লুব্ধক

লেখক: মাহবুব আজীজ

আত্মহত্যা তাহলে এরকম!

নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর শেষ বিন্দু দেখতে পায় মোজাফফর হোসেন;  ষোলোতলা বারান্দা থেকে এক লাফে মৃত্যু হবে তার!

দশ সেকেন্ড আগেও বোঝেনি মোজাফফর – কথা শুনছিল আর হাসছিল, মাসুদ সাহেবের লাগাতার রসিকতায় না হেসে থাকা যায় না; যদিও সে এসেছে মাসুদ সাহেব মানে ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমানের কাছে একান্ত প্রয়োজনে। মোজাফফর মন্ত্রণালয়ের সেকশন সাব-ইনচার্জ, আপিসে মাসুদ সাহেবের টেন্ডারের ফাইল তার বোকামিতে আটকে গেছে; সেটা মোজাফফরের মাথা ঘামানোর বিষয় হতো না, তার মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে – কাজটি সে করে দেবে বলে আগেই মাসুদুর রহমানের কাছ থেকে দুই দফায় দুই লাখ দুই লাখ করে মোট চার লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে বসে আছে। সোজা বাংলায় অগ্রিম ঘুস নিয়েছে সে এই টাকা, এখন ঊর্ধ্বতন তানভীর হোসেনের টেবিলে ফাইল গেছে আটকে – অতঃপর কর্তব্য ঠিক করার জন্য মাসুদ সাহেবের কাছে আসে মোজাফফর। সন্ধ্যার ঠিক আগে, ধানম–র লেকপাড়ে সুরম্য এক অ্যাপার্টমেন্টের ষোলোতলায় মাসুদুর রহমান থাকেন, তিনি মোজাফফরের সর্বশেষ পরিস্থিতি শুনবেন আজ, এর মধ্যে তার বিরাট ড্রইংরুমে উপস্থিত হন মোবাইল ফোন কোম্পানির এক নির্বাহী – রসিক মাসুদ সাহেব নির্বাহী আর মোজাফফরের সঙ্গে এমনসব কথা বলতে থাকেন, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন নির্বাহী, রসিকতা বোঝার মতো অবস্থায় নেই মোজাফফর, কিন্তু তাকেও হাসতে হয়। অনর্গল কথা বলেন মাসুদ সাহেব; এরই এক ফাঁকে ড্রইংরুম-সংলগ্ন বারান্দায় আসে মোজাফফর সিগারেটে টান দিতে – আচমকা তখনই এই কা-!

ছোট্ট একচিলতে দখিনমুখী বারান্দা, গ্রিল নেই – কোমরসমান উচ্চতায় তিনদিক কাচঘেরা, দরজা দিয়ে বেরোলেই সামনে সীমাহীন শূন্যতা; যেন হাত বাড়ালেই আকাশ ছোঁয়া যায়। শুরুতে বেশ লাগে মোজাফফরের – এতো উঁচু থেকে ঢাকা শহর দেখতে ভালো লাগে তার; ধানম– লেক, ছিমছাম বাড়ি, ইতস্তত রাস্তা – সে মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতে সামনে এগোয় আর মুহূর্তের মধ্যে, মোজাফফর জানে না – তার সত্তার কোন গভীর অন্ধকার থেকে তীব্র এক ইচ্ছা এসে সমগ্র ভেতরটাকে গ্রাস করে, মোজাফফরের পুরো শরীর প্রস্ত্তত হয়ে ওঠে – দিই এক লাফ, সব শেষ করে দিই!

ঝটিতে নিজেকে পেছনের দিকে নিয়ে আসতে থাকে মোজাফফর – না, কিছুতেই না। এভাবে না। কেন সে মরবে? বিস্ময়কর আরো যে, মোজাফফর দেখতে পায় উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে তার মাথা থেঁতলে যায়! … সে পেছাতে থাকে, পেছাতে পেছাতে দেয়ালের দিকে নিজেকে শক্ত করে সেঁটে রাখে আর টাইলস-বসানো মেঝের দিকে তাকিয়ে কোনোমতে একটা সিগারেট ধরায়, বিস্ময়ের সঙ্গে মোজাফফর আরো দেখে – সিগারেট ধরাতে গিয়ে তার ডান হাত থরথর করে কাঁপে, তার ডান পাও কাঁপে অবিরত; সে বারান্দার মেঝের দিকে অনড় চোখে তাকিয়ে অতিদ্রুত সিগারেটে টান দিতে থাকে, কোনোভাবেই সে সামনের বিস্তারিত আকাশের দিকে আর তাকায় না; তীব্র ভয় মোজাফফরের বুকের ভেতর জাপটে ধরে – তার মনে হতে থাকে, আরেকবার সামনের এই দিগন্তবিসত্মৃত আকাশ বা মাটিতে চলমান পিঁপড়ের সারির মতো মানুষের দিকে তাকালে সে আর নিজেকে ষোলোতলার এই বারান্দায় আটকে রাখতে পারবে না! আধখাওয়া সিগারেট নেভায় সে গোড়ালির ঘষায়, সেখানেই ফেলে রাখে সিগারেটের মোথা, ওটা তুলে বাইরে ফেলার জন্যে কাচঘেরা কার্নিশের পাশে যাওয়ার সাহস তার হয় না; সে মুখ গুঁজে ফিরে আসে মাসুদুর রহমানের ড্রইংরুমে।

তখনো হাসছেন মাসুদ সাহেব, লোকটি অনর্গল কথা বলতে পারেন – ‘সিলেটের সাইফুর রহমান সাহেব তখন অর্থমন্ত্রী। ইনকাম ট্যাক্সের অফিসাররা গেছেন ভরদুপুরে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। মন্ত্রী বললেন, সোয়েটার পরে আসো! ভাদ্র মাসের গরমে মন্ত্রী তাদের সোয়েটার পরে আসতে বললেন কেন, বেচারারা বুঝতে পারলেন না! কিন্তু মন্ত্রীর হুকুম বলে কথা! তারা বঙ্গবাজারে গিয়ে হাতের কাছে যে-মাপ পেলেন, সেইমতো তড়িঘড়ি সোয়েটার পরে ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে মন্ত্রীর সামনে চলে এলেন। মন্ত্রী হতভম্ব। গেজেটেড অফিসারদের আচরণে তার আক্কেলগুড়ুম! তিনি তাদের আসতে বলেছেন সন্ধ্যা ছয়টার পর, বেকুবগুলো চারটার সময় প্রচ- গরমের মধ্যে শীতের জাম্পার পরে তার সামনে দাঁত কেলিয়ে হাসছে! … মন্ত্রী বললেন, আমি তোমাদিগকে আসিতে বলিলাম আফটার সিক্স ও’ক্লক … তোমরা জাম্পার পরিয়া …’

মাসুদুর রহমান নির্বিকার বলে যান, নির্বাহী আর মোজাফফর হাসতে থাকে। মোবাইল কোম্পানির নির্বাহী উঠি উঠি করেন অনেকক্ষণ, তবে ওঠেন না – গল্প শোনেন আর হেসে গড়িয়ে পড়েন, মোজাফফরও হাসে বটে; বারান্দা থেকে ফেরার পর তার ভেতরটা কাঁপে, অচেনা অবসন্নতা নীরবে তার ভেতরে বয়ে যায়।

মাসুদ একের পর এক গল্প বলেন, মোজাফফর হাসিমুখে তা শুনলেও তার ইচ্ছা করে, হঠাৎ তাকে বলে বসতে – ‘ভাই! খামোকা মনের সুখে কথা শুনবার মতো অবস্থায় আমি নাই। আমি জরুরি কথা বলবো!’ – অবশ্য কিছুই বলে না সে, চুপ করে মাসুদ সাহেবের মজাদার অভিজ্ঞতা শোনে আর হাসে।

‘বুঝলে হে মোজাফফর! শব্দ ঠিকমতো না বুঝলে খুব মুশকিল!’ – মোজাফফর ইতিবাচক মাথা নাড়ে, ইতোমধ্যে টেলি কোম্পানির নির্বাহী নিষ্ক্রান্ত হন; নির্বাহীকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলেন মাসুদ, ‘মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিও এখন আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে আসে বিনিয়োগ পাওয়ার ধান্ধায়!’

‘আপনি ছোট ব্যবসায়ী?’ মোজাফফর বোঝে, এই প্রশ্ন না করলে মাসুদ ক্ষুণ্ণ হবেন; তাই সে প্রশ্ন করে।

প্রসন্ন হাসেন মাসুদ, ‘নয়? বছরে দুই হাজার কোটি টাকা টার্নওভার না করলে সেই ব্যবসায়ীকে বড় ব্যবসায়ী বলতে চাই না আমি। আমার কত হয়? এক হাজার হয় কি না সন্দেহ!’

এক হাজার কোটি টাকা মানে কত টাকা? খানিক চিন্তা করে মোজাফফর বুঝতে পারে, এটা নিয়ে ভেবে সে কোনো উত্তর খুঁজে পাবে না; তাই সে সোজা নিজের কথা পাড়ে – ‘ভাই। সেকশন অফিসারের পদ খালি ছিল, আমি চার্জে ছিলাম। তখন আপনার সঙ্গে ডিল হইছে। এর মধ্যে নতুন অফিসার আসছেন। পুরাটা প্যাঁচায়া গেছে।’

মাসুদ মনোযোগ দিয়ে শোনেন, মোজাফফর ছেলেটাকে তার ভালোই লাগে – সহজ-সরল একটা ব্যাপার আছে তার মধ্যে; বেচারা ঘুস খেয়ে বসে আছে; নতুন অফিসার এসে গেছে, এখন ভয়ে কাঁপছে! ছেলেটার বয়স কত হবে? চলিস্নশ হয়েছে কি? তার তুলনায় ছেলেই তো! মাসুদুর রহমান পঞ্চান্ন পার হলেন গত মাসে, বয়সের তুলনায় এখনো দুর্দান্ত ফিট – ভোর সাড়ে ৫টায় উঠে সোজা ধানম– লেকে চলে যান হাঁটতে। টানা দেড় ঘণ্টা হেঁটে ৭টায় ফিরে স্ত্রী লুনাকে ডেকে তোলেন। লুনা তার থার্ড ওয়াইফ, যা হয় আর কি – বাইরে থেকে লোকে হাসিখুশি জানলেও ভেতরে তিনি খুব মেজাজি, বিশেষ করে নিজের ঘরে; সম্ভবত প্রথম দুই বউ তাই বেশিদিন টেকেনি, তৃতীয়জন অর্থাৎ লুনা কিন্তু বেশ বুঝে গেছে তাকে; বয়সের ব্যবধান বিশ হলে কী হবে ঠিক তার মনমেজাজ বুঝে চলে সে; এক পুত্র, এক কন্যা ঘর আলো করে এসেছে, সাত বছর বয়স ছেলেটির – তপু; আর চার বছর মেয়েটির – টিয়া; মাসুদ আর লুনাকে সুখী দম্পতি বলা যায়। ‘বুঝলাম। নতুন অফিসার আসছে। তো? আমার কাজ তো চাই। নতুনকে ম্যানেজ করো।’ এবার গম্ভীরমুখে বলেন মাসুদুর রহমান।

‘তানভীর সাহেব একেবারে অন্য ধাঁচের অফিসার। ডিপার্টমেন্টে নতুন আসছেন। তার হাতের প্রথম টেন্ডার। ছয়শো কোটি টাকার প্রজেক্ট। আমি চেষ্টা করছিলাম। … তিনি নিয়মের বাইরে এক পা যাবেন না।’

‘দূর মিয়া। নিয়ম? নিয়ম জিনিসটা আবার কী? কত টাকা হইলে তিনি আমার ফার্মের পক্ষে সাইন করবে, সেটা বাইর করো!’

‘চেষ্টা করছিলাম ভাই। তিনি ভাবেসাবে বুঝায় দিছেন, আমি সোজা না হইলে বিপদে পড়বো!’ মোজাফফরের নিরীহ মুখের দিকে মাসুদুর রহমান নির্বিকার শান্তভঙ্গিতে সোজা তাকিয়ে থাকেন – বেশিদিন যে তিনি ছেলেটিকে চেনেন, এমন নয়। মাসকয়েক হলো তার সঙ্গে যোগাযোগ করে মোজাফফর, এর আগে তার ফার্মের
এর-ওর সঙ্গে ছোটখাটো ডিল সে করেছে; এর মধ্যে বড় রাস্তা আর সেতু তৈরির টেন্ডার বিভাগে বদলি হয়ে আসে মোজাফফর, আর তখন থেকেই সরাসরি যোগাযোগ।

পল্টনে তার আপিসেই সাধারণত আসে মোজাফফর; তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে আপিসের বদলে মাসুদ সাহেব বাসায় নিজের ড্রইংরুমে বসে কথা বলতে পছন্দ করেন। আজ নিয়ে মোজাফফর বারতিনেক মাসুদ সাহেবের ধানম–র ফ্ল্যাটে আসে।

কোনো ফ্ল্যাট যে এতো অভিজাত আর সুন্দর হতে পারে, মোজাফফরের ধারণা ছিল না। কত আয়তন হবে এর? ডুপেস্নক্স ফ্ল্যাট। সাত-আট হাজার স্কয়ার ফিট হতে পারে। ১০ হাজারও হতে পারে। ড্রইংরুমই তিনখানা। যাহ, বাবা! চিন্তা করতে চায় না মোজাফফর; মাথা ঝিমঝিম করে।

মোজাফফরের কি ঈর্ষা হয়? এরকম একটি ফ্ল্যাট, এরকম একটি সচ্ছল জীবন কি সে মনে মনে চায়?

আসলে বড়সড় দূরে থাক, আদৌ নিজের একখানা ফ্ল্যাট ঢাকা শহরে হতে পারে – এই ধারণাই কোনোদিন মোজাফফরের মাথায় আসেনি। বিশ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে একখানা এমএ ডিগ্রি নিয়ে নন-ক্যাডার সার্ভিসে তথ্য মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং পায় সে। তৎকালীন সরকারের ছাত্র সংগঠনের নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে ধরে চাকরিটি পেয়ে যায় সে, বছরখানেকের মধ্যে বিয়ে করে মোটামুটি নিরিবিলি জীবনযাপনের চেষ্টা করে মোজাফফর। তার বউ বিলকিস, মা পছন্দ করেন ময়মনসিংহে, চোখ বন্ধ করে তাকে বিয়ে করে মোজাফফর অনেকবারই ভেবেছে, নাহ্, কোনো ভুল হয়নি। ভালোই আছে সে, জিগাতলায় আড়াই রুমের ভাড়া বাসা, ইলেকট্রিসিটি-গ্যাস-পানি সব আছে ঠিকমতো, বিলকিসের চাহিদা সীমিত; ছেলেটা ক্লাস এইটে পড়ে ধানম– বয়েজে, মেয়েটা ক্লাস ফোরে অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ে। বিলকিস জানপ্রাণ দিয়ে আগলে রাখে সংসার; ময়মনসিংহের বাদিহাটিতে মা আছেন মোজাফফরের, বাবা গত হয়েছেন কয়েক বছর, একা মা ভিটা আঁকড়ে থাকবেন, আছেন – মোজাফফর চেষ্টা করেও মাসে হাজারখানেক টাকা নিয়মিত পাঠাতে হিমশিম খায় বরাবর। হিমশিম খায় সংসারের আরো বহুকিছু সংস্থানে। এরকম বাস্তবতায় মোজাফফরের পক্ষে সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন মনে মনে দেখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বছরখানেক আগে সড়ক ও সেতু অধিদফতরে বদলি হওয়ার পর থেকে অবশ্য নিজের জীবনে মোজাফফর বদল দেখতে পায়।

টেন্ডার ফাইলের ইঁদুর-দৌড় – একটু এদিক-ওদিক করলেই টাকা! শুরুতে ৫ হাজার, ১০ হাজার; আসেত্ম আসেত্ম বাড়তে থাকে টাকার অংক; ছয় মাস আগে সেকশন ইনচার্জের চেয়ার হয় শূন্য, অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সেটি পালন করে সাব-ইনচার্জ মোজাফফর, আর সেই সময়ে বুক ঠুকে মাসুদ সাহেবের কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিয়ে মহাবিপদে পড়ে মোজাফফর! সম্প্রতি সেখানে বিসিএস ক্যাডারের তানভীর সাহেব প্রধান কর্তা হিসেবে আসীন হয়েছেন, আর তারপর মোজাফফর হয়েছে ঠুঁটো জগন্নাথ! ইতোমধ্যে ঘুসের সমুদয় টাকা খরচ করে মোজাফফরের ঘুম হারাম হওয়ার দশা! কী করবে সে এখন?

‘বাবা, বাবা … লাসি পায়ে ব্যথা পেয়েছে। তাড়াতাড়ি আসো।’ ডুপেস্নক্সের দোতলায় তখন রীতিমতো কান্নাকাটি – মাসুদ সাহেবের স্ত্রী লুনা চিৎকার করে কাঁদছেন, ‘তাড়াতাড়ি আসো। লাসির পায়ে গরম পানি পড়ছে!’ একটা কুকুরের আর্তধ্বনি ছাপিয়ে মা-মেয়ের চিৎকার মোজাফফরের কানে আসে।

মাসুদ সাহেব দৌড়ে যান, তাদের প্রিয় কুকুর লাসির পায়ে গরম পানি পড়েছে!

অনতিবিলম্বে মোজাফফর দেখতে পায়, লাসিকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় নামছেন লুনাভাবি, পাশে মাসুদ সাহেব, কন্যা টিয়া, পুত্র তপু, বাসার কয়েকজন গৃহকর্মী উদ্বিগ্ন মুখে পিছু পিছু নামে।

আর তারপর মোজাফফরকে বড় ড্রইংরুমে বসতে বলে মাসুদ সাহেব পাশের ছোট ড্রইংরুমে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, ‘তোমরা এরকম করলে হবে! একটু ধৈর্য ধরো! ডাক্তারকে ফোন করেছি। চলে আসবে।’

‘আমরাই যাই না কেন? লাসি এভাবে কষ্ট পাবে!’

‘বিপদে ধৈর্য ধরতে হয়! … পেশেন্স। পেশেন্স। কয়েক মিনিট। কেয়ারটেকার অলরেডি রওনা দিয়ে দিয়েছে। গাড়ি নিয়ে গেছে। ডাক্তার আসছে।’

এরপর শুরু হয় টোটকা চিকিৎসা। আলু ছেঁচে নিয়ে আসে গৃহকর্মী, লুনাভাবি কাঁদতে কাঁদতে লাসির পায়ে তা লাগাতে থাকেন, কাপড় ভিজিয়ে, বরফকুঁচি দিয়ে নানা কায়দায় লাসিকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে কয়েকজন; বেচারা লাসি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একবার লুনাভাবির কোলে, একবার টিয়ার কোলে আশ্রয় নেয়। মোজাফফর নিজেকে পারিবারিক এই উদ্বিগ্ন পরিবেশ থেকে আড়াল করতে আবার সেই বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।

আবার কি ভয় পায় মোজাফফর? ষোলোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ার ভয়! এবার আর কার্নিশ পর্যন্ত এগোয় না সে, দেয়ালে শক্ত করে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকায়, রাত আটটার মতো বাজে, রাস্তার বাতি, গাড়ির আলো ওপর থেকে বিন্দু বিন্দু, পিঁপড়ের সারির মতো চলছে, টানা তাকিয়ে মাথা ঝিমঝিম করে মোজাফফরের – সে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকায়।

ময়মনসিংহ থেকে এসেছিল ঢাকায়; কত বছর হবে? উচ্চমাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে ভর্তি আর বাবার মৃত্যু পাশাপাশি ঘটনা, ১৯৯৯ সাল। তারপর থেকে একেবারে ক্লিশে, পরিচিত নিম্নমধ্যবিত্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের জীবন। টিউশনি, পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখি, কোনোরকমে টেনেটুনে সেকেন্ড ক্লাস। ভাগ্যক্রমে ঢাকায় তথ্য মন্ত্রণালয়ে ননক্যাডার চাকরি। তার ভাগ্য এক অর্থে আরো ভালো যে, প্রকল্প থেকে সেটি মূল চাকরিতে চলে যায়; সরকার পরিবর্তনেও তার অসুবিধা হয় না। সাধারণ চেহারা আর অমায়িক আচরণের মোজাফফরকে কেউই আপদ মনে করে না সম্ভবত। আসলে মোজাফফর ঝাঁকের কই হয়ে মিশে যেতে জানে।

সব চলছিল ঠিকঠাক – মাসুদ সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া চার লাখ টাকায় বাদিহাটিতে মায়ের থাকার ঘরখানাকে রীতিমতো পাকা করে ফেলেছে সে!

এখন আকস্মিক এই বিপদ!

অবশ্য মায়ের ঘর পাকা করা নিয়ে বিলকিসের অসন্তুষ্টি মোজাফফরকে যথেষ্ট সামাল দিতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে।

‘নিজের কিছু নাই। গ্রামের ঘর পাকা করতেছো! ওইখানে       থাকবেটা কে?’ রাতদিন বিলকিসের প্রশ্ন।

‘আহা! বাপের ভিটা বলে কথা! এগুলা ছেলেমেয়েদেরই হবে। বাপ-দাদার চিহ্ন লাগে না!’ মোজাফফর বোঝানোর চেষ্টা করে।

‘ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম। দাদার যে ছনের ঘর ছিল, সেই চিহ্নই থাক …। কামরাঙ্গীরচরে দুই লাখ টাকা শতাংশে জমি পাওয়া যায়। ওইখানে জমি কিনে বাড়ি করলে একটা অবলম্বন হইতো আমাদের! পুলাপান নিয়া এতো অনিশ্চয়তা … বাঁচন যায়! মাথার উপর চালটুকু না থাকলে!’

মাথার ওপর চাল! গভীর কথা বলে বটে বিলকিস; কিন্তু মোজাফফর বোঝে না, বৃদ্ধ মাকে ছনের ঘরে রেখে কীভাবে নিজের জন্য কামরাঙ্গীরচরে চলে যাবে সে? বিপদ হলে বাদিহাটিই সই!

বিপদাপদের কথা এতো ভাববারই বা কী আছে? কোন পথে বিপদ আসে, কে বলতে পারে। মোজাফফর কি জানতো, তার ছাঁচে ঢালা সব পরিকল্পনায় তানভীর সাহেব এভাবে পানি ঢেলে দেবে? মাসুদ সাহেবের প্রজেক্ট না হলে মোজাফফরের মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। এই লোকের কলিজা দেখার মতো; কোনো কাজ ছাড়াই যে চার লাখ টাকা দিতে পারে, কাজ শুরু হলে কী যে অপেক্ষা করছিল মোজাফফরের, তা শুধু সে এখন কল্পনা করে কেবল আফসোসই করতে পারে!

আবার এ-ও তো সত্য, টেন্ডার প্রকল্পে আসার আগে মোজাফফর দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি, তার হাতে একসঙ্গে চার লাখ টাকা আসবে কোনোদিন, ভেবেছে অবসরে যেতেই হবে একদিন, রিটায়ারমেন্টের সেই টাকা দিয়েই কোনোমতে একটা কিছু …।

তখন মা যে ছনের ঘরে থাকেন, এটা নিয়েও বাড়তি ভাবনা আসেনি।

কিন্তু আজ হলো কী মোজাফফরের? এই ফ্ল্যাটেও কয়েকবার এসেছে সে, আজ জেনেছে – এই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে প্রতি ফ্ল্যাটের মালিকের চারখানা করে গ্যারাজ, তিনটিতে নিজের গাড়ি থাকে, একটি গ্যারাজ অতিথির জন্য।

মোজাফফরের বুকের ভেতর টনটন করে। জীবনে একখানা নিজের গাড়ির কথা সে ভাবতেই পারে না, আর এরা ফ্ল্যাটের সঙ্গে নিজের তিনখানা গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করে নেয়!

‘দূর, আমি কি পাগল হয়ে গেলাম!’ – নিজেকেই ধিক্কার দিয়ে ভেতরে ড্রইংরুমে ফিরে আসে মোজাফফর, ততক্ষণে অল কোয়ায়েট অন্য দ্য কুকুর ফ্রন্ট! লাসি পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে তৃপ্ত মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাসুদ সাহেব আর লুনাভাবি পায়েসের বাটি নিয়ে লাসির পিছু পিছু হাঁটছেন, ‘ডগি, ডগি … পিস্নজ বেবি …’ লুনাভাবির আদুরে গলা।

‘ইয়েস। মোজাফফর। আসো । আসো। স্যরি। একটু আপসেট হয়ে গেছিলাম।’ মাসুদ সাহেব লাসিকে লুনাভাবির হাতে ন্যস্ত করে মোজাফফরের পাশের সোফায় বসে বলেন, ‘বুঝলে রিয়াল অ্যালসেশিয়ান। রেয়ার কালেকশন। এতো নরম যে … আহা!’

মোজাফফর হাসিমুখে দেয়ালে সাজানো পেইন্টিংয়ের সারির দিকে তাকায়। বাড়িতে যত দেয়াল এক নজরে দেখা যায় সব দেয়াল পেইন্টিংয়ে মোড়ানো। মোজাফফরের দৃষ্টির পথ ধরে মাসুদ সাহেব বলেন, ‘… পেইন্টিংস আমার আর লুনার হবি। দেশের এমন কোনো বড় পেইন্টার নাই যার কালেকশন আমাদের নাই।’ … পেছনের বিরাট একটা ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘সবগুলো অরিজিনাল। ওই যে মাঝেরটা, ওটার দাম ২৫ লাখ টাকা। ক্যাশে কিনেছি।’

মাসুদ সাহেব এবার সোফা থেকে উঠে মোজাফফরকে পাশে  নিয়ে তৃপ্ত মুখে ঘুরে ঘুরে দেয়ালে দেয়ালে সাজানো পেইন্টিং দেখাতে থাকেন। ‘এটা অরিজিনাল কামরুল। দ্য গ্রেট ম্যান। এটা সফিউদ্দীন। … ওই যে পাশের রুম … ওটাতে ফটোগ্রাফ আছে। পেইন্টিং তো আছেই। আমি বাঙালি কারো ফটোগ্রাফ কিনি না। সব ফরেন। … আর ওপাশের ড্রইংয়ে হস্তশিল্প। একেবারে রুট লেভেল থেকে জোগাড় করা!’

‘মাসুদভাই আমার ব্যাপারটা …’

‘আরে তোমার ব্যাপার! চলো … ওপাশের বড় বারান্দায় যাই। ওখানে বসার ব্যবস্থা আছে। বারবিকিউ পার্টি করি মাঝেমধ্যে। আর অনেক দামি কয়েকটা টেলিস্কোপ ফিক্সড রাখা আছে। কয়েকজন একসঙ্গেও গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায়। আমার আবার আকাশ দেখার খুব শখ! … চলো …’

মাসুদ সাহেব উত্তর দিকের বড় বারান্দায় মোজাফফরকে নিয়ে আসেন। নিজে একটি টেলিস্কোপে চোখ রেখে পাশেরটির দিকে ইশারা করে মোজাফফরকে বলেন, ‘গ্রহ-নক্ষত্র কিছু চেনো? স্বাতী তারা? … আসো আসো … চোখ রাখো এখানে …’

মোজাফফর কোনোদিন টেলিস্কোপ দেখে নাই, চোখও রাখে নাই। সে অপটুভঙ্গিতে চোখ রাখে, মাসুদ সাহেব তাকে গ্রহ-নক্ষত্রের পাঠ দিতে শুরু করেন, ‘বুঝলে। আকাশ যদি কেউ জানে; জীবনের রহস্য তার কাছে অনেক পরিষ্কার হয়ে যাবে। … ওই যে ওপাশে, ওটাকে বলে সপ্তর্ষিম-ল। ২৭টা নক্ষত্র আছে বুঝলে। একেকটা নক্ষত্রের চারটি করে শাখা!’

মোজাফফরের কাছে সবই আধো বুদ্বুদ বলে মনে হতে থাকে, তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে, এতো চমৎকার মানুষ মাসুদভাই – পেইন্টিং, গ্রহ-নক্ষত্র যার প্রিয়, তাকে নিশ্চিত ওই চার লাখ টাকার দায় থেকে মুক্তি দেবেন। আসল কথাটাই তো সাহসের অভাবে এতোক্ষণে মোজাফফর বলে নাই, চার লাখ টাকা যখন সে নেয় – তখনই মোজাফফর জানতো, এতো বড় প্রজেক্ট তার সাইনে হবে না। গেজেটেড অফিসার লাগবে। তখন সে এই তথ্য আড়াল করে টাকাটা নিয়ে নেয় মাসুদ সাহেবের কাছ থেকে; আরো কথা এই – সেকশন ইনচার্জ তানভীর সাহেব আরেক পার্টির সঙ্গে বন্দোবসেত্মর ভিত্তিতে এই প্রজেক্টে আসছেন, এমন একটি গুঞ্জন তখনই মোজাফফর শুনেছিল আপিসে। এই ব্যাপারটিও তখন মাসুদ সাহেবের কাছে চেপে যায় সে। তানভীর সাহেব আপিসে যোগ দিয়ে নিজের প্রথম কাজ হিসেবে প্রজেক্ট সেই পার্টিকে দিয়ে দিয়েছেন! অবশ্য এটা এখনো আনঅফিসিয়াল, কাগজপত্র সার্কুলার হয়নি এখনো। এটাও বেমালুম চেপে বসে আছে মোজাফফর!

‘কি, বেকুবের মতো তাকায় আছো? মন দিয়ে দেখবার চেষ্টা করো! নক্ষত্র চোখ না মন দিয়ে দেখতে হয়।’ – মাসুদ সাহেবের কথায় মন দিয়ে নক্ষত্র দেখার চেষ্টা করে মোজাফফর, আসেত্ম আসেত্ম সে বুঝতে পারে, আসলেই খুব সুন্দর নক্ষত্ররাজি, কী যেন নাম বললেন মাসুদভাই ওই তারাটির …

ওপাশের বারান্দায় একা আত্মহত্যার ভয়ে সে রীতিমতো কেঁপে উঠেছিল; সুন্দর নক্ষত্ররাজির দিকে চোখ রেখে মোজাফফরের মনে হতে থাকে – আসলে তা ছিল তার এতোসব আড়াল করে ঘুস গ্রহণের কারণেই! এখন সে আরেক বারান্দায়, তারার পানে তাকিয়ে আছে, একটুখানি এগোলেই সামনে কাচের কার্নিশ – তার একেবারেই ভয় লাগে না আর। মাসুদ সাহেবের অন্তরঙ্গ ব্যবহারে মোজাফফর বুঝতে পারে, তার ভয় কেটে যাচ্ছে। আর কোনো ভয় নেই। মাসুদ সাহেবের কাছে চার লাখ টাকা কোনো ব্যাপার নাকি! খামোখাই ভয়ে সে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল! মাসুদ সাহেব নিশ্চয়ই ভেবে নিয়েছেন, নতুন অফিসার এসেছে, অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছে, এখানে মোজাফফরের কী দোষ! বেচারা নিয়েছে না হয় কিছু টাকা! কী আর করা! …

‘মোজাফফর!’ মাসুদ সাহেবের গলাটা এবার অচেনা মনে হয় মোজাফফরের কাছে। বেশ গম্ভীর।

‘জি মাসুদভাই?’

‘খুব বোকা হলে কেউ হাজার কোটি টাকার মালিক হয় না।’

মাসুদ সাহেবের গলার স্বরে মোজাফফরের পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। সে স্তব্ধ মুখে টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে মাসুদ সাহেবের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকে।

‘তানভীর সাহেব তোমাদের সেকশন হেড হচ্ছে আমি আগেই জানতাম। সে আমার অপোনেন্ট পার্টির পেটেন্ট। তাই তানভীর আসার আগেই তোমারে কিনে রাখছি আমি। নাথিং মোর। তোমারে দিয়েই সাইজ করবো তারে! … তোমাদের ওখানে আমার খেলা মাত্র শুরু, যেতে হবে অনেক দূর। …’ বলতে বলতে টেলিস্কোপে আবার চোখ রাখেন মাসুদ সাহেব, ‘ওই যে ওই তারাটি … ওইটার নাম লুব্ধক! লুব্ধক অর্থ কি তুমি জানো?’

 

মাসুদ সাহেবের  ষোলোতলার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে মোজাফফর। কটা বাজে এখন? রাত সাড়ে আটটা, না ন’টা? ঘড়ি দেখতে ইচ্ছা হয় না মোজাফফরের – সে মাথা নিচু করে অ্যাপার্টমেন্টের দরজা দিয়ে বের হয়ে ধানম– ৮ নাম্বার রাস্তা থেকে সাতমসজিদ রোডের দিকে হাঁটতে থাকে। প্রধান সড়কে উঠে সে বাঁয়ে জিগাতলার দিকে হাঁটবে – কী মাস এটা? চৈত্র মাস! তাই কি বাতাস এমন! বাতাসে কেমন হুহু শব্দ! চার লাখ টাকার দায় কেটে গেছে বলা যায়; কিন্তু মোজাফফরের গলায় ফাঁসের মতো বিঁধে আছে মাসুদ সাহেবের কথা … তোমারে দিয়েই সাইজ করবো তারে! … খেলা মাত্র শুরু! কী কী করতে হবে মোজাফফরকে? আপিসের গোপন সমস্ত দাফতরিক কাগজ-সিদ্ধান্ত আগে থেকে মাসুদ সাহেবকে জানাতে হবে? তানভীর সাহেবকে ম্যানেজ করার কলাকৌশল করতে হবে দিনের পর দিন? মাসুদ সাহেবের কাছে কতদিনে মোজাফফরের দেনা শোধ হবে?

নয়টা-পাঁচটা সরকারি চাকরি, দৈনন্দিন জীবনযাপন, সন্তানদের লেখাপড়া, বাড়িতে মা – আটপৌরে বাস্তবতার মধ্যে টানাটানির সংসার – এর মধ্যে কোথাও একটুখানি গুড় দেখলে পিঁপড়ার মতো ঝাঁপিয়ে পড়া – এর নাম জীবন? মোজাফফর বোঝে না, কখনো এ-ধরনের চিন্তাভাবনা তার মাথায় আসে না, মাথা গুঁজে কোনোরকমে দিন পার করে দেওয়াই তার নিত্যদিনের রুটিন; আজ কী হলো? সব দোষ ওই ষোলোতলা বারান্দায় উঁচু থেকে দেখা নিচে মানুষ-গাড়ি-ঘরবাড়ির সারি; আচমকা কেন মনে হলো দিই এক লাফ! মোজাফফর দেখে উলটো দিক থেকে হঠাৎ একটা পাজেরো তীব্র গতিতে আসে। সে ছিটকে পেছনে সরে আসে এক লাফে!

 

না, আত্মহত্যার ইচ্ছা মোজাফফরের আর হয় না। কেবল কণ্ঠনালির কাছে অদৃশ্য এক অস্বস্তি তাকে পিপাসার্ত করে তোলে। অনেকক্ষণ পানি খায়নি মোজাফফর; তাই সম্ভবত এই জলতেষ্টা। আকাশের দিকে তাকায় পিপাসার্ত মোজাফফর, মাটি থেকে আকাশ একরকম,    ষোলোতলা থেকে আরেকরকম; এতো তারা আকাশে – ২৭টি, প্রতিটির আবার চারটি করে অংশ, কিছুই জানতো না মোজাফফর! পথচলতি মানুষের বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে সাতমসজিদ রোডের ফুটপাত থেকে মাথার বহু বহু ওপরে দিগন্তবিসত্মৃত ঝকঝকে আকাশের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মোজাফফর। মাসুদভাই আজ লুব্ধক তারা চেনালেন তাকে।

আচ্ছা, লুব্ধক শব্দটির অর্থ কী!

Leave a Reply

%d bloggers like this: