শিশিযাপন

লেখক: ওয়াসি আহমেদ

চকমধুরার ধুধু প্রান্তর চিরে রাস্তা হবে বলে যেদিন ইটবোঝাই প্রথম ট্রাকটা এল, দুর্গম এ-গ্রামের লোকজন চৈত্র মাসের গা-জ্বালানো গরমেও হিম শিউরানি টের পেয়েছিল। দুদিন না যেতে হাসপাতাল হবে বলে ধূলিঝড় তুলে একটা সিমেন্টবোঝাই ট্রাকও যখন হেলেদুলে গ্রামের উত্তরে সরকারের পতিত জমিতে এসে হুস্ হুস্ নিশ্বাস ছেড়ে শান্ত হলো, লোকজনের মনে হলো, তারা একটা বিপত্তিতে পড়ে যাচ্ছে। সেই শুরু।
এ-কথাগুলো ঠিক এভাবে না হলেও যার বলার কথা সে মোনসের প্রামাণিক, চকমধুরার আদি বাসিন্দা। সে অবশ্য এখন বলার অবস্থায় নেই।
চওড়া পাকা বারান্দায় আধশোয়া হয়ে ঘাড়মাথা তুলতে গিয়ে সে মহাবেকায়দায়; তার পেটের ওপর একজন রোগাপটকা পুলিশের পায়ের কাদামাখা কালো বুট, আর ঝুঁকেপড়া হাতে গিটসুদ্ধ কাঁচা বাঁশের লম্বা কঞ্চি। মোটামুটি গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করছে দশ-বারোজন তামেশগির, কারো মুখে পানখাওয়া লাল হাসি, কারো মুখে অবোধ কৌতূহল, আর অল্প দূরে কালো বোরখার পর্দা মাথার ওপর পতাকার মতো উড়িয়ে যে তেজি গলায় পুলিশকে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে, সে মোনসের প্রামাণিকের বউ, জেবুন্নাহার – ‘মারেন ভাইজান, মেরে মরার শখ মেটায় দ্যান।’
পুলিশকে বউ নিজের স্বামীকে পেটাতে বলছে এ-ঘটনার সরল অনেক ব্যাখ্যাই হতে পারে। ঘরে বউ-বাচ্চা রেখে বদমায়েইশি করতে গেছে, বা বিয়েই আরেকটা করে ফেলেছে, বা নিদেন বউকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করেছে, বা … বলে শেষ করা যাবে না, কত কিছুই হওয়া সম্ভব। কিন্তু ঘটনা হলো জায়গাটা হাসপাতাল, থানা না, আর কঞ্চি হাতে পেটে বুট ঠেকানো রোগাপটকা বছরতিরিশের লোকটা মোটেও পুলিশ না, হাসপাতালের গার্ড। লোকজন যারা ঘিরে দাঁড়িয়েছিল, তারা কেউ রোগী, কেউ রোগীর সঙ্গে আসা আত্মীয়-পরিজন। বিনোদনই বড় কথা, বিশেষ করে রাগের মাথায় বেআবরু মেয়েমানুষের তেজি গলায় ‘মারেন ভাইজান’ রোগশোকেও বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। মূল ঘটনা না জানা থাকলেও মেয়েলোকটা যে লোকটার বউ এ-কথা কাউকে বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না – এ হলো বিনোদনের গুপ্ত কথা।
কিছু সময় পর ঘটনা পরিষ্কার হতে লোকজন এ ওর দিকে তাকায়, একসময় সরেও পড়ে। লোকটা পোকা মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়ে ধরা পড়ে, মানে, মরে না গিয়ে বুট ও কঞ্চির শাসানির চাপে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। গার্ড, যাকে খাকি পোশাকের কারণে পুলিশ-পুলিশ মনে হওয়া স্বাভাবিক, পা সরাতে গিয়েও পারছে না লোকটার বউয়ের তেজের কারণে। সে অবশ্য কাদামাখা জুতাটাই রেখেছে লোকটার ডোরাকাটা লুঙ্গির কষে বাঁধা গিটের ওপর, চাপ-টাপ দিচ্ছে না, কঞ্চিটা লোকটার বউই তার হাতে তুলে দিয়েছে, আর ভাইজান ভাইজান করছে। আগেও একবার আত্মহত্যার পাঁয়তারা করে বিফল হয়ে বউকে বিপদে ফেলেছিল শুনে সে সবে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া লোকটাকে স্রেফ ভয় দেখাতে জামার কলার ধরে হালকা ঝাঁকি দিয়ে বলেছিল, ‘আর করবি?’ এইটুকু ঝাঁকির টাল সামলাতে না পেরে লোকটা কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিল আউটডোরের চওড়া বারান্দায়, আর তখনি বউটার রাগ-রোষ তাকে এতই চাপে ফেলে দিয়েছিল, সে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় বুটপরা বাম পা-টা লোকটার পেটের ওপর তুলে দিয়েছিল। নিজেকে তার তখন পুলিশ-পুলিশ মনে হলেও কাদামাখা বুটের কারণে লজ্জা-সংকোচে ঘাড় নিচু করে লোকটার মুখে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছিল চোখের কোল গড়ানো বড়সড়ো এক ফোঁটা – কী বলবে একে – কান্না, না যন্ত্রণা!
গোড়ার কথায় আসা যাক। বেশ কয়েক বছর আগে চকমধুরায় রাস্তা, হাসপাতাল, ইশকুল-মাদ্রাসা বানানো, এমনকি ইরিক্ষেতে সেচের মেশিন বসানোর তোড়জোড় শুরু হতে, অর্থাৎ উন্নয়নের সেই প্রাথমিক ধাক্কায় বিপত্তির যে-আঁচ গ্রামবাসী পাচ্ছিল তা তাদের দীর্ঘদিনের জীবনযাপনের অভ্যাস ও আচার-আচরণ ভেস্তে যাওয়ার ভয়ে। যুবক মোনসের প্রামাণিকের মনে আছে তার মা বলেছিল, ‘আমাগের কী হবে! জোর করে বাঁচায়া রাইখ্যা মরার সুখ কাইড়া নিবি!’ ছোটবেলা তার বাবা শমসের প্রামাণিক ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি দিতে না পেরে বিষ খেয়েছিল, বিষে কাজ হয়েছিল। গরু কিনবে বলে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিল, গরু অবশ্য কিনতে পারেনি, পাঁচ হাজারে গরু কোথায়? শমসের প্রামাণিক বাজার-হাট করেছিল সে-টাকায়, মেয়েকে জামাইসহ আনিয়েছিল পাশের গ্রাম তাগামারা থেকে, দুদিন রেখেও ছিল ওদের। ভালোই খাওয়াদাওয়া হয়েছিল। মাসখানেক পর প্রথমবার কিস্তি নিতে এসে টাকা না পেলেও তেমন চোটপাট না করে ফিরে গিয়েছিল এনজিওর লোক। আরো মাসখানেক পর দ্বিতীয়বার এল, এবার শমসের প্রামাণিককে না পেয়ে মোনসের ও তার মা-ভাইকে হুমকিধমকি দিয়ে উঠানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে, বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করে একটা আধপাকা বাতাবিলেবু গাছ থেকে ছিঁড়ে বিদায় হয়েছিল। তৃতীয়বার আসার দুদিন আগে শমসের প্রামাণিক শিশি খেল – হাতের বুড়োআঙুল ও তর্জনীর বেড়ের পাঁচ-ছয় ইঞ্চি লম্বা পাকালো শিং মাছের কালচে-লাল রঙের শিশির এক ফোঁটাও বাকি রাখেনি। মোনসেরের মা বলছিল আরো দুই কিস্তির তারিখ পর্যন্ত আপেক্ষা করলে পারত। এ গেল মোনসেরের বাবার কথা, তবে তার বড়ভাই মোকসেদকে নিয়ে মোটেও আক্ষেপ ছিল না। খেতে না পেয়ে তার বউ চলে গিয়েছিল, বিবাগি হয়ে মোকসেদ গ্রাম ছেড়ে আত্রাই সদরে এক কাঠগোলায় কাজ নিয়েছিল। কাঠগোলার করাতকলে কীভাবে যেন পা পড়ল, বেশি যে কেটেছিল তা-না, হাসপাতালে চিকিৎসাও করিয়েছিল কাঠগোলার মালিক। লাভ হয়নি, পায়ে পচন ধরল, হাঁটুর নিচ থেকে ডান পা-টা কেটে বাদ দেওয়া ছাড়া গতি ছিল না। বউ নেই, আবার পা-ও নেই, মোকসেদ কিছুদিন অপেক্ষা করল। কিসের অপেক্ষা সে-ই বলতে পারত। বাড়ি এসে এক পায়ে ল্যাংচে ল্যাংচে মাসখানেক পার করে শিশি খেল। গ্রামের লোকজন তো না-ই, বাড়িতেও কেউ আহা-উহু করেনি। মোনসেরের মা বলত, ‘মানুষের জেবন খুদাতালার দান, আর জেবনের কষ্ট বাড়লে খুদাতালাই পথ বাতলে দ্যান।’
কথাটা তার নিজের, না অন্যের মুখে শোনা কে জানে। সম্ভবত এটা তার একার কথা নয়। সেজন্য চকমধুরার হাট-বাজারে তো বটেই, গাঁয়ের ভেতরের ছোটখাটো একচালা মুদি দোকানেও একটা জিনিসের অভাব কেউ কোনো দিন দেখেনি। সেটা শিশি। সব শিশির মাপ এক নয়, কোনোটা বড়, কোনোটা ওই পাঁচ-ছয় ইঞ্চির – মোনসেরের বাপ শমসেরের মাথার কাছে যেমন পাওয়া গিয়েছিল। একজনের জন্য ছোটটাই যথেষ্ট। বড় শিশি যারা কেনে তাদের মতলব আলাদা। বছর দশেক আগে মোনসেরদের বাড়ির কিছুটা তফাতে লালু ফকির তার বউ, দুই ছেলে ও তার নিজের জন্য বড় এক শিশিতেই হয়ে গিয়েছিল।
দোকানে শিশিগুলো চাইলেই দোকানদার কাগজের ঠোঙায় ভরে দেয়। দোকানে সেগুলো থাকেও চোখের সামনে, কাঠের তাকে পুতুলের মতো সার করে সাজানো। একবারের ঘটনা। তপন পালের ভুষিমালের দোকানের বেঞ্চিতে বসা বছর আঠারো-কুড়ির এক ছোকরা নানা কথার ফাঁকে চোখ ঘুরাচ্ছিল দোকানের বাঁ দিকের তাকে যেখানে অন্তত ডজনখানেক ছোট-বড় কালচে-লাল শিশি গা ঢলাঢলি করে দাঁড়িয়েছিল। তপন পাল ছোকরাকে চিনত, নাম মতি, বাপ ভালোই গেরস্থি করে, জমাজমিও মন্দ না, আর মতি নাকি স্কুল পাশ দিয়ে নাটোর না কোথায় কলেজে পড়ে। তপন পাল খেয়াল করছিল মতির নজর কোন দিকে। বয়স কম, লাজুক চোখমুখ, চাইতে লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপার তো এমন না যে সে নিজে সেধে একটা শিশি ধরিয়ে দেবে। তার মনটা একটু খারাপ হয়েছিল এই ভেবে, গেরস্থ বাড়ির ছেলে, দেখতে-শুনতে ভালো, পরনে জামা-কাপড়ও ভালো, কেবল চোখের তলায় এক কাঁড়ি কষ্ট। না জানি কী চোট পেয়ে দোকানের বাঁ দিকের পলকা কাঠের তাকে লাইন করা শিশিতে নজর দিচ্ছে। শেষমেশ মতি, ‘দ্যান তো কাহা ছোট এট্টা’ বলে ফেলার পর তপন পাল ঠোঙায় মুড়ে একটা শিশি হাতে দিতে সে পয়সা মিটিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে চলে গিয়েছিল।
পরদিন খবর পাওয়া গিয়েছিল ঘটনা তপন পাল যেমন ভেবেছিল তেমন না – মানে সেই যে সে মতির চোখের নিচে এক কাঁড়ি কষ্টের পুঁটলি দেখতে পেয়েছিল, ওটা কঠিন কষ্টের কিছু ছিল না। মতির ভাব-ভালোবাসা হয়েছিল তারই সঙ্গে কলেজে পড়া এক মেয়ের। তো সেই মেয়ে নাকি বলেছিল তাকে যদি সত্যি ভালোবেসে থাকে, তবে কি সে তার জন্য জীবন দিতে, মানে মরতে রাজি হবে? ব্যস, এটুকুই। মেয়েটা তাকে মরতে বলেনি, মতি মুখে বললেই পারত রাজি। এর জন্য শিশি খাওয়া বাড়াবাড়ি। সে-সময় গ্রামে এমন কথা অনেকেই বলাবলি করেছিল।
ছোট গ্রাম, তারপরও বছরে তিরিশ-পঁয়ত্রিশটার মতো ঘটনা ঘটে। সবই শিশি খেয়ে। ফাঁস দিয়ে বা গলায় কলসি বেঁধে পুকুরে ডুবে মরার কায়দাটা কঠিন বলে সে-পথে তেমন কেউ যায় না। ফাঁস দেওয়া আসলেই কঠিন, জোগাড়যন্ত্র লাগে। পুরুষ হোক মেয়ে হোক, শাড়ি বা দড়ির দরকার পড়ে। সেই শাড়ি বা দড়ি জুতমতো ঘরের বাতায় বা গাছে বেঁধে ঝোলাঝুলিতে ম্যালা ঝামেলা। শিশি সেদিক দিয়ে সুবিধার, নিরাপদও। আর সেই যে অনেক বছর আগে – মোনসের প্রামাণিকের কিছু কিছু মনে আছে – কার্তিক মাসের মঙ্গায় আকালু ও তার বউ মিলে যুক্তি করল দুজন ফাঁস নেবে, তারপর কত হাসাহাসি। শিশি কেনার পয়সা ছিল না সেটাই সম্ভবত কারণ। আকালুর বউ ঘরের বাতার বাঁশ ভেঙে পড়ল, আর ওদিকে ঘরের চেয়ে বাইরে ভালো চিন্তা করে আকালু যখন বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে ডালপালা ছড়ানো একটা পছন্দের বরইগাছ পেয়ে কাঁটা বাঁচিয়ে হাত দশেকের মতো উঁচুতে উঠেছে, তখনি মনে পড়ল দড়ি আনেনি, ছেঁড়াফাড়া গামছা ছিল ঘরে, ওতে কাজ হবে না ভেবে ফেলে এসেছে। কী করে, পরনের লুঙ্গি খুলে ধুম ন্যাংটো হয়ে গাছের ডালের সঙ্গে টাইট করে গলা বাঁধতে গিয়ে খাটো লুঙ্গিতে কিছুতে কুলাচ্ছিল না। অনেক চেষ্টা করেও সুবিধা করতে না পেরে পা ফস্কে পড়ল তো পড়ল, কোমরও ভাঙল। দশ হাত তেমন বেশি না, কিন্তু কপালে খারাবি থাকলে যা হয়, হাত-পা ভাঙলে দুঃখ ছিল না, ভাঙল কোমর। এদিকে বউ বাতার বাঁশ ভেঙে পড়ে ঘরে কাতরাচ্ছে আর সে কোমর ভেঙে গাছতলায় ন্যাংটো হওয়ার লজ্জায় রা কাড়তে পারছে না। এমন কেলেংকারির পর কেউ ঝোলাঝুলিতে যায়নি। আকালু ও তার বউ অবশ্য পরে শিশি পেয়েছিল। কেউ দিয়ে থাকবে, না হলে ভাঙা কোমর নিয়ে সে কোথায়, কার কাছে যাবে!
মাঝে মাঝে সদর থেকে দারোগা-পুলিশ এসে দেখে যায়। দেখে যাওয়াই সার। তারা কিছুটা অবস্থাপন্নদের উঠানে চক্কর কাটে, কারো গাছে ডাব চোখে পড়লে পেড়ে দিতে বলে, খাওয়ার মতো কিছু না পেলে কাঁচা কষাটে আম নুন-মরিচ দিয়ে চটকে দিতে বলে। গ্রাম ঘুরে ঘুরে তাদের মনে হয় – কথায় কথায় যে শিশি গলায় ঢালে, এর পেছনে একটা নেশার মতো ব্যাপার থাকলে থাকতে পারে। নেশার টানেই একজনকে দেখে অন্যে প্রেরণা পায়। বিপদ-আপদে যাতে বেশি নাজেহাল হতে না হয়, সেজন্য ঘরে ঘরে তারা শিশি মজুত রাখে, কখন দরকার পড়ে! সমস্যা সমাধানের এটাই পথ। অভাবী জায়গা, একটাই ফসল, গুনে গুনে খেলেও মঙ্গার সময় বাদেও মানুষের ঘরে ভাত জোটে না। তবে এটাই যে কারণ তা না, দারোগা-পুলিশের ধারণা – লোকজনের মনে বিমারি বাসা বেঁধে আছে, মনখারাপের বিমারি, তাই ছুতো পেলেই হলো। মোনসের প্রামাণিকের আপন চাচাতো বোন বিলকিস, দেখতে-শুনতে খারাপ ছিল না, কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব আসে না, হালকা-পাতলা গড়নের মেয়েটা দিনে দিনে কেমন হয়ে গেল। কী কপাল, শিশি যেদিন খেল, সেদিনই বিয়ের প্রস্তাব এল।
দারোগা-পুলিশ এ-অবস্থায় কী করবে! খুনোখুনি না, বড় অসুখ-বিসুখ না, তারপরও লোক মরে, কোনো কোনো মাসে চার-পাঁচজনও। লোকজন হা-হুতাশ করে না, কেউ কাউকে দোষ দেয় না। যা বলতে চায় – বড় কষ্টে ছিল, বড় দাগা পেয়েছিল, বাঁচার এমন কষ্ট সহ্য করা যায় না, নিজের পথ নিজে করে নিয়েছে। আবার মতির মতো ভুলভাল কাজও কেউ কেউ করে, বিশেষ করে অল্পবয়েসিরা। বাপ মোবাইল কিনে দেয়নি এমন দুঃখ শিশি খাওয়ার কারণ হিসেবে খাটে না।
সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়ল যখন রাস্তা, হাসপাতাল, ইশকুল হতে শুরু করল। আগে যেখানে ভ্যান বা গরুর গাড়িতে ঘাড়-পিঠ গুঁজে শরীর অবশ করে উপজেলা সদর থেকে গ্রামে পৌঁছতে দিন কাবার হয়ে যেত, সেখানে সরকারি লোকলস্করের হাওয়া খেতে খেতে গাড়ি হাঁকিয়ে আসা-যাওয়া চলতে লাগল। আবার তারা এও বলতে লাগল – দোকানপাটে শিশি বেচাকেনা বন্ধ, কারো যদি ঘরেও পাওয়া যায়, হাজতে নেওয়ার আগে পিঠে রুলের বাড়ি। এ কেমন কথা! এতদিন মানুষ যা করে এসেছে তা না করে কী করে টিকবে! আর শিশি কি সকাল-বিকাল এমনি এমনি শখ করে কেউ খায়! দরকারে খায়, দরকার কখন এরা কী করে বুঝবে! বাঁচার জ্বালা মেটাতে গলায় ঢালে – অসুখ করলে যেমন ওষুধ। সরকারি লোকজন আরো বলল – তোমাদের মন দমে গেছে, চাবি ঘোরাও, মন খুলবে, শিশির কথা ভুলে যাবে।
আজব কথায় লোকজন ভরসা পেল না। না হয় না-ই খেল, তাই বলে কিনতে চাইলে দোকানে পাবে না, ঘরেও এক-আধ শিশি রাখতে পারবে না – এ হয় না।
তারা আরো শুনল, শহরে-গঞ্জে কামে-কাজে জুটে গেলে, টাকা রোজগারে মেতে উঠলে কোথায় পালাবে মনের বিমারি! শিশির কথা আর মনে পড়বে না।
আচানক হলেও কথাটা নতুন। মোনসের প্রামাণিক শহরে এল। শরীর-গতর তখন ভালো, ভারী কাজে অসুবিধা নাই। ভিড়ে গেল রাজমিস্ত্রির জোগালির দলে। সকাল-সন্ধ্যা কাজ, রাতে ঘুমাত অন্য জোগালিদের সঙ্গে, খাওয়াদাওয়াও এক সাথে। সারাদিন খাটাখাটনির পর বাঘের খিদা নিয়ে যখন খেতে বসত, মনে হতো খিদার আগুন নেভানোর এমন সুখ আগে পায়নি। রোজগারের টাকা হাতে পেলে ভাবত, এই কি চাবি ঘোরানো, মন কি তার খুলতে শুরু করেছে? সরকারি লোকজন যেমন বলেছিল।
তারপরও কী যেন নেই, হাতের কাছে নেই, আশেপাশে অন্যের কাছেও নেই। এই না থাকার, খালি খালি লাগার ব্যাপারটা মাঝে মাঝে বেশ ভোগাত। রাজশাহী শহর, বড় জায়গা, কত মানুষ, কত কিসিমের মানুষ; সে মানুষ দেখে আর ভাবে এরা কেউ শিশির কথা চিন্তা করে না। ভাবতে গিয়ে তার তাজ্জব লাগে, সবাই বাঁচার জন্য পাগল, বাঁচার কষ্টের কথা মাথায় রাখে না। নুলো ভিখারি, কুষ্ঠে পা পচে দফারফা, হাসপাতাল থেকে মরা বাচ্চা কোলে আহাজারি করতে করতে মা রাস্তায় নেমেই কাফনের জন্য টাকা মাঙছে – এমন দৃশ্য হরহামেশা চোখে পড়ে, কিন্তু শিশি খাওয়ার কথা তো শোনে না। আর শিশিই-বা কোথায়!
তবে একেবারে খালি খালি কি থাকা যায়! কায়দা করে নানা জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানল শিশির কারবার কোথাও নাই। আছে যা, ইঁদুর মারার বিষ, পলিথিন বা মুখবন্ধ কাগজের প্যাকেটে বিক্রি হয়, পথে-ঘাটে ফেরিওয়ালারাও হেঁকে হেঁকে বেচে। এতে ভরসা হয় না – এইটুকু জান ইঁদুরের। ইঁদুরের জিনিস মানুষের কাজ করবে না। আরো আছে – পোকা মারার বিষ, ইরিক্ষেত বাঁচাতে চাষিরা কিনে নিয়ে যায়। শিশিতে বেচে, বড় বড় শিশি, বোতল বললে মানায়। রংটাও কালচে, দোকানে দেখে একটা বোতল হাতের কাছে রাখবে ভেবেও কেনেনি। পরে আফসোস করেছে, পড়ে থাকত টিনের বাক্সের তলায়, কেউ জানতে পারত না।
রুজি-রোজগার মন্দ না, নিজে চলার পরও থাকে। এদিকে মা মারা গেছে, শিশি খেয়ে না, এমনি অসুখে পড়ে। মা থাকলে মাসে মাসে টাকা পাঠাতে পারত। প্রথম এক বছর নিয়ম করে পাঠাত। মা মরে যেতে টাকা খরচের পথ অনেকটা বন্ধ হয়ে যেতে মোনসের ভাবল এবার কী করা। অল্প দিনেই টের পেতে শুরু করল মনে তার রং ধরছে, চাবি তবে ঘোরাতে পারছে। শখ করে এটা-ওটা কেনে, জামা-কাপড়, ঘড়ি, ফিতাওয়ালা বাটার ভারী স্যান্ডেল, শেষমেশ একটা মোবাইলও। তারপর কাজ থাকে একটাই – বিয়ে। সে-কাজটাও কীভাবে যেন হয়ে গেল। তার এক জোগালি দোস্ত সব বন্দোবস্ত করে দিলো। বছর ঘুরতে বউয়ের কোলে ফুটফুটে বাচ্চাও এল। ছেলে বাচ্চা। এবার?
এবার, এবার করে কিছু দিন যেতে এক সকালে আকাশভরা মেঘ, বৃষ্টি হবে হবে। বাতাস হঠাৎ এই জোরে, এই আবার মোলায়েম বেগে চরে ফিরে বৃষ্টি নামিয়ে তবে থামল। টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টির তাল ঠোকা শুনতে শুনতে মোনসের তার বউ জেবুন্নাহার, সংক্ষেপে নাহারকে বলল, কাজে যাবে না। নাহার কিছু না বলে চাল-ডাল চুলায় চাপিয়ে বলল একটা বেগুন যদি পেত চিকন ফালি করে ভাজি করত। মোনসের জবাব দিলো না, বউ আবার কথাটা বলল। সে ছাতা নিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে পা ফেলতে দেখল ঘুটঘুটে অন্ধকার, রাস্তায় পানি জমে একাকার। ভেজা ছাতা ভেঙে ঘরে ঢুকে সে এক কোণে চুপ করে বসে পড়ল। পাশেই বছর দেড়েকের ছেলেটা ঘুমাচ্ছিল, কোনো কারণ নেই, ঘুম ভেঙে বিকট চিৎকারসহ কান্না জুড়ে দিলো। নাহার রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে ছেলেকে থামাতে এটা-ওটা বলার ফাঁকে তার কাছে জানতে চাইল বেগুন কোথায় রেখেছে। ঠিক তখন, বহুদিন পর, মোনসেরের বুক খালি খালি লাগল। নাহার অবশ্য এ নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটিতে যায়নি, বেগুন নেই তো কী হয়েছে, ঘরে আলু আছে, খিচুড়ির সাথে ঝুরি আলু ভাজা কম কিসে! দুপুরে দুজনে খিচুড়ি খেল, খেয়েদেয়ে মোনসের যা করে না, টানা ঘুম দিয়ে উঠে ছাতা নিয়ে বাইরে বেরোল।
টিপ টিপ বৃষ্টি তখনো, রাস্তায় জমাট পানি সরে গেছে। সে গলির দোকানে গিয়ে একটা স্টার ফিল্টার ধরিয়ে আয়েশ করে কয়েকটা টান দিলো, তারপর ঘরে ইঁদুরের বড় জ্বালাতন বলে দোকানদারকে শুনিয়ে শুনিয়ে বিড়বিড় করে ইঁদুরের বিষ চাইল। চিকচিকে কাগজে মোড়ানো ইঁদুরের ছবিওয়ালা একটা প্যাকেট হাতে পেয়ে জানতে চাইল একটায় হবে কিনা। দোকানদার হাসল, বলল, ‘এর এক দানা খাইলে জান শ্যাষ, জায়গায় খাবু জায়গায় মরবু। বেশি নিতি চাইলে নিতি পারেন।’ দুইটা না তিনটা না আরো বেশি – মন ঠিক করতে সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে মোনসের বলল, ‘দ্যান চাইট্টা। কামে লাগবে।’ ঘরে ফিরে সেই সন্ধ্যাটা যে কী ভালো কেটেছিল মোনসের বোঝাতে পারবে না। ছেলেকে পিঠে চড়িয়ে ঘোড়া হয়ে ঘরের এমাথা-ওমাথা চক্কর কেটেছিল, আর নাহারকে অবাক করে বলেছিল চাইলে সেও তার পিঠে চাপতে পারে। বিষের প্যাকেটগুলো বুদ্ধি করে চৌকির পাটাতনের নিচে পেরেক মেরে সুতায় ঝুলিয়ে বড় শান্তিতে রাতে ঘুমিয়েছিল।
পরদিন সকালে কাজে গিয়ে আগের সন্ধ্যা বা রাতের কথা ভেবে সে অবাক হয়েছিল, কাজটা অনেক আগেই করে রাখতে পারত। তাহলে বুক খালি হওয়ার যন্ত্রণায় পড়তে হতো না। কাজের ফাঁকে সে বারবার আনমনা হয়ে পড়ছিল। গ্রামের কথা খুব মনে পড়ছিল, তার জানা নেই শিশি না পেয়ে লোকজন কী করছে? তার বাবার কথা, বড়ভাইয়ের কথা মনে পড়ছিল। আশ্চর্য হচ্ছিল, আগে তো কখনো মনে পড়েনি। আরো কতজনের কথা মনে পড়ছিল! যতই ভাবছিল, সে তাদের সবাইকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল। মনমরা, ক্লান্ত মুখ, আবার এও ভাবছিল মনমরা হতে হতে তারা নিজেদের জন্য ব্যবস্থা করে যেতে পেরেছে। অন্য কথাও ভাবছিল, সে যে শহরে এসে থিতু হয়েছে, বিয়ে করেছে, বাবা হয়েছে – কী লাভ! নাহার আগের দিন বৃষ্টি দেখে ঝুরিভাজা আলু দিয়ে খিচুড়ি খাইয়েছে – সেজন্য, না ছেলেকে পিঠে নিয়ে সে ঘোড়া সেজেছে, না-কি রাতে লম্বা ঘুম দিয়েছে, সেজন্য? সে-রাতে, নাহার পাশেই ঘুমে কাদা, ছেলেটারও কোনো নড়াচড়া নেই। সে চৌকি থেকে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে পেরেক থেকে চিকচিকে কাগজের প্যাকেটগুলো হাতড়ে দরজা খুলে বারান্দায় এসে আকাশ দেখেছিল। মেঘের ফাঁকে চিড়াচ্যাপ্টা চাঁদ, ভেজা, চুপচুপে এক টুকরা আলো এই ভাসছে এই ডুবছে। কী লাভ!
সেবার প্রথম মোনসের প্রামাণিক ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে গেল। ঝক্কি-ঝামেলা সব নাহারের ওপর দিয়েই গেছে। লোক ডাকা, হাসপাতালে নেওয়া, ডাক্তার-নার্সদের পায়ে ধরা, ওষুধ জোগাড়, হেনতেন।
কথা নেই বার্তা নেই, লোকটা মরতে গেল কেন – এ নিশ্চয় নাহারের কাছে ধাঁধা ছাড়া কিছু ছিল না। ধাঁধার জবাব পেতে সে যখন মোনসেরকে চেপে ধরেছে, সে আজব কথা বলেছে। তার নাকি গ্রামের কথা মনে পড়েছিল, বাড়ির পেছনে বাতাবিলেবু গাছটার কথা মনে পড়েছিল, আর চাঁদ …। চাঁদ কী? সে চুপ করে থেকেছে। নাহার জানতে চেয়েছিল, আর? সে জবাব দেয়নি। একসময়, অনেকক্ষণ পরে আস্তে আস্তে বলেছিল, এ তাদের গ্রামের ধারা। পাগল-ছাগল নিয়ে সংসার করছে এ-কথা আগে কখনো মনে না হলেও, সেদিন মোনসেরের জবাব শুনে নাহারের ইচ্ছা হয়েছিল, পেলে সেও খায়। বেশি না অল্প, লোকটার যাতে শাস্তি হয়। পরপরই তার মনে হয়েছিল, ঘরে এত সুন্দর ছেলে থাকতে যে বিষ খায়, তাকে শাস্তি দেবে কী করে!
কয়েক দিন নাহার তক্কেতক্কে ছিল। কিন্তু মোনসেরের মধ্যে পাগলামির কোনো আলামতই পাচ্ছিল না। শান্ত-ঠান্ডা একটা লোক, রোজ সকালে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে যা পায় খেয়ে কাজে যায়। সারাদিন খেটে রাতেও যা দেওয়া হয়, মন ভরে খায়। টাকা-পয়সা যা কামায়, বিড়ি-সিগারেটের জন্য অল্প-স্বল্প রেখে সবই তার হাতে তুলে দেয়। কারো খারাপ-ভালোতে সে নেই, বিশেষ করে নিজের ভালোতেও যে নেই এটা তখন নাহারের কাছে পরিষ্কার।
অনেক কিছু তালাশ করেও যখন কিছু মিলল না, তখন একদিন গ্রামের ধারা নাকি যেন বলেছিল, নাহার সে-ব্যাপারে জানতে চাইল। মোনসের খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল সে বুঝবে না। নাহার এমনিতে ঠান্ডা স্বভাবের, চেঁচামেচি করে না, তবে সেদিন বুঝবে না শুনে সে খেপে গেল। চিৎকারে ঘর মাথায় তুলল, কী বুঝবে না? বউয়ের এমন রূপ দেখে মোনসের ভয় পেল। নাহার তাকে টিটকারি দিতে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল, ‘লাগবে নাকি ইন্দুরের বিষ, লাগলে লিয়া আসি, কয় পুরিয় গিললে আর ডাক্তরখানায় যাইতি হবে না? শালা, ইন্দুরের জাত।’ সেই প্রথম মোনসের নাহারের মুখে শালা শুনল, তাও তাকেই বলা। তার তখন মনে হলো যদি শিশি পেত!
শালা, ইন্দুরের জাত বলে ফেলার পর জিভের আড় ভেঙে যেতে জেবুন্নাহার ওরফে নাহারের গলা প্রায় দিনই নানা কারণে চড়তে শুরু করেছিল। ছেলে মাটিতে বসে এটা-ওটা মুখে দিচ্ছে, সে চেঁচিয়ে ছেলেকে ধমকাচ্ছে, চুলায় ডাল ঘুঁটতে গিয়ে ঘুঁটনি ভেঙে গেছে, তাতেও চিল্লানি, সরষের তেলের বদলে মোনসের সয়াবিন তেল নিয়ে এসেছে, এ তো চিল্লানোর আরো মোক্ষম সুযোগ। কেন বিষ খেতে গেল এ-রাগ তাকে দিনে দিনে অস্থির করে তুলেছিল। আর এ তো বলার অপেক্ষা রাখে না স্বামী যখন বিষ খেয়েছে, মরুক বা না মরুক, দোষ তার ওপরও বর্তায়। কী করেছে সে যে মোনসের নিজেকে ইঁদুর ভেবে ইঁদুরের জিনিস খেয়েছে! ইঁদুর যখন, সে তবে বিড়াল। মোনসেরকে সামনে পেলে ঝগড়াটে বেড়ালের মতোই ঘাড়ের রোয়া ফোলাত। কিন্তু সে জানত না বিড়ালের ভয়ে ইঁদুর এ-গর্তে সে-গর্তে লেজ গুটিয়ে থাকতে থাকতে একদিন হাওয়া হয়ে যেতে পারে।
এদিকে মাসকয়েকে মোনসেরের শরীরে হঠাৎ ভাঙন ধরল, আগের মতো কাজকর্মে বল পায় না। খেতে বসে পেটের আগুন নেভানোর সুখও জোটে না – আগে যেমন হতো। তার ফের গ্রামের কথা মনে পড়তে লাগল। কাজে, কাজের ফাঁকে যখন-তখন মনে পড়তে লাগল। বাবার কথা, পা-কাটা বড়ভাইয়ের কথা, আরো আরো অনেকের কথা। এও ভাবতে লাগল, গ্রামের মানুষ শিশি ছাড়া না জানি কী দুর্ভোগে আছে! একবার কি যাবে, গিয়ে দেখে আসবে শিশি না পেয়ে তারা কি সত্যি সত্যি চাবি ঘোরাচ্ছে?
দ্বিতীয় দফায় ইঁদুর হতে মন চায়নি। ধানক্ষেতে পোকা মারার ওষুধের বড়সড়ো বোতল নিয়ে ঘরে ঢোকায় বিপদ। সে ঘরমুখো হয়নি। দিনের কাজ সেরে নিরিবিলি দেখে রাস্তা-লাগোয়া গাছের আড়ালে বসে একটা স্টার ফিল্টার গোড়া পর্যন্ত টেনে বোতলের টাইট ছিপি খুলেছিল। গন্ধটা নাকে টানতে খুব খারাপ লাগেনি। তারপর আর দেরি করেনি, গলায় কতটুকু ঢেলেছিল বলতে পারবে না, বুকে এমন জ্বালাপোড়া শুরু হলো, লুটিয়ে পড়ার আগে ঝাপসা চোখে দেখতে পাচ্ছিল কাত হওয়া বোতলে অনেকখানি রয়ে গেছে। তখন সন্ধ্যা হয় হয়।
এরপর কী হলো, কে বা কারা তাকে এই হাসপাতালে নিয়ে এল, মরে না গিয়ে কতক্ষণ বা কতদিন বেহুঁশ ছিল, জেবুন্নাহারই-বা কী করে খবর পেল, মোনসের কী করে বলবে! হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে হচ্ছিল, ওষুধে কাজ দিয়েছে, ঘোর ঘোর চোখে ছেঁড়াখোঁড়া যা কিছু দেখছিল তাতে নিশ্চিত ছিল কাজ দিয়েছে। সে তার বাপকে দেখতে পাচ্ছিল, বড়ভাইকে পাচ্ছিল, এমনকি মাকেও, আরো আরো অনেককে। আশ্চর্য, লালু ফকির যে এক দানে বউ, দুই ছেলে নিয়ে শিশি খেয়ে পার পেয়ে গিয়েছিল, তাকেও তার গোটা পরিবারসহ দেখতে পাচ্ছিল।
দেখায় যে-মস্ত ভুল ছিল তার বড় প্রমাণ – এই যে লোকটা পেটের ওপর জুতাসুদ্ধ পা তুলে আছে, হাতে আবার কাঁচা বাঁশের লম্বা কঞ্চি। পা তুলেছে বটে, তবে পায়ের পুরো ভর ছাড়েনি, আর এই যে তাকিয়ে আছে তার চোখে – কী দেখছে? চোখভরা বড় এক ফোঁটা পানিতে সে ঝুঁকেপড়া লোকটার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। আর কে এত চিল্লাচ্ছে? মেয়েমানুষের গলা, সে ধরতে পারছে না। কে ও?

Leave a Reply

%d bloggers like this: