সহোদর

লেখক: তানভীর মোকাম্মেল

ঝাউডাঙার পিচের বড় রাস্তাটায় উঠেই পরেশ দত্ত বুঝতে পারলেন, ভুল করে ফেলেছেন। কারণ দূর থেকে শাঁ-শাঁ করে আসা মিলিটারিভরা ট্রাকটা তখন ওদের অনেকটাই কাছে এসে পড়েছে। মাথায়, কাঁখে বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে পলায়নরত ওর পরিবারটি ততক্ষণে সৈন্যদের চোখে পড়ে গেছে। অবশ্য কেবল পরেশ দত্তের পরিবার নয়, আরো কয়েকটি পরিবার। আসলে চুকনগর গণহত্যা থেকে কপালগুণে সপরিবারে বেঁচে যাওয়া পরেশ দত্ত বোধহয় একটু বেশিই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। কারণ আর মাত্র তো আধমাইল পথ পেরোলেই ভারতের সীমান্ত। এই পাকা রাস্তাটা, তারপরে কিছুটা পাটক্ষেত, তারপরেই ওই তো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সীমান্তরেখা। ওদের আগে যত মানুষ হেঁটে গেছে, তারা তো এতক্ষণে সবাই প্রায় নিরাপদে সীমান্তের ওপারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরো কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে আটকে গেল পরেশ দত্তের পরিবারটিও। পরিবার বলতে বছর পঞ্চাশের পরেশ দত্ত, স্ত্রী মালতী রানী আর দুই ছেলেমেয়ে, বছর পনেরোর দীপালি ও এগারো বছরের রমেন বা রমু।
মিলিটারিদের জলপাই রঙের ট্রাকটি থেকে টপাটপ লাফ দিয়ে নেমে এলো দশ-বারোজন খাকি পোশাকপরা সৈন্য। ওদের মাথায় হেলমেট। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। সৈন্যরা দ্রুত পরেশ দত্তের পরিবারসহ রাস্তার ওপরকার মানুষদের ঘিরে দাঁড়াল। কেমন যেন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে পড়লেন পরেশ দত্ত এবং ওর স্ত্রী আর ছেলেমেয়ে দুটো। ওদের সঙ্গে আরো পাঁচ-ছয়টি পরিবার। খুবই অভ্যস্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সৈন্যরা বিহ্বল মানুষগুলোকে লাইন করে দাঁড় করাল। কেউ দেরি বা দ্বিধা করলে রাইফেলের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করছিল। আর ধমকের সুরে উর্দুতে নানা কিছু বলছিল। সব বাক্য বুঝতে না পারলেও ‘লাইন মে খাড়া হো যাও’, ‘শালে মালাওন কা বাচ্চে’ আর ‘ইন্ডিয়া ভাগ রাহা হ্যায়’ এসব শব্দ বুঝতে পারছিলেন পরেশ দত্ত।
লাইনটা দাঁড়িয়ে গেলে ট্রাকের সামনে থেকে ওদের অফিসারটি নামল। অফিসারটির হাতে বেতের মতো একটা ছোট লাঠি। লাঠিটাকে যে নিয়মিত তেল খাওয়ানো হয় তা বোঝা যায়। সূর্যের আলোতে চকচক করছে লাঠিটা। লাইনে নারী-পুরুষ-শিশু সবাই দাঁড়িয়ে। বেশ কয়েকজন তরুণী মেয়েও ছিল। লাইনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় লোকজনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল অফিসারটি। তারপর একেকজন যুবতী নারী বা তরুণী মেয়ের দিকে ওর হাতের লাঠিটা দিয়ে ইঙ্গিত করছিল আর দুজন সৈন্য মেয়েটাকে টেনেহিঁচড়ে ট্রাকটার কাছে নিয়ে যেতে থাকল। আর ট্রাকের ওপরে দাঁড়ানো অন্য দুজন সৈন্য মেয়েটাকে ট্রাকটার ওপর তুলতে থাকল। চারদিকে কান্না, চিৎকার ও ধমকের আওয়াজ। অফিসারটি একসময় পরেশ দত্তের পরিবারটির সামনেও এলো। আর পরেশ দত্ত ও ওর বউ মহাআতংকে দেখলেন, অফিসারটি ওর লাঠিটা তুলে পরেশবাবুর কিশোরী মেয়ে দীপালির দিকে ইঙ্গিত করল। পরেশবাবু দাঁড়ানো অবস্থা থেকেই সটান অফিসারটির পায়ে পড়ে গেলেন। দু-পা জড়িয়ে আকুল কণ্ঠে বলতে চাইলেন ওর মেয়েটাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু অফিসারটি ওর বুটজুতা দিয়ে সজোরে এক লাথি কষাল পরেশবাবুর বুকে। পরেশবাবুর দেহটা কিছুটা শূন্যে উঠে দূরে ধুলোর ওপর ছিটকে পড়ল এবং তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে থাকলেন পরেশবাবুর স্ত্রী মালতী রানীও। কিন্তু সেসব কান্নাকে কিছুমাত্র আমলে না এনে দুজন সৈন্য দুদিক থেকে দীপালিকে ধরে ট্রাকটার দিকে টেনে নিয়ে গেল এবং দীপালিকেও ট্রাকটাতে তোলা হলো। অফিসারটি সৈন্যদের কিছু একটা বলে গটগট করে হেঁটে ট্রাকের সামনের সিটে গিয়ে বসল। অফিসারের পিছু পিছু কিছু সৈন্য ট্রাকে গিয়ে উঠল। কিছু ওখানেই রয়ে গেল। ট্রাকটি বেশ গর্জন করে স্টার্ট নিল। এগারো বছরের রমু হঠাৎ লাইন থেকে বেরিয়ে ‘দিদি’ বলে চিৎকার করে চলন্ত ট্রাকটার দিকে ছুটে গেল। এ-সময় ট্রাকের ওপর থেকে শোনা গেল দীপালির কান্নাভেজা চিৎকার – ‘ভাই, পালা! … পালিয়ে যা!’ কিন্তু রমু ক্রমেই ট্রাকটার দিকে দৌড়ে এগিয়ে আসতে থাকল। একজন সৈন্য রমুর দিকে তাক করে ওর হাতের রাইফেলটা তুলল। কিন্তু এ-সময় লম্বা চোয়ালের চোয়াড়ে চেহারার এক হাবিলদার ও এক সৈন্যের যেন চোখাচোখি হলো। যে-সৈন্যটি রাইফেল তুলেছিল, হাবিলদার হাত তুলে ওকে গুলি করতে মানা করল। এরপর ট্রাকটা থামিয়ে বালক রমুকেও টেনে তোলা হলো ট্রাকটাতে। আর এর পরপরই হঠাৎ প্রচণ্ড গুলিবর্ষণের আওয়াজে কেঁপে উঠল চারপাশের আকাশ-বাতাস। দীপালি আর রমু মহাআতংকে ও ভয়ে বিস্ফারিত চোখে দেখল, কাটা কলাগাছের মতো ওর বাবা-মাসহ লাইনে দাঁড়ানো শরণার্থীরা সব মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। গুলির ধোঁয়া, মানুষের আর্তনাদ আর রাস্তার ওপর উড়তে থাকা ধুলো সব মিলে গোটা জায়গাটা এক অবর্ণনীয় ধোঁয়াশায় রূপ নিয়ে ফেলল। দেহগুলো আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকল। অল্প কিছু মানুষ দৌড়ে এদিক-ওদিক ছুটে পালাতে থাকল। আর ট্রাকের ওপর দাঁড়ানো সৈন্যরা ওদের তাড়া খাওয়া প্রাণীর মতো নিশানায় এনে গুলি করে মারতে লাগল। লক্ষ্য ভেদ করতে পারলে খুশির হাসি হেসে পাশের সৈন্যটার দিকে তাকাচ্ছিল। আর গুলির প্রচণ্ড আওয়াজে বেশকিছু কাক আশপাশের গাছগুলো থেকে আকাশে উড়ে কা-কা চিৎকারে সমস্ত আকাশ যেন ভরিয়ে তুলল।
গুলির পর্ব শেষ হলে ট্রাকটা আবার চলতে শুরু করল। ট্রাকের মেয়েগুলোর কান্না ও আর্তনাদের কোনো বিরাম নেই। তবে রমু দেখল ওর দিদি কেমন যেন অবসন্নের মতো ট্রাকের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। দুচোখে ঠিক ভয় বা কান্না নয়, কেমন যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা। রমুর দিকে তাকিয়ে অস্ফুট গলায় কেবল বলল : ‘পালালি না ক্যান বোকা! … ক্যান পালালি না?’
মিনিট বিশেক চলার পর ট্রাকটা এসে থামল একটা ফ্যাক্টরির গেটের সামনে। বোঝা গেল, এটা একটা বন্ধ-হয়ে-যাওয়া চিনিকল। চারিদিকে আখ মাড়াইয়ের নানা লোহার যন্ত্র। বেশ কিছু সৈন্য গেটটার সামনে জটলা করছিল। ট্রাকটার ওপর এতগুলো তরুণীকে দেখে সৈন্যগুলো মহাআনন্দে চিৎকার করে উঠল। ট্রাকটা ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে একটা গোডাউনের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘড়ঘড় করে খুলল গোডাউনের লোহার বড় গেটটা। মেয়েগুলোকে ট্রাক থেকে নামিয়ে ঢোকানো হলো ওই গোডাউনের ভেতরে। সবকিছু কেমন যেন একটা ছবির মতো ঘটছিল রমুর চোখের সামনে। একসময় ঘড়ঘড় করে গোডাউনটার ভারি গেটটা বন্ধও হয়ে গেল। রমুকে কেউ ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করল না। ট্রাকের সেই চোখ-মটকানো সৈন্যটা ওকে শুধু বলল – ‘তু ইধার ঠেক।’ রমু চেঁচিয়ে বলল – ‘আমার দিদি!ত্ত্বি লোকটি বলল – ‘মিল যায়ে গা।’ আবারো যেন সৈন্যটির সঙ্গে চোখাচোখি হলো লম্বা চোয়ালের হাবিলদারটির। এবার হাবিলদারটি ওর খ্যাসখ্যাসে মোটা গলায় বলল – ‘তু এহি রহা যা।’
এখন থেকে রমুর কাজ হলো প্রতি সকালে, দুপুরে ও বিকেলে টিউবওয়েল থেকে পানি ভরে বিশাল চিনিকলটার যেখানে-যেখানে সৈন্যরা তাঁবু গেড়ে রয়েছে, সেসব তাঁবুতে পানি পৌঁছে দেওয়া। একটা বাঁশের দু-ধারে জলভরা দুটো টিনের ক্যানেস্তারা ঝোলানো। অনেক কষ্টে রমু ওটা বয়ে নিয়ে যায় তাঁবুগুলোতে। চিনিকলটার ভেতরে তিনদিকে তিনটে তাঁবু। তার মধ্যে দুটোতে আবার দুটো বড় কামান বসানো। আর বাইরের গেটের দুপাশে রয়েছে আরো দুটো তাঁবু। দিনটা রমুর কাটে এসব তাঁবুতে পানি পৌঁছানোর কষ্টকর কাজে। এছাড়া আরো কিছু ফাই-ফরমাশ খাটতে হয় ওকে। তবে সবচেয়ে খারাপ লাগত ওর যখন কোনো কোনো রাতে ওই লম্বা চোয়ালের সুবেদারটি বা ওই চোখ-মটকানো সৈন্যটার কেউ একজন ওকে ধরে চিনিকলের দেয়ালের আড়ালে নিয়ে যেত। বালক রমুর জানার কথা নয় যে, ওই সুবেদার আর ওই সৈন্যটি পাকিস্তানের যে-অঞ্চল থেকে এসেছে, সেখানে নারীদেহের মতো অল্পবয়সী বালকরাও সমভাবে আকর্ষণীয়। প্রচণ্ড ব্যথার যন্ত্রণা ও ক্ষোভে-ঘৃণায় রমুর সমস্ত শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলেও ও সহ্য করে যেত। আর এটা ঘটত প্রায় রাতেই। তবে মিলিটারিদের এই ক্যাম্পটাতে ও একা নয়। এরকম আরো তিন-চারটি ওর কাছাকাছি বয়সের ছেলে ছিল। সারাদিন নানা কাজের ফাঁকে ফাঁকে রমু চেয়ে চেয়ে দেখত বদ্ধ গোডাউনটার দিকে। দুপুরের দিকে একবার করে গেট খুলত। তখন হইহই করে কিছু সৈন্য ওই গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকত। আরেকবার খুলত রাতে। তখন সৈন্যরা দলবেঁধে বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে গোডাউনটার ভেতরে গিয়ে ঢুকত। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে গোডাউনটার বন্ধ গেটটার ভেতর থেকে ভেসে আসত নানা রকম চিৎকার, কান্না, আর্তনাদ।
আর গেটের উলটোদিকে একটা দালানবাড়ির দু-তিনটে ঘরে থাকত ওদের যে ধরে এনেছিল সেই ক্যাপ্টেনটি ছাড়াও আরো দুজন অফিসার। ক্যাম্পের অফিসঘরটাও ওই দোতলা দালানে। প্রতি রাতে গোডাউনের গেট খুলে দু-তিনজন মেয়েকে ওই দালানে নিয়ে যাওয়া হতো। আঁধারের মধ্যে রমু অনেক চেষ্টা করত দেখতে যে, ওই মেয়েদের মধ্যে ওর দিদি আছে কি না? কিন্তু ঘন আঁধারের মধ্যে সবকিছু পরিষ্কার দেখা যেত না। রাতে ক্যাম্পে কোনো আওয়াজ করা নিষেধ। আলো জ্বালানোও। মেয়েগুলোকে নিয়ে ওদের সঙ্গের পাহারার সৈন্যগুলো কেমন যেন ছায়ামূর্তির মতোই নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে মেয়েগুলোকে অফিসারদের দালানে পৌঁছে দিত।
এভাবেই চলছিল রমুর দুঃস্বপ্নের মতো দিনগুলো। কতগুলো দিন ও রাত যে পার হয়েছে তার হিসাবটাও ও রাখতে পারেনি। হ্যাঁ, একদিনই কেবল ওর দিদির দেখা পেয়েছিল ও। তবে সে-দেখা না হলেই যেন ভালো হতো! একদিন ভোরবেলা টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে বড় গেটটার দিকে যাচ্ছিল রমু। পথটা অফিসারদের দালানবাড়িটার সামনে দিয়ে। হঠাৎ ওর পা যেন পাথরের মতো আটকে গেল। দেখল ওর দিদি দুটো মেয়ের সঙ্গে হেঁটে আসছে। দিদিকে চিনতে ওর কষ্টই হচ্ছিল। মাথায় উস্কোখুস্কো চুল, পরনের শাড়িটা কয়েক জায়গায় ছেঁড়া, হাঁটছিলও একটা হাত আরেকটা মেয়ের কাঁধে ভর রেখে, কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সামনে ও পিছনে ওদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল দুজন বিহারি রাজাকার, যারা এই ক্যাম্পটাতে নানা
ফাই-ফরমাশ খাটে। রমুকেও দেখতে পেল ওর দিদি। আর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে-ও। তারপর যে-কথাটি ওর দিদি ওদের ধরা পড়ার প্রথম দিন ট্রাকের ওপরে বলেছিল সেই কথাটিই আবার চিৎকার করে বলল : ‘তুই পালা রমু! … এখনো পালাসনি? … পালা!’ তবে চিৎকার করে বললেও কেমন যেন ফ্যাচফেচে বিজাতীয় শোনাল কিশোরী দীপালির গলাটা। যে দিদি ওকে ছেলেবেলায় ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে’ গান গেয়ে ঘুম পাড়াত ওর দিদির সেই সুরেলা মিষ্টি গলার মতো নয়। যেন কোনো অশরীরী আত্মা ওর দিদির শরীরের ভেতর থেকে কথাগুলো বলছে। আস্তে আস্তে ওর দিদিসহ মেয়ে তিনটে পথের বাঁকে হারিয়ে গেল।
না, পালায়নি রমু। পালাবে বলে তো সেদিন নিজে থেকে মিলিটারিদের ট্রাকের ওপর ওঠেনি ও। ওর দিদিকে সাহায্য করবে বলেই তো ও এখানে আছে। কেবল সেদিনই ও এই অভিশপ্ত চিনিকলটা থেকে বের হয়ে চলে যাবে যেদিন ও ওর দিদিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি সর্বদা এক থাকে না। বর্ষাকাল শেষ হতেই দেখা গেল চিনিকলটার ক্যাম্পের সৈন্যদের মধ্যে নানা রকম অস্থিরতা। আর শীতকাল এসে যেতেই বড় কামান দুটোকে সরিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর একদিন রাতে সমস্ত ক্যাম্প খালি করে পাকিস্তানি অফিসার ও সৈন্যরা তাদের সবরকম অস্ত্রশস্ত্র আর যানবাহন নিয়ে খুব দ্রুততার সঙ্গেই ট্রাক ও জিপ গাড়িগুলো চালিয়ে পালিয়ে গেল। যাওয়ার আগে কিছু বন্দিকে অবশ্য ওরা গুলি করে মেরে রেখে যায়। আর কিছু বন্দিকে ওদের সঙ্গে ট্রাকে চাপিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টের দিকে নিয়ে যায়। ক্যাম্পের বিহারিরাও চলে গেল ওদের সঙ্গে। তবে স্থানীয় বাঙালি রাজাকাররা পলায়নরত সেনাবাহিনীর ট্রাকগুলিতে উঠতে মরিয়া চেষ্টা করলে পাঞ্জাবি সৈন্যরা রাইফেলের বাঁট দিয়ে গুঁতিয়ে ওদের ট্রাক থেকে নামিয়ে দেয়। পরদিন ভোরে বাঙালি রাজাকারগুলোও, অনেকেই অস্ত্র রেখে ও পরনের খাকি পোশাক খুলে ফেলে, ক্যাম্প ফাঁকা করে যে যেদিকে পারে পালাল। শীতের উজ্জ্বল সকালটাতে যখন স্টেনগান ও রাইফেল হাতে, পরনে লুঙ্গি এবং কারো কারো মাথায় ও কোমরে গামছা বাঁধা, সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ বড় একটা দল ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বাংলা’ বলে সজোরে স্লোগান দিতে দিতে পরিত্যক্ত ক্যাম্পটার ভেতরে এসে ঢুকল, তারা আরো অনেক কিছুর মতো, একজন কিশোরী ও এক বালকের একসঙ্গে হাতবাঁধা দুটি মৃতদেহ পাশাপাশি পড়ে থাকত দেখে বেশ বিস্মিতই হলো। আগেও পাকিস্তানি মিলিটারির কয়েকটা ক্যাম্প তারা মুক্ত করেছে। হাতবাঁধা অনেক নারীর মৃতদেহও তারা দেখেছে; কিন্তু এমনটি আর দেখেনি। এক কিশোরী ও এক বালকের একসঙ্গে হাতবাঁধা পাশাপাশি শায়িত দুটো মৃতদেহের কারণটা ওদের কাছে অজানাই রয়ে গেল।
না, রমু ওর দিদিকে ছেড়ে যায়নি।

Leave a Reply