সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

লেখক: কামাল উদ্দিন হোসেন

সংবিধানে আক্ষরিক অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক ও মর্মার্থে জাতির জনক। স্বাধীনতার ঘোষকের কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কেউ তোলেননি, তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর কেউ কেউ তুলেছেন, তবে তির্যকভাবে। সুতরাং এইরূপ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর হওয়া আবশ্যক। সংবিধান ঠিকভাবে পড়লে এই বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ থাকে না।সাংবিধানিকভাবে সব সংশোধনের পরও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্থান ঢাকা, কাল ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল।

আমি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক আলোচনার মধ্যে আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখব। তবে তার আগে একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করব বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে নেতাজি সুভাষ বসু যখন কুখ্যাত হলওয়েল স্তম্ভ অপসারণের আন্দোলন করেন, সেই আন্দোলনের অন্যতম কর্মী ছিলেন শেখ মুজিব।

১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলনেও তিনি জড়িত ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে ১৯৪৮ সাল থেকে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়-সম্পর্কিত আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের কর্মী, ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রীর পদবরণ, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন প্রবর্তনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, ১৯৬৬ সালে তাঁর বিখ্যাত পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের দাবি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে জড়ানো, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ওই মামলা পণ্ড, শেখের মুক্তি ও জনসমাবেশে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’অভিধা প্রদান, ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের প্রথম ও শেষ নির্বাচন এবং শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের কথা মনে রাখতে হবে এবং ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ১৭ মার্চ প্রত্যাহার। পরবর্তী ঘটনার বিবরণ আমরা মুজিবনগরে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা বা Proclamation of Independence থেকে পাব যা আজকে সংবিধানের অঙ্গ হয়ে গেছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ ডাক ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, উল্লেখ করতে হয়।

এইবার সংবিধানের বর্তমান আকারে যা আছে তাই দেখা যাক, অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনীর পরেও যা দাঁড়িয়েছে।

সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম পরিচ্ছেদে আছে :

‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’

উপস্থিত সুধীমণ্ডলী,

এখানে বা সংবিধানে স্বাধীনতার ঘোষক কোনো একজন ব্যক্তি নন এবং ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ’ আবার ঘোষণার তারিখ ২৭ মার্চ নয়, ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। এর অর্থ দাঁড়ায় সংবিধানে এখানে মুজিবনগরের প্রকাশিত ঘোষণাপত্রকে উল্লেখ করা হচ্ছে এবং এ ঘোষণার বিষয়ে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তাই মুজিবনগরের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে দিতে হয়, প্রথমাংশ সম্পূর্ণ ইংরেজি, পরে তার অনুবাদ, ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিক অংশ :

THE PROCLAMATION OF INDEPENDENCE

Mujibnagar, Bangladesh.

Dated : The 10th day of April, 1971.

Whereas free elections were held in Bangladesh from 7th December 1970 to 17th January 1971 to elect representatives for the purpose of framing a Constitution,

And

Whereas at these elections the people of Bangladesh elected 167 out of 169 representatives belonging to the Awami League,

And

Whereas General Yahya Khan summoned the elected representatives of the people to meet on the 3rd March 1971, for the purpose of framing an Constitutions,

And

Whereas the Assembly so summoned was arbitrarily and illegally postponed for indefinite period,

And

Whereas instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war,

And

Whereas in the facts and circumstances of such treacherous conduct Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, the undisputed leader of the 75 million people of Bangladesh, in due fulfilment of the legitimate right of self-determination of the people of Bangladesh, duly made a declaration of independence at Dacca on March 26, 1971 and urged the people of Bangladesh to defend the honor and integrity of Bangladesh,

And

Whereas in the conduct of a ruthless and savage war the Pakistani authorities committed and are still continuously committing numerous acts of genocide and unprecedented tortures, amongst others on the civilian and unarmed people of Bangladesh,

And

Whereas the Pakistan Government by levying an unjust war and committing genocide and by other repressive measures made it impossible for the elected representatives of the people of Bangladesh to meet and frame a Constitution, and to give themselves a Government,

And

Whereas the people of Bangladesh by their heroism, bravery and revolutionary fervor have established effective control over the territories of Bangladesh,

We, the elected representatives of the people of Bangladesh, as honor-bound by the mandate given to us by the people of Bangladesh whose will is supreme, duly constituted ourselves into a Constituent Assembly, and having held mutual consultations,

And

In order to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice,

declare and constitute Bangladesh to be a Sovereign PeopleÕs Republic and thereby confirm the declaration of independence already made by Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman …

and that this proclamation of independence shall be deemed to have come into effect from 26th day of March 1971 …

সাংবিধানিক প্রস্তাবনার সঙ্গে মিলিয়ে এই ঘোষণাপত্রের তরজমা ও ব্যাখ্যার পূর্বে বলতে হয়, এই ঘোষণাপত্র বা Proclamation of Independence-কে সংবিধানের ৪র্থ তফসিলের ৩য় অনুচ্ছেদের অঙ্গীভূত করা হয়েছে। তাছাড়া এর বরখেলাফ অর্থাৎ সার্বভৌমতার বিরুদ্ধাচারণকে ১২৩ – A of Penal Code-এ দণ্ডনীয় অপরাধ গণ্য করা হয়েছে, যার প্রাসঙ্গিক অংশ হচ্ছে : Whoever, within or without Bangladesh with intent to influence or knowing it to be likely that he will influence, any person or the whole of any section of the public, in the manner likely to be prejudicial to the safety of Bangladesh or to endanger the sovereignty of Bangladesh in respect of all or any of the territories lying within its borders, shall by words spoken or written, or by signs or visible representations, condemn the creation of Bangladesh in pursuance of the Proclamation of Independence on the twenty sixth day of March, 1971 or advocate the curtailment or abolition of sovereignty of Bangladesh in the respect of all or any of the territories lying within its borders whether by amalgamation with the territories of neighboring states or otherwise, shall be punished with rigorous imprisonment which may extend to ten years and shall also be liable to fine.

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বহু রায়ে এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের একটি আকর দলিল বলে গণ্য করেছেন।

এইবার আমরা সাংবিধানিক বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যায় যেতে পারি। শুরু হয়েছে আমরা বলে আবার তার পরপর বাংলাদেশের জনগণ বলে তার অর্থও সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা যে বাংলাদেশের জনগণ কী করলাম, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ করলাম। কবে তা করা হলো? সেটা ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। এই স্বাধীনতার ঘোষণার পরিণাম পরের বাক্যাংশে বলা হয়েছে যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। কীভাবে তা হয়েছে তাও বলা হয়েছে। সেটা হলো জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় বলা হয় জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা।

এই সংবিধান রচিত হয়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত গণ-পরিষদের দ্বারা, যা চূড়ান্ত রূপ হয়েছে ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে। তা হলে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালের ঘোষণাটা কোথায় এবং এর একজন ঘোষকের কথা যে বলছি সেগুলি কোথায়? অবধারিতভাবে আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার আকর দলিলে যেতে হয় যাতে ইংরেজিতে বলা হয়েছে Proclamation of Independence যা ঘোষিত হয়েছে মুজিবনগরে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে, যেখানে কেবল স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি ও স্বাধীনতা ঘোষণার আদি পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। সেটা বুঝতে হলে এই ঘোষণাপত্রের বাংলা ভাবার্থ দিতে হয়।

ঘোষণাপত্রে শিরোনাম, তারিখ ও স্থানের উল্লেখ করে বলা হয়েছে ৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ১৭ জানুয়ারি নির্বাচনের কথা যার উদ্দেশ্য সংবিধান রচনা; নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯-এর মধ্যে ১৬৭ জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে, যারা আওয়ামী লীগের সদস্য; জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ১৯৭১ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান রচনার জন্যে সম্মেলন ডাকেন। সেই আহূত সংসদকে স্বেচ্ছাচারী ও অবৈধভাবে মুলতবি করা হয়; প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে আলোচনা চলাকালে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতক যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ৭৫ মিলিয়ন জনগণের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের জনগণের বৈধ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য পরিপূরণে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকায় নিয়মিত স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের জনগণকে বাংলাদেশের মর্যাদা ও সংহতি রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ নৃশংস ও বর্বর যুদ্ধ চালিয়ে বাংলাদেশের নিরস্ত্র বেসামরিক অধিবাসীদের উপর গণহত্যা ও বিভিন্ন প্রকার নজিরবিহীন নির্যাতন চালাচ্ছে; এই গণহত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের জন্য জনপ্রতিনিধিগণের পক্ষে সম্মিলিত হয়ে একটি সংবিধান রচনা করে নিজেদেরকে একটি সরকার দিতে অসম্ভব করে তুলেছে; বাংলাদেশের জনগণ তাদের সাহস, বীরত্ব ও বৈপ্লবিক প্রবণতায় বাংলাদেশের ভূভাগে তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছেন;

আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ জনগণের প্রদত্ত ম্যান্ডেট পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ যে-জনগণের অভিপ্রায় সর্বোচ্চ সে-জন্য আমরা আমাদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করে আলাপ-আলোচনা করেছি এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সমতা, মানব-মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে;

বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা ও সংগঠন করছি এবং এতদ্বারা ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণাকে সমর্থন করছি … এই ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।

আইনে এই প্রক্রিয়াকে ‘লেজিসলেশন বাই রেফারেল’ বলা হয়।

আর একবার স্মরণার্থে বলা যায়, ঘোষণাপত্র প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জনগণ তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি অনুসারে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁরা তখনকার সাড়ে সাত কোটি জনগণের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে সমর্থন করেন। এইভাবে প্রথমে জনগণ, তার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সর্বশেষে জননেতা এক সারিতে যুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব, বাঙালিরা জাতি বা নেশন হলো, যার অর্থ একটি ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তিত জনগোষ্ঠী রাষ্ট্র সৃষ্টি করেন। একেই বলে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। এইখানে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল পার্থক্য। পাকিস্তান ভারতের মতো ইংরেজ সরকার কর্তৃক ১৯৪৭ সালের Indian Independent Act এর মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব দুই গণ-পরিষদের ওপর হস্তান্তরিত হয়ে অর্জিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশ গঠন, প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের জনগণ, অর্থাৎ বাঙালিরা এই যে স্বাধীনতার প্রক্রিয়া এই ঘটনা পরম্পরায় এমনভাবে সন্নিবেশিত যে, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে যে একজনের নাম আসে সে জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একজন প্রকৃত জননেতা। প্রক্রিয়াটি এমন যে, অন্য কোনো ব্যক্তির বা নেতার নাম আসতে পারে না এবং স্বাভাবিকভাবে আসেওনি। এই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম স্বাধীনতার ঘোষণাদাতা রূপে সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়ে আছে। এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখা এবং তা রক্ষণ সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান আমাদের কর্তব্য।

আমরা ঘোষণাপত্রের প্রক্রিয়ায় কয়েকটি মূল ঘটনার যে উল্লেখ রয়েছে সেগুলির মধ্যে ১৯৭০-এর নির্বাচন, আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, জেনারেল ইয়াহিয়ার সংসদ অধিবেশন ডেকে আকস্মিকভাবে মুলতবি ঘোষণা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলাকালে অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতক যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া, আর জনগণের ওপর নির্মম বর্বর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যা যার প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচিত অবিসংবাদিত জননেতার স্বাধীনতা-ঘোষণা – এইসব ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত আছে, তবে এর সঙ্গে আমরা ৭ মার্চের রমনার বিশাল জনসমাবেশে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ডাক ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’কে অবশ্যই গুরুত্ববহ বলতে হয় এজন্যে যে, এই ডাকের ফলে যে-অসহযোগ আন্দোলন শুরু, যা অভূতপূর্ব, যার ফলে দেশে যে সর্বাত্মক অসহযোগ সূচিত হয় ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে, যার ফলে সামরিক স্বৈরাচারী শাসকের ক্ষমতা সেনানিবাসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফল দাঁড়ায়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দখলদার বাহিনী বা অকুপেন্ট আর্মিতে পর্যবসিত হয়। ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চের কালরাত্রি পর্যন্ত শেখ মুজিবের নির্দেশে বস্তুত সরকার চলতে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা – এই ডাক একমাত্র তিনিই দিতে পারেন। কেবল ডাক দিলে তো হয় না, সেই ডাকের পিছনে ডাক দেবার ক্ষমতা বা অথরিটিও চাই। সবই ছিল শেখ মুজিবের কাছে।

কালের দিক থেকে বিচার করা যাক। সংবিধানে বলা হয়েছে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে; তাহলে আমরা সাংবিধানিকভাবে ২৭ বা অন্য কোনো দিনের উল্লেখ করতে পারি না। বাস্তবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তারিখ ১০ এপ্রিল ১৯৭১, তাহলে ২৬ মার্চ কীভাবে হয়? এই জন্য যে ঘোষণাপত্র বা Proclamation of Independence মার্চ ১৯৭১ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে গণ্য করা হবে। এইভাবে ঘোষণাপত্র শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ডাকের দিনকেই সমর্থন ও অনুমোদন করে। তাহলে স্বাধীনতা ঘোষণার দিন আমরা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ছাড়া আর কোনো দিন সাংবিধানিকভাবে বলতে পারি না।

স্থান সম্বন্ধে দেখতে গেলে দেখতে পাব ঘোষণাপত্র ঘোষিত হয়েছে ‘মুজিবনগরে’। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা থেকে, যা ঘোষণাপত্রেই বলা আছে। সাংবিধানিকভাবে স্থানের ঘোষণা প্রথমে দেওয়া হয়নি; শুধু এইটুকু বলা হয়েছে যা সমর্থিত হয় ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে। সাংবিধানিকভাবে প্রথম ঘোষণা ঢাকায়, এর সমর্থন ও অনুমোদন মুজিবনগরে; আর কোনো স্থানের অনুপ্রবেশের অবকাশ নেই। সুতরাং চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো স্থানের অবস্থান সংবিধানে অন্তর্গত নয়।

সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের জনগণের জাতি হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা Right of self-determination ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠার কথা দুই অংশে বলা আছে, প্রথম অংশে ঘোষণা দ্বিতীয় অংশে প্রতিষ্ঠার কথা আছে। আছে একটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌম আত্মবিকাশের কথা। আইনে এই দুরূহ দায়িত্ব পালন করে জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা আর প্রতিনিধিদের মুখপাত্র হয়ে আসেন তার স্বীকৃত নির্বাচিত নেতা। এইখানে গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেটা হচ্ছে, জনতা ও নেতার সম্পর্ক অর্থাৎ তিনিই নেতা যিনি জনগণের আস্থাভাজন এবং আস্থা প্রকাশের স্বীকৃত ও আইনগত দিক হচ্ছে নির্বাচন। সংবিধানে তাই বলা হয়েছে, জনগণ অর্থাৎ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাঁরা ঘোষণা দিচ্ছেন এর পূর্বে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতা অর্থাৎ জনগণের নেতা যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছে তাকে অনুমোদন করে। এইভাবে নেতা-জনতা বা জনতা-নেতা এক হয় আইনের চোখে। সুতরাং আইনের দিক থেকে যদি কোনো এক ব্যক্তি স্বাধীনতার ডাক দিতে অধিকারী হন বা লিগ্যাল অথরিটি যার থাকবে তিনি হবেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতা, আর অন্য কোনো ব্যক্তির সেই অধিকার গ্রহণের অবকাশ নেই। তাহলে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষক একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরিপন্থী কিছু বলা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।

সংবিধানের আক্ষরিক অর্থে আমরা পেলাম স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এবার সংবিধানের মর্মার্থ বা ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্পিরিটি অব ল’ সেই অর্থে আমরা কী পাই।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে যখন ইংরেজ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, এই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান রচয়িতাদের বলা হতো Founding Fathers Ñ প্রতিষ্ঠাতা জনকবৃন্দ। এই রেওয়াজ বা কনভেনশন দুইশো বছর ধরে অন্যান্য রাষ্ট্রের ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়।

আমাদের বর্তমান সংবিধান দ্বাদশ সংশোধন, একাধিকবার স্থগিত থাকার পরেও সেই ১৯৭২ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর যে প্রথম সংবিধান রচিত হয় তা আজো বলবৎ এবং ত্রয়োদশ সংশোধনীর পর কাঠামোগতভাবে প্রায় ১৯৭২ সালে অসংশোধিত সংবিধানের অবস্থায় ফিরে গেছে।

এই সংবিধান রচিত হয় যে গণ-পরিষদের দ্বারা এর সদস্যরা হচ্ছেন ১৯৭০ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনের নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ এবং এঁরাই ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগরে নিজেদের গণপরিষদ গঠন করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন ও সেইসঙ্গে, আমরা আগেই দেখেছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণাকে confirm বা অনুমোদন করেন। সবদিক থেকে এই গণপরিষদের সদস্যবৃন্দকে প্রতিষ্ঠাতা-জনক বলা যায়। আবার এই প্রতিষ্ঠা-জনকবৃন্দের নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথমে নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে তিনি নির্বাচিত সদস্যদের নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সময় Proclamation of Independence-এর বলে প্রেসিডেন্ট ও সংবিধান রচনার সময় প্রধানমন্ত্রীরূপে সব সময় এই ফাউন্ডিং ফাদারদের ছিলেন নেতা। সুতরাং সংবিধানের মর্মার্থে তিনি জাতির জনক।

আজকাল অনেকে, এমনকি যারা তাঁর কঠোর সমালোচক তাঁরাও, শেখ মুজিবকে ফাদার অব নেশান বা জাতির জনক বলেছেন। তাহলে সংবিধানের আক্ষরিক অর্থে সিদ্ধ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষক, মর্মার্থে পাচ্ছি তিনি ফাউন্ডিং ফাদারদের নেতা। দুটোকে জড়িয়ে আমরা পাচ্ছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 লেখক : সাবেক বিচারপতি। [সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু স্মারকগ্রন্থ ১।]

Leave a Reply