শিল্পে অর্থহীনতার অর্থ

লেখক:

সাখাওয়াত টিপু

‘The New is not a fashion, it is a value.’

-Roland Barthes (1915-80)

আধুনিক শিল্পের কাজ কী? এক কথায়, বস্ত্তর সঙ্গে ইন্দ্রিয়ানুভূতির সহজ প্রকাশ। এখানে সহজ মানে সরল নয়, অপর সহযোগে কল্পনার রূপ দর্শন। বস্ত্ত থেকে যে-দৃশ্য সচরাচর গোচর হয়, শিল্প শুধু সেটাকে বর্ণনাত্মক করে না, বাড়তি সংশ্লেষ যুক্ত করে। তাই আধুনিক শিল্পের বিকাশের ভেতর দিয়ে নিছক একক বস্ত্তকে একই বস্ত্ত আকারে হাজির করার দিন শেষ হয়ে গেছে। বস্ত্ত বাস্তবে যে-আকার ধারণ করে, শিল্পে সেটা বাস্তবের ইঙ্গিত আকারে থাকে। কারণ বাস্তবের অধরা রূপ আধুনিক শিল্প ধরতে চায়; ইমেজ বা ছবি কল্পনাকে প্রসারিত করে। এক বস্ত্তর সঙ্গে অপর বস্ত্তর সম্বন্ধ স্থাপন, নিছক বস্ত্তর উপস্থাপন নয়। বস্ত্তর অন্য রূপের রূপান্তর। ফলে বস্ত্তর সঙ্গে সময় অস্থিতি হিসেবে জায়মান থাকে।

দর্শনশাস্ত্রে সময় কালের পরিমাপক। কাল বস্ত্ত দিয়েই চিহ্নিত হয়। কাল মানে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নয়, বস্ত্তর স্থিতি আর অস্থিতি দুই কালকে নির্দেশ করে। ফলে সময় অসীমের সীমারেখায় বস্ত্ত ধরা দেয়। বস্ত্তকে ধরে কালগণনা মানব সভ্যতার ঐতিহাসিক ঘটনা। কালনিরপেক্ষ বস্ত্ত মানে বর্তমান বস্ত্ত। কেননা, বস্ত্তর বর্তমান ছাড়া অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ কল্পনা অলীক ব্যাপার মাত্র। ফলে হলফ করে বলা যায়, সময়ের একক বর্তমান। কথাটা বললাম শিল্পের আধুনিকতা ধরার জন্য। কেন? শিল্পশাস্ত্রে আধুনিকতা দুই ধরনের। মূর্ত আর বিমূর্ত। দুই-ই বস্ত্তকেন্দ্রিক। একপদে বস্ত্তগত জীবনের বাস্তব রূপ, অপর পদে বস্ত্তগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন রূপ। বস্ত্ত মাত্রই বাস্তব। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্যমান বস্ত্ত শিল্পে হাজির হয় অপর বস্ত্তরূপে। আর বস্ত্তর বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে অধরা রূপের বস্ত্ত। মানে বস্ত্তকে অধরা রূপে হাজির করা। দুই ধারাই পুঁজিকেন্দ্রিক সমাজের চিরচেনা কাঠামোর বিচ্ছিন্নতার ভেতর অবচয় আর অবক্ষয় রূপে শিল্প আকারে জারি থাকে। বস্ত্তর ভোগ আর অভোগের উৎপাদন-প্রক্রিয়া মানুষকে যুক্তির দোরগোড়ায় পৌঁছায়। দর্শনশাস্ত্র বলছে, যুক্তির অবচয় মানে বিমূর্ত ভাবের উপায়। ফলে শিল্পে আধুনিকতা বস্ত্তগত ভাবকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে।

কাজী সালাহউদ্দীন একজন আধুনিক শিল্পী। কারণ আধুনিক শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য মাত্রই বস্ত্তনির্ভরতা। বস্ত্তই ভাব-নির্দেশক। মানে বস্ত্তই ভাবকে শাসন করে। শাসিত ভাববস্ত্ত আধুনিক সমাজে অপর অর্থে দেখা দেয়। ফলে ভাবই বস্ত্তর আকার ধারণ করে। বস্ত্ত ভাবের আকার নেয় না। তবে বস্ত্তর অনুপস্থিতি এখানে মুখ্য নয়, গৌণ। বস্ত্তর উপস্থিতি-ভাব বাস্তব হয়ে ওঠে। বাস্তব মানে সত্য নয়। সত্য মানে যা স্থিত, যার অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নেই, যা সর্বকালেই বিরাজিত। কিন্তু বাস্তবের ইতিবাচক আর নেতিবাচক বদলের ভেতর আধুনিকতা চিহ্নিত। এই চিহ্নিত রূপেই সালাহউদ্দীন আধুনিক শিল্পী হিসেবে হাজির হন।

তাঁর শিল্পের ইতিবাচকতা হচ্ছে ‘স্মৃতিনির্ভর অতীত’। যে-‘স্মৃতিনির্ভরতা’ ঐতিহ্যকেন্দ্রিক। যেমন তিনি শিল্পে হাজির করেন ঢাকা নগরের প্রাত্যহিকতার বস্ত্ত-উপাদান। জীবনধারণের সংস্কৃতি এই ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। প্রাণের সঙ্গে খাদ্যবস্ত্তর সম্পর্ক নেহাত ভোগের নয়। রুচি আর উৎপাদন সম্পর্ক-কাঠামো তাকে এক করে রেখেছে। কারণ খাদ্যবস্ত্ত তার শিল্পবস্ত্ততে পরিণত হয়েছে। খাদ্যবস্ত্ত হিসেবে ‘বাখরখানি’, ‘জিলাপি’, ‘টোস্ট’ কিংবা ‘পাউরুটি’ নগরকেন্দ্রিক মানুষের নিত্যদিনের সংস্কৃতির অংশ। এটাকে যখন শিল্পবস্ত্ত হিসেবে দেখা হয়, তখন দুই অর্থ সামনে আসে। এক অর্থে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য যখন সংস্কৃতির পুনরুৎপাদনের পন্থা আকারে থাকে, সেটা প্রথা আকারে প্রচলিত হয়। আর প্রচলিত প্রথাই তখন স্মৃতিনির্ভরতার জন্ম দেয়। মানে একই  বাস্তবতা বারবার বাস্তব রূপে হাজির হয়ে আধুনিক রূপ ধারণ করে। অন্য অর্থে, পুঁজির পুনরুৎপাদন দিক। কারণ পুঁজি সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে চায়। সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটায়। কেননা, সংস্কৃতির রূপান্তর মানে সংস্কৃতির ধ্বংস নয়। অন্য আরেক সংস্কৃতিতে বদল। কারণ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে পুঁজি টিকে থাকতে পারে না। ফলে সালাহউদ্দীন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেটা স্মৃতিনির্ভর বাস্তবতা। শিল্পের এই বাস্তব অতীত নহে। বস্ত্ত স্মৃতি রূপেই বর্তমান। শিল্পী দর্শনীতে হাজির করেছেন ‘হারানো সময়’ নামের ইনস্টলেশন। তাতে দেখা যায়, ম্যানহোলের ঢাকনার ভেতর নানা সাজানো ঘড়ি। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার সময়ের মিল নেই। মানে বর্তমানে দাঁড়িয়ে দেখা সময়ের নানা চিহ্ন।

‘বিপর্যস্ত বর্তমান’ তার শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ দিক। সেটা কেমন? নগরকেন্দ্রিক আধুনিকতার দৃশ্য। দৃশ্য বলতে আমরা নগরের ইমেজ বা ছবিকে বোঝাচ্ছি। আমাদের আধুনিকতা পাশ্চাত্যশাসিত। এটা আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। ফলে সেটা চিন্তাহীনতার দশায় পর্যবসিত হয়েছে, যে-আধুনিকতা প্রকৃতিকে শাসন করে শর্তহীনভাবে। ফলে নগরের যে স্বাভাবিক গঠনপ্রক্রিয়া সেটা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সালাহউদ্দীন শিল্পকর্মে সেই দৃশ্য ধারণ করেছেন। ক্যানভাসে তাকালে মনে হয়, নগর মানে ‘হিজিবিজি গিজগিজ’। ‘হিজিবিজি গিজগিজ’ ভাবের অপর অর্থ ‘হ-য-ব-র-ল’। মানে স্থানের সঙ্গে শূন্যতার সৌন্দর্যের যে সম্পর্ক সেটা নগরে অনুপস্থিত। কেননা দালানের পর দালান জাগছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতিতে পা ফেলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে ক্রমশ। এই অস্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক শিল্পে হাজির করেছেন তিনি। ফলে রং আর ফর্মের দিক থেকে এটি নন্দনতাত্ত্বিক। কেননা, বস্ত্তর উপস্থিতি বস্ত্তর ভাব প্রকাশে শিল্পে নন্দনক্রিয়া হিসেবে হাজির হয়।

প্রশ্ন জাগতে পারে, ‘অস্বাভাবিক’ দৃশ্য কি শিল্প? অস্বাভাবিকতা একধরনের বাস্তবতার অবক্ষয়। এটা আধুনিকতা লক্ষণ। অস্বাভাবিকতা এখানে বাস্তব। ক্যানভাসে এটা যখন দৃশ্য আকারে হাজির হয়, তখন অপর বাস্তবতার গুণ রূপেই দৃশ্যমান হয়। কারণ তার শিল্প কথিত নগর সভ্যতার অস্বাভাবিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে; যেন বস্ত্ততে বস্ত্ততে সংঘাত, বাস্তব বাস্তবকে হরণ করে! নগর মানে কি স্থানহীন বা কাঠামোহীন গন্তব্য? শিল্পী ক্যানভাসে রেখা আর ফর্মের যে-কোলাজ করেছেন সেটা ইঙ্গিতময়। ছবি পাঠ করলে দেখা যাবে, নানা জ্যামিতিক ক্ষেত্র ক্যানভাসের পাটাতনে। উল্লম্ব, সম, বিষম ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ কিংবা অর্ধ, সরল-অসরল বৃত্ত নগর কাঠামোর উপমাই সৃষ্টি করে, যাকে আমরা বলছি ইঙ্গিতময় শিল্প। কেননা, বস্ত্তর ভাবই বস্ত্তকে শিল্পে রূপান্তর করতে বাধ্য। ফলে অস্বাভাবিক দৃশ্যই তার শিল্প হয়ে ওঠে। যেমন এই অস্বাভাবিকতার ভিডিওচিত্র রানা প্লাজা ধসের ঘটনাকে নিয়ে। অনর্গল মোবাইলের ধ্বনি বেজে উঠছে, কিন্তু ধরার কেউ নাই। এখানে মোবাইল-ধ্বনি ব্যক্তির উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তির ‘অনুপস্থিতি’ বা ‘সদ্যমৃত’ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এখানে ধ্বনিই বস্ত্তর উপযাচক।

দর্শনশাস্ত্রে অর্থের ভূমিকা দুই ধরনের। এক দিক, বস্ত্তর বিনিময়মূল্য নির্ধারণ; অন্য দিকে অভিধান বা সমার্থকতা সৃষ্টি করা। ফরাসি দার্শনিক রলাঁ বার্থ বলেন, নতুন মাত্রই চটক নয়, এটা মূল্য বটে। শিল্পী সালাহউদ্দীনের মাধ্যম হিসেবে অপাঙ্ক্তেয় বস্ত্তকে ব্যবহার করেছেন। যেমন কাঠের গুঁড়া, ফেলে দেওয়া কার্টন, চাটাই, চট, পুরনো খবরের কাগজ ইত্যাদি। এই উপাদান শিল্পের বেলায় চটক নয়, মূল্যই নির্ধারণ। মানে শিল্পী অর্থহীনতাকেই অর্থ দিয়েছেন। বস্ত্তর প্রকৃতিই বস্ত্তর ভাব। উপযোগিতাই সেই ভাবের অর্থধাত্রী। উপযোগহীন বস্ত্ত মাত্রই বস্ত্তর প্রকৃতির অভাব। কিন্তু অনুপযোগী বস্ত্তকে রূপ দেওয়াকে বলছি ‘বস্ত্তর প্রকৃত স্বভাব’।  ফলে বস্ত্তর অ-ভাবকে ভাবে আনাকে আমরা নাম দিয়েছি শিল্প। সালাহউদ্দীনের শিল্পকর্মও বস্ত্তর স্বভাব আর অভাব, দুই অর্থে তাই।

জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে কাজী সালাহউদ্দীন আহমেদের ইন (সাইট) নামের এই শিল্প-প্রদর্শনীটি চলে ১৭ থেকে ২৭ এপ্রিল ২০১৪ পর্যন্ত।