শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম

লেখক:

ফারহানা শারমিন ইমু

‘বড় হয়ে পৃথিবীর প্রেসিডেন্ট হবো’ – এমনটা ভাবতাম একেবারে ছোটবেলায়। আরেকটু যখন বড় হলাম – বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হবার স্বপ্ন দেখতাম। মানুষ যত বড় হয়, বোধকরি স্বপ্নগুলো বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ততই ছোট হতে থাকে – বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার সীমাবদ্ধতা, ক্ষমতা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে শেখে।

আমি তখনো আমার সীমাবদ্ধতা, অবস্থান বুঝতে শুরু করিনি – বুয়েট স্থাপত্য বিভাগে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আমি। এমনই এক সময়ে (১৯৯৬ সালে) ‘স্যার’কে পেয়েছিলাম খুব কাকতালীয়ভাবেই বলতে হবে।

ফটোগ্রাফি ক্লাসের assignment ছিল – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ভবনের slide তুলতে হবে। সহপাঠী মুনের সঙ্গে আমার group। Digital Camera না – তখনো S.L.R. Camera-য় film ভরে shutter speed, aparture শেখানো হয়। slide photography-র জন্য অপেক্ষাকৃত দামি slide film বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। assignment ছিল – প্রতিটি group-কে নির্ধারিত স্থাপনার ছবি তুলে একটা করে film (৩৬টি slide) জমা দিতে হবে। বন্ধুকে বললাম, ‘একটা building-এর ছবি তো বিভিন্ন angle থেকে তোলাই যায় – চলো, architect-এর কাছ থেকে Concept জেনে নিয়ে তারপর ছবি তুলি।’

বন্ধু গররাজি – ‘জানো, কত বড় architect, আর কত রাগী?’

‘হলো-ই বা। আমাকে তো Concept জানতে হবে।’

স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত ‘Concept’ শব্দটার অর্থ তখন মাত্র বুঝতে শুরু করেছি। যে চিন্তা, ধারণা, বাস্তবতা কিংবা দর্শনকে সামনে রেখে স্থপতি স্থাপত্য রচনা শুরু করেন Concept হলো খুব সাদামাটাভাবে বলতে গেলে তা-ই।

অনেক অনেক পরে উপলব্ধি করেছি – কী ‘বিশাল পাহাড়ে’র কাছে ‘কত ক্ষুদ্র আমি’ ‘কত তুচ্ছ প্রয়োজন’ নিয়ে গিয়েছিলাম; আর কত অকৃত্রিম স্নেহে অবলীলায় ‘সেই পাহাড়’ আমাকে সেদিন প্রশ্রয় দিয়েছিলেন – একটির জায়গায় ছয়টি slide film কিনে দিয়ে বলেছিলেন – ‘slideগুলো আমাকে দেখাবেন’ –

Slide দেখে বলেছিলেন – ‘কিছু হয়নি’!

চারুকলার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত ছাড়াও ছয়টি film কিনে দেওয়ার মতো উদারতা মানুষটার মধ্যে ছিল; একই সঙ্গে অকপটে আমাদের অপারগতা জানিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী অথচ সংক্ষিপ্ত ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা স্যারের ছিল।

পরবর্তীকালে স্যার শিখিয়েছিলেন – একটি স্থাপনার ছবি তোলা মানে বিভিন্ন দিকে দাঁড়িয়ে Camera-র shutter-এ চাপ দেওয়া নয়।

দিনের বিভিন্ন সময়ে, বছরের বিভিন্ন ঋতুতে, সূর্যের বিভিন্ন অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি স্থাপনা তার চারপাশের মানুষ, চারপাশের গাছপালা, পরিবেশ – সবকিছুসহ বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তিত হয় এবং এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোকে ফ্রেমে ধরে রাখা স্থাপত্য ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে একজন ফটোগ্রাফারের অন্যতম দায়িত্ব।

আরেকদিনের ঘটনা – সম্ভবত ১৯৯৭ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের সকাল। রমনার বটমূল থেকে ছোট বোনসহ হাঁটতে হাঁটতে স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য স্যার এবং খালার সঙ্গে বারান্দায় বসে চা খাব। স্যারকে প্রথম শিশুতোষ খুশি হতে দেখলাম। বললেন – ‘আপনারা এসেছেন? এখন তো কেউ আমার কাছে আসে না।’

বললেন – ‘বাঙালি মেয়েরা বটমূলে গান গাইবে না তো  কে গাইবে?’

একজন অত্যন্ত ‘স্নেহশীল’ পিতাকে পেয়েছিলাম – উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেছিলেন – ‘আমার মেয়েকে চেনেন? ডালিয়া নওশীন – খুব ভালো সংগীতশিল্পী। তিনিও বটমূলে গিয়েছেন – এখনই আসবেন – পরিচয় করিয়ে দেব।’

গল্প হয়েছিল অনেকক্ষণ – দেশের গল্প, স্যার এবং খালার জীবনের অসংখ্য পহেলা বৈশাখের গল্প। যখন উঠলাম – স্যার সুন্দর করে বললেন – ‘বাঙালি মেয়েরা কেন যে বোঝেন না – শাড়িতেই তাদের সবচাইতে ভালো মানায়।’ বেশ টেনে বলেছিলাম – ‘Th-a-n-k, you sir’ -। স্যারের সঙ্গে এ সমস্ত আহ্লাদ করার স্পর্ধা কোনো এক অসীম ক্ষমতায় আমি অর্জন করেছিলাম।

এবার একটু ‘অভিনেতা মাজহারুল ইসলামে’র গল্প বলি। স্যারকে নিয়ে স্থাপত্য জগতে যে সামান্য সংখ্যক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে – তিনি নামক প্রামাণ্যচিত্রটি তার মধ্যে একটি। তিনির শুটিং চলছে – ক্যামেরার সামনে স্যার খালাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর পরীবাগের বাসার সামনের বাগানের সবুজ ঘাসে হাঁটছেন। ক্যামেরার অপরপ্রান্তে নির্ঝর ভাইয়ের সঙ্গে আমরা ক’জন। অনেকক্ষণ ধরে শট নেওয়া হচ্ছে – ‘shot okay’ হচ্ছে না। আমি বললাম – ‘দাদু (তখন মাঝে মধ্যে স্যারকে ‘দাদু’ বলে ডাকতাম) – খালার হাতটা একটু ধরেন না -’। সলজ্জ হাসি মুখে ধরে রেখে স্যার সেদিন খালার হাত ধরেই বেশ কিছুক্ষণ বাগানে হাঁটলেন।

মাজহারুল ইসলাম স্যারের তিনটি আদেশ অমান্য করেছি আমি। – স্যার আমাকে সময় নষ্ট না করে architecture ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করতে বলেছিলেন। আমি architecture পড়েছি। – স্যার বলেছিলেন – ‘যদি architect হতেই হয়, বিয়ে করবেন না। ভাস্কর নভেরার মতো হতে হবে – সমাজ সংসারকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে হবে।’ বলা বাহুল্য, আমি বিয়ে করেছি। যতটুকু বুঝেছিলাম – স্যার বিশ্বাস করতেন – নানাবিধ সামাজিক বন্ধন, মাতৃত্বের প্রতিবন্ধকতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ফলে স্থাপত্যচর্চায় যে ‘একাগ্রতা’র প্রয়োজন তা মেয়েদের পক্ষে লালন এবং পালন করা সম্ভব নয়। ডালিয়া আপার মুখে বহুবার শুনেছি, নিজের মেয়েকেও স্যার স্থাপত্য জগতে আসতে নিষেধ করেছিলেন।

তিনির প্রয়োজনে প্রায় প্রতিদিন বুয়েটের ক্লাস শেষ করে বাস্ত্তকলাবিদে (স্যারের অফিস) চলে যেতাম। আমার কাজ ছিল স্যারের অফিসের ভেতরে যে কাঠের মেসোনাইন ফ্লোর ছিল, কাঠের মই বেয়ে সেই ফ্লোরে উঠে ধুলার ভেতর থেকে ড্রইং বের করে ঝেড়েমুছে প্রকল্প হিসেবে আলাদা করা। একেক দিন একেকটি প্রকল্প গোছাতাম কিংবা গোছানোর চেষ্টা করতাম – স্যারের মুখ থেকে সেই প্রকল্পের গল্প শোনার লোভে।

এমনি একদিন অফিসের দরজার সামনে স্যার এগিয়ে এসেছেন আমাকে বিদায় দিতে। হঠাৎ লোডশেডিং এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সশব্দে চালু হলো দেয়াল-পার্শ্ববর্তী প্রিয়প্রাঙ্গণ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বিশাল জেনারেটর। স্যার অত্যন্ত রেগে গেলেন। প্রশ্ন করলেন – ‘বলুন, গত তিন মাসে উত্তরবঙ্গে কটি deep tubewell বসানো হয়েছে?’ সংগত কারণেই আমি নিরুত্তর। সদা স্পষ্টবাদী মানুষটা চিৎকার করে বলেছিলেন – ‘আমাদের মতো এত সুন্দর দেশে, নদীর দেশে deep tubewell-এর কোনোই প্রয়োজন থাকতে পারে না। আমি অনুরোধ করছি – আপনারা এই প্রজন্ম খানিকটা বোঝার চেষ্টা করুন – একটু সচেতন নাগরিক হয়ে উঠুন। বাংলাদেশে সব আছে – এখানে বিদ্যুৎ ঘাটতি, লোডশেডিং হতে পারে না। কোনো একজন মন্ত্রীর ছেলে deep tubewell কিংবা আরেকজনের ছেলে বিদেশ থেকে generator আমদানি করার ব্যবসা পেয়েছেন। আপনারা একটু চোখ খুলে তাকান – please একটু সচেতন হোন।’