‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’

লেখক:

সেলিনা হোসেন

প্যারিসের প্রবাস জীবনে যে-কটি জায়গা রুমানার পছন্দ তার একটি ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের লাইব্রেরিটি। শুধু পুরনো বই নয়, জায়গাটিতেও পুরনো গন্ধ পাওয়া যায়। সরু-চাপা সিঁড়ি বেয়ে লাইব্রেরির দোতলায় উঠলে পাওয়া যায় পুরনো বইয়ের বেশ বড় সংগ্রহ। বসার জায়গা আছে, সোফা কিংবা চেয়ার। সবই রং-ওঠা-বিবর্ণ। পছন্দের বই র‌্যাক থেকে নামিয়ে পড়া যায়। যতক্ষণ খুশি থাকা যায়। তবে বই বাড়িতে নেওয়ার অনুমতি নেই। বইয়ের সারিতে একটি পিয়ানো আছে, যে-কেউ বাজাতে পারে। মাঝে মাঝে তরুণ ছেলেমেয়েরা এসে পিয়ানোর সামনে বসে। যেদিন কেউ পিয়ানো বাজায় সেদিন বইয়ে মন বসে না রুমানার। কান পেতে বাজনা শোনে। সেই মৃদু তরঙ্গধ্বনি ওর ক্যানভাসের রং হয়। শিহাবুলের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ওকে পীড়িত করে। শিহাবুল নিজেও ক্যানভাসের শিল্পী। তারপরও একসঙ্গে থাকা হলো না। রুমানা এই বিষণœ ভাবনা তাড়িয়ে পিয়ানোর তরঙ্গে মনোযোগী হয়। ভাবে, বিয়াল্লিশ বছর ফুরিয়ে গেছে বেঁচে থাকার আয়ু থেকে। দিনযাপনের গণনা শুরু হয়েছিল কত বছর বয়স থেকে? না, মনে করতে চায় না ও। শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোর হিসাব রাখেনি ও। সেটি ছিল তৈরি হওয়ার সময়। একটু একটু করে শেখার বয়স। সে দিনগুলো মনে রাখার আনন্দ অন্যরকম। কখনই দিনগুলো ভোলার কথা মনে হয়নি।
একসময় পটুয়াখালীর আগুনমুখা নদীর পাড়ে বাউল হরিদাস বলেছিল, খুকি বকুল ফুলের মালা গাঁথতে শিখেছ? ও বলেছিল, হ্যাঁ, শিখেছি। তোমার গানে বকুল ফুলের গন্ধ আছে বাউল দাদা। তুমি গন্ধ পাও খুকি? পাই, পাই দাদা। সেই তো কবে সেই বাউল গান গেয়ে নদীর ধার দিয়ে হেঁটে যেত। আর ওর মনে হতো বাউলের পায়ের শব্দ আগুনমুখার স্রোতে মিশে যায়। ওর কাছে গান এবং নদী পাখা মেলে দাঁড়িয়ে-থাকা বিশাল কোকিল, মধুর স্বরে ডেকে যাচ্ছে। সেই আশ্চর্য সময়ে এক নেড়িকুকুর পাশে পাশে হেঁটে যেতে চাইলে তাড়িয়ে দিত ও। বাউল পেছন ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসিতে সৌরভ ছড়িয়ে বলতেন, ওকে ভালোবাসো।
ভালোবাসা? রুমানা কুড়ি বছর বয়সের পরে চোখ কপালে তুলে শব্দটির অর্থ হাতড়ে ফিরেছে। সেই শৈশবে কুকুরকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন একজন বাউল। বলেছিলেন, ওর একটি নাম রাখ। নাম? কী নাম রাখব দাদা? রুমানার মনে হয়েছিল কুকুরের নাম রাখা খুব কঠিন। একটি নাম পাওয়া কি এত সহজ? তারপরও সে-বয়সে নিজে নিজে বলেছিল, ও যদি মাদী কুকুর হয় তাহলে ওকে বকুলফুল ডাকব। আর মরদ কুকুর হলে আগুনমুখা। এভাবেই তো শেখা হলো জীবনের অঙ্ক, ধারাপাত, নামতা, জ্যামিতি Ñ আরো কত কী। ওড়ানো হলো ছাই। খেঁাঁড়া হলো জমিন। দেখা হলো সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া। প্রবল তুষারপাত। মোনালিসা। শিল্পের শহর প্যারিস। যদি হরিদাস বাউল এ-শহরে আসেন, তিনি কি সিন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে শিহাবুলকে ভালোবাসতে বলবেন? যদি তিনি বলেন, রুমানা শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি বুকশপের সামনে দাঁড়িয়ে অনায়াসে সেই বাউলকে বলবে, শিহাবুল এখন আমার কাছে নেড়িকুকুরের চেয়েও খারাপ। আপনি আমাকে কুকুরকে ভালোবাসতে বলবেন না দাদা। এবার আমি আপনার কথা রাখতে পারব না। মানুষ কুকুর হলে তার হিংস্রতার ধার অনেক বেড়ে যায়।
রুমানার সময় এখন খুব নিঃসঙ্গ। তাই ছুটির দিনে এখানে আসাটা ওর কাছে খুব জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। ও মেট্রোতে করে এখানে আসে।
বুকশপের সরু কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। সিঁড়িটি এত সরু যে দুজন পাশাপাশি উঠতে পারে না। নামতেও পারে না। সিঁড়ির সোজাসুজি ঘরটি একটি বসার ঘর। দোতলার ঘরের পুরনো বই বিক্রির জন্য নয়। রুমানার হাসি পায় যখন দেখে বইচোরদের সতর্ক রাখার জন্য গোপন ক্যামেরায় গতিবিধি নজরদারি করা হয়। কারো বই সরানোর সাধ্য নেই। গত কয়েকদিন ধরে পেইন্টিংয়ের ওপর একটি বই পড়ছে রুমানা। বইটি মূলত শিল্পের ইতিহাস। অনেককাল আগের শিল্পীদের জীবনীও আছে। পুরনো সোফার রংজ্বলা কুশনের ওপর বসলে সামনে দরজা। দরজার সঙ্গে একচিলতে বারান্দায় কয়েকটি ফুলের টব আছে। বুকশপের কেউ একজন পানি দেওয়ার দায়িত্বে থাকে। মাঝে মাঝে রুমানার সঙ্গে ওর টুকটাক কথা হয়।
তুমি কেমন আছ ন্যান্সি? তোমার টিউলিপ কবে ফুটবে কিংবা তুমি কি শেক্সপিয়রের নাম শুনেছ?
ও ঠোঁট উলটে চোখ বড় করে রুমানাকে জিজ্ঞেস করে, শেক্সপিয়র কে?
রুমানা উত্তর দিতে আমতা-আমতা করলে ন্যান্সি আবার জিজ্ঞেস করে, লোকটি কে রুমানা?
আমি কি তোমার কাজে দেরি করিয়ে দিচ্ছি ন্যান্সি?
ন্যান্সি হেসে বলে, তুমি অনেক বই পড়ো তো, সেজন্য অনেক কিছু জানো। আমি বই পড়তে ভালোবাসি না। বই পড়তে আমার বিরক্ত লাগে। যাই। বাই রুমানা।
রুমানার এমন অভিজ্ঞতা প্রায়ই হয়। খুব কমই কাউকে পাওয়া যায়, যে বই পড়তে আসে। বেশিরভাগই অবসর কাটাতে আসে এখানে। তাদের মধ্যে রোজমেরি একজন। বয়সী রোজমেরির সঙ্গে রুমানার বন্ধুত্ব হয়েছে। বুকশপের দোতলার দুটি ঘরের একটিতে দুজনে অনেক সময় কাটায়।
রোজমেরির বয়স কত হবে তা ধরতে পারে না রুমানা। তার চেহারা, চলাফেরা ইত্যাদি থেকে ধরে নেয় যে, আশির কাছাকাছি হবে। হয় দু-এক বছর বেশি, নয়তো কম। যে কাপড় পরে, তাতে অনায়াসে মনে করা যায় যে বিত্তশালী পরিবারের সদস্য। আসলে এসব ভাবনার কোনো কারণ নেই। যুক্তিও নেই। শুধু কৌতূহল আছে এবং নিজের একটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার ইচ্ছা আছে। নিজে নিজে যুক্তি দাঁড় করালে তা অনেক সময় অন্যের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খেতে নাও পারে। তাতে কিছু আসে যায় না। এটি এক ধরনের মানসিক বিনোদন, রুমানা তাই মনে করে।
রোজমেরি দুটো পোষা কুকুর নিয়ে বুকশপে আসে। একটিকে গলার বেল্ট ধরে নিয়ে আসে। অন্যটিকে একটি ব্যাগে ভরে আনে। সেটি অবশ্যই একটি ছানা-কুকুর। সাদা ধবধবে লোমে ভরা বাচ্চাটিকে ছেড়ে দিলে ব্যাগের ওপর জুত করে বসে সেটি চারদিকে তাকায়। এবং কারো দিকে তাকিয়ে নয়, নিজে নিজেই ছোট ঘরে ‘ঘেউ’ শব্দ ছড়িয়ে দেয়। দোতলায় বসে থাকা আরো দু-চারজন ঘাড় তুলে ওর দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। রুমানা ধরে নেয়, সবাই ঘেউ শব্দটি উপভোগ করেছে। এভাবে কখনো এমন সঙ্গতিপূর্ণ বিষয় তৈরি হয়, যা মানুষের ভালো বা মন্দ লাগার ক্ষেত্র তৈরি করে। যেমন শিহাবুলের হাসিতে খ্যাক ধ্বনি ছিল। ওই শব্দটি শুনলে শরীর হিম হয়ে যেত। ও অনেকদিন শিহাবুলকে বলেছে, এমন শব্দ না করে থাকতে পারো না?
শিহাবুল কঠিন স্বরে বলত, না। হাসির সঙ্গে ওই শব্দ স্বাভাবিক শব্দ। তোমার শুনতে ভালো না লাগতে পারে। তাতে আমার কিছু আসে যায় না।
এভাবে বললে?
বললাম তো। দু’কান ভরেই শুনলে।
বিয়ের আগে ভালোবাসার এই শর্ত ছিল?
কী শর্ত?
কারণ ছাড়াই আঘাত করে কথা বলা।
তুমি আমার একটি স্বাভাবিক আচরণ অপছন্দ করেছ।
কিছু বলতে পারব না?
না, পারবে না।
শিহাবুল চিৎকার করে দমিয়ে দিত। আর রুমানার মনে হতো, শৈশবে দেখা নেড়িকুকুরের লোম ঝরে যাওয়া পিঠে সেঁটে যাচ্ছে শিহাবুলের শব্দ। আস্তে আস্তে সেটি একটি বিশাল ক্ষত হয়। সেখানে আর প্রেম থাকে না।
বুকশপে বসে এমন ভাবনা ভাবলে রুমানার ভেতরে নানা ধরনের স্মৃতি আছড়ায়। ও নিঃসঙ্গতার তুষারপাত থেকে বের হয়ে রৌদ্রস্নাত দিনে ঢুকতে পারে। তখন গমগম করে শিহাবুলের কণ্ঠস্বর Ñ ভুলে যেও না যে আমার স্কলারশিপ নিয়ে প্যারিসে আসা হয়েছিল বলে, এমন একটি শহরে প্রবাসী হওয়ার ভাগ্য তোমার হয়েছিল।
ও তখন মনেপ্রাণে আঁকড়ে ধরে শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি নামের বইয়ের দোকান গড়ে ওঠার ইতিহাস। আঁকড়ে ধরে শত শত ইঁদুরের চলাফেরা। সেই পায়ের শব্দ শিহাবুলের কণ্ঠস্বর হয়ে রুমানার স্মৃতি খামচে ধরে, তোমার কোনো যোগ্যতা ছিল না স্কলারশিপ পাওয়ার। এখন এসেছ পিকাসোর শহর প্যারিসে। আমি তোমার জীবনে থাকি আর না থাকি, প্যারিস শহর তোমার জীবনে থাকল। মনে করো এটাই আমার প্রেম। বড় জায়গা তৈরি করে দেওয়ার প্রেম।
প্রেম নাকি প্রেমের ক্ষত?
সেই অদ্ভুত শব্দ করে হাসে শিহাবুল। হাসি যেন ধ্বনিত হয় লাইব্রেরির দোতলার চার দেয়ালে। রুমানা শুনতে পায় রোজমেরির কণ্ঠ : অনেককাল আগে সিন নদীর পাড়ে একটি বড়সড় নর্দমা ছিল এ-জায়গায়। এ নর্দমার মধ্যে বাস করত শত শত ইঁদুর। এর পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটি ছিল ভাঙাচোরা, এবড়ো-খেবড়ো। লোকেরা এ-রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় নাকে রুমাল চাপা দিত। নর্দমা থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধ ভারী করে রাখত বাতাস। ইঁদুরগুলো প্রায় সারাক্ষণই খাবারের খোঁজে দৌড়ে বেড়াত। মোচের দাঁড়া উঁচিয়ে থমকে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটি ছিল দারুণ। ভীষণ ভালো লাগা তৈরি করত। পথচারীরা দাঁড়িয়ে বলত, দেখ দেখ কেমন রাজকীয় ভঙ্গি, যেন রাজার মেয়েকে বিয়ে করতে যাওয়ার আগের মুহূর্ত এখন ওর।
অন্যজন ওকে ঠেলা দিয়ে বলত, ও খাবার খুঁজতে বেরিয়েছে। পেটে খিদে লেগে আছে। তুই শালা ওর মধ্যে নিজের আখের দেখতে চাস।
বিষণœমুখে তাকায় অন্যজন। মাথা নাড়ে। উত্তর দিতে পারে না। উত্তর দেওয়ার ভাষা ওর নেই। বোকার মতো বলে, সিন নদীর জল ছুঁয়ে বাতাস ভেসে আসছে। কোথাও থেকে কেউ হাসতে হাসতে বলছে, বাতাস দিয়ে কী হবে? খাবার চাই।
নর্দমার অপরদিকের মদের দোকানে মাতালদের আড্ডা জমে উঠেছে। খালি বোতলগুলো কেউ কেউ ছুড়ে দিয়েছে নর্দমায়। লন্ড্রিতে কাজ করা ছেলেটি বিষণœমুখে বসে আছে। কেউ নোংরা কাপড় দিতে আসেনি কিংবা কেউ ধোয়া কাপড় নিতে আসেনি। একসময় রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। মাতালরা খিস্তি-খেউড় আওড়ায়। আর উজাড় করে ফেলে মদের বোতল।
রোজমেরি হাই তোলে।
রুমানা জিজ্ঞেস করে, তোমার ঘুম পাচ্ছে মেরি?
বোধহয় পাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে আমি বছরকয়েক ঘুমাইনি।
তুমি কি টায়ার্ড?
যে বুড়ি দুটো কুকুর নিয়ে শেক্সপিয়র লাইব্রেরিতে আসে, সে টায়ার্ড হয় না। তুমি আমাকে বাজে প্রশ্ন করবে না রুমানা।
ও, তাই তো। আমি তো জানি তুমি তোমার কিশোর বয়সে এ-বুকশপটি হয়ে উঠতে দেখেছ।
হ্যাঁ, দেখেছি।
হাসিতে চঞ্চল হয়ে ওঠে রোজমেরি। ওর কুঁচকে-থাকা ত্বকে সোনালি আলোর ঝিলিক। যেন বলতে চায়, এখনই আমার সেই কিশোরবেলা। এখন আমি চৌদ্দ পার হয়ে পনেরোয় পা রেখেছি। আমার ষোলোতম জন্মদিনে আমি প্রথম এই নদীর পাড়ে আসি। তখনই আমার সঙ্গে পিয়েরের জমজমাট বন্ধুত্ব হয়েছিল। ও একদিন আমাকে বলেছিল, তুমি যদি সিন নদী হও, তবে আমি এই নদীতে ডুবে মরব। নদী আমার প্রেমের সাক্ষী হবে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি ডুবতে চাও কেন? ও বলেছিল, এই ডুবে থাকা আমার প্রেমের নদীতে। প্রেম থাকবে শুধু তোমার সঙ্গে। এই সময়ের পরে তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা নাও হতে পারে। আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, পিয়েরে তুমি খুব কঠিন বালকের মতো কথা বলছ। ও হেসে বলেছিল, প্রেম তো কঠিনই। ওটা কি সহজ নাকি? বোকারা প্রেমকে সহজ ভাবে। আমি ভাবি না। আমি আবারো অবাক হয়ে বলেছিলাম, তুমি এটুকু বয়সে এত কথা কী করে বুঝলে পিয়েরে? ও কেমন বিষণœ হয়ে গেল। মনে হলো ওর দুচোখে সিন নদীর সবটুকু জমে আছে। নদীর পাড়ে নটর ডেমে চার্চের চূড়া। আমার খুব ভালো লাগছিল ওকে দেখতে। ভয় করছিল। খুব ইচ্ছে করেছিল ওর দুহাত ধরতে। পারিনি। আবারো জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে একই প্রশ্ন। ও বলেছিল, ঈশ্বর আমাকে বোঝার শক্তি দিয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর সময় মা আমার দুহাত ধরে বলেছিলেন, তুমি আমার একমাত্র সন্তান। তোমার ভালোবাসা নিয়েই আমি স্বর্গে বাস করব। মনে রেখো, ঈশ্বর মানুষকে ভালোবাসার শক্তি দেন। বোঝার শক্তি দেন। তুমি তোমার বোঝার শক্তি দিয়ে প্রেম বুঝবে, মাই চাইল্ড। মায়ের মৃত্যুর পরে আমি অনেক কিছু বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি খুব একা একা বড় হয়েছি রোজমেরি।
এটুকু বলে রোজমেরি চুপ করে থাকে। রুমানা কোনো প্রশ্ন করে না। দেখতে পায় ওর দুই পেট ঘরের এখানে-সেখানে বেড়াচ্ছে। ছোটটি ফিরে এসে রোজমেরির কোলে উঠে বসে। বুড়ি ওর গায়ে হাত বোলায়। রুমানা জানে, বুড়ি ওর নাম রেখেছে শেক্সপিয়র। আর বড়টির নাম সিন রিভার।
রুমানা হাসতে হাসতে বলেছিল, কুকুরের নাম শেক্সপিয়র রাখা কি ঠিক হয়েছে?
রোজমেরি কণ্ঠে বিদ্রƒপ ছড়িয়ে বলেছিল, তোমার চিন্তা খুব ট্র্যাডিশনাল, রুমানা। তোমাকে আরো মডার্ন হতে হবে। শোনো, ওর নাম আমি পিয়েরে রাখতে চেয়েছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম, ওকে অন্যরা পিয়েরে ডাকলে তা আমাকে আহত করবে। ওই নাম আমার নিজের জন্য থাকুক।
তুমিও এখানে ট্র্যাডিশনাল। আমি হলে শেক্সপিয়র না রেখে পিয়েরে রাখতাম।
রোজমেরি খেঁকিয়ে উঠে বলে, চুপ করো। তুমি আমার বুকের ভেতর হাত ঢুকিও না। শেক্সপিয়র নাট্যকার। আমি তাঁর নাটক পড়ি এবং তাঁর অভিনয় দেখি। শেক্সপিয়র আমার প্রেমের নাম নয়।
তুমি রেগে যাচ্ছ কেন?
রোজমেরি চুপ করে থাকে। রুমানা বুঝে যায় যে, ও আর কথা বলবে না। একটু পরে দেখতে পায় শেক্সপিয়রকে ও ব্যাগে ঢুকিয়েছে। ভেতর থেকে কুঁইকুঁই শব্দ আসছে। রুমানার মনে হয় দুই কুকুরের ঝগড়া Ñ একজন বলছে, ওই শালা কুত্তার বাচ্চা। কাকে গালি দিলি? আমাকে? হ্যাঁ। কেন? কারণ বুড়িটা তোকে যতœ করে। তোর গায়ে আঁচড় লাগলে চেঁচায়। তুই কুঁইকুঁই করলে ছুটে যায় তোর কাছে। তাতে তোর কী? আমার জ্বালা বাড়ে। বাড়–ক, শালা শয়তান একটা। ওই মুখ খিস্তি করবি না। করব, একশবার করব।
রুমানা শুনতে পায় রোজমেরির খেঁকানি স্বর, সিন রিভার, এদিকে আয়। বাড়ি যাব আমরা।
বড় কুকুরটি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে বুড়ির পায়ের কাছে দাঁড়ায়। বুড়ি ওর কলার চেপে ধরে প্রথমে, তারপর সেটা ছেড়ে দিয়ে বেল্টের মাথা হাতে নেয়। রুমানার দিকে তাকিয়ে ভুরু উঁচিয়ে বলে, যাবে না?
রুমানা মাথা নেড়ে বলে, পরে যাব।
বুড়ি বের হতে হতে বলে, এনজয় ইওর টাইম।
ও হাত তুলে মৃদু হেসে বলে, বাই। সিঁড়িতে রোজমেরির পায়ের শব্দ শুনতে পায় ও। তখন ওর নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হয়। ভাবে, নিজের সঙ্গে আর বুঝি জুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে বুক শূন্য হয়ে যায়। এটা শারীরিক অসুস্থতা, নাকি মানসিক সংকট? অসুস্থতা কী তা বোঝার সাধ্য ওর হয় না।
শুধু এটুকু বুঝতে পারে যে, বেঁচে থাকার সুতোটা হাজার হাজার নাটাইয়ে পেঁচাতেই থাকে। ওটা থেকে মুক্তি নেই। মুক্তি? শব্দটি কী দিয়ে তৈরি? সোফার পেছনে মাথা হেলায় রুমানা। তখন দুটি তরুণ ছেলেমেয়ে ঘরে ঢোকে। ছেলেটি পিয়ানোর সামনে গিয়ে বসে। মেয়েটি ওর পাশে ঘাড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বেজে ওঠে সুর। ঘরজুড়ে আশ্চর্য মূর্ছনা ছড়ায়। রুমানা মগ্ন হয়ে যায়। দু’কান পেতে শোনে।
একসময় লাইব্রেরির কেয়ারটেকার ওকে ডাকে – ম্যাডাম, উঠুন।
আমি তো বাড়ি যেতে চাই না পাসকাল।
আমি লাইব্রেরি বন্ধ করব। আপনাকে উঠতে হবে।
স্যরি পাসকাল। আমি উঠছি।
রুমানা ধীরপায়ে নামে। ছোট সিঁড়িটিকে খুব আন্তরিক মনে হয়। যেন কতকাল আগের শৈশব, যেখানে সিঁড়ি ও ইঁদুরের গল্প ছিল। সিঁড়ি বেয়ে ইঁদুরের নেমে আসার গল্পটি দাদি মায়াবী কণ্ঠস্বরে বলতেন। ইঁদুরের দল কীভাবে ক্ষেতে গর্ত করে ধান সঞ্চয় করত সে-গল্প বলতেন তিনি। সেইসঙ্গে গল্পে যোগ করতেন ধানকুড়ানি মেয়েদের গল্প। সেসব গল্প এখনো ছবির মতো সেঁটে আছে বুকের দেয়ালে। রুমানা বুকশপের বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সিন নদীর ওপর থেকে ভেসে আসা বাতাস স্পর্শ করে ওকে। ও মেট্রো রেল স্টেশনের দিকে না গিয়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকে। বেশ লাগছে হাঁটতে। বুকের ভেতরের শূন্যতা কমে এসেছে। যেন বাতাস ওকে আড়াল করে দিয়েছে। ও ঘুরে দাঁড়ালে দেখতে পায় শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। ও আবার সেখানে আসে। লাইব্রেরির সামনে পেতে রাখা বেঞ্চে বসে। মাথার ওপরের গাছটিতে সুন্দর ফুল ফোটে। ও নাম জানে না। এখন রাস্তার আলোয়  দাঁড়িয়ে-থাকা গাছটিকে রহস্যময় মনে হয় এ-কারণে যে. যেন ইঁদুরেরা নর্দমা থেকে বেরিয়ে এসে গাছের নিচে হুটোপুটি করতে করতে বলছে, একদিন এখানে শেক্সপিয়র এসে দাঁড়াবে আর ওর প্রেমিকা বাংলাদেশের মেয়ে রুমানা তাকে বলবে, তোমাকে আমি যুগ যুগ ধরে ভালোবাসি শেক্সপিয়র। চলো সিন নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ল্যুভ মিউজিয়ামে যাই। তুমি আমাকে মোনালিসা ডাকো।
এমন ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণখোলা হাসিতে মেতে ওঠে রুমানা। তারপর মেট্রো রেল ধরে বাড়ি ফেরার জন্য স্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকে। নানা ব্যস্ততায় মাসখানেকের মধ্যে শেক্সপিয়রে যাওয়া হয় না রুমানার। রোজমেরি একদিন ফোন করে।
তোমাকে দেখছি না কেন রুমানা? তোমাকে না দেখে আমার দুটো ডগই মন খারাপ করে। এখানে এসে চুপচাপ বসে থাকে। তোমাকে দেখে যেমন উৎফুল্ল হয়, তেমন আর হয় না।
রুমানা মৃদু হেসে বলে, খুবই ব্যস্ত আছি। আগামী উইকেন্ডে আসব। স্যাটারডেতে। তুমি আসবে মেরি?
শিওর। রোজমেরির কণ্ঠ উৎফুল্ল শোনায়।
রুমানা ফোন বন্ধ করতে করতে ভাবে, বুড়িটা আনন্দে থাকার কৌশল জানে। ওর ভেতরে আনন্দের খনি আছে। সে উৎস কখনো ফুরোয় না। কমে এলে কোনো অদৃশ্য শক্তি সে-জায়গা পূরণ করে দেয়। রুমানা রোজমেরির সঙ্গে পরিচয়ের পুরো সময় খতিয়ে দেখে ভাবল, বুড়ির বেঁচে থাকার কিছু একটা উৎস আছে। ও তিন ছেলেমেয়ের মা। এক একজন ইউরোপের এক এক দেশে থাকে। ফ্লোরেন্স, বার্লিন ও জেনেভায় থাকে দুই ছেলে এক মেয়ে। বুড়ি প্রায় ওদের কাছে বেড়াতে যায়। পাঁচটা নাতি-নাতনি আছে। স্বামী মারা গেছে সাত-আট বছর আগে। প্যারিসের বাইরে থেকে বোনের একটি মেয়ে প্রায়ই বুড়ির কাছে এসে থাকে। দুজনের বেশ আন্তরিক সম্পর্ক। কোনো একটি সূত্র ধরে মেয়েটি বুড়ির সঙ্গে দুষ্টুমি করে, তখন বুড়ির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যেন অপার্থিব আলো সেখানে ভর করে। মানুষ কখনো কখনো এভাবে অন্যরকম হয়। মানুষের ভেতরের প্রকাশ ঘটলে তার সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণ ঘটে, তাকে তখন মায়াবী আলোয় দেখা হয়। রুমানার আকস্মিকভাবে মনে হয় ওর নিজের এমন কোনো সঞ্চয় নেই। ওর ভাঁড়ার শূন্য। বিষাদ ওকে আচ্ছন্ন করলে ও রান্নাঘরে এসে ফ্রিজ খোলে। ঠান্ডা পানি খায়। চিজ মুখে পোরে। একবাটি ভাত আছে। বের করে মাইক্রো-ওভেনে দেয়। তারপর ডিম ভাজি করে খেতে বসে। খাওয়া শেষ করতে পারে না। রোজমেরি একটি দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছে। স্বামী ছিল,           সন্তান আছে। জীবনযাপনের আবশ্যিক উপকরণের সবটুকু ওর ছিল। রুমানার তা নেই। শিহাবুলের সঙ্গে পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে বাচ্চা হয়নি। এমন ছিল না যে ওরা চায়নি। কেন হয়নি এ প্রশ্ন তখন পর্যন্ত ওকে ভাবায়নি। নিজের ক্যারিয়ার গড়া প্রধান ছিল। এখন ভাটা পড়েছে সময়ে। ভাটির টান বড় বেশি তীব্র। রুমানা প্লেটভর্তি ভাত বেসিনে রেখে ড্রইংরুমে আসে। টেলিভিশন ছেড়ে বসে থাকে। ভাবে, এভাবে রাত শেষ হোক। সারারাত বসে থেকেও কাল ভোরে কাজে যেতে পারবে ঠিকই। ও তাকিয়ে থাকে টেলিভিশনের পর্দায়, কিন্তু সেটাকে সাদাই মনে হয়। কোনো ছবি নেই সেখানে। এভাবে রুমানার সময় প্রায়শ উলটেপালটে যায়। ও নিজের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। এই ফাঁকটুকু কেন তা ওর বোধের মধ্যে আসে না। একদিন রোজমেরিকে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার কি কখনো এমন শূন্য সময় আসে মেরি?
রোজমেরি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছিল, শূন্য সময় কী?
চারদিকের সবকিছু সাদা হয়ে যাওয়া।
হি-হি হাসিতে ভেঙে পড়েছিল রোজমেরি। হাসি শেষ হলে নিজের কোলের ওপর রাখা বই পড়ায় মনোযোগী হয়েছিল। সেদিন রুমানার সঙ্গে আর কথা বলেনি। রোজমেরির সেদিনের আচরণ এখন পর্যন্ত প্রবল রহস্য রুমানার কাছে। ওর ধারণা, রোজমেরি একদিন এই রহস্যের আড়াল ভেঙে দেবে। হয়তো সময় নিচ্ছে। এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে রুমানার অবসাদ কেটে যায়। ও টেলিভিশন বন্ধ করে বিছানায় যায়। দিন পনেরো পরে এক উইকেন্ডে দেখা হয় রোজমেরির সঙ্গে। তাকে কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তার সঙ্গে কুকুর দুটি নেই। রুমানাকে দেখে হাত উঁচিয়ে বলে, হাই।
তুমি কেমন আছ মেরি?
শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
তোমার পেট দুটি?
বাড়িতে রেখে এসেছি। ছোট ছেলে এসেছে। ওর বাচ্চারা শেক্সপিয়রকে নিয়ে খেলছে। আমাকে আনতে দিলো না। আর তুমি তো জানো আমি এখানে না আসতে পারলে শান্তি পাই না।
আমি জানি মেরি।
আজ আমি তোমার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। বই পড়তে না। আর কেউ যদি এসে পিয়ানো বাজায় তাহলে দারুণ হবে রুমানা।
চলো আমরা ব্যালকনিতে গিয়ে বসি। আমাদের গল্পের সঙ্গে সিন নদী থাকবে। নদীর বোটগুলো থাকবে। নদীর ওপরের ব্রিজ, ওপারের নটর ডেম চার্চ…
থাক আর বলো না। আমি এতকিছু চাই না। শুধু নদীটা চাই। সেইসঙ্গে থাকবে শুধু আমার প্রেম।
প্রেম?
হ্যাঁ, আমার পিয়েরে। তুমি আমার হাতটা ধরো রুমানা। আমি উঠে দাঁড়াই।
এসো।
দুজনে ব্যালকনিতে এলে দেখতে পায় চারদিকে অদ্ভুত আলোর ছায়া। রুমানা অস্ফুট স্বরে বলে, ইস কি সুন্দর!
প্রেমের আলো এমনই রুমানা।
রোজমেরির মুখ উজ্জ্বল হয়।
আজকে কি তুমি কাউকে স্মরণ করছ মেরি?
এই প্রেম শুধু স্মরণ করার ব্যাপার নয়। ভেতরজুড়ে সারাক্ষণ থাকে।
তুমি কি পিয়েরের কথা বলবে?
ও আমার প্রেমের সঞ্চয়। সবকিছু একপাশে, আর ও অন্য পাশে। তোমার জীবনে প্রেমের সঞ্চয় নেই রুমানা?
রুমানা চুপ করে থাকে। না, রোজমেরির মতো প্রেমের সঞ্চয় ওর জীবনে নেই। রোজমেরি যে গভীরভাবে পিয়েরকে স্মরণ করে, এমন স্মরণের মানুষ তো ওর নেই। কোনোদিন এমন অপরূপ আলো ওর প্রেমের সঞ্চয় থেকে বেরিয়ে আসবে না, যেদিকে তাকিয়ে ও নিজেকে বলবে, বেঁচে থাকার আশ্চর্য শক্তি অজন্তার গুহাগাত্রে চিত্রিত শিল্প। মানুষ তার আপন নিয়মে আঁকে – সময়কে অতিক্রম করে রয়ে যায় সেই শিল্পের রশ্মি। যে-রশ্মির দিকে তাকিয়ে রোজমেরি গড়ে তোলে প্রতিদিনের গুহাচিত্র। তাই ওর সামনে কোনো বর্ণহীন দিন নেই।
রোজমেরি ঘুরে তাকিয়ে বলে, তোমার হাত ধরে নদীর ধারে যাব রুমানা।
চলো যাই।
দুজনে লাইব্রেরির বাইরে এসে দাঁড়ায়। হাত ধরে সামনের রাস্তা পার হয়। রোজমেরি এক মুহূর্ত দাঁড়ায়। শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি বইয়ের দোকানের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলে, পিয়েরে এ-দোকানটি দেখেনি। একদিন এখানে ইঁদুরেরা দৌড়াদৌড়ি করতো। শত শত ইঁদুর বাস করত নর্দমাটাকে ঘিরে। মাতালেরা হল্লা করত দিনে-রাতে। মেয়েরাও আসত ইচ্ছেমতো মদ খেতে। এখানকার ক্যাফে দ্য অ্যামেচারে সস্তায় মদ পাওয়া যেত। শুধু নদীটি ছিল আমার আর পিয়েরের। আমরা মাত্র কয়েকদিন নদীর ধারে হেঁটেছিলাম। পিয়েরের কাছে শুনেছিলাম ভালোবাসার কথা। শুনেছিলাম ওর হারিয়ে যাওয়ার কথা। বলেছিল, আমি লেখক হতে চাই। শেক্সপিয়রের মতো নাট্যকার। তাঁর নাটকগুলো মা আমাকে পড়াতেন। আমিও খুব পছন্দ করেছিলাম সেসব নাটক।
একসময় কথা বন্ধ করে রোজমেরি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি বলি, চলো যাই।
এই লাইব্রেরিতে পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত লেখক আড্ডা দিতেন। আমি দেখেছি তাঁদের অনেককে। আমেরিকান লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আমার প্রিয় লেখক ছিলেন। তিনি আসতেন এখানে। তাঁর অ্যা মুভেবল ফিসট স্মৃতিকথায় সিন নদীর জেলেদের কথা আছে। জেলেরা রাতদিন মাছ ধরত।
এটুকু বলে রোজমেরি মৃদু হাসে। তাঁর ফোকলা মুখে রোদের ছায়া পড়ে যেন। দূরের দিকে তাকিয়ে বলে, এখানে কবি এজরা পাউন্ড আসতেন। ঔপন্যাসিক জেমস জয়েসকে আমি দেখেছি। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসের নাম কি তুমি জানো?
রুমানা দ্রুতকণ্ঠে বলে, হ্যাঁ জানি। ইউলিসিস।
উপন্যাসের নাম জানার ক্রেডিট ও রোজমেরিকে দিতে চায়নি। উপন্যাসটি ও অনেক সময় নিয়ে পড়েছে।
রোজমেরি ওর দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে বলে, থ্যাঙ্কু রুমানা।
এই লাইব্রেরিতে তুমি আর কাকে দেখেছ মেরি?
গারট্রুড স্টাইন আসতেন। স্কট ফিটজেরাল্ডও আসতেন।
তুমি খুব ভাগ্যবতী। এত বিখ্যাত লেখকদের দেখেছ। এখন তেমন কেউ আসে না।
ইয়াং লেখকরা কোনো একদিন বড় লেখক হবেন, কে হবেন তা আমরা জানি না রুমানা।
তা ঠিক। পিয়েরে কি লেখক হয়েছিল মেরি?
আমি জানি না। ওর জন্যই তো আমি এই লাইব্রেরিতে এসে বসে থাকি। ভাবি, একদিন নিশ্চয়ই এই লাইব্রেরিতে আড্ডা দিতে আসবে। লাইব্রেরিতে তখন অন্যরা ওকে নিয়ে মেতে উঠবে। কেউ কেউ বলবে, দেখো দেখো বিখ্যাত নাট্যকার পিয়েরে জাঁ এসেছে। বুড়িয়ে যাওয়া পিয়েরেকে তো আমি চিনতে পারব না। ওর নাম শুনে বুঝব এই লেখকই পিয়েরে।
সত্যি যদি তেমন ঘটনা হয়, তখন তুমি কী করবে?
দূর থেকে ওকে শুধুই দেখব।
কাছে যাবে না?
না। আমার কাছে তো ওর প্রেমের সঞ্চয় আছে। আর সেই বয়সটা কৈশোরের। মায়ের মৃত্যুর পরে যে একটি নিঃসঙ্গ বালক ছিল।
রুমানা দেখতে পায় রোজমেরি দুহাতে চোখ মুছছে। রুমানার দিকে তাকিয়ে বলে, এই সময় সিন নদীতে শত শত জেলে মাছ ধরত। এখন এই নদীতে সি ক্রুজারের ভিড়। লোকেরা এই যানে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। আমি আর পিয়েরে জেলেদের সঙ্গে মাছধরা দেখতে গিয়েছিলাম। আমি তোমাকে নিয়ে এখানে এসেছি কেন রুমানা?
বেড়াতে। রুমানা হেসে বলে।
না, শুধু বেড়াতে না। আমি পানিতে হাত ডোবানোর জন্য একদম নদীর ধারে যাব। তোমার কাছ থেকে সাপোর্ট চাই। একা তো যেতে পারব না।
চলো। রুমানা রোজমেরির হাত ধরে এগিয়ে যায়। আস্তে করে জিজ্ঞেস করে, আজ বোধহয় তোমার কোনো স্মরণীয় দিন?
হ্যাঁ। আর কিছু জিজ্ঞেস করো না।
দুজনে অনেকক্ষণ নদীর কিনারে বসে থেকে ফিরে আসে। রাস্তা পার হয়ে লাইব্রেরির সামনে আসে।
তুমি কি আবার লাইব্রেরিতে ঢুকবে মেরি?
হ্যাঁ। চলো। তোমার কাজ নেই তো রুমানা?
না, আজ আমি তোমার সঙ্গে থাকব। যতক্ষণ তুমি থাকবে ততক্ষণ।
রোজমেরির মুখ হাসিতে ভরে যায়। রুমানার মনে হয় এখন ওকে বিষণœ দেখাচ্ছে না, কিংবা ক্লান্তও। সিঁড়িতে পা রাখতেই দুজনে শুনতে পায় ওপরের ঘরে কেউ একজন পিয়ানো বাজাচ্ছে। রোজমেরি শক্ত করে রুমানার হাত চেপে ধরে। জোরে শ্বাস টেনে বলে, পুরনো বইয়ের ঘ্রাণ নিচ্ছি। ওহ, জীবনটা কত সুন্দর। একদিন পিয়েরে আমাকে বলেছিল, ও মিউজিক অ্যান্ড বুক ভালোবাসে। আমি এই লাইব্রেরিতে বসে বুঝেছি এ দুটো বিষয়কে ভালোবাসতে শিখলে বেঁচে থাকা সহজ হয়। জানো রুমানা, আমি অনেকদিন ভেবেছি, এখানেই যেন আমার মৃত্যু হয়। যখন এখানে বসে থাকব মৃত্যু যেন নিঃশব্দে আমার ভেতরে প্রবেশ করে। আস্তে করে যেন আটকে দেয় আমার হার্টের দরজা।
তারপর শব্দ করে হেসে ওপরে ওঠার জন্য সিঁড়িতে পা রাখে। ছেড়ে দেয় রুমানার হাত। কারণ দুজন মানুষ পাশাপাশি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারে না। আর রুমানা ভাবে, বুড়ি এখন একাই যাবে। রুমানাকে বুড়ির আর দরকার নেই। ও আর ওপরে ওঠে না। ঘরে ফেরার জন্য বাইরে আসে।
এরপর রুমানা সামারে বাংলাদেশে আসে এক মাসের জন্য। নিজ দেশে বেড়িয়ে বেশ ফুরফুরে মনে প্যারিসে ফেরে ও। এরও দিন-পনেরো পরে লাইব্রেরিতে আসে। ঘরে ঢোকার মুখে রিসেপশন। ওখানে ন্যান্সির সঙ্গে দেখা হয়। ও বিভিন্ন জায়গায় রাখা ফুলগাছে পানি দিচ্ছিল। ওকে দেখে বলে, তুমি কেমন আছ রুমানা? কবে ফিরলে দেশ থেকে?
দুই সপ্তাহ আগে। তুমি ভালো আছ ন্যান্সি?
আমি ভালো আছি। তবে মন খারাপ। তোমার ফ্রেন্ড রোজমেরি মারা গেছে।
ওহ্ রোজমেরি। কবে ঘটনা ঘটল?
লাস্ট উইকে। এই লাইব্রেরিতেই।
ওহ্ গড, রুমানার কণ্ঠে মৃদু আর্তনাদ ধ্বনিত হয়।
কোথায় বসেছিল মেরি?
ওর প্রিয় জায়গায়।
পিয়ানোর পাশের ডান দিকের সোফায়?
হ্যাঁ। ওর মাথাটা পেছনে হেলানো ছিল। কোলে বই ছিল শেক্সপিয়রের ওথেলো। মেরির পেট দুটো ওর পায়ের কাছে বসে খুব কাঁদছিল। ওদের কান্না শুনে আমি এগিয়ে যাই। তারপর অন্যদের ডেকে আনি।
রুমানার মুখের দিকে তাকিয়ে ন্যান্সি বলে, আমি জানি তুমি খুব দুঃখ পেয়েছ।
রুমানা ন্যান্সির দুহাত জড়িয়ে ধরে বলে, মেরি এই মৃত্যুটিই চেয়েছিল। ও পৃথিবীর একজন সুখী মানুষ।