কালো বেড়ালটার জন্য শম্ভুচরণকে সকালবেলাতেই মাঝেমধ্যে পাঁচিল টপকাতে হয়। আর বেড়ালটাও তক্কেতক্কে থাকে। শম্ভু পাঁচ মিনিট দশ মিনিট আগেপিছু করে বেরিয়ে দেখেছে, মিচকে একটা হাসি নিয়ে বেড়ালটা টুক করে রাস্তাটা কেটে বসে থাকে। সারাদিনের ব্যবসা বলে কথা, অগত্যা শম্ভুকে পেছনের পাঁচিল টপকে সদর রাস্তায় উঠতে হয়। এমনিতে চায়ের দোকান মানে বারোভূতের আড্ডা। কেউ পয়সা না দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে তো কারো কাছ থেকে পয়সা চাইতে লজ্জা করে। বিড়ি-সিগারেটেরও খদ্দের কমছে। আজকালকার বাচ্চারা লুকিয়ে বিড়ি-সিগারেট খেয়ে কোনো আনন্দ পায় না। সে ছিল শম্ভুচরণের ছোটবেলায়, বিজয়া দশমীর দিনে প্যান্ডেলের পেছনে লুকিয়ে ঘন্তা, দীপক, বুড়ো, নুলো একটা চারমিনারকে ভাগ করে খেতো। মনে হতো কত বড় হয়ে গেছি। এখনকার বাচ্চাদের নাকি বড় বড় নেশা! তা বিড়ি-সিগারেটের বাইরে পানমশলা, খৈনিও রাখে শম্ভু। কিন্তু বিক্রিবাট্টা বড়ই কম। 

তার ওপর সোনামণির খাঁই দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাঁজা মেয়েছেলের যদি ধোলো রং হয় তাহলে তার মতো নচ্ছার মেয়েমানুষ খুব কম হয়। বউকে পালিশ মেরে রাখার জন্য চ্ছের টাকা খরচা হয় প্রতিমাসে। সাবান, তেল, সেন্ট তো আছেই, গত মাসে ফেসিয়ালের জন্য পাঁচশো টাকা গচ্ছা গেছে। এখন লোকজন নাকি পুজোর আগে, বিয়ের আগে, নেমন্তন্ন বাড়ি যাওয়ার আগে ফেসিয়াল করে। কিছু মানুষ মার্কেটিংয়ে গেলে, বাপের বাড়ি যাওয়ার আগেও ফেসিয়াল করে। পাঁচশো টাকা শুনে একটু গাঁইগুঁই করেছিল শম্ভু। কিন্তু সোনামণি তেড়েমেড়ে যেই বললে যে, সনাতনদার বউ পটি করতে গেলেও ফেসিয়াল করে তখন থেকে শম্ভু একদম চুপ মেরে গেছে। আর চুল স্ট্রেইটেনিংয়ের খরচ শুনলে চুল এমনিতেই সোজা হয়ে যায়। লোকের মুখে শুনেছে, সোনামণির সঙ্গে সনাতনদার আশনাই আছে। সনাতনদাকে একদম সহ্য করতে পারে না শম্ভু। বউয়ের মুখের ওপর সে-কথা বলতেও ভয় পায়। সোনামণিকে রীতিমতো সমঝে চলে ও। আর সনাতনদা তো নেতা মানুষ, ছুঁয়ে ফেললে বাহাত্তর ঘা।

 আসলে শম্ভুর স্বভাবটাই একটু গর্তে সেঁধানোর। গণ্ডগোল দেখলে এড়িয়ে চলা স্বভাব। মায়ের সঙ্গে যখন সোনামণির লাগলো তখন একবার মনে হচ্ছিল মা জিতে যাবে তো একবার মনে হচ্ছিল বউ। শম্ভুও নিজের স্বভাব অনুযায়ী মাঝেমধ্যে জার্সি বদল করছিল। মাও বেশ দজ্জাল। একেবারে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি। তবে সোনামণি এককাঠি ওপরে যায়। শেষ পর্যন্ত দুই ভাই, শম্ভু আর শিব আলাদা হলো। শিবুর ভাগে পড়লো মা-বাবা আর চার ভাগের তিন ভাগ সম্পত্তি। শম্ভু পেল বাইরের দিকের দেড়খানা ঘর। শম্ভু বোকাবুদ্ধির মানুষ, প্রথমে আধাবখরার জন্য চেঁচামেচি করার পক্ষে ছিল। সোনামণি এক ঝাপটে চুপ করিয়ে দিয়েছে। বছরদুয়েক বাদে সোনামণি মামলা ঠোকায় বুঝেছিল কারণটা কী? বাবা-মাকে নিজের ঘাড়ে নিতে হলো না, আবার মামলার প্যাঁচে পড়ে শিবু আধাআধি বখরাতেই রাজি।

তবে শিবু আড়ালে বউদির নিন্দে করতে ছাড়ে না।

সোনামণি সম্পর্কে গজিয়ে ওঠা গসিপের কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তাই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না শম্ভু। জানে পুরুষমানুষ, সারাজীবন দাঁত কেলিয়ে খেটে যেতে হবে। বাবাকেও তাই করতে দেখেছে শম্ভু। সবাই কি আর সনাতনদার মতো চওড়া কপাল করে জন্মায়?

 কিন্তু খাটাখাটিরও তো একটা সীমা আছে। শম্ভুদের বাড়ির পেছনদিকে বড় পাঁচিলটার ধারঘেঁষে শিবুর গোয়াল। একমাত্র শিবুর ধোলো গরুটা মনে হয় শম্ভুর কষ্টটা বোঝে। পাঁচিল টপকানোর সময় প্রায়ই গরুটার সঙ্গে চোখাচোখি হয়। ধোলো বেশ সহানুভূতির চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। শিবু বিয়েথা করেনি। গরুগুলোই শিবুর সন্তান। হাজার হোক, বকলমে বংশধর তো? জ্যাঠামশাইয়ের কষ্ট বুঝবে না?  

পাঁচিলটা টপকানোর সময় আজ খানিকটা পাছার ছাল উঠে গেল। আসলে প্যান্টটা দু-বছর আগেকার পুজোর। যে-কোনো মুহূর্তে শ্লীলতার আবরণ খুলে যেতে পারে। শম্ভুও প্যান্টটাকে বেশ তোয়াজে রাখে। ঘষা খাবার সময় যত না পাছার চামড়ার জন্য দুঃখ পেয়েছিল, তার থেকে প্যান্টের জন্য বেশি উদ্বিগ্ন হয়েছিল। চামড়া বিনা পয়সায় গজিয়ে যাবে। এখন প্যান্টের খরচ বার করতে গেলে সোনামণির ফেসিয়ালের খরচ উঠবে না। সোনামণিকে বললেই ফোঁস করে উঠবে – ‘আমার মুখ আগে না তোমার …’। অশ্লীল কথা সকালবেলা মনে আনতে চায় না শম্ভু।

কিন্তু সত্যিই টাকার বড় দরকার। যতো দিন যাচ্ছে ততো জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এর মধ্যে টুকটাক ফ্যাকড়া তো আছেই। বেশ কদিন তো করোনার করুণায় দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তারপর আমপানের ঝড়ে কোথাও কিছু নেই, শম্ভুর দোকানের চালটা উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। বেশ কিছু টাকা গচ্ছা গেছে। নতুন চালের সঙ্গে গুমটিটার বাঁশ আটকাচ্ছিল না। একজনকে বাঁশ দেওয়ার জন্য বাঁশের দামই যথেষ্ট সেটা শম্ভু হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছে। সাইকেলটাও মাঝখান থেকে ব্যাগড়বাই করেছে। রতনদার দোকানে নিয়ে যেতে সে সাইকেলের দু-চাকায় প্রণাম করে প্রস্তাব দিয়েছে মিউজিয়ামে দিয়ে দিতে। বিবর্তনের পরে এখন যেটাকে সাইকেল বলে চালানো হয়, তার পার্টসের সঙ্গে শম্ভুর সাইকেলের পার্টসের কোনো সম্পর্ক নেই। রতনদাই ব্যবস্থা করে লোহালক্কড় হিসেবে বেচে দিয়েছে। যে-টাকা পেয়েছিল তাতে সোনামণির একজোড়া জুতো হয়েছে। মাঝখান থেকে মালপত্র থাকলে শম্ভুকে রিকশা নিতে হয় – দশ টাকা ফালতু গচ্ছা। এর মধ্যে শম্ভুর মোবাইলটি খারাপ হয়েছে। কালো, ছোট্ট একটা সেট। সেটায় শুধু ফোন করা আর ধরা যেতো। ব্যবসায় কাজে লাগতো। তারপর থেকে সোনামণির পুরনো একটা সেট নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল। সর্বনাশটা করল তথাগত। দুপুরে কলেজ যাচ্ছি বলে বেরিয়ে শম্ভুর গুমটিতে এসে বসে। আরো কটা বিশ্ববখাটে ছেলে এসে দেশোদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পোস্টার- টোস্টার লেখে, আজগুবি কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে। হাফ চায়ে খুব একটা লাভ থাকে না। একতাড়া বিড়িও মাঝেমধ্যে ধারে দিতে হয়। ওরা থাকা মানে শম্ভুর লোকসান। তবু দোকানটা গমগম করে বলে আপত্তি করে না। তা সোনামণির পুরনো সেটটায় তথাগত নেট চালু করে দিয়েছে। একটা নেশার মতো – ফালতু খরচা বেড়েছে। তথাগত বাউন্ডুলে বলে শম্ভু তো আর সবকিছু বিসর্জন দিতে পারে না। এক মাসেই নিজেকে সামলে নিয়েছে, পারতপক্ষে আর নেট খোলে না শম্ভু।

আগডুম-বাগডুম ভাবতে ভাবতে দোকান খোলে শম্ভু। এই সময়টার একটা অদ্ভুত নেশা আছে। সূয্যিদেব ওঠার আগে একমুঠো হালকা আলো অন্ধকারের মধ্যে ছুড়ে দেন। সেই আলো আবির হয়ে মেঘগুলোর আনাচে-কানাচে জড়িয়ে ধরে। ঘাসের ডগায় জমা শিশিরকণা কি সুন্দর সেই রং তাড়াতাড়ি মেখে নেয়। এ বড়ো পবিত্র মুহূর্ত। তিনি আসছেন। এ যেন প্রতিদিনের দুর্গাপূজার বোধন। প্রথম চা-টা বিনে পয়সায় দেয় শম্ভু। এই ভোররাতেও খদ্দের জুটে যায়। আজ কাঁচাপাকা চুলের এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। শম্ভু পয়সা নেবে না শুনে বলে, ‘তাহলে তোমাকে একটা গান শোনাই।’ ভরাট গলায় গেয়ে ওঠেন ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে।’

শম্ভু গানের ভক্ত নয়। অবশ্য চায়ের দোকানে সব খবরই চালাচালি হয়। কাল রাতে নাকি একটা ঘরোয়া প্রোগ্রামে শ্রীকান্ত আচার্য নামে বিখ্যাত গায়ক এসেছিলেন। আজ সকালে গাড়ি করে তিনি বেরিয়ে গেছেন। তাহলে কি ভোররাতে একলা হাঁটতে বেরিয়ে পড়েছিলেন? তথাগত বললে যে, ওর সঙ্গে একটা সেলফি তুলে দোকানে আটকে দিলে মাসখানেকের বিক্রি নাকি একদিনে হয়ে যেতো। শম্ভুর তো কপালের দিকটায় ফাটল আছে, সেই ফাটল গলে সব সুযোগই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

এরকম আরেকটা সুযোগ হাতে এসে গেলো। অযাচিতভাবেই। সনাতনদার সঙ্গে বাড়ি ফেরার সময় মুখোমুখি দেখা। পিত্তি জ্বলে ওঠা কী জিনিস সনাতনদাকে দেখলে বুঝতে পারে শম্ভু। নিজের বাড়ি থেকে বেরোতে দেখলে যেসব প্রশ্ন মনের ভেতর উঁকি দেয় সেগুলো সোনামণির ভয়ে মনের ভেতর থেকে যায়। কষের পোকাধরা দাঁতটা পর্যন্ত দেখিয়ে কষ্ট করে হাসে শম্ভু। সনাতনও দাঁত কেলায়। কেমন চার অক্ষরের বোকা মানুষ লাগে ওকে। সেরকমই দাঁতের শোকেস খোলা রেখে বলে – ‘তোর সঙ্গে কিছু কথা আছে শম্ভু।’ 

শম্ভু যতখানি পর্যন্ত দাঁত বার করা যায় করে বলে, ‘বলো সনাতনদা।’

‘এখানে হবে না, তুই বরং রাত্রি করে আমার বাড়িতে আয়।’ – সনাতন বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে বলে। বাইকটার দিকে লোভী চোখে তাকায় শম্ভু, ভগবান ভীষণ একচোখা। এরকম একটা ঘ্যামা বাইক সনাতনের সঙ্গেই মানায়। ঠিক করে নেয় একটু বেশি রাত করেই ওদের বাড়ি যাবে।   

দুই

কেন কোডে কথা বলতে হবে? কেন একটা সিগারেটের দাম অতো বেশি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না শম্ভু। সনাতনদার মুখের ওপর না বলার সাহস নেই। তাই একটু ঘুরিয়ে বলেছিল যে, একটু ভেবে জানাবে ও। মাঝখানের সময়টুকুতে মাথা নিচু করে নিজের মোবাইলটা ঘাঁটছিল। বেড়ে সারিয়েছে তথাগত মোবাইলটাকে।  সনাতনের মুখের দিকে সরাসরি তাকাতে অস্বস্তি লাগে। মোবাইলটা হাতে করেই ভাবছিল শম্ভু। লাভের অংশটা অবশ্য বেশ লোভনীয়। দু-একটা খদ্দের জুটলেই সোনামণির মাসে চারবার ফেসিয়ালের খরচ উঠে যাবে। সনাতনদাকে জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছিল না এটা কোনো বড়সড় নেশার জিনিস কি না। তাহলে তো সমাজের ক্ষতি হয়ে যাবে। 

‘তাহলে ভেবেই জানাস।’ – সনাতন সোফায় বসে আড়মোড়া ভাঙে। এর একটাই অর্থ – এবার কেটে পড়ো। শম্ভুও কেটে পড়তে পারলেই বাঁচে। রাস্তাটা বেশ ফুরফুরে মেজাজেই এসেছিল। বাড়িতে ফিরে মনটা আবারো বিগড়ে গেল। সোনামণি একটা বিপজ্জনক পোশাক পরে ফ্যানের হাওয়া খাচ্ছে। এরকম দু-চারটে পোশাক ওর আছে। পাড়ার উঠতি বয়সের ছেলেপুলেগুলোকে উচ্ছন্নে পাঠাবার ইচ্ছা জাগলে সোনামণি এই পোশাকগুলো বার করে। এই রাতদুপুরে দর্জির পরিশ্রম বাঁচিয়ে দেওয়া পোশাকটা কেন পরেছে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না শম্ভু। কচ্ছপ নয়, শামুকের মতো একটা খোলস আছে শম্ভুর। বাইরের কলে হাতমুখ ধুতে ধুতে সেই শামুকের খোলের মধ্যে নিজেকে ঢুকিয়ে নেয় ও। 

সাধারণত শম্ভুর খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে না সোনামণি। আজ একসঙ্গে খেতে বসেছিল। ডাল-ভাত, পটোল ভাজা আর ডিম সেদ্ধ। শম্ভুর কাছে মোটামুটি ভোজবাড়ি। কারণটা ভাবতে ভাবতে ডালটা আঙুল দিয়ে একটু বেশিক্ষণ নেড়ে ফেলেছিল ও। সোনামণি ভুরু কুঁচকে তাকাতে প্রায় মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিল – ডাল মে কুছ কালা হ্যায় কি না দেখছে। শেষ মুহূর্তে শামুকের খোলটা ওকে বাঁচিয়ে দেয়। টুপ করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। 

সোনামণি সারামুখে রাতের বেলা কীসব মাখে। সেই কিম্ভুতকিমাকার মূর্তি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ মোবাইল হাতে কাটায়। তারপর মুখ ধুয়ে আরো একপ্রস্ত রূপচর্চা করে বিছানায় ঢোকে সোনামণি। শম্ভুকে ওত পেতে থাকতে হয়। সোনামণি মশারির ভেতর ঢুকলে ওকে আলো নিভিয়ে, দরজা লাগিয়ে আসতে হয়। তারপর গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় শম্ভু। নিয়মের হেরফের হয় না খুব একটা।  

আর নিয়মের হেরফের হলেই চিন্তা হয়। মুখে হাসি নিয়ে শম্ভুর শরীরের কথা জিজ্ঞেস করতে কিছু বলে উঠতে পারে না ও। তোতলে-মোতলে বিড়ির বান্ডিলটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল শম্ভু। ঘরে বিড়ি ধরালে অশান্তি করে সোনামণি। 

‘আহা, বাইরে খাবে কেন? এখানেই ধরিয়ে নাও। কত্তো পরিশ্রম যায়।’ 

‘ঘর পোড়া গরু তো।’ প্রায় স্বগতোক্তি করে শম্ভু। 

এবার খ্যাঁক করে ওঠে সোনামণি। ‘কী বললে?’

‘নাহ্, ঘরে বিড়ি ধরালে পোড়া পোড়া গন্ধ ওঠে’ – সামাল দেয় শম্ভু। 

বাইরে বসে বিড়ি ধরায় শম্ভু। সেরকম আমেজ আসে না। বিড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে দুশ্চিন্তাগুলো পাকিয়ে পাকিয়ে উঠে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অন্ধকারে পথ খুঁজে না পেয়ে কালোর সঙ্গে মিশিয়ে নেয় নিজেকে। ধোঁয়াগুলো অন্ধকারের অংশ হয়ে যায়। নিজের চিন্তাগুলোর সঙ্গে সততাও বোধহয় মিশে থাকে শম্ভুর। সততাও হয়তো একদিন পথ খুঁজে না পেয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। 

ঘরে ঢুকে দেখে মশারি ফেলা। ডাল মে কালা নয় একেবারে পুরো কালো ডাল। সোনামণি নিজ হাতে মশারি টানিয়েছে মানে সূর্য ওঠার দিকটা ঠিকমতো খেয়াল করা হয়নি শম্ভুর। শম্ভু বিছানায় উঠতে ওকে জড়িয়ে ধরে সোনামণি। দু-হাত দিয়ে শম্ভুকে পরতে পরতে ছিঁড়তে থাকে।  হঠাৎ করেই ও আবিষ্কার করে, ওর কোনো আকর্ষণ জাগছে না। হাঁফ ধরা গলায় সোনামণি জিজ্ঞেস করে, ‘আজ সনাতনদার কাছে গিয়েছিলে?’ 

অসহায়ের মতো জবাব দেয় শম্ভু। বিবমিষা জাগে। মুখের ওপর  হামলে পড়া সোনামণিকে বড়ো উচ্ছিষ্ট মনে হয়। কেটে কেটে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কী চাও? আমি সনাতনদার প্রস্তাবে হ্যাঁ করি?’

লোভে অন্ধকারেও ঝিলিক মেরে ওঠে সোনামণির চোখ। নিজের গা থেকে সোনামণিকে আস্তে আস্তে ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে জবাব দেয় শম্ভু, ‘ঠিক আছে, তাই হবে।’ 

 গা থেকে খসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাক ডাকতে থাকে সোনামণির।

তিন   

তথাগতর সঙ্গে কথা বলে সুখ নেই। অথচ তথাগতরা না এলেও কেমন আলুনি লাগে। সব জায়গায় ওরা যুদ্ধ খোঁজে। সাদা মানুষ-কালো মানুষে, গরিবে-বড়লোকে, ভালোয়- মন্দয় একটা লড়াইয়ে থাকে ওরা। ওরা মানে তথাগত ও তার বন্ধুরা। ‘এসব করে কী পাও? যত ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো!’

উত্তরে দু-হাত দু-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে চড়া গলায় বলে ওঠে – ‘আমি সেইদিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ ভূমে রণিবে না।’ 

শম্ভু বিড়ি ধরিয়ে উত্তর দেয়, ‘যখন যেখানে-সেখানে বনের মোষ লেজ নেড়ে নেড়ে চরিবে না/ যখন বিয়ে করা এক বাঁশের চারা ঘরেতে তিষ্টতে দিইবে না।’ 

হা-হা করে হাসে তথাগত। বলে, ‘একটু যদি পড়াশোনাটা চালাতে গুরু, তাহলে তোমার ওপর কেউ লাঠি ঘোরাতে পারতো না।’    

ঝিমঝিম দুপুরে তথাগতর সঙ্গে সময় গড়ানোর কথা চালাতে হয় শম্ভুকে। – ‘লাঠি ঘোরানোর জন্য কি আর পড়াশোনার দরকার পড়ে। আমাদের এমএলএ রসময়বাবু তো এইট টপকাতে পারেনি। একই স্কুলে পড়তাম বলে জানি। এখন স্কুলের পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে স্যারদের ওপরই ছড়ি ঘোরায়।’

‘কিংবা সনাতনদা। কেউ ঘুণাক্ষরেও বলবে না শিক্ষাদীক্ষা কিছু আছে। কিন্তু তিনি লাঠি নয়, একেবারে বাঁশের কারবার করেন। মানুষের খারাপ খারাপ জায়গায় বাঁশের সাপ্লাই দেওয়ায় সিদ্ধহস্ত।’

‘তুমি আজ এতো তেতে আছো কেন শম্ভুদা?’ – তথাগত প্রশ্ন করে। ‘বউদি কি আবার ফেসিয়াল করবে বলে ক্ষেপে উঠেছে?’

‘বকিও না, আমি মরছি নিজের জ্বালায়।’ তথাগতকে কাটাবার চেষ্টা করে শম্ভু। অনেক কষ্টে বিকেল পড়তে পুরো দলটাকে দোকান থেকে ওঠানো গেলো। 

শম্ভু চা-বিস্কুটের সঙ্গে পাউরুটি, ডিম, মাখন, কোল্ড ড্রিংকস রাখে। পানও সাজে। দুপুরের দিকে পানের ডিমান্ড থাকে। সকালের দিকে ডিম-পাউরুটি আর সন্ধ্যাবেলায় চা-বিস্কুট। দুপুরে কোল্ড ড্রিংকস আর সবসময়ের জন্য বিড়ি-সিগারেট। 

খদ্দেরটা এলো দুদিন পর। একটা সিগারেটের ব্র্যান্ড আছে কি না জিজ্ঞেস করে। তারপর চোখ নাচিয়ে বলে, বড়ো আছে?  এটাই কোড। তবু সাবধানে দামটা বলে। সনাতনদা বলেছে পুলিশের খোচড় থাকতে পারে। নিজের মোবাইলটা চোখের সামনে ধরে কিছু না বোঝার ভান করে বাঁ-হাত বাড়িয়ে দেয় শম্ভু। এ-লাইনে এটাই দস্তুর। বুকের ভেতর বিয়েতে ভাড়া করা ব্যান্ডপার্টির মতো ঝমাঝম বাজনা বাজাতে থাকে – বর এসেছে। একটা ওই ব্র্যান্ডের সাধারণ সিগারেটের দাম রেখে বাকি টাকাটা ফিরিয়ে দেয় শম্ভু। আর হাতেও ধরিয়ে দেয় একটা সত্যি নির্ভেজাল সিগারেট। 

ছেলেটা কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে বলে – ‘যা বাব্বা, সনাতনবাবু যে বলেছিল এখানেই পাওয়া যাবে?’

‘তুমি কোড ভুল বলেছো।’ কথাটা হাওয়ায় ঝুলিয়ে দেয় শম্ভু। 

‘সে কী কথা!’ আবার দুবার ছেলেটা কোড বলে। তারপর শম্ভুর সামনে থেকেই সনাতনকে ফোন লাগায়। শম্ভু জানতো এবার ওর ফোনে সনাতনদার ফোন আসবে।   

বেশ কিছুক্ষণ রিং হতে দিয়ে ফোনটা ধরে শম্ভু। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ‘মাকড়া’ বলে একটা চিৎকার আসতেই বুঝতে পারে ঠিক জায়গা থেকে ফোন এলো। তবু ভালো করে নামটা দেখে নেয়। আলগোছে ফিসফিস করে বলে, ‘অনেক টাকার ব্যাপার তো, তাই সবদিক বাজিয়ে নিচ্ছিলাম।’

আরো অনেক রকম চারপেয়ের বাচ্চা সম্বোধন করে সনাতনদা জানায় যে, এরপর থেকে মাকড়ামো করলে শম্ভুকে বাপের বিয়ের নেমন্তন্ন খাইয়ে দেবে। শম্ভুও বিগলিত হয়ে জানায় যে, ওর বাপের বিয়ে দেখার মোটে ইচ্ছে নেই। 

চার

নাটকটা হবে জানতো। সনাতনদার সাথে থানার দহরম-মহরম থাকবে না সে কখনো হয়? তথাগতদের খপ্পরে না পড়লেই হতো। লোভ, লোভ। নিজেকে ধিক্কার দেয় শম্ভু। ‘তোমার কাছে ওদের কুকর্মের রেকর্ডিং আছে। এমনকি সনাতনবাবুর কলটাও রেকর্ড করে নিয়েছো। তোমার থানায় যেতে ভয় কিসের?’ 

তবু শম্ভু দ্বিধা করছে দেখে তথাগত বলে, ‘তোমার ওই ফোনটার বদলে একদম ঝাঁ-চকচকে একটা স্মার্টফোন দেবো, এখন অফার চলছে।’  

ভেতরে লোভ ঝিলকিয়ে উঠেছিল। ফোনটায় খুব তাড়াতাড়ি চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছিল। রাজি হয়ে যায় শম্ভু। এফআইআরের চিঠিটা দেখে আইসি ওকে চেম্বারে ডেকে পাঠিয়েছিল। রিসিভ কপিটা ওর কাছ থেকে চেয়ে নেয়। প্রতিবাদ করতে পারেনি শম্ভু। এফআইআরের বয়ান তথাগতরা লিখে দিয়েছিল। 

‘ধুর, তোমার দ্বারা কিস্যু হবে না।’ তথাগত হতাশ হয়ে বলে ওঠে। ‘সমস্ত অস্ত্র তুমি ওদের হাতে তুলে দিলে?’ 

ভাগ্যিস ফোনে রেকর্ডিংয়ের কথা এফআইআরের বয়ানে ছিল না। তাহলে ওর ফোনটাসুদ্ধ থানায় চেয়ে নিতো। তথাগত আগে থেকে আন্দাজ করেছিল। তবু একটা দিক থেকে স্বস্তি, ওই গোলমেলে ব্যবসাটা আর করতে হবে না। সনাতনদাকে পুলিশ নিশ্চয়ই সাবধান করে দেবে। সোনামণিও দুপুরে কিছু বললো না দেখে বোঝা গেলো জলটা বেশিদূর গড়ায়নি। সবকিছু ঝামেলা ছাড়া মিটে গেলে বাঁচে শম্ভু। 

তথাগতকে দুপুরে সেই কথা বলায় সিনেমাস্টারের মতো চোখ নাচিয়ে বলেছে, ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায় দোস্ত।’ পিকচারের বাকি অংশটা ঘটলো রাতের দিকে। এক জিপ পুলিশ এসে দোকানটাকে একেবারে তছনছ করে দিলো। আমপানেতেও এতো ক্ষতি হয়নি।  শম্ভুকেও দোকানটার মতো তছনছ করার ইচ্ছেয় ছিলো ওরা। কিন্তু দু-চার ঘা পড়তেই এককোণে হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ে ও। তাও একটা নিরীহ দেখতে পুলিশ সুযোগ বুঝে একবার-দুবার লাঠির বাড়ি মেরে যাচ্ছিল। বেচারী বোধহয় হাত চালানোর এরকম সুযোগ পায় না। সেই লোকটাই শম্ভুর ঘাড় ধরে পুলিশের গাড়িতে তোলে।

 থানায় এসে দেখে সনাতন আর আইসি বসে আছে। আইসি উঠে এসে একটা লাথি মেরে অভ্যর্থনা জানায় শম্ভুকে। ‘শালা, শহরে বসে ড্রাগসের ব্যবসা করছিস? আবার অন্যের নামে নালিশও জানিয়ে যাচ্ছিস?’ এবার সনাতন এসে একটা চড় মারে। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ায় শম্ভু। ‘তোমারই তো ব্যবসা এটা সনাতনদা। তুমি যাতে মানুষের আর ক্ষতি করতে না পারো তাই আমি আজ সকালে থানায় জানিয়েছিলাম।’ 

সনাতনদা কড়া গলায় বলে, ‘তোর কাছে কোনো প্রমাণ আছে?’ 

‘আছে তো।’ বেশ জোর গলায় শম্ভু বলে। প্যান্টের পকেট থেকে সযত্নে ওর মোবাইলটা বার করে ও। ‘যেদিন সনাতনদা আমায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, সেদিনের থেকে সবকিছু ভিডিও রেকর্ডিং করে রেখেছি। এমনকি দোকানে খদ্দেরের সঙ্গে যখন কোডটা না বুঝতে পারার নাটক করছি তখন তুমি যে-ফোনটা করেছিলে, তারও কল রেকর্ডিং করে রেখেছি।’ 

এবার আইসি সাহেব সনাতনদাকে টেনে নিয়ে গিয়ে একটা চেয়ারে বসায়। শম্ভুর দিকে একটা মোড়া এগিয়ে দিয়ে বসতে বলে। শম্ভুর কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে রেকর্ডিংগুলো দেখতে থাকে। দেখা হয়ে গেলে ফোন থেকে সিমটা খুলে সনাতনবাবুর হাতে তুলে দেয় আইসি সাহেব। আর মোবাইল সেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে ভাঙতে থাকে। ‘ব্যস, আর তো কোনো প্রমাণ নেই।’ আইসি সাহেবের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সনাতন আরো একবার মারতে ওঠে শম্ভুকে। আইসি বলে ওঠে, ‘মাদক আইনে ফেলবো ব্যাটাকে।’ তারপর বেল বাজিয়ে কাউকে ডাকে। ‘প্রেস ডাকবো, পুরো মাদকসহ ব্যবসাদার গ্রেফতার। কালকেই ফ্রন্ট পেজে আমার ছবি।’ 

একটা হাবিলদার হাজির। ঠকঠক করে কাঁপছে। আইসি সাহেব বলে ওঠে, ‘উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্র আনুন।’ হাবিলদারটা তাও দাঁড়িয়ে ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কেঁপে যাচ্ছে। এবার পুরো পুলিশি মেজাজে টেবিলটা চাপড়ে ওঠে আইসি সাহেব। 

‘সাহেব থানার সামনে প্রচুর লোক। তারা সবাই হাতে মোবাইল ধরে আছে। এ-ঘরে যা ঘটছে সব ফেসবুক লাইভে দেখাচ্ছে।’ হাবিলদার বলে ওঠে। 

এবার শম্ভু জামার ইনার পকেট থেকে তথাগতর দেওয়া ফোনটা বার করে। ছেঁড়া জামার গর্ত দিয়ে মোবাইলের দামি লেন্স এতোক্ষণ সব দেখছিল। বাইরের পৃথিবীকেও দেখাচ্ছিল। শম্ভুকে অনেককিছু শিখিয়ে দিয়েছে তথাগত। উঁকি মেরে দেখে প্রায় হাজারখানেক ভিউয়ার দেখছে। একপাশে স্টুডিওয় তথাগত বসে আছে। দর্শকদের মাঝেমধ্যে পুরনো রেকর্ডিংগুলো দেখানোর কথা। সব ঠিকঠাক চলছে। থামসআপ দেখায় তথাগত। শম্ভুও উত্তর দেয়। 

শম্ভু আইসির চেম্বার থেকে বেরোনোর সময় কেউ বাধা দেয় না। বাইরে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে থানার সামনে জমা হওয়া মানুষগুলো চেঁচিয়ে ওকে অভিনন্দন জানায়। 

হঠাৎ সেই নিরীহ পুলিশটি এগিয়ে এসে ওর জামার ধুলো ঝেড়ে দেয়। তারপর একদম পুলিশি কায়দায় শম্ভুকে স্যালুট করে বসে।  জমা হওয়া ভিড়ের মধ্যে দেখে সোনামণিও হাজির। ওর দিকে তাকিয়ে খুশি খুশি মুখে হাত নাড়ছে। পাত্তা দেয় না শম্ভু। 

Leave a Reply