শহীদ কাদরী সময়স্রোতে ‘ঝকঝকে সদ্য, নতুন নৌকো’

লেখক:

বায়তুল্লাহ্ কাদেরী

বিশ শতকের  বাংলা  কবিতায় শহীদ কাদরীর (১৯৪২-২০১৬) অবস্থান কোথায়? দশকওয়ারি পুরনো বহুল তর্কসাপেক্ষ বিষয়টি মাথায় রেখে অথবা না রেখেই কীভাবে কাদরীকে চিহ্নায়িত করা যাবে? শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), আল মাহমুদের (১৯৩৬) সুহৃদ হিসেবে একই দশকের তকমায় ফেলে তাঁর কবিতা কি একই মেজাজে পড়া সম্ভবপর? নাকি রাহমান, মাহমুদের দশক পেরিয়ে প্রাগ্রসর দশকে গিয়েই শহীদ কাদরী বাংলা কবিতার নতুন সরণির সমত্ম? যদি দশকের ঘেরাটোপে এ-সময়ের কবিদের আগলাতেই হয়, তাহলে শহীদ কাদরী ষাটের দশকের কবিতার মেজাজ-নির্মাতা। কি নতুন আলোকপ্রক্ষেপে, কি আধুনিক শব্দরৌপ্যের ছটায়, জীবনাচরণের অননুকরণীয় বোহিমীয়পনায়, এমনকি নাগরিক নিরেট নিরসিত্মত্ব নৈর্ব্যক্তিক ‘আমি’র (এলিয়টীয় প্রম্নফ্রক নয়, নয় বিষ্ণু দে-র সুরেশ) নির্মাণে শহীদ কাদরী ষাটের কবিদের প্রথম পুরোহিত।

নগর কলকাতায় কৈশোর-অতিক্রামত্ম কবি বাংলাদেশে স্থানামত্মরিত হলেন নগরকে আরাধনা করেই। রুচি-নির্মাণে, সংবেদন ও মনোসন্নিবেশে শহীদ কাদরী আগাগোড়া শহুরে। ‘বহিরঙ্গে নাগরিক অমত্মরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক’ এ-কবির হওয়ার সাধ্য নেই। অথবা পুরনো ঢাকার আসত্মাবলের বেতো ঘোড়াটির ঝিমুনির মধ্যে কাদরীর নগরকে চেনা যাবে না। যে-ঢাকা চলিস্নশ-পঞ্চাশ কিংবা ষাটে কসমোপলিটান দূরের কথা, গাঁয়ের গেঁয়োমি পর্যমত্ম ছাড়তে পারেনি, কাদরীর কবিতায় সেই ঢাকাও নেই; কিন্তু আছে আজকের ঢাকার ক্ষয়, অবসাদ, একাকিত্ব আর বোহিমীয়পনা। আছে বৃষ্টির জলে ধুয়ে-যাওয়া কাল, স্মৃতি এবং জীবনের উৎসারণ! বোদলেয়ার তাঁকে নিয়ে গেছেন ডাকিনির কাছে, ময়লা সৌরভের রুগ্ণ সৌন্দর্যের কাছে ‘আলোকিত গণিকারা’ বাংলাদেশের কবিতায় আলো ছড়ালো অন্যরকমভাবে। কবিতার বাঁক-বিন্যাসে, শব্দ, উপমা-চিত্রকল্প নির্মাণে হীরক-দ্যুতিতুল্য নিরাবেগ সংযম কবিকে চিনিয়ে দিলো বাংলা কাব্যের নগরসাধক রূপে। অতএব, শহীদ কাদরীর এই নগরমনস্কতা বরং একটি সুদীর্ঘকালের গড়ে-ওঠা সমৃদ্ধ কসমোপলিটানের উত্তুঙ্গ উৎকর্ষ এবং তা-সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার অনিবার্য পরিণতিতেই একমাত্র সম্ভবপর। কাদরীর কবিতার নাগরিকতার সঙ্গে বরং শিল্প-বিপস্নবোত্তর লন্ডন-প্যারিস নগরীর জীবনচিত্রের সাযুজ্য বেশি। আসলে আধুনিক কবিতার নগর-প্রতিবেশ আক্ষরিক অর্থে বিশ শতকীয় কবিদের হাতেই চিত্রিত হতে থাকে। তার আগে অবশ্য বোদলেয়ার ফরাসি কবিতায় নগরজীবনের যন্ত্রণাময় আত্মনিমজ্জনকে ভাষারূপ প্রদান করেন। মূলত নাগরিক কবিতার সূচিমুখ তৈরি হয় বোদলেয়ারের হাতেই। বোদলেয়ারের নগর এক নারকীয় উলস্নাস, ডাকিনি, আর প্রেতিনির উন্মুক্ত ঊরুর শব্দে রাত্রিময়, নপুংসক আত্মায় বেশ্যালয়ে পাপমোচনে প্রশস্ত রাত্রিযাপন। এলিয়ট নগরকে এঁকেছেন ঊষর, ক্লেদবৈকল্যময়, যুদ্ধোত্তর মানুষের পঙ্গুত্বে প্রায় ক্লীব এবং সৃষ্টিসম্ভাবনাহীনতায়। দ্য ওয়েস্টল্যান্ডে তার পরিচয় আছে। এসব উত্তরাধিকার শহীদ কাদরী বহন করেছেন কাব্যমেজাজে। তাঁর নাগরিকতার মূলে আছে অধীতবিদ্যার আমত্মঃসৃজন প্রক্রিয়া, আরেকটু বিশেষভাবে বললে বলা যায় কিছুটা হলেও নাগরিক উৎকর্ষে উত্তীর্ণ কবির জন্মস্থান কলকাতা শহরের উত্তরাধিকারসূত্রে।

শহীদ কাদরীর কবিতায় আছে নেতিবাদী জীবন, বোহিমীয়ান ও নাগরিক ক্লেদ, গস্নানি-পঙ্কিলতা এবং আত্মবিধ্বংসী-প্রবণতা, যা ষাটের কবিদের প্রধান লক্ষণ। ‘We have no other alternative except self destruction’ –­ এ-প্রবণতাতেই এ-দশকের কবিকুল জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছেন, অবলীলায় পাপাসক্ত হয়ে বিষাদাত্মক আত্মস্বীকারোক্তিতে (আমেরিকান কবি রবার্ট লাওয়েল, অ্যান সেক্সটন, সিলভিয়া পস্নাথ কনফেশনাল পোয়েট্রির অগ্রগণ্য) নিমজ্জিত থেকেছেন। উত্তরাধিকারের প্রথম কবিতাতেই শহীদ কাদরী এক ভয়াল বৃষ্টির আগমন ঘোষণা করেন –

রাজত্ব শুধু আজ রাতে, রাজপথে-পথে

বাউন্ডুলে আর লক্ষ্মীছাড়াদের, উন্মূল, উদ্বাস্ত্ত

বালকের, আজীবন ভিক্ষুকের, চোর আর অর্ধ-উন্মাদের

বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ।

 

বোঝা যায়, এ-বৃষ্টি সংবেদনা নিয়ে উপস্থিত হয়। নিয়ে আসে নতুন শিহরণ ও কাঁপন। প্রাত্যহিকতার চলমানতায় এ যেন করুণ আঘাত। বৃষ্টির তেড়ে আসা জলে যা কিছু অপস্রিয়মাণ তার ফর্দও যেনবা কবির চেতনায় করুণ এবং তা রোমান্টিকতার অবসানই যেনবা – ‘ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো, বেজে সিগারেট-টিন/ ভাঙা কাঁচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন/ মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি/ লন্ড্রির হলুদ বিল, প্রেসক্রিপশন, শাদা বাক্স ওষুদের/ সৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার/ ভবিতব্যহীন নানা স্মৃতি আর রঙবেরঙের দিনগুলি।’

কিন্তু এ-বৃষ্টি কবির বর্ণনায় আরেকটু অর্থবহ ও গাঢ় সংকেতবাহী। কবির নগরজীবনের সূচনাও যেন এ-বৃষ্টির মধ্যে দৃষ্টিগ্রাহ্য। সমস্ত ভাসানের গল্পে এক নিঃসঙ্গ অসিত্মত্বের প্রবল উপস্থিতিও টের পাওয়া যায় –

শহরে প্রভু, বর্ষায়, বিদ্যুতে

নগ্নপায়ে ছেঁড়া পাৎলুনে একাকী।

হাওয়ায় পালের মতো শার্টের ভেতরে

ঝকঝকে, সদ্য, নতুন নৌকোর মতো একমাত্র আমি।

(‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’, উত্তরাধিকার)

 

‘হাওয়ায় পালের মতো, ঝকঝকে নতুন নৌকোর মতো’ এ-আগমন, বাংলা কবিতার ‘সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে’ ‘বিদ্যুতের উড়মত্ম বলস্নম হয়ে’ একজন নতুন পাপাচারী সমেত্মর আগমন। এমন কবিতা, এমন নগর-উৎসারিত বোধ আসলেই ‘উত্তরাধিকার’বিহীন। তিরিশি কবিতার ক্ষয়িষ্ণুতার আড়ালের রোমান্টিকতা এখানে কোথায়? যেটি শামসুর রাহমানের মাহুতটুলির আসত্মাবলের সোঁদা ও খড়ের গম্বুজের আসত্মাবলে বলয়িত? যেখানে রাহমান অতি-বর্ণনময়, কখনো-কখনো স্মৃতিময়তায় ভোরের শয্যায় নিরিবিলি চুলে আঙুলের বিলি এঁকে রোমন্থনপ্রিয়? আল মাহমুদ কৌমসমাজের নিরাভরণ প্রতিনিধি হয়ে ‘উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত’ করতে ক্ষেতের আড়ালে কর্দমে শরীরী-আহবানে লোকজ ও গ্রামীণ?

 

বলতে চাইছি, আগাগোড়া প্রস্ত্ততি নিয়েই শহীদ কাদরী কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। শহীদ কাদরীর কবিতায় বৃক্ষ কই? ছায়াসুশোভিত, অন্ধকার, বায়ুতাড়িত বৃক্ষরাজি? বাংলাদেশের যত্রতত্র গাছ, আকাশ, নীলিমা আর শস্যময়তার কথা বাংলা কবিতায় সুপ্রচুর। গ্রাম থেকে আসা শহুরে পত্তন-গাড়া মানুষ সুযোগ পেলেই তাই গ্রামে, শহরতলিতে, গাছ ও নিসর্গে হৃদয় মেলে দেয়। শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে মুহূর্তেই নস্টালজিক হয়ে ওঠে আজো। কিন্তু শহীদ কাদরী নগরেরই বাউল, বাউন্ডুলে, হতচ্ছাড়া এক। বৃক্ষহীন, ছায়াহীন, শস্যহীন এক শব্দমিছিলে যদিও ‘গাছ’ শব্দটি কখনো-সখনো আসে, সঙ্গে থাকে গুল্ম, থাকে বাগানের কাঁটাযুক্ত গোলাপ, নিরাবেগ শহুরে গদ্যভঙ্গির বর্ণনায়। তাঁর শব্দ ও পরিপ্রেক্ষে নির্বাচন, বর্ণন-কৌশল আচমকা, অভিঘাতপূর্ণ, পাঠকের প্রথানুগ আবেগের বিপ্রতীপ। ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’ কবিতাটির মধ্যেই যেন সমস্ত শহীদ কাদরী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। কবিতাটিতে তিনি জড়ো করেছেন যাবতীয় ফর্দ, যেগুলো অতিবৃষ্টিময়তায় অলিগলি, খুপরি ও অলক্ষ থেকে বৃষ্টির ভাসানে অতিদৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। ‘গগনে গরজে মেঘ’ কিংবা ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’ কিংবা ‘রিমঝিম রিমিঝিম’ শব্দমুখর রোমান্টিকতার বদলে এক আচমকা অবশ্যম্ভাবী আপৎকালীন বৃষ্টি এসে সচকিত করে দেয়। কবি যে-সকল উপাদান বৃষ্টির আবহ-নির্মাণে ব্যবহার করলেন সেটি শহুরে বৃষ্টির অতিপ্রাত্যহিক অনুষঙ্গ। আমরা এ বিপ্রতীপ বৃষ্টি আর দেখিনি কবিতায়, কিন্তু অবলীলায় দেখে চলেছি প্রাত্যহিকতায়। সেটিই কাদরী দেখালেন। কারণ এ-কবি মাঠের কৃষকের বাদলা-দিন, গেঁয়োপথের বৃষ্টিধারার জন্য কলম ধরেননি। অকস্মাৎ এ-বৃষ্টিতোড় মানুষকে সন্ত্রস্ত করে তোলে, দিগ্বিদিক ছুটোছুটিতে আর অজানা আশঙ্কায়। শহুরে ‘লাল আরশোলা মড়কে ভেসে ওঠে’ দেখায় শহুরে জীবনের ভাসমানতাকেই। এটিই যেন আরাধ্য বাস্তবতা ‘ঝাঁকে-ঝাঁকে লাল আর্শোলার মত যেন বা মড়কে/ শহর উজাড় হবে,’ কিংবা ‘বজ্র-শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি : শ্রম্নতিকে বধির করে/ গর্জে ওঠে যেন অবিরল করাত-কলের চাকা/ লক্ষ লক্ষ লেদ-মেশিনের আর্ত অফুরমত্ম আবর্তন। আর এই বৃষ্টিবিভীষিকায় মানুষ –

 

বৃষ্টি পড়ে মোটরের বানটে, টেরচা,

ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নীচু

 

অতএব শহীদ কাদরী অন্যরকমভাবে কবিতার ধারাভাষ্য তৈরি করলেন। তাঁর শহরে হয়তো বোদলেয়ার আছে, কিন্তু সেটি শহীদ কাদরীয় বঙ্গমাতার আঁচল ধরেই। শহীদ কাদরীর কবিতায় বৃষ্টি ইমেজ এরকমই অভিনতুন, আরেকটি কবিতায় বৃষ্টি কেমন দৃশ্যময় – ‘লম্বা লম্বা সরু বৃষ্টির আঙুল লোকটাকে হাতড়ে দেখেছে/ তার জ্বলজ্বলে জামা শপশপে ভেজা’

(‘ভরা বর্ষায়’ : একজন লোক)

 

একজন নাগরিক মানুষের অনিবার্য নিয়তি কীরকম? তার মন ও মনন, ব্যক্তিকতা এবং কৃত্রিম নিরাবেগ, যাপিত মুখোশ কীরকম সুচারু শৌখিন ও নিয়ন্ত্রিত সেটি ধরা পড়েছে কাদরীর কবিতায়। এ-বর্ণনায় খেদোক্তি নেই কিংবা এ থেকে মুক্তির উদগ্র বাসনাও নেই কবির; বরং এক প্রাত্যহিক কদাকার সৌন্দর্যই যেন প্রকাশিত হয়ে পড়ে। আর সেগুলোর দীক্ষা যদিও কবি বোদলেয়ার থেকেই নিয়েছেন তবু সেগুলো আমাদের কাব্যাভ্যাসে অভিঘাত আনে –

 

জ্যোৎসণায় বিব্রত বাগানের ফুলগুলি, অফুরমত্ম

হাওয়ার আশ্চর্য আবিষ্কার করে নিয়ে

চোখের বিষাদ আমি বদলে নি’ আর হতাশারে

নিঃশব্দে বিছিয়ে রাখি বকুলতলায়

(‘নশ্বর জ্যোৎস্নায়’)

 

সুন্দর সূর্যাস্ত থেকে ভোরবেলাকার সূর্যোদয়

পর্যমত্ম হেঁটেছি। আর অসীম অধৈর্যভরে ঘেঁটে,

সেই চঞ্চল, পিচ্ছিল জরায়নে সভয়ে দেখেছি

শয়তানের ধবল মুখ

(‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’)

রাত্রে চাঁদ এলে

লোকগুলো বদলে যায়

দেয়ালে অদ্ভুত আকৃতির ছায়া পড়ে

যেন সারি সারি মুখোশ দুলছে কোন

অদৃশ্য সুতো থেকে

আর হাওয়া ওঠে

ধাতুময় শহরের কোন্ সংগোপন ফাটল

কিংবা হা-খোলা তামাটে মুখ থেকে

হাওয়া ওঠে, হাওয়া ওঠে

(‘ইন্দ্রজাল’)

এই নাগরিক নিঃসঙ্গতা, নাসিত্ম ও মনোবিকলন একপর্যায়ে দুঃখবোধকে

উদ্বুদ্ধ করতে বাধ্য। সেইসঙ্গে আনে অপরাধবোধ। স্বীকারোক্তিমূলক মানসিকতাও এর সঙ্গে যুক্ত। ষাটের কবিতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য – এই স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার প্রথম সচেতন প্রয়াস এ-দশকের কবিদের মধ্যেই লক্ষ করা যায়। যদিও বিশ্ব কবিতায় আমেরিকান কবি রবার্ট লাওয়েল, অ্যান সেক্সটন, সিলভিয়া পস্নাথ প্রমুখের কবিতায় এর প্রবণতার উত্তুঙ্গ শিল্পসিদ্ধি ঘটেছে। শহীদ কাদরীর কবিতার আতীব্র নাগরিকতায়, বৈপরীত্যে ও পাপবোধে এ-অপরাধবোধের স্বীকরণ ঘটেছে। তাঁর কবিতায় স্বকাল, সমাজ ও অনিবার্য পরিণতি, ব্যক্তি-অসিত্মত্বের বিপন্নতা এবং অভিযোজনগত সমস্যা থেকে সৃষ্ট অমত্মর্দহন থেকেই স্বীকারোক্তিপ্রবণতা কাজ করেছে –

 

সৎসঙ্গ লাগে নি ভালো? সজ্জনের কথা?

কৃমিও যায় না সেই দুর্গন্ধের নর্দমায়, পাকে

সেখানে ভাসালি বুক?

(‘বিপরীত বিহার’)

 

শহীদ কাদরীর কবিতায় রৌদ্রকরোজ্জবল ঝকমকে দিবারম্ভ নেই। বরং সেখানে বিবর্ণ, ধূসর রহস্যময় চন্দ্রালোকিত রাত দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। কারণ ‘জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে/ সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিল যেন/ দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে’ এমন বোধের বিপ্রতীপ, শত্রম্নভাবাপন্ন প্রকৃতির সৌন্দর্য-তিরোহিত এক অভিশপ্ত নগরীতে কবির জন্ম। এ-নগরে রাত নামে অবলীলায়, সেই রাত আবার গভীর তিমিরাচ্ছন্ন নয়। অস্ফুট জ্যোৎসণা, কখনো কখনো জ্যোৎসণার তীব্র আলোক বিচ্ছুরণে কদর্য রাত্রির উদ্ভটতাকে প্রকাশ করে –

১.   প্যাঁচার তীব্র চিৎকার

যেন সেই রাত্রির শরীরের ওপর,

নিরমত্মর আঁচড় রেখে যাচ্ছে।

(‘পরস্পরের দিকে’)

২.   কেক্-পোস্ট্রির মতোন সাজানো থরে থরে নয়নাভিরাম

পুষ্পগুচ্ছের কাছেও গিয়েছি ত’, মস্নান রেসেত্মারাঁর

বিবর্ণ কেবিনে আশ্রয়ের যে আশ^াস এখনও

টেবিল ও চেয়ারের হিম-শূন্যতায় লেখা আছে

(‘নিসর্গের নুন’)

উত্তরাধিকারেই শহীদ কাদরীর নাগরিকবোধ এবং নগরযন্ত্রণা সর্বাধিক প্রতিফলিত হয়েছে। ভাষা-নির্মাণে, শব্দ ব্যবহারে, নাগরিক কঠিন, নিরেট বস্ত্তবর্ণনায় শহীদ কাদরী এ-কাব্যে এক ব্যতিক্রমী ইশতেহারপ্রণেতা। শহীদ কাদরী সময়কে দেখেছেন ডালির বিগলিত সময়যন্ত্রের ক্রমভঙ্গুরতায়, সমাজকে দেখেছেন কসমোপলিটান লন্ডন-প্যারিসের উজ্জ্বল বর্ণবিভায়, শাহরিক জীবনের ছন্দকে আবিষ্কার করেছেন বোদলেয়ারীয় ‘ক্লেদজকুসুম’ ও অবক্ষয়িত অন্ধকারে। কবির নগরকে গ্রাস করেছে বোদলেয়ারের কামমত্ত ডাকিনিরা; নষ্ট নপুংসক বীর্য-গন্ধময় কামুকের উলস্নাস তাঁর কবিতার ভাষাকে করেছে নির্মেদ। আলোকিত গণিকাবৃন্দকে কবি লক্ষ করেন বোদলেয়ারের মতনই আত্মশুদ্ধির উপায় হিসেবে। ‘সে রাতে ছিলাম কদাকার ইহুদিনীর পাশে/ পাশাপাশি দুটো মৃতদেহ যেন এ ওকে টানে’ (শার্ল বোদলেয়ার, সে-রাতে ছিলাম, বুদ্ধদেব বসু-অনূদিত)। শহীদ কাদরীও নগরের অন্ধকারে প্রদীপ্ত নক্ষত্রের আলোর মতো আবিষ্কার করেন আলোকিত গণিকাবৃন্দকে, ‘শহরের ভেতরে কোথাও হে রুগ্ণ গোলাপদল/ শীতল কালো, ময়লা সৌরভের প্রিয়তমা’ এ গণিকাবৃন্দ কবিকে অলৌকিক আহবানে ডেকে নিয়ে যায়। আর কবিরও বোধোদয় ঘটে –

বিকলাঙ্গ, পঙ্গু যারা, নষ্টভাগ্য পিতৃমাতৃহীন, –

কাদায়, জলে, ঝড়ে নড়ে কেবল একসার অসুস্থ স্পন্দন

তাদের শুশ্রূষা তোমরা, তোমাদের মুমূর্ষু স্তন!

(‘আলোকিত গণিকাবৃন্দ’)

সুতরাং নগরের এ-বিপ্রতীপতা যে প্রেমবোধের সৃষ্টি করে তাও রিরংসাময়, শরীরী উত্তাপের টানে প্রেম ভোগেরই নামামত্মর। উত্তাপহীন, অসুস্থ, নষ্ট ও অভিশপ্ত নগরে নারী যেন প্রেমহীন নিরাবেগ এক শরীরী বাসনার মধ্যে চিত্রিত। –

 

রাত্রে তোমাকে স্বপ্নেও দেখি

গণিকালয়ের সারিতে একা

আমারি মুখের মতন হাজার

মুখের মিছিল

তোমার জন্য প্রতীক্ষায়।

(‘প্রিয়তমাসু’)

ফলপ্রসূ এ-কবির কলম। তবু প্রশ্ন, শহীদ কাদরী কি আরো বেশি লিখতে পারতেন? কেনই বা লেখেননি? কবির কি প্রতিভাগত উনতা ছিল? নাকি কোনো সীমাবদ্ধতা? জবাবটি হতে পারে – না, আর খুব বেশিকিছু দেওয়ার ছিল না এ-কবির। অহেতুক চর্বিতচর্বণে এ-ব্যতিক্রমী কবিপ্রতিভার লিপ্ত হওয়া, এটি অসম্ভব। প্রথম প্রকাশেই যিনি অন্যরকম, যিনি পৃথক স্বরায়নে আত্মস্বয়ম্ভু তিনি কেন লিখলেন না? আসলে সেটি ছিল তাঁর জীবনদর্শনগত সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্ব। ‘আমি অনেকদিন পর একজন হা-ঘরে/ উদ্বাস্ত্ত হয়ে চরকির মতো গোটা শহর ঘুরে বেড়ালাম।’ (আজ সারাদিন, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই) – এই দিকচিহ্নহীন, উন্মূল ভ্রামণিকতা কবির জগৎকে বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলেছিল। আত্ম-অতিক্রমী বাঁক-বদলের স্পৃহা ও সুযোগ এ অকালপক্ব কবির ধাতে ছিল না। তাঁর মনোজগৎ ক্লামত্ম; একই দৃশ্য, একই নরকসদৃশ নিয়তি কবির নগরযন্ত্রণাকে তীব্র করে তোলে। আশৈশব নাগরিক কবির অভিজ্ঞতা কবিকে দিয়েছে প্রবল নাসিত্মচেতনা। এক উন্মূলচারী মানুষ হিসেবে নগর তাঁকে কোথাও আত্মসমর্পণের বিশ^াসে স্থিত হতে দেয়নি। মূল্যবোধ, প্রেম, ধর্ম ও সামাজিক লোকাচার কবির শহুরে জীবনে তিরোহিত। একজন আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে তাঁর প্রেমবোধে যুক্ত হয়েছে মৌহূর্তিক চেতনা ও রিরংসাবোধ। ফলত তাঁর প্রেমবোধও খণ্ডিত। কবির উচ্চারণে তার অসহায় স্বীকরণ আছে –

 

যারা গাঁও-গেরামের মানুষ,

তাদের গ্রাম আছে মসজিদ আছে

সেলাম-প্রণাম আছে।

আমার সেলামগুলো চুরি ক’রে নিয়ে গেছে একজন সমরবিদ,

আমার প্রেমের মূল্য ধ’রে টান মারছে অমত্মরঙ্গ বিজ্ঞানী

(‘এবার আমি’)

 

বাস্তবিক, শহীদ কাদরী আগাগোড়াই এক নাগরিক কবি। তাঁর এই নগরচেতনার সঙ্গে জীবনচেতনার এক সুগভীর সামঞ্জস্য বিদ্যমান। সমাজে ক্রমবর্ধিষ্ণু নগরায়নই নয়, বরং তাঁর কবিতা একটি সুদীর্ঘকালীন নগরজীবনের উত্তুঙ্গ অবস্থার পরিণাম ও আবেগ-অনুভূতির ভেঙেপড়া, বিচূর্ণিত সত্তার আকুতিই উপজীব্য হয়ে উঠেছে। আর অধীতবিদ্যায় পৃথিবীর তাবৎ নাগরিক বিভীষিকাকে আতমস্থ করা কবির পঠন-বৃদ্ধ মনন নগরীর সিংহ-ফটকে কেবলি পায়চারি করেছে চরম বাউন্ডুলেপনায় –

না, না, তার কথা আর নয়, সেই

বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো – শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।’

(‘অগ্রজের উত্তর’)

হ্যাঁ, অগ্রজ শহীদ কাদরী, উত্তরটি পেয়েছি; কবি, আপনি পাঠককে প্রতারণা করেননি কখনো।