাকা-পয়সার দেনা মিটিয়ে দিয়ে আমাকে বিদায় করে দিলো।

তারপর?

তারপর সেই গতানুগতিক। সোশ্যাল সিকিউরিটির দ্বারগ্রস্ত হলাম। সোশ্যাল সিকিউরিটি জানো তো? এখানে চাকরিহীনেরা সাপ্তাহিক ভাতা পায়। যতদিন সে কোনো চাকরি না পায়, ভাতা পেতে থাকে। এভাবে কেউ কেউ  সারা জীবনই ভাতা পেতে থাকে। তবে এভাবে অপর মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় বেঁচে থাকতে কে ভালোবাসে?

আমি এসব খবর জানতাম। এই ভাবে তো এদেশে মদাসক্ত আর মাদকাসক্তরা বেঁচে থাকে এবং আজীবন মদ এবং মাদকদ্রব্য সেবন করে যায়। সব ভালো সিস্টেমেরই নেতিবাচক দিক আছে।

তবু লেসলির কথা শুনে আমি বললাম, জানি তুমি কী বলছ। কিন্তু শুধু চাকরিহীনেরা তো নয়, এদেশে এতিম, পঙ্গু, বৃদ্ধ, অসুস্থ এরাও নিয়মিত ভাতা পায়।

হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছো। তো তারপর থেকে আমি এভাবেই দিন কাটাচ্ছি। মাঝখানে এক জায়গায় কাজ পেয়েছিলাম, কিন্তু দুদিন বাদেই সেখান থেকে ছাঁটাই হয়ে গেলাম। লোকে আমাকে দেখে আজকাল কানাঘুষো করে। বলে যে, আজকাল আমার চেহারায় নাকি মদখেকোদের ছবি ফুটে বেরোচ্ছে! তাই গুরুত্বের সাথে চিন্তা করেছি মদমুক্ত জীবন যাপন করার। ভালো না হয়ে ওঠা পর্যন্ত আমি কোথাও আর চাকরি পাবো না। আমাকে ভালো হতে হবে!

আমি তার কথা শুনে আশান্বিত হয়ে বললাম, তাহলে তুমি এবার মনস্থির করে এসেছো যে ভালো হয়ে উঠবে?

অবশ্যই!

আর কোনোদিন মদ খাবে না?

কখনোই না।

ভালো হয়ে গেলে কিন্তু তুমি শুঁড়িখানার আশপাশ দিয়েও যেতে পারবে না প্রথম প্রথম। কারণ অ্যালকোহলের গন্ধ কিন্তু তোমার রক্তের ভেতরে তুলকালাম শুরু করে দেবে। তখন তোমার ঢুকতেই হবে সেখানে, মনে থাকবে?

খুব মনে থাকবে ডাক্তার। খুব মনে থাকবে।

আমার কথা শুনে বড় গম্ভীর মুখে বলে উঠল লেসলি।

এরপর লেসলিকে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করে, তার শরীর থেকে রক্ত টেনে নিয়ে পরীক্ষা করতে পাঠিয়ে, তার জীবন-বৃত্তান্ত  লিখে, তাকে ওষুধ দিয়ে ওয়ার্ড ছেড়ে বাইরে বেরোচ্ছি যেই ওমনি  নীল ইউনিফর্ম পরা ওয়ার্ডের সিস্টার আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, আরে, তুমি যাও কোথায়?

আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম, আরে, পাঁচটা তো কখন বেজে গেছে, আমি বাড়ি যাবো না?

আরে রাখো তোমার বাড়ি, বাড়িতে তোমার কে আছে?

কেউ নেই, আমি একা।

কেউ নেই, আর সে-বাড়িতে তুমি ফিরতে চাচ্ছো? কাজ শেষ করেছো, এখন একটু বসো, এক কাপ চা খাও।

সিস্টার মার্গারেট বয়স্ক মানুষ। তরুণ ডাক্তারদের সঙ্গে এভাবেই কথা বলে। কেউ তাতে কিছু মনে করে না।

আমি কফিতে চুমুক দেবার সময় সিস্টার মার্গারেট বলল,  আচ্ছা, এই যে তোমাদের ডাক্তার ব্রাহামা, তিনি যখন কথা বলেন তখন এই যে তোমরা গদগদ হয়ে শোনো, কিন্তু তার জন্মের সময় কেন তার মা একদলা চিনি তার মুখে তুলে দেয়নি, এটা বলতে পারো?

আমি সিস্টার মার্গারেটের কথা শুনে হেসে ফেলে বললাম, তুমি কী করে জানলে যে জন্মের সময় তার মা তার মুখে চিনি তুলে দেননি?

মার্গারেট বলল, চিনি দিলে তার মুখের কথা এত কটু হয় কী করে? যেন সর্বক্ষণ রেগে টং হয়ে আছেন। কোনো কথা তাকে ঠিকমতো বলা যায় না। অথচ রোগীদের সাথে কথা বলার সময় তার ব্যবহার কত যে মধুর, এর কারণ কী?

মার্গারেট সত্যি কথাই বলল। ওয়ার্ড বা আউটডোরের রোগীদের সাথে ডাক্তার ব্রাহামার ব্যবহার অতুলনীয়। অথচ বাইরের মানুষের সাথে তার কাটা কাটা ব্যবহার। এর কারণ কী? যেন বাইরের মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করলেই তারা তাকে সুযোগ পেয়ে ব্ল্যাকমেইল করবে এমনি তার মনোভাব!

সুতরাং উত্তরে আমি চুপ করে থাকলাম।

এসব ক্ষেত্রে নীরবতা শ্রেয়।

আমার অবস্থা বুঝে মার্গারেট বলল, জানি, তুমি তোমার কনসালট্যান্টের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করবে না, কারণ তার সার্টিফিকেটের ওপর তোমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কিন্তু দেখো, একদিন এখানে তুলকালাম কান্ড হয়ে যাবে!

আমি তার কথা শুনে ভয়ে ভয়ে বললাম, কার সাথে সিস্টার?

কেন, আমার সাথে? আমি এই ওয়ার্ডের ইন-চার্জ, তা কি তুমি জানো না? এটা তো আমার ওয়ার্ড, তার তো  নয়। তিনি অতিথির মতো ওয়ার্ডে আসেন, ওয়ার্ড রাউন্ড দেন, রোগীদের দেখেন, তারপর নির্দেশ দিয়ে চলে যান। আবার তিন দিন পরে তার দেখা মেলে যখন তিনি ওয়ার্ড রাউন্ড দেন। সে তিন দিন কার নির্দেশে ওয়ার্ড চলে, কে রোগীদের দেখভাল করে, তুমি বলো?

সিস্টার মার্গারেটের কথাটা বিলকুল ঠিক।  আমারও এক্তিয়ারে ওয়ার্ড নেই। আমি শুধু ডাক্তার ব্রাহামার নির্দেশে তার রোগীদের দেখভাল করি। রোগীদের কোনো প্রকারের ঝামেলা হলে সব তার ঘাড়ে বর্তাবে। সুতরাং জবাব না দিয়ে হেসে চুপ করে থাকলাম।

কফি খেয়ে এরপর ধীরে ধীরে কেটে পড়লাম ওয়ার্ড থেকে।

পরদিন ওয়ার্ডে ঢুকতেই সিস্টার মার্গারেট আমাকে ধরলো।  এই যে শোনো ডাক্তার, কী ওষুধ দিয়েছো তুমি লেসলিকে? সে তো বেচারি একেবারে ঘুমোচ্ছে না।

তাই নাকি মার্গারেট? আমি তো তাকে খুব ভালো ওষুধ  দিয়েছিলাম।

এই ভালো ওষুধ তো তার ঘুমের ধারেকাছে ছিল না, ডাক্তার। সারাটা রাত ভদ্রমহিলা জেগেছিল, আর ওয়ার্ডের অন্য রোগীদের ঘুম ভাঙিয়ে বকবক করছিল।

আমি মরিয়া হয়ে বললাম, আমি তো অনেক হাই ডোজে তাকে হেমিনেভরিন দিয়েছিলাম সিস্টার মার্গারেট।

রাখো তোমার হাই ডোজ, আরও হাই দাও।

বিদেশে কাজ করার সময় এই এক ঝামেলা প্রায় ভোগ করতে হতো। রোগী একটু হাউকাউ করলেই তাকে  তৎক্ষণাৎ ঠান্ডা করার জন্যে ওয়ার্ডের নার্সরা বায়না ধরত। ফলে জুনিয়র ডাক্তাররা পড়ে যেত মুশকিলে। ওদের আর কী, আমরা ডাক্তাররা মনে মনে ভাবতাম, কিছু হলে তো আমাকে তার জবাবদিহি করতে হবে। এবং সেই সাথে আমাদের কনসালট্যান্টকে। মাঝখান থেকে আমাদের বায়োডাটায় একটা কালো দাগ পড়ে যাবে!

সুতরাং নার্স যতই বায়না ধরুক, আমি বা আমরা ডাক্তাররা  ওষুধের ডোজ বাড়াতাম খুব সতর্কতার সাথে।

আমি তাই সিস্টারের কথায় একটু গাম্ভীর্যের ভাব করে বললাম,  আরে, বেশি হাই ডোজ দিলে তোমার রোগী কলাপ্স করে যাবে যে।

আমার কথায় সান্ত্বনা না পেয়ে মার্গারেট বলল, তাহলে তোমার কনসালট্যান্ট ব্রাহামাকে বলো, তিনি একটা ব্যবস্থা করুন।

তাই বললাম। ডাক্তার ব্রাহামার অফিসে ঢুকে সাহস করে তাকে সব কথা জানালাম। ডাক্তার ব্রাহামা মনে মনে যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি জানো না, সব সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের নার্সদের নিয়ে এই এক সমস্যা। তারা কাজ করবে মেন্টাল ওয়ার্ডে। কিন্তু রোগীদের দেখতে চাইবে আর দশটা সাধারণ ওয়ার্ডের রোগীদের মতো। ভালো, ভদ্র, বিনীত, বুঝদার। কিন্তু এইসব রোগীর বেলা সেটা কী করে সম্ভব? অবশ্য সম্ভব, যখন তারা ভালো হয়ে উঠে তোমাকে ধন্যবাদ জানাবে।

তারপর একটু থেমে বললেন,

আর লেসলি ওয়ার্ড হচ্ছে আমার এক মূল্যবান রোগী। তার ঝামেলা একটু সহ্য করতে হবে। তুমি রাতের বেলা পারলে একবার লেসলিকে দেখে যেও। তাকে  কাউন্সেলিং করো। তাহলে সে ভালো ঘুমাবে।

আচ্ছা, ডাক্তার ব্রাহামা। মাথা নেড়ে আমি বললাম।

কেন সে ভ্যালুয়েবল এ-কথাটা তুমি জিজ্ঞেস করবে না, ডাক্তার? শুধু মাথা নেড়ে সায় দিলেই কি হয়ে গেল?

এবার অনুভব করলাম ডাক্তার ব্রাহামার বিরক্তির মাত্রা চড়ছে।

তাড়াহুড়ো করে আমি বললাম, ঠিক এই কথাটাই আপনাকে আমি এখন জিজ্ঞেস করব বলে ভাবছিলাম!

বেশ, তাহলে শোনো, এই রোগীর ওপরে আমি ডিটক্সিফিকেশন মেথড চালাবো না। এর আগে অনেকবার এসব করা হয়েছে। রোগী ভর্তি করে আস্তে আস্তে তাকে ওষুধ দিয়ে স্নায়ু ঠান্ডা করে  অ্যালকোহলমুক্ত করা হয়েছে। এবার আমি লেসলিকে  কী করবো, জানো?

কী করবেন, ডাক্তার ব্রাহামা?

তার ওপরে আমি ডাইসালফিরাম দিয়ে পরীক্ষা চালাবো।

ডাইসালফিরাম অর্থাৎ অ্যান্টিবিউজের আসল নাম হচ্ছে টেট্রাইথাইলথাই ইউরাম ডাইসালফাইড। এই দ্রব্যটি অ্যালকোহলের মেটাবোলিজমের ওপর কাজ করে, অর্থাৎ শরীরের  রক্তে মিশে যাবার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। যার ফলে রোগীর শরীরের ভেতরে নানা ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি করে। তার চোখমুখ লাল হয়ে আসে। প্রচুর ঘাম হয়। মাথা ধরে, বুক ধড়ফড় করে, শ্বাসকষ্ট হয়। কিন্তু সে মরে না।

সাধারণত নিয়ম হচ্ছে এক ডোজ ডাইসালফিরাম খাবার একটু পরে এক বা দুই আউন্স হুইস্কি বা জিন রোগীকে খেতে  দিতে হয়।  আর তার একটু পরেই শুরু হয়ে যায় উপসর্গগুলো – একেবারে নাটকীয়ভাবে। এর ফলে আশা করা হয় রোগীর মদ খাবার ইচ্ছা অচিরে নির্মূল হয়ে যাবে। তবে ডাক্তার এবং নার্সকে খুব সতর্ক থাকতে হয়। হাতের কাছে অক্সিজেন সিলিন্ডার, সাকার মেশিন (গলা থেকে শ্লেষ্মা বের করে ফেলার জন্যে), অ্যান্টি-হিস্টামিন ইত্যাদি রাখতে হয়।

কারণ কোনো কোনো সময় এটা দেখা যায় যে ডাইসালফিরাম  দিয়ে চিকিৎসা করতে গিয়ে রোগী পটল তোলার পর্যায়ে প্রায় পৌঁছে গেছে। যেমন তার রক্তচাপ নিচে নেমে যায়, প্রচুর বমি হয়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে চেহারা নীল হয়ে আসে। রোগী এরপর ক্রমাগত এক আচ্ছন্নতার ভেতরে ডুবতে থাকে।

তখন সে এক কেলেঙ্কারি কান্ড।

কিন্তু অ্যালকোহলিজমও তো একটা সাধারণ অসুখ নয়। বুনো ওলের জন্যে বাঘা তেঁতুলই তো দরকার। এই চিকিৎসা কিছুদিন করার পরে রোগীর মদ খাওয়ার ইচ্ছা ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হয় বা হতে পারে।

কিন্তু কোনো কনসালট্যান্ট এই সব ঝুঁকির কাজ বাধ্য না হলে নিতে চান না। এত ঝামেলার দরকার কী? এরচেয়ে রোগীকে হাইডোজ ট্রানকুইলাইজার বা ঘুমের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করে রিহ্যাবিলিটেশনে পাঠিয়ে দেওয়া অনেক ভালো এবং নিরাপদ।  এভাবেই চেষ্টা করে সকলে।  রিহ্যাবিলিটেশন মানে অ্যালকোহলিক রোগীর পুনর্বাসন। এবং সেখানে গিয়ে অধিকাংশ রোগীই ভালো হয়ে উঠে বাড়ি ফিরে আবার কিছুদিন বাদে মদের মোহে পড়ে যায়। পুরো ব্যাপারটা মানুষের জীবনে একটা করুণ পুনরাবৃত্তি তাতে  সন্দেহ নেই, কিন্তু মানব জীবনের রহস্যের কথা কে সঠিক বলতে পারে? এতদিন বাদে এ-সত্য তো পরিষ্কার যে, আমাদের মগজই সারাটা জীবন আমাদের চালিত করে। কিন্তু সেই মগজ একবার মদাসক্ত হলে তারও কোনো পূর্বাপর হিসাব থাকে না। সে আর সঠিক পথে আমাদের চালিত করতে পারে না। সে তখন তার নিজের স্বকীয়তা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলে।

তাই ডাক্তার ব্রাহামার কথা শুনে মনে মনে আমি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলাম। লেসলির মতো রোগীর জন্যে এত বড় একটা ঝুঁকি নেবেন ডাক্তার ব্রাহামা? আর হাসপাতালে ভর্তি করে রেখে রোগীর এরকম চিকিৎসা করা মানে ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রারের দফারফা। তার দিনরাতের ঘুম হারাম। সর্বক্ষণ রোগীর পিছে পিছে থাকতে হয়, তাকে ফলোআপ করতে হয়, কোনোভাবে তার শরীর অসুস্থ হয়ে  পড়লে সঙ্গে সঙ্গে তাকে মেডিসিন বিভাগে ট্রান্সফার করতে হয়।

কী ঝামেলা! মনে মনে ভাবলাম।

কিন্তু ডাক্তার ব্রাহামাকে আমার মনের কথা জানতে দেব কেন? উলটে বরং প্রচুর উৎসাহ দেখিয়ে বলে উঠলাম, ওঃ, সেটা তো খুব ভালো হয়, ডাক্তার ব্রাহামা। অনেকদিন কোনো রোগীকে এই চিকিৎসা করা হয়নি এই ইউনিটে। কিন্তু লেসলি কি এই চিকিৎসা করতে রাজি হবে?

রাজি হবে না মানে? এই চিকিৎসা করতে সে রাজি হয়েছে বলেই তো তাকে আমি এবার হাসপাতালে ভর্তি করতে সম্মত হয়েছি। এর ভেতরে কোনো কিন্তু নেই মেয়ে, বুঝলে? আগে দেখেছি না, প্রতিবার তাকে গতানুগতিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করানোর ফলে সে চিকিৎসা ফেল?

তাহলে তো আর কথাই নেই ডাক্তার ব্রাহামা। কবে তাহলে চিকিৎসা শুরু করব? আমি উৎসাহ ধরে রেখেই জিজ্ঞেস করলাম।

ডাক্তার ব্রাহামা একটু ভেবে নিয়ে বললেন, তুমি কাল সকালেই তাকে এক বড়ি ডাইসালফিরাম দিয়ে দেবে। ঠিক সকাল দশটায়। আমি আজ সিস্টারকে বলে তার হুইস্কি পানের ব্যবস্থা করে রাখব। আর তুমি আনুষঙ্গিক সব ব্যবস্থা করে রাখবে আশা করি।

অবশ্যই, ডাক্তার ব্রাহামা। মাথা  অনেকখানি ঝুঁকিয়ে আমি তার রেজিস্ট্রার বলে উঠলাম।

এরপর আমি প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে এলাম ওয়ার্ডে। সিস্টার মার্গারেটকে জড়িয়ে ধরে বললাম, সিস্টার, তোমার খবর আছে!

মানে? মার্গারেট ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল।

আমি টুল টেনে বসে তাকে সংবাদটা জানালাম। আগামীকাল থেকে চিকিৎসা শুরু হবে সেটাও জানালাম।

সব শুনে সিস্টার মার্গারেট উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, আরে, বলো কী,  এ তো এক সর্বনেশে কথা, লেসলির মতো এক বেআক্কেল অ্যালকোহলিকের ওপরে এই গুরুতর চিকিৎসার পরিকল্পনা করেছেন ডাক্তার ব্রাহামা? তোমার কনসালট্যান্টের মাথা খারাপ হয়ে গেছে ডাক্তার।

তার কথা শুনে মাথা নেড়ে আমি বললাম, তা হতে পারে, তবু আগামীকাল সবকিছু সাজসরঞ্জাম প্রস্ত্তত রাখতে হবে তোমাকে, বুঝলাম।

আমার কথা শুনে বেজার মুখ করে সম্মতি জানালো মার্গারেট।

 

পরদিন সকালে বেলা ন’টা বাজার আগেই আমি হাসপাতালে এসে হাজির হলাম। ওয়ার্ডে প্রথমে ঢুকেই আগে পানির কেতলি অন করে পানি গরম করে একগাদা দুধ আর চিনি মিশিয়ে পান করলাম মস্তবড় একমগ কফি। এইসব কফির মগ বা কাপ ড্রাগ রিপ্রেজেনটেটিভরা ওয়ার্ডের নার্সদের কাছে দিয়ে যায়, যেন ডাক্তাররা চা বা কফি পান করার সময় তাদের কোম্পানির ওষুধগুলোর নাম মনে রাখে এবং রোগীদের প্রেসক্রিপশন দেয় সেইসব ওষুধের।

একটু বাদে সবকিছু ঠিকঠাক করে ট্রলি সাজিয়ে সিস্টার মার্গারেট চলে গেল লেসলির বিছানার কাছে। আমাদের লেসলি তো সেই সকাল থেকে তার চিকিৎসার তোড়জোড় দেখে মনে মনে মহাখুশি, যদিও মুখের চেহারাটা করে রেখেছে নির্বিকার। এদিকে রাত থেকে মদ না খাবার জন্যে কাঁপছে থরথর করে।  দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে তার।  মদ তার এখুনি দরকার এই কাঁপুনি থামাবার জন্যে। ওদিকে তার জন্যে রেডি হচ্ছে মদ। জুলজুল করে সে তাকাচ্ছে হুইস্কির বোতলের দিকে, যেন পারলে এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়ে  পুরো বোতলটা তার মুখে ঢেলে দেয়!

ওদিকে ডাক্তার ব্রাহামা বসে আছেন তাঁর অফিসে। ওখান থেকে  তিনি সবকিছুর নির্দেশ দিচ্ছেন। একটু পরে যখন কাজ শুরু হবে  আমি ফোন করে ডাক্তার ব্রাহামাকে জানালাম। উনি বললেন, একটু সবুর করো আমি আসছি।

শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। এবং মনে মনে একটু উত্তেজিতও হলাম, কারণ এর আগে আমিও কোনো অ্যালকোহলিককে ডাইসালফিরাম দিয়ে চিকিৎসা করিনি, শুধু বইতে পড়েছি।

ডাক্তার ব্রাহামা সবসময় জামাকাপড়ে ফিটফাট থাকেন। অথচ আমি অন্যান্য হাসপাতালের ইংরেজ কনসালট্যান্টদের দেখেছি  জামাকাপড়ে অনেকসময় তারা ঢিলেঢালা, কিন্তু ডাক্তার ব্রাহামা সেদিক থেকে ভীষণ সচেতন। সেদিন যেন আরও বেশি, এরকম মনে হলো আমার। তিনি ওয়ার্ডে এলে আমি দেখলাম,  দামি গরম কাপড়ের থ্রিপিস স্যুট পরেছেন ডাক্তার ব্রাহামা। ফর্সা টকটকে রং। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, ইংরেজরা যে-চুলকে আদর করে বলে, সল্ট অ্যান্ড পেপার। অর্থাৎ লবণের শাদা এবং গোলমরিচের কালোর  মিশেল দেওয়া যে-চুল। কথাটা তারা সবসময় পুরুষের মাথা উপলক্ষেই বলে, নারীর মাথার চুলকে এরকম বলতে আমি শুনিনি।

ডাক্তার ব্রাহামাকে দেখে লেসলি আদুরে মেয়ের মতো তার দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, হাই, ডক্টর ব্রাহামা?

হাই, লেসলি, বলে ডাক্তার ব্রাহামাও দুহাত বাড়িয়ে লেসলিকে ডাক্তারিসুলভ আদর করলেন।

লেসলি মুখে কিছুটা গর্বের ভাব ফুটিয়ে বলল, আই অ্যাম রেডি। বলেই সে জুলজুল করে হুইস্কির বোতলটার দিকে তাকাল।

আই নো, বলে ডাক্তার ব্রাহামা আমার দিকে তাকালেন।

আমি সিস্টার মার্গারেট এবং অন্য আরেকজন নার্সের দিকে তাকালাম। সেই নার্সটি এসে এক বড়ি ডাইসালফিরাম এনে লেসলির হাতে তুলে দিলো, তারপর মেজার গ্লাসে পানি দিলো একটু। লেসলি বড়িটা গিলে চুপ করে বসে থাকল।

ডাক্তার ব্রাহামা তার হাতের ঘড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইশারা করলেন। সিস্টার মার্গারেট তখন মেজার গ্লাসে এক বা দেড় আউন্স পরিমাণ হুইস্কি ঢেলে লেসলিকে দিলো। মরুভূমির ভেতরে একবিন্দু ওয়েসিসের মতো মুহূর্তে সে-হুইস্কি অন্তর্হিত হলো লেসলির মুখগহবরে।

ডাক্তার ব্রাহামা আবার হাতঘড়ির দিকে তাকালেন।

তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, আমি আমার অফিসে বসে অপেক্ষা করছি, তুমি লেসলির কাছে থাকো।

আমি তাই থাকলাম। একটা টুল টেনে রোগীর বিছানার কাছে বসে ছিপ ফেলে তাকিয়ে থাকলাম রোগীর মুখের দিকে।

একটু আগেই মদটা মুখে ঢেলে লেসলি বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়েছিল। এখন সে চোখ মেলে ওয়ার্ডের ছাদের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকলো। যেন কিছু চিন্তা করতে লাগলো।

সিস্টার মার্গারেটও একটু যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তার কাচঘেরা ঘরে ফিরে গেল। যাবার আগে একজন জুনিয়র নার্সকে বলে গেল রোগীর দিকে চোখ রাখতে।

আমিও সকলের নিশ্চিন্ত ভাব দেখে নিজের মনের ভেতরে ব্যক্তিগত সব সমস্যার কথা গোপনে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম!

কিছুক্ষণ বাদে যখন সকলেই মোটামুটিভাবে নিশ্চিন্ত, হঠাৎ করে যেন তেলেসমাতি কান্ড শুরু হয়ে গেল সকলের চোখের সামনে। লেসলি বিকট এক চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠে তার দশাসই শরীর বিছানায় খাড়া করে তুলে ফেলে আমার দিকে রক্তাক্ত বিলাই চোখে তাকিয়ে বলে উঠল, হেই, হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান টু মি?

আরে, আমি তার কী করেছি? যা করার সব তো ডাক্তার ব্রাহামার নির্দেশমতোই করা হচ্ছে। কথাটা মনে মনে ভেবে আমি বলতে গেলাম, লেসলি, প্লিজ, লাই ডাউন কোয়ায়েটলি।

কিন্তু আমি মুখ খোলার আগেই লেসলি এক লাফে বিছানা ছেড়ে  উঠে প্রায় লাফাতে লাফাতে সিস্টারদের কাচঘেরা কেবিনের ভেতরে ঢুকে বলল, হেই মার্গারেট, হোয়াট ডক্টর ব্রাহামা হ্যাজ প্রেসক্রাইব্ড ফর মি? আর অল অব ইউ প্ল্যানিং টু কিল মি? ইউ সিলি পিপল?

মার্গারেট লেসলিকে ঠান্ডা করার জন্যে ধীর স্বরে বলল, প্লিজ লেসলি, শান্ত হও। একটু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে!

লেসলি সিস্টার মার্গারেটের কথা শুনে আরো উত্তেজিত হয়ে বলল,  হাঃ, ইউ মাস্ট বি জোকিং। ফাজলামো পেয়েছো? একটু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে? আমার সাথে ইয়ার্কি মারা হচ্ছে তোমাদের? অ্যাই?

সেই দশাসই চেহারার বত্রিশ বছরের লেসলির ব্যবহার তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাকে ঠেকিয়ে রাখা কি চাট্টিখানি কথা? মার্গারেট আবার মুখ খোলার আগেই লেসলি সিস্টারদের রুমের ফাইলপত্র সব উলটে, চায়ের মগ মাটিতে ফেলে, তিনটে নার্সকে কনুইয়ের গুঁতোয় সরিয়ে দিয়ে, সোনালি চুল বাতাসে উড়িয়ে, চোখ বড় বড় করে ওয়ার্ডের করিডোর দিয়ে মারল ছুট।

ইতোমধ্যে একজন জুনিয়র নার্স ডাক্তার ব্রাহামাকে ফোন করে  দিয়েছে। আমি এদিকে দাঁড়িয়ে আছি হাতে অ্যান্টি-হিস্টামিন ইনজেকশন নিয়ে লেসলিকে ইনজেকশন দেবো বলে, তার শরীরের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকাবো বলে, কিন্তু  কোথায় লেসলি? তাকে হাতে পাবো তবে না ইনজেকশন। আমার চোখের সামনে লম্বা সরু করিডোর। ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে সেটা বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। ওই যে লেসলি চলে যাচ্ছে দেখা যায়। কোনো পূর্বাপর চিন্তা না করেই আমি হাতের ইনজেকশন শক্ত করে ধরে রেখে করিডোর দিয়ে লেসলিকে ধরার জন্যে দৌড়তে লাগলাম। আমার সামনে আগে আগে দৌড়াতে লাগল নার্স, সিস্টার মার্গারেট এবং আরো কেউ কেউ।

এখন সে আমাদের ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে গেছে। আর একটু পরেই হাসপাতালের সামনে পৌঁছে  যাবে। কিন্তু করিডোরের শেষ মাথায় সে পৌঁছতেই ধাক্কা খেল একজনের সঙ্গে। আমি দূর থেকে তাকিয়ে দেখি সে একজন আর কেউ নয়, স্বয়ং ডাক্তার ব্রাহামা।

ডাক্তার ব্রাহামা তাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে যেতেই লেসলি বাইন মাছের মতো তার হাত গলিয়ে ছুটতে লাগল হাসপাতালের গেটের দিকে। কিন্তু ডাক্তার ব্রাহামাও কম যান না। তিনিও দেখি থ্রি পিস স্যুট পরিহিত অবস্থাতেই গলার দামি সিল্কের টাই বাতাসে উড়িয়ে লেসলির পেছনে দৌড়াচ্ছেন। আর চিৎকার করে বলছেন, লেসলি, কাম  ব্যাক, মাই ডিয়ার লেসলি, প্লিজ কাম ব্যাক। ইউ উইল বি অলরাইট। আই প্রমিজ, ইউ উইল বি অলরাইট। কাম ব্যাক, মাই ডারলিং!

আর কীসের কাম ব্যাক! যা হবার ছিল তা তো হয়েই গেছে। লেসলি চোখের নিমেষে হাসপাতালের সবুজ লন মাড়িয়ে, পেভমেন্ট তিন লাফে ডিঙিয়ে, ফুলগাছের ফেন্স লাফিয়ে পার হয়ে মেইন গেট দিয়ে রাস্তায় নেমে ছুটতে ছুটতে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আর লেসলির পেছন পেছন একটা খরগোশের মতো তীরবেগে দৌড়াতে দৌড়াতে অদৃশ্য হলেন ডাক্তার ব্রাহামা।

আমি আর সিস্টার মার্গারেট করিডোরের বাইরে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে রোগী লেসলি স্টুয়ার্ট আর ডাক্তার ব্রাহামাকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। আমার হাতে ধরা অ্যান্টি-হিস্টামিন ভরা প্লাস্টিকের সিরিঞ্জ, যা লেসলির শরীরে একবার ফুটিয়ে দিতে পারলেই সে শান্ত হয়ে যেত। কিন্তু তার আর সুযোগ পাওয়া গেল কই?

আমাদের চোখের সামনে এখন হাসপাতালের সবুজ ঘাসে ভরা লন। মৃদু মৃদু শীতল বাতাস। এখানে সেখানে রঙিন সব ফুল। হালকা রোদ উঠেছে আজ বাইরে। প্রকৃতি যেন বড় সুখে আজ সময় কাটাচ্ছে।

কিন্তু আমরা মানুষেরা আজ সুখে নেই! একটু আগেই আমাদের মানসিক বিভাগে ঘটে গেছে এক অঘটন। আমার আজ পুরো দিনটাই মাটি হবে বুঝতে পারছি। সিস্টার মার্গারেটও খুব সুখী নয়। ভেতরের উত্তেজনা ও ভয় দমন করতে করতে আমরা পরস্পরের দিকে তাকালাম।

সিস্টার মার্গারেট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ইউ নো হোয়াট, ডক্টর বানু?

আমি ক্লান্ত স্বরে বললাম, ইয়েস মার্গারেট?

দ্যাট জেন্টেলম্যান মিন্স গুড টু হিস পেশেন্ট, বাট নট গুড টু হিস স্টাফ অ্যান্ড কলিগ।

আমি তার কথার মুহূর্তে প্রতিবাদ করে বললাম,  ওঃ, কাম অন, মার্গারেট, ডাক্তার ব্রাহামা একজন ভালো ডাক্তার, একজন ভালো মানুষও, তাকে চিনতে ভুল করো না, লক্ষ্মীটি।

মার্গারেট আমার মুখের দিকে একটু বিমূঢ়তার সাথে তাকিয়ে বলল, তুমি বলছো?