সন্ত্রাসবাদ, নীতিবোধ এবং কামুর একটি নাটক

লেখক:

অংকুর সাহা
‘Truth, like light, is blinding. Lies, on the other hand, are a beautiful dusk, which enhances the value of each object.’- আলব্যের কামু, ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত পতন উপন্যাস থেকে।

বেশ কয়েক বছর আগে এ-কাহিনিটি আমায় বলেছিলেন সম্প্রতি প্রয়াত এক রুশ সহকর্মী। তিনি শুনেছিলেন তাঁর শৈশবে, এক স্নেহশীল রুশ শিক্ষকের মুখে। কথিত আছে, মহান রুশ লেখক ফিওদর দস্তয়েভস্কির (১৮২১-৮১) জীবনের শেষ দশকে তাঁর স্বপ্নে নাকি দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং ঈশ্বর! প্রথাসিদ্ধ ধার্মিক না হলেও শুদ্ধ জীবনযাপনে বিশ্বাসী লেখকের মননে অবশ্যই ছায়া ফেলবে ঈশ্বরের অনুযোগ। কল্পনা করে নেওয়া যাক তাঁদের কথোপকথন। ব্যথিত ঈশ্বর বলেন, ‘বাছা ফিওদর, মাত্র ছদিনে আমি সৃষ্টি করেছি এই বিশ্বচরাচর – তার মধ্যে কিছু ভুল-ত্রুটি থেকে যেতেই পারে; আর তুই কিনা সারাজীবন ধরে লিখে গেলি কেবল পাপী-তাপী-খুনি-অপরাধীর গপ্পো! কেন আমার সৃষ্টিতে কোথাও কি সৎ, সুন্দর, ধার্মিক মানুষ নেই, যারা সৎভাবে জীবন যাপন করে?’ ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করেন প্রৌঢ় লেখক, ‘হ্যাঁ প্রভু, ভীষণ ভুল হয়ে গেছে, লিখবো, অবশ্যই লিখবো।’ ঘুম ভেঙেই তিনি লিখতে বসেন নতুন উপন্যাস – যদিও শেষ করতে লেগে যায় অনেক বছর, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে সমাপ্ত হয় তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস – বারো খণ্ডে বিভক্ত, প্রায় আটশো পৃষ্ঠার মহাগ্রন্থ – কারামাজভ ভাইয়েরা।
‘ন্যায়-অন্যায় জানিনে, জানিনে, জানিনে,…’ – কিন্তু কবি-লেখক-দার্শনিককে জানতেই হয় ন্যায় আর অন্যায়ের মধ্যেকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক – ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রোথিত এবং মানবিক ভাবনায় সম্পৃক্ত তাঁদের নীতিবোধ, মানবসমাজে অশুভের অমোঘ উপস্থিতি স্বীকার করে নিয়েও তাঁরা লাল খড়ির গণ্ডি টেনে আলাদা করে রাখেন সততা ও ন্যায়নিষ্ঠাকে। কারামাজভ ভাইয়েরা ষড়যন্ত্র করেন তাঁদের নির্মম, হৃদয়হীন, অত্যাচারী পিতাকে হত্যার; কিন্তু তাঁদের পাপী অথবা অপরাধী বলতে পাঠকদের বাধবে। তাঁদের চিন্তাভাবনায় অনিশ্চয়তা আছে কিন্তু পাপবোধ নেই, তাঁদের মূল্যবোধগুলো আপেক্ষিক কিন্তু বিকৃত নয়।
আবহমান কাল ধরে বিতর্ক চলেছে – সৎ উদ্দেশ্যে কোনো অসৎ কর্ম কি সমর্থনযোগ্য? মহৎ উদ্দেশ্যের সাধনে নরহত্যা কি যুক্তিসঙ্গত? একজনের চোখে যিনি সন্ত্রাসবাদী, খুনি, অন্যজনের চোখে তিনি স্বাধীনতা-সংগ্রামী ও মহান নেতা। ১৯৩০ দশকে কেউ যদি হত্যা করতো হিটলারকে, সেটা কি অন্যায় হতো? কত কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচতো তাতে? ১৯৪৬-৪৭ সাল নাগাদ যদি জিন্নাহকে মেরে ফেলতো কেউ, তাহলে কি অখণ্ড থাকতো ভারতবর্ষ? স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতো লাখ লাখ মানুষ? ১৯৯৯ সালে যদি ক্লিনটন প্রশাসন প্রেরিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করতো ওসামা বিন লাদেনকে? পৃথিবীতে অশান্তির পরিমাণ খানিকটা হলেও কমতো কি? এসব প্রশ্নের কোনো সঠিক জবাব হয় না।
আলব্যের কামুর (১৯১৩-৬০) স্বল্পদৈর্ঘ্যরে জীবনের একটা বড় অংশে রয়েছে ন্যায়-অন্যায় এবং শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব। তিনি জন্মসূত্রে ফরাসি, কিন্তু জন্মের স্থান আলজেরিয়ার ভূমিজ মানুষের প্রতি তাঁর সমর্থন বেশি; সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তাঁর গভীর সহানুভূতি। কিন্তু বিদ্রোহে বা বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন হিংসামূলক কর্মের – সৎ উদ্দেশ্যের সাধনে মন্দ উপায়ের ব্যবহার কি ন্যায়নিষ্ঠার পরিপন্থী? গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বেড়িয়েছেন কামু – তাঁর নাটকও তা থেকে রেহাই পায়নি। বিশেষ করে আমাদের আলোচ্য নাটকের উপজীব্য এই শুভ-অশুভের নিয়ত দ্বন্দ্ব।
কামুর নাটক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দস্তয়েভস্কির কথা এসে পড়তে বাধ্য; নাট্যকার কামু দস্তয়েভস্কির মন্ত্রশিষ্য। ১৯৩৭ সালে প্যারিসে প্রথমবার এসেই তিনি তেয়ার্ত দ্য লেকিপ নাট্যদলে যোগ দেন – তাঁদের প্রথম প্রযোজনা কারামাজভ ভাইয়েরা উপন্যাসের নাট্যরূপ। এবং ১৯৫৯ সালে কামুর রচিত অন্তিম নাটক লে পসেদে হলো দস্তয়েভস্কির বেসি উপন্যাসের নাট্যরূপ (মূল উপন্যাসের নামটি বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘দানবেরা’)।

দুই
১৯১৭ সালের (পুরনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার-অনুযায়ী) অক্টোবর অথবা (নতুন গ্রেগ্রোরিয়ান ক্যালেন্ডার-অনুযায়ী) নভেম্বর মাসে বলশেভিক বিপ্লবের ফলে রাশিয়ার জারতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং লেনিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট শাসনের সূচনা হয়। কিন্তু সেই ঘটনার প্রায় তিন দশক আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মনে ঘনীভূত হয় অসন্তোষ এবং নানা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ও ধর্মঘটে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৮৯১ সালের দেশজোড়া দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ লোকের অনাহারে মৃত্যুর পরেই সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে মানুষ – ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কখনো শান্তিপূর্ণ আবার কখনো সশস্ত্র প্রতিবাদে। শেষ পর্যন্ত ১৯০৫ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে শান্তিপূর্ণ গণবিক্ষোভের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণের ফলে দুশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হলে দেশজুড়ে জ্বলে ওঠে বিদ্রোহের আগুন।
১৯১৭ সালের বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল সংঘবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি, কিন্তু ১৯০৫-এর বিদ্রোহ ছিল বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত – ছাত্র, শ্রমিক ও বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন নেতৃত্বে – তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কথা মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এদের অনেকে ছিলেন কবি ও লেখক এবং বিপ্লবী সমাজবাদী দলের সদস্য।
জার দ্বিতীয় নিকোলাসের কাকা ও ভায়রাভাই গ্র্যান্ড ডিউক সের্গেই আলেকজান্দ্রোভিচ ছিলেন মস্কোর গভর্নর জেনারেল। কবি ও বিপ্লবী ইভান কালিয়াইয়েভ (১৮৭৭-১৯০৫) তাঁর অশ্ব-শকট লক্ষ করে নাইট্রোগ্লিসারিন বোমা ছোড়েন ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯০৫, বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে। বোমাটি ফাটে গ্র্যান্ড ডিউকের ঠিক কোলের ওপরে এবং ছিন্নভিন্ন হয় তাঁর শরীর। রক্তাক্ত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয় ইভানকে, কয়েক মাস পরে তাঁর মৃত্যুদণ্ড ও ফাঁসি হয়। ইভানের বন্ধু বিপ্লবী ও সাহিত্যিক বরিস সাভিনকভ (১৮৭৯-১৯২৫) ওই একই সন্ত্রাসবাদী দলের সদস্য – তিনি বিপ্লবী, কিন্তু তীব্রভাবে বলশেভিকবিরোধী। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান প্যারিসে এবং সেখান থেকেই পরিচালনা করেন বিপ্লবী কার্যকলাপ। স্তালিন তাঁকে ছলে-বলে-কৌশলে দেশে ফিরিয়ে আনেন এবং গ্রেফতার করেন। তারপর কারাগারে ঘটে তাঁর অকালমৃত্যু – হত্যা অথবা আত্মহত্যা।
১৯১৭ সালে রুশভাষায় প্রকাশিত হয় বরিসের স্মৃতিচারণা – ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৯ পর্যন্ত রাশিয়ার সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের কার্যকলাপের করুণ, রোমহর্ষক কাহিনি। রাশিয়ার মহত্তম পুত্রকন্যাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কাহিনি – এক সন্ত্রাসবাদীর স্মৃতিকথা। কোনো গোষ্ঠী বা পার্টির একাধিপত্য যদি মানুষের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে বিপ্লব বৃথা। তাঁদের চোখে বলশেভিকরা বিশ্বাসঘাতক। ইভান কালিয়াইয়েভ এই গ্রন্থের এক প্রধান চরিত্র। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ বৃথা হয়েছে বলশেভিকদের বিজয়ে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র মূল্যহীন, সাম্য ও সমাজতন্ত্র ছাড়া ব্যক্তিস্বাধীনতা অর্থহীন – এইখানেই বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের রুশ সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের সঙ্গে কামুর আত্মার আত্মীয়তা।
১৯৩১ সালে সাভিনকভের গ্রন্থটির ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয় – ফ্রান্সের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী মহলে একই সঙ্গে নিন্দিত ও সমাদৃত হয় গ্রন্থটি। নিন্দার কারণ গ্রন্থের বলশেভিক-বিরোধিতা, সমাদরের কারণ বিপ্লবীদের সাহস ও আত্মত্যাগ। কামু বইটি পড়েছিলেন ১৯৩০-এর দশকে এবং তাঁর মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটে এ-গ্রন্থের একটি ঘটনা-অবলম্বনে নাটক-রচনায়। নাটকের প্রায় প্রতিটি চরিত্র রক্তমাংসের মানুষ – কেবল একটি চরিত্র (স্তেপান ফেভোরভ) হলেন কাল্পনিক – সেই চরিত্রটিও এসেছে মূলত কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি কামুর গভীর অসন্তোষের কারণে। স্তেপান চরিত্রটি আবার বিপ্লবের কারণে তিন বছর জেল খাটার পরে পালিয়ে যান সুইজারল্যান্ডে অর্থাৎ রক্তমাংসের লেনিনের সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত মিল।
নাটকটির নাম লে জুস্ত (Les Justes) – নামের আক্ষরিক ইংরেজি অনুবাদ করলে হবে ‘The Just’; ধ্র“পদী শৈলীর নাটক – কোনোরকম প্রথা ভাঙার চেষ্টা তাতে নেই। বিষয়টিও চিরকালীন – উচ্চ আদর্শের সমর্থনে মানবহত্যা ন্যায়সঙ্গত কিনা। আমাদের দেশের সশস্ত্র সংগ্রামীদের (স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে নকশালপন্থা থেকে বর্তমানের মাওবাদী) কার্যকলাপ নিয়েও এরকম প্রশ্ন উঠেছে। নাটকের প্রতিটি ঘটনা বাস্তবভিত্তিক এমনকী বিধবা গ্র্যান্ড ডাচেসের সঙ্গে তাঁর স্বামীহন্তারকের আশ্চর্যজনক সাক্ষাৎকারটিও কপোলকল্পিত নয়। অতএব সত্যি ঘটনার নাট্যরূপ দিয়ে কামু তাকে কতোটা বাস্তবসম্মত করতে পেরেছেন – তার ওপরেই এ-নাটকের সার্থকতা।

তিন
সান্তিয়াগো কামারেস কিরোগা (১৮৮৪-১৯৫০) স্পেনের এক শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী নেতা। ১৯৩১ সালে স্পেনে রাজতন্ত্রের পতনের পর নতুন গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে মন্ত্রিত্বের পর তিনি ১৯৩৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ – প্রতিবিপ�বী জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোর আক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনি সপরিবারে পালিয়ে যান দেশ ছেড়ে। সান্তিয়াগো যান লন্ডনে, তাঁর স্ত্রী ও কন্যা আশ্রয় নেন প্যারিসে।
কন্যা মারিয়া ভিকতোরিয়া কাসারেসের (১৯২২-৯৬) বয়স তখন তেরো। প্যারিসে হাইস্কুলের পড়া শেষ করার পরে তিনি প্রথমে ফরাসি নাট্যশালার বিখ্যাত নট রেনে সিমোনের (১৮১৮-১৯৭১) নাট্যশিক্ষা বিদ্যালয়ে অভিনয় শিখতে শুরু করেন। সেখানকার শিক্ষা সমাপ্ত করে ঐতিহ্যমণ্ডিত প্যারিস কনজার্ভেতোয়ার নাট্যসংস্থায় নাম লেখান – সেখানকার অন্তিম পরীক্ষায় তিনি ট্র্যাজেডিতে প্রথম এবং কমেডিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। বয়স কুড়ি ছোঁয়ার আগেই তিনি প্যারিসের থিয়েটারে নিয়মিত অভিনেত্রী।
১৯৪৩ সালের জানুয়ারি মাসে কামু যখন তৃতীয়বার প্যারিসে এলেন, ফ্রান্স তখন নাৎসি জার্মানির পদানত। সেই বিষাদময় সময়ে একদিন তিনি বন্ধু জেনিন গালিমারের সঙ্গে দেখতে গেলেন একটি জনপ্রিয় নাটক – জন মিলিংটন সিনজ-রচিত দুঃখ বিষাদের দিয়ের্দ্রে। নাটকটি ব্যর্থ প্রেমের গতানুগতিক কাহিনি, প্রেমিক হত হলে প্রেমিকা আত্মহত্যা করবে; কিন্তু আসর মাতিয়ে দিচ্ছেন প্রেমিকার ভূমিকায় এক আনকোরা অভিনেত্রী। গালিমার এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাটকের পরিচালক মার্সেল হেরাঁ অভিনয়ের শেষে তরুণ লেখক কামুকে নিয়ে গেলেন সাজঘরে – সেখানে দুজনের দেখা হলো – কামু, বয়স ২৯, তাঁর বিয়ে হয়েছে ফ্রানসিনের সঙ্গে দুবছর আগে এবং মারিয়া, বয়স ২০, প্যারিসে একা, কিন্তু মঞ্চসফল নেকড়ের পালের মধ্যে একাকী হরিণী মতন তাঁর চোখের চাওয়া, ‘তিনি বয়ে আনেন নাটুকে বিদ্যুৎ এবং অবলীলায় ছড়িয়ে দেন মঞ্চে’ (সমকালীন নাট্য-সমালোচকদের মন্তব্য)। হে দুর্লভ প্রেম : কামুর বাকি জীবন কাটবে এই দুই নারীর প্রেমের টানাপড়েনে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একই মঞ্চে একই পরিচালক মঞ্চস্থ করবেন কামুর নতুন নাটক এবং তার প্রধান চরিত্রে মারিয়া কামারেস।

মহান লেখকদের সৎ এবং পূত চরিত্রের মানুষ হতে হবে এমন দাবি আমরা কেউই করি না। কামুর রচিত নাটকগুলো বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ এবং কথাসাহিত্য ও মননশীল প্রবন্ধ লিখে কামুর বিশ্বজোড়া খ্যাতি হলেও নাটক ছিল তাঁর প্রথম প্রেম – এসব কথা মনে রেখেও বলা যায় যে, কামুর নাটকগুলো লেখার পেছনে ছিল এক গূঢ় উদ্দেশ্য – সুন্দরী প্রেমিকার নিয়মিত সঙ্গ, নাটকের আলোচনা ও মহড়ায় তাঁদের নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ। মারিয়া যদি অন্য কারো লেখা নাটকে অভিনয় করেন, তাহলে অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়বে তাঁদের প্রেম। অন্য লেখক, পরিচালক বা অভিনেতার সঙ্গে মারিয়ার সামান্যতম ঘনিষ্ঠতা হলেও অসম্ভব ঈর্ষা বোধ করতেন কামু।
অথচ নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যও সুষ্ঠুভাবে পালন করেছেন তিনি। সময় কাটিয়েছেন স্ত্রী ফ্রানসিন এবং যমজ পুত্র-কন্যা জঁ ও ক্যাথরিনের (জন্ম সেপ্টেম্বর ৫, ১৯৪৫) সঙ্গে। কিন্তু পারিবারিক দিনগত পাপক্ষয়ে হাঁপিয়ে উঠলেই তিনি চলে আসতেন মারিয়ার প্রশস্ত, আলোকোজ্জ্বল ফ্ল্যাটে – সেখানে মারিয়া তাঁর পাচিকা এবং পোষা বেড়াল – এবং বই, রেকর্ড ও দীর্ঘ বিশ্রাম।
আমুদে কামুর বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও ঝাড়েবংশে প্রচুর। তাঁরাও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন কামুর এই দ্বৈত জীবনে। কামুর সঙ্গে ডিনার খেতে গেলে তাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতেন না যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গিনী কে থাকবেন – ফ্রানসিন অথবা মারিয়া।
জীবনের শেষ কয়েক মাসেও তাঁর মনের মধ্যে ছিল নাটকের চিন্তা। তিনি আলজেরিয়ার এক সন্ত্রাসবাদী স্বাধীনতা-সংগ্রামীর জীবন নিয়ে নাটক লেখার কথা ভাবছিলেন এবং নিজস্ব একটি নাট্যশালা খোলার চিন্তাও তাঁর মাথায় ছিল।

চার
বয়স পঁচিশ ছোঁয়ার আগেই কামু সমাপ্ত করেন তাঁর প্রথম মৌলিক নাটক কালিগুলা – রোম সাম্রাজের ঐতিহাসিক গাইয়াস সুটোনিয়াস ট্রানকুইয়াস (৬৯-১৩০)-রচিত বারোজন সিজার গ্রন্থটি এই নাটকের অনুপ্রেরণা। ১৯৩৮ সালে নাটকটি রচনা করার পরে তিনি তার মঞ্চায়নের চেষ্টা করেন প্রথমে আলজিয়ার্স এবং পরে প্যারিসে, কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার ফলে তা আর সম্ভব হয়নি। কামুর কালিগুলা এক উন্নততর আত্মহত্যার কাহিনি – ক্ষমতাশীল মানুষ যখন অন্যদের ধ্বংস করে, তারই সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুত করে নিজের ধ্বংসের পটভূমি। প্রথমে নাটকটি ছিল তিন অঙ্কের – দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরে তিনি নাটকটি পরিমার্জনা করেন এবং তা বেড়ে দাঁড়ায় চার অঙ্কে। কামুর মৃত্যুর পাঁচ দশক পরেও কালিগুলার নিয়মিত অভিনয় হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মঞ্চে। কামুর ইচ্ছে ছিল নিজে কালিগুলার ভূমিকায় অভিনয় করার, কিন্তু তা আর শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। নাটকটির বাংলা অনুবাদ করেছেন সব্যসাচী দেব।
১৯৪২-৪৩ সালে নাৎসি জার্মানি-অধিকৃত ফ্রান্সে জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার ওপরে ভিত্তি করে কামু লেখেন তাঁর দ্বিতীয় নাটক, লে মালাঅঁতুদুঁ (Le Malentendu, ‘ভুল বোঝাবুঝি’)। এসময়ে প্যারিস ছেড়ে গিয়ে কামু মধ্য ফ্রান্সের পার্বত্য অঞ্চলের একটি ছোটো শহরে বাস করছিলেন এবং সেখানকার মানুষের শোচনীয় অবস্থা দেখেই তিনি এই ‘আধুনিক ট্র্যাজেডি’ লিখতে অনুপ্রাণিত হন। জাঁ নামে এক তরুণ খুব অল্পবয়সে ভাগ্যের সন্ধানে বিদেশে চলে যায় – দুদশক তার কোনো খবর নেই। সংসার চালাতে তার মা আর বোন বাড়িতে এক সরাইখানা খোলে; কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন রহস্য – কোনো ধনী অতিথি সেখানে একা উপস্থিত হলে বোন মার্থা ও মা তাকে খুন করে তার সব টাকা-পয়সা নিয়ে নেয়, হতভাগ্যের মৃতদেহটি ফেলে দেওয়া হয় নদীর জলে। জাঁ একদিন ফিরে আসে এবং নিজের পরিচয় না দিয়ে ছদ্মনামে সরাইখানার অতিথি হয়। তিন অঙ্কের নাটকে জাঁয়ের হত্যার অসম্ভাব্য করুণ কাহিনি। ভুল নামে নাটকটির বাংলা অনুবাদ করেছেন পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।

১৯৪৪ সালের শুরুতে নাটকটি মঞ্চস্থ করতে রাজি হলো প্যারিসের বিখ্যাত নাট্যসংস্থা তেয়ত্রে দ্য মাত্যুরি। প্রবীণ পরিচালক মার্সেল হেরাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে কামু নাটকের পাণ্ডুলিপির কিছু পরিমার্জনা করলেন। মহড়া চললো মাসতিনেক, ভগিনী মার্থার ভূমিকায় মারিয়া কাসারেস। ২৪ জুন নাটকের প্রথম রজনী, তারপরে নিয়মিত অভিনয়, তবে যুদ্ধকালীন নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে মাঝে মাঝে তা বন্ধ রাখতে হতো। নাটকের বিষয়ে দর্শক ও সমালোচকদের মন্তব্য ভালোমন্দে মেশানো, কিন্তু মারিয়ার অভিনয়ের প্রশংসায় সকলেই একমত। সতীর্থ নাট্যকার অঁরিরেনে লেনোরমঁ মন্তব্য করলেন, ‘এই নাটকের তাৎপর্য সঠিক অনুধাবন করতে দর্শকদের অন্তত দুদশক লাগবে।’
পরের বছর সেপ্টেম্বর মাসে কামুর শ্রেষ্ঠ নাটক কালিগুলার প্রথম প্রযোজনা ঘটলো প্যরিসে; কিন্তু হায়, এই নাটকে মারিয়ার অভিনয়যোগ্য কোনো চরিত্র নেই! দুজনের সম্পর্কেরও অবনতি ঘটলো অদর্শনের ফলে; প্রায় দুবছর কাটলো এইভাবে। কামু যাবেন না মারিয়া-অভিনীত নাটক দেখতে, কারণ তিনি নাটকের প্রধান পুরুষ চরিত্রের অভিনেতা জেরার্ড ফিলিপেকে সন্দেহ করেন মারিয়ার নতুন প্রেমিক হিসেবে এবং ভোগেন তুমুল ঈর্ষায়।
১৯৪৭-এর হেমন্তে কামু চিন্তাভাবনা শুরু করলেন নতুন নাটক লেখার জন্যে। তারপর ১৯৪৮-এর ৬ জুন প্যারিসের রাস্তায় দুজনে মুখোমুখি মারিয়া যাচ্ছেন থিয়েটারের মহড়ায়, কামু যাচ্ছেন আঁদ্রে জিদের সঙ্গে জরুরি মিটিংয়ে। কিন্তু দুজনেই কাজ ভুলে গেলেন একে অন্যকে দেখে!
পাঁচ
প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরে নাটকের প্রযোজনার দেরি হলো না; নাটকের নাম লেতা দ্য সিয়েজ (L’Etat de siege, ‘অবরোধ-কালীন অবস্থা’) প্রথম অভিনয় ২৭ অক্টোবর ১৯৪৮। যদিও তার পূর্ববর্তী বছরে প্রকাশিত উপন্যাস লা পেস্ত (La Peste, ‘The Plague’ ‘মারি’)-এর সঙ্গে কাহিনির সামান্য হলেও মিল রয়েছে, নাটকটি কামু সম্পূর্ণ নতুন করে লিখেছেন। মারির পটভূমি ছিল আলজেরিয়ার ওরান শহর, কিন্তু নাটকটিকে কামু প্রোথিত করলেন স্পেনে, কারণ ইউরোপ ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হলেও স্পেনে চলেছে ফ্রাংকোর দুঃশাসন। নাটকটি জনপ্রিয় হয়নি, কারণ বেশির ভাগ দর্শকই মারি উপন্যাসের নাট্যরূপ দেখবেন বলে প্রত্যাশা করেছিলেন। প্রধান নারী-চরিত্রে মারিয়ার অভিনয়ও দর্শকের মনে দাগ কাটলো না বিশেষ।

ইতোমধ্যেই পরবর্তী নাটক লেখার কাজ তিনি শুরু করে দিয়েছেন যদিও তার কাহিনি ১৯০৫ সালের ব্যর্থ রুশ বিৎপ্লবের, সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ কিন্তু পাঠক ও দর্শককে মনে করিয়ে দেবে চার দশক পরে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের জনগণের প্রতিরোধের কথা। পাঁচ অঙ্কের নাটক লে জুস্ত (Les Justes, ‘The Jus’t) )। প্রথম অঙ্কে গ্র্যান্ড ডিউকের গাড়িতে বোমা ফেলার চক্রান্ত, কাজের দায়িত্ব নিলেন ইভান কালিয়াইয়েভ। দ্বিতীয় অঙ্কে বোমা ফেলার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ফলে অনিশ্চয়তা – গাড়িতে দুই শিশুর উপস্থিতির জন্যে বোমা ফেলতে পারেননি ইভান। তৃতীয় অঙ্কে বোমার বিস্ফোরণ এবং ডিউকের মৃত্যু। চতুর্থ অঙ্কে কারাগারে ইভান এবং ফাঁসির প্রস্তুতি। শেষ অঙ্কে ফাঁসির আগের রাত্তিরে ইভানের সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া; সবচেয়ে নমনীয় স্বভাবের ডোরাও শপথ নেয় ইভানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার।
১৯৪৯ সালের জুন থেকে আগস্ট মাস কামু ভ্রমণ করেন দক্ষিণ আমেরিকায়, সেখান থেকে প্যারিসে ফিরে এসে অসুস্থতার মধ্যেই সমাপ্ত করেন নাটকের কাজ। ১৫ ডিসেম্বর তেয়াত্ত-এবারতোত প্রেক্ষাগৃহে নাটকের প্রথম অভিনয়।
নাটকটির পূর্ণাঙ্গ মহলার দিনে কামু এতটাই অসুস্থ যে যেতেই পারলেন না থিয়েটারে; শ্যালিকা ক্রিশ্চিয়ান গেলেন এবং থিয়েটার থেকে বারবার ফোন করে জানালেন লেখককে। শুভ মহরতের আগের দিনও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী। খুব অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি উপস্থিত থাকলেন প্রথম রজনীতে। নাটক দেখতে এলেন অন্য আমন্ত্রিতদের সঙ্গে জঁ পল সার্ত্রে এবং সিমোন দ্য বোভোয়া। বোভোয়া তাঁর ডায়েরিতে উলে�খ করেছিলেন, কেমন অবসন্ন লাগছিল কামুকে, কিন্তু আনন্দ পেয়েছিলেন তাঁর উষ্ণ অভ্যর্থনায়। অভিনয় শেষ হওয়ার পরে এক মহিলা দর্শক ছুটে এসে কামুকে জানালেন – নাটক ভীষণ ভালো লেগেছে তার – ‘কিছু দিন আগেই দেখেছি নোংরা হাত (সার্ত্রের লেখা নাটক – বিষয় কমিউনিস্টদের নীতিবোধ)। আপনার নাটক তার চেয়ে অনেকগুণে ভালো।’ সার্ত্রে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন বলে কামু লজ্জা পেলেন, মৃদু হেসে বললেন, ‘দেখলেন তো, এক ঢিলে দুই পাখি!’

রোগজর্জর প্রেমিকের কথা মনে রেখে ডোরার ভূমিকায় অভিনয়ে প্রাণ ঢেলে দিলেন প্রতিভাবান অভিনেত্রী মারিয়া কাসারেস – সেই বিরহের আকুতি পৌঁছালো দর্শকদের কাছেও। লে ফিগারো সংবাদপত্রের প্রতিবেদক জঁ জাক গোতিয়ে তাঁর সম্পর্কে লিখলেন, ‘You Know her waist of miracle slenderness, her narrow eyes drawn toward the temples, her tapered brows, her pointed chin, her bulging forehead, the shiny traces of tears on her cheeks… she amazed the audience by her acting at once passionate and measured.’ কিন্তু নাটকটির মধ্যে তিনি পেলেন কেবল হতাশা আর শূন্যতা, হত্যা আর মৃত্যু, এক মুহূর্তের জন্যেও পেলেন না জীবনদায়ী কোমলতা। তিনি  তাঁর কঠোর            মন্তব্য দিয়ে ভরে দিলেন নাটকটিকে – ‘A play? No! An Ideogram, living creatures? No!… They call men who write such things master thinkers? I call them masters at killing themselves, zealots of suicide. প্যারিসের সমাজতন্ত্রী পত্রিকা লে পপুলিয়েরের মতে, নাটকটি ‘Powerful and moving’ আবার কমিউনিস্ট পত্রিকা লুমানিতের মত ঠিক তার উলটো – ‘Worse than cold – icy. Fabricated characters, banal dialogues… Unbelievable actions.’

কিন্তু একই প্রেক্ষাগৃহে ছ-মাস চলার পরেও নাটকটি জনপ্রিয় এবং তার সুনাম ছড়িয়ে গেল বিদেশেও। কামু ভীষণ খুশি হলেন ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান সংবাদপত্রের মন্তব্যে – ‘But for the first time, for a long time we hear again in this work, and in the theatre, the authentic voice of God, without the help of God, the hearts of some men.’ ন্যু ইয়র্কের পার্টিজান রিভিউ সাময়িকপত্রের নাট্যসমালোচক নিকোলা চিয়ারোমন্টো লিখলেন, ‘After all is said about the weakness of Les Justes as a play, it remains a piece of literary work that commands respect and a stage production that is moving if not really dramatic.’ কিছু দর্শকের স্বতঃস্ফূর্ত মন্তব্য উদ্ধৃত করার পরে চিয়ারোমন্টো আরো জানালেন, ‘What made the Parisians applaud Les Justes and burst into tears at some of its scenes was not the debate about the revolution which is present in a few sketchy sentences, but reminder of the resistance which it obviously contains.’

ছয়

ব্রিটিশ সাহিত্য-সমালোচক ও অনুবাদক স্টুয়ার্ট গিলবাট (১৮৮৩-১৯৬৯) এ-নাটকটির প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেন। তাঁর জন্ম ইংল্যান্ডের এসেক্স অঞ্চলে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার, মা মেলভিনা পাঞ্জাবের অন্তর্গত কাপুরথালা রাজ্যের রাজকুমারী। ১৯০৭ সালে আইসিএস পরীক্ষায় পাশ করে তিনি প্রশাসক  হিসেবে ভারতবর্ষে আসেন এবং প্রথম মহাযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরে তিনি ব্রহ্মদেশে বিচারকের পদে নিযুক্ত হন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ফরাসি। ১৯২৫ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি বাকি জীবন ফ্রান্সে কাটান। তিনি কামু, সার্ত্র, অাঁদ্রে মালরো, জঁ ককতো প্রমুখের লেখা ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন; আবার ইংরেজি থেকে ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন জেমস জয়েসের ইউলিসিস উপন্যাস। জয়েস ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৩০ সালে তিনি ইউলিসিসের একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনাগ্রন্থ প্রকাশ করেন এবং ১৯৬৭ সালে সম্পাদনা করেন জয়েসের পত্রাবলি।

লে জুস্ত নাটকটির নামের আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়াবে ‘The Just’ অথবা ‘ন্যায়নিষ্ঠ মানুষেরা’; কিন্তু ১৯৫৮ সালে গিলবার্ট যখন নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করলেন, তিনি তাঁর নাম দিলেন ‘The Just Assassins’ অর্থাৎ ‘ধার্মিক খুনি’। নামটি বিস্ময়কর, কারণ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে যখন কালিয়াইয়েভের বন্ধুরা তাঁর কৃতকর্মটিকে খুন বলে উলেস্নখ করে, তখন তিনি চিৎকার করে বলেন, ওই শব্দটা আর কোনোদিন আমার সামনে মুখেও আনবে না।

নেপালের নাট্যকার কল্পনা ঘিমিরে নাটকটির অনুবাদ করেছেন নেপালি ভাষায়। ১৯৯১ সালে যখন কাঠমান্ডুতে নাটকটির প্রথম অভিনয় হয়, তখন নেপালে রাজনৈতিক খুনখারাবির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তার পরে আরোহান গুরুকুল নাট্যগোষ্ঠী নাটকটির প্রযোজনা করেছেন চলিস্নশ বারেরও বেশি এবং মাওবাদী জনযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে নিয়মিত রাজনৈতিক হত্যার কারণে নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ন্যায়প্রেমী নাটকটির পরিচালক সুনীল পোখেরাল, দুটি মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন সঞ্জীব আপরেটি এবং দিল ভূষণ পাঠক। ২০১১ সালে নাটকটি গুরুকূল থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং ২০১২ সালে কাঠমান্ডুর আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবে মহাসমারোহে অভিনীত হয়েছে আবার।

ফরাসি ভাষায় নাটকটির প্রথম প্রকাশ ১৯৫০ সালে, প্রকাশক গালিমার, যারা কামুর প্রায় সব গ্রন্থেরই প্রথম প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইংরেজিতে স্টুয়ার্ট গিলবার্টের অনুবাদে কামুর চারটি মৌলিক নাটক একসঙ্গে প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। লেখক একটি নতুন ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন এই গ্রন্থের জন্যে। তিনি লিখেছেন, ‘It seems to me that there is no true theatre without language and style, nor any dramatic work which does not, like our classical drama and the Greek tragedians, involve human fate in all its simplicity and grandeur.’ কামু নাটক না লিখলে একটা বড়ো শূন্যতা থেকে যেতে পৃথিবীর নাট্যসাহিত্যে।

কামুর নাটকের বাংলা অনুবাদ এক জরুরি এবং প্রয়োজনীয় কাজ। বাংলায় লে জুস্তের অনুবাদক কাবেরী বসুকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের বহু দর্শক এ-নাটকটির অভিনয় দেখেছেন, এটাও একটা মস্ত সুখবর।

তথ্যসূত্র

Caligula and Three other plays, Albert Camus, Vintage, New York, 1962.

Albert Camus : a Biography, Herbert Loltinan, Vintage, New York, 1980.

Memoirs of a Terrorist, Boris Savinkov, translated with a foreward and epilogue by Joseph Shaplen, Albert and Charles Boni, New York, 1931.

Camus : Portrait of a Moralist, Stephen Eric Bronner, University of Minnesota Press, 1999.

Albert Camus: A life, Olivier Todd, Translated by Benjamin Ivry, Alfred A. Knopf, 1997.