সফিউদ্দীনকে নিয়ে আমার প্রথম লেখা

লেখক:

বুলবন ওসমান

বাংলাদেশের পথিকৃৎ শিল্পীদের সবাইকে নিয়ে লিখেছি। লিখেছি তার পরের প্রজন্মের অনেককে নিয়েও, অথচ অন্যতম গুরু সফিউদ্দীনকে নিয়ে একটি লেখাও হয়নি। এর একটা ছোট পটভূমি আছে। আমি ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে ঢাকা চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিই। পাঠদানের বিষয় : সমাজতত্ত্ব শিল্প-সম্পর্কিত – অর্থাৎ সোসিওলজি অব আর্ট। এই বিষয়ের পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস তৈরিতে সাহায্য করেন বাংলাদেশের পথিকৃৎ সমাজতাত্ত্বিক অধ্যাপক এ কে নাজমুল করিম। তাঁর তত্ত্বাবধানে পাঠ্যসূচি তৈরি হয়। আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দিয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, তৎকালীন অধ্যক্ষ। চারুকলায় এ-বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পেছনে এই দুই মনীষীর ছিল মৌল অবদান। তাঁদের পরস্পর ছিল প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।
পাঠদান করে চলেছি। আর চারুকলার বিভিন্ন বিভাগে ঘুরে ঘুরে দেখছি হাতে-কলমে শিক্ষার পদ্ধতি। কিন্তু এখনো আমার কাছে অধরা ছিল শিক্ষাবোধটি কেমন করে একজন শিল্পীর মানসে উদয় হয় বা একজন শিল্পী তার শিল্পকর্মে কী সমস্যার সমাধান করেন। অ্যারিস্টটল যে বলেছেন, শিল্পকলা হলো অনুকরণ, তা বুঝি কিন্তু সব শিল্পকলা তো অনুকরণের মতো লাগে না, তার বেলা? আবার খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে অনুকরণ পাওয়াও যায়। এসব চিন্তা নিয়ে চারুকলায় চাকরি করি। তখন হঠাৎ একদিন একটা চিন্তা মাথায় খেলে, আচ্ছা প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে যদি লেখালিখি করি তাহলে তো শিল্পকলার জগৎ সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যায়। এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে ১৯৭০-এর দিকে চিত্রশিল্পীদের ওপর লিখব ঠিক করে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসি। প্রথমে ঠিক করি চারুকলায় প্রতিষ্ঠিত যাঁরা আছেন তাঁদের দিয়ে শুরু করব। তাহলে যাতায়াত ব্যয় ও সময় বাঁচে। পরে যাবো অন্যদের কাছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে শিল্পী বাছাই করার প্রক্রিয়া। কাকে নিয়ে প্রথমে শুরু করব?
চারুকলার চিত্রকলা বিভাগের দোতলায় ওপরের শ্রেণির পাঠক্রম চলে। মাঝে মাঝে তাদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে কাজ দেখি। আলাপ হয় শিল্পী আবদুল বাসেতের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে বেশ একটা ঘনিষ্ঠতা জন্মে গিয়েছিল। প্রথম তাঁর ওপর লিখব ঠিক করি। তিনি তখন আজিমপুর সরকারি বাসভবনে থাকতেন। চারুকলায় ও তাঁর সঙ্গে বাসায় গিয়ে ছবি দেখি আর তথ্য নিই। এভাবে আমার শিল্পীদের শিল্প-ভাবনা সম্বন্ধে সরাসরি জ্ঞানার্জনের কাজ শুরু হয়। বাসেতের পর আবদুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরীর পর পালা আসে সফিউদ্দীন আহমেদের। তিনি বাবার বন্ধু, তাই অনেক সমীহ করে প্রস্তাব স্থাপন করি। তিনি বাসায় যাওয়ার জন্যে বলেন। তখন তিনি স্বামীবাগে কেএম দাস লেনে নিজের কেনা বাড়িতে থাকেন। একতলা বাড়িটি ইটের মোটা দেয়ালঘেরা। ভেতরে বেশ অনেকটা জায়গা, গাছপালাশোভিত। পেছনে খালের মতো নিচু ভূমি। অনেকটা মফস্বলের পরিবেশ। একদিন বিকেলে হাজির হই। স্যারের একটা মদ্দা কুকুর ছিল, অ্যালসেশিয়ান। কুকুরের ডাক শুনে তিনি বেরিয়ে এলেন। বাঁধলেন ওকে। তারপর সব ঘুরে ঘুরে দেখালেন বাড়ির চারপাশ।
আমি জানতে চাই, বন্যার জল এখানে ওঠে কিনা। তিনি জানালেন যে, ঘরের ভেতরেও জল ওঠে। তখন ছবির সব ফোলিও আলমারির ওপরে তুলে তবে রক্ষা। গল্প করতে করতে আরো জানালেন যে, এই উঠোনের মধ্যেই সদর-দরজা দিয়ে ছোট ছোট নানা রকম মাছ ঢুকত। জল কমে এলে তাদের তীরবেগে ছোটাছুটি লক্ষ করতেন। আর এ-অভিজ্ঞতা থেকে আসে তাঁর বিখ্যাত এচিং সিরিজ ‘অ্যাংরি ফিশ’ বা ‘বিক্ষুব্ধ মৎস্য’।
বসার ঘরে বসে আমি তার পুরনো কাজ দেখতে থাকি। উডকাট, এচিং… এসব দেখতে দেখতে মন চলে যায় সাঁওতাল পরগনায়। দুমকা অঞ্চলের আদিবাসী সাঁওতালদের জীবন নিয়ে সব কাজ। ওই অঞ্চলের ভূদৃশ্য… ঋতু-পরিক্রমা… আদিবাসীদের কর্মজীবন বা জীবন সংগ্রামের চিত্র। এই জীবনচিত্রে ফুটে ওঠে সাদা-কালোর অনন্ত দৃশ্য। ছোট ছোট কাজ, কিন্তু কী গভীর জীবনবোধের ব্যঞ্জনা আর নিটোল বুনট। আদিবাসী সমাজব্যবস্থার কৌম সংবদ্ধতার মতোই চিত্রতল জমাট। নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ও নিখুঁত পরিবেশনা। এসব চিত্র বেশিরভাগ আনুভূমিক। আবার মাঝে মাঝে আসছে তালগাছ, তখন তা উল্লম্ব। কখনো তালের সার আনুভূমিকও আছে। যখন তা আলের পাশে সার বাঁধাভাবে দাঁড়িয়ে।
কাজ দেখানোর পর প্রচুর খাবার এলো, তারপর বললেন, আলোচনা আজ থাক, পরে একদিন এসো… তখন তুমি যা জানতে চাও বলব।
আমি জানি শিল্পীরা মুডে চলেন, তাই কোনো আপত্তি উত্থাপন করি না।
ঠিক আছে স্যার, আরেকদিন বসব।
বাসায় না হলেও আমি তাঁর কাছ থেকে শিল্পকলার অনেক কিছু জানতে পারি চারুকলার টেবিলে বসে। যখন-তখন গিয়ে বসতাম। কিবরিয়া সাহেবের টেবিলও তাঁর পাশে। দুজনই মিষ্টভাষী, রসিকতায় পটু। হাসি আছে, কিন্তু তা কখনো উচ্চকিত করে না। চোখে কৌতুকের ছটা।
একদিন বসে আলাপ করছি, সফি স্যার বললেন : দেখো, আলো দুধরনের। এখন বেলা এগারোটা, তাই পুবদিক থেকে আসা আলো হলো ওয়ার্ম। আবার দেখো পশ্চিমদিক থেকেও আলো আসছে; ওটা কিন্তু সরাসরি নয়, প্রতিফলিত আলো, তাই ওটা কুল।
আমি অষ্টাদশ শতকের সত্তরের দশকের শিল্পীদের কথা ভাবি। তাঁরা তো এই আলো নিয়েই কাজ করেছেন। যাঁদের নামকরণ হয় ইম্প্রেশনিস্ট। ক্লদ মনের ‘ইম্প্রেশন সানরাইজ’ ছবিটির নামে তাঁদের ইম্প্রেশনিস্ট আখ্যা দেওয়া হয়। সফিউদ্দীনও তাঁর প্রথমদিককার কাজে ইম্প্রেশনিস্ট; কিন্তু ইম্প্রেশনিস্টদের কাজে যে কাঠামোর অভাব ছিল বা কিছুটা ইজি ধরনের, তিনি কিন্তু এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন। তাঁর কাজ স্পষ্ট। বাঁধুনি খুবই শক্ত। এটা আবার প্রকাশবাদী বা এক্সপ্রেশনিস্টও বলা চলে না, অনেকটা এ-দুয়ের মাঝামাঝি একটা ধরন। সফিউদ্দীন চেনা জগৎ বা মানুষকে দেখে তার চিত্রাবয়ব ধারণ করছেন। কিন্তু তার প্রকাশ ধরনের মধ্যে একটা অদ্ভুত নিরাশক্তি আছে। তা আবার আলোকচিত্রের মতো নয়, যা শিক্ষা-সুষমামন্ডিত। তাঁর সব কাজের মধ্যে একটা প্রাচ্যশিল্পধারার মতো ছন্দ কাজ করে চলে। ছন্দের মধ্যে আসে পুনরাবৃত্তি, ডান-বাম সঞ্চারণ, আর এই চলনের মধ্যে কোনো ভগ্নতা নেই। সবই নিটোল। প্রবল ভারসাম্য বজায় রেখে সব শিল্পাংশ সম্পর্কিত। সবই চলেছে কৌম নৃত্যের মতো হাত ধরাধরি করে এবং স্বল্প-আন্দোলনে। আবার এরই মধ্যে কোথাও স্পেস বেশি ছেড়ে, কোথাও কম এভাবে আধুনিক শিল্পকলার ব্যাকরণও মেনে নেন।
আরো একদিন বাসায় গেলাম। বেশকিছু কাজ দেখালেন। আর এদিনও আমাকে আরো অপেক্ষা করার পালা অনুসরণ করতে হলো, কারণ ভূরিভোজন করিয়ে তিনি আমাকে বিদায় দিলেন। শিল্পীর মুডকে সমীহ না করে উপায় নেই। এরপর এসে গেল মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, আমার শিল্পীদের ওপর লেখায় ছেদ পড়ে গেল, যেটা পরবর্তীকালে আর হয়নি।
এতদিন চারুকলায় তাঁর টেবিলে বসে আলাপ করছি… চারুকলায় বেশ বড় বড় আমগাছ আছে। চোখের ওপরেই আছে, কিন্তু আমরা কখনবা এসব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করি। তিনি বললেন, আমগাছের পাতাগুলো দেখেছো? ডালের মাথায় কেমন সুন্দরভাবে গুচ্ছ আকারে সাজানো থাকে? এ-কথা বলতে বলতে তিনি নাচের মুদ্রা দেখানোর মতো দুহাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সঞ্চারণ করলেন। আমার চোখে তখন প্রকৃতির বিন্যাসের সব ছবি ধরা পড়তে থাকে। বুঝতে পারি কী নিবিড়ভাবে তিনি প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করেন। এই বৃক্ষরাজি, নদী, জলকে কেন্দ্র করে নৌকোর চলাচল, মাছধরা… সবকিছু শিল্পীর মানসে নিখুঁতভাবে ধরা থাকছে। একসময় তিনি তাঁর মতো করে চিত্রতল সাজিয়ে চলেছেন। এ আরেক স্রষ্টা। এজন্যেই শিল্পকলাকে বলা হয়েছে প্রকৃতির পৌত্র। শিল্পী প্রকৃতির পুত্র, আর তাঁর সৃষ্টি হলো তৃতীয় প্রজন্ম।
একদিন তাঁর টেবিলে বসে আলাপ করতে করতে বলি, স্যার, আগামী আমার একটা ক্লাসে শিল্পী কামরুল হাসানকে ডাকব, তিনি লোকশিল্পের ওপর বলবেন।
তিনি কথাটা শুনে একটু গম্ভীর হলেন। তারপর বললেন, দেখো বুলবন, সরকার তোমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছে, তুমি যা পড়াবে তা-ই নির্দিষ্ট। তুমি তোমার ক্লাসে আর কাউকে এনো না। অন্য সময় কামরুল সাহেবকে দিয়ে আলোচনা করাতে পারো।
কথাটা শুনে আমি সঙ্গে সঙ্গে সচেতন হয়ে গেলাম। স্যার আমাকে চমৎকার বুদ্ধি দিয়েছেন। নিজের নির্দিষ্ট দায়িত্বকালে আর কাউকে যে জায়গা দেওয়া যায় না তা উপলব্ধি করি। তিনি আমাকে নিয়ম মানার চমৎকার একটা শিক্ষা দিলেন। তাঁর মধ্যে এই নিয়মনিষ্ঠাটা ছিল সর্বসময়ের।
জার্মান শিল্পতাত্ত্বিক এর্নস্ট কুহ্নেলের ইসলামিক আর্ট বইটি বাংলায় অনুবাদ হয়, অনুবাদ করেন সাংবাদিক মোসলেমউদ্দিন। বইঘর থেকে প্রকাশিত বইটি এখলাসউদ্দীন আমাকে সম্পাদনার জন্যে দেন। পান্ডুলিপির ভাষাটি দেখে দিয়ে আমি একটি সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধ লিখে দিই ইসলামি আর্টের ওপর। বইটি সফিউদ্দীন স্যার পড়েছেন। তিনি একদিন আমাকে বললেন, বুলবন, তুমি ভালো করেছো, ইসলামি আর্টে যে বই-বাঁধাই একটা শিল্পে রূপ নিয়েছে এটা পর্যন্ত উল্লেখ করে। কলকাতায় বুঝলে, যত ভালো বুক বাইন্ডার সব মুসলমান। এটা ছিল মুসলমানদের জাত-ব্যবসা।
স্বাধীনতার পর আমাদের ৭নং মোমেনবাগের (রাজারবাগ) বাসায় একদিন এসেছেন। আমি তাঁকে এগিয়ে নিয়ে আসি। ঘাসভরা লনের পাশে এক চিলতে বারান্দায় তখন আমার মেজভাই আসফাকের বড় ছেলে সুফেন খেলছিল। ওর বয়স তিন-চার হবে। আমি তাঁকে বলি, এই যে দাদাকে দেখছো, ইনি একজন খুব বড় শিল্পী।
সুফেন বলে, আমিও ছবি অাঁকতে পারি।
তাই নাকি! সফিউদ্দীন সাহেব বলেন।
হ্যাঁ। একটা কাগজ দাও।
আমি আমার কামরায় স্যারকে নিয়ে বসাই। পেছন পেছন সুফেন হাজির, কই, আমাকে কাগজ-কলম দাও।
আমি স্যারকে বসিয়ে পাখা খুলে দিই। তারপর নতুন শিল্পীকে দিই কাগজ আর কলম।
সুফেন তা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে আসে। হাতে কাগজ। তাতে ছবি অাঁকা। সে-ছবিটি সোজা তার শিল্পীদাদার হাতে দিলো।
বাহ্, শিল্পী সফিউদ্দীনের বিস্ময় প্রকাশ। বিষয়টি ছিল দেয়ালের পাশে দাঁড়ানো কৃষ্ণচূড়া গাছটি ও বাগানের অন্যান্য অনুষঙ্গ।
দাদা, তুই এত সহজে অাঁকলি কী করে! আমরা তো অমন করে পারি না! তিনি কয়েকবার বললেন একই কথা। তোদের মতো আমরা তো অাঁকতে পারি না!
আমি বুঝতে পারি, শিশুদের প্রথম জীবনের নিষ্কলুষ যে-প্রকাশ পরবর্তী জীবনে তা থাকে না, মানুষ বড় হয়ে হয়ে যায় সচেতন। সেই স্বতঃস্ফূর্ততা যায় হারিয়ে। তখন ইচ্ছা করেও আর আগের জায়গায় ফেরত যাওয়া যায় না। শিল্পীদের এই আক্ষেপ চিরকালের।
তিনি অবসরে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গ পাই না। তাই একদিন দেখা হলে তাঁকে বলি, স্যার, আপনি ধানমন্ডির বাড়িতে চলে আসেন, আমরা ওখানে গিয়ে বিকেলে আড্ডা দেবো।
তিনি বললেন, দেখি, সবটা গুছিয়ে নিয়ে চলে আসবো। তাও আসতে আসতে ২০০৬ পর্যন্ত পার হয়ে গেলো। এর আগে একদিন চারুকলায় এসেছিলেন, বললেন, বুলবন একটা ভালো কাজ করেছি, হোয়াইট অন হোয়াইট, বাসায় এসো – তোমাকে একটা দেবো। এর আরো আগে অবশ্য বাবাকেও (শওকত ওসমান) একটা উপহার দেবেন বলেছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য যে, সময়মতো না গিয়ে এগুলো আমার সংগ্রহ করা হয়নি।
২০০৮-এর দিকে ধানমন্ডির বাসায় গেছি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। ধানমন্ডি চার নম্বর সড়কে পার্কের পাশে তাঁর বাড়ি। ছ-তলা বাড়ির তিনি থাকতেন পাঁচতলায়, দক্ষিণ-পুব কোণে। জানালার মাঝ দিয়ে পার্কের গাছপালা দেখা যেতো। তিনি এরই মধ্যে অনেক স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছেন। তবু আমি একটা বড় কাগজ নিয়ে বসলাম সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখব বলে। কিন্তু যা-ই জিজ্ঞেস করি বলেন, মনে করতে পারছি না – এবং এটা যে পারছেন না তা বলে একটা লজ্জামিশ্রিত হাসি। একেবারেই শিশুসুলভ আচরণ। আমি জানি না, তিনি এই স্থানান্তরে ব্যথিত হয়েছিলেন কিনা? নিজেকে কি বন্দি বন্দি ভাবতেন? খোলামেলা জায়গায় প্রকৃতির সঙ্গে সারাজীবন কাটিয়ে এটা কি খোপের মতো লাগত? তাঁর সামনে বসে আমার সাদা বড় কাগজটি যখন সাদাই থেকে যেতে লাগল আমার মন খারাপ হয়ে যায়। ভাবি, আরো বছর দু-তিন আগে কেন যে দেখা করিনি! সবই যে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেল!
সাংসারিক জীবন সুখের ছিল সফিউদ্দীন স্যারের। কলকাতায় ১নং ভবানীপুরে তাঁদের দোতলা বাড়িটি ছিল বনেদি ধরনের। তাঁর বাবা শেখ মতিনউদ্দীন ছিলেন রেজিস্ট্রার। মা জমিলা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ১৯৫২ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাজশাহীর আঞ্জুমান আরার সঙ্গে। তাদের দুই পুত্র ও এক কন্যা – সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রথম পুত্র সাঈফ আহমেদ বিদ্যুৎ প্রকৌশলী। ছোট ছেলে আহমেদ নাজির ছাপচিত্রশিল্পী। শিল্পী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। একমাত্র কন্যা সেলিনা আহমেদ।
শিল্পী সফিউদ্দীনের শিল্পকর্মে পরিবেশ সচেতনতা সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয়। প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদান তাঁর কাজে জায়গা করে নিয়েছে। ছিলেন নিসর্গ প্রেমিক। সেইসঙ্গে ভালোবাসা ছিল নিসর্গে সংগ্রামরত মানুষগুলোর প্রতিও। বেঙ্গল স্কুলের প্রভাব তাঁর মধ্যে প্রগাঢ়। তবে এই ধারায় প্রথম দিকে যা অজন্তা-ইলোরার অনুসরণ ও দেব-দেবীকেন্দ্রিক ছিল, তা থেকে এই ধারাকে মুক্তি দেন শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু। তারই ক্রম ধরে শ্রীগোপাল ঘোষ সারা ভারতের নিসর্গে বিচরণ করে এর সীমানা সমাপ্ত করেন। সফিউদ্দীনও তেমনি বাংলা ও বাংলা সংলগ্ন সাঁওতাল পরগনার চিত্র তুলে ধরেন। আবার পূর্ববাংলার সজল-সরস রূপটিকে তাঁর চিত্রতলে করেন শোভিত। তাই অনেক রঙিন হয়ে ওঠে তাঁর ছাপচিত্র ও তেলচিত্র। আজকের প্রকৃতি ধ্বংসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে সফিউদ্দীনের শিল্পকর্ম একটি জ্বলন্ত প্রতিবাদ হয়ে চিরকাল টিকে থাকবে। 