মিজানুর খান

বাইরে থেকে কিঞ্চিৎ ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ক্যাঁচক্যাঁচ করে একটা চিকন শব্দ হলো শুধু। রুশনারার কাছে এই আওয়াজটা খুবই পরিচিত। ওর মুখস্থ হয়ে গেছে – কত জোরে ঠেলা দিলে ঠিক কতটুকু আওয়াজ হয়, কেমন হয় সেই আওয়াজ। তাই সে এখন আর আগের মতো বিরক্ত হয় না, হলেও নিজেকে বুঝ দেয় – আর অল্প কয়েকটা দিন, তারপরেই তো এই দরজায় জংধরা কব্জার বিরক্তিকর আওয়াজ থেকে মুক্তি।

মূল ফটকের এই শব্দটার জন্যে রুশনারা আজকাল যতটা না রুষ্ট হয়, তারচেয়েও বেশি ক্রুদ্ধ হয় রাহেলার ওপর। সাত বছরের বেশি হয়ে গেল কাজের মেয়েটা তাদের সঙ্গে আছে। সেই কবে থেকে এই বাড়িতে, একেবারে কুসুমের জন্মের পর থেকে, তারপর কখন যে ধীরে ধীরে রাহেলাও এই পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেছে সেটা সে বুঝতেও পারেননি।

তাকে অনেকবার বলা হয়েছে দরজাটা ঠিকমতো বন্ধ করে রাখতে। ড্রাইভার, ফেরিওয়ালা, হকার – কত অচেনা-অজানা লোক সিঁড়ি দিয়ে ওপর-নিচ যাওয়া-আসা করে, বলা তো যায় না, কখনো কেউ যদি হুট করে ভেতরে ঢুকে পড়ে! কিন্তু মেয়েটা আজো ছিটকিনিটা তুলতে ভুলে গেছে।

তারপরেও কিছু বলল না সে।

গত কয়েকদিন ধরে রুশনারার বুকের ভেতরে খুশির জল বুদ্বুদ করে ফুটছে। তার অনেকদিনের একটা স্বপ্ন, যার বীজ সে রোপণ করেছিল কুসুমের জন্মেরও আগে, সেটা পূরণ হতে চলেছে। ওই স্বপ্নের গোড়ায় নিয়মিত জল ঢেলেছে রুশনারা, সার দিয়েছে মাটিতে, আগাছা পরিষ্কার করেছে, তারপর বাস্তবতার কঠিন মাটি ভেদ করে একদিন ঠিক ঠিকই উঁকি দিয়েছে স্বপ্নের কচি চারা, সেই চারার যত্ন করেছে সে, ছেঁটে দিয়েছে ডালপালা, অপেক্ষা করেছে এই চারা কবে হয়ে উঠবে মহীরুহ, তারপর ফল ধরবে তার শাখায়।

একই স্বপ্ন রাতের পর রাত দেখলে সেটা যেমন বিবর্ণ হয়ে যায়, রুশনারার স্বপ্নেরও একই দশা; কিন্তু তারপরও, যখনই তার মনে হয়েছে যে তারা – সে, তার স্বামী রেজওয়ান এবং ছোট্ট মেয়ে কুসুম, একটু একটু করে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে অগ্রসর হচ্ছে, তার মনে হয়েছে, ওই স্বপ্নবৃক্ষের ডালে দেখা দিয়েছে অস্ফুট ফুলের আভাস, সেই ফুল থেকে একদিন ফল হবে – এই আশায় তার মনের নীড়ে সুখের একটা পাখি কিচিরমিচির করে গান গেয়ে উঠেছে।

ডেভেলপাররা জানিয়েছে যে, তাদের ফ্ল্যাটের কাজ প্রায় শেষ, দু-তিন মাসের মধ্যেই তারা উঠে যেতে পারবে। এখন শুধু ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি। মেঝেতে কোন টাইলস বসানো হবে, দেশি না বিদেশি ফিটিংস লাগানো হবে বাথরুমে, আর সেগুন কাঠের দরজায় তারা কী ধরনের নকশা করতে চায় – এসব ফাইনাল হয়ে গেলে ফ্ল্যাটে উঠতে সময় লাগবে না।

এই সুসংবাদ রেজওয়ানই দিয়েছে তাকে। গত সপ্তাহে। সেদিন অফিস থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে বিধ্বস্ত শরীরটা সোফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিল রুশনারা। সে ফিরেছে রেজওয়ান আসার আগেই। বেশিরভাগ দিনেই এরকমটা হয়। প্রতিদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রুশনারা ছোট্ট একটা ফোন দিয়ে স্বামীকে তাগাদা দেয় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি যাওয়ার জন্য। ফার্মগেটের কাছে অন্ধকারে ঠাসা স্যাঁতসেঁতে সরু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে স্বামীকে বলে : আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে না ‍তুমি? মেয়েটা বাসায় একা। রাহেলার সঙ্গে সারাদিন থাকে। একটু আগে গেলে ওকে তুমি সময় দিতে পারতে।

রেজওয়ান : কেন, তুমি কখন ফিরবা?

রুশনারা : আমার তো একটু বাজারে যেতে হবে। তুমি তো কোনো খেয়ালই রাখো না ঘরের। রান্নার কি কিছু আছে!

আহ্লাদের সুর রেজওয়ানের কণ্ঠে : আজকে কোনোরকমে সামলে নাও সোনা। আমার একটু ঝামেলা।

রুশনারা : আমার জন্যে তোমাকে বাড়ি যাওয়ার কথা বলিনি। আমার জন্যে যে তুমি কখনো বাসায় আসো না সেটা আমি বুঝি। কিন্তু মেয়েটার কথা ভেবেছো একবারও? রাতে তুমি যখন আসো কুসুম ঘুমিয়ে থাকে, সকালে ও যখন স্কুলে যায় তখন তুমি ঘুমিয়ে থাকো। তোমাদের কী দেখা হয় ঠিকমতো!

রেজওয়ান : প্লিজ সোনা, এভাবে বলো না, প্লিজ। আর কয়েকটা দিন সময় দাও। আমি সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছি। তোমার জন্যে একটা সুখবর আছে।

রেজওয়ান আর কিছু বলল না। চুপ করে রইল। এটা তার কৌশল। সে চায় রুশনারা এখন কিছু বলুক। কারণ সে জানে রুশনারা কিছু বললে একটুখানি হালকা হবে, তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা শব্দগুলোর সঙ্গে বুকের ভেতরে জমে থাকা মান-অভিমান দুঃখ-কষ্টও জলীয় বাষ্পের মতো বের হয়ে আসবে। কেটলির ভেতর থেকে ফুটন্ত পানির কিছুটা বাষ্প হয়ে নির্গত হওয়ার পর কেটলির ভেতরটা যেমন শান্ত হয়ে আসে, ঠিক তেমনি একটু পর ঠান্ডা হয়ে যাবে রুশনারাও।

রুশনারা জানতে চাইল : কী খবর দিবা, দাও।

রেজওয়ান হাসল : বাড়িতে এসে দিবো সোনা, এখন না।

রেজওয়ানের মুখে দুই মিনিটের মধ্যে তিনবার সোনা ডাক শোনার পর সেদিন আর কীইবা বলার ছিল রুশনারার। ফোনের এপাশে চুপ করে রইল কয়েক মুহূর্ত। ওপাশ থেকে রেজওয়ানই কথাটা বলল : সন্ধ্যার পরে আমার একটু উত্তরা যেতে হবে। কাজের জন্য একজন উচ্চপদস্থকে ধরেছি। কত দিতে হবে না হবে সেসব নিয়ে একটু কথা আছে। ওই কাজটা পেয়ে গেলে ফ্ল্যাটের পুরো টাকাটা তুলে ফেলতে পারব।

রুশনারা তখন গেট পার হয়ে রাস্তার ওপর চলে এসেছে।

রেজওয়ান : তুমিও তো চাকরি করো। জানো না যে তদবির-ঘুষ ছাড়া আজকাল কিছু হয় না?

রুশনারা : প্রতিদিনই তো তোমার একটা না একটা অজুহাত থাকে।

রেজওয়ান : অজুহাত হবে কেন? কানেকশন না থাকলে আজকাল কোনো কাজ পাওয়া যায় বলো?

রুশনারা : আমি বলছিলাম কুসুম তো স্কুল থেকে ফেরার পর সারাদিন কাজের মেয়েটার সঙ্গে থাকে। আর মেয়েটার যা স্বভাব – কেয়ারটেকার না হয় ড্রাইভার কাউকে না কাউকে বাড়িতে নিয়ে এসে গল্প করতে থাকে। পুরুষ মানুষের মাথামুণ্ডু কখন বিগড়ে যায় কে জানে!

একটানা বলে গেল রুশনারা। এর মধ্যে হাত দিয়ে একটা রিকশা থামিয়ে আরেক হাতে শাড়ি সামলে সিটে উঠে হুড তুলে দিয়ে শক্ত করে ধরে বসে রইল। দেখল, কলমুখর জনস্রোত অবিরল বয়ে যাচ্ছে রাস্তার দুদিকে। ঘামে ভেজা ক্লান্ত মানুষ দ্রুত পায়ে ছুটছে বাড়ি। কারোরই ফুরসত নেই একটুখানি থামার।

এক সপ্তাহ পরের ঘটনা। আরো একটা সাধারণ রাত। অন্যসব রাতের মতোই। ঘড়িতে দশটা বেজে গেছে, রেজওয়ান এখনো ফেরেনি। একবার কল করার কথা ভেবেও আর ফোন করেনি রুশনারা। ও জানে প্রতিটি প্রশ্নের কী উত্তর দেবে রেজওয়ান। স্বামীর প্রতিটি নিশ্বাস, শব্দ, বাক্য, এমনকি চুপ করে থাকার অর্থ এতদিনে ওর আত্মস্থ হয়ে গেছে।

এগারোটার পরে ঘরে ঢুকে রেজওয়ান সিটিংরুমে গিয়ে বসে টিভিটা ছেড়ে দিলো। হালকা একটা নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল সারাঘরে। কী একটা সিরিয়াল শুরু হয়েছে। হিন্দি সিরিয়াল। কুসুমও দৌড়ে এসে সোফায় বসল। কুসুম তার বাবাকে কিছু বলল না, রেজওয়ানও কিছু বলল না তার মেয়েকে। দুজনই সিরিয়ালটা গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল।

রেজওয়ান যেখানে বসেছে, তার উলটো পাশে একটা বেতের চেয়ার টেনে বসল রুশনারা। আজো বাড়িতে ফেরার পর একটুখানিও সময় পায়নি কোথাও বসার। সরাসরি রান্নাঘরে ঢুকে তরকারিগুলো পরিষ্কার করে চুলায় বসিয়ে দিয়েছে।

ঘামে তেলতেলে হয়ে আছে রুশনারার মুখ। শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল ও নাকটা মুছল সে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল : ফ্ল্যাটের কী অবস্থা? কাজ শুরু হইছে?

রেজওয়ান : হুম, টুকটাক শুরু হইছে নাকি। কোম্পানির সিরাজি সাহেব ফোন দিয়েছিল। বলল, সবকিছু ঠিকঠাকমতো চললে জুলাই মাসেই নাকি উঠে যেতে পারব।

রুশনারা : এখন কোন মাস? আজ  এপ্রিলের সাত তারিখ। তারপর আঙুলে দিন-তারিখ-মাস গুনতে গুনতে রুশনারা দেখল আর মাত্র আড়াই মাস বাকি।

অবশ্য এরকম ‘আড়াই মাস’ গত আট বছরে বহুবার এসেছে। রুশনারা ফোন দিলেই ধুরন্ধর সিরাজি সাহেব বলেছেন : ম্যাডাম, সবকিছু রেডি। এতদিন যখন কষ্ট করেছেন, আর আড়াই মাস ধৈর্য ধরেন। গ্যাস আর পানির কানেকশন লাগাইয়া ফেলছি। এখন ফিনিশিংয়ের কাজ ধরবো। হাতে টাকা নেই বলে শুরু করতে পারছি না। আরো কিছু টাকা দেন, তারপর চাবিটা লইয়া যান।

এই একগোছা চাবির স্বপ্ন দেখিয়ে সিরাজি সাহেব তিন লাখ, পাঁচ লাখ করে বহু টাকা খসিয়ে নিয়েছে।

রুশনারার মনে হয় ওই একগোছা চাবি হচ্ছে মুলা আর ওরা – রেজওয়ান এবং সে – আস্ত দুটো গাধা। সেই কবে, এখনো ছবির মতো ভাসে, বছরসাতেক আগে, কুসুম তখন মাত্র কোলে এসেছে, রিহ্যাবের মেলায় গিয়ে উত্তরার পাঁচ নম্বর সেক্টরে সাততলা অ্যাপার্টমেন্টের পাঁচতলায় একটি ফ্ল্যাটের বুকিং দিয়েছিল ওরা। অ্যাপার্টমেন্টের ডিজাইন, সামনের একচিলতে খোলা জায়গা, এমনকি রোজভ্যালি নামটাও পছন্দ হয়েছিল তাদের। বুকিং দেওয়ার পর সেদিন রাতে, ধানমণ্ডির পঁচিশ নম্বর রাস্তায় চটপটি খেয়ে ফুরফুরে বাতাসে চুল ওড়াতে ওড়াতে, নাখালপাড়ার সরু গলির বাড়িতে ফিরেছিল রুশনারা। ততোক্ষণে রেজওয়ানের কোলে ঘুমে কাদা হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট কুসুম।

মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা করেই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল ওরা। ডেভেলপাররা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, এক বছরের মধ্যেই ওরা উঠে যেতে পারবে। কিন্তু এর মধ্যে সাতটা বছর চলে গেছে, কুসুম পিতামাতার কোল থেকে নেমেছে, ছেড়েছে মায়ের দুধ, হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে ও দৌড়াতে শিখেছে, ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’ কবিতা অভিনয় করে দেখাতে পারে, মুখস্থ বলতে পারে সুরা ফাতিহা; শুধু তাই নয়, এখন সে স্কুলে গিয়ে ক্লাস-পরীক্ষাও দেয় মাসে মাসে; কিন্তু সেই রোজভ্যালিতে ওঠার সময় আজো তাদের আসেনি।

রুশনারা গুনে গুনে দেখে এক-দুই-তিন করে সাতটা বছর গেছে জীবনের – ফ্ল্যাটের বুকিং মানি, ডিপোজিট আর কিস্তির টাকা শোধ করতে গিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে ওর শাশুড়ির দেওয়া ভারি একটা টিকলি, কুসুমের প্রথম জন্মবার্ষিকীতে ওর নানার দেওয়া গলার চেইন। মাত্র দু-বছর আগের কথা, ডেভেলপাররা ধরল যে, ফ্ল্যাটের সবকিছু রেডি, তিন লাখ টাকা দিলেই উঠতে পারবে, রুশনারা তখন প্রভিডেন্ট ফান্ডটাও ভেঙে ফেলল, গাজীপুরে পাঁচ কাঠার একটা জমি বিক্রি করে দিলো রেজওয়ান; কিন্তু স্বপ্নের সেই রোজভ্যালি রেডি হলো না এখনো।

অফিসে সারাদিনের রক্ত পানি করা খাটুনির পর রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত রুশনারা মেয়ে কুসুমকে স্বামী ও তার নিজের মাঝখানে রেখে শুয়ে শুয়ে রোজভ্যালি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখে। কল্পনার চোখে দেখতে পায় কীভাবে সে প্রতিটি ঘর একটু একটু করে সাজিয়ে তুলছে – বেডরুমে খাটটা পাতবে মাঝখানে যাতে দুপাশ দিয়ে দুজনে নামতে পারে, আলমারিটা রাখা হবে সে যে-পাশে শোবে সেদিকে, ওয়াল ক্যাবিনেটগুলো হবে মাথার পেছনে, ড্রইংরুমের মেঝেতে টাইলসের বদলে লাগাবে লেমিনেটেড উড, টিভিটা ঝুলিয়ে দেবে ওয়ালে, কুসুমের ঘরের চার দেয়ালের রং হবে গোলাপি, একেক ঘরে ঝুলবে একেক রঙের পর্দা।

রুশনারা : তোমার ঘরটা অনেক পুতুল দিয়ে সাজাব কুসুম।

কুসুম : আচ্ছা, শুধু ফ্রোজেনের পুতুল, অন্য কোনো পুতুল না। ঠিক হ্যায়?

কুসুমের উত্তরে একটু বিরক্ত হলেও রুশনারা মুখে হাসি মেখে বলল : আচ্ছা। কিন্তু ঠিক হ্যায় কী আম্মু?

কুসুম : ঠিক হ্যায় মানে হলো ঠিক আছে। তুমি জানো না?

রুশনারা : না আম্মু, আমি জানি না। তুমি কোথায় শিখেছ?

কুসুম : টিভিতে। রাহেলাও জানে।

রুশনারা : ওকে, বুঝেছি। তুমি আমার সঙ্গে এখন থেকে আর এই ভাষাতে কথা বলবে না। ঠিক আছে?

কুসুম : ওক্কে, আর বলব না।

রুশনারা কুসুমের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল : আই লাভ ইউ মাই বেবি।

কুসুম : আমি তোমাকে বেশি ভালোবাসি।

রুশনারা : কতটুকু বেশি?

কুসুম ওর দুই হাত ওপরে তুলে দুদিকে যতটুকু পারে প্রসারিত করে বলল, এত্তখানি বেশি। ওর ডান হাতটা তখন ঘুমন্ত বাবার মাথায় লাগলে রেজওয়ান একটু নড়েচড়ে আবার শুয়ে পড়ল।

কুসুম : নতুন বাড়িতে আমরা কবে যাচ্ছি মা?

রুশনারা : হয়ে গেলেই চলে যাব আম্মু।

কুসুম : কবে কাজ শেষ হবে?

রুশনারা : এই তো জুলাই মাসে।

কুসুম : জুলাই মাস কবে?

রুশনারা : আড়াই মাস পরে।

কুসুম : আড়াই মাস কবে হবে?

রুশনারা : জুলাই মাসে।

কুসুম একটা গোলকধাঁধার চক্করে পড়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। ওর বড় বড় চোখ দুটো দেখে বোঝা গেল দিন ও মাসের হিসাব গুনতে গিয়ে ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। কী বলবে বুঝতে পারে না কুসুম। ওর জড়িয়ে যাওয়া কথা কী যে মিষ্টি লাগে রুশনারার।

শুয়ে শুয়ে মেয়ের সঙ্গে খুনসুটি করে রুশনারা আর মনে মনে হাসে। কুসুমের প্রশ্নের উত্তর দিতে ওর খারাপ লাগে না। কারণ সে আসলে কুসুম নয়, নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলে। একটা প্রশ্নের উত্তর দেয় আর তার মনে হয় ওদের ফ্ল্যাটে ওঠার সময় যেন আরো একটু ঘনিয়ে এসেছে। ওদের কথাবার্তার কারণে শান্তিতে ঘুমাতে পারে না রেজওয়ান। কিছু বলেও না। শুধু চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে থাকে।

কুসুম কখনো কখনো জানতে চায় : আমরা এই বাড়ি ছেড়ে কেন চলে যাব মা?

রুশনারা : কারণ এই বাড়িটা ছোট্ট।

 কুসুম : না, ছোট্ট না। এটা বড় বাড়ি।

রুশনারার চোখে হাসি খলবল করে। এই বাড়িতেই কুসুমের জন্ম। নাখালপাড়ায় কিচেন ডাইনিং ড্রইং আর এক বেডরুমের ছোট্ট এই বাড়ি কুসুমের বেড়ে ওঠার সাক্ষী। এই সেই বাড়ি যার চার দেয়ালে লেগে আছে তার হাতের স্পর্শ। এই সেই বাড়ি যার সিমেন্ট উঠে যাওয়া অমসৃণ মেঝেতে পা ফেলে ফেলে সে হাঁটতে শিখেছে, এই বাড়ির রান্নাঘরেই একবার গরম পানি পড়ে কুসুমের ডান পায়ের হাঁটুর নিচে কিছুটা পুড়ে গিয়েছিল।

রুশনারা : এই বাড়িটা পচা।

কুসুম প্রতিবাদ করল : না, এই বাড়িটা ভালো। কুসুমের গলায় কান্না জমে ওঠে।

রুশনারা : দেখ না এই বাড়ির সব দেয়ালে তুমি পেনসিল দিয়ে ছবি এঁকে রেখেছ।

কুসুম : নতুন বাড়িতে আঁকব না।

রুশনারা : আচ্ছা, তুমি তো গুড গার্ল।

কুসুম : তুমিও গুড অ্যান্ড বিগ গার্ল আম্মু।

কুসুমের মুখের একেকটা বোল রুশনারার কানে ভারি মধুর লাগে। এই তো সেদিন সে কথা বলতে শিখল। কিন্তু এখন সে তার নিজের অনুভূতি একটা পুরো বাক্য দিয়েও প্রকাশ করতে পারে। কুসুম যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন মেয়েটাকে আলতো করে তুলে এক পাশে শুইয়ে দিয়ে মাঝখানে জায়গা করে নেয় রুশনারা। স্বামীর পিঠের ওপর বুক ঘষে শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ। রেজওয়ান যখন জেগে উঠে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো, তখনো তাকে মুখ বন্ধ করে পড়ে থাকতে হয়, এইটুকুন একটা ঘর, একটু শব্দ হলেই কুসুম উঠে যেতে পারে – এই ভয়ে।

রেজওয়ান যখন ওকে আদর করে তখনো রুশনারা রোজভ্যালির ফ্ল্যাটের কথা ভাবে – সেখানে কুসুমের জন্য  থাকবে আলাদা রুম, ওর ঘরে লাগানো হবে গোলাপি ওয়াল পেপার, দুটো গোলাপি ক্যাবিনেটের মাঝখানে নকশা করা খাটে বিছিয়ে দেবে ফুলতোলা গোলাপি চাদর। রুশনারা ভাবতে থাকে – ওই ফ্ল্যাটে রাত হবে নির্জন, স্বামীর আদর-সোহাগের সময় তাকে এখনকার মতো গুটিসুটি মেরে কাঠ হয়ে শুয়ে থাকতে হবে না, কুসুম তখন পাশের ঘরে ডিমলাইটের মৃদু নীল আলোতে ঘুমিয়ে থাকবে নরম বিছানায়, ওর ঘরের দরজার পাল্লা দুটো হালকা করে ভেজানো থাকবে, তখন ওদের বেডরুমে একটু হাত-পা ছড়িয়েই রেজওয়ানকে কাছে টেনে নিতে পারবে রুশনারা।

সকালে কুসুমকে ঘুম থেকে টেনে তুলে, জামা-কাপড় পরিয়ে, ওকে স্কুলে ড্রপ করে তারপর অফিসে যায় রুশনারা। রেজওয়ানের জন্যে নাস্তাও রেডি করে বের হতে হয় তাকে। স্ত্রীর হাতের রান্না ছাড়া খায় না রেজওয়ান। আরো প্যাখনা আছে – খাবার একদিন বাসি হলেও খাবে না। আস্তে-ধীরে ঘুম থেকে উঠবে রেজওয়ান, বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ ফেসবুকিং করবে, তারপর গোসল করে বের হবে ঘর থেকে। সময় থাকলে কুসুমকে স্কুল থেকে তুলে বাড়িতে রেখে সারাদিনের জন্যে বের হয়ে যায় রেজওয়ান। যেদিন সম্ভব হয় না, সেদিন আনতে যায় রাহেলা। আজকাল রাস্তাঘাটে গাড়ির এত জ্যাম আর গিজগিজ করা মানুষের ভিড় যে, নানা দুশ্চিন্তায় ছেয়ে থাকে রুশনারার মন। রাহেলা বাড়িতে ফিরে মোবাইল টিপে কুসুমকে ফোনটা দেয়।

কুসুম : আম্মু, আমরা বাসায় এসেছি।

রুশনারা : ওকে আম্মু। তুমি গোসল করে খাবার খেয়ে নিও। রাহেলা তোমাকে খাইয়ে দিবে।

কুসুম : না, আমি নিজের হাতে খাব।

রুশনারা : ওরে বাবা, আমার মামণিটা দেখি বড় হয়ে গেছে।

কুসুম : আজকে রাস্তায় কী হয়েছিল আম্মু জানো?

ধক্ করে ওঠে রুশনারার বুকের ভেতরটা। না জানি কী বলে মেয়েটা।

আবার কুসুম : একটা লোক, মাথায় জট পাকানো বড় বড় চুল, গায়ে নোংরা জামা, আমাকে একটা ললিপপ সেধেছিল।

রুশনারা : তুমি নাওনি তো?

কুসুম : না না। আমি নেই নাই, কিন্তু রাহেলা খালা নিয়েছে।

এই হলো রাহেলা – মাখন যেমন উত্তাপ পেলে গলে যায়, ঠিক তেমনি পুরুষ মানুষে কাত হয়ে যায় রাহেলা। নিচতলার ড্রাইভারের সঙ্গে একবার সে বসুন্ধরা মার্কেটেও চলে গিয়েছিল, তাকে নাকি একটা মোবাইল কিনে দেবে, ওই ফোনে সে ফেসবুক লাগাবে।

কুসুমের আগ্রহ ললিপপে। দু-একদিন, রুশনারা যখন ওকে স্কুল থেকে আনতে যায়, একটা ললিপপের জন্য ওর মাথাটা খারাপ করে দেয় কুসুম। কী যে চঞ্চল হয়েছে মেয়েটা। স্কুলের গেট দিয়ে বের হওয়ার পর থেকেই ললিপপের জন্যে শুরু হয় ওর আবদার। তারপর শুরু হয় ছটফটানি। এরপর কান্নাকাটি। হাতটা মুঠোর ভেতরে নিয়েও ঠিকমতো ধরে রাখা যায় না। কখন যে কোন দিকে দৌড় দেয় সেটা সে বুঝতেও পারে না।

স্কুল থেকে ফিরছিল সেদিন। প্রচণ্ড গরম। ঠাঠা দুপুরে যেন আগুন গলে গলে পড়ছে চারপাশে। রুশনারা গলির মুখে রিকশাটা ছেড়ে দিলো। কোনার মুদিদোকান থেকে তেল, লবণ, তেজপাতাসহ আরো কিছু কিনতে রিকশাটা ছেড়ে দিয়েছিল সে। খরিদশেষে রুশনারা যখন টাকা শোধ করতে যাবে তখন দোকানদারের সহকারী এক যুবক হঠাৎ কুসুমকে দোকানের ভেতরে টেনে নিয়ে গেল। রুশনারা প্রথমে খেয়াল করেনি। দাম পরিশোধ করে নেটের ব্যাগ দুটো হাতে ঝুলিয়ে গলির দিকে পা বাড়াতে গিয়ে আচমকা খেয়াল হলো কুসুম ওর সঙ্গে নেই। বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠল তার।

চিৎকার করে ডেকে উঠল রুশনারা : কু-সু-উ-উ-উ-ম।

দোকানের ভেতর থেকে কেউ একজন উত্তর দিলো : এই যে ম্যাডাম, কুসুম এইখানে। রুশনারা দেখল কুসুম ওই যুবকের কোলে। তার হাতে একটা ন্যাড়া ললিপপ। মুখে দিয়ে চুষছে।

বাড়িতে ফিরে কুসুমের পিঠে জোরে একটা কিল বসিয়ে দিলো রুশনারা। কুসুমের দেহটা মাটির দিকে নুইয়ে পড়ে দুলতে লাগল। টব থেকে ঝুলেপড়া মানিপ্ল্যান্টের লতার মতো।

রুশনারা : ওই ব্যাডার কোলে উঠলি ক্যান তুই?

কুসুম : আমি উঠি নাই আম্মু। চাচ্চু আমারে কোলে নিল।

রুশনারা : তুই গেলি ক্যান হের কাছে, ওই ছেমড়ি, তুই ওই ব্যাডার কাছে ক্যান গেলি?

কুসুম : উনি আমাকে একটা ললিপপ দিলো।

রুশনারা : দিলেই লইতে হইবো?

বলতে বলতে ধুপ্ করে আরেকটা কিল দিলো রুশানারা : আর খাবি ললিপপ? জীবনে কোনোদিন নিবি?

কিল খেয়ে কিছু বলল না কুসুম; কিন্তু মায়ের জেরার মুখে কিছুক্ষণ পর জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করল মেয়েটা। কান্নার দমকে কোনো কথা পরিষ্কার বোঝাও গেল না।

পরদিন রুশনারা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে কুসুমের জন্যে কিনে এনেছিল ললিপপের বড় একটা প্যাকেট। এর ভেতরে নানা ফ্লেভারের ললিপপ। সাদা রঙের চিকন লম্বা কাঠির মাথায় মার্বেলের মতো গোল একেকটা চকলেট প্লাস্টিক দিয়ে মোড়ানো। একেকটা প্লাস্টিকের গায়ে ছাপা একেক কার্টুনের ছবি। ওই প্যাকেটটা বুকে নিয়েই ওই রাতে রুশনারা আর রেজওয়ানের মধ্যিখানে ঘুমিয়ে পড়েছিল কুসুম।

ধানমণ্ডির রিহ্যাব মেলায় ফ্ল্যাটের বুকিং দেওয়ার সময় ওদের রোজভ্যালির যে-ফ্লায়ার দেওয়া হয়েছিল সেটা প্রায়ই বের করে দেখে রুশনারা। সেখানে বাড়ির দুটো ম্যাপ আছে। একটাতে নিজেদের ফাইভ/বি ফ্ল্যাটের ভেতরের নকশা। আর অন্যটা পুরো অ্যাপার্টমেন্টের। নিচতলায় পার্কিং স্পেস। ওখানে হাত বোলাতে বোলাতে স্বপ্ন দেখে – রেজওয়ান বড় কোনো কাজ পেলে একদিন ওদেরও একটা গাড়ি হবে। সেই গাড়ি অপেক্ষা করবে ওদের জন্যে নির্ধারিত পার্কিং বে’তে। কোথাও বেড়াতে গেলে ড্রাইভার দরজা খুলে দেবে, আলতো করে শাড়ি উঁচিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে বসে সে শরীর হেলিয়ে দেবে পেছনে, তার আর রেজওয়ানের মাঝখানে পা দুলিয়ে বসবে কুসুম।

বিকেল হলে কুসুম ফ্ল্যাট থেকে নেমে আসবে ওই পার্কিং স্পেসে, সেখানে খেলাধুলা করবে, স্কিপিং রোপ দিয়ে লাফাবে অথবা সাইকেল চালাবে, এসব না হলেও অন্তত হাত-পা ছুড়ে একটু দৌড়াদৌড়ি তো করতে পারবে। এ-ও বা কম কী। এখন যেখানে আছে সেখানে এক ইঞ্চিও জায়গা নেই কোথাও। একটা বাড়ির জানালা আরেকটা বাড়ির জানালার সঙ্গে লাগানো, এক বাড়ির ওপর উঠে গেছে আরেক বাড়ির বারান্দা, ঢাকা শহরের বাড়িগুলোই এমন – যেন দুই ভাইবোন গলাগলি করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে।

এপ্রিল মাসের সাত তারিখ, আট তারিখ করে মে জুন পার হয়ে একসময় চলে এলো জুলাই মাস। গত দুমাসে অনেক খাটুনি গেছে ওদের। রুশনারার অফিস, রেজওয়ানের ফিল্ডে কাজ – এসব তো আছেই। এর পাশাপাশি তারা দুজনে মিলে ফ্ল্যাটের টাইলস, কিচেনের ওয়ার্কটপ, বাথরুমের ফিটিংস, জানালার গ্রিল – এসব ঘুরে ঘুরে পছন্দ করেছে। দিনের পর দিন চষে বেড়িয়েছে গ্রিনরোড, স্টেডিয়াম মার্কেট আর হাতিরপুল বাজার। কোনোটা দামে মিলে তো ডিজাইন পছন্দ হয় না। আবার রেজওয়ানের পছন্দ হয় তো রুশনারার রুচিতে লাগে।  দুজনের পছন্দ হলো তো দেখা গেল দাম নাগালের বাইরে।

এসব সত্ত্বেও ওরা সবকিছু গুছিয়ে এনেছে। হয়তো আপস করতে হয়েছে কোথাও কোথাও। রেজওয়ান কিংবা রুশনারা – কোনো একজনকে হয়তো একটু ছাড় দিতে হয়েছে। অথবা হিসাবের বাইরে গিয়ে গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ। তার চেয়েও বড় কথা, গত দু-মাস ওদের দুজনের কেউই মেয়েটাকে সময় দিতে পারেনি।

কিন্তু এই পরিশ্রম আর ত্যাগের ফসল তারা তুলেছে। এক শুক্রবার ওরা ঠিক ঠিকই উঠে গেল নিজেদের ফ্ল্যাটে। রোজভ্যালির সব ফ্ল্যাট এখনো রেডি হয়নি। রেজওয়ানদের ওপরের তলার দুপাশের দুটো ফ্ল্যাটই খালি। এখনো কাজ চলছে। টুকটাক করে নিজের ফ্ল্যাটের ঘর গোছাতে গোছাতে রুশনারা প্রতিদিনই ওপরের তলায় খুটখাট কাজের শব্দ শুনতে পায়। মেশিন দিয়ে টাইলস কাটার শব্দ হয় কখনো, কখনো শোনা যায় ঘষে ঘষে কাঠ সমান করার আওয়াজ, আবার কখনো বোঝা যায় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তৈরি হচ্ছে জানালার গ্রিল।

প্রথম প্রথম একটু বিরক্ত হতো রুশনারা। পরে সে নিজেকে বুঝিয়েছে – ওরাও তো কদিন আগে এই ফ্ল্যাটে কাজ করিয়েছে, তখনো তো এই একই রকমের শব্দ হতো, অন্যেরা সহ্য করেছে তখন, এখন করতে হবে ওদের।

রেজওয়ান : এই যে সারাদিন খুটখাট খুটখাট শব্দ – আর ভাল্লাগে না।

রুশনারা : আর কটা দিন সবুর করো। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হয়ে গেলে ভালো। তখন তো সবাই চলে আসবে। তাই না?

রেজওয়ান : শুক্রবারও একটু বেলা করে ঘুমাতে পারি না। এত সকালে কাজ শুরু করার কী আছে! মানুষের একটু কমনসেন্স থাকবে না বুঝি!

রুশনারা : সবাই একটু দ্রুত কাজ শেষ করতে চাইছে।

রেজওয়ান : সিঁড়িটা দেখেছ, প্রতিদিন কেমন ময়লা হয়ে থাকে। ওপরে মাল ওঠাতে গিয়ে এই অবস্থা।

রুশনারা প্রথমদিকে এসব কথা কানে নিত না। কিন্তু ইদানীং ওরও একটু খচখচ করে। সারাদিনের অফিস, তারপর রাতের বেলায় একটু ঘর সাজানোর পর যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমাতে যায় তখনো ওপরের তলায় খুটখাট শব্দ হয়। এরপর কি আর শান্তিমতো ঘুমানো যায়!

রেজওয়ানদের পাশের ফ্ল্যাট ফাইভ/এ-তে উঠেছে ওদের মতোই ছোট্ট একটি পরিবার। ভাই এনজিওতে চাকরি করে, ভাবী গৃহিণী। ওদের দুটো সন্তান : মেয়েটির নাম রায়না, কুসুমের চেয়ে একটু বড় আর ছেলেটি সাদাফ, বয়স কয়েক মাস হবে। খুব অল্প সময়েই এই পরিবারটির সঙ্গে ওদের খাতির জমে গেছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে কুসুমের কারণে। কখনো কখনো রায়না খেলতে আসে কুসুমের কাছে, কোনোদিন কুসুম যায় ওদের ফ্ল্যাটে। ওরা পুতুল নিয়ে মিথ্যামিথ্যি সংসার সাজায়, মিথ্যা পাতিলে, ইট-কাঠের মিথ্যা আগুন দিয়ে রান্না করে মিথ্যা তরকারি, তারপর দুই ফ্ল্যাটের বড়দের ডেকে ওরা মিথ্যামিথ্যি খাওয়া-দাওয়া করে।

সেদিন ছিল আশুরার ছুটি। রেজওয়ানও বাসায়। আজ সে কোথাও যায়নি। মটরশুটি দিয়ে পোলাও রান্না করেছিল রুশনারা। কুসুম খুব পোলাও খেতে পছন্দ করে। গত কয়েকদিন ধরেই মেয়েটা পোলাও খাব পোলাও খাব বলে বায়না ধরেছিল মায়ের কাছে। কিন্তু অফিসের জন্যে সময় করতে পারেনি। এছাড়াও সকালে রেজওয়ান বাজার থেকে এনেছিল টাটকা ইলিশ। একটু একটু করে বেশিই খেয়ে ফেলেছিল রেজওয়ান। খাওয়ার পর শরীরটা বিছানায় ছেড়ে দিয়েছিল। পাশের বালিশে ছিল রুশনারা।

রেজওয়ান : তাহলে তোমার স্বপ্নটা শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো।

রুশনারা : হুম, কোনোদিন নিজেদের ফ্ল্যাট হবে – এই আশা তো আমি ছেড়েই দিয়েছিলাম।

রেজওয়ান : এখন আমার স্বপ্নটা পূরণ করো তুমি।

রুশনারা : ফ্ল্যাটের স্বপ্নটা তো তোমারও ছিল। তোমার পূরণ হয়নি?

রেজওয়ান : না, হয়নি। আমার স্বপ্ন ছিল দুটো সন্তান। আমি একটা ছেলে চেয়েছিলাম। তুমি বলতে, এই বাড়িতে না, এই বাড়িতে না, আগে আমাদের ফ্ল্যাটে উঠি, তারপর। এখন তো উঠেছি।

বাম দিকে ঘুরে ডান হাত দিয়ে রুশনারাকে জড়িয়ে ধরল রেজওয়ান। বালিশ থেকে পিছলে নিচের দিকে নেমে মুখটা রাখলেন স্ত্রীর বুকের ওপর। তিনি শুনতে পাচ্ছেন স্বামীর নিশ্বাস দ্রুত উঠছে, পড়ছে। রুশনারা বুঝতে পারলেন রেজওয়ান এখন ওকে চায়। তার শরীরও ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করল। এরকম একটা স্বপ্ন প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে ছিল রুশনারার মনেও। একদিন ওদের একটা খোলামেলা ঘর হবে, নিজেদের ঘর, প্রাইভেসি থাকবে, যেখানে ওরা দুজন দিনের আলোতেও পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়ে পারবে একজন হয়ে যেতে।

রুশনারা ফিসফিস করে বলল : এখন না রিজু। মেয়েটা জেগে আছে।

রেজওয়ান অনুনয় করল : দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আসো।

রুশনারা : এখন দরজা বন্ধ করলে মেয়েটা কী ভাববে বলো।

রেজওয়ান উলটো দিকে ঘুরে বলল : মেয়েটা একটু দুপুরবেলায় ঘুমাতে পারে না। আজকে তো ছুটির দিন। স্কুল খোলা থাকলে তো ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না।

কন্যার প্রতি কপট রাগ দেখাল পিতা রেজওয়ান। বিছানা ছেড়ে উঠে রুশনারা দেখল রাহেলা ফুল স্পিডে ফ্যান ছেড়ে টিভিরুমের মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মুখটা একেবারে কাদা। আর এই রুম সেই রুমে একা একা ঘোরাঘুরি করছে কুসুম।

রুশনারা মেয়েকে বলল : রায়নাদের বাসায় যাবে কুসুম?

জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল কুসুম : হুউম, যাব।

রুশনারা : পুতুলটা নিয়ে যাও।

কুসুম : ওক্কে।

রুশনারা : দুষ্টুমি করো না। সাদাফ ঘুমালে শব্দ করো না। ও ঘুম থেকে উঠে গেলে কান্না শুরু করবে। তখন কিন্তু খেলতে পারবে না।

কুসুম : আমি শব্দ করি না, রায়না করে।

রুশনারা : ঠিক আছে যাও, দরজাটা একটু জোরে লাগিয়ে দিও।

প্রথমে কুসুমের দৌড়ে যাওয়ার এবং তার একটু পরেই বড় দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হওয়ার শব্দ পেল রুশনারা। সে-ও বেডরুমের দরজার ছিটকিনি তুলে, জানালার পর্দাগুলো ঠিকঠাকমতো টেনে স্বামীর পাশে এসে শুয়ে পড়ল। পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল রেজওয়ানকে। রেজওয়ানও স্ত্রীর দিকে ঘুরে ডান পাশে ভর দিয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর তারা দুজনে চলে গেল এক আদিম দুপুরে।

রুশনারার যখন ঘুম ভাঙল তখন মসজিদের মাইকে আসরের আজান পড়ছে। শরীরের কাপড় ঠিক করে নিল রুশনারা। কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি। রেজওয়ান ঘুমাচ্ছে এখনো। ওর নাকের ডগায় বৃষ্টির ফোঁটার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঘুমালে ওর মুখটা দেখতে কুসুমের মতো লাগে।

রেজওয়ানের গলার কাছে একটা লম্বা দাগের মতো। রুশনারা সেটা নখ দিয়ে আঁচড় কেটে ওঠাতে চেষ্টা করল। দু-তিনবার আঁচড় কাটতেই রুশনারার নখের ভেতরটা ভরে গেল ঘাম আর শরীরের ময়লায়।

রুশনারা : এই ওঠো। কখন বিকেল হয়ে গেছে।

রেজওয়ান : আরেকটু শুয়ে থাকো না প্লিজ। আজ তো ছুটি। কাল থেকে আবার সেই দৌড়ঝাঁপ।

রুশনারা : আচ্ছা তুমি ঘুমাও। আমি পাশের ফ্ল্যাট থেকে কুসুমকে নিয়ে আসি।

রেজওয়ান : আরেকটু খেলুক না মেয়েটা। কাল থেকে তো স্কুল।

রুশনারা যেই উঠতে যাবে রেজওয়ান তার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে রাখল। আবার বালিশে মাথা ফেলে শুয়ে পড়ল রুশনারা। শুয়ে শুয়ে গল্প করল দুজনে। যেন কত দিনের জমে থাকা কথা। গল্পের বেশিরভাগ জুড়েই ছিল তাদের রোজভ্যালিতে ওঠার  কাহিনি।

রেজওয়ান : ওপরতলার লোকেরা কবে আসবে জানো কিছু?

রুশনারা : মনে হয় আগামী মাসে, পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি বলছিলেন।

রেজওয়ান : আজ মনে হয় কাজ হয়নি ওপরে। শব্দ পাচ্ছি না যে।

রুশনারা : হয়েছে তো। সারাদিনই তো আওয়াজ শুনলাম। আজ মনে হয় আশুরা বলে একটু আগেই শেষ করে দিয়েছে।

রুশনারা উঠে গিয়ে সবগুলো ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিলো। শীত আসেনি এখনো। কিন্তু সন্ধ্যার মতো একটা অন্ধকার জমে যায় মাগরিবের আগেই। হয়তো গাড়ির ধোঁয়া। ঢাকার বাতাসের এমন অবস্থা হয়েছে যে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে রাহেলাকে ডেকে তুলল রুশনারা। বলল পাশের ফ্ল্যাট থেকে কুসুমকে নিয়ে আসতে।

রাহেলা মেঝে থেকে বিছানা তুলে সেটা গুছিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে রেজওয়ানকে এক কাপ চা দিয়ে কুসুমকে যখন আনতে গেল তখন মাগরিবের আজান পড়বে পড়বে। রুশনারা একবার ভাবল কুসুমের তো নিজেই এসে পড়া উচিত ছিল এতক্ষণে। ও তো বড় হচ্ছে। রুশনারা আজকাল ওকে একটু একটু করে ছেড়ে দিতে শুরু করেছে। প্রতিটি পাখিকেই তো একদিন নীড় ছেড়ে চলে যেতে দিতে হয়। না হলে তো সে উড়তে শিখবে না কোনোদিন।

রাহেলা : আফা, কুসুম তো হেই বাসায় নাই।

রুশনারা : কোন বাসায় গেছিলি তুই?

রাহেলা : রায়নাগো ফ্ল্যাটে।

রুশনারা : তুই মনে অয় এহনো ঘুমাইতে আছোস রাহেলা। চোখ খুইলা দেখ।

রাহেলা : ভাবিরে কইলাম, কুসুমরে নিতে আইছি। আফায় পাডাইছে। ভাবি কইলো রায়না বাসাত নাই। ওর বাপের লগে কই বলে গেছে।

দ্রুত ছুটে গিয়ে রুশনারা পাশের ফ্ল্যাটের ডোরবেলে তিনবার চাপ দিলে ভাবি এসে দরজা খুলে দিলেন। রুশনারা হাসতে হাসতে বললেন : ভাবি, আপনি মনে হয় রাহেলার সঙ্গে একটু মজা করলেন।

ভাবি : না ভাবি, কেন কী হয়েছে?

রুশনারা : কুসুম তো আপনাদের ফ্ল্যাটে গেল।

ভাবি : কখন?

রুশনারা : এই তো, দুপুরের একটু পর।

ভাবি : না না, আমাদের এখানে তো ও আসেনি। রায়নারে নিয়ে ওর বাবা তো তার এক ভাইরে দেখতে ঢাকা মেডিক্যালে গেছে।

রুশনারা অস্থির হয়ে গেল : কী বলতেছেন ভাবি, তাহলে আমার কুসুম কই গেল?

ভাবি : অস্থির হইয়েন না। হয়তো নিচে খেলতেছে।

পার্কিং এরিয়া সুনসান। কাউকে পাওয়া গেল না সেখানে। কেয়ারটেকার ও গার্ড বলল, কুসুমকে ওরা দেখেনি। যেসব বাচ্চা খেলছিল তারাও অনেক আগে যার যার ফ্ল্যাটে চলে গেছে। গার্ড সামনের রাস্তায় এগিয়েও কুসুমকে খুঁজে এলো। রুশনারা কী করবে বুঝতে পারছিল না। দৌড়ে চলে গেল নিজের ফ্ল্যাটে। চিৎকার করে রেজওয়ানকে ডেকে তুলল। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে আরো যে দু-তিনটা ফ্ল্যাটে লোক উঠেছে তাদের পরিবারের বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করল তারা কেউ কুসুমকে কোথাও দেখেছে কি না। সবাই চুপ করে রইল, কেউ কিছু বলতে পারল না।

এশার পরেও কুসুমের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। রেজওয়ান ও রুশনারা প্রথমে তাদের ফ্ল্যাটের সবকটা ঘর, বাথরুম, বারান্দা, কিচেন, ওয়ারড্রোব, দরজার পেছনে, স্টোররুম – সবখানে তন্নতন্ন করে খুঁজল। এমনকি জানালার কার্নিশেও উঁকি দিয়ে দেখল তারা। তারপর রোজভ্যালির চারপাশে, ময়লা ফেলার ডাস্টবিনে, কেয়ারটেকারের কক্ষে, গার্ডরুমে, সিঁড়ির কোনায়, লিফটের ভেতরে, পার্ক করা গাড়ির নিচে – সবখানেই খুঁজল। ছাদের ওপর পানির ট্যাংকের নিচে ফুলছাপ একটা কাপড় দেখে তার ওপর উপুড় হয়ে পড়ল রুশনারা। তার মনে হলো কাপড়টা কুসুমের একটা জামার মতো। ছয়তলার যে দুটো ফ্ল্যাটে কাজ হচ্ছিল সেখানেও খুঁজে দেখল তারা। অন্ধকারের জন্যে ভালো দেখা গেল না। টর্চলাইটের আলোতে তারা দেখল মেঝের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কাচ, বিদ্যুতের তার, ভেজা সিমেন্ট, ওয়েল্ডিং মেশিন।

রোজভ্যালির চৌহদ্দির ভেতরে যখন কুসুমের কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না, রেজওয়ান একা একা একটু দূরের রাস্তাতেও ঘুরে এলো। রাত বাড়তে থাকায় এখন গাড়ি কম। দুজন পুলিশ বন্দুক নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে।

কিছুক্ষণ পর শুরু হলো তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতে রেজওয়ান ফিরে এলো বাড়িতে। বুঝতে পারছিল না কুসুমকে সে আর কোথায় কোথায় খুঁজবে। এরকম বৃষ্টির রাতে মেয়েটা এখন কোথায় কীভাবে আছে ভেবে রেজওয়ানের বুকটা ফেটে যেতে চাইল। অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকেরাও তাদের বাসায় ভিড় করেছে। সিটিংরুমে কোনো জায়গা নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে-বসে কেউ বলল থানায় পুলিশকে রিপোর্ট করতে, কেউ বলল হাসপাতালে খোঁজ নিতে, আবার কেউ বলল ঢাকায় যেসব আত্মীয়স্বজন আছে তাদের জানাতে। রেজওয়ান এর মধ্যেই একবার তার স্ত্রীর খোঁজ নিতে গেল বেডরুমে। সেখানেও গিজগিজ করছে মহিলারা। বিছানার ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে রুশনারা। একবার জ্ঞান আসে। আবার যায় চলে।

সারারাত ধরে রোজভ্যালির বাইরে চলল ঝড়বৃষ্টির তাণ্ডব। আর ইট-কাঠ-পাথরের ভবনটির ভেতরে দীর্ঘশ্বাস, শোক, অবিশ্বাস, জিজ্ঞাসা, আতঙ্ক – সবকিছু একসঙ্গে রইল জটবেঁধে। ভোরের দিকে খোঁজ পাওয়া গেল কুসুমের। কোথায়? ঠিক ওপরের অসমাপ্ত ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটের কোথায়? রেজওয়ান তো ওখানে রাতে খুঁজে দেখেছে? যেখানে কিচেন হবে সেখানে। কিচেনের কোথায়? গ্যাসের চুলার নিচে ড্রয়ার বসানোর যে জায়গাটা তার ভেতরে। ওখানে কী করছে কুসুম? শুয়ে আছে, দলা পাকিয়ে।

ওপরের ফ্ল্যাটে দৌড়ে গেল রেজওয়ান, তার পেছনে ছুটল রুশনারাও। এই কুসুমই তো ওদের জীবনের সব। জীবনের গভীর সুখ, গভীর দুঃখ, পাওয়া, না পাওয়া – সবই তো এই কুসুমের জন্যে।

রক্তাক্ত কুসুম পড়েছিল কিচেনের এবড়োখেবড়ো মেঝের ওপর, ওর রক্তে ভিজে কালো হয়ে গেছে লাল ইট। অর্ধেক শরীরটা দেয়ালে হেলান দিয়ে আর বাকি অর্ধেকটা মেঝের ওপর এমনভাবে পড়ে আছে যেন কেউ ওখানে তাকে ঠেসে ধরেছিল। ওকে দেখে মনে হয় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখা একখানা পুতুল। কোমরের নিচ থেকে দুটো কোমল পা নগ্ন। ডান পায়ের হাঁটুর নিচে পুড়ে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন। সুতির নীল হাফপ্যান্টটা দলা পাকিয়ে পড়ে আছে অদূরে, তার পাশে রাংতা দিয়ে মোড়ানো একখানা ললিপপ। কুসুমের তলপেটের ওখান থেকে রক্তের চিকন একটা স্রোত গড়িয়ে চলে গেছে জানালা বরাবর। জানালায় ফ্রেম লাগানো হয়নি এখনো। ফলে বাইরে থেকে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়েছে জমাট বেঁধে যাওয়া রক্তের ওপর। আর একদল পিপড়া সারিবেঁধে রক্তস্রোত বেয়ে বেয়ে এগিয়ে চলেছে কুসুমের দিকে।

Leave a Reply