ল্যাটিন আমেরিকার ‘হাঙর’ কার্লোস ফুয়েন্তেস

লেখক:

ভূমিকা ও অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

খ্যাতিমান মার্কিন ঔপন্যাসিক, কার্লোস ফুয়েন্তেসের দীর্ঘদিনের বন্ধু উইলিয়াম স্টাইরন বলেছেন, কার্লোস হাঙরের মতো, সর্বক্ষণই যদি সাঁতারে না থাকে মৃত্যুবরণ করবে।
ল্যাটিন আমেরিকান ঔপন্যাসিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ (যদিও মারিও বার্গাস য়োসার মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি, এমনকি কোনো দলের সঙ্গে সক্রিয়ও ছিলেন না) জন্মের পর থেকে পিতার কূটনৈতিক চাকরিজনিত কারণে এবং পরে বিষয়টি নিজেরই মজ্জাগত হয়ে যাওয়ায় সারাক্ষণই হাঙরের মতো এ-দেশ থেকে ও-দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। উইলিয়াম স্টাইরন কার্লোস ফুয়েন্তেসের সঞ্চরণশীলতার বিষয়টি বলেছেন, কিন্তু হাঙরের মতো দাঁত বসানোর বিষয়টি বলেননি। তিনি যেখানে দাঁত বসিয়েছেন, ছিঁড়ে কেটে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছেন।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের পর প্রধান ল্যাটিন আমেরিকান ঔপন্যাসিক হিসেবে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী পেরুভিয়ান ঔপন্যাসিক মারিও বার্গাস য়োসার নাম যত উচ্চারিত হয়, তার চেয়েও বেশি উচ্চারিত ও আলোচিত হন মেক্সিকান কার্লোস ফুয়েন্তেস।
গত শতকের ষাটের দশকের গোড়াতে ল্যাটিন আমেরিকার কথাসাহিত্যের বিশ্বসাহিত্য সভায় আকস্মিক সরব উপস্থিতি ঘটেছে যে নীরব ‘এল বুম’ আন্দোলনের, তারই সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব দিয়েছেন কার্লোস ফুয়েন্তেস।
তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে : দ্য ডেথ অব আর্টেমিও ক্রুজ, আত্তরা, ক্রিস্টোকার আনবর্ন, টেরা নস্ত্রা, ডিস্ট্যান্ট রিলেশনস, দ্য ওল্ড গ্রিঙ্গো, দ্য ক্যাম্পেইন, দ্য ইয়ার্স উইথ লরা দিয়াজ, দ্য ঈগলস থ্রোন এবং ডেসটিনি অ্যান্ড ডিজায়ার।
তিনি কিছু স্মরণীয় ছোটগল্প ও নাটক রচনা করেছেন।
কার্লোস ফুয়েন্তেসের জন্ম ১১ নভেম্বর ১৯২৮ মেক্সিকোতে। ১৫ মে ২০১২ মৃত্যুবরণ করেন।
কালজয়ী এই ঔপন্যাসিককে অনুধাবন করার জন্য তাঁর দেওয়া তিনটি সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ অনূদিত হলো :

দ্য প্যারিস রিভিউর সাক্ষাৎকার থেকে
১৯৮১-র ডিসেম্বরের তুষারপাত চলছে। নিউ জার্সির প্রিন্সটনে পুরনো আবাসিক এলাকায় তাঁর বিশাল এক ভিক্টোরিয়ান ভবনে প্যারিস রিভিউর পক্ষে কার্লোস ফুয়েন্তেসের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলফ্রেড ম্যাক অ্যাডাম এবং চার্লস ই রুয়াস। লম্বা ও ভারী কাঠামোর মানুষটির গায়ে শীতের পোশাক – কচ্ছপগলা সোয়েটার এবং জ্যাকেট।
সাক্ষাৎকারের শুরুতে সূচনা বক্তব্যটি এমন : ফ্রান্সে মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত থাকাকালে ফুয়েন্তেস দেখলেন লেখালেখিটা তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে উঠছে। সুতরাং তিনি সরকারি পদ ছেড়ে লেখায় ফিরে এলেন।
ফুয়েন্তেস : ১৯৭৭ সালের এপ্রিলের প্রথম দিন ফ্রান্সে রাষ্ট্রদূতের পদটি ছেড়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে প্যারিসের উপকণ্ঠে একটা বাড়ি ভাড়া নিলাম, যেখানে আমি আমার লেখালেখি শুরু করতে পারি। একজন বিবেকবান কূটনীতিবিদ হওয়ার কারণে আমি দুবছরে একটি লাইনও লিখতে পারিনি। যে-বাড়িটি আমি ভাড়া নিলাম জানা গেল একসময় এ-বাড়ির মারিক ছিলেন চিত্রশিল্পী গুস্তাভ দোরে। আর তাই আমাকে কাঠামো ও প্রস্থতার জন্য আমার প্রত্যাশা ফিরিয়ে দিলো। যেমন লিটল রেড রাইডিং হুডে দোরের অলঙ্করণ অবিশ্বাস্য বিচিত্রতায় ভরপুর। নেকড়ের সঙ্গে বিছানায় ছোট মেয়েটি! এসব আবহের নিচে জন্ম নেয় আমার উপন্যাস ডিসট্যান্ট রিলেশনস।
প্রশ্ন : আপনি যখন রাষ্ট্রদূত ছিলেন, লেখালেখি কেন অসম্ভব হয়ে ওঠে?
ফুয়েন্তেস : কূটনীতি এক অর্থে লেখালেখির বিপরীতধর্মী। নিজেকে বহু বিষয়ের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হয় : সেক্রেটারির সঙ্গে ঝগড়া করে কাঁদতে হাজির হওয়া ভদ্রমহিলা; আমদানি ও রফতানি; সংকটে পড়া দেশি ছাত্র; সবই তো দূতাবাসের সমস্যা। লিখতে গেলে লেখকের অভিনিবেশ প্রয়োজন, লেখার দাবি – লেখালেখি ছাড়া আর কিছু করা যাবে না। আমার তখনকার অব্যক্ত শক্তি এখন অবমুক্ত হচ্ছে। আজকাল আমি অনেক লিখছি। তাছাড়া কেমন করে লিখতে হয় তাও শিখেছি। কীভাবে লিখতে হয়, মনে হয় আগে জানতাম না, আমলা হয়ে লিখতে শিখেছি। আমলার চাকরির সময় হাতে অনেকটা ‘মানসিক সময়’ থাকে; চিন্তার সময় বের করা যায়, মস্তিষ্কে কেমন করে লেখা যায়, তাও শেখা হয়। আমি যখন তরুণ ছিলাম আমি অনেক ভুগেছি, কারণ আমি কী বলতে যাচ্ছি তা না জেনে মালার্মের শূন্য পৃষ্ঠার চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেছি। আমি পৃষ্ঠার সঙ্গে লড়াই করেছি এবং পেটে আলসার বাধিয়ে তার মূল্য দিয়েছি। এর জন্য আমাকে প্রচন্ড বলবান হয়ে উঠতে হয়েছে, কারণ বয়স যখন কুড়ি ও তিরিশের ঘরে লেখার জন্য যথেষ্ট শক্তিও থাকে। পরবর্তী সময় এই বল ব্যবহার করতে হয় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। যখন আমি পেছনে ফিরে তাকাই, আমি নিজেকে দেখতে পাই দাফতরিক ডেস্কের পেছনে – নিজের ভেতরে লেখার জন্য মনটা মুক্ত থাকত, চাকরির এই পদটা ছেড়ে দেওয়ার পর কী লিখব তার প্রস্ত্ততি নিতাম। এখন আমি লিখতে বসার আগেই লেখা শুরু করে দিতে পারি। এখন শূন্য পৃষ্ঠা বেশ ব্যবহার করতে পারি, যা আগে পারতাম না।
প্রশ্ন : আমাদের বলুন, লেখালেখির প্রক্রিয়াটি কেমন করে আপনার নিজের ভেতর ঘটে?
ফুয়েন্তেস : আমি সকালবেলার লেখক। আমি সকাল সাড়ে ৮টায় কাগজে-কলমে লিখতে শুরু করি, সাড়ে ১২টা পর্যন্ত লিখি, তারপর সাঁতার কাটতে যাই। ফিরে আসি, মধ্যাহ্নভোজ করি, বিকেলের পড়াশোনাটা চালাই যতক্ষণ না পরের দিনের লেখার খোঁজে হাঁটতে বের হই। আমি টেবিলে বসার আগেই আমার বইটা মাথার ভেতর লিখে ফেলব। এখানে এই প্রিন্সটনে হাঁটাহাটির ব্যাপারে আমি একটি ত্রিকোনাকৃতির প্যাটার্ন অনুসরণ করি : মার্সার স্ট্রিটে আইনস্টাইনের বাড়ি পর্যন্ত যাই, তারপর স্টকটন স্ট্রিটে থমাস মানের বাড়ি পর্যন্ত আসি, তারপর এভলিন প্লেসে হারমান ব্রোচের বাড়ি পর্যন্ত। এই তিনটি জায়গা ঘুরে আমি বাড়ি ফিরে আসি। ততক্ষণে আমি মানসিকভাবে আগামীকালের ছ-সাত পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছি।
প্রশ্ন : আপনি হাতেই লিখেন?
ফুয়েন্তেস : আমি হাতেই লিখি এবং যখন অনুভব করি যে, আমার কাজটা হয়েছে, তখন এটাকে বিশ্রাম দিই। তারপর পান্ডুলিপি সংশোধন করতে বসি। নিজেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টাইপ ও সংশোধন করতে থাকি।
প্রশ্ন : আপনাকে কি ব্যাপক পুনর্লিখন করতে হয়? নাকি মানসিকভাবে লিখনের সময় পুনর্লিখনের ব্যাপারটাও ঘটে যায়?
ফুয়েন্তেস : লেখাটা যখন কাগজে নেমে আসে তখন কার্যত এটা শেষই হয়ে আসে। এতে কোনো বাদ পড়া অধ্যায় কিংবা দৃশ্য থাকে না। ব্যাপারটা কেমন করে ঘটছে, আমি তো তা জানি, আমার লেখাটা মোটামুটিভাবে নির্ধারিত হয়েই নেমে আসে, কিন্তু একই সঙ্গে আমি নিজের ভেতরের বিস্ময়ের উপাদানগুলোকে বলি দিই। যিনি উপন্যাস লিখছেন তিনি কোনো না কোনোভাবে প্রুস্তিয়ান (মার্সেল প্রুস্ত) সমস্যার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছেন – তিনি জানেন কী লিখতে যাচ্ছেন, একই সঙ্গে বিস্মিত হচ্ছেন তাঁর কলম থেকে কী বেরিয়ে আসছে তা দেখে। প্রুস্ত কেবল তখনই লিখতেন যখন তিনি জানতেন কী লিখতে যাচ্ছেন, তারপরও তাঁকে লিখে যেতে হয়েছে যেন তিনি কিছুই জানেন না, এভাবে। এ এক অসাধারণ ব্যাপার। এক অর্থে আমরা সবাই একই অভিযানে জড়িয়ে আছি : কী লিখতে যাচ্ছি জানতে চাই, লেখার বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাই এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতার সেই মার্জিনটুকু চাই যা পাঠকের আবিষ্কার, বিস্ময় এবং স্বাধীনতার পূর্বশর্ত।
প্রশ্ন : ইংল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে সম্পাদক ও সাহিত্যে তাঁদের প্রভাব নিয়ে ইতিহাস লেখা সম্ভব। স্প্যানিশ ভাষাভাষী দেশে কি এ-ধরনের ইতিহাস লেখা সম্ভব?
ফুয়েন্তেস : অসম্ভব। কারণ স্প্যানিশ ‘নোবলম্যান বা হিদালগো’ আত্মমর্যাদা কখনো একজন ভৃত্য শ্রমিককে আমাদের লেখা নিয়ে কী করা উচিত তা বলার সুযোগ দেবে না। আসলে স্পেনের উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া চরম অহংকার ও চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ একটি ভয়াবহ ধরনের সিজোফ্রেনিয়া সৃষ্টি করে রেখেছে, নোবলম্যান আশা করে সবাই তাদের সম্মান করবে, যেমন তারা নিজেরা করে অধিকতর ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে। ল্যাটিন আমেরিকায় যদি কারো লেখা সম্পাদনা করার চেষ্টা করা হয়, এমনকি তিনি যদি ভাড়াটে লেখকও হন, তাঁর রচনা সেন্সর করার কিংবা তাঁকে অপমান করার অভিযোগ এনে সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করবেন।
প্রশ্ন : তাহলে কি আপনি বলবেন সমাজের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক সমাজের সঙ্গে আমেরিকান লেখকদের সম্পর্কের চেয়ে ভিন্ন? যেমন লেখকদের এই ‘হিদালগো’ বলে দেয় সংস্কৃতিতে তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ অনেক বেশি।
ফুয়েন্তেস : মেক্সিকান লেখক হিসেবে আমার অবস্থা পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা লেখকদের মতো। আমার সমাজে কথা বলার স্বাধীনতা আছে, সেখানে এই সুযোগ পাওয়া দুর্লভ ব্যাপার। আমরা অন্যের জন্য বলতে পারি যা সেন্ট্রাল ইউরোপের মতো ল্যাটিন আমেরিকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য সে-ক্ষমতার জন্য মূল্যও দিতে হয় – হয় সম্প্রদায়ের কাজে লাগুন, নতুবা মুখ থুবড়ে ভোঁতা হয়ে পড়ে থাকুন।
প্রশ্ন : তার মানে আপনি কি নিজেকে আপনার সংস্কৃতির দাফতরিক প্রতিনিধি বিবেচনা করেন?
ফুয়েন্তেস : না। কারণ আমি সবসময় ফরাসি স্যুররিয়ালিস্ট জ্যাক ভাসের কথাটা মনে রাখি – ‘নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে বড় ঘাতক মানুষের আর কিছু নেই।’ কাজেই আমার বেলায় এটা সত্য নয়।
প্রশ্ন : আমেরিকান এবং ল্যাটিন আমেরিকান লেখকের সামাজিক দায়িত্বের বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
ফুয়েন্তেস : আমেরিকান সাহিত্যিককে তাঁর সংস্কৃতির জন্য যা করতে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশিকিছু করতে হয় আমাদের, ল্যাটিন আমেরিকান লেখকদের। তাঁরা নিজেদের জন্য এবং লেখার জন্য অনেক বেশি সময় পান। কিন্তু আমাদের সামাজিক চাহিদা অনেক বেশি। পাবলো নেরুদা বলতেন, ল্যাটিন আমেরিকান লেখক একটা ভারী দেহ টেনে বেড়ান, তাঁর জনগণের ভার, তাঁর অতীতের ভার ও তাঁর জাতীয় ইতিহাসের ভার। আমাদের অতীতের বিশাল ওজন আত্তীকরণ করতে হয়, কাজেই কেমন করে আমরা এসেছি তা ভুলতে পারি না। অতীত ভুলে গেলেই মৃত্যু। একজন ল্যাটিন আমেরিকানকে লেখক হিসেবে নয়, একজন নাগরিক হিসেবে অনেক যূথবদ্ধ দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারপরও তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক স্বাধীনতা ও সুযোগ সংরক্ষণ করতে হয়। এটা এক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে, তবে আমার নাম ও একেবারে দ্বন্দ্বশূন্য হওয়ার চেয়ে, যা কখনো আমেরিকান লেখকের বেলায় ঘটে থাকে, দ্বন্দ্বসংকুল হওয়াটাই বরং ভালো।
দ্য মাদার জোন্স সাক্ষাৎকার থেকে

দ্য মাদার জোন্স সাময়িকীর জন্য স্টিফেন ট্যালবটের নেওয়া সাক্ষাৎকারের একাংশ। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ৩ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে।
এ-বছর (১৯৮৮) ফুয়েন্তেস তিনটি পুরস্কার পান যা তাঁর শিল্প, রাজনীতি ও প্রভাবের যে বিশাল অধিক্ষেত্র তারই প্রতীকী রূপ। স্পেনের রাজা ফুয়েন্তেসের হাতে তুলে দিয়েছেন সার্ভেন্তেস প্রাইজ, সঙ্গে প্রায় ৮৮ হাজার ডলারের চেক। এটাকে বলা যায় ফ্রাঙ্কোর যুগ থেকে বৈপ্লবিক সরে আসা। সে-সময়ে ফুয়েন্তেসের উপন্যাস অ্যা চেঞ্জ অব স্কিন অশ্লীল পর্নোগ্রাফিক, কমিউনিস্ট ভাবাদর্শী, খ্রিষ্টানবিরোধী, জার্মানবিরোধী, ইহুদিপন্থী হওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়। নিউইয়র্কের ন্যাশনাল আর্টস ক্লাব ভারিক্কি ধরনের সমাবেশ করে ফুয়েন্তেস সাহিত্যকর্মের জন্য স্বর্ণপদক প্রদান করে, তাতে উপস্থিত ছিলেন টম উইকার, জোয়ান ডিডিয়ন এবং জন কেনেডি জুনিয়র। আর মানাগুয়াতে সান্দানিস্তারা ফুয়েন্তেসকে দিয়েছে নিকারাগুয়ার সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক পুরস্কার যা ১৯ শতকের কবি ও জাতীয় বীর রুবেন দারফোর নামে প্রবর্তিত। আগে যাঁরা এ-পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন গ্রাহাম গ্রিন ও গার্সিয়া মার্কেজ।
ফুয়েন্তেস সাংবাদিকদের বললেন, ‘তাঁরা আমাকে পদকের তলায় সমাহিত করতে চেষ্টা করছেন।’ কিন্তু তিনি যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন এবং লালন করছেন তা উপভোগও করেন। তাঁর স্কুলজীবনের পুরনো সহপাঠী ও বন্ধু চিলির ঔপন্যাসিক হোসে দোনোসো (কারফিউ উপন্যাসখ্যাত) স্মরণ করছেন স্প্যানিশ-আমেরিকান উপন্যাস আন্তর্জাতিকীকরণে প্রথম সচেতন সক্রিয় এজেন্ট হলেন কার্লোস ফুয়েন্তেস। ল্যাটিন আমেরিকান ফিকশনের আকস্মিক আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার জোয়ার যে-আন্দোলন থেকে হয়েছে ফুয়েন্তেস সেই ‘এল বুমে’র নেতা।
ফুয়েন্তেস হেসে ওঠেন ‘আমি সঞ্চরণশীল, সুতরাং আমি আছি।’ এটা খুব সিরিয়াস বিষয়। সঞ্চরণশীলতাই কার্লোস ফুয়েন্তেসেকে ব্যাখ্যা করে। এটাই তাঁর শিল্প ও ব্যক্তিত্বের মৌল বিষয়। মেক্সিকান কূটনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ফুয়েন্তেস তাঁর জীবনের অপেক্ষাকৃত ভালো অংশটি রাস্তায় কাটিয়েছেন। মেক্সিকোসিটির উপশহরে হালফ্যাশনের আবাসিক এলাকায় তাঁর বাড়ি আছে, কিন্তু কদাচিৎ সেখানে বাস করেন। তিনি একজন ভ্রমণরত বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হয়েছেন। কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী নিবাসী হিসেবে এক স্যুটকেসে বেরিয়ে এসে ফুয়েন্তেস বিশ্বজুড়ে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। ঔপন্যাসিক উইলিয়াম স্টাইরন (সোফিস চয়েসখ্যাত) যাঁর সঙ্গে ফুয়েন্তেসের কুড়ি বছরের ঘনিষ্ঠতা। এ-বছর (১৯৮৮) তাঁর সঙ্গে নিকারাগুয়া ঘুরে এসেছেন বলছেন, ‘সে তো হাঙরের মতো। যদি সার্বক্ষণিক চলাচলের মধ্যে না থাকে তাহলে মরে যায়। আমার ধারণা বেঁচে থাকার জন্য কার্লোস ঘুরে বেড়ায়। আমার কাছে তাঁর ফোন নম্বর নেই, কারণ বারবার তাঁর নম্বর বদল হয়।’
সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী এনরিক ক্রজ মনে করেন, ফুয়েন্তেসের প্রধান ত্রুটি তাঁর ‘মূলহীনতা’। স্টাইরনসহ অন্যদের মতে, তাঁর অস্থিরতা, তাঁর দ্বি-সাংস্কৃতিক সীমান্ত পারাপারই হচ্ছে তাঁর প্রধান শক্তি। ‘ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে এতো সাবলীলভাবে – বিশেষ করে এর নিজস্বতা, বৈপ্লবিক প্রকৃতি, আশাহীন হতবুদ্ধিদশা নিয়ে তাঁর চেয়ে সাবলীলভাবে কেউ লিখতে পারেনি’ – স্টাইরন যুক্তি দেন, ‘অথবা বিপরীতভাবে দেখতে গেলে তিনি পুরো বিষয়টিকে উত্তর আমেরিকার চোখ দিয়ে দেখেছেন। আমি মনে করি উত্তর আমেরিকার পাঠকদের কাছে তিনিই ল্যাটিন আমেরিকার প্রধান ব্যাখ্যাদাতা দোভাষী।’
যদিও ফুয়েন্তেস কোথাও স্থায়ীভাবে থাকছেন না, তাঁকে মূলবিচ্ছিন্ন মানুষ মনে করাটা আসলে ভুলপথে এগোনোর মতোই। তিনি যেখানেই গিয়েছেন সঙ্গে নিয়ে গেছে স্প্যানিশ ভাষা ও তাঁর ল্যাটিন সংস্কৃতি। একই সঙ্গে তিনি এমনকি নিজের দেশেও বহিরাগতের প্রেক্ষাপটটি নিয়ে আসছেন। অস্থির প্রাণশক্তিময় এবং তাড়িত ফুয়েন্তেসের জীবন ডন কুইহোতের সঙ্গে মেশানো যায় – লেখক হিসেবে নিজের জীবনের শুরুতেই তা অনুধাবন করে বলেছেন, ‘প্রেক্ষাপটের সন্ধানে আমি হবো চিরকালীন এক পর্যটক।’

ফুয়েন্তেস স্মরণ করছেন, ‘মেক্সিকো ছিল একটি কল্পনার দেশ। আমি ভেবেছিলাম আমাকে আমোদিত করতে আমার বাবা এই দেশটি আবিষ্কার করেছেন। আমি যেখানে বসবাস করতাম তার চেয়ে অনেক ভিন্ন, অনেক বিচিত্র এই দেশ।’ তাঁর জন্য বাস্তবতা ছিল নিউইয়র্কের থার্টিন্থ স্ট্রিটের হেনরি কুক পাবলিক স্কুল, যেখানে ছোটবেলায় তিনি পড়াশোনা করেছেন – ‘স্কুলটিই সবার মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকার ক্ষেত্র – অ্যান আমেরিকান মেল্টিং পট। সেখানে ছিল কালো মানুষ, চায়নিজ, গ্রিক ইতালিয়ান… এবং ফ্লোরেন্স পেইন্টার নামের অসাধারণ একজন শিক্ষক। মিসেস ফ্লোরেন্স পেইন্টার আমাদের হাতে ধরে নিয়ে গেছেন। শিখিয়েছেন সবকিছু – গণিত, সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল। আর আমি এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন শিক্ষার্থীও পাই যাদের কোনো ধারণা নেই কোথায় ব্রাজিল, কোথায় অ্যাঙ্গোলা বা কোথায় ইন্দোনেশিয়া! যখন তাঁকে আমাদের খুব দরকার কোথায় সেই মিসেস পেইন্টার?’
ফুয়েন্তেস স্কুলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন, ১৮ মার্চ ১৯৩৮ পর্যন্ত ‘গ্যাঙ্গের একজন’ হিসেবে, ‘যেদিন মেক্সিকোর লোকরঞ্জনবাদী প্রেসিডেন্ট ল্যাজারো কার্দেনাস মেক্সিকোর সব বিদেশি কোম্পানি জাতীয়করণ করলেন, হঠাৎ বড় বড় হেডলাইন দেখতে শুরু করলাম ‘লাল মেক্সিকো’ এবং মেক্সিকানরা ‘আমাদের’ তেল চুরি করছে। আমার সব বন্ধু তখন আমাকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। হঠাৎ আমি সমাজচ্যুত হয়ে গেলাম।’ ৫০ বছর পরও যখন ফুয়েন্তেস তাঁর এই সমাজচ্যুতির কথা বলেন, ব্যাপারটা তাঁকে অস্বস্তিতেই ফেলে দেয়। ‘তা-ই আমাকে বুঝিয়ে দেয় আমি গ্রিঙ্গো (ল্যাটিন আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের লোকদের তা-ই বলে) নই।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি মেক্সিকান।’

অ্যাচিভমেন্ট অ্যাকাডেমির নেওয়া সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ
[সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় ২ জুন ২০০৬।]
প্রশ্ন : আপনি খ্যাতিমান লেখক, একজন কূটনীতিবিদের পুত্র, নিজেও খ্যাতিমান কূটনীতিবিদ; তারপরও যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬০ দশকে আপনাকে ভিসা দিতে অস্বীকার করল। এ-ব্যাপারটা নিয়ে বলবেন কি?
ফুয়েন্তেস : হ্যাঁ বলব। ১৯৬২ সালে এনবিসি আমাকে একটি বিতর্কে অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ‘প্রগতির জন্য জোট’ শীর্ষক আলোচনায় আমাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ল্যাটিন আমেরিকা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি রিচার্ড গুডউইনের সঙ্গে বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম, বেশ তো যাওয়া যাক। প্রশাসনে কাজ করার কারণে রিচার্ড আমার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে, আমার চেয়ে ভালো ইংরেজি বলাবে, আরো অনেক দিক থেকে এগিয়ে। তবু আমি অংশ নিতে পারলে খুশিই হবো। কাজেই আমি আমন্ত্রিত হলাম, আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম।
আমি মেক্সিকোসিটিতে আমেরিকান দূতাবাসে গেলাম এবং সঙ্গে সঙ্গেই আমার ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হলো। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলল, ‘আপনাকে বলা যাবে না, এটা গোপনীয় বিষয়।’ কাজেই আমি আটকে গেলাম এবং আমাকে চিরদিনের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিতের তালিকায় ফেলা হলো। আমি এ-সময় জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই তালিকা থেকে কি বের হওয়া সম্ভব? আমি কি কখনো বের হতে পারব?’ তারা বলল, ‘না, না, না।’ আমি বললাম, ‘নরকেরও তো একটা সীমা আছে। সেখানেও তো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, নরকবাসের পর একদিন আত্মার বিশোধনের জন্য নির্ধারিত স্থানে কিংবা স্বর্গে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। নরক তো চিরকালের জন্য নয়। আশা করি ভিসা প্রদানে আপনাদের এই অস্বীকৃতিও চিরকালের জন্য নয়।’ তারা বলল, ‘না না, আপনিও এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।’ ‘কীভাবে?’ ‘কমিউনিস্টবিরোধী হিসেবে আপনি যদি আপনার আনুগত্য প্রদর্শন করতে পারেন, তাহলে।’ আমি বললাম, ‘নৈতিক কারণেই এ-কাজটা আমি কখনো করব না। আমি কমিউনিস্ট নই, কিন্তু অতটা ম্যাকআর্থাইটও আমি হতে পারব না।’
কাজেই আমি তাদের কালো তালিকাতে থেকেই গেলাম। ১৯৪৭ সালে আমাকে পোয়ের্তেরিকোতে ঢুকতে দেওয়া হলো না। তখন সিনেটর ফুলব্রাইট ফ্লোর নিয়ে দাবি জানালেন, আমার ওপর নিষেধাজ্ঞা বিশেষ কারণে প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হোক, বক্তৃতা দিতে দেওয়া হোক এবং নিরুপদ্রবভাবে থাকতে দেওয়া হোক। কাজেই আমার বেলায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলো। এটা একটা অসাধারণ অদ্ভুত ব্যাপার – তার মানে আমি ভিসার আবেদন করেছি, তখন বিরাজমান ‘অযাচিত ব্যক্তি আইনে’ – যা ম্যাককারেন-ওয়াল্টার বিল থেকে সৃষ্টি, তাতে আমাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আবার যখন আবেদন করলাম ফুলব্রাইট অ্যাক্টের শক্তিতে ভিসা মঞ্জুর করা হলো – আমরা আজ ফ্রান্জ কাফকার কথা বলছি – এটাই হচ্ছে কাফকাস্ক সিচুয়েশন।
ক্লিনটন প্রশাসন আসার পর এ তালিকাটি ইতিহাস হয়ে যায়। আমার মতো এই তালিকায় ছিলেন – গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। ইভস মনতাদ, সিমো সিনোরে, ফোকাল্ট, গ্রাহাম গ্রিনসহ প্রথিতযশা অনেক ব্যক্তির নাম ছিল এতে। ‘যুক্তরাষ্ট্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি’র তালিকায় থেকে আমরা সন্তুষ্টই ছিলাম। ক্লিনটন আসার পর আমরা তালিকা থেকে অবমুক্ত হলাম। এখন ইচ্ছামতো যাওয়া-আসা করতে পারি। এটা এক হাস্যকর স্নায়ুযুদ্ধ পরিস্থিতি। ম্যাককারেন ও ওয়াল্টার দুজনই অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল সিনেটর। আর্থার মিলার তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, অযাচিত ব্যক্তির তালিকায় তাঁর নাম ছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করার পর তাঁর পাসপোর্ট দিতেই অস্বীকার করা হলো। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী মেরিলিন মনরোকে নিয়ে সিনেটর ম্যাককারেন এবং সিনেটর ওয়াল্টারের সঙ্গে দেখা করলেন। পরে মেরিলিন মনরোর উপস্থিতির শক্তির জোরে আর্থার মিলার তাঁর পাসপোর্ট ফিরে পান।
প্রশ্ন : সমাজে লেখকের দায়িত্ব কী? আপনি কী মনে করেন?
ফুয়েন্তেস : বই রচনা করা। লেখকের সাধ্যমতো ভালো বই লেখা। আর বাকি সকল কিছুর উৎপত্তি ভালো বই থেকে। একটা সময় ছিল, যখন লেখকের রাজনৈতিক দায়িত্বের ধারণাটি বিরাজমান ছিল – লেখককে ঘোষণা করতে হতো ‘আমি বামপন্থী’, ‘আমি জনগণের জন্য’ – এ ঘোষণা দিলেন এবং বাজে বই লিখলেন; তবু লেখককে ক্ষমা করে দেওয়া হতো, কারণ লেখক ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে – সেই দিন ফুরিয়ে গেছে। অনেক বাজে বই লেখা হয়েছে, লেখকরা ভালো মানুষ হতে পারেন কিন্তু বইগুলো বাজে। কেন এমন ঘটেছে ল্যাটিন আমেরিকাতে তা তো স্পষ্ট।
পাবলো নেরুদা একবার আমাকে বলেছেন, ‘আমরা, ল্যাটিন আমেরিকান লেখকরা, আমাদের গোটা দেশের ভার পিঠে বহন করে ভ্রমণ করি। আমাদের দেশের সকল কিছুর জন্য আমরাই দায়ী – কারণ আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নেই, আমাদের নিরক্ষরতা ৮০-র ঘরে। এই সকল কারণের জন্য ভাষাহীনের কণ্ঠে স্বর তুলে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।’ আজকের দিনে এটা আর সত্যি নয়, অধিকাংশ ল্যাটিন আমেরিকান দেশেই গণতন্ত্র বিরাজ করছে, নিয়মিত নির্বাচন, রাজনৈতিক দল, ইউনিয়ন কর্মকান্ডের স্বাধীনতা, কৃষি সমবায়, সবই একসঙ্গে কাজ করছে। সাধারণভাবে বলা যায়, এখন ল্যাটিন আমেরিকার গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা রয়েছে। কাজেই আপনি যদি লেখক হয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চান, সততার সঙ্গে এ-কথা ঘোষণা করুন, ‘আমি রাজনীতিতে আছি, কিন্তু আমি একজন লেখক। লেখক হওয়া আমাকে বিশেষ কোনো সুযোগ দিচ্ছে না। আমার রাজনৈতিক চিন্তা ও কাজ দিয়ে আমাকে বিচার করুন।’
এটা হচ্ছে একদিক। কিন্তু এমন লেখকও আছেন যাঁরা বলেন, ‘রাজনীতি নিয়ে আমার করার কিছু নেই। আমি প্রান্তে রয়ে যাই। আমি বই লিখি। আমি বড়জোর একজন সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব।’ লেখক কাজ করে যাচ্ছেন তাঁর ভাষা, ভাবনা ও স্মৃতি নিয়ে। ভাষা নিয়ে কাজ করার সময় পছন্দ হোক বা না-ই হোক লেখককে কাজ করতে হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। লেখক যদি রাজনৈতিক বিশ্বাসবোধ থেকে নাও লিখে থাকেন, তাঁর ভাষার মূল্যায়ন করতে এর ওপর যে রাজনৈতিক প্রভাব তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। রাজনীতি বা ধর্ম বা অন্যকিছুর বাগাড়ম্বরে সমাজে ভাষার সার্বক্ষণিক ব্যবহারে ভাষা নিজ অবস্থান থেকে ক্রমেই সরে যেতে থাকে। পছন্দ করুক বা না-ই করুক, মালার্মে মনে করেন, বিভিন্ন উপজাতিকে তার ভাষা ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করাই লেখকের কাজ।
প্রশ্ন : ঔপন্যাসিক কি প্রকৃতিগতভাবে প্ররোচনাকারী?
ফুয়েন্তেস : হ্যাঁ। ব্যাপারটা সাধারণত এই অর্থে যে, এমন কিছু লিখো না, যা পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আমার কাছে পৃথিবীতে উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য ইংরেজি উপন্যাসে। অনেক বছর ধরে ইংরেজি সাহিত্য চলে আসছে, একটার পর একটা মাস্টারপিস সৃষ্টি হচ্ছে আর তার প্রায় সবগুলোই প্রচলিত ইংরেজ সমাজের বিরুদ্ধে। আমি এবং আমার স্ত্রী বছরের কিছুটা সময় ইংল্যান্ডে কাটাই এবং আমরা বুঝতে পারি তাদের সমাজ কতটা রক্ষণশীল, রাশভারী এবং গতানুগতিক প্রথানুসারী। আর সে-সমাজে যদি আপনি এমিলি ব্রোনতে, ডি এইচ লরেন্স এবং ভার্জিনিয়া ওলফের মতো কাউকে পেয়ে যান তাহলে তো তাঁরা সমাজের বিরুদ্ধে যাবেনই, তাঁদের হাতের আয়নায় সমাজকে প্রতিবিম্বিত করবেন – তাঁদের সমাজ তা প্রত্যাশা করুক বা না-ই করুক। এটিও বাস্তবতার আরেকটি দিক – ঔপন্যাসিক চলমান বাস্তবতায় বিকল্পগুলোই সমাজের সামনে তুলে ধরেন। কাজেই সবসময় উপন্যাস রচনায় বিদ্রোহ ও বৈপরীত্যের উপাদান রয়েই যায়। এটা রাজনৈতিক বক্তৃতা লেখার চেয়ে ভিন্ন ধরনের।