ভাবতে গিয়ে মনে হলো, প্রতি শনিবার আব্বার সঙ্গে দেখা হবার পর আমাদের যে কথাবিনিময় হয়, তার সুরটা মূলত দার্শনিক আর ধর্মীয় বোধে পরিপূর্ণ। আব্বার বয়স অনুমান করে হলেও চুরাশি বছরের কাছাকাছি এবং জটিল হাড়ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হবার কারণে স্বাভাবিক চলাফেরায় ছন্দপতন ঘটেছে। বেশির ভাগ সময় বিছানায় শুয়ে কাটান। খুব বিরক্ত হয়ে গেলে পা টেনে টেনে বসার ঘরটায় এসে বসেন টিভিটা খুলে।

তাঁর পছন্দের টিভি অনুষ্ঠান রেসলিং। আম্মা এটা নিয়ে মাঝেমাঝে বিরক্তি প্রকাশ করলেও আমরা উপেক্ষা করি। আম্মার অখুশির কারণ আমরা বুঝতে পারি। সেটি আমাদেরও অস্বস্তির কারণ। এখনকার রেসলিংগুলোতে স্বল্প পোশাক পরিহিত মেয়ে কুস্তিগীরগুলো লাফালাফি করে। আমাদের মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল চোখ এখনো এসব দেখে অভ্যস্ত হতে পারেনি। তবে আমি জানি, আব্বা কেবল খেলাটাই উপভোগ করেন। যেমনটি আমরা ছোটবেলায় করতাম।

এতোটাই রেসলিংয়ের ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম যে সন্ধ্যাবেলায় টিভিতে রেসলিং দেখানোর সময় লোডশেডিং হলে আমরা কলোনির একটি নির্দিষ্ট বাড়ির ব্যালকনিতে গিয়ে ঝুলতাম। বাইরে থেকে বারান্দার গ্রিল ধরে। মাঝেমাঝে হাত ব্যথায় টনটন করতো। বাসাটা ছিল আব্বার অফিসের একজন গাড়িচালকের। সে একটি ব্যাটারি মজুদ রেখেছিল যেটা দিয়ে বিদ্যুৎ চলে গেলেও টিভি দেখার ব্যবস্থা করা যেতো। ওদের ১৮ ইঞ্চি টিভিটা ঘরের ভেতরে একটা টেবিলে রাখা ছিল। আমরা যারা ক্ষুদে দর্শক ওরকম লোডশেডিং সন্ধ্যায় ওই বাসার ব্যালকনির গ্রিল ধরে ঝুলতাম, তাদের কারো উচ্চতা চার-সাড়ে চার ফুটের বেশি ছিল না। এমন বাঁদরঝোলা ঝুলে থাকতে আমাদের বেশ কষ্ট হলেও টিভির পর্দায় মুখোশ পরা মিল মাসকারাস বা আরো কোনো প্রিয় কুস্তিগীরের ঠেলাঠেলি দেখে আমরা ভীষণ মজা পেতাম। বাসায় ফিরে আব্বাকে বলতাম সেদিনের কুস্তিমঞ্চের ঘটনাসমূহ এবং আরো একবার আনন্দলাভের কারণ ঘটতো। টিভিতে রেসলিং দেখবার নির্দোষ আনন্দের প্রকৃতিটা এমনই ছিল।

পরবর্তীকালে আব্বা-আম্মাকে আমি কিছুদিনের জন্য যখন ব্রাসেলসে নিয়ে যাই যেখানে আমি কর্মসূত্রে কয়েক বছর ছিলাম, ইউটিউবে আব্বাকে রেসলিং দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু টিভির পরিবর্তে কম্পিউটারে রেসলিং দেখে আব্বার খুব একটা ভালো লাগেনি এবং এভাবে তাঁর একঘেয়েমি দূর করার যে-চেষ্টা করেছিলাম তা মাঠে মারা যায়।

চাকরির কারণে প্রথমে ব্রাসেলস আর তারপর কলম্বোতে তিন বছর করে মোট ছ-বছর আমাকে দেশের বাইরে থাকতে হয়। সপ্তাহান্তে প্রতি শনি বা রবিবার আব্বা-আম্মাকে ফোন করতাম। অল্প সময় কথা হতো। অনেক রকম চাপে থাকলেও এই রুটিনে তেমন কোনো হেরফের হয়নি। আর হেরফের করার সুযোগ ছিল না। নিয়ম করে প্রতি শনিবারে ঢাকায় যখন সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসতো মাগরিব নামাজের পর, আমার সময় মিলিয়ে ফোন করতাম। ব্রাসেলসে থাকার সময় টাইম জোনের পার্থক্য হতো চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। কলম্বোতে সেটা আধা ঘণ্টায় নেমে আসে। হেরফের করার সুযোগ ছিল না, কারণ, কোনো শনিবারে যদি বিশেষ কোনো কাজের ব্যস্ততায় ফোন করতে না পেরে পরের দিন রোববারে ফোন করতাম, আব্বা ফোনটা ধরেই বলতেন, গতকাল কেন করিনি। আগের দিন ওই সময়টায় আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করে বসেছিলেন। হাজার মাইল দূর থেকে এই কথা শুনে আমার আবেগ সামলে ওঠা কঠিন হতো। গলা পর্যন্ত উঠে আসা কান্নার গমক কোনোরকম গিলে ফেলে আব্বাকে বলতে পারতাম যে, গতকাল একটু ব্যস্ত ছিলাম, তাই ফোন করে উঠতে পারিনি। আর নিজের কাছে প্রতিশ্রুতি দিতাম এই বলে যে, যত ব্যস্ততাই থাকুক, কোনোভাবেই এই ভুল আর করা যাবে না।

যখনই ওই ছবিটা মনের পর্দায় ভেসে উঠতো, আব্বা তাঁর বিছানায় বসে আছেন মাগরিব নামাজের পরে পিপাসার্ত কান নিয়ে কখন আমার ফোনটা বেজে উঠবে, আর তারপর একটা নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করে থেকে বুঝতে পারলেন যে সেদিনের মতো আর কোনো ফোন আসবে না, আমার ভেতর একটা শূন্যতা ঘুরপাক খেতে শুরু করতো। এরপর আমি যে কাজই করতে যেতাম, হয়তো রান্নাঘরে ঢুকতাম রাতের খাবার তৈরি করতে অথবা টিভি খুলে কোনো চ্যানেলে পছন্দের একটা অনুষ্ঠান দেখতে চাইতাম, কিছুতেই মন বসাতে পারতাম না। একটা তীব্র অপরাধবোধ, সময়মতো ফোন না করে আব্বাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখা, আমার চেতনাকে কুঁকড়ে ফেলতো। ওই সময়ের জন্য নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারতাম না। একটা কঠিন শপথ গ্রহণ করতাম যে, ব্যাপারটার আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু তারপরও কখনো কখনো ঘটে যেতো। আমি একইরকম অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু সময়ের জন্য নিজের ভেতর, নিজের কাছে আড়ষ্ট হয়ে থাকতাম। তারপর নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম এই বলে যে, আব্বা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে কোনো কারণে আমি আজ ফোনটা করে উঠতে পারিনি। আগামীকাল করতে যে কোনো ভুল হবে না সেটি আমার সঙ্গে আব্বাও গভীরভাবে বিশ্বাস করতে থাকেন।

এরকম অনেক ধরনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমি যখন দেশে ফিরে এলাম, প্রতি শনিবার আব্বা-আম্মার কাছে যাওয়া আমার রুটিনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ালো। শরীর খুব খারাপ না

করলে অথবা অফিসের কোনো ব্যস্ততা না থাকলে এই রুটিনের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। তারপরও যদি কোনো কারণে কখনো শনিবারে যেতে না পারি, সেটা আগে থেকে আব্বাকে জানিয়ে অবশ্যই নিশ্চিত করি, কারণ, বৃদ্ধ বাবা-মাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখা আমার কাছে অপরাধ মনে হয়। কোনো সন্তানেরই সেটি করা উচিত নয়। কিন্তু আমি জানি, সব সন্তানের চিন্তা-ভাবনা এক ধারায় প্রবাহিত হয় না। যদি হতো, তাহলে পত্রিকায় বা সামাজিক মাধ্যমে

বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের দুর্ব্যবহারের লোমহর্ষক কাহিনিগুলো প্রকাশ পেতো না। আমাকেও মন খারাপ করতে হতো না এই ভেবে যে, এটা কীভাবে সম্ভব।

তো, আব্বার সঙ্গে শনিবারে দেখা হতে হতে প্রায় দুপুর হয়ে আসে। শনিবারের সকালের আলস্যের জাল থেকে নিজেকে কোনোরকমে ছাড়িয়ে নিয়ে আমি টিকাটুলীর দিকে রওনা দিই। টিকাটুলী রাজধানী ঢাকা শহরের পুরনো অংশের একটি ঐতিহাসিক স্থান। টিকাটুলীর নাম বলতে গেলে আমার লন্ডনের পিকাডেলির কথা মনে আসে। দুটি রাজধানী শহরের ঐতিহাসিক দুটি জায়গার নামের দ্যোতনাজনিত মিল হয়তো এই মনে আসার কারণ। কোনো কোনো শনিবারে টিকাটুলীর পথে আমার আরো দুয়েকটি কাজ সেরে ফেলবার চেষ্টা করি। যেহেতু আমি সাপ্তাহিক দুদিন ছুটির প্রথম দিনটি একেবারেই নিজের জন্য রাখতে চাই। এদিন আমি শামুকের খোলসের মতো নিজের জগতে ঢুকে পড়ি। ঘরের অনেক কাজ করার একটা মানসিক পরিকল্পনা থাকে। তবে বেশিরভাগ সময় অল্প কাজ করেই আমি নিজেকে ছুটি দিয়ে দিই। তখন হয় কিছু পড়ি বা লিখি বা কিছু করবো বলে চুপচাপ বালিশে মাথা দিয়ে ভাবতে থাকি।

কাজের দিনগুলো আমাকে বাইরে কাটাতে হয়। অফিসে, সভায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে নানা কিসিমের মানুষ আর কাজের ভেতর কাটানো সময়গুলোর ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একটা ধারাবাহিক পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এগুলোতে আমাকে অংশগ্রহণ করতে হয়। চেষ্টা করি আমার সামর্থ্য অনুসারে সবটুকু আন্তরিকতা দিয়ে এসব কিছুতে অবদান রাখতে। কতটুকু সফল হই জানি না। তবে নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে পারি। এটাই সান্ত্বনা বা স্বস্তি। আর যেসব কাজে বা স্থানে আমি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি না, অথচ ওই পদ্ধতির অংশ হিসেবে আমাকে সে-সমস্ত কিছুতে উপস্থিত থাকতে হয়, তখন আমি আমার স্বভাবজাত নির্বিকার মনোভাব অথবা উপেক্ষা করার নীতি অবলম্বন করি।

ভান, ভণ্ডামি বা প্রতারণা আমার সঙ্গে যায় না। আমি অভিনয় করতে জানি না। ফলে যারা অভিনয়ে পটু বা ভনিতা ধরে কাজ উদ্ধার করতে ওস্তাদ, তাদের কাছে আমি গ্রহণযোগ্য হতে পারি না। সেটি নিয়ে আমার মাথাব্যথাও নেই। বরং, জিনসূত্রে প্রাপ্ত সততার উত্তরাধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে চলতে আমি গর্ব বোধ করি। এই গর্ব বোধে কোনো অহং বোধ নেই। মনে হয়, বেশ কিছুক্ষণ নিজের ঢোল নিজেই পেটালাম।

এসব বলার অর্থ আসলে আব্বার সঙ্গে আমার শনিবারের যে সাপ্তাহিক কথোপকথন তার পটভূমি তৈরি করা। সততা শব্দটির সঙ্গে অনেক ছোটবেলায় পরিচয় হলেও এর চেয়ে শক্তিশালী আরেকটি শব্দ integrity-র সঙ্গে জানাশোনা হয় আরো অনেক পরে। তখন আমি কলেজে পড়ি। ইংরেজি বিষয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি গল্পের একটি ছিল এম.কে. রোলিংসের ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’। গল্পের প্রধান চরিত্র জেরি নামে এক অদ্ভুত বিষণ্ন বালক। লেখক এই বালকের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে integrity শব্দটি ব্যবহার করেন।

একেবারেই অপরিচিত একটি শব্দ। আমার ইংরেজি ভোকাবুলারি তখন কেবল একটু একটু করে সমৃদ্ধ হচ্ছে। এখানেও আব্বার কথা চলে আসে। প্রাথমিক স্কুলে পড়তে থাকা অবস্থায় আব্বা আমাকে আর আমার ছোট বোনকে ইংরেজি গ্রামার শেখাবার জন্য আলাদা করে নিয়ে বসতেন। তাঁর সংগ্রহে ইংল্যান্ডের নানা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত এ.এস. হর্নবিসহ আরো অনেকের গ্রামার বই ছিল। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত অক্সফোর্ড অ্যাডভান্সড লারনারস  অভিধানসহ আরো নানা ধরনের বইয়ের সঙ্গে। স্কুলের পড়ার বাইরে এ-ধরনের অতিরিক্ত পড়ার চাপ আমাদের কাছে অত্যাচার মনে হতো। কিন্তু কিছু করার ছিল না।

এই প্র্যাকটিস আমার কলেজ ফাইনাল পরীক্ষার পরও অব্যাহত ছিল। পরীক্ষার পর তিন মাসের অবসর। আব্বা অফিসে গিয়ে ফোন করতেন বাসায় আর ওই সমস্ত গ্রামার বই থেকে পড়া দিতেন। এক্সারসাইজ হোমওয়ার্কসহ। এভাবে ইংরেজি ভাষার প্রতি আব্বার নিজের ভালোবাসা তাঁর দুই মেয়ের ভেতর তিনি সঞ্চারিত করতে চান এবং সফল হন। পরবর্তীকালে আমরা দুই বোনই ইংরেজিতে অনার্স আর মাস্টার্স সম্পন্ন করি। যদিও আমি অর্থনীতিতেও পড়বার সুযোগ পেয়েছিলাম। আর শুধু ইংরেজিতে পড়বার জন্য ছোট বোনকে এক শিক্ষাবছর নষ্ট করতে হয়।

আমার ইংরেজি ভোকাবুলারি বাড়াবার সেই শুরুর সময়ের কথা বলছিলাম যখন আমি প্রথম রহঃবমৎরঃু শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হই। এটার অর্থ খুঁজতে অভিধান ঘাঁটতে হলো এবং জানলাম এর অর্থ উচ্চতর নৈতিক বোধ। শব্দটা মগজে গেঁথে গেল। সেই সঙ্গে ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পটির শেষ দুটি লাইন : ‘তার কোনো মা নেই। তার কোনো স্কেটসও নেই।’ আমি নিজে যখন ছোটগল্প লেখার চেষ্টা শুরু করলাম, এই লাইন দুটো সবসময় মাথায় রাখি। কিন্তু চাইলেই এতো শক্তিশালী লাইন লেখা সবসময় সম্ভব হয় না।

আব্বার সঙ্গে আমার শনিবারের আলোচনার নিয়মিত বিষয়সূচি হলো সাহিত্য, আমার অফিসের পরিবেশ আর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রধান খবর। মাঝেমাঝে পরিবারের সদস্য আর আত্মীয়স্বজনের আচরণ-ব্যবহার। আর আব্বার প্রিয় বিষয় পবিত্র কুরআন শরিফ নিয়ে তাঁর বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা। সবকিছুর মূলসুর উচ্চতর নৈতিক বোধ বা ওই integrity সম্পর্কিত। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয় যদি এর মধ্যে আমার কোনো লেখা কোথাও প্রকাশিত হয় তার লেজ ধরে। আব্বা সবসময় আমার লেখার উচ্চকিত প্রশংসা করতে থাকেন আর বলেন, কীভাবে আমি এতো সুন্দর করে শব্দ সাজাই। তারপর তাঁর একটা অবধারিত সিদ্ধান্ত থাকে : ‘ইংরেজিটা শিখছিলি বলেই বাংলাটা এতো স্বচ্ছন্দে আসে তোর।’ আমি অস্বীকার করতে পারি না।

ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছিলাম বলেই আমার সামনে এক অলৌকিক জগতের দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। এই উন্মোচন কেবল চারপাশের দুনিয়া সম্পর্কে আমার ধারণা প্রভাবিত করেনি, সামগ্রিক মানবজীবন বিষয়ে আমার একান্ত নিজস্ব একটি চিন্তার ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। এই ভিতের ওপর আমি প্রতিষ্ঠা করে নিতে পেরেছি আমার আপনার ভুবন।

তবে এখানে বলে রাখা ভালো, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে কালভিত্তিক সবিস্তারে পড়াশোনা শুরু করার অনেক আগে থেকেই, অ্যাংলো-স্যাক্সন বেউলফ থেকে বিংশ শতাব্দীর হেমিংওয়ে-রচিত কিলার এবং ইত্যাদি, বিশ্বসাহিত্যের সান্নিধ্যে আমার নিয়মিত নিবিড় যোগাযোগ। এই ব্যাপারেও যথারীতি আব্বার প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে।

আম্মার কাছে শুনেছি, আমি যখন তাঁর পেটের ভেতর, বিশেষ করে ওই সময়টার আগে-পরে আব্বার পড়াশোনার পরিমাণ অত্যধিক বেড়ে যায়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে আমার জন্ম। যুদ্ধ-পরবর্তী বিধ্বস্ত দেশে সবকিছুর চড়া মূল্য। সামান্য একজন সরকারি চাকরিজীবী হাতেগোনা কয়টা টাকা পেতেন মাসশেষে বেতন হিসেবে। তার সিংহভাগ চলে যেতো ছয় সদস্যের একটি পরিবারের পেছনে নিত্যদিনের ব্যয় মেটাতে। সেখানে আমার মতো দুধের বাচ্চাও ছিল। কিন্তু ওরকম দুর্মূল্যের বাজারেও আব্বার স্বল্প বেতনের কিছুটা চলে যেতো পছন্দের বই কেনার পেছনে।

উত্তরের যে-জেলা শহরে আব্বার তখন পোস্টিং, সেখানের নিউমার্কেটে স্ট্যান্ডার্ড লাইব্রেরি বলে একটি চমৎকার বইয়ের দোকান ছিল (আব্বার সংগ্রহের অনেক বইয়ে এই দোকানের নাম আমি পরবর্তীকালে আবিষ্কার করি)। আব্বা সেই বইয়ের দোকান থেকে কিনতেন নানা ধরনের বই। বাংলা, ইংরেজি মিলিয়ে। তখন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া থেকে ঝকঝকে কাগজে ঝরঝরে বাংলা অনুবাদে চলে আসতো রাশান সাহিত্যের তাবৎ ধ্রুপদী বইয়ের সংগ্রহ। তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, গোর্কি থেকে গোগোল, তুর্গেনেভ, নিকোলাই অস্ত্রভস্কিসহ আরো অনেকে। বইগুলো শোভা পেতে দেখতাম একটি তিন তাকের আলমারিতে। থরে থরে সাজানো।

আম্মার কাছ থেকে আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অক্ষর চেনার পর থেকে বইগুলোর নাম পড়তে শিখে গেলাম। তারপর একটু বড় হতে হতে জুল ভার্নের সব ক্লাসিক পড়ে শেষ করলাম নেশাগ্রস্ত পাঠক হয়ে। আর গোর্কির পৃথিবীর পথ ও পাঠশালার শিক্ষা আর তলস্তয়ের ‘একজন মানুষের কতটুকু জমি প্রয়োজন’-এর দীক্ষা আমার চেতনার মর্মমূলে কিছু একটা বুনে দিলো চিরদিনের জন্য। রাশান সাহিত্যের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠার পর্বেই মূলত আমার ভেতরে এক সন্ন্যাসী বসতি গড়ে নেয়। এরপর ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে দিন-রাতের ওঠাবসা আমাকে পুরোদস্তুর দার্শনিক বানিয়ে ফেলে।

জীবনটাকে চালিয়ে নেবার জন্য আমি যাদের মাঝখানে চলাফেরা করি, প্রায় প্রতি পদক্ষেপে তাদের বেশির ভাগের সঙ্গে আমার একধরনের মানসিক সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে যেহেতু আমার মধ্যে ইতিমধ্যে দার্শনিক উদাসীনতা বা উপেক্ষা করে যাবার প্রবণতা শক্ত খুঁটি গেড়ে নিয়েছে, তাই শত কষ্ট সহ্য করেও আমি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি এবং এখন পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছি। এসব সংঘর্ষ এড়ানো গল্পই আব্বার সঙ্গে আমার শনিবারের আলোচনায় জায়গা করে নেয়।

আমি যখন বিদেশে চাকরিরত ছিলাম, কোনো জায়গাতেই অফিসের পরিবেশ অনুকূল ছিল না। বসদের অযৌক্তিক ও অন্যায় আচরণের শিকার হয়েছি অসংখ্যবার। শুধু নিজে কোনো অন্যায় করবো না বা অফিসের ডিসিপ্লিন নষ্ট হতে দেবো না –    এমন বিশ্বাসের ওপর ভর করে সব অপমানই সহ্য করে গেছি। সহ্য করে যাওয়াটা ঠিক হয়েছে কি না প্রতিবাদী চরিত্রের মানুষরা এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু আমি জানি, যে-পরিবেশে আমি ছিলাম সেখানে প্রতিবাদ করারও সুযোগ ছিল না। একজন খানিকটা প্রতিবাদ করতে গেলে তার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হয়েছিল সেটিও আমাকে দেখতে হয়েছে।

তাই বলে আমি ভীত নই। বরং চুপ করে থাকতে পারি লম্বা সময়। আমার ভেতরে এরকম একটা চাপা জেদ কাজ করে, দেখি না কতদূর যেতে পারে। সময়কে আমি ভীষণ গুরুত্ব দিই। সবকিছু ঘটার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আছে/ থাকে এটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। কোনোকিছুই নির্ধারিত সময়ের আগে ঘটে না – এ-ধরনের একটি দার্শনিক বোধ আমার চেতনায় ভালোমতো গেঁথে গেছে। এটাও আমার ওই সাহিত্য পড়ার প্রত্যক্ষ ফলাফল।

পত্রিকায় যে নৃশংস বা অবিশ্বাস্য খবরগুলি পড়ি, আমি বিশ্বাসই করতে পারি না মানুষের পক্ষে এগুলো কীভাবে করা সম্ভব। কিছুক্ষণ থম ধরা মুহূর্ত কাটানোর পর মনে হয়, মানুষের পক্ষে আসলে সবই সম্ভব। যখন আমি এ-ধরনের খবরগুলো বেশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারি না, তখন ওই পড়া বা লেখার মধ্যেই চোখ-মুখ গুঁজে আশ্রয় খুঁজি।

অনেককে দেখি, লাইমলাইটে আসার জন্য বা যে-কোনোভাবে আলোচনায় থাকার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে। এটা করতে গিয়ে নিজের শরীর বা পরিবারের প্রতিও ঠিকমতো খেয়াল করছে না। অথচ, একটাই জীবন। আর জীবনটা ভীষণ সংক্ষিপ্ত। এই নশ্বর, অনিশ্চিত জীবন নিয়ে বাজি খেলে যারা অহেতুক মূল্যবান সময়টা নষ্ট করে ফেলে তাদের জন্য আমার কেবল করুণাই হয়। ছোট্ট জীবনের আসল সৌন্দর্যই তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। তারা কখনো পরিমাপই করতে পারবে না, কাফেতে বসে এক মগ ধোঁয়া-ওঠা কাপুচিনো পানের মজাটা কোথায়। অথবা, যে-কোনো একটি বেস্ট সেলার উপন্যাস হাতে নিয়ে লিভিং রুমের সোফায় কাত হয়ে তার পাতায় বুঁদ হয়ে যাবার স্বর্গীয় আনন্দের স্বরূপটা কী।

এ-ধরনের মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে/ হয়। এরা সময় কাটানোর জন্য অন্যের অযথা সমালোচনা অথবা নিন্দা করে। আরেকভাবে বললে, অন্যের পেছনে লেগে থেকেই এরা জীবনের দামি মুহূর্তগুলির অপচয় করে। কারণ একটাই, ব্যক্তিস্বার্থ। এরা এদের প্রয়োজনের ব্যাপ্তি নির্ধারণ করতে পারে না বলে ব্ল্যাক হোলের মতো হাঁ করে থাকে। এসব চিন্তা আমাকে এখন এভাবে আক্রান্ত করছে, কেননা আমি বলতে চেয়েছি প্রায় প্রতি শনিবারে আব্বার সঙ্গে দেখা হবার পর আমরা এসব বিষয়ে কথা বলতে থাকি।

বেশির ভাগ সময় আমি বলি, আব্বা শোনেন। কখনো কখনো আব্বা তাঁর মতামত দেন। আমরা দুজন দুই প্রজন্মের প্রতিনিধি। কথা বলতে গিয়ে আমরা আবিষ্কার করি যে, গত তিন দশকে মানুষের জীবনে অর্থ-বিত্ত আর প্রযুক্তির স্বাচ্ছন্দ্য যত বেড়েছে, একই গতিতে পাল্লা দিয়ে মানুষের ভেতর থেকে মায়া-মমতা-ভালোবাসা-সহানুভূতি-সহনশীলতা কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় এসে নেমেছে। অর্থের পেছনে মানুষের অন্ধের মতো ছুটে চলা আর ছোট-বড় যে-কোনো অসৎ পথ অবলম্বন করতে বিন্দুমাত্র সঙ্কোচ বোধ না করার গল্প শুনে আব্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

তারপর বলেন, ‘আমাদের সময় মানুষ এতো লোভী ছিল না।’

আমি বলি, ‘সব কালেই হয়তো ছিল, আব্বা। তা না হলে তলস্তয় ওই গল্পটা লিখতেন না। কিন্তু এখন এর প্রকোপ বেড়েছে। তাই চোখে পড়ে।’

আব্বা আমার কথা শুনে স্মিত হাসেন। আমাদের মধ্যে কিছুক্ষণের নীরবতা নেমে আসে। তারপর তলস্তয়ের নাম শুনে আব্বা  সেই পুরনো গল্পটা আবার বলতে থাকেন। আমি জানি, এই গল্পটা বলতে আব্বা ভালোবাসেন। অনেকবার শোনা গল্প। তারপরও তাঁকে বলতে দিই। আমি আরো জানি, গল্পটা বলে শেষ করার আগেই আব্বার গলা ধরে আসবে। ফ্যাকো অপারেশন করা বয়স্ক ঘোলা চোখজোড়া অশ্রুতে উপচে উঠবে। যেভাবে ঘন বর্ষাকালে ভারী বর্ষণের পর গ্রামের বাড়ির পুকুরটা ভরে উঠে পুকুর পার ভেসে যায়।

গল্পটা যে কার লেখা আব্বা বা আমি কেউই মনে করতে পারি না। আব্বার মতে, এটা বুড়ো তলস্তয়ের লেখা। আমার অন্য কারো কথা মনে হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কারো নাম মনে করতে পারি না। জাহাজের মাস্তুলের চূড়ায় ছোট্ট ছেলেটা উঠে গেছে। নিচে থেকে সবাই উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে। এই বুঝি পা ফসকে পড়ে যায়। বাবা চিৎকার করে গালাগালি করছেন, ‘নেমে আয়, হারামজাদা। আজ তোকে মেরে তক্তা বানাবো।’ বকা খেয়ে ছেলে আস্তে করে নেমে আসতেই বাবা দৌড়ে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কাঁদতে থাকেন। গল্প বলা শেষ। আব্বার চোখ ভিজে গেছে। গলা ধরে এসেছে। আমি চুপ করে একবার আব্বার মুখের দিকে তাকিয়ে েেদয়ালের দিকে ফিরে বসি। আমার আরেকটা গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। বহুদিন আগের গল্পটা আমাদের জীবনের।

এক সকালে কলোনির বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন ছেলেমেয়ে জমা হয়েছে নদীর কিনারে। ভৈরব নামের নদীটা বয়ে গেছে কলোনির পাশঘেঁষে যেখানে উঁচু দেয়াল থাকার কথা থাকলেও এখন নেই। খোলা পথ দিয়ে যে-কোনো সময় চোর-ডাকাতের দল ঢুকে আমাদের বাসাগুলো আক্রমণ করতে পারে। একদিন এই খোলা পাড়ের ধারে এক মহিলার লাশ ভেসে এসেছিল। কোরবানি ঈদের কদিন আগে। আমরা ছাগলকে কাঁঠালপাতা খাওয়ানো ভুলে সেই লাশ দেখতে ছুটে গিয়েছিলাম। এর আগে কখনো পানিতে ভেসে আসা মানুষের মৃতদেহ দেখিনি কেউ। কচুরিপানার ঝাড়ের সঙ্গে লেগে উপুড় হয়ে ছিল একজন দুর্ভাগা মহিলার প্রাণহীন দেহ। পানিতে ফুলে উঠেছিল শরীরটা। সম্ভবত মাথার চুল বাম হাতে পেঁচিয়ে ছিল। খেয়াল করলে দেখা যাচ্ছিল। দৃশ্যটা মনের পর্দায় বুঝি আটকে গেল চিরদিনের জন্য। এতো বছর পরেও স্পষ্ট মনে করতে পারি।

তখন আমার বয়স ছিল দশ বা এগারো। আমরা ফিরে এসে ভুলে গিয়েছিলাম। এখন ভাবি, আমাদের মধ্যে যারা বয়সে বড় ছিল, তাদের কেউ থানা পুলিশে খবর দিয়েছিল কি না। খুব অল্প সময় বিষয়টা আমাদের ছোটদের মাথায় ছিল। তারপর আমরা অন্যান্য খেলায় মেতে উঠেছিলাম। অথচ, ঘটনাটা কতটা মারাত্মক ছিল সেই বয়সে আমাদের সাধারণ বুদ্ধির রাডারে তা ধরা দেয়নি। কিন্তু দৃশ্যটা আমি ভুলে যেতে পারিনি। এটি শৈশবের ভুলতে না-পারা কিছু ঘটনার একটি।

আরেকটি সেই গল্প যেটি বলতে গিয়ে আমি দূর অতীতের অন্যএকটি ঘটনা টেনে এনেছি গল্পের ভেতরের গল্প হিসেবে। এক ছায়াময় বিকাল ছিল সেদিন। খেলতে খেলতে আমরা সবাই যথারীতি নদীর সিমেন্ট বাঁধানো পারের ওপর এসে বসলাম। সামনে ধীরস্থির ভৈরব মৌন ভঙ্গিতে বয়ে যাচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। সেদিন নদীতে কোনো কচুরিপানার দল ছিল না। পানি ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ। মুখ বাড়ালে আয়নার মতো প্রতিফলন হয়।

মাঝনদীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে হঠাৎ ভুস করে শুশুকের মাথা ভেসে উঠতে দেখা যায়। কেউ একজন দেখতে পেলে অমনি দেখার আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। অন্যরা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নদীর সেদিকটায় তাকায়। কিন্তু শুশুকটা তখন আরেক দিকে ভেসে ওঠে। সবার ঘাড় এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে বলে, ‘একটা না। আসলে অনেকগুলো শুশুক।’ কথাটা সত্যি করে দিয়ে নদীর বুকে বিকালের নিস্তেজ আলোর ভেতর দুই-তিন দিক থেকে কয়েকটা শুশুকের মাথা একসঙ্গে ভেসে উঠতে দেখা যায়। আমরা বাচ্চারা, বড়রা বাচ্চা বলে আমাদের ওপর খবরদারি করতে চায়, হইহই করে উঠি।

এর মধ্যে বলা নেই, কওয়া নেই, মাঝারি আকারের একটা খালি নৌকা আমাদের কাছে এসে ভেড়ে। নৌকায় একজন মাঝি আর তার একজন সহযোগী। দুদিন আগে নাকি বড়দের কেউ কেউ নৌকা ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। আমাদের জানা ছিল না। খুশি আর উত্তেজনায় টগবগ করতে করতে আমরা সবাই নৌকায় চেপে বসলাম। বড়রা নৌকার চারপাশ ঘিরে। ছোটরা গুটিসুটি মেরে মাঝখানে। নৌকা দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে চলতে শুরু করেছে।

আমরা ভীষণ উত্তেজিত। একটু

ভয়-ভয়ও করছে। সন্ধ্যা হতে আর বেশি বাকি নেই। এক চক্কর দিয়ে সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে পারবো – সেই আশঙ্কা মনে কিছুটা হলেও আসা-যাওয়া করছে। বাসার কড়া নিয়ম, সন্ধ্যায় মাগরিবের আজান পড়ার মধ্যেই ঘরে ঢুকতে হবে। যেভাবে পাখিরা নীড়ে ফেরে। কবুতর আর মুরগিগুলো ঢুকে পড়ে খোপের ভেতর। ছোট বোনটাও সঙ্গে আছে। আছে পাশের বাড়ির দুই বোন যারা আমাদের দুই বোনের বান্ধবী। একবার ঘাড় উঁচু করে আকাশের দিকে তাকাই। সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসছে ধীরে ধীরে। মনের মধ্যে বাসায় ফিরে যাবার ভয়টাও জমে আসছে। ছোট বোনটা নিশ্চিন্তে তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মগ্ন। আমি সঙ্গে আছি। কাজেই তার বাড়তি কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

আমরা তখন তীর থেকে বেশ দূরে একেবারে মাঝনদীতে। হঠাৎ সমস্ত চরাচর কাঁপিয়ে একটা সুতীক্ষ্ণ চিৎকার। … না। … না। … না। একবার। দুবার। তিনবার। নৌকায় থাকা সবার মাথা একসঙ্গে সেদিকে ঘুরে গেল যেদিক থেকে আমরা রওনা করেছি পনেরো-কুড়ি মিনিট হয়ে গেছে। আর কারো কাছে নয়, এক অলৌকিক উপায়ে আব্বার কাছে দুঃসংবাদ পৌঁছে গেছে। তাঁর ছোট দুইটা মেয়ে নৌকায় করে নদীতে ঘুরতে গেছে যে মেয়ে-দুটি সাঁতার জানে না।

আমার ডাকনাম ধরে আব্বা তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে ডেকে যাচ্ছেন। আমাদের ফেরাতে চাচ্ছেন। বাতাসে ভেঙে গিয়ে শুধু নামের শেষ অক্ষরটা না হয়ে, নিষেধ হয়ে, আমাদের পথ আটকাতে চাইছিল। আব্বা সেদিন তাঁর দম আটকে রেখেছিলেন যতক্ষণ আমরা ঘরে না ফিরি। আব্বার ওই মর্মভেদী চিৎকার আমাদের নৌভ্রমণের আনন্দে আকস্মিক ছন্দপতন ঘটায়। নৌকা ঘুরিয়ে আমরা ফিরে আসি। এখন আমাদের শনিবারের কথোপকথনে মনে হলেই আব্বা যখন সেই রাশান বালকের কথা বলেন যে জাহাজের মাস্তুলের মাথায় উঠে তার বাবার হৃদকম্পন বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছিল, আমার তখন অনেক দূরে ফেলে আসা সময়ের বাক্সে আটকে থাকা অসমাপ্ত নৌভ্রমণটার কথা মনে পড়ে যায়। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো শনিবারের পিতা-কন্যার আড্ডায় এই গল্প এসে ঢুঁ মেরে যায়নি। ভাবছি, আমার এই গল্প লেখার উছিলায় আব্বাকে সামনে বার সেটি মনে করিয়ে দেব কি না। কিন্তু আমার বুড়া আব্বার ভেজা চোখ দেখতে আমার ভালো লাগে না। যেমন ভালো লাগে না তাঁর ধরে আসা কণ্ঠস্বর। হয়তো আমি নাও বলতে পারি। হয়তো আমি বলতে পারি সেই গল্পটা যেটা আরেক শনিবারে শুরু করেছিলাম এই বলে যে, ‘আব্বা, আমি তো আসলে মনে মনে একজন সন্ন্যাসী।’

Leave a Reply