শঙ্খ ঘোষের কবিতা : ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধ স্বরায়ণ

লেখক: সঞ্জীব দাস

একালের প্রণত পাঠকের কি মনে পড়ে, অন্তত এই অন্ধসময়, করালগ্রস্ত পরিপার্শ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে ব্রেখ্ট-রচিত সময়সন্ধির সেই অমোঘ স্বরায়ণ, ÔAn die NachgeborenenÕ  ইংরেজি অনুবাদে যার নাম দাঁড়ায় এরকম : ÔA poem for dark timesÕ কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যাক :

Really, I live in dark times!

Innocent words are foolish. An unfurrowed

brew

Indicates apathy. He who laughs

Just hasn’t received yet.

The terrible news

 

What times are these, In which.

A conversation about trees is almost a crime.

Because it implies Silence about so many

misdeeds!

বিবেকী কবি ব্রেখ্ট ১৯৩০ সালে নাৎসি দলের অত্যাচারে ধ্বস্ত জার্মানির সংস্কৃতির মহাশ্মশানে দাঁড়িয়ে যে-স্বরায়ণ উৎকীর্ণ করেছেন তাঁর কবিতায় এরই নাম প্রতিবাদ। ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে, আধিপত্যকামিতার বিরুদ্ধে এমন উচ্চারণই চেনায় কবির-শিল্পীর বলিষ্ঠ মানসিকতা। স্পষ্ট করে তাঁর ÔGutsÕ,, বাংলা কবিতায় এই guts, নির্ভীক শিরদাঁড়া এই ধ্বংসকালীন সময়ে যাঁর কবিতায় সর্বাধিক পরিমাণে বিদ্যমান তিনি শঙ্খ ঘোষ, অশীতিপর এই কবি এখনো যে-কোনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে উদ্ধৃততর্জনী, প্রতিমুহূর্তে তাঁর গাঢ় প্রতিবাদ কাব্যপরিসরে হয় সংহত! প্রতি মুহূর্তে – দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাঁর কবিতা এখনো তাই প্রতিবাদী, স্বাধীনচেতা মানুষের প্রতিবাদের আয়ুধ হয়ে ওঠে।

অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। পঞ্চাশের দশক তো সামগ্রিকভাবে অন্যরকম কাব্যভাবনার জন্ম দিয়েছিল। তিরিশ ও চল্লিশের দশকের কবিকুলের অধিকাংশই তাঁদের লেখনীকে চালনা করেছেন প্রতিবাদে-প্রতিরোধে, আন্দোলন ও রাষ্ট্রদ্রোহে কিংবা বিপ্লবী কার্যক্রমে। কিন্তু পঞ্চাশের দশকের কবিকুলের একটা বড় অংশ সমাজ ও রাজনৈতিক সমস্যা-সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে রচনা করেছিল আত্মমুখীনতার সীমাস্বর্গ। এ-কারণেই সমালোচক তপোধীর ভট্টাচার্যের মন্তব্য :

চল্লিশের তুলনায় পঞ্চাশের কবিরা প্রধানত যেখানে আলাদা, সে হলো এই ব্যক্তি সর্বস্বতায়। ভুল প্রতিক্রিয়ায় সমাজ চলে গেল প্রতিকারহীন দূরত্বে, ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা হয়ে উঠল সার্বিক। আপাত নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে কবিরা খুঁজে পেতে চাইলেন কল্পিত মুক্তির গোপন ভাবাক্ষগুলি, আসলে ইতিহাসের চাকাকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইলেন তারা।

সমালোচক অশোক মিত্র এই আত্মমুখী কাব্য-প্রবণতাকে নস্যাৎ করেছেন নির্মম শানিত বাচনে, বেদনাঘিন্ন কণ্ঠে তিনি পঞ্চাশের কাব্যের মূল্যায়ন করতে বসে লেখেন :

কবিতায় আমি আর বাংলাদেশকে খুঁজে পাই না। খণ্ডিত বিজীর্ণ হেজে যাওয়া বাংলাদেশকে কান্নায়-সর্বনাশে উতরোল বাংলাদেশকে … যেন সমাজের কাছে তাঁদের স্বর-অনুস্বর নেই, বিন্দুবিসর্গও নেই, আমার তোমার ব্যবহৃত শব্দগুলি তাঁরা ব্যবহার করেন, কিন্তু ব্যবহারের কোনো এখতিয়ার নেই তাঁদের, তাঁদের হাতে ব্যবহার ব্যভিচার হয়ে দাঁড়ায়।

এমন চরম মূল্যায়নে আংশিকতা আছে নিঃসন্দেহে। না হলে তো ভুলে যেতে হয় জরুরি অবস্থার অলোকরঞ্জনকে। ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচারী বাচনের বিরুদ্ধে তিনিই বোধহয় একমাত্র বঙ্গীয় কবি, যিনি দাপটে প্রতি-বাচনে পেশ করার সাহস দেখান, রচনা করেন ‘আন্তিকোণে, মঞ্চ : কলকাতা’, ‘জ্ঞান-পাপ’, ‘নির্ধারণ’, ‘গিলেটিনে আলপনা’র মতো সমাজলগ্ন, প্রতিবাদঘন কবিতা। এমনকি ব্যক্তিস্বরের কবিতার শিরোমণি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও নড়িয়ে দিয়েছিল, সত্তরের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পাশবিকতা। প্রতিবাদ উঠে এসেছিল আন্তরিকতায়। লেখা হয়েছিল ‘ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি ভয়ঙ্কর বিদ্রƒপে’র মতো কালজয়ী প্রতিবাদী কবিতা। এছাড়া তরুণ সান্যাল, সিদ্ধেশ্বর সেন, অমিতাভ দাশগুপ্ত প্রমুখ তো ছিলেনই।

তবে এ-কথা স্বীকার করতেই হবে, চল্লিশের সুভাষ মুখোপাধ্যায় কিংবা পূর্ববর্তী নজরুল ইসলামের মতো প্রতিরোধে উতরোল নয় তাঁদের কবিতা। ব্যক্তিজন সেখানে পিছু হটে বড় হয়ে উঠেছে সমষ্টির কণ্ঠ। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে পঞ্চাশের কবিরা সমাজসচেতনতাকে দূরে ঠেলে ব্যক্তিস্বরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, সমাজ রাষ্ট্রীয় ঘটনাবলিকে দেখেছেন ব্যক্তিচোখ দিয়ে, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের মাত্রাগুলোকে কবিতায় ধরেছেন ব্যক্তিমনের ভাষায়। এখানেই চল্লিশের কাব্যবিশ্বের সঙ্গে তাঁদের কাব্যবিশ্বের

সমুদ্র-ব্যবধান রচিত হয়েছে।

এই সময়েরই সন্তান শঙ্খ ঘোষ, পঞ্চাশের কবিকুলের মধ্যে অন্যতম বর্ষীয়ান তিনি। লক্ষণীয়, পঞ্চাশের কবি হলেও মানসিকতা ও জীবনদর্শনের দিক থেকে তিনি অনেকটাই ভিন্ন। ব্যক্তিস্বর তাঁর কবিতারও নিয়ন্ত্রা; কিন্তু সমাজ সেখানে প্রাণবন্ত বাস্তব। প্রতিবাদ তাঁর অনায়াস ভুবন, মনে হয় ব্যক্তিময়তা এবং সমাজচৈতন্যের বিরুদ্ধতার ধারণায় তাঁর আস্থা ছিল না। বরং তিনি মনে করেন, এদের মধ্যেও আবিষ্কার করা যায় গহন সম্পর্কের সূক্ষ্ম সুতো। নিজস্ব সৃষ্টিতে এরই সুচারু সমন্বয়ে তিনি সর্বত্র তৎপর।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই এই সমন্বয় সাধনের পরিচয় স্পষ্ট। দিনগুলি রাতগুলি কাব্যগ্রন্থে ‘অবগুণ্ঠিতা’, ‘মেঘে-মেঘে’, ‘দিনগুলি রাতগুলি’র মতো সংহত আবেগের আত্মময় কবিতা যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি সন্নিবেশিত হয়েছে ‘যমুনাবতী’, ‘শিশুসূর্য’র মতো বিস্তারধর্মী কবিতা। এই বিস্তারধর্মী কবিতাগুলোর উৎস

প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিকবির প্রতিবাদী মানসিকতা। ‘যমুনাবতী’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক; এর পরিপ্রেক্ষিত উঠে এসেছে কবিবন্ধু ও সমালোচক অশ্রুকুমার সিকদারের তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ও ইতিহাস-সচেতন বিশ্লেষণী লেখায় :

১৯৪৭ সাল যেন বিভীষিকা। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টে ঘটে যাওয়া স্বাধীনতাকে কমিউনিস্ট পার্টি অলীক আর মিথ্যা বলে ঘোষণা করেছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা সত্ত্বেও এই স্বাধীনতা যে এক উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মনে হয়েছিল সবকিছু এক নতুন আনন্দের দিকে চলেছে। শিশুরাষ্ট্রের শাসকদের কার্যকলাপে স্বাধীনতার মোহ অবশ্য অচিরেই ফিকে হতে শুরু করেছিল। কোচবিহারে খাদ্য-আন্দোলনের মিছিলের ওপর পুলিশের গুলি চালনার, কিশোরী হত্যার প্রতিবাদে শঙ্খ ঘোষকে লিখতে হয়েছিল :

নিভন্ত এই চুল্লিতে তবে

একটু আগুন দে।

হাতের শিরায় শিখার মতন

মরার আনন্দে।

বাস্তবিকই দিনগুলি রাতগুলি কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা বাংলা প্রতিবাদী কবিতার বিশ্বে একঝলক নতুন বাতাস। প্রান্তিক মানুষের বুভুক্ষার যন্ত্রণা, শোষকের ভূমিকা কবির হৃদয়তন্ত্রীতে ঘা মেরেছে, জেগে উঠেছে তাঁর অন্তঃশীল প্রতিবাদী সত্তা। মাত্রাবৃত্তের মধ্যলয়ে কবি অপরিসীম ক্ষমতায় সঞ্চারিত করেছেন হা-অন্ন সরস্বতী, যমুনাবতীদের জন্য তাঁর আন্তরিক যন্ত্রণাবিদ্ধ ভালোবাসা। আর এর মধ্য দিয়েই মগ্ন সুরে কবিতার তলদেশ থেকে উঠে এসেছে ব্যর্থ শাসক, শোষকের প্রতি কবির ঘৃণা, প্রাণস্পর্শী হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, কোনো অসংযত উচ্চারণ, কোনো প্রগলভ স্বরায়ণ ছাড়াও যে ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধ স্বর উৎকীর্ণ হতে পারে কবিতায়, বক্ষ্যমাণ প্রতিবেদনে কবি রেখেছেন সেই প্রমাণের মগ্ন স্বাক্ষর।

দিনগুলি রাতগুলির অন্য একটি কবিতা ‘শিশুসূর্য’ বরং প্রতিবাদে প্রখর, উচ্চারণে তীব্র, উচ্চকণ্ঠ :

এ কোন দেশ?

মৃত্যু তার স্খলিত অঞ্চল ঢালে দয়িতমুখে

শিশু তার জন্মে পায় দুর্বল দুয়ারে হাহাকার

সদ্যস্বাধীন দেশের সরকার জনগণের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। দুবেলা দু-মুঠো খাবার জোটাতেও হয়েছিল অসমর্থ, ফলে হাহাকার, মৃত্যুশোকে কালো হয়ে গিয়েছিল এদেশের আকাশ। কবির তরুণ সংবেদী হৃদয় মানতে পারেনি এই বীভৎসা। ফলে কবিতার ছত্রে ছত্রে শাসকের প্রতি, ক্ষমতাতন্ত্রের প্রতি প্রতিবাদ সংহত হয়েছে। বক্র-বাচনে তুলে এনেছেন সেই প্রতিবাদ। প্রশ্নের সূচিমুখে বিদ্ধ করতে চেয়েছেন পাঠকের হৃদয় :

এ কোন দেশ?

তোমার শরীর শিশু মৃত্তিকায় লগ্ন করে করে

শৈশব কামনা করে দেশমাতা দেশ

এ কোন দেশ

অসংখ্য-শিবিরে-রুদ্ধ শিবির কামনা করে

এ কোন দেশ?

প্রথম কাব্যগ্রন্থের দুটি কবিতায় প্রতিবাদী শঙ্খের যে-মুখচ্ছবি দেখা গিয়েছিল, পরবর্তীকালে তা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে। প্রতিবাদ যে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কাব্যচর্চার সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ততায় লগ্ন তা স্পষ্ট হয়েছে বারবার। মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয় কাব্যগ্রন্থ থেকেই তাঁর প্রতিবাদী চেতনা সংহত রূপ নিতে শুরু করে। বাবরের প্রার্থনা, বন্ধুরা মাতি তরজায় ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে কবির ক্ষমতাতন্ত্রবিরোধী স্বর তুঙ্গস্পর্শী। এমন টালমাটাল সময়। সত্তরে দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করতে বঙ্গীয় মেধাবী যুবক-যুবতীদের একটা বড় অংশ সেদিন আত্মকেন্দ্রিকতার অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল কৃষিজীবী জনতার মধ্যে। অন্যদিকে প্রতিবাদী যৌবনকে দমন করতে সরকারও হয়ে উঠেছিল সক্রিয়। ১৯৭২ সালের প্রহসনী নির্বাচনে জয়লাভের পর বঙ্গীয় কংগ্রেস সরকার জয়োৎসবের নামে শুরু করে অত্যাচারের নয়া অধ্যায়। এই কালবেলাই স্তম্ভিত হয়ে আছে ওই দুটি কাব্যগ্রন্থে। সময়চেতনার স্ফুরণ অনেকের কবিতাতেই দেখা গেছে, যাবেও। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাতন্ত্রের রক্তচক্ষুকে নীরব উপেক্ষায় নস্যাৎ করেছেন কজন! কজন সেদিন কবিতায় শানিত করেছেন প্রতিবাদ! অধিকাংশই তো সেদিন সময় ভুলে, সমাজসত্য ভুলে রোমান্টিক ভাবালুতার নিরাপদ স্রোতে গা ভাসিয়ে ছিলেন। এমন সময় মুষ্টিমেয় কয়েকজন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধরেছিলেন কলম, প্রতিবাদে তাঁদের কবিতা উঠেছিল গর্জে। এঁদের মধ্যে তীক্ষèতম প্রতিবাদ যাঁর কবিতায় সংহত হয়েছিল তিনি নিঃসন্দেহে শঙ্খ ঘোষ। লক্ষণীয়, নবারুণ কিংবা মনিভূষণের মতো উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ নয়, এখানে প্রতিবাদ এসেছে মগ্নস্বরে, কিছু দাপটে কাঠিন্যে তা অনন্যপরতন্ত্র। ‘জয়োৎসব ১৯৭২’, ‘তিমির বিষয়ে দু-টুকরো’ থেকে ‘ইন্দ্র ধরেছে কুলিশ’, ‘হাসপাতালে বলির বাজনা’, ‘মার্চিং সং’, ‘রাধাচূড়া’, ‘আপাতত শান্তিকল্যাণ’, ‘শৃঙ্খলা’, ‘বাবু বলেন’ – সর্বত্রই কবির নির্ভীক শিরদাঁড়ার তীক্ষè স্পর্শ আমরা অনুভব করি।

এদের মধ্যে ‘রাধাচূড়া’ এবং ‘আপাতত শান্তিকল্যাণ’ কবিতাটি রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষু প্রদর্শনের সৌজন্যে এক অন্য মাত্রা পেয়েছে। ক্ষমতাতন্ত্রকে যে শানিত লেখনীর দ্বারা সত্যিই ভয় পাওয়ানো যায় তার প্রমাণ তৎকালীন সরকার কর্তৃক কবিতাদুটিকে নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্ত। ‘রাধাচূড়া’ কবিতাটিকে সরকার নিষিদ্ধ করলে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের মতো নির্ভীক কবি-শিল্পীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হন। এরপর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়-আয়োজিত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কবি-সাহিত্যিকদের সাক্ষাৎকারে যা ঘটেছিল তা তো আজ প্রবাদে পরিণত। সেখানে ‘রাধাচূড়া’কে উপলক্ষ করে শিল্পীর স্বাধীনতার সপক্ষে প্রতিবাদের স্বর উচ্চারণের অলৌকিক সাহস প্রদর্শন করেন অলোকরঞ্জন; কিন্তু ‘রাধাচূড়া’কে কেন ভয়ের দৃষ্টিতে দেখেছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাতন্ত্র? আসলে ‘রাধাচূড়া’ পুরোপুরি রূপক কবিতা। এখানে মালি কর্তৃক গাছপালা পরিচর্যার রূপকে কবি স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রের ক্ষমতা বজায় রাখার সুচতুর কার্যক্রমকে নগ্ন করে দিয়েছেন। ক্ষমতাতন্ত্র স্বাধীনচেতা, উন্নত মস্তক প্রতিবাদী নাগরিককে ভয় পায়। তাই

চলে তাদের পোষ মানানো, অবনমিত করার পরিকল্পিত কার্যক্রম। রূপক-স্নিগ্ধ ভাষায় এ-সত্যই কবিতায় উৎকীর্ণ হয়েছে :

খুব্ যদি বাড়্ বেড়ে ওঠে

দাও ছেঁটে দাও সব মাথা

কিছুতে কোরো না সীমাছাড়া

থেকে যাবে ঠিক ঠান্ডা, চুপ –

ঘরেরও দিব্যি শোভা হবে

লোকেও বলবে রাধাচূড়া

এরপর সময় পালটেছে, ক্ষমতায় এসেছে জনগণের সরকার বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু কে না জানে ক্ষমতা এক স্বতন্ত্র সত্তা, সে যাকে আশ্রয় করে তাকেই গ্রস্ত করে। ফলে বামফ্রন্টের গায়েও লাগল দুর্নীতির কালিমা। মেহনতি মানুষের নেতারাও হয়ে উঠলেন স্বেচ্ছাচারী, তাঁদেরও গ্রাস করল ক্ষমতার দম্ভ। প্রতিবাদী শঙ্খ ঘোষের কবিতায় বামফ্রন্টের অপশাসনের সংহত করলেন প্রতিবাদ, বামফ্রন্টের রাজত্বের শেষ পর্বে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-লালগড়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ক্লীন্ন রূপ দেখেও যখন একদল সুবিধাবাদী কবি-সাহিত্যিক শাসকদলের স্তাবকতা করেছেন, তখন শঙ্খ ঘোষ প্রতিবাদে কম্বুকণ্ঠ। সমস্ত ক্ষতের মুখে পলি, মাটিখোঁড়া পুরোনো করোটি, গোটা দেশ জোড়া জউঘর, হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে স্পষ্ট চিহ্নিত হয়েছে কবির ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধ স্বরায়ণ, কখনো একদা জনগণের পার্টির ভণ্ডামিকে বিঁধেছেন বক্রবাচনে : ‘তুমি বলেছিলে জয় হবে জয় হবে/ এরকমই দিন থাকবে না চিরদিন/ তা শুনে কত-না ধামাকায় মেতে গিয়ে/ কী আশ্চর্য নেচেছি অন্তহীন।’

(‘তুমি বলেছিলে জয় হবে জয় হবে’)

 

কখনো ক্ষমতাসীন দলের মুখ ও মুখোশের বৈপরীত্য দেখে কবির বিস্ময়মথিত ঘৃণা হয়েছে তুঙ্গস্পর্শী : ‘ভিতর থেকেই ভালোবাসব ভেবে/ গিয়েছিলাম সেদিন তোমার কাছে/ কিন্তু এ কী আরেকরকম মুখ/ জেগে উঠলাম দহন বেলার আঁচে।’ ক্ষমতাবান অন্ধশক্তি সেদিন চেয়েছিল সবাইকে এক ছাঁচে ঢালতে। কবির প্রতিবেদনে চিরকালের ভাষায় মূর্ত হয়েছে এই প্রবণতার প্রতি তাঁর নির্ভীক কটাক্ষ। কখনো আবার পুলিশনির্ভর জনগণতান্ত্রিক সরকারের আদর্শ ও আচরণের অসংগতি তাঁর বক্রবাচনে বিদ্ধ হয়েছে :

তিন রাউন্ড গুলি খেলে তেইশজন মরে যায়

লোকে এত বজ্জাত হয়েছে।

…   …   …

পুলিশ কখনো কোনো অন্যায় করে না তারা আমার পুলিশ।

এই পর্বে ক্ষমতাতন্ত্রের সীমাহীন ঔদ্ধত্যকে কবি বারবার বিঁধেছেন অসামান্য সাহসিকতায়। এ-প্রসঙ্গে মনে আসে ‘নৈশ সংলাপ ২০০৭’ কবিতাটির কথা। নন্দীগ্রামের গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় কলকাতায় বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয় বুদ্ধিজীবীদের মিছিল। সেই মিছিলে নেতৃত্ব দেন শঙ্খ ঘোষ স্বয়ং। এই সময়সন্ধির পরিপ্রেক্ষিতেই কবিতাটি রচিত। কবিতাটিতে রয়েছে কবির সঙ্গে এক বামফ্রন্ট সমর্থকের দ্বিরালাপ। সেই সমর্থক বেদনাঘিন্ন কণ্ঠে কবিকে বলছেন :

‘আপনি এত প্রকাশ্যেই আমাদের বিরুদ্ধে নামলেন? এতটাও/ দেখতে হল?’ এর উত্তরে কবির প্রফেটিক উক্তি : ‘ভেবে দেখো তোমরা কোথা থেকে কোথায় এসেছ। কী হয়েছ, কী ছিলে। … তোমরা যা বোঝোনি আজও … টের পাওনি, টের পেতে দেয়নি এক দিশেহারা রাজ/ ভিতরে ভিতরে যার ভর হয়ে উঠেছিল লুম্পেন সমাজ।’ এই সংলাপ ক্ষমতান্ধ শাসকশক্তির কাছে নিরাসক্ত আয়নার মতো, সেই আয়নায় ক্ষমতান্ধ শাসক দেখতে পায় তার দুঃসহ নগ্নতা, হয়তোবা অনুভব করে নিজের সুনিশ্চিত পতনের মৃদু পদধ্বনি।

এরপর বামফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটেছে, এসেছে নতুন সরকার। অতিদ্রুত ক্ষমতার সত্তা তাদেরও গ্রস্ত করেছে। তাদের বিরুদ্ধেও

সংহত হয়েছে কবির শানিত লেখনী। জন্ম নিয়েছে ‘মাওবাদী’র মতো কবিতা। এখানে কবি প্রশাসনের পুলিশের স্বৈরাচার, আধিপত্যকামী দমন-পীড়নের প্রবণতাকে তির্যক বাচনে বিঁধেছেন :

এখনও কি তুমি প্রতিবাদ করো?

– মাওবাদী

প্রশ্ন করার সাহস করেছ?

– মাওবাদী!

চোখে চোখ রেখে কথা বলো যদি

ঘড়ি-ঘড়ি সাজো মানবদরদি

আদরের ঠাঁই দেবে এ গারদই

মাওবাদী –

সহজ চলার ছন্দটা আজ

একটু না-হয় দাও বাদই!

শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্র, পুলিশ প্রশাসনিক ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কবির লেখনী সরব এমনটা নয়, ক্ষমতার অন্যান্য কেন্দ্রকেও তিনি তীক্ষè বাক্যশরে বিদ্ধ করেছেন কবিতায়। আরওয়ালে উচ্চবর্ণের গুণ্ডাবাহিনী রণবীর সেনা একদা সংঘটিত করেছিল মারাত্মক গণহত্যা। উচ্চবর্ণের এই নারকীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবিকণ্ঠ সরব হয়। চিরকালই যে প্রান্তিক মানুষ অত্যাচারিত হয়, তাদের রক্তে রচিত হয় নিত্যনতুন জালিয়ানওয়ালাবাগ। এ-সত্যই তাঁর কবিতায় প্রাণস্পর্শী হয়ে উঠেছে :

আমার সবটাই আলো আমার সবটাই অন্ধকার

আমার সবটাই জন্ম আর আমার সবটাই মৃত্যু-দ্বার

 

আমার ধর্মও নেই আমার অধর্ম নেই কোনো

আমার মৃত্যুর কথা যদি কেউ দূর থেকে শোনো

জেনো – এ আমার মাটি এ কাল আমার দেশকাল

জালিয়ানওয়ালাবাগ এবার হয়েছে আরওয়াল!

এই প্রতিবাদী চেতনার আন্তরিক প্রকাশ, ক্ষমতাতন্ত্রবিরোধী অবস্থান শঙ্খ ঘোষকে অমেরুদণ্ডী বাঙালি সমাজে স্বতন্ত্রতা প্রদান করেছে। স্বতন্ত্র করেছে তাঁর কবিতাকে। ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং ক্ষমতাতন্ত্রবিরোধী স্বরায়ণই যে প্রকৃত কবির কর্তব্য শঙ্খ ঘোষ বারবার তাঁর কবিতায় আমাদের মনে করান!

Leave a Reply

%d bloggers like this: