শুকনো পাতার গান

লেখক:

বসন্ত রায় চৌধুরী

‘জানি,

হাঁটবে যখন

শুকনো পাতা গাইবে গান

ধৈর্য্যের প্রাণের প্রসাদে জল ও বেলফুলে

লেখা রবে সব

অতিমন্দ্রে মধুতে মন্দিরে ভোরে।’ – বিষ্ণু বিশ্বাস

শুকনো ডালে বসা পাখিটিও কুড়িয়ে পাওয়া ডালপালা দিয়ে তৈরি। পাশেই সবুজ ঘাসের সঙ্গে লতাপাতা জড়ানো। মরা কাঠে প্রাণের স্পন্দন আমাদের আশা জাগায়। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কাজে প্রাণের খোঁজ মেলে। নিবিষ্ট পথের অনুসন্ধানে প্রিয়ভাষিণী শেকড়ের মৌনতায় নিজের গল্প খুঁজে পান। তাঁর কাজে শেকড়ের মাঝে আলোর আবাহন যেমন আছে, আছে মৌনতা, আর্তনাদ, ছন্দ, আনন্দ। তাঁর ভাস্কর্যে আমরা দেখি বাংলার সরল মাটি-মানুষের অবয়ব, মুক্তিযোদ্ধার ক্ষিপ্রগতি, মানুষে মানুষে বন্ধন, প্রকৃতি আর মানুষের সম্মিলন। প্রাণপ্রাচুর্যে উৎসারিত মৃত কাঠের গায়ে গড়ে তোলা ভঙ্গিকে এককথায় বলা চলে প্রিয়ভাষিণীর যাপনমন্ত্রের উৎসারণ।

১৯৯৪ সালে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টসে একক প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁর কাজ দর্শকদের দেখান। কুড়িয়ে পাওয়া গাছের গুঁড়ি, ডালপালার ভেতরে যে-অবয়ব আছে তাঁর কাজে তখন সেটি পাওয়া যায়। ভাস্কর্যের প্রথাগত গড়নের বাইরে নিজস্বতায় সমৃদ্ধ শিল্পকর্মের প্রকাশ হয় তখনই। বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পের অগ্রজ শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের আগে নভেরা আহমেদ ইউরোপীয় শিল্পরচনার ধরনে ভাস্কর্য গড়েন। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তীকালে বিমূর্ত জ্যামিতিক প্রকাশ দেখা যায় নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যে। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী অগ্রজ ওই দুই শিল্পীর চেয়ে ব্যতিক্রমী ও স্বতন্ত্র। প্রিয়ভাষিণী কাঠের গড়নের গায়ে চিন্তা যুক্ত করে নানা অবয়ব তৈরি করেন। কাঠের সঙ্গে গল্প করে নতুন আরেকটি গল্পের জন্ম দেন। নতুন গাছগাছালির সঙ্গে সতেজ সবুজ গাছ-পাতা যুক্ত করেন। কোনো কোনো কাজে গাছকে বড় হতে দেন। একসময় ভাস্কর্যের সঙ্গে সবুজ গাছটি অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে। ভাস্কর্যটি হয়ে যায় গাছের অংশ। পাঠক, প্রিয়ভাষিণী এবারের প্রদর্শনীতে ত্রিমাত্রিক কাঠের অবয়বের বাইরে দ্বিমাত্রিক কিছু শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন লোহা ও টিনের পাত দিয়ে। দ্বিমাত্রিক তলে ‘রাজা হর্ষবর্ধন’ শিরোনামের কাজে পুরনো তামার পাত কেটে রাজার মুখ তৈরি করেছেন। চিত্রতল তৈরি করেছেন বাদামি রঙের টিনের পাতে। মুক্তিযুদ্ধ প্রিয়ভাষিণীর কাজে এক গভীর আবেগ যুক্ত করে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ হাজির করেন। নিমগাছ যেমন আমাদের শুদ্ধ করে, তেমনি শুদ্ধতার অঙ্গীকারে গড়ে-ওঠা স্বাধিকার আন্দোলন নিয়ে নিমের শেকড়ে তৈরি করেছেন ‘বধ্যভূমি একাত্তর’। মুক্তিযুদ্ধের বেদনাভরা মুহূর্তকে মনে করিয়ে দেয় এ-কাজটি। ভালো লাগার সময়কে আড়াল করে চেতনায় জেগে ওঠে ‘স্টপ জেনোসাইড’ কাজটি দেখে। শহিদের আত্মা, রক্ত, আগুন একসঙ্গে দেখা দেয় ‘স্টপ জেনোসাইডে’। ‘অাঁধার মাঝে’ কাজের গায়ে পুরনো গাছের           ক্ষয়ে-যাওয়া আস্তর অন্ধকার তৈরি করেছে। বিস্তৃত ডালপালা একসময় মরে গিয়ে খোলস খসে যায় – এ-শিল্পকর্মটি আমাদের সে-সময়কে মনে করায়। প্রিয়ভাষিণীর কাজের শিরোনামে এক নাটকীয়তা আছে। মোহ তৈরি করা নামকরণে শিল্পকর্মগুলো এক হয়ে যায়। কখনো কবিতার লাইন, কখনো গল্পের কথা নামকরণে যুক্ত করে দেন। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ কাজটি তৈরি করেছেন গুল্মলতা, বাঁশ ও তালের অাঁটি দিয়ে। বাঁশের খন্ডের ভেতরে বড় হয়ে উঠেছে লতাগুল্ম। নগরায়ণের জন্যে উজাড় হচ্ছে পাখির আশ্রয়স্থল ও সবুজ গাছ। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ কাজটি আমাদের সবুজের তৃষ্ণা মেটায়। ‘বাদলধারা হলো সারা’ কিংবা ‘বেলা যে ফুরায়’ কাজগুলো তৈরি করেছেন নারকেলের খোসা আর বটের ডাল দিয়ে। প্রকৃতি আমাদের ছায়া দেয়, আবার শিল্পকর্মের গড়নও দেয়। প্রিয়ভাষিণী প্রকৃতি থেকে গড়ন খুঁজে নিয়ে নিজ সৃজনচিন্তা যুক্ত করেন। প্রতিদিন দেখা শত তুচ্ছের আড়ালে কত আনন্দ-বেদনামিশ্রিত মৌন গল্পের  চরিত্র আছে তা প্রিয়ভাষিণী অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখেন। প্রকৃতির এ-রহস্যের মাঝে নিজে তৈরি করে নেন আরেক ভুবন। ‘যখন গহন রাত্রি’ কাজটি তেমনই এক মুহূর্ত তৈরি করে। খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির গল্প তৈরি হয় ত্রিমাত্রিক কাঠের জানালার ওপাশে দাঁড়ানো কাঠের গুঁড়িতে তৈরি করা মেয়ের অবয়বের সাহায্যে। ‘কেশবিন্যাস’ কাজটিতে সরল বিমূর্ততা তৈরি হয় শিল্পীর জ্ঞাতসারেই। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আমাদের সুন্দর দেখান, আবার কখনো বেদনাকে উসকে দেন। প্রকৃতির কথা বলেন। রহস্যের মাঝে প্রকৃতির আকার-আকৃতিকে অবয়বে রূপ দেন। এই রূপকল্পে শিল্পীর সঙ্গে একসময় দর্শক যুক্ত হয়ে যান। এটিই প্রিয়ভাষিণীর আনন্দ। বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টসে গত ৭ আগস্ট শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হয় ২২ আগস্ট।