রোদপাখি

লেখক:

শরদিন্দু সাহা

আমি ছিলাম না, এ-কথা কার এত বুকের পাটা আছে যে বলবে! বারান্দার পিলার ছুঁয়ে একতলায় বন্যার ঘরে চুমু খেয়ে সিঁড়িগুলোকে জাপটে ধরেছিলাম কতদিন। পিংপং বলের মতো একটু-আধটু না-হয় খেলতে চাইছিলাম বটে; কিন্তু সে আর কি বেশিক্ষণ খেলার জো ছিল? দোতলায় বড় কর্তার ঘরে গিয়ে ঢুঁ মারলে সে কী গোস্সা! আমের ডালটা না-হয় এসে দেয়ালে কোলাকুলি সারছিলই, তাই বলে কি এত কথার ব্যোম ফাটানো। ব্যোম না-হয় তুবড়ি – ছ্ র্ র্ ছ্ র্ র্ । এপাশ-ওপাশ, বড়-ছোট-মেজ-সেজ দেখার কি মাথার দিব্যি দিয়েছে কেউ তবে।
দেয়নি যখন, জোরে আরো জোরে পা চালাতে হবে। আহাঃ, এমন আমার তেজ কস্মিনকালেও কেউ দেখেনি। বন্যা দেখতে চেয়েছিল সেই তেজ। আর দেখবে বলেই না তার এতদূর পথ পার হয়ে চলে আসা। বিমানবন্দর থেকে নেমেই ওয়েলকাম প্ল্যাকার্ডগুলো উপেক্ষা করেই শাটল ট্যাক্সিতে চেপে বসা। ছেঁকা খেয়েছিল বলেই না ও…। কত কিছুই তো পালটায়। ছোট-ছোট রাস্তা চওড়া হয়। বড় রাস্তাগুলো এঁকেবেঁকে নানাদিকে চলে যায়। তাই বলে কি পথ খোঁজা শেষ হয়। কাচের ফাঁকফোকরে তাই তো পথ খোঁজা বন্যার – ঝাপসা। ধোঁয়াশা, বিষণ্ণ এই পথ। আঙুলটা চেপে ধরে কাচের মধ্যে গলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সোঁ-সোঁ করে শনশনে বাতাস। হাওয়ার এই চলাফেরায় বন্যা ভাবনার তরঙ্গগুলোকে ওলটপালট হতে দেখলে বুঁদ হয়ে বসে থাকে। শুকনো মুখ, পুরনো কাঁটা-কাঁটা।
মায়ের মুখটা আসে আর যায় বারবার। শেষবারের মতো যখন দেখেছিল – কতই বা বয়স। মায়াভরা মুখ, টানটান। সিঁথিতে সিঁদুর – জ্বলজ্বল, রাঙাজবা। একফালি আলো এসে পড়েছিল – সোনা-সোনা, হলুদ-হলুদ, লাল-লাল। মুখটা ফিরিয়ে নিয়েছিল শেষবারের মতো বন্যা। ভেজা-ভেজা চোখে চিন্তার স্রোত।
কেন ভিজে উঠেছে বন্যার চোখ? আহাঃ কতটা সময়। গাছের পাতাগুলো ধুলো খেয়ে নিস্তেজ বিবর্ণ হয়ে আছে। কেইবা আবার কোনোদিন গাছটা ঝাঁকিয়ে ধুলো উড়িয়ে দিয়ে গোড়াতে জল ঢেলে বলবে – ওহে, একবার জেগে ওঠো তো! শ্বাস-প্রশ্বাসটা খোলামেলাই তো ছিল সেদিন, বেতাল হয়নি একটুও। কেন যে আসছে ধোঁয়ার গন্ধ, ভার-ভার? মুখ ফসকেই বেরিয়ে যায় বন্যার – নোংরা-নোংরা, ছিঃ ছিঃ … এমনও করতে পারে সবাই?
গাড়ির কাঁটাটা ঊর্ধ্বমুখী হতেই চাকার সামনেই মানুষের বাচ্চা। বন্যা ঘাবড়ে না গিয়ে এ-কথা সে-কথার জালে জড়িয়ে নিতে চায়। বুড়ো আঙুল দেখায়, খিস্তিখাস্তা করে – কাঁচকলা।
তার মানে?
মানে ভেবে নিন – জাদু, সব ভেলকি।
‘কোথায় যে গেল ছেলেটা – অদ্ভুত। কার যেন মুখ বসিয়ে দেওয়া।’ বন্যা অস্থির হয়। ঠিক দেখেছে তো!
আমি ঠিকই চিনতে পেরেছিলাম। এরকম কতই তো, ছাঁচে ফেলা। কত লম্বা সময়।

লম্বালম্বি ছাদ। নারকেলের ডালটা উবুড় হয়ে ছিল। পাতার আড়ালে-আবডালে বড় ভালো লেগেছিল। ভাগ্যিস বন্যার মা ডেকেছিল – মা, নেমে আয়।
জড়িয়ে ধরতে তো চেয়েছিল আমাকে – পারেনি। কী করে বুঝবে জড়িয়ে ধরার জ্বালা। বড্ড বাহাত্তুরে কিনা আমি। ভয় কিনা আত্মীয়তায়। চিৎকার করে বলেছিল, মা, এক টুকরো রোদ দাও না, বাড়ি-ঘরদোর চিনতে কী পারা যায় না হয়? এমনিতেই চোখের মণিটা…।
সেদিন রাতেই দয়মন্তি চুপিচুপি দাদাকে বলেছিল – মেয়েটাকে নিয়ে কী করি দাদা? কত কিছুই না জানতে-বুঝতে চায়। বড্ড প্রশ্ন করে।
বন্যাকে নিয়ে তোর এত দম-আটকানো চিন্তা!
ও তুমি বুঝবে না – মার কষ্ট বড় কষ্ট। কেন যে এত রোদ খাওয়ার শখ?
দয়মন্তির চিন্তার পারদটা চড়তে দেখলে বন্যা খুশিতে ডগমগ হয়ে হাত-পা কুঁচকে ফেলে – মা-টা রাত-দিন শুধু এই না সেই। ভালো করে তুলবে, মানুষ করবে – এটা কী পাগলামি? একটু বাড়াবাড়ি করলেই দাঁত-মুখ খিঁচে ঝাঁটা উঁচিয়ে – গন্ডমূর্খ, এখনই পাল্লা দিতে চাও, আরো তো দিন পড়ে। এই দেখো – রোদটা মেঝেতে কেমন লেপটে আছে – কী মজা!
ধরা কি যায় আমাকে?
কল্পনার চাকরিতে মনটাকে বন্দি করে মাকে ডাকে – রোদ্দুরের রং কী, জানো? নিজের মনেই বিড়বিড় – ভাঙাচোরা, অাঁকাবাঁকা, ডা-বাঁ – এক টুকরো হীরে।

দুই
মনের আগুনে পুড়ে ছাই হতে কে আর চায়। মনটা আমার হু-হু করে। ডেকে বললাম, আমাকে একটা আকার দিতে পারো? এমন করে কেউ যাতে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। তবে আর উপায় কী! হতাশ হয়ে বন্যার দিকে একঝলক। ঝুপ করে এক ঝরনা জল ছড়িয়ে ভেজানো ধুলোয় পিরামিড হয়ে উড়িয়ে নিতে চাইলে আমার অনিচ্ছাকৃত ডুবে যাওয়া। গোমড়ামুখো হয়ে বন্যা কেন জানি জলের নাচন দেখে। জোড়া-জোড়া রং থাকে অধরাই। দূরে চলে যেতে চাই অন্য কোথায়। ততক্ষণে আমি আলাদা হয়ে ছিটকে গিয়ে পর্দার আড়ালে দরজার পর্দায় বৃত্ত হয়ে যাই। কতদিন যে হয়ে গেলো অন্তরার সঙ্গে দেখা হয় না। বন্যা ডেকে ডেকে থ হয়ে যায় – কী হলো? এত বইপোকা হয়ে কী হবে? পাতাগুলো চিবিয়ে খাবি নাকি?
প্রশ্নগুলো আমায় না করে মাকে করলেই তো পারিস দিদি।
ধুস্, কোনদিকে যে যাচ্ছি আমরা?
তোদের সময়টা ভালোই তো ছিল রে।
সময়টার কতটাই আর ফারাক কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সবকিছু…
তবু তোর একটা হিল্লে হলো, আমার যে কী হবে?
অন্ধকারের অপেক্ষায় আমার হাহুতাশ। তবু। লুকোচুরি খেলবে বলেই না সাতসকালে বন্যার চোখ কচলে নেওয়া। অদ্ভুত পালাবদল। হাবুডুবু খেতে চেয়ে রংগুলো ডানা মেলে ছটফট। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আমার অনিয়মিত ঘোরাফেরায় অসন্তোষের ছায়াপাত। কুট্টিভাইটা হাত-পা ছুড়ে আপনমনে জলছবি করলে শরীরটা আমার শূন্যে দাগ লাগিয়ে ভাঙতে শুরু করে। ওই তো সোনালি রংটার জলরঙে গলাগলি। বারান্দার মেটে রংটাও নাচতে চায় সমানতালে।
কিই-বা করার আছে আমার? শোক-দুঃখ শুধু বন্যার, আমার নয়? সাতসকালে নাই-বা দেখল। কিন্তু কখন যে আমার শরীর ফুঁড়ে কথা বেরিয়ে এসেছিল অনেক।
দেখতে পেলি ভাই?
কী?
ওই যে ছায়ার উলটোপিঠে এক মুঠো আলো।
আমি প্রাণভরে হাসলাম।
ভাইটার এক টুকরো অস্বস্তি নিয়ে কান্না-কান্না মুখ। মা মেরেছে। লাঠিপেটা। গড়গড়িয়ে জল।
ফোলানো মুখে চোখ কচলিয়ে দিশাহারা হয়ে – অভিযোগের কথা চালাচালি। দিদি-ভাই দুহাতে কোমর জড়িয়ে অনেকক্ষণ – বলবি না কিছু, বলতে তোকে হবেই।
আমি ততক্ষণে ড্রয়িংরুম ছেড়ে রাস্তায়। বন্যার ছোটাছুটি। কী বলবে এখন? লম্বা নালিশের ফিরিস্তি।
বন্যা ঘরের জানালাগুলো খোলার মনস্থ করে। ফটাফট। হুকটা নিচ থেকে সরে গেলে আরশোলাটা চোখ পাকিয়ে তাকায় কটমট।
ঘরের কাজকর্ম ছেড়ে এখানে কী করছ? বড্ড সব পাগলামি।
এত যে গুমোট, আমার ছটফটানি কী আর থামে? বাপরে বাপ। দম-আটকানো বাতাসে চুলগুলো দেদার ডানে-বাঁয়ে। বন্যার শরীরে কত কথা। চুলগুলো ছিঁড়বে নাকি? মাথাটা না ঝোঁকালে চলছিল না। কোথায় সামনের দিকে তাকাবে, না মরার কল করছে।
মা, একটুখানি রোদ্দুর দেখলাম, উবে গেল বুঝি।
ওই তো বারান্দায় – অঢেল রোদ্দুর।
তোর কী হয়েছে, বল তো?
জানি না।
কোথায় রোদ্দুর?
বারান্দায়?
ফ্যাকাসে, রংচং নেই, এ আবার রোদ্দুর হয় নাকি!
কীরকম হবে, তবে?
টেবিলেলের ওপর ঘুরপাক খায় আরেকটা মাকড়সা। বোঝাই করা বই বাড়তেই এক মস্ত বড় উদ্বেগ। বাবা, এত! দয়মন্তি শান্ত চুপ। প্রতিক্রিয়ায় নিরুত্তাপ। চঞ্চলতা বাড়ে বন্যার। ফাঁকফোকরে আমার জায়গাটা ছোট। ক্রমশ কোণঠাসা। দুটো চোখ খুলে কতভাবেই না পাওয়া। ঠক করে নড়েচড়ে ওঠে টেবিলটা। বইগুলো খলবল করে।
দয়মন্তি চিৎকারে গলা ফাটায়। নীরবতা ভেঙে টুকরো-টাকরা হয়ে খানখান।
ঘুমে ঢলে পড়ে বন্যা।
কী রে এতক্ষণ ধরে মুখ গুঁজে কী পড়ে যাচ্ছিস? এতক্ষণেও কিছু হলো না বুঝি! কবে আর হবে? বুঝেছি, কপালে আছে ডেগ মাস্টারি, আমি আর কী করব? … এভাবে চললে এক থেকে দশের মধ্যে, কক্ষণও না। লবডঙ্কা হবে। ডোরে-ডোরে ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে ঘুরে মরবি। পুছবে না কেউ।
মাথাটা ভার হয়। গিলে নেয় সবকিছু বন্যা। বইয়ের পাতাটা ওলটালে শব্দগুলো গিজগিজ করে। তবু।
এবারও মুখস্থ না হলে অঙ্কটা কখন!… কুড়িটা, সময় সাড়ে দশটা। এগারটা – পলাশ স্যার … কেমিস্ট্রি, অমলেন্দু স্যার – সাড়ে বারোটা থেকে তিনটে… ট্রেন বাস-রিকশা-ট্রাম।
মা যাব না?
বরাদ্দ – পনেরো মিনিট – স্নান-খাওয়া।
ডেন ব্রাউনের বইটা পড়ব না তাহলে – দ্য লস্ট সিম্বল? দ্য ভিঞ্চি কোড?
বলেছি না কতবার – নো।
বাংলাটা বরঞ্চ ফাঁকতালে। না হলে গোল্লা, বিগ জিরো।
আসে না আমার মোটেই।
অভিযোগের বহর তো কম নয়। রাগটা বাড়ছে বন্যার। না পারাটা অপরাধ! চিন্তাটা নিয়ে ঝিমোয়। আমি ওর মুখের এক কোণে মিশে গিয়ে দম নিয়ে নিই। স্পর্শর খুশি চঞ্চল করে তুললে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। আবার কী করে ফিরে আসব আমি এ-অসময়ে? এত ডাকাডাকি। হই-হুল্লোড়। কেউ যদি চিনে ফেলে। বলেই যদি দেয় – লজ্জা-শরমের বালাই নেই?
আমি নাচতেই থাকি। গুম হয়ে যাব বলেই না। এতক্ষণে না-হয় গলা জাপটে দুগালে দুটো চুমু খেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে লম্বা হয়ে বিছানায়। বিছানাটা জ্যান্ত হয়ে যায়। বন্যা কখন যে গা এলিয়ে দেবে।
গাড়িটা ততটা গতিতে ছোটেনি। বন্যা মাথাটা ঝুঁকিয়ে দেয়।
কী হে আর কতক্ষণ?
সোঁ-সোঁ, সাঁই-সাঁই… বাতাস-ধুলো, কালো কালো ধোঁয়া – অাঁধার।
ক্লাসরুম! ল্যাম্পপোস্টের আলো। জল্লাদ কি-না, কোথায় স্যার! থমথমে।
কী হতে পারে?
স্ট্যান্ড আপ।
পারব না স্যার।
অত গা-ঘেঁষাঘেঁষি, গলাগলি, অতগুলো টাকা ঢালছে গার্জিয়ানরা।
আর তোমরা!
টিউশন পড়ে নেবো, স্যার।
স্যার গলে জল হয় – এসো কিন্তু।
প্রশ্নটা আউট হয়ে গেলো, অত খেটে। ও তো আমার প্রাইভেট টিউটর নয়। বললেই বা কেন?
তুই দিবি রে নোটগুলো?
বন্যা ক্লাসরুম থেকে বেরোয়। অন্ধকারের ছায়াটা খাবলে নিতে থাকে ওর ইচ্ছেগুলোকে। আলোটা আসে আর যায় দ্রুত। ধরা তো দেয় না। শ্বাস। আরো লম্বা করে। আমি পাশ কাটালেও বন্যা হন্যে হয়ে খোঁজে। কতদিন ধরেই না ওর দেখার ইচ্ছেটা…

বন্যা দ্রুত ফিরছে। মনের ধন্দ মেটেনি। আমার অস্তিত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন। কেন যে আবার হোঁচট খেলো? বিশ্বায়নের ভূত! আমি ফ্যাকাসে। লুটোপুটি খাই। ভাঙতে থাকে কণাগুলো।
মা বলল, ‘বেটি, কতদিন আর রোদপাখির গল্প শোনাবি?’
স্কুলের দেয়ালে ফাটলটা লম্বালম্বি এসে বন্ধুদের ছুঁলো।
বাবা বলল, আজ ষাঁড়ের গুঁতো খেয়েছি – বীভৎস! রক্তের ফোঁটা ছিটকে এসে দেয়ালে।
বন্যার কিছুই করার ছিল না। মশারিটা নড়েচড়ে উঠল। মশার ভ্যানভ্যানানি!
অসহ্য! ভাবলো, পালিয়ে বাঁচি।
কোথায় পথ? ড্রাইভারটা তাহলে ইচ্ছে করে…।
বাড়িটা ভেঙে টুকরো-টুকরো। রাস্তার দুপাশে এমনিতেই ঘন হয়ে পড়া শুরু হলো, তার শেষ কোথায়? চোখে সর্ষে ফুল।
মা – অত চাপ! অত মার্কস।
কাজে আসবে কোনো একদিন।
কিছু একটা করতে তো হবেই। তাহলে অত টাকা-টাকা কেন?
প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা ছিল না। শেয়ার করব। দেখিনি চারপাশে কাউকে। এক ঝলক টিউবের আলো। ভরল না মন। চার-পাঁচটা মাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। চোরপোরেশনের ঢিবি। বনবন। একরাশ বিরক্তি।
পিষে মারতে পারলে বেঁচে যায়। দশ-বারোটা পাক মেরে। দিনের বেলাতেই এত … জন্মায় লাগামছাড়া … মরে আর কত! জন্ম আর মৃত্যু – দুসময়ে দুরকমের বন্দোবস্ত, ভরাট করা যায় না এ-ভরদুপুরে। রেলিং মেপে ধরে-ধরে পা ফেলে-ফেলে যাওয়া। দেখছিলাম কান্ডখানা। ছায়ারা জায়গা করে নিতে চায় বলে হেলে-পড়া সূর্যের দম হাঁসফাঁস। বন্যা মুখ গুঁজে বসে পড়ে।
ব্রেকটা কষতেই রাস্তাটা যেন দুফাঁক হয়ে দুদিকে।
কোথায় যাচ্ছ, তুমি?
কোথায় আর, জাহান্নামে।
আশ্চর্য! না ভাবা, না চিন্তা। কেউ এমন করে পছন্দ-অপছন্দ, ঠিক-বেঠিক যাচাই করে?
কতক্ষণে? কোন পথে? আমার এক সর্ষে আলো সূর্য থেকে সোজা বাঁক খেতে খেতে … প্রশ্নটা যেন করেই ফেলল … এ-মুখো হয়নি, তাও তো কম দিন হলো না … কত বড়, এত্ত বড় … টাকা-পয়সা, বাড়িঘর, ঠাঁটবাট … রইস আদমি … টাকা উড়ছে বুঝি … অভাব-অভিযোগ ম্যানহাটান, ব্রিসবেন … লং ড্রাইভ …
অল্পেতেই ড্রাইভারটা … দেখেও দেখছো না?
ড্রাইভারের কী! তোমার চোখে ধাঁধা। চেনা পথ। তবু গুলোচ্ছ।
ইজ ইট! তোমাকে চিনি কি!
চিনতে চেয়েছো। পারোনি।
কোথায় ছিলে?
তোমার ওই জার্নালের ভেতরে লুকিয়েছিলাম।
কী যে বলো, এত নড়াচড়া।
এবার সামনে তাকাও। পথটা কেমন?
তামাটে! ধুলোর পাহাড়। দুচারটা কাঁকড়া-বিছে। মাথাভাঙা পিলার। আয়লা উড়ে উড়ে আসছে – ষাড়ের মুন্ডু। সাইনবোর্ড। মগডাল। কাচের টুকরো ঝন্ঝন্।
আরো ভালো করে তাকাও।
কান্নার শব্দ। মানুষগুলো সব কাঁদছে। কেন যে কাঁদছে?… ঠাকুমা। পাড়াসুদ্ধ মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে – চেনা বাড়ি। প্রাচীর ঘেরা। কাগজি লেবু – বারান্দার দুধারে। পেটটা চেপে যন্ত্রণা যেন ঠেলে বেরোচ্ছে। চুলগুলো – এলোমেলো ধবধবে সাদা। চোখটা ভিজে উঠল, আর সবারই চোখগুলো না ভিজে গিয়ে যাচ্ছেতাই। দুচারটে কুকুর বেড়াল, বুক ফাটিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে কান্না – এ-জনমে শেষ হবার নয় – দুঃসময়। বাড়ির ছাদে বেল পড়ার শব্দ হলো বুঝি, এ সময়ে। বড় বেয়াদব সময়, সুযোগসন্ধানী।
আমি বন্যাকে কত কী প্রশ্ন করলেও ভ্রু কুঁচকে চোখটাকে নাচিয়ে চুলগুলো দু-আঙুলের ফাঁকে জট পাকিয়ে কত কিছুই না খোঁজে।
আর একটু এগিয়ে চলো। মাথা ঝিমঝিম করছে বুঝি।… তবে! রাগ, আগুনে রাগ। নিজেকে সামলাও। সামলিয়ে জীবনটাকে দেখো।

তিন
ট্রেন। লম্বা প্লাটফরম। ১২ বগির আয়োজন। হাজার-হাজার মানুষ। মুখে একগাল দাঁড়ি। হিন্দু ঘরের বউঝিরা ছেলেমেয়ের হাত ছেড়ে খোলা মনে। মুসলিম বউরা বোরখার আড়াল আর না-বোরখার মাঝে কথাকাটাকাটি। পিঠে ব্যাগভর্তি খাতা-বই পেনসিল বড়-বড় ডিগ্রির দম আটকানো স্বপ্ন। কুলি-কামিন। মুটে-মজুর, রাজমিস্ত্রি, জোগালি-সুন্দরবন-লক্ষ্মী-ক্যানিং-ডায়মন্ড থেকে দলে-দলে। ভিড়ে ঠাসাঠাসি। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়।
পঙ্গপালের দল ঢোকে। শহরের গর্ভে – ঝুপ। খবরের কাগজের হেডলাইন – মুজিবকন্যার সিংহাসন দখল – সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-বুদ্ধদেব-মমতা-জমি আর জমি-দখল-বেদখল-টাটাবাবু-নবীন পট্টনায়ক-মিত্তাল স্টিল-জমি আন্দোলন-বাংলা আর উড়িষ্যা-বাংলাদেশ হাসিনা-চুক্তি ইনফ্রাস্ট্রাকচার-সিভিল সোসাইটি-মিছিল-মায়োয়িস্ট-সন্ত্রাসী-ওবামা-পরিবর্তন…
বন্যা এবার নিজের দিকে দেখো। ঘর দেখো, বাড়ি দেখো, আরো নিজের মানুষ দেখো, পরের মানুষ দেখো, যত খুশি দেখো, মনভরে দেখো।
বন্যা দেখছে। দেখার চোখটা পালটাচ্ছে।
ড্রাইভার।
বলুন দিদি।
পথ ভুল করছো না তো? আর কত সময় লাগবে?
কোথায় যাবেন, সে তো বলেননি দিদি?
তাই বলে তুমি জিজ্ঞেস করবে কিনা।
সব পথই অচেনা ঠেকছে।
এত পথ সব বাইপাস করলে কেমন করে চেনা লাগবে দিদি?
তুমি চিত্রাগঞ্জ চেনো?
কোন চিত্রাগঞ্জ?
চবিবশ পরগনা-দক্ষিণ-গঙ্গার ধার-সিমেন্ট বাঁধানো ঘাট-শ্মশান-মন্দির।
এত সহজে চেনা যাবে না, দিদি।
বন্যা সত্যিই চিনতে পারছে না। ও একটা ব্রেইনলেস। গোবরপোড়া। এতগুলো বছর শুধু আমাকেই খুঁজল। অথচ… রাস্তাটা একটু একটু করে যেন চেনা মনে হতে থাকে। আলোটা আমার শরীর থেকে বেরিয়ে ডানে-বাঁয়ে লুটিয়ে পড়ছে কিনা।
লোকগুলো অস্থির। উন্মাদনায় বেপথু হয়ে কেমন গোসা করে বসে আছে। এক্ষুনি ফেটে পড়লে ঘটবে বিস্ফোরণ। উঃ শব্দের কী জ্বালা। এটা কুকর্ম নয় বলছো?
তেতো সময়ে এমনটা হয়ে থাকে। গোপন ষড়যন্ত্র। হিসেব-নিকেশ। ফিসফিস ফুসফাস।
এতোটা সময়। কল্পনায়ও ছিল না, ঘুণাক্ষরে।
কোন পথে যাবেন বলুন তো? পথটা ক্যামন চটচটে পিচ্ছিল, ভয়ডর নেই লোকটার। নির্বিকার।
বন্যার সব ঘোলাটে লাগে।
আমাকে কতভাবেই না ও চিনতে চেয়েছিল। চিন দিলে তো! কত যে রং পালটে যায় আমার। ছাদ থেকে লাফিয়ে-লাফিয়ে নিচে নামে। কী অদ্ভুত সেই রং। বন্যা বুঝতে পারে না কেমন করে এত লুকোচুরি খেলে পথচলা। সময়ের দাপটে সমস্যাটা তো কম ছিল না।
থামটা এত আড়াআড়ি পড়ে। কথার খই ফুটছে অবস্থা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না যে। গমগম। রক্তচোখ। অভিযোগ ঝুরিঝুরি – মশাই এভাবে চলে? রাস্তা বেহাল। জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বগামী। মিটিং-মিছিল-লোক ঠকানো-বকবাস। ভোট বাক্সে-ফলস।
ড্রাইভার ব্রেক কষে মাথাটা স্টিয়ারিংয়ে নিয়ে ঘোঁৎ ঘোঁৎ।
আর কতদূর?
গোদের ওপর বিষফোঁড়া – খোঁড়া।… মিছিল সরলে ট্রাফিকের খপ্পরে। কালো কুচকুচে, বাঁ হাতটা উলটো করে ভাঁজ করা।
আহাঃ, এমন করে বিসর্জন না দিলেই নয়। ওরা বড়ই গোঁফ-খেজুরে। সময়ের ত্রেরাত্র শ্রাদ্ধ করে এত কান্ডকারখানা। বুকফাটা কষ্টে এতটা উল্লাস! কে জানে মানুষের কোন প্রকাশটা ঠিক? সংস্কৃতির কোন সেতু গড়ে রূপ পালটাতে চায়। মানুষ কী এইভাবে পালটে যায়? জুড়তে গিয়ে কত যে পিছল খায়। ভুল করেই বলে ফেলে – এ আমার! যাকে আমার বলে আপন করতে পারতো তাকেই বলে কিনা ফোট্। চলবে না এ-পথে, অন্যপথ দেখো।
ঢাকঢোল কাঁসরের শব্দ – বন্যা দুকানে আঙুল দিয়ে চোখ বোজে। ভেবেছিল কতই না কী – গোছালো, পরিমিত, মিষ্টিভাষী। আমি জানি – বন্যা আমার কাছে পৌঁছবে বলেই না ও গর্ব করে বলেছে, ‘চলো না আমার ঘরে চলো, রোদপাখি দেখেছো কখনো? দেখাবো, ওই তো আমার চিরকালের বন্ধু।’ আমি এমনই, ওকে ছুঁয়ে বলতে পারছি না যে আমি আছি। কোলাকুলি করে দুগালে চুমু খাই। দেখতে পাই বন্যার বেড়ে ওঠা। কিন্তু কেউই যে আমাকে কোনোদিন ওকে আমার কাছে আসতে দেয়নি। কী করে দেবে? আমার ঠিকানা ও-ই তো জানত। আমি জানি কত কষ্ট বুকে করে ও এতদিন পরে…
গাড়িটা ঘোরাতেই কানফাটা আওয়াজে তালা লাগে – এরা কারা? কেন এমন করছে?
সন্ত্রাসবাদী! দিনদুপুরে মানুষ মারার দল।
খুন আর খুন করার ছল। শরীরের অঙ্গগুলো অকেজো করে দেওয়া। কী সাংঘাতিক! ওরা পারে!
ওরা সব পারে। উল্লাসে মত্ত হয়ে পতাকা হাতে নাচতে-নাচতে উলঙ্গ হতে পারে ওরা।
কী হলো, কথা কানে যাচ্ছে না দিদিভাই।
যাওয়া চলবে না। পারমিশান দেবো না আমরা, এ এলাকা আমাদের। কোনো মায়ের লাল নেই নড়চড় করে।
বন্যার মুখটা ফ্যাকাসে। দেশটা ভেতরে বাহিরে সব দিকেই…। চেনা মুখে অচেনা কথা। কোথায় এদের ঘর? এরা কোনোদিন রোদপাখির খোঁজ করেনি বোধহয়।
কে রোদপাখি? ওসব পাখিটাখি এদেশে নেই ম্যাম। থাকলেও এখন যাওয়া চলবে না। সব পাখি এখন খাঁচায় আটকানো। ডানা মেলতে দিলেই যে পথের কাঁটা হবে। আগেই তাই খাল্লাস।
বন্যার দুচোখ দিয়ে জল গড়ায় – টস্ টস্ ।
ম্যাডাম ওরা কাউকে চেনে না?
নিজের দেশকেও না!
পাগল। তাহলেই হয়েছিল।
চেপে যান। ডানাগুলো কেটে পালক ওড়াবে আকাশে। তারপর দুহাত তুলে বলবে – মাইরি, ক্যামন দিলাম?

সামনে ওটা কী?
চোখটা কচলে নিল বন্যা।
কত বড়-বড় ইমারত – বট ডুমুর, গিরগিটি, গেছোসাপ। লেজ নাচিয়ে দুরদুর করে মগডালে। রংটা এই আসে এই যায়। চুপ মেরে বসেছিল এতক্ষণ। ধুলোর তুফানটা চাকা হতে বাতাসে ঢোকে। এলোপাতাড়ি ঘুরেফিরে শরীরের সামনে এসে হাঁকপাঁক করে। বন্যার দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে দূরে যেতে থাকে সব কল্পনার ফাঁদ।
ড্রাইভার সবকিছু এত অন্ধকার কেন?
আলোটা ফুরিয়ে গেছে বলে। কত লম্বা কালো মেঘের টুকরো দেখেছেন।
আমি কিই-বা করতে পারতাম!। আমার আসা-যাওয়ার বাধানিষেধ কোনোকালেই বুঝতে চায়নি। শুধু এক জগ অভিমান নিয়ে জায়গার পর জায়গা পালটেছে। জোর করে থাপ্পড় কষাবে বলে চোখ-মুখ লাল করে তাকিয়েছে বারান্দায়। ঘরে পেছনে গাছতলায়, টালির চালে, আমের মগডালে।
শরীরটা তৈরি হলে আস্তে-আস্তে নামব বলে যেই না – কী হলো বন্যা?
চোখের পাতায় ঘুমের ঢল। ডানে বাঁয়ে ওপর-নিচ করে খোঁজার ইচ্ছেটাই নিঃশেষ এক পলকে।
যুদ্ধটা বোধহয় জোর কদমেই শুরু হয়েছে। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। ঘরের দরজা জানালাগুলো বোমার শব্দে কেঁপে উঠলো। পালাবো বললেই কী পালানো যায়?
টান। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া শরীর। মুড়িয়ে যাওয়া জানালার শিক। দরজার পাল্লা। ঘরে ঝোলানো ফটোর নিচে – টিকটিকির পেট। লিকলিকে সাপটা দরজার ফাঁকফোকরে ঢুকতে গেলেই খানিকটা টাল খেল। মায়ের গালমন্দ – এই সময় যদি বেটি একটু সময় করে…। বড্ড ইচ্ছে হয়েছিল জাপটে গিয়ে ধরে। শরীরটা জোড়া লাগার আগেই – বন্যা ফিজিক্স টিচার এসেছে, নিচে এসো।

ড্রাইভারটা ব্রেক কষতেই ঝাঁঝালো বিরক্তি – কতদিন হলো এ লাইনে?
দেশটার এই জন্যই তো এ-হাল। লাইসেন্সটা নিশ্চয়ই বাঁত হাত দিয়ে।
ড্রাইভিংয়ের কী এমন সম্পর্ক?
কথাটা শুনে বন্যার চক্ষু চড়কগাছ। কার এমন বুকের পাটা যে লোকটাকে দূর-দূর করে তাড়ায়। চোখ-মুখ ফুলতেই থাকে।
‘রোদপাখিটা’ আর বুঝি দেখা হলো না!
সত্যিই ও আমাকে দেখতে পাচ্ছে না, না দেখতে চাইছে না, হয়তো আমাকে যেমন করে পেতে চাইছে তেমন করে পাচ্ছে না।
রাজ করার শখ হয়েছে। করুন। কে বাধা দিচ্ছে? এখন তো সবই খুল্লামখুল্লা। এলাহি সুযোগ আপনাদের। দেশের লোক মরুক; কার কি আসে-যায়?
লোকটার যা মন চাইলো, বলে গেলো। অাঁতে ঘা লেগেছে।
দেশ-বিদেশের ফারাক। গুটিয়েই নিল বন্যা। আর একটা কথাও নয়।

চার
লম্বা পথ। ক্লান্ত শরীর। ভাবনার জীর্ণতায় টাল খাওয়া কথকতা।
রাস্তাটা বের করবে বলেই না, এত সময় পরে।
কারা যেন সারবেঁধে হাতে ফেস্টুন উঁচিয়ে এপাশেই। স্লোগান স্পষ্ট – আমাদের দাবি মানতে হবে। জবাব চাই, জবাব দাও, নইলে গদি…। আদিবাসী উন্নয়ন সমিতি, অমর রহে। শব্দ মিছিল – স্বপ্ন নেই, অনিঃশেষ যাত্রা, লক্ষ্য দূর অস্ত, একঘেয়ে, চাপ খাওয়া, ম্যাড়মেড়ে। অন্যের ইচ্ছায় পথ চলা। অচেনা নারী-পুরুষ। ভাঙাচোরা কালো-কালো মুখ। অস্পষ্ট সাদা-সাদা মেঠো দাগ। মিলিয়ে নিতে চাইলো, যদি কোনো সূত্র লেগে যায়। ভাত-ডাল-নুন, পোশাক-আশাক, ঘর-দোর নাকি আরো কিছু অমূলক তো নয়, পোশাকি মিছিলে গৌণ – কারা দেয়নি। দিতে পারত। বঞ্চনা মিথ্যে নয়। এতকাল কাঁদেনি। কাঁদার ভান করছে। আসল কান্নার রকমসকমে লজ্জা। বড়-বড় মানুষ এই শুনছে – শুনুক। কত দিনই তো দেখছে, ওরা কি সত্যি গায়ে মাখছে?
বন্যার ভেতরে কষ্ট হয়। হিসেবটা কি এতই সোজা? নিজেদের ভার কার ওপর চাপিয়ে দিয়ে ওরা বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে চাইছে। কাঁধটা আসলে কাঁধই নয়। পিচ্ছিল। প্রশ্নোত্তরের জালে জড়াতে থাকে বন্যা।
কী ভাবছেন দিদি? এত ভাবলে ভাবতেই হবে। পথ খুঁজে পাবেন না।
কথার বাঁক ঘুরে যায়। বন্যা উদাস হয়। হাত উঁচিয়ে তিনতলা বাড়িটার দিকে তাকায় ড্রাইভার – কত বড় বাড়ি দেখছেন দিদি। কী চমক! এলাহি ব্যাপার! টাকা আসে টাকা যায়। বেহাত হয়ে বাঁ হাতের মুঠোয়। ওরা মালিক, আমরা ড্রাইভার। আমাদের টাকায় ওরা মজা লোটে। সাহেব-সুবো – কেতা কত?
বাপরে! বন্যা চমকে যায়। লোকটা কত কিই-না ভাবতে পারে!
শুধু ভাবনায় আর কী হয়। কে শুনবে ভাবনার কথা? ওই তো ওরা এত এত লোককে শোনাতে শোনাতে যাচ্ছে। এই আলোতে মুখ চেনা যায় না। খুদকুড়ো কিছু যদি বা মিলল, ওই দাদারাই সব খাবলে নেবে, ছিটেফোঁটা থাকলে তবে না কুকুর-বেড়ালদের কামড়াকামড়ি। সকলের হাঁড়ির খবরই রাখি। আপনার খবরও জানি।
আমার কথা! তুমি তো সাংঘাতিক লোক!
জানি, জানি, না জানলে হবে।
না জানবেই বা কেন! কেই-বা জানে কার মনের আড়ালে কী লুকিয়ে আছে! ডিকোড করলেই বেরিয়ে পড়বে চড়্চড়্ করে। মানুষগুলোকে দমিয়ে রাখার লারে লাপ্পা খেলাই তো চলছে সারাক্ষণ।
আমার ভয়ের পিদিমটা দপ করে জ্বলে উঠল বন্যার জন্য। কথার জালে আটকে গিয়ে ও নিজেই না একসময় বন্দি হয়ে যায়!
কী হলো দিদি, এবার কোন রাস্তা ধরবো?
কোথায় এলাম বলো তো? এ-শহরটা এমন অচেনা ঠেকছে।
মনের ভুল দিদি। সব ওপর চালাকি। আসলে ঠিক উলটো। ভেতরটা ঝাঁঝরা-স্বার্থপর-জোচ্চর-ঠগবাজ। এদের আপনি মানুষ বলেন? মানুষের বুদ্ধি মানুষের কাজে না লাগলে যা হয়, তাই। ড্রাইভারের বাচ্চাগুলো কি কম বদমায়েস! মিটার টেম্পারিং করে, সববাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
সে আবার কেমন করে করে?
অতো কথায় আপনার কী কাজ দিদি? অনেক কায়দা। আমি বলি আর আপনি ফাঁস করে দিন, বড়লোকের পকেট কাটছে, কাটুক।
সেটাও তো অপরাধ।
ওইটুকুনিতে চালাকি আছে, পাপের কী দেখলেন?
পাপ কাকে বলে জানো? গোটা ব্যবস্থার গায়ে গন্ধ। আর এটাও ব্যবস্থারই অংশ। ছোট-বড় বলে কিছু হয় না। ভাবতে থাকো, দেখবে কেউ না কেউ তার অধিকার হারাচ্ছে কোনো না কোনোভাবে।
বড়-বড় কথা বলছেন দিদি, আপনি তো নিজের রাস্তাটাই নিজে চেনেন না, না হলে এত গোলকধাঁধা। এত ভালোবাসার টান! মুখোশ পরা। মেকি! শিক্ষিত লোকগুলো হয় এরকমই আনকোরা। কী বিপদেই না ফেলেছেন! এক্ষুনি ‘আয়লা’ এসে সব লন্ডভন্ড করবে। আমি কিন্তু রিস্ক নিতে পারব না।
বন্যা নেতিয়ে পড়েছে ড্রাইভারের হাবভাব দেখে।
রোদপাখিটা বড় বেইমান। এইসময় যদি একটু…
বাড়িটা যদি চিনিয়ে দিতো। কে জানতো, এরকটা হবে। ফ্লাইওভারের চক্করে হাতির মতো শরীর নিয়ে চমকাচ্ছে। দেমাক তো কম নয়। চোরা ইশারা। দমফাটা চিৎকার।
আমার শরীরটাকে যাচ্ছেতাই ভাবে মাড়িয়ে সকলে ছুটছে। এদের হলোটা কী? বন্যার সামনে দাঁড়ানোর এতটুকু ক্ষমতা আমার নেই। কালো কালো দাগ এসে আমার শরীরটাকে কুৎসিত করে দিয়েছে, ঘৃণা জন্মাচ্ছে… কাউকে জানাবো এমন মানুষ এই শহরে কই? বন্যাকে চোখের সীমানায় ধরে রাখা যখন প্রায় অসম্ভব, কার যেন তখন গলা পেলাম – এতো লুকোচুরি আর কতদিন, বয়স তো অনেক হলো।… কথাটা ঠিকই, বয়সের ভার তোয়াক্কা না করেই তো এত ঘুরপাক খাওয়া। বন্যা তো আসছে। শরীরটা আর একটু পরেই দলা পাকিয়ে যাবে। রাস্তাটা ঠিক চিনেই তো আসছিল। কিন্তু কতক্ষণ?
দিদি পথ তো আর চেনা যাচ্ছে না। আপনি একটু আগে রোদপাখির কথা বলছিলেন না। পালিয়েছে।
ভীতু, কাপুরুষ।
সেদিনও ঘরে ফেরার উল্লাসে মেতে উঠেছিল বন্যা। ও আমায় গাল পেড়েছিল – মাতাল। লম্পট। কামুক যুবকের উন্মত্ত চাহনি, টের পায়নি ও।
অন্ধকারে আমার উপস্থিতিটা জানিয়ে দিয়েছিলাম, বলেই না।
বন্যা তো আমাকেই দেখতে চাইছে, কিন্তু আজ আর…
ড্রাইভার। বন্যা চিৎকারে গলা ফাটাচ্ছে – পথ সত্যিই আপনি চেনেন না?
কোথায় পথ? চিত্রাগঞ্জ যাওয়ার সব পথই বন্ধ হয়ে গেছে।
দিদিমণি, পথে অনেক জঞ্জাল, অনেক কাঁটা, গাছের ডার, অ্যান্টেনা, শক লাগা তার।
তবে উপায়? আমার কি রোদপাখি দেখা হবে না?
চেষ্টা তো করি কোনো নতুন পথে… তবে আমি নিশ্চিত, ঘর আপনি খুঁজে পাবেন না। কত কিছুই তো ঘটে। এই ধরুন যদি প্রমোটারের খপ্পরে পড়ে।… প্রমোটার আছে – মানুষ নেই – ভাই বন্ধু কেউ নেই – গাছ নেই জল নেই – আকাশ নেই। রোদপাখি আর থাকে?
এরকম কেন বলছো?
অনেক ঝড়-তুফান। অনেক মানুষ, কত লোভ, কত হিংসা, এখন কি আর আস্ত আছে?
পথেই যখন এত অপদস্থ হওয়া, না জানি পথের শেষে কী?
আমার যে শরীরের আর এতটুকু অবশিষ্ট নেই। বন্যা বোধহয় বুঝে ফেলেছে। খোঁজার তাগিদটা না হয় এত চটজলদি হারিয়ে যেত না।
নাকি এতক্ষণে নিশ্চিত হয়েছে – ঝড় যখন থেমে যাবে, আবার শরীর হবে, আমি একটু পরেই খেলা করব ওদেরই ছাদের এক কোণে কিংবা ছাদের কোল ঘেঁষে সটান দাঁড়িয়ে থাকা জামরুল গাছের কাছে কিংবা আরো বিঘৎ খানেক দূরে নারকেল কিংবা লেবুগাছের মগডালে। বন্যা এগোবে, না পিছোবে, না মাঝপথেই… কে জানে? আমিও না।
পথের কণাগুলো ঢেকে দিয়ে যাচ্ছে কোন রাতপোকারা? গাড়ির ড্রাইভার আর সওয়ারি দুজনেই যেন রাতকানা। কীসের এত কিলবিল করা অদেখা জীবন, দেখার আকুতিতে অস্থির? মানুষগুলো এমন করে কেন চুপ করে থাকে? ভূত-প্রেত-জিন! বন্যার সামনে ছায়া-ছায়া, কায়া হতে চাইছে – ধরবে নাকি? নিজের গলার স্বর নিজের কাছে অচেনা ঠেকে। কেন যে ওরা পরিত্রাতা সাজতে চায়? গাড়িটাকে টেনে নিয়ে যাবে বলে ওর সামনে এসে দাঁড়ায় – সে কী আমি? বন্যার চোখের তারা বড়-বড় হয়। হাতটা লম্বা করে কাচের গায়ে বুলিয়ে দেখে ফেলতে চায় – সময় আর সময়ের শেওলায় ঢেকে থাকা আমার শরীর। মাকেই ডেকে ফেলে আনমনে – আমি এখনো বড় হইনি মা, রোদপাখি কোথায় জানো? 