লিসোটোতে ভ্রমণ : কারাবন্দি কামাহেলো ও ঘোড়া পালামা

লেখক:

মঈনুস সুলতান

কিছুদিন হলো আমি আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের একটি ছোট্ট রাজতান্ত্রিক দেশ লিসোটোতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে এ দেশটিতে আছে প্রচুর পাহাড়, নীলাভ জলের দৃষ্টিনন্দন হ্রদ, সবুজ ঘাসে নিবিড় প্রান্তর ও দিগন্ত-ছোঁয়া বিশাল সব উপত্যকা। লিসোটোর রাজধানীর নাম মাসেরু। আমি ওখানে সাময়িকভাবে ডেরা বেঁধেছি। কোনো দেশে দীর্ঘদিন ভ্রমণের একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে – ক্রমাগত উদ্দেশ্যহীন সফরের ব্যয়ভার বহন করা। তো আমি তা সংকুলানের জন্য ছোটখাটো কিছু কনসালট্যান্সির কাজ করছি। দিনকয়েক হলো আমি জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির সঙ্গে কনসালট্যান্ট হিসেবে যুক্ত হয়ে মাসেরুর কেন্দ্রীয় কারাগারে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছি, এবং এ উদ্দেশ্যে আজ রওনা হয়েছি কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে।

বেশ কিছুক্ষণ হলো ইউএনডিপির রেডিও অ্যান্টেনা লাগানো সুপরিসর ল্যান্ড রোভার হাঁকিয়ে ছুটে যাচ্ছি মাসেরু শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছেন উন্নয়ন সংস্থার একজন স্থানীয় কর্মচারী। এ বাসোটো ভদ্রলোক ইউএনডিপির তরফে কাজ করছেন কারাগার উন্নয়ন প্রকল্পে। মাসেরু কেন্দ্রীয় কারাগারে কিছুদিন আগে বন্দি মানুষজনের মাঝে বিরাট আকারের রায়ট হয়ে  গেছে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারা-কর্তৃপক্ষকে গুলি চালাতে হয়। তাতে জখম হয়েছেন বারোজন, এবং অন দি স্পট মৃত্যুবরণ করেছেন দুই কারাবন্দি। আজ আমি ইউএনডিপির তত্ত্বাবধানে মাসেরুর কেন্দ্রীয় কারাগারে যাচ্ছি ওখানে ‘অলটারনেটিভ টু ভায়োলেন্স’ বা ‘হিংসার বিকল্প’ শিরোনামে প্রশিক্ষণ করা যায় কি না তার সম্ভাবনা যাচাই করতে। কারাগারের অবস্থান শহর থেকে বেশ দূরে জনহীন একটি উপত্যকায়। পথঘাট পিচঢালা নয় বলে কিছুটা দুর্গমও। ল্যান্ড রোভার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নুড়িপাথর ছিটকিয়ে চারদিকে ধোঁয়াশা ছড়াতে-ছড়াতে ডিঙিয়ে যাচ্ছে ছোটখাটো পাহাড়-পর্বত। আমি জানালা দিয়ে দূর দিগন্তে আবছা হয়ে-আসা উপত্যকার দিকে তাকাই। খুব নিচুতে নেমে আসা সূর্যরশ্মিময় মেঘদল এ নিসর্গপটে ছড়াচ্ছে গাঢ় ডেপথ। কেমন যেন তেপান্তরে হারিয়ে-যাওয়ার অনুভূতি হয়। আর যে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কারাগারে যাচ্ছি তা যদি হাসিল না হয় তার দুর্ভাবনায় নার্ভাসবোধও করি।

ইউএনডিপির ল্যান্ড রোভার ভয়ানকভাবে দুলে উঠলে গাড়ির ধাতব চেসিসে আমার মাথা ঠুকে যায়। চাঁদিতে হাত বুলাতে-বুলাতে আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য লিসোটো বেড়াতে আসা, এবং পর্যটনের ব্যয়ভার বহন করার জন্য ইউএনডিপির কানসালট্যান্সির ছোটখাটো কাজে জড়িয়ে-পড়া ইত্যাদি ভাবনা থেকে ফিরে আসি বাস্তবে। সড়ক এখানে ভয়ানক দুর্গম হয়ে উঠেছে। গাড়িটি বড়-বড় বোল্ডার ডিঙিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আর বেমক্কা জারকিংয়ে শরীরের হাড়গোড় খুলে যাওয়ার জোগাড় হয়। ঠোকাঠুকি থেকে সাবধানে মাথা বাঁচিয়ে দেখি – চারদিকে পাহাড়-শ্রেণির ঠিক মাঝখানে বউলের মতো এক জায়গায় অনেকখানি পরিসর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাসেরু জেলখানা। আমি জানালা দিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে আরেক দফা জারকিংয়ের মোকাবিলা করি। মনে হয় কারা-পরিদর্শন তামাদি হলে পরে আমাকে যেতে হবে মা-ার ডাক্তারের ডেরায় খিল লুজ হয়ে-যাওয়া হাড়গোড় মেরামতের প্রয়োজনে।

জেলগেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে আমার সমস্যা কিছু হয় না। ইউএনডিপির স্থানীয় কর্মচারী দারোয়ানদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার বিষয়টি স্মুদভাবে হ্যান্ডল করেন। প্রহরীরা আমার আইডি পাসপোর্ট দেখে জাবেদা খাতায় টিপসই নিয়ে গেট খোলে। ভেতরে এসে দেখি কাঁটাতারের বেড়ার ওপর বসে পঞ্চাশ কিংবা ষাটটি কাক। তারা আমাকে দেখতে পেয়ে এমন বেতালভাবে কা-কা করে ওঠে যে, একজন মোড়লগোছের প্রহরী রাইফেল বাগিয়ে হাঁক পাড়েন ‘অ্যাটেনশন’। এ আচরণে আমার টেনশন বাড়ে। কাকরা কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে খামোশ মেরে যায়, ব্যাটাদের মনে হয় দারোগা পুলিশ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা আছে। দেখি – কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে একসারি কারাবন্দি। তাদের কামানো চকচকে চাঁদিতে রোদ ছলকে যাচ্ছে। ভুঁড়িওয়ালা এক কনস্টেবল সারির পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে-যেতে পেইন্ট ব্রাশ দিয়ে তাদের কারো তালু আর কারো গ-দেশে দাগ দিচ্ছেন। আরেকটি ফটক পেরিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি জেলারের দফতরে। আমার কাগজপত্র, ইউএনডিপির চিঠিচাপাটি নিয়ে স্থানীয় কর্মচারী জেলারের কামরায় যান। আমাকে পায়া নড়বড়ে একটি বেঞ্চে বসতে বলা হয়। খানিক দূরে লোহার শিকওয়ালা কপাটের সামনে দাঁড়িয়ে কারাবন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে আসা আত্মীয়স্বজন। কেউ কথা বলছে না, কোথাও কোনো শব্দ হচ্ছে না। শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছেন জনাকয়েক কারাবন্দি, তাদের পাশে ইউনিফর্ম পরা পুলিশ। আমার সামনের সিমেন্টের চাতালে বসে আরামসে জাবর কাটছে তিনটি কানঝোলা ছাগল। জানালা দিয়ে দেখি – আরেকটি ছাগলকে ঘাসপাতা খাওয়াচ্ছেন জেলখানার কমলা রঙের ড্রেস-পরা এক কারাবন্দি। আমি ওদিকে তাকাচ্ছি দেখে কারাবন্দি ছাগলকে খাওয়ানো বন্ধ করে তার ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি চুলকিয়ে আমার দিকে হাত নাড়েন। একটি আধবুড়া ছাগি এসে আমার ব্রিফকেস লেহন করতে শুরু করলে ভাবনায় পড়ি – এ-জানোয়ারদের হাজতবাস করতে হচ্ছে কেন? ব্যাঁ ব্যাঁ শব্দে কয়েকটি ছানা আর্তনাদ করছে। স্থাপনাটি কারাগার বটে, তবে একইসঙ্গে এখানে গড়ে উঠেছে ছাগলের খামারও।

জেলারের খাসকামরায় আমার ডাক পড়ে। এ-পুলিশ অফিসারের চেহারা বেজায় ভারি। তার ধূসর চুলে ব্রেইড করা। তাতে মনে হয় কয়েকটি নেউলের লেজ কেটে ওখানে ক্লিপ দিয়ে আটকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি কাচের গেলাসে করে সম্ভবত ছাগির দুধ খাচ্ছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে হুড়ুত করে ঢেঁকুর তুলে কাঠের চামচে দুধে তালমিছরির গুঁড়া মেশান। তার সামনে

মেলে-রাখা সাউথ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের কারাগার থেকে আমাকে দেওয়া জেলারদের প্রশংসাপত্র। তিনি কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি কি জেনারেল গান্ধীর সৈনিক?’ বলে

ফিক-ফিক করে খামোকা হাসেন। আমি কোনো কথা না বাড়িয়ে সংক্ষিপে বলি, ‘নন-ভায়োলেন্সের ওপর আমি যে ধরনের কাজ করি তাতে গান্ধীজির দর্শনের ছায়া আছে।’ জবাবে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, ‘ইউ আর ক্লিয়ার্ড, তবে কিছু মনে না করলে এ কাগজে একটু সই করতে হবে।’ আমি কোনো প্রশ্ন না তুলে বাড়িয়ে দেওয়া কাগজে স্বাক্ষর করি। তাতে আইনি পরিভাষায় লেখা – কারাবন্দিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে কোনো পত্রিকায় প্রবন্ধ বা কলাম লেখা যাবে না। অনুমতি ছাড়া কিছু প্রকাশ করলে রাজকীয় সরকার আমার জন্য কারাগারে দিন গুজরানের বন্দোবস্ত করবেন।

গঞ্জের ব্যবসায়ীরা যে রকম বাজারহাটের অন্ধিসন্ধি কায়-কারবারের গোছগাছ ভালো বোঝে, সে রকম ইউএনডিপির স্থানীয় কর্মচারী মনে হয় জেলখানার পথঘাট ভালো করে চেনেন। আমাদের অতিক্রম করতে হয় আরেকটি ফটক। আমার ব্রিফকেস খুলে দেখার পালা এলে প্রহরীদের একজন দুই আঙুলের ইশারায় স্মোক করার সাংকেতিক মুদ্রা দেখান। কর্মচারী তার ব্যাগ থেকে দুপ্যাকেট সিগারেট বের করে তাতে দুখানা করে লিসোটোর কারেন্সি বিশ মালতির নোট গুঁজে প্রহরীদের হাতে দেন। খটাখট করে খুলে যায় লৌহ-কপাট। আমি তার দক্ষতার প্রশংসা করলে তিনি ফিসফিস করে জবাব দেন – রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছোটখাটো কিছু কথা বলার জন্য এ-কারাগারে কাটিয়েছেন তার জিন্দেগির সাড়ে চারটি বছর। তখনই ভেসে আসে ভয়াবহ আর্তনাদের শব্দ। লিসোটো ভাষায় এ আকুতি এমনই মর্মস্পর্শী যে, মনে হয় কাউকে বেঁধে তার গায়ে জ্বলন্ত লোহার ছ্যাঁকা দেওয়া হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। মনে হয়, এবার মানুষটির মুখে রুমাল গুঁজে দিয়ে অসহায় চিৎকারের তেজকে ভোঁতা করে দেওয়া হচ্ছে। পস্নাস্টিকের ব্যাগে পোরা হাতিপোকার অবরুদ্ধ আওয়াজের মতো করিডর ধরে বেজে যায় গোঁ-গোঁ শব্দের প্রতিধ্বনি। স্থানীয় কর্মচারীর চেনা একজন কারারক্ষী এসে তার সঙ্গে হাত মেলান। আমার পরিচয় দিতেই তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করেন। তখন তার চকচকে চাঁদিতে উল্কি করে আঁকা রক্তাক্ত কাঁকড়া-বিছার ছবি দেখে আমি আঁতকে উঠি। স্থানীয় কর্মচারী তার হাতে বিশ মালতির নোটসহ সিগ্রেটের প্যাকেট পাচার করেন। আমি আর্তনাদের ব্যাপারটি জানতে চাই। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলেন, কিছু কারাবন্দি ভুগছে মারাত্মক এইডস ব্যাধিতে। শরীরী কষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠলে এদের কেউ-কেউ হলস্না-চিৎকার দেয়, ব্যথায় কান্নাকাটি করে। কিন্তু এরা দাগি আসামি, শরীরে সামান্য ব্যথা-বেদনা হলেই তো আর এদের জেলখানা থেকে খালাস দেওয়া যায় না!  তিনি এবার ফস করে একশলা সিগ্রেট ধরিয়ে তার পাকস্থলী দেখিয়ে ইশারায় আমার কাছে কী যেন একটা নালিশ করেন। রক্ষী মুখে কিছু বলছেন না, কেবল ইঙ্গিতে পেট দেখাচ্ছেন। ঠিক বুঝতে পারি না – ক্ষুধায় তিনি কাতর হয়েছেন কী? নাকি কষ্ট পাচ্ছেন পৈটিক কোনো গোলযোগে? আমি ইউএনডিপির স্থানীয় কর্মচারীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করি। অবশেষে আরেকখানা বিশ মালতির নোট দিতেই তিনি সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে ছোটখাটো স্যালুট দেন।

 

আমরা এসে ঢুকি জানালাহীন আধো-অন্ধকার একটি কামরায়। ওখানে বসে আছেন অলটারনেটিভ টু ভায়োলেন্স নামক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আগ্রহী এগারোজন কারাবন্দি। এরা সবাই যাবজ্জীবন পেয়ে বাস করছেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সলিটারি সেলে। কামরায় একসারি বেঞ্চের পেছনে দেয়ালের কাছে আছে একটি বেদি। তাতে কাঠের ক্রুশের তলায় দাঁড়িয়ে ঝিমাচ্ছেন যিশু ও তাঁর জননী মা মরিয়মের পাথরের মূর্তি। বেদির পেছনে রাখা চারটি খালি কফিন। কর্মচারী বুঝিয়ে বলেন যে – এ-কামরাটি খানিকটা গির্জার মতো, ফাঁসির আগে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত কয়েদিকে বাইবেল পড়ে শোনানো হয় এখানে। প্রার্থনা করারও সুযোগ দেওয়া হয়। আর কারাগারে যেসব মানুষের অন্যান্য কারণে মৃত্যু হয় তাদের মরদেহ সমাহিত করার আগে এখানে নিয়ে আসা হয়। একজন পাদ্রি তাদের শেষকৃত্যের আচারাদি এ-বেদির সামনে সম্পন্ন করে দেন।

চাঁদিতে উল্কি-আঁকা কারারক্ষী আমাকে আলোচনার জন্য পাক্কা দুঘণ্টা মেয়াদ দিয়ে শিকল টেনে দরোজায় তালা দেন। আমি সঙ্গে-সঙ্গে কারাবন্দিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে কাজের কথায় আসি। ব্রিফকেস থেকে মার্কার ও পোস্টার পেপার বের শুরু করি কথাবার্তায়। আমি চাচ্ছি প্রশিক্ষণের আগে এরা কে কি শিখতে চান তার চাহিদা নির্ণয় করতে। কিন্তু সকলে – কারাগারে তারা আজকাল কী ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করছেন, কী কারণে ভায়োলেন্স হচ্ছে, তা আলোচনা করতে চান। আমি রাজি হয়ে তাদের একটু নিরিখ করে দেখি। এরা সবাই দাগি ক্রিমিনাল, এদের মাঝে সাতজন খুনের মামলায় যাবজ্জীবন পেয়েছেন, একটি বিষয়ে খটকা লাগে, এদের চোখেমুখে আমি কিন্তু কোনো অপরাধের ছাপ দেখি না। সবাই বয়সে তরুণ। এদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সেমিনারে এসে বসা অনাগ্রহী ছাত্রদের মতো দেখায়।

কারাগারের সমস্যা সম্পর্কে কথাবার্তা শুরু হলে আমি মূল পয়েন্টগুলো মার্কার দিয়ে পোস্টার পেপারে লিখি। ভায়োলেন্সের একটি প্রধান কারণ হচ্ছে – কারাগারে খাদ্যের সংকট। সশ্রম কারাদ–র কয়েদিরা সারাদিন পাথর ভাঙার পরিশ্রম করেন। কিন্তু এদের খাবার দেওয়া হচ্ছে মাত্র দুবেলা। আবার কারারক্ষীদের সঙ্গে ছোটখাটো মতভেদ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে প্রায়ই এক বেলার খাবার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কয়েদিদের। তো ক্ষুধায় কাতর হয়ে কোনো-কোনো কয়েদি অন্য কয়েদির খাবার কেড়ে নিতে গেলে সূত্রপাত হয় হিংসাত্মক দ্বন্দ্বের। পরিণতিতে বেধে যায় মারপিট। জেলখানার নিয়ম হচ্ছে – ছেলেদের সপ্তাহে দুবার করে মাথা ও মুখ কামানো। মসৃণভাবে কামানো না হলে তাদের চুলে বা মুখে পেইন্ট ব্রাশ দিয়ে দাগ দিয়ে দেওয়া হয়। কারাগারে ক্ষুর বা বেস্নডের সরবরাহ যথেষ্ট নয়। এগুলো নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়লে তা থেকে বাধে রক্তাক্ত সংঘাত। হ্যাঁ, কারাগারে বাস করছে বেশকিছু এইডসগ্রস্ত কয়েদি। এদের ক্ষুর বা বেস্নড ব্যবহার করা বিপজ্জনক, এতে রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা আছে। তার চেয়ে বড় বিপদ যেটি – সেটি নিয়ে কিছু বুঝিয়ে বলা মুশকিল…। এ পর্যন্ত বলে আলোচনায় নীরবতা নেমে এলে আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করি, বলি – আমাকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে না বললে প্রশিক্ষণের নকশা করতে আমার অসুবিধা হবে। খানিক ইতস্তত করে দু-তিনজন কয়েদি একসঙ্গে বলেন – বড় সমস্যা হচ্ছে ‘পেটো’। আমি শব্দটি বুঝতে না পারলে ইউএনডিপির স্থানীয় কর্মচারী ফিসফিস করে অনুবাদ করেন ‘রেপ’। কারাগারে রেপের ঘটনা ঘটছে প্রচুর। স্কুলের কমবয়সী একটি ছেলে কয়েদি হয়ে এসেছিল। সে রেপের শিকার হয় কয়েকবার। যারা তাকে দৈহিকভাবে ধর্ষণ করার সুযোগ খুঁজতো তাদের মাঝে ক্ষুর-বেস্নড নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধে। আমি জানতে চাই – ছেলেটি এখন কোথায়? জবাবে শুনি – তাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে কনডেম সেলে রাখা হয়েছে। মাঝে-মাঝে সশ্রম কারাদ–র শর্ত পূরণ করার জন্য তাকে পাঠানো হচ্ছে রাতের বেলা জেলারের বাসায় কাজ করতে। কোনো-কোনো কয়েদির মুখে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসির রেখা দেখা যায়।

আমি এবার আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে একটু আগে করিডরে শোনা আর্তনাদের প্রসঙ্গ তুলি। আমার আন্দাজ মিথ্যা নয়, তথ্য বের করে আনার জন্য – বিশেষভাবে রাজনৈতিক কারণে বন্দিদের টর্চার করা হচ্ছে অহরহ। তারা জোরে চিৎকার করলে মুখে পলিথিনের ব্যাগ বেঁধে দেওয়া হয়। ইউএনডিপির কর্মচারী আমার হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেন। তাতে লেখা – গত দেড় বছরে তিনজন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে টর্চারের সময় মুখে পলিথিনের ব্যাগ বেঁধে দেওয়ার ফলে। এরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান।

এ-বিষয় নিয়ে পাশের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে। আমি এবার জিজ্ঞাসা করি – অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কারাগারে সমস্যা হচ্ছে কি? খুবই শক্ত-সামর্থ্য এক কয়েদি সামনে এসে পাজামার পায়া তুলে দেখান দগদগে লালচে জখমের চিহ্ন। তিনি দুহাত মুঠো করে তার তীব্র ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করে বলেন, ‘স্যার, পৃথিবীর মাত্র একটি জেলখানায় ঘোড়া দিয়ে মানুষের ওপর ভায়োলেন্স চালানো হয়, সেটি হচ্ছে মাসেরুর সেন্ট্রাল জেল।’ আমি বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাকে এক সপ্তাহে তিনবার খাবার থেকে বঞ্চিত করলে তিনি কারারক্ষীর ওপর খেপে ওঠেন। এ-কারণে তাকে হাতে-পায়ে বেঁধে চোখে পট্টি লাগিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় পালামা নামক কারাগারের পোষা ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়া তাকে নিয়ে ছুট লাগালে তিনি বোল্ডারের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে পয়লাবার জখম হন। তাকে আবার চাপানো হয় পালামার পিঠে। পরপর তিনবার তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে আঘাত পান।

তৃতীয়বার ঘোড়ার খুরের বাড়ি লাগে তার হাঁটুতে। সে থেকে তিনি খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। চার মাস হয়ে গেছে, হাঁটুতে যন্ত্রণা হচ্ছে প্রচুর কিন্তু তাকে কোনো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। তাকে ঘাড় ধরে ঝাঁকিয়ে বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে আরেক কয়েদি আমার সামনে এসে দাঁড়ান। হরর ফিল্মের অভিনেতার মতোই ভয়াবহ তার মুখের অভিব্যক্তি। তিনি চিবিয়ে-চিবিয়ে কথা বলেন, ‘স্যার, আই লাইক টু টেল ইউ সামথিং পেস্নইন অ্যান্ড সিম্পল।’ আমার ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘হিস ম্যাজেস্ট্রি দ্য কিং’ মৃত্যুদ- মওকুফ করে আমাকে যাবজ্জীবন দিয়েছেন। কয়েক বছর পর আমি কারাগার থেকে বের হব অবশ্যই। ‘দেন, লিসেন হোয়াট আই অ্যাম গোয়িং টু ডু।’ তিনি দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলেন, ‘আই অ্যাম গোয়িং টু শুট দ্য ফাকেন হর্স  পালামা… হারামি ঘোড়াটার লেজ কেটে নিয়ে আমি রাজদরবারের সিংহাসনের সামনে রাখব।’

খুব সাবধানে আমি কথাবার্তার কনক্লুসনে আসি যে, বাদবাকি প্রসঙ্গ আমরা পরের দিন প্রশিক্ষণের সময় আলোচনা করব। সবাই যখন তাদের সেলে ফিরে যাওয়ার জন্য উঠতে যাচ্ছে, আমি তখন জানতে চাই – কারো নাম কামাহেলো কি না? একটি তরুণ লাজুক মুখে, ‘দ্যাটস মি, আই অ্যাম স্যার’, বলে সাড়া দেয়। আমি তাকে আরো মিনিটপাঁচেক বসতে বলে অন্যদের কাছ থেকে বিদায় নিই। ইউএনডিপির স্থানীয় কর্মচারী অন্য কয়েদিদের কামরার বাইরে প্রহরীর কাছে সমর্পণ করছেন। আমি কামাহেলোর সঙ্গে কথা বলি।

কামাহেলো হচ্ছে লিসোটোর বয়স্ক শিক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার মি. মোজাফেলার বড় ছেলে। অনেক বছর আগে আমি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে বয়স্ক শিক্ষাবিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে যুক্ত ছিলাম। লিসোটো থেকে আন্তর্জাতিকমানের এ-প্রশিক্ষণে মি. মোজাফেলা তাঁর সরকারের তরফ থেকে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তখন তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। অনেক বছর পর লিসোটোতে বেড়াতে এসে মি. মোজাফেলার সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়। সত্যি কথা বলতে – মাসেরু শহরের আশপাশে পাহাড়, হ্রদ ও উপত্যকায় আমার ঘুরে বেড়ানোর বন্দোবস্ত করে দেন মি. মোজাফেলা। তখন অন্তরঙ্গভাবে কথাবার্তা বলে জানতে পারি তাঁর পরিবারের যুগ্ম ট্র্যাজেডির বিষয়টি। তাঁর ছোট ছেলে কানানেলো ছিল জন্মগতভাবে আলবাইনো বা ধবলগ্রস্ত এক কিশোর। লিসোটো সমাজে একটি প্রচলিত কুসংস্কার হচ্ছে – ধবলগ্রস্ত মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মন্ত্রপূত চূর্ণ ও নির্যাসে প্রস্ত্তত আরক ব্যবহার করলে মানুষ নাকি আশাতীত ক্ষমতার অধিকারী হয়। তো ওই সমাজের অজ্ঞাত এক ইয়ানগা বা বস্ন্যাকম্যাজিক জাতীয় জাদুটোনার ওঝা কানানেলোকে খুন করে তার শরীরের কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধারালো অস্ত্রে কেটে নেয়। এ ঘটনার কিছুদিন পর তাঁর বড় ছেলে কামাহেলো ছোটভায়ের হত্যাকারী বিবেচনা করে বস্ন্যাকম্যাজিক চর্চাকারী এক ইয়ানগাকে হত্যা করে। বিষয়টি নিয়ে প্রচুর কোর্ট-কাছারি হয়। কিন্তু আদালতে কামাহেলোর হাতে নিহত ইয়ানগা যে তার ছোটভাই কানানেলোর হত্যাকারী তা প্রমাণ করা যায়নি। পরিণামে কামাহেলোকে আদালত যাবজ্জীবন দ- দিয়ে কারাগারে পাঠান।

কামাহেলোর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমি একটি বিষয় খেয়াল করি যে, মি. মোজাফেলার এ-কারাবন্দি বড় ছেলের চেহারার সঙ্গে তাঁর মুখের কোনো মিল নেই। একথা সত্যি যে, তার ছোটভাই ধবলগ্রস্ত কানানেলোকে খুন করার প্রতিশোধে সে এক বস্ন্যাকম্যাজিকের ওঝা ইয়ানগাকে হত্যা করে জেলখানায় যাবজ্জীবন কাটাচ্ছে, তার আচরণে দাগি খুনির কোনো ছাপ নেই, বরং সাতাশ-আটাশ বছরের তরুণটিকে প্রেমে-পড়া যুবকের মতো অপ্রস্ত্তত দেখায়। আমি তার হাতে মি. মোজাফেলার চিঠি দেই। সঙ্গে কাগজ-কলম বাড়িয়ে দিলে সে বাবাকে দ্রম্নত চিঠির জবাবও লিখে। খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিকে বছরে মাত্র একবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়। ক্রিসমাসের সময় মি. মোজাফেলা কারাগারে এসেছিলেন, কিন্তু উৎকোচ দিতে অস্বীকার করায় তাঁকে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। চিঠি লেখা শেষ হলে আমি তার কাঁধে হাত রেখে জানতে চাই, ‘সান, টেল মি হাউ ইট ইজ লাইক লিভিং ইন অ্যা জেল?’ সে জবাব দেয়, ‘খুব খারাপ না আংকেল, প্রাণে বেঁচে থাকা যায়, মাছকে সরোবর থেকে তুলে সামান্য পানি দিয়ে একটি ভা– রাখার মতো। সাঁতার কাটা যায় না, আর দম ফেলতে কষ্ট হয়।’ আমি এবার জানতে চাই, ‘কামাহেলো, সেলে একাকী তোমার সময় কী করে কাটে?’ সে মস্নান হেসে জবাব দেয়, ‘কথা ছিল বাবা আমাকে কেপটাউনের একটি ইউনিভার্সিটিতে পাঠাবেন, কিন্তু এসব ঘটনা ঘটে গেল, আমি অ্যারেস্ট হয়ে জেলখানায় আসলাম, আমার আর কেপটাউনে যাওয়া হয়নি… সেলে যখন একা থাকি, আমি চোখ বন্ধ করে কেপটাউনের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের কথা ভাবি। কল্পনা করি – আমি বসে আছি লাইব্রেরিতে। ক্লাসে যাই, নোটবুকে লেকচারের মেইন পয়েন্টগুলো লিখি। ছুটির দিনে হাঁটতে-হাঁটতে চলে যাই টেবোল মাউন্টেনের ওপর। চূড়ায় দাঁড়িয়ে গায়ে বাতাসের তাজা ছোঁয়া মাখতে-মাখতে দেখি সিগালের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে রবিন আইল্যান্ডের দিকে। আইল্যান্ডের ঘরদুয়ার, জেটি, বোট সব আমি পরিষ্কার দেখতে পাই। ওখানকার কারাগারে তো মদিবা নেলসন ম্যান্ডেলা অনেক বছর কাটিয়েছিলেন, তাঁর

কথাও ভাবি… সময় কেটে যায়।’ আমি তাকে তার বাবার পাঠানো পাউরুটি ও অরেঞ্জ মার্মালেডের জার দেই। সে খুব লাজুকভাবে বলে, ‘আংকেল, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমি এখানে বসে একটু রুটি খাব।’ সে আঙুল দিয়ে রুটির ছেঁড়া টুকরায় অরেঞ্জ মার্মালেড লাগিয়ে খায়। খেতে-খেতে সে বলে, ‘আমার কাছে পাউরুটি আছে জানতে পারলে কেউ না কেউ তা কেড়ে নেওয়ার জন্য আমাকে অবশ্যই আক্রমণ করবে।’ বেশ খানিকটা পাউরুটি খেয়ে সে বাকি রুটিটুকু চিপে ছোট করে গেঞ্জির ভেতরে ঢোকায়। অরেঞ্জ মার্মালেডের ছোট্ট জারটি আন্ডারওয়্যারের ভেতর ঢুকিয়ে বিদায় নেওয়ার সময় বলে, ‘আংকেল, পরের বার আসলে বাবার কাছ থেকে টুথব্রাশ ও পেস্ট নিয়ে আসবেন কাইন্ডলি।’

জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসার পথে দেখি – গেটে একটি পিকাপ ট্রাকে তোলা হচ্ছে লাল রঙের ঘোড়াকে। ইউএনডিপির স্থানীয় কর্মচারী আমাকে ফিসফিস করে বলেন, ‘দিস ইজ পালামা, জেলখানার টর্চার হর্স।’ ধুলা উড়িয়ে পিকাপটি ছুটে চলে মাসেরু শহরের দিকে। আমাকে জেলগেটে আবার সইসাবুদ করতে হয়। তাতে একটু সময় লাগে। তো এক সময় কারারক্ষীদের সঙ্গে হাতটাত মিলিয়ে আমরা ফেরার জন্য ল্যান্ড রোভারে চাপি। মাসেরু শহরে ঢোকার পথে দেখি – পিকআপ ট্রাকখানা থেমে আছে। আমরাও গাড়ি থামাই। ইউএনডিপির স্থানীয় কর্মচারী খোঁজ নেন। পালামার শরীর খারাপ যাচ্ছে। তাই তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পশুচিকিৎসকের হাসপাতালে। গাড়ির কি একটা বিগড়ে গেছে, তাই সারাই করতে হচ্ছে। কথাবার্তার সুযোগে আমি পালামার একটি ছবি তুলে নেই।