সব্যসাচীর চিত্র-দিব্যরথ

লেখক: জাহিদ মুস্তাফা 

না-ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর অবশেষে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের একক চিত্রপ্রদর্শনী সম্প্রতি হয়ে গেল ঢাকার কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে ডেইলি স্টার-বেঙ্গল আর্টস প্রিসিঙ্কট গ্যালারিতে। প্রদর্শনীর শিরোনাম – ‘চিত্রের দিব্যরথ’। বেঁচে থাকতেই চেয়েছিলেন নিজের শিল্পকর্ম নিয়ে একটি প্রদর্শনী করতে। সেটি হয়নি বটে, তবে অগণন ভক্তের চোখের সামনে চলে এলো তাঁর শিল্পসৃজনসমূহ। কাগজে রেখাঙ্কন, স্কেচ, জলরং আর ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নানারকম প্রতীকায়িত ইমেজ, মাথার ভেতরকার অস্ফুট দৃশ্যকাব্য।

সাহিত্যই ছিল তাঁর পথ। সারাজীবন দুহাতে লিখেছেন। তাঁর রূপরচনার অপরিমেয় সৃজনশক্তি সাহিত্যের নানা মাধ্যমে উপচে পড়েছিল। কবিতা, গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-কাব্যনাটক, আত্মজীবনী – যা কিছু রচনা করেছেন তাতেই তাঁর ঈর্ষণীয় সাফল্য।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, বাঙালি কৃষকদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নিয়ে লেখা কাব্যনাটক নুরলদীনের সারাজীবন তাঁর দুটি অসামান্য রচনা।

চুরাশি বছরের জীবনে প্রথমভাগের চোদ্দ বছর বাদ দিলে তাঁর সৃজনের বয়স সত্তর। এই সময়টাকে প্রধানত তিনি সৃজনের ধ্যানে কাজে লাগিয়েছেন।

শিল্পের আরো নানা মাধ্যমে রূপসৃজনের আকুতি তাঁকে সুস্থির থাকতে দেয়নি। মুক্তি খুঁজেছেন চলচ্চিত্র, সংগীত ও শিল্পকলায়। চিত্রকলা ছিল তাঁর অন্তরের অভিসার, গোপন প্রণয়।

গত শতকের আশির দশকে পঞ্চাশের পর সৈয়দ হক শুরু করলেন ছবি আঁকা। বাঙালির রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেক বা লেবানিজ কবি কাহলিল জিবরান, সিরীয় কবি আদোনিস পর্যন্ত অনেক কবিই ছবি এঁকেছেন। আমাদের কবি শামসুর রাহমানও সামান্য হলেও ছবি এঁকেছেন।

অপরদিকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মিকেলেঞ্জেলো কবিতা লিখেছেন। ১৯৩৫ সালে পাবলো পিকাসো লেখালেখিতে মগ্ন হয়েছিলেন। আমাদের শিল্পী মুর্তজা বশীর গল্প-উপন্যাস-পদ্য রচনা করেছেন। সৈয়দ হকও এই ব্যতিক্রমী শিল্পীদের অন্যতম হয়েছেন সৃজনের বলয় পরিবর্তনের আকুতির জন্য।

সেই পঞ্চাশের দশকে বন্ধু হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন কয়েকজন তরুণ চিত্রশিল্পীকে। তাঁরা হলেন – কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, রশিদ চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী প্রমুখ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ শিক্ষক-শিল্পীর সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। বহুবার গেছেন জয়নুলের শান্তিনগরের বাসার আড্ডায়। নিজেও কবুল করেছেন – ‘সাহিত্যে আসবার প্রথম দিন থেকেই অবিরাম সঙ্গ করেছি লেখক অধিক চিত্রকরদের, জীবনের প্রায় সর্বাংশে আমার ওঁরাই তো; জয়নুলের মতো অগ্রজেরা আমাকে উদ্বোধিত করেছেন, কাইয়ুমের মতো বন্ধুরা আমাকে ঋদ্ধ করেছেন। ওঁদের সৃজন ও সান্নিধ্যে আমি ধ্বনিতে জেগে উঠেছি।’ এতে উপলব্ধি হয় শিল্পের প্রতি তাঁর এমন টান আকস্মিক নয়।

বিশ শতকের বিশ্বে নতুন সৃজনের জন্য শিল্পী-সাহিত্যিকদের সম্মিলিত আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে শিল্পের এ দুটি শাখায় পারস্পরিক সৌহার্দ্যের সম্পর্ক ঠিকই খুঁজে পেয়েছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। সাহিত্য করলেও শিল্পকে কাছে টেনেছেন সবসময়। অমরত্বের বাসনা বহন করতেন বলে দীর্ঘজীবন চেয়েছেন এই জীবনশিল্পী।

এক সাক্ষাৎকারে কবি ফকির লালন সাঁইয়ের মতো শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছিলেন। সেটি হলে তাঁর সৃজনসম্ভার হয়তো এখনো প্রতিনিয়ত আমাদের আলোড়িত ও বিস্মিত করত। তাঁর কলম ও মাথা চলত সমানতালে। যা কিছু বলতেন দৃঢ় উচ্চারণে, সুললিত ভাষায় জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক চারুশিল্পচর্চা শুরুর সুবর্ণজয়ন্তীতে শিল্পকলা একাডেমিতে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অননুকরণীয় ভাষায় তিনি শিল্পের সেই সময়টাকে তুলে ধরেছেন পরম আন্তরিকতায়। দৃশ্যান্তরী মানুষেরা গ্রন্থে নিজের চিত্রকলা নিয়ে তাঁর বলা – ‘ভাষার যে উচ্চারণ, চিত্রেও তারই বিতরণ – শব্দ আর আঁকা আমি ভিন্ন করে কখনো দেখিনি।’

নিজের ভেতরে দৃশ্যরূপ সৃজনের আকাঙ্ক্ষায় চিত্রকলার নানা কৌশল আয়ত্ত করার প্রচেষ্টার রসদ জুগিয়েছিলেন শিল্পীবন্ধু কাইয়ুম চৌধুরী। আড্ডা আর গল্পের ফাঁকে আঁকিবুঁকিতে মেতে উঠতেন। গুলশানে বৃক্ষশোভিত তাঁর বাড়ির বাগান ভরে তুলেছিলেন শৌখিন ভাস্কর্য-সৃজনে।

সহধর্মিণী আনোয়ারা সৈয়দ হক লিখেছেন – ‘তিনি চেয়েছিলেন নিজের ৮১তম জন্মদিনে একক প্রদর্শনীর আয়োজন করতে। সেটি আর হয়ে উঠলো না। তিনি বেশি আঁকতেন, যখন আমি বিদেশে থাকতাম। তাঁর তৈরি অনেক ছোট ছোট ভাস্কর্য তিনি বিদেশে আমার কাছে পাঠাতেন। যেগুলি আমি সংরক্ষণ করতে পারিনি।

তিনি কোনো পেশাদার আঁকিয়ে ছিলেন না। ছিলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মতোই স্বতঃস্ফূর্ত একজন ছবি আঁকিয়ে এবং ভাস্কর। পথচলতি যেটি হাতের কাছে কুড়িয়ে পেয়েছেন সেটি দিয়েই তিনি তৈরি করেছেন নতুন একটা কিছু।’

এবার আসি এ-প্রদর্শনীতে তাঁর চিত্রকলা-ভাস্কর্য প্রসঙ্গে। নানা মাধ্যমে আঁকা সাঁইত্রিশটি চিত্রকর্ম ও দুটি ভাস্কর্য এতে স্থান পেয়েছে। বেশিরভাগ কাজ শিরোনামহীন। মনে হয়, কবি এগুলোকে শিরোনামভুক্ত করার সময় করতে পারেননি। শিরোনাম পাওয়া চিত্রকর্মগুলো হলো – ‘জ্যোৎস্নায় দম্পতি’, ‘শৈশব স্মৃতি’, ‘পূর্বপুরুষে ফেরা’, ‘অধরা হাত’।

কাগজে প্যাস্টেল ও জলরঙে শিরোনামহীন এক চিত্রে সৈয়দ হক এঁকেছেন কালো রেখায় তিনটি ফিগর – প্রথম দুটি মানবসদৃশ হলেও তৃতীয়টি সারমেয়সদৃশ। যেন গোধূলিলগ্নে এরা হাঁটতে বেরিয়েছে।

‘জ্যোৎস্নায় দম্পতি’ শীর্ষক চিত্রকর্মটি ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা। আলো-আঁধারিতে পরস্পর বিপরীতে দাঁড়ানো নারী-পুরুষ কি জ্যোৎস্নায় অভিমানহত, নাকি জ্যোৎস্নায় দুজনের অপার মুগ্ধতা দুজনকে ছাপিয়ে গেছে!

শিল্পীদের কাছে প্রিয় এক বিষয় আত্মপ্রতিকৃতি। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং নিজেকে অনেকবার এঁকেছেন। শিরোনামহীন এক চিত্রে দেখি রোদচশমা পরা সৈয়দ শামসুল হকের আত্মপ্রতিকৃতি। চশমার দুটি কাচের একটি লাল অন্যটি কালো। লালকাঁচে বাংলাদেশের মানচিত্র।

‘শৈশব স্মৃতি’ শিরোনামের কাজটিতে কবির স্মৃতি যে এখনো অম্লান, সময়ের ধূসরতা যে তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, সেটি প্রতিভাত হয়েছে। মার্ক শাগাল সারাটি জীবন তাঁর ফেলে আসা গ্রাম ও স্মৃতি নিয়ে অনেক ছবি এঁকেছেন। সৈয়দ হকের অনেক লেখায় তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিময় কুড়িগ্রাম ঘুরেফিরে এসেছে। নিজের এলাকার একটা আদর্শরূপ দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন কল্পিত এক জনপদ – জলেশ্বরী। সে-পটভূমে রচনা করেছেন মানুষের বিস্ময়কর নৈর্ব্যক্তিক জীবনগাথা। ছবিতেও এর অনুরণন পাওয়া গেল।

তাঁর একাধিক ছবিতে চোখের উপস্থিতি দেখা যায়। চোখের গোলককে তিনি বেশকিছু ছবিতে ব্যবহার করেছেন। যেমন – ১৯৮৮ সালে আঁকা অধরা হাত ও একই বছরের শিরোনামহীন একাধিক চিত্রে চোখ ও চোখের গোলক প্রয়োগ করেছেন শিল্পী।

পাখিউড়া আকাশ সমুদ্রগর্জন আর ঢেউয়ের আছড়ে পড়া নিয়ে তেলরঙে দারুণ নন্দিত এক ছবি এঁকেছেন কবি-শিল্পী। এটিও তাঁর ১৯৮৮ সালের কাজ। ১৯৯০ সালে কাগজে জলরঙের স্বচ্ছ ওয়াশে কোরক থেকে ফুটে বের হয়ে আসা এক ফুলের ছবি এঁকেছেন। আমাদের চোখে অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা বয়ে আনে এ-ছবি। এ-সময়েই জলরঙে ব্রাউন আর কালোয় আঁকা কাজগুলোর সঙ্গে কবি শামসুর রাহমানের কবিতার সঙ্গে শিল্পী আমিনুল ইসলামের অঙ্কনের অন্ত্যমিল দেখা গেল।

প্রদর্শনীর একটি ভাস্কর্যেরে উল্লেখ না করলেই নয়। একটি ডাল দিয়ে মানুষের যে দেহাবয়ব সেটিকে দেখে মনে হয়, এই লোকটি যেন অস্ত্রধারী, পিস্তল তাক করে পজিশন নিয়ে আছেন। তাঁর কতক কবিতায় এমন বিষয় পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের নিষ্করুণ বাস্তবতা, দুনিয়াজুড়ে সত্তরের মুক্তিসংগ্রামের চাপ সম্ভবত এই রূপসৃজনে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের আঁকা চিত্রকর্মের এ-প্রদর্শনী চলেছে গত ২৩ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল ২০১৮ পর্যন্ত। এ-প্রদর্শনী অনুরাগী পাঠককুলের কাছে, চিত্রকলা দর্শক-বোদ্ধাদের কাছে – সৈয়দ শামসুল হকের পরিচয়কে পূর্ণতা দিলো।

Leave a Reply

%d bloggers like this: