জাহিদ মুস্তাফা

বাংলাদেশের সমকালীন শীর্ষ চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর (১৯৩২-২০২০) প্রয়াত হয়েছেন গত ১৫ আগস্ট। তাঁর প্রায় সত্তর বছরের শিল্পসাধনা নিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বিশেষ একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। ‘মুর্তজা বশীরের সৃষ্টি ও প্রসারিত মন’ শীর্ষক তিন মাসব্যাপী এ-প্রদর্শনীটি ঢাকার ধানমণ্ডিতে বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে গত ১২ অক্টোবর।

বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও মরগুবা খাতুনের কনিষ্ঠ সন্তান মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রমনা এলাকায়। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনে, পরে ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত বগুড়ার করোনেশন ইনস্টিটিউশনে শিক্ষাগ্রহণ করে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকার গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটে শিল্পপাঠ নিয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক করে কলকাতা আশুতোষ মিউজিয়াম থেকে শিল্পসমালোচনায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ সনদ লাভ করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি ইতালির ফ্লোরেন্সে অ্যাকাদেমিয়া দ্য বেল্লে আর্তিতে চিত্রকলা ও ফ্রেস্কো বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ এবং ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত প্যারিসের ইকোল ন্যাসিওনাল সুপিরিয়র দ্য বোজ আর্তেতে অধ্যয়ন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। 

মুর্তজা বশীর বহু মাধ্যমে কাজ করে নিজের সৃজনকে বৈচিত্র্যময়তায় মেলে ধরেছেন। তিনি রেখাচিত্র, ছাপচিত্র, জলরং, তেলরং, মিশ্রমাধ্যম, ম্যুরাল করেছেন। তেলরঙে তাঁর সমধিক সিদ্ধি। বেশ কয়েকটি চিত্রমালা করেছেন তিনি। এগুলো হচ্ছে – ‘দেয়াল’, ‘শহীদ-শিরোনাম’, ‘পাখা’, ‘রমণী’, ‘কলেমা তৈয়বা’ প্রভৃতি। শক্তিশালী অংকন, রঙের সুমিত প্রয়োগ এবং সমাজচৈতন্যে শিল্পীর সংগ্রামী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সমসাময়িক শিল্পীদের থেকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। আরেকটি অনন্যগুণ শিল্পঅভিযাত্রায় তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছে, সেটি হলো – সাহিত্যসাধনা  ও ইতিহাস নিয়ে তাঁর নিরলস গবেষণা। চলমান প্রদর্শনীতে সংকলিত চিঠিপত্র, স্কেচ, আলোকচিত্র, পোস্টার ও পেপার-কাটিংয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর গভীর শিল্প-জিজ্ঞাসা, ইতিহাস-সচেতনতা ও সমাজচিন্তার রূপরেখা দর্শক-শিল্পবোদ্ধাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও এ-প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত কিছু বিরল চিত্রকর্ম, ক্যাটালগ ও আলোকচিত্র। সব নিয়ে ব্যতিক্রমী এই শিল্পীর সমগ্র শিল্পীসত্তার মোটাদাগের একটা পরিচয় এ-প্রদর্শনী থেকে পাওয়া সম্ভব।

পাশ্চাত্যশিল্পে শিক্ষা নেওয়ার পর প্রথম জীবনে শিল্পী মুর্তজা বশীরের চিত্রকর্মে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। নির্বস্তুক বিষয় নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চিত্রপটে পরিবর্তন আসে। তাঁর কয়েকটি চিত্রমালা বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করেছে। দেয়াল, এপিটাফ চিত্রমালার চিত্রকর্মগুলো মূলত নির্বস্তুক ও বাঙালির গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে আঁকা। প্রজাপতির ডানার নানা আকার-প্রকার ও সৌন্দর্যকে বিশ্লেষণ করে তিনি বস্তুনিষ্ঠ ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করেন। পরে ‘পাখা হাতে রমণী’র চিত্রমালার মাধ্যমে বাস্তবানুগ চিত্রচর্চায় ফিরে আসেন তিনি – লোকচিত্রের উপাদান প্রয়োগের ঐতিহ্যপ্রীতিকে সঙ্গী করে।

গত সাত দশকে দেশে-বিদেশে শিল্পী মুর্তজা বশীরের অনেকগুলো একক চিত্র-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। তেমনি বিশ্বের নানা দেশে আয়োজিত অসংখ্য দলীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নিয়েছেন। কৃতিত্বের জন্য অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ‘স্বাধীনতা পদক’ (২০১৯), ‘একুশে পদক’ (১৯৮০), ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার’ (১৯৭৫), ‘সুলতান পদক’ (২০০৩), ‘ফ্রান্সের চিত্রকলা উৎসব পুরস্কার’ (১৯৭৩) ও ‘স্টার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার’ (২০১৬)।

১৯৮৭ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ফেলোশিপ পেয়ে তিনি বাংলাদেশের লোক ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ওপর গবেষণা করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ভারতের আইসিসিআরের ফেলোশিপে দিল্লি, কলকাতা, বেনারসের নানা জাদুঘর পরিদর্শন করেন এবং পশ্চিমবঙ্গের নয়টি জেলার তিন হাজার গ্রামে ঘোরেন। তাঁর এই গবেষণার আলোকে লেখা মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবসি সুলতান ও তৎকালীন সমাজ নামক গ্রন্থটি ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া ভারতের নুমিসমেটিক সোসাইটির জার্নালে তাঁর বেশ কয়েকটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

পেশাগত জীবনে এই শিল্পী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করে ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দেয়ালচিত্র করেছেন মুর্তজা বশীর। ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ঝামা ইটের টুকরার মোজাইকে করা ‘শহীদবৃক্ষ’ এদেশে দেয়ালচিত্রের অঙ্গনে একটি অনন্য ও শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। দেশীয় ঐতিহ্য বহন করে এমন উপাদান – পোড়ামাটির ইটের ব্যবহারে শিল্পী তাঁর চিন্তা ও প্রয়োগে বিশিষ্টতার সাক্ষর রেখেছেন।

শিল্পী মুর্তজা বশীর পাকিস্তান আমলের নামকরা কাগজ সমকাল, দিলরূবা, সওগাত পত্রিকায়  নিয়মিত লিখতেন। স্বাধীনতার পর সাপ্তাহিক বিচিত্রা, মাসিক কালি কলম, দৈনিক সংবাদপ্রথম আলোর সাময়িকীসহ বিভিন্ন কাগজে শিল্প-সাহিত্যের নানা বিষয়ে লিখেছেন। তাঁর লেখা উপন্যাস – আলট্রামেরীন (১৯৭৯), মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে / অমিত্রাক্ষর (২০০৮), কাঁচের পাখির গান এবং কাব্যগ্রন্থ – ত্রসরেণু (১৯৭৬), তোমাকেই শুধু (১৯৭৯), এসো ফিরে অনসূয়া (১৯৮৫), সাদায় এলিজি (২০১৭) ও বাংলা থেকে ইংরেজিতে স্ব-অনূদিত Fresh Blood, Faint Line (২০০৮), নির্বাচিত রচনা ও প্রবন্ধ : মূর্ত বিমূর্ত (২০০১), আমার জীবন অন্যান্য (২০১৪) ও চিত্রচর্চা (২০২০) মননশীল পাঠকদের কাছে আদরণীয় হয়েছে। ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হুমায়ুন কবীর-রচিত নদী নারী চলচ্চিত্রের প্রধান সহকারী পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও শিল্পনির্দেশক ছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালে নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্র ক্যায়সে কাহুর শিল্পনির্দেশনা দিয়েছেন।

বেঙ্গল আর্টস প্রোগ্রামের আয়োজনে বেঙ্গল শিল্পালয়ে ‘মুর্তজা বশীরের সৃষ্টি ও প্রসারিত মন’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে রেখাচিত্রে শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতি, তাঁর করা এচিং ছাপচিত্র, ১৯৫২-র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন স্মরণে আঁকা চিত্র, বন্ধু কবি শামসুর রাহমান ও শিল্পী আমিনুল ইসলামের প্রতিকৃতি, নানা মাধ্যমে আঁকা আত্মপ্রতিকৃতি, ড্রয়িং, কোলাজ, চিত্রমালার মধ্যে ‘ডানা’, ‘দেয়াল’, ‘কলেমা তৈয়বা’ প্রভৃতি সিরিজের চিত্রমালা। এছাড়াও স্থান পেয়েছে কাঠখোদাই ছাপচিত্র, এচিং মাধ্যমের কাজ, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে, তেলরঙে আঁকা অবয়ব ও প্রকৃতিচিত্র দুই প্রেমাস্পদের জন্য সংগীত। বিশেষ এ-প্রদর্শনীতে শিল্পীকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র কমপিলেশন অব ইমেজেস, পঞ্চান্ন বছরের অভিযাত্রা এবং তাঁর চিত্রনাট্যে চিত্রায়িত নদী নারী চলচ্চিত্রের ভিডিও স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ প্রদর্শনীতে শিল্পীর সমগ্রজীবনের কৃতিত্ব ও নানা কর্মকাণ্ডের পরিচয় তুলে ধরে সম্পূর্ণ মুর্তজা বশীরকে তুলে ধরার প্রয়াস আছে। দর্শকনন্দিত এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ১৬ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত।

Leave a Reply