আচ্ছা, বাড়ির সবাই মিলে কত দিন এখানে চায়ের আড্ডায় বসেনি?

প্রশ্নটা নিজেকে করে নিজেই যেন চমকে ওঠেন নওশের। তখনো তাঁর হাতে ধূমায়িত চায়ের কাপ, মাত্র একটি চুমুক দেওয়ার পর হঠাৎ এই প্রশ্নটা আজ মনে আসে। সেই উঠানের পাশে ছোট্ট রেলিং ঘেরা বারান্দা, পুরনো আমলের ডাইনিং টেবিল, ওপাশে বুড়ো নিমগাছের ছায়া। সব আগের মতোই আছে। অবশ্য সবই যে আগের মতো আছে, তা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পাল্টে যায়। রং চটে যাওয়া দেয়ালের সামান্য কিছু সংস্কার আর নতুন রং ছাড়া এ-বাড়ির তেমন কিছুই পাল্টায়নি। কিন্তু আগের সেই দিনগুলি একেবারে পাল্টে গেছে।

নওশেরের হঠাৎ ছেলেবেলার দিনগুলির কথা মনে পড়ে। এই ডাইনিং টেবিলে রোজ সকাল-সন্ধ্যায় চায়ের বিরাট আড্ডা বসেছে। বাবা সরকারি অফিসের কেরানি, নওশেরের কতই বা বয়স তখন, স্কুলে পড়ে। কিন্তু বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে সে সবার বড়। শমসের তার থেকে তিন বছরের ছোট, খুকি আরো ছোট। ছোট চাচা আর বেলু মামা কারোরই তখন বিয়ে হয়নি। ছোট চাচা একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন মাত্র। আর বেলু মামার খেলাধুলার দিকে ঝোঁক। এ-বাড়িতে থেকেই মামা তখন কোনো একটা স্পোর্টিং ক্লাবে ঢোকার জন্য রীতিমতো চেষ্টা শুরু করেছেন। রোজ সকালবেলা এই ডাইনিং টেবিলে তখন যেন হাট বসে যেত। বাবা আর ছোট চাচার অফিসে যাওয়ার তাড়া, নওশের-শমসেরের স্কুল। মা একা হাতে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করে তারপর চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে এসে বসতেন ডাইনিং টেবিলে। নওশের ক্লাস নাইনে ওঠার পর থেকে তার জন্য আধা কাপ চা বরাদ্দ হলেও শমসের আর খুকুর জন্য কেবলই দুধ।

কত কী যে গল্প হতো সেই আড্ডায়। আড্ডার ফাঁকেই বাবার হাতে বাজারের ফর্দ তুলে দিতেন মা। বাবা তখন ছোট চাচার সঙ্গে রাজনীতির আলোচনা শুরু করেছেন। বাজারের ফর্দটা কোনোমতে জামার পকেটে রেখে হয়তো বাবা বলছেন, সরকার এবার কিছুতেই নির্বাচনের তারিখ পেছাতে পারবে না।

ছোট চাচা বৈষয়িক মানুষ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, স্টক মার্কেটের অবস্থাটা খেয়াল করেছ ভাইজান, কীভাবে বড় বড় কোম্পানির দরপতন ঘটছে?

বেলু মামা এসবের মধ্যে নেই। তাঁর মাথার মধ্যে সারাক্ষণ কেবল ক্রিকেট। বাবা আর ছোট চাচার আলোচনার ফাঁকে সুযোগ বুঝে ঠিকই দেশ-বিদেশের ক্রিকেটের খবর শুনিয়ে দিতেন। মা কিছু না বলে চুপচাপ সবার কথা শুনতেন। বলতে গেলে এই ডাইনিং টেবিলে বসেই বাড়ির রান্নাঘর থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, শেয়ারবাজার, খেলাধুলার খবর কোনো কিছু বাদ যায়নি। কিন্তু কাপের চা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনাও শেষ। এদিকে এতক্ষণ রাজনীতির আলোচনা করে বাবা যে বাজারের ফর্দের কথা বেমালুম ভুলে যাবেন মা সেটা ভালোই জানতেন। তাই আর একবার মনে করিয়ে দেন, বাজার থেকে কী কী আনতে হবে ভুলো না যেন!

কিছু আনতে হবে নাকি, দাও তাহলে একখানা ফর্দ লিখে দাও।

আবার সন্ধ্যাবেলা বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে সেই একই দৃশ্য। মামা মাঝেমধ্যে এসে পড়লে বসে যেতেন সেই আড্ডায়। এত দিন পরও ছবির মতো ঘটনাগুলি যেন চোখের সামনে এসে ভিড় করে। মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। এর মধ্যেই বাবার মৃত্যু এবং ছোট চাচার বিয়ে করে বিদেশে চলে যাওয়া। এরপরও এ-বাড়ির চায়ের আড্ডাটা কখনো বন্ধ ছিল না। বেলু মামাও ততদিনে একটা ন্যাশনাল ক্রিকেট ক্লাবের ম্যানেজার হয়ে আলাদা বাসা নিয়ে চলে গেছেন। সময় পেলে মাঝেমধ্যে মামিকে নিয়ে এ-বাড়িতে বেড়াতে আসেন। আর নওশেরকে এরই মধ্যে পড়াশোনার পাট শেষ করে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। ছোট একটা ব্যবসা দিয়েই তার কর্মজীবন শুরু। এদিকে আর মাত্র দুটো বছর পর শমসের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হবে। খুকিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে। নওশের সারাদিন ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকলেও সকাল-সন্ধ্যা ডাইনিং টেবিলে চায়ের আড্ডায় তার হাজিরা কিন্তু বন্ধ হয়নি। মা তখনো নিজের হাতে ছেলেমেয়েদের জন্য চা করে আনেন। চায়ের টেবিলে বসে সবার মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে কথা হয়। শমসের বিদেশের স্কলারশিপের জন্য এখন থেকেই খোঁজখবর শুরু করেছে। মা তখন খুকির বিয়ের চিন্তায় অস্থির।      

চায়ের কাপে আরো একবার চুমুক দেন নওশের। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ছেলেবেলায় পড়েছিলেন : ‘সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়।’ সত্যিই তাই, সময় নদীর স্রোতের মতো কেবলই বয়ে যায়। আজ হাজার চেষ্টা করেও কৈশোরের সেই সোনালি দিনগুলি আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। ঘরের পাশের নিমগাছটা এখন কত বড় হয়ে প্রায় পুরো বাড়ির ওপর ছাতার মতো ছায়া দিচ্ছে। বাবা নিজের হাতে নিমের একটি ছোট চারা এনে ঘরের পাশে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তখন কে জানত এতটুকু একটি চারা বাড়ির ওপর মাথা তুলে দাঁড়াবে। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চারাগাছটি এখন পরিপূর্ণ বৃক্ষ হয়ে উঠেছে।

দেখতে দেখতে খুকিরও একসময় বিয়ে হয়ে গেল। শমসের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়া মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিদেশি স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে চলে যায়। নওশেরের জীবনেও আসে বিরাট পরিবর্তন। এদিকে পারিবারিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই দূরসম্পর্কের মামাতো বোন নাজনীন স্ত্রী হয়ে আসে তার জীবনে। এ যেন জীবনের আর এক নতুন অধ্যায়। তবে বিয়ের পর থেকে এ-বাড়ির অনেক কিছু বদলে যেতে শুরু করে। বদলে যায় বাড়ির দৈনন্দিন রুটিন। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের অসুস্থতাটাও দেখা দেয় তখন থেকে। বাড়িতে নতুন কাজের লোক আসে। মাকে আর নিয়ম করে
দু-বেলা চা তৈরি করতে হয় না। বরং কাজের লোক সবার ঘরে ঘরে সময়মতো চা পৌঁছে দিয়ে আসে। ডাইনিং টেবিলে সবার একসঙ্গে বসার সেই পুরনো রেওয়াজটা আর থাকে না। ধীরে ধীরে এটাই একসময় বাড়ির অভ্যাসে পরিণত হয়। যে যার মতো চুপচাপ এসে ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খেয়ে চলে যায়। এমনও হয়েছে, সপ্তাহের সাত দিন হয়তো বাড়ির অনেকের সঙ্গেই অনেকের দেখা হয়নি। একই বাড়িতে থেকেও নওশেরের সঙ্গে মেয়ে নীলার কত দিন যে দেখা হয়নি তা এখন হিসাব করে বের করা মুশকিল।

‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি …’

দোতলা থেকে নীলার খালি গলায় গাওয়া গান ভেসে আসছে। চায়ের কাপটা টেবিলে রাখেন নওশের। মেয়েটার গানের গলা ভারি মিষ্টি। একেবারে মায়ের স্বভাব পেয়েছে। অবশ্য বিয়ের পর এ-বাড়িতে এসে নাজনীনের আর কখনো গান গাওয়া হয়নি। সংসারের কাজেই সে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। নওশেরকেও ক্রমশ নিজের ব্যবসার কাজে এত বেশি ব্যস্ত হতে হয়েছে যে, বাড়ির সবার খোঁজখবর নেওয়ার মতো সময়ই তার হয়ে ওঠেনি। নাজনীন একাই সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। নওশের বুঝতেও পারেননি কখন কীভাবে তাদের মেয়ে নীলা বড় হয়ে উঠেছে। তবে মেয়ের যে গানের দিকে ঝোঁক আছে নওশের সেটা জানতেন। কিন্তু ও যে এত ভালো গান করে সেটা জানতেন না। জানবেন কী করে, কোনো দিন মেয়ের গান শোনার মতো কি সময় হয়েছে তাঁর? না, সময়ই তো হয়নি। সারাক্ষণ ব্যবসার কাজে দেশে-বিদেশে ছুটেছেন। বিশ্রামের সময়ই যেন হয়নি কখনো। কিন্তু এই করোনাকালে এখন বাড়িতে অখণ্ড অবসর, কিছুতেই এখন যেন সময় আর কাটতে চায় না। খালি চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে নওশের অনেক আগেই উঠে দাঁড়িয়েছেন। এবার এগিয়ে যান সিঁড়ির দিকে। নীলার ঘরটা দোতলার ঠিক দক্ষিণে একেবারে শেষদিকে। নওশের পায়ে পায়ে সেদিকেই এগিয়ে যান। নীলা তখনো খালি গলায় গেয়ে চলেছে –

‘বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয় পানে চাইনি …’

নিজের ঘরে ওয়্যারড্রবে জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখতে রাখতে আপনমনেই গাইছিল নীলা। ও যখন নিজের কোনো কাজের মধ্যে ডুবে থাকে, তখনই গুনগুন করে গায়। মনের আনন্দেই গায়। আজ সেভাবেই আপন খেয়ালে গাইছিল। হঠাৎ দরজার বাইরে বাবাকে দেখে চমকে ওঠে নীলা, বাবা তুমি! বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন, ভেতরে এসো।

হঠাৎ তোর গান শুনে ওপরে উঠে এলাম।

আমার গান শুনে?

হ্যাঁ, মানে আগে তো কখনো সেভাবে তোর গান শুনিনি তাই –

বাবার কথায় এবার নীলা হেসে ফেলে, আমার আবার গান!

কেন, ভালোই তো গাইলি মনে হয়।

এই একটু-আধটু যখন যা মনে আসে গাই। তবে সেটা গান হয় কি না জানি না।

কী বলিস, আমার কাছে তো বেশ ভালোই মনে হলো।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, ওই যে তুই গাইলি হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি …

সত্যিই তুমি আজ এত মনোযোগ দিয়ে আমার গান শুনেছ বাবা?

মেয়ের কথায় এবার বেশ লজ্জায় পড়ে যান নওশের। সত্যিই তো, এই এতটা বছর এক বাড়িতে থেকেও নিজের মেয়ের গাওয়া একটা গান কখনো শোনা হয়নি। আসলে শোনার মতো সময় হয়ে ওঠেনি কখনো। কিন্তু আজ মনে হলো, মেয়ের গান আরো আগেই শোনা উচিত ছিল। মেয়ের প্রশ্নের জবাবে ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি টেনে ধরে নওশের বলেন, আগে তো গান শোনার মতো আমার সময় হয়ে ওঠেনি মা, তাই বুঝতে পারিনি।

তা ঠিক। তুমি তোমার ব্যবসা নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকো, গান শোনার সময় কোথায় তোমার।

মেয়ের কণ্ঠে ক্ষোভ নাকি অভিমান নওশের ঠিক বুঝতে পারেন না। তবু বলার চেষ্টা করেন, আসলে ব্যবসার ভেতরে ডুবে ছিলাম। তাই বাড়ির কে কী করছে জানতেই পারিনি।

এবার জানতে পারলে?

হ্যাঁ, এই যে তুই কখন কীভাবে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলি সেটাও বুঝতে পারিনি। তোর মায়ের কাছে শুনেছি।

তাহলে বলতে হয়, করোনা ভাইরাস এলো বলেই আমরা এখন সবাই সবাইকে জানতে পারছি।

কথাটা মন্দ বলিসনি। আসলে ব্যস্ততা আমাদের পারিবারিক সম্পর্ককেও দূরে সরিয়ে রেখেছিল। একসঙ্গে বসে কথা বলার মতো এ-রকম অবসর আগে কখনো আসেনি।

তাই হবে বোধহয়।

গানটা বন্ধ করলি কেন মা, আবার গা না!

নীলা অবাক হয়ে তাকায় বাবার মুখের দিকে, বাবা তুমি সত্যিই আমার গান শুনবে?

তোর গান শুনবো বলেই তো নিচতলা থেকে দোতলায় উঠে এলাম।

কি বলছো, আমার গান শোনার জন্য তুমি নিচতলা থেকে উঠে এসেছো?

নীলা যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারে না, বাবা ওর গান শুনতে বাড়ির নিচতলা থেকে দোতলায় উঠে এসেছেন। সেই ছোটবেলা থেকে বাবাকে নীলা তেমন করে কখনো কাছে পায়নি। ওর যা কিছু আবদার সবই ছিল মায়ের কাছে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই বাবা আর নীলার মধ্যে যেন একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। নীলা তাই কখনো বাবাকে ওর কাছের মানুষ ভাবতে পারেনি। অথচ আজ এত দিন পর নিজের ঘরে খুব কাছাকাছি আর মুখোমুখি বসে মনে হচ্ছে, বাবাই যেন ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ, আপনজন। সকালবেলা ঠিক এই সময়ে দোতলার খোলা বারান্দা থেকে নীলার ঘরে বাইরের প্রথম আলো এসে পড়ে। আলোর সরু রেখাটা ক্রমশ বড় হতে হতে একসময় সারা ঘর ভরে যায়। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সেই আলো অনেক আগেই নীলার সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। বাবা আবারও বলেন, কী রে গাইবি না?

নীলা আবার গুনগুন করে গেয়ে ওঠে –

‘আমার সকল ভালোবাসায় সকল আঘাত সকল আশায়

তুমি ছিলে আমার কাছে, আমি তোমার কাছে যাইনি …’          

দেশজুড়ে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বাড়ির কাজের লোকজন সবাই ছুটি নিয়ে চলে গেছে। তাই রান্নাঘরের সব দায়িত্ব এখন নাজনীনের। তাকে একাই সব সামলাতে হয়। অবশ্য বাড়িতে কাজের লোকজন থাকলেও রান্নাটা নাজনীন নিজের হাতেই করেছে সবসময়। সাহায্য করার লোকজন সবসময় পাশে থাকায় তেমন অসুবিধা হয়নি কখনো। নীলা অবশ্য মাঝেমধ্যে এখন মাকে রান্নাঘরে সাহায্য করতে আসে। কিন্তু নাজনীনের সেটা অপছন্দ। মেয়ের পড়াশোনাটাই তার কাছে সবচেয়ে আগে। নীলা সবেমাত্র স্ট্যাটিসটিকসে অনার্সসহ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে। এখন মাস্টার্সের প্রস্তুতি চলছে। পড়াশোনায় মেয়েটা যথেষ্ট ভালো। মা তাই রান্নাঘরের চেয়ে নীলাকে ওর নিজের ঘরে পড়াশোনার মধ্যে দেখতেই বেশি পছন্দ করে। তবে নীলা নিজের ঘরে থাকলেও মা ওর উপস্থিতি সবসময় বুঝতে পারে। নিচতলায় রান্নাঘরে কাজের মধ্যে থেকেও দোতলায় নীলার খালি গলায় গুনগুন করে গাওয়া গান নাজনীন বেশ উপভোগ করে। কখনো নিজেও গুনগুন করে মেয়ের সঙ্গে গেয়ে ওঠে –

‘তুমি মোর আনন্দ হয়ে ছিলে আমার খেলায় –

আনন্দে তাই ভুলেছিলেম, কেটেছে দিন হেলায় …’

নীলা আজ অনেক দিন পর এ-গানটা গাইলো। ও প্রায়ই নিজের ঘরে গুনগুন করে গান গায়। ওর ঘর থেকে নিচে রান্নাঘরটা একটু দূরে হলেও নাজনীন শুনতে পায়। গানের কথাগুলি স সময় স্পষ্ট বোঝা না গেলেও সুরটা ঠিকই বোঝা যায়। আজ অনেকদিন পর নীলার গলায় গানটা শুনে আপনমনেই নাজনীন গুনগুন করে গাইল। এটা নাজনীনেরও খুব পছন্দের একটা গান। গানটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও সুরের রেশটা মনের ভেতর অনেকক্ষণ যেন থেকে যায়। নাজনীন তখন কলেজে সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। অ্যানুয়াল কালচারাল কম্পিটিশনে এই গান গেয়ে পুরস্কারও পেয়েছিল। সে সবই এখন স্মৃতি।

নাজু!

এ কি তুমি?

দেখতে এলাম তুমি কী করছো।

রান্নাঘরের দরজায় নওশেরকে দেখে অবাক হয় নাজনীন। কখনো তো নওশের রান্নাঘরে আসেন না। তার সে-সময়ই বা কোথায়। তাই যে-মানুষটি কখনো রান্নাঘরের ধারেকাছে ঘেঁষেননি কোনো দিন তাঁকে আজ হঠাৎ রান্নাঘরে দেখে অবাক হওয়ারই কথা। নওশেরের কথা শুনে হেসে ওঠে নাজনীন, কী করছি মানে, রান্নাঘরে আমি রোজ কী করি!

হ্যাঁ, রান্না করছ আমি জানি। তাই ভাবলাম তোমাকে যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি।

রান্নাঘরে তুমি আমায় সাহায্য করবে?

কেন, ছেলেবেলায় মায়ের সঙ্গে আমি রান্নাঘরে অনেক কাজ করেছি।

কিন্তু তুমি এখন সেই ছেলেবেলায় আর নেই। তাছাড়া এখন তোমার সেই সময়ই বা কোথায়?

কী বলছ নাজু, এখন আমার হাতে অনেক সময়। তাই বলছি, কিছু কাজ থাকলে আমাকেও করতে দাও। 

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুপুরের রোদটা একেবারে মাথার ওপরে উঠে যায়। নিমগাছটা যদিও বাড়ির ওপর ছাতার মতো ছায়া হয়ে আছে, কিন্তু মাঝদুপুরে বাড়ির উঠানটা রোদে ঝলমল করে। গাছের ডালপালা আর সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে বাড়ির প্রায় সবখানেই দুপুরের রোদ ছড়িয়ে পড়ে। নওশেরের আজ কেন যেন ছেলেবেলার দিনগুলির কথা খুব বেশি করে মনে পড়ছে। মাকে এ-সময়ে যদি কোথাও খুঁজে পেতে হয় তবে সেটা ছাদে। হয়তো ডালের বড়ি শুকোতে নয়তো বাক্স থেকে জামা-কাপড় বের করে ছাদে রোদে মেলে দেওয়া। এসবই ছিল মায়ের নিত্যদিনের কাজ। মা কি এখনো তাঁর সেই পুরনো অভ্যাসটা বজায় রেখেছেন? পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নওশের ছাদে উঠে যান। কিন্তু না, ছাদে মা নেই। তবে কি মায়ের শরীর খারাপ, নাকি এই অভ্যাসটা মা অনেকদিন আগেই বদলে ফেলেছেন? ছোটভাই শমসেরের কথা হঠাৎ মনে পড়ে। শমসের দেশের বাইরে থাকায় মায়ের সঙ্গে মাঝে মাঝে ভিডিও ফোনকলে তার কথা হয়। কিন্তু নওশের বাড়িতে থেকেও মায়ের সঙ্গে সেভাবে দেখা হয় না। ঠিক কবে যে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে এখন যেন তাও মনে পড়ে না।

বাবা, রোদে না দাঁড়িয়ে এখানে ছায়ার ভেতর আয়।

ছাদে মাকে কোথাও না দেখে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মায়ের কণ্ঠ শুনে নওশের থমকে যান। ছাদে চিলেকোঠার ওপাশে আচারের বয়ামগুলি রোদে দিয়ে মা কার্নিশের ছায়ার নিচে চুপচাপ বসে আছেন। নওশের মায়ের কাছে গিয়ে বসেন। মা কেমন আছেন তা জানার আগে মা নিজেই প্রশ্ন করেন, অনেক দিন তোর মুখখানা দেখিনি বাবা, অনেক শুকিয়ে গেছিস। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না বুঝি!

আমি ভালো আছি আম্মা। মাঝে আপনার শরীর খারাপ হয়েছিল, এখন কেমন আছেন?

আমার আর থাকা না থাকা, আল্লাহ্ ভালোই রাখছে।

কিন্তু আম্মা, আপনি কি এখনো সেই আগের মতো দুপুরে ছাদে ডালের বড়ি শুকোতে আসেন?

কথাটা বলেই যেন নওশের অপ্রস্তুত হয়ে যান। এরকম কথা বলে মাকে বিব্রত করা ঠিক হয়নি। কিন্তু ছেলের কথা শুনে মায়ের মুখে হাসি ফোটে। দুপুর রোদে ঘামে ভেজা মায়ের ক্লান্ত মুখখানার দিকে চেয়ে নওশের চমকে ওঠেন। মনে হয় একটা বিরাট বটবৃক্ষ যেন বাইরের রোদ-তাপ সয়ে তার জন্য ছায়া বিছিয়ে রেখেছে। ছেলের প্রশ্নের জবাবে মা হেসে বলেন, আগের মতো এখন আর পারি না বাবা!

তাহলে এই ভরদুপুরে একা ছাদে বসে আছেন কেন?

আচারের বয়ামগুলি রোদে দিয়েছি তাই।

আম্মা, আপনি এখনো আচার তৈরি করেন, সেই আমের মোরব্বা?

তোর মনে আছে বাবা?

মনে থাকবে না কেন। আমের মোরব্বা নিয়ে আমাদের ভাইবোনের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত।

খুকি আবার বরইয়ের আচার বেশি পছন্দ করত। 

সব মনে আছে আম্মা, শমসেরের সঙ্গে এই নিয়ে খুকির কত ঝগড়া-কান্নাকাটি।

এখন আচারের বয়ামগুলি কেউ ছুঁয়েও দেখে না।

কত দিন পর মা-ছেলে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি যেন আবার নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন। কোনো কথা হয়তো মায়ের মনে নেই, নওশের সেটা মনে করিয়ে দেন। আবার নওশেরের ভুলে যাওয়া কথা মনে করান মা। কত বছর পর মায়ের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলেন নওশের। নিমিষেই মন থেকে সব দুঃখ-বেদনা হারিয়ে যায়। আঁচলে মুখ মুছে মা বলেন, নিচতলার চায়ের টেবিলটার কথা খুব মনে পড়ে, বাবা। 

আমারও মনে পড়ে।

ওখানে বাড়ির সবাই মিলে কত কথা হতো, এখন আর সেখানে কিছুই হয় না।

বিকেলের রোদ পড়ে আসে। বাড়ির আঙিনা জুড়ে তখন নিমগাছের ঘন ছায়া। একটু পর সন্ধ্যার আঁধার নামে।  অন্য দিনগুলিতে বাড়ির নিচতলাটা এ-সময় সুনসান থাকে। কিন্তু আজ অনেক দিন পর পুরনো ডাইনিং টেবিলটা যেন গমগম করে উঠল। মাকে সঙ্গে নিয়ে নওশের নেমে এলেন নিচে। স্ত্রীকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ডেকে বললেন, নাজু, আজ থেকে আমরা সবাই মিলে এখানে বসে চা খাবো।

বাবার সেই উচ্ছ্বসিত গমগমে গলার আওয়াজ পেয়ে দোতলা থেকে নেমে এলো নীলা। বললো, ঘরে একা বসে চা খাওয়ার মধ্যে কোনো মজা নেই।

এবার নাজনীনও চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে এলেন চায়ের টেবিলে। মা বললেন, সবাই মিলে একসঙ্গে না বসলে বাড়িটাকে যেন ঠিক বাড়ি মনে হয় না।

চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দেয় নীলা। ওর কণ্ঠে তখনো গুনগুন করছে গানের সুর। নাজনীনও সেই সুরে নিজের কণ্ঠ মেলান –

‘গোপন রহি গভীর প্রাণে আমার দুঃখসুখের গানে

সুর দিয়েছ তুমি, আমি তোমার গান তো গাই নি…’