লকডাউন

লেখক: মহি মুহাম্মদ

মহল্লাটাই যেন একটা গোরস্তান। চারপাশে কোনো শব্দই নেই। বাসাবাড়িতে সবাই ঝিমুচ্ছে, না-হয় রান্নায় ব্যস্ত। কাকটা ডেকে উঠল। ঠিক দুপুর। পাশেই ব্যাপটিস্ট খ্রিষ্টানদের কবরস্থান। সেগুন, মেহগনি আর শিরিষের ডালে বসে আছে ওরা। স্বরে ক্লান্তি নেমেছে। ভয়-ধরানো স্বরে ডেকে চুপ মেরে আছে। এ-কদিনে ওদের কোনো ডাক শোনা যায়নি। মনে হয় কোনো নতুন লাশ নামছে। গত চারদিন যাবত দিন নাই, রাত নাই লাশ নামছে। পৃথিবীর কোথাও বাকি নেই। একশ সাতানব্বইটি দেশে একযোগে লাশ নামছে। এর মধ্যে চীন, স্পেন, ইরান ও আমেরিকায়
আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মৃত্যুও বেশি। ভয়ংকর ভাইরাস করোনা। কী যে হবে কে জানে!
ছয়তলার জানালা দিয়ে কবরগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। দেখা যায় ইলেকট্রিসিটির তারগুলো। কখনো ওরা ওখানেই বসে থাকে সারি বেঁধে। না-হয় গোরস্তানের বড় বড় গাছে। শুধু কাক নয়, অন্য দু-চারটে পাখিও এসে বসে। ওদিকে তাকিয়ে থেকে তার ভাবনা হয়। অন্যসময় হলে এত ভাবনা হতো না; কিন্তু এখন হচ্ছে। মাথার ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি। ভয় পেতে পেতে কেমন জানি ভোঁতা হয়ে গেছে অনুভূতি। স্বাভাবিক মৃত্যুর সময় এমন হয় না। এখন হচ্ছে। প্রতিদিন মৃত্যুর খবরে অনুভূতি পালটে যাচ্ছে। গলিতে যেসব ছেলে আড্ডা দেয়, ওরা কেউ নেই। ওরা নেই কয়েকদিন হলো। কয়েকদিন আগে আড্ডা দিচ্ছিল ছেলেগুলো। পুলিশ নাকি কয়েকজনকে পিটিয়েছে। এখন আর কেউ আসে না।
এখন মাঝে মধ্যে সেনাদের টহলধ্বনি শোনা যায়। গলির শেষ মাথায় দু-একটা মুদিদোকান আছে। একটা ডিসপেনসারিও। খোলা না বন্ধ, কে জানে! দিন ফুরোয়। হতাশার বিমূর্ত সাগরে ডুবে থাকে। মনে হয় – দরজার বাইরেই মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে। স্তব্ধ দিনের শেষে গড়িয়ে নামে সন্ধ্যা। ভয় আরো পেয়ে বসে। মনের ভেতর একটা আশংকা কালো থাবা বিস্তার করে। টিভিতে মৃত্যুর খবর ছাড়া আর কিছু নেই। নতুন নতুন এলাকায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। প্রবাসীরা দেশে ফিরছে। এসেই ওরা ঘোরাঘুরি শুরু করছে। সতর্ক হচ্ছে না। ওদের ভেতর থেকেই রোগ ছড়াতে পারে। ওরা কোয়ারেন্টাইন মানছে না। ওদের খুঁজছে পুলিশ। পাসপোর্ট বাতিল করার হুমকি দিয়েছে। থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। হুঁশ নেই কারো। কেউ তোয়াক্কা করছে না। তার রাগ হয়। নিজের ভেতর অস্থিরতা বাড়ে। কার প্রতি, কাদের প্রতি? ওসব ভেবে এখন সময় পার করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
নিষ্প্রাণ গলি। মরা সাপের মতো শুয়ে আছে। অনেকক্ষণ তাকিয়েও কাউকে দেখা যায় না। ছেলেগুলো কি সবাই ভয় পেয়েছে? নাকি ওদের মা-বাবারা আটকে রেখেছে ওদের? ওরা কি এখন আর এই ছয়তলার জানালার দিকে তাকিয়ে সিটি বাজাতে পারে না? কেমন একটা ব্যাকুল প্রতীক্ষা। কিসের প্রতীক্ষা? কাদের জন্য? ভেবে পায় না সে।
পেছনে কারো পায়ের শব্দ। ফিরে তাকাতে ইচ্ছে হয় না। অবশ্য কোমল শব্দ শুনে বুঝতেই পারে এটা ছোট বোন তুশির আগমন বার্তা। কত বছর বয়স ওর? এই সাত-আট। এরই মধ্যে মৃত্যুর ব্যাপারটা ওকেও ভাবিয়ে তুলেছে। চুপচাপ থাকে আর সুযোগ পেলে অনেক কিছু জানতে চায়।
তুমি কী দেখ আপুনি?
কিছু না।
আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি তাকিয়ে আছো।
এমনি তাকিয়ে আছি।
কী ভাবছো?
কই, কিছু না তো!
আচ্ছা, আপুনি একটা কথা বলবো?
বলো।
আমরা সবাই কি মরে যাবো?
তার ভেতরটা কেমন ছ্যাৎ করে উঠল। তুশি আবারো জিজ্ঞেস করলো, আপুনি, আমরা সবাই কি মরে যাবো? সে দূরে কোথাও হারিয়ে গেল। আর উদাস কণ্ঠে বলল, জানি না।
আমরা সবাই মরে গেলে এই পৃথিবীতে কে থাকবে?
জানি না।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই তুমি শুধু বলো জানি না, জানি না।
সে তখনো গলিতে তাকিয়ে আছে। এই দেখে ছোট বোন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। হয়তো ওর আরো কিছু জানার বাকি আছে। সিলিংফ্যানটা এমনিতেই ঘুরছে। জানালা দিয়ে একটা বাতাস আসছে। আগে হলে দুপুরের এমন শান্ত চিত্র দেখা যেত না। হয়তো ফেরিওয়ালা হেঁকে বেড়াত। রিকশাওয়ালারা টিংটিং করে ছুটত। লোকজনের আনাগোনা থাকত। এসবই জীবনের চিত্র। আজ নেই বলে খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে জীবন থেমে গেছে। সময় থমকে গেছে।
রান্নাঘর থেকে ডাল ‘ছ্যাৎ’ করার শব্দ এলো। তুশি তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। বোনের মুড দেখে হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছে না। তুশির বড় নিশু। ও বসে আছে ঘরের আরেকটি জানালায়। টেবিলে ছড়ানো-ছিটানো বই। এ-মাসেই ওর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। টেবিলে বসে মন খারাপ করে আছে। কবে নাগাদ পরীক্ষা হবে কে জানে! এই পরীক্ষার জন্য ওর অনেক কার্যক্রম আটকে আছে। ওর আশা ছিল তাড়াতাড়ি পরীক্ষা শেষ হবে। তারপরেই সে কিছুদিন মুক্ত। কিন্তু এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে গেল।
কতদিন আকাশে তাকানোর সময় হয় না। এখনই আকাশের দিকে তাকাল। একটা নির্মল আকাশ ঝকঝক করছে। মনে হচ্ছে জীবাণুমুক্ত হচ্ছে প্রকৃতি। পাখিরা উড়ছে। ফেসবুকে পেয়েছে কক্সবাজারে নাকি ডলফিন ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূষণের কারণে ডলফিন হারিয়ে যেতে বসেছিল। এখন নাকি এই লকডাউনে সাগরের জল নির্মল হতে শুরু করেছে। ইস্, প্রকৃতি মনে হয় আবার সতেজ হচ্ছে। প্রকৃতিরও একটা নিজস্ব গতি আছে। আর কত অত্যাচার সে সহ্য করবে? তাই বুঝি মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠেছিল। এবার সে আবারো অত্যাচার সহ্য করার জন্য নিজেকে তৈরি করছে। শত বছর পরপর সে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে। মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। নাকি প্রকৃতির প্রতিশোধ এটি? একটা ভাবনা মাথায় বেশ ঘুরতে থাকে।

দুই
ইতালির পম্পেই নগরীর কথা মনে পড়ল। শহরটি খুবই জাঁকজমক হয়ে উঠেছিল ব্যবসায়ীদের পদচারণায়। পম্পেই নগরীর লোকজন আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছিল। অনৈতিক জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। বাবা নাকি অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য ছেলেমেয়েদের ব্যবহার করতেন। নগরের জায়গায় জায়গায় গোসলখানা ছিল, নারী-পুরুষ একসঙ্গে গোসল করত। পতিতালয়, মদ, জুয়া এসব তো কোনো ব্যাপারই ছিল না। যতরকম পাপাচার ছিল সবকিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল তারা। বর্বর, অসভ্যতা ও সমকামিতায় মত্ত হয়ে উঠেছিল পম্পেই। সেদিন দুপুরে কেউ ঘুমুচ্ছিল, কেউ খাচ্ছিল, কেউবা আনন্দে মশগুল ছিল। ঠিক সে-সময় নিঃশব্দে জেগে উঠল মৃত ভিসুভিয়াস। জ্বলন্ত অগ্নিলাভায় শহরের বিশ হাজার মানুষের মুহূর্তেই বিশ ফুট নিচে জীবন্ত কবর হয়ে গেল। সেই অভিশপ্ত নগরীর কথা জেনে তার খুব খারাপ লেগেছিল। প্রকৃতির প্রতিশোধ। প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেয়। তবে খুব আস্তে আস্তে। এত নিষ্ঠুরতা প্রকৃতি সহ্য করে না। করোনা কি প্রকৃতির প্রতিশোধের আরেকটি ধাপ? কি জানি, হলেও হতে পারে!
আচ্ছা, ওই দেশটার একটা শাস্তি হতে পারে না? এই ব্যাটারা করোনার মতো ভাইরাস উৎপন্ন করেছে। আবার কিভাবে এগুলো এত মানুষের মধ্যে ট্রান্সমিশন করে দিলো। এটা কি শুধুই ভাইরাস, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে? সে খুব ভাবনায় পড়ল। তার এক বান্ধবী বলছিল, বৈশ্বিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখন শুরু হয়েছে শক্তির চর্চা। এই শক্তির দৌড়ে হয়তো করোনাই একটা বড় মারণাস্ত্র! ভবিষ্যতে রাইফেল কিংবা বোমা দিয়ে মানুষ হত্যা করা হবে না, মানুষ মারা হবে এমনই ভাইরাস-অস্ত্র দিয়ে। আর তারই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে। এই ভাইরাস হয়তো ওই দেশের কোনো ল্যাবরেটরিতে উৎপাদন করা। ওরা হয়তো কোনো মারণাস্ত্র তৈরি করতে চেয়েছিল। আর কোনো কারণে সেটা সংক্রমিত হয়ে গেছে মানুষের শরীরে। আর এভাবেই হয়তো এটার একটা ট্রায়ালও হয়ে গেল! এবার সময়কালে কাজে লাগানো হবে। এই সংশয়ের কথা কাউকেই শেয়ার করা যায় না। লাফিয়ে পড়বে তার ওপর তাঁবেদাররা। বলবে, মুখে কথা বললেই তো হবে না, প্রমাণ কি আছে? তাদের আরেক বান্ধবী তো রীতিমতো ক্ষেপে গিয়ে বলেছে, কী আজেবাজে বকছিস, এগুলো গড পাঠিয়েছে, গড। গড চিনিস? তোরা তো আধুনিক মেয়েছেলে, গড চিনবি ক্যামনে? সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বান্ধবীটির দিকে তাকিয়ে ছিল। অন্য বান্ধবী তখন তাকে সরিয়ে নেয় ওখান থেকে।
এই দেশটির পাশাপাশি অন্য যেসব দেশ শক্তির মহড়ায় এগিয়ে আছে ওরা কি বসে থাকবে? নিশ্চয়ই ওরা এর চাইতেও শক্তিশালী কিছু আবিষ্কার করবে। করতেই থাকবে। তারপর উত্তেজনা ছড়াবে। গরিব দেশগুলোকে অনুসারী বানাবে। নমঃ নমঃ করে না চললে জীবাণু-অস্ত্র ফুটিয়ে দেওয়ার হুমকি দেবে। এমনও হতে পারে, যে-দেশ কথা শুনলো না তার ওপর একটা প্রয়োগ করে দিলো খুব গোপনে। কেউ জানল না, হাজার মানুষ মরে গেল। সবাই আহা উহু বলেই খালাস হবে। রাষ্ট্রযন্ত্র নাজেহাল হবে পরিস্থিতি সামাল দিতে। আর তারা ক্ষমতার দাম্ভিকতা ছড়িয়ে অট্টহাসি দেবে ভেতরে ভেতরে।
মানবতাকে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখে কারো কোনো কষ্ট হবে না। সবাই শক্তিশালীর আসনটি ধরে রাখতে চাইবে। তার মাথায় এমন জটিল চিন্তা আসে না। কী করে যে মানুষ এমন জটিল চিন্তা করে সে বোঝে না।
তুশি মেঝেতে বসে খেলছে। ও এখন পুতুলকে শাড়ি পরাতে ব্যস্ত। আর নিশু হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে কিংবা কারো সঙ্গে কথা বলছে। মায়ের কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগে ডালে ফোড়ন দেওয়ার শব্দ হয়েছিল।
আচ্ছা, দাদির তো কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। এমন সময় মা ডাক দিলেন। মিশু উঁকি দিলো রান্নাঘরে। মা বললেন প্লেটগুলো ধুয়ে দিতে। মিশু চুপচাপ প্লেট ধুতে শুরু করল। একবার তাকিয়ে দেখল, চুলায় ভাত টগবগ করছে। পাশে ডালের হাঁড়ি নামানো। মা বসে টমেটো কাটছে। পাশেই পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ আছে। পাশের চুলায় আলু সেদ্ধ হচ্ছে। তার মানে আজ ভাত, ডাল, আলু ভর্তা আর টমেটো চাটনি।

তিন
বাবা এই শহরে থাকে না। চাকরি তার অনেক দূরে। সাগর পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। দশ-পনেরো দিন আগে গিয়েছে বলে এই দিনে আর ফেরেনি। আর বাবা থাকলেই কি! তারা সবাই ভয়ে গুটিয়ে থাকে। আর মায়ের সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকে। বাবা বাসায় থাকলে তারা কেউ হাসে না। মাও হাসে না। বাবা শুধু ভুল ধরতে থাকে। আর মিলিটারি মেজাজ দেখাতে থাকে। তারা বোঝে, বাবা বাসায় না থাকলে কেন একটা হাওয়া খেলা করে। তারপরেও তারা সবাই চায় কিছুদিন পরপর বাবা নামের মানুষটা বাসায় ফিরুক। আচ্ছা, বাবা এখন বাসায় থাকলে কেমন হতো? কী আর হতো! একরকম তো হতোই। মনে হয় ওরা আরো বেশি সাহস পেত। এখন একজনও পুরুষ মানুষ নেই বাসায়। তাই হয়তো তারা মানসিকভাবেও দুর্বল। ধ্যাৎ, কেন মানসিকভাবে দুর্বল হতে যাবে! এটা সে কী ভাবছে!
দাদির কাশিতে ভাবনায় ছেদ পড়ে। কাশিটা বেড়ে গেছে। ওষুধ বাবা এনে দিয়ে গেছে। তা এখনো চলছে। গায়ে জ্বরটা দাদিকে জ্বালাচ্ছে খুব। সঙ্গে কাশিও। মা গিয়ে একটা সিরাপ এনেছে। কিন্তু কিছুতেই কাশিটা কমছে না। দাদির গলাব্যথাও আছে। কিছুই বলে না। চোখ দিয়ে পানি ঝরে কেবল। দুপুরে খাওয়ার পর আমরা সবাই বসেছিলাম দাদিকে ঘিরে। কিন্তু মা আমাদের বকা দিলেন। কেন বকা দিলেন কী জানি। আমরা উঠে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে শুনি মাও যেমন কেমন ভয়ার্ত গলায় কথা বলছে। আমাদের তিন বোনের উৎকর্ণ কান পাশের ঘরের দিকে। মায়ের কাছ থেকে কী শব্দ আসছে সেদিকে। কিছুক্ষণ আগে যে ভাত খেয়েছি তা যেন গলা বেয়ে উঠে আসছে।
জানালা দিয়ে কাউকে দেখা যায় কি না উঁকি মারল। না, দেখা যায় না। এমন সময় মায়ের গলা আবার শোনা গেল। দাদির শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে। কী করবে সে ভেবে পাচ্ছে না। বাবাকে একটা ফোন করবে? ভেবে ঠিক করতে পারল না। নিশু বলল, আপুনি বাবাকে ফোন কর।
বাবাকে ফোন করলে বাবা কী করবে? অতদূর থেকে তো বাবা কিছুই করতে পারবে না। তার চেয়ে আমি একটু নিচে গিয়ে দেখি কাউকে পাওয়া যায় কি না!
মায়ের কথার অবাধ্য হয়ে ছুটে বাইরে এলো সে। সুনসান নীরবতা। শেষ বিকেলে সবাই কি ভাতঘুম দিচ্ছে? ওই লাফাঙ্গা ছেলেটা কই, ওকে দেখছে না কেন? এমনিতে তো জানালার কাছে নিচে দাঁড়িয়ে নানারকম শব্দ করে। আজকে কই গেল হারামজাদা? দৌড়ে ছুটল সে ডিসপেনসারির দিকে। গিয়ে দেখল ডিসপেনসারির ছেলেটা ঘুমে ঢুলছে। মিশু ওকে বললো, ভাই আপনাদের ডাক্তারটাকে একটু কল দেন না।
কেন আপু কী হইছে, বলেন?
আমার দাদির খুব খারাপ অবস্থা। নিশ্বাস টানতে পারছে না। কেমন জানি করছে।
ছেলেটা মোবাইল টিপে ফোন করলো। তার কাছে দাদির বয়স জিজ্ঞেস করল। সে বয়স বলল। ছেলেটা অপরপ্রান্তে থাকা ডাক্তারকে বয়স বললো। তারপর, হ্যালো, হ্যালো করে ফোনটা ছেড়ে দিলো।
আমি বললাম, কী হলো ভাই?
ডাক্তার ফোন রেখে দিলো।
সে বুঝলো, কেন ডাক্তার বয়সের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তার মানে কি দাদিকে কোনো চিকিৎসা দিতে পারবো না! আচ্ছা একটা রিকশা কিংবা ট্যাক্সি পেলে তো দাদিকে মেডিক্যালে নিয়ে যেতে পারত! গলি দিয়ে আরেকটু এগিয়ে গেলেই তো রাস্তা। দৌড়ে গেল সে ওদিকে। আর তখনি দেখতে পেল কয়েকজন পুলিশ আর একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সামনে অনেকগুলো খেটে-খাওয়া মানুষ। তরুণী লোকগুলোকে বকাঝকা করছে। কান ধরে ওঠবস করাচ্ছে। কিন্তু ওদিকে সে খেয়াল করতে পারল না। সে রাস্তার চারদিকে তাকাল একটা গাড়ির আশায়। একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা একটা রিকশা! এই সময় পুলিশ আর তরুণী তার দিকে এগিয়ে এলো। তরুণী তাকে লক্ষ করে ধমকে উঠল। কেন সে এই সময় বাড়ির বাইরে এসেছে? সে কি জানে না এখন পুরো দেশে লকডাউন চলছে?
সে কাঁদতে কাঁদতে তরুণীকে বোঝাতে চেষ্টা করল তার দাদির অবস্থা। তরুণী আরো রেগে আগুন। তাকে কান ধরে ওঠবস করতে বললো। সে বেঁকে বসল। তর্ক জুড়ে দিলো। সঙ্গের পুলিশটি অকথ্য ভাষায় গালি দিতে শুরু করল। হাতের লাঠি দিয়ে এক ঘা তার পশ্চাদ্দেশে বসিয়ে দিলো। তারপর কান ধরে ওঠবস করাল। তাকে হেনস্থা করার ছবিটি তরুণী তার মোবাইলে তুলে নিল। তার দুচোখ ফেটে অপমানের অশ্রু অঝোরে ঝরতে শুরু করেছে। তপ্ত অশ্রু গণ্ডদেশ গড়িয়ে নামছে। কিন্তু সেদিকেও খেয়াল নেই তার। তার দরকার একটা সিএনজি অটোরিকশা কিংবা রিকশা।
না কোনো গাড়ি নেই। কোনো রিকশা নেই। মোবাইল টিমের ভয়ে সব কোথায় পালিয়েছে। সে পরাজিত মানুষের মতো ফিরতে শুরু করল। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে। গিয়ে যেন দেখে দাদির কিছু হয়নি। বাসায় এসে খুব দ্রুতগতিতে সিঁড়ি ভাঙল। তখন বাসা থেকে একটা কান্নার রোল চিকন সুরে বেরিয়ে আসছে। মায়ের সঙ্গে তার দুই বোনও কাঁদছে।
পাশের বাসায় নক করে শোকসংবাদটা দিয়ে এলো। কিন্তু কেউ তাদের বাসায় এলো না। সময় এতই খারাপ যে কোনো মানুষই তাদের বাসায় আসেনি। দরজার বাইরে থেকে নানা উপদেশ দিয়ে যে যার মতো চলে গেল। এমন দুরবস্থার কথা ভাবাও যায় না। এই শোকের মধ্যেই বাড়িওয়ালা খবর পাঠিয়েছে, লাশ নিয়ে এক্ষুনি চলে যেতে হবে। এমনকি তাদেরও বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা বাসায় ফিরতে পারবে না!

Leave a Reply

%d bloggers like this: