সরলাসুন্দরী

লেখক:

মাহবুব রেজা

সন্ধ্যা পেরিয়ে বেড়ালের মতো গুটি-গুটি পায়ে নামছে রাত। নিঃশব্দে। বড় উঠোনের ভাঙা মেঝে। চির ধরা মোটা দাগ। উঠোনে একটা আদিমকালের হাওয়া একা একা ঘুরপাক খায়। দেখা যায় না, টেরও পাওয়া যায় না।

ঘরের দরোজার দুটো পাল্লাই হাঁ করে খোলা। ঘণ্টাখানেক আগে শব্দ করে মোড়ের ট্রান্সফরমার জ্বলে গিয়ে পুরো এলাকায় ঘন দুধের মতো লোডশেডিং নেমে এসেছে। সমীর গরমে ঘরে টিকতে না পেরে উঠোনে এসে বসেছে। শীতকাল-গরমকাল বলে কোনো কথা নেই। বাড়ির উঠোনে একটা কাঠের চেয়ার পাতা থাকে বারো মাসই। সমীর হাতপাখা নিয়ে অন্ধকারে চেয়ারে বসে থাকে। উঠোন থেকে দেখা যায়, ঘরের ভেতর জমাটবাঁধা অন্ধকার। সমীর দেখছিলও তা।

বাড়িটা অনেক জায়গা জুড়ে। একসময় তিন বাড়ি একসঙ্গে ছিল। দেশভাগের সময় নিখিলেশ বিশ্বাস নিজের জায়গা বিক্রি করে কলকাতায় চলে গেলেন। তারপর স্বাধীনের বছরখানেক আগে অবিনাশও নিখিলের পথ ধরল। অবিনাশ চলে যাওয়ার সময় তার ছোটভাই রণজিৎকে বলেছিল, তুই আর এই দেশে থাইকা কী করবি? ল, আমগো লগে। বড়দার কাছে যাইগা।

রণজিৎ অবিনাশের সঙ্গে যায়নি।

কেন যাবে? অবিনাশকে সে রাগ করে উত্তর করেছিল, তুমি যাইতাছো যাও, আমারে এর মইদ্যে হান্দাও ক্যা?

রণজিতের কথায় অবিনাশ আর কথা বাড়ায়নি। সে তার ছোটভাইকে চেনে। রণজিতের ঘাড়ের রগ বাঁকা। ঘাড়ত্যাড়া মানুষজনের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব নিয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ।

বড়দা, মেজদা চলে যাওয়ার ফলে রণজিতের বাড়ির অংশ কমে এসেছে। সবমিলিয়ে আড়াই কাঠা জায়গার ওপর রণজিতের অংশের বাড়িঘর। এক ছেলে সমীর আর দুই মেয়ে অপলা, অতসী। অপলা বিয়ে করে কলকাতায় মেজদার ধারেকাছে থাকে। অতসী বিয়ে করেছে, তবে জামাই ভ্যাগাবন্ড। এখানে-সেখানে রাত কাটায়। ঘরে দুবছরের মেয়ে শশী। ওর জন্যও মন পোড়ে না।

সমীরদের বাড়িজুড়ে বেশ গাছ। এত গাছ যে, দিনের বেলাতেও বাড়ির মধ্যে অন্ধকার ছায়া খেলা করে। বড় বড় গাছের পাতারা থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। পাতাদের ভাবটা এমন, নট নড়ন নট চড়ন। সমীর চেয়ারে বসে আর কী করবে! অন্ধকার ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সমীর হঠাৎ দেখতে পেল, ঘরের ভেতর কেউ যেন হেঁটে দরজার এ-পাশ থেকে ও-পাশে চলে গেল। একটা শরীরী ছায়া হাওয়ার মধ্যে খেলে গেল!

একবার নয়, পরপর দুবার।

আরে! কী আশ্চর্য!

সমীর চমকে গেল। ঘাবড়েও গেল খানিকটা। সমীর নড়েচড়ে বসল চেয়ারে। নড়েচড়ে বসার ফলে চেয়ারের পায়ার সঙ্গে পুরনো কালের সিমেন্টের উঠোনের ঘষা লেগে একটা অদ্ভুত ধরনের শব্দ তৈরি হয়। আর সে-শব্দটা অন্ধকার উঠোনে ছন্দ তুলে নেচে বেড়াতে লাগল।

সমীর একা মানুষ। বয়স গিয়ে দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশে। নাকি তারও ওপরে! সমীর ভাবল, অতসী মেয়েকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে অপলার ওখানে গেছে। ঘরে কেউ নেই। তাহলে ঘরের ভেতর কে হাঁটাহাঁটি করে!

কে হেঁটে-হেঁটে দরজার এ-পাশ থেকে ও-পাশে যায়! ভাবনাটা সমীরের ভেতর দীর্ঘ হয়, ধবধবে সাদা রঙের বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে দিয়ে এই অন্ধকারে ঘরের ভেতর কে হাঁটাহাঁটি করছে?

সমীর চেয়ারে বসে থাকে। ননীমোহন বসাক লেনে সমীরদের বাড়িটা সবচেয়ে পুরনো। সমীরদের বাড়ি ঘেঁষে মালতিদের বাড়ি। মালতির বাবা নারায়ণ চক্রবর্তী বাড়ি বিক্রি করে গ্রামে চলে গেছেন। বিক্রমপুর। মালতিদের বাড়ির মাধবীলতার ঝাড় দেয়াল টপকে সমীরদের বাড়ি চলে এসেছে। অনধিকার প্রবেশ। মাধবীলতার গন্ধে আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সমীরের তখন দম নিতে কষ্ট হয়। সমীর ঘরের ভেতর চোখ ফেলে ম্লান কণ্ঠে নিজেকে নিজে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, ঘরের মইদ্যে কেডায় হাঁটে! কথা কইলে জব দেয় না ক্যা!

সমীরের কথাগুলো কিছুদূর ভেসে গিয়ে আবার ফেরত আসে। কথাগুলো উঠোনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।

সমীর আবার কথা বলে। জবাব আসে না। খাঁ-খাঁ নীরবতা।

সমীর এবার একটু ভয়ই পায়। সে চেয়ারে শক্ত হয়ে বসে ধরা গলায় জোর দিয়ে বলল, ঘরের মইদ্যে কেডায় হাঁটে? কথা কয় না ক্যা – বলে কিছুক্ষণ চুপ থাকে সমীর। উত্তর আসে না। নীরবতা ঘুরপাক খায়। ঘরের ভেতর থেকে কোনো উত্তর না এলে সমীর আবার বলে ওঠে, ঘরের মইদ্যে য্যায় হাঁটে হ্যায় কি বোবা!

সমীর কথাটা বলে চুপ করে যায়। উঠোনে তাকে ঘিরে নেচে বেড়াতে থাকে তার কথার ধ্বনি। প্রতিধ্বনি।

 

দুই

সরলাসুন্দরী। সমীরের মা। দেখতে প্রতিমার মতো হলেও সরলা কথা বলতে পারত না। সরলার স্বামী রণজিতের এ নিয়ে কোনো  হা-হুতাশ নেই। সরলা মুখে কথা বলতে পারে না এ-কথা যেমন সত্য, তেমনি এ-কথাও অনেক বেশি সত্য যে, সরলা চোখ দিয়ে তার চেয়েও বেশি কথা বলতে পারে। রণজিৎ সরলার সে-ভাষা বোঝে। সরলাকে বিয়ে করার পর রণজিৎ সবাইকে বলত, সরলা তো মুখ দিয়া কথা কয় না। আমার সরলা কথা কয় চোখ দিয়া।

সরলাসুন্দরীর চোখ যে কী সুন্দর ছিল!

যুদ্ধের সময় রণজিৎকে বাড়ি থেকে তুলে দূরের বিলে নিয়ে গিয়েছিল। দুদিন পর বিলে ভেসে উঠেছিল রণজিতের লাশ। আর সরলাসুন্দরীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ক্যাম্পে। তারপর থেকে সরলার কোনো খোঁজ নেই। তবে ওরা যেদিন সরলাকে নিয়ে গিয়েছিল সেদিন সরলার পরনে ছিল না সাদা, না ঘিয়ে রঙের একটা শাড়ি।

শাড়ির রংটা এখনো সমীরের চোখে ভেসে ওঠে। কতকাল আগের কথা!

সমীর উঠোনের অন্ধকারে ডুবে গিয়ে চেয়ারে বসে থাকে। সে দেখতে থাকে, ঘরের ভেতর কেউ একজন হেঁটে একবার এ-পাশ থেকে ও-পাশ, আরেকবার ও-পাশ থেকে এ-পাশ করছে। অন্ধকারের মধ্যে কতকাল আগের পুরনো শাড়িটা সমীরের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। না সাদা, না ঘিয়ে রঙের শাড়ি।

সমীরের মনে হলো, ঘরের ভেতর বুঝি তার মা হাঁটছেন। সরলাসুন্দরী কতদিন পর তার ননীমোহন বসাক লেনের বাড়িতে এলেন?

উঠোনে তখন মালতিদের দেয়াল টপকে আসা মাধবীলতার গন্ধ বুনো সাপের মতো কিলবিল করছে। কোত্থেকে একটা হিমশীতল সমীরণ এসে আলতো করে স্পর্শ করে যায় সমীরকে। সমীরের চোখের সামনে তখন একটা হালকা আলোর ঢেউ।

আলোর ঢেউটা আসলে কে?

সরলাসুন্দরী?

নাকি অন্য কেউ?

সমীর বুঝে উঠতে পারে না।

 

তিন

মাধবীলতার গন্ধে সমীরের মাথার ভেতরটা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। একসময় সমীরের মাথা সেই গন্ধে ঢেকে যায়। কিছুক্ষণ পর সমীরকে আরো অবাক করে দিয়ে ঘরের ভেতর থেকে চুড়ির একটা রিনঝিন শব্দ ভেসে আসে। সমীরের কানে শব্দটা দীর্ঘক্ষণ ঝুলে থাকে।

সমীর অন্ধকারের মধ্যে বসেই থাকে।

হঠাৎ সমীরের মোবাইল বেজে ওঠে।

সমীর দেখল, মোবাইলের স্ক্রিনে ভাসছে অপূর্ণার নাম।

সমীর ফোন ধরে অপূর্ণাকে সব খুলে বলল। সমীরের কথা শুনে মোবাইলের অন্য পাশ থেকে অপূর্ণা হেসে ওঠে, তুমি যে কী আলাই-বালাই কথা কও, বলে অপূর্ণা হাসতেই থাকে।

উঠোনে তখন গেছোসাপের মতো কিলবিল করে ছড়িয়ে পড়ছে অপূর্ণার হাসি আর ঘরের ভেতর থেকে উঠে আসা চুড়ির শব্দ। সমীর অন্ধকার উঠোনে হাসির মধ্যে ডুবে গেল। চুড়ির শব্দে ভেসে গেল।