সান্তা ফের আর্ট ডিস্ট্রিক্ট ও মুনলাইট ক্যাম্পফায়ার

লেখক: মঈনুস সুলতান

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের সান্তা ফে শহর সম্পর্কে পর্যটক মহলে একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘দেয়ার আর মোর আর্ট গ্যালারিজ হিয়ার পার স্কয়ার ফুট দেন অ্যানি প্লেস অন দিস প্ল্যানেট।’ কথাটা যে অবান্তর নয়, তার সাক্ষাৎ প্রমাণ পাওয়া যায় নগরীর ক্যানিওন রোডের একটি সরণিতে পা ফেললেই। সেখানে তিন শতাধিক আর্ট গ্যালারি তৈরি করছে ঘুরে বেড়ানোর বর্ণিল এক পরিবেশ।

কিছুদিন হলো, আমি সান্তা ফের প্রান্তিকে সানোরা ডেজার্ডের-লাগোয়া একটি জুনিপার ও পিনিওন বৃক্ষে ভরপুর টিলায় চল্লিশের দশকের শেষদিকে তৈরি অ্যাডোবি-কেতার কটেজে বসবাস করছি। এখানে এসে অনেকদিন পর আমার দেখা হয়েছে রোজেন নিউমি বা রোজের সঙ্গে। তার প্রতিবেশী হিসেবে আমি একসময় সাউথ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় বসবাস করেছি। ক্যান্সার-আক্রান্ত হওয়ার পর রোজ আফ্রিকার কাজটাজ গুটিয়ে ফিরে এসেছে সান্তা ফের নিজগৃহে। সে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে রিকভার করেছে। বর্তমানে আর্ট-লাভার এই নারী নগরীর বাস্তুহারা চিত্রকর ও ছিন্নমূল ভাস্করদের দিনযাপন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে একটি গাইডবুক-জাতীয় বই লিখছে। সান্তা ফে-তে এসে আমি প্রথমবার ক্যানিওন রোডে যাই তার সঙ্গে।

আজ বেশ উৎসাহের সঙ্গে রোজ আমাকে নিয়ে ফের বেরিয়ে পড়ে ক্যানিওন রোডের আর্ট ডিস্ট্রিক্টের দিকে। সেখানে তার বন্ধু চিত্রকর বেন স্টিলের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছে। সে টিলা পেঁচিয়ে তৈরি মোরাম-বিছানো পথে ড্রাইভ করে আমাকে নিয়ে আসে সিটি সেন্টার ছাড়িয়ে ক্যাথিড্রালের পেছনদিকের একটি পার্কিং-লটে। কথা হয়, ক্যানিওন রোডে ঘোরাঘুরি শেষ হওয়ার পর আমাদের দেহমনে এক্সট্রা এনার্জি থাকলে যাওয়া যেতে পারে কোনো রেস্তোরাঁয় ডিনারের জন্যে।

পার্কিং-লট থেকে আমরা স্বচ্ছসলিলা ছড়া-নদীটির পাড় ধরে  রিভার পার্কের দিকে অগ্রসর হই। রংচঙে টাইটসের ওপর আঁটসাঁটভাবে জড়িয়ে রোজ একটি আফ্রিকান বাটিকের র‌্যাপ পরেছে। তার টপের বর্ণাঢ্যতায় ছলকাচ্ছে বহো বা বোহেমিয়ান  কেতার নকশাবহুল উচ্ছলতা। ছড়া-নদীটি আধডোবা পাথরে রীতিমতো জলতরঙ্গ বাজিয়ে ছুটছে। তার বহতা রিদমের ঝিরিঝিরি শব্দে যেন ধুয়েমুছে যাচ্ছে আমাদের দিনযাপনের ক্লান্তিকর বিষাদ। যেতে যেতে গ্রীবা বাঁকিয়ে রোজ আমার দিকে তাকায়, কী যেন বলতে চায়, কিন্তু কিছু বলে না, চোখে সামান্য দ্বিধা নিয়ে চুপচাপ পথ চলে। অল্প মেকাপে তার মুখের রোগদীর্ণ রেখা মুছে গিয়ে তাতে এসেছে ¯িœগ্ধ পরিচ্ছন্নতা। আফ্রিকান বিডের ওভারসাইজড নেকলেস ও কানপাশায় বিকেলের রোদ প্রতিফলিত হয়ে খেলছে নীলাভ আভা।

রিভার পার্কের গাছপালার সবুজে দারুণ কনট্রাস্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নেটিভ আমেরিকান সম্প্রদায়ের নানা গোত্রের অনেক টোটেম পোল। আস্ত বৃক্ষের কাণ্ডে খোদাই করে নানাবিধ জন্তুর প্রতীকে তৈরি টোটেম পোলগুলো এ-এলাকায় বসবাসরত আমেরিকার আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে। একটি বর্ণাঢ্য টোটেম পোলের কার্ভ করা জোড়া চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয় – পৌরাণিক জমানার অতিকায় এক দৈত্য যেন ‘যেমন খুশি সাজো’র মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে আছে পথ আগলে। আমি তাকে খুঁটিয়ে দেখার জন্য এগিয়ে গেলে রোজ তার চোখের পাপড়ি তুলে বলে, ‘প্লিজ ওয়াক অ্যা বিট স্লো।’  আকর্ষণীয় কিছু দেখতে পেলে আমার দ্রুত হাঁটার প্রবণতা আছে, এ-গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে রোজ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। আমার উচিত তার প্রতি আরো সংবেদনশীল হওয়া। তাই লজ্জিত হয়ে বলি, ‘লেটস টেক আ ব্রেক।’ সামনে একটি কাঠের বেঞ্চ পাতা দেখতে পেয়ে সে বলে, ‘চলো, এখানে বসে একটু জিরিয়ে নিই।’ বসতে পেয়ে রোজ স্পষ্টত খুশি হয়। আমি হেলান দিয়ে বসে সামনে তাকাই, দেখি – পাঁচ-পাঁচটি বিচিত্র টোটেম পোল দারুণ কৌতূহল নিয়ে বনানীর ওপর দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে মেঘভাসা আকাশ।

পার্কের পিচঢালা সড়ক ধরে স্ট্রলার ঠেলে হেঁটে আসছে একটি পরিবার। দম্পতির নারীটি হাঁটতে হাঁটতে স্ট্রলারে হাত গুঁজে শিশুর মাথায় রোদ ফেরানোর বনেট অ্যাডজাস্ট করে। পুরুষটি তার ছোট্ট মেয়ের হাত মুঠোয় নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে গাছপালার ওপেনিংয়ে দাঁড়-করানো টোটেম পোল। তাদের চোখমুখের প্রসন্নতা নিরিখ করে রোজ মৃদুস্বরে বলে, ‘আরন্ট দে ডিসপ্লেয়িং অ্যামেজিং হারমনি?’ আমি তার কমেন্টের সঙ্গে একমত হয়ে বলি, ‘দ্য ফ্যামিলি লুকস ট্রুলি লাভলি।’ ঠিক তখন ছোট্ট মেয়েটি তার বাবার মুঠো থেকে হাত খুলে নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে ওয়েভ করে। জবাবে রোজও তার দিকে হাত নাড়লে বাচ্চা মেয়েটি ছুটে আসে আমাদের দিকে। আমি তাকে ‘হাই লিটিল গার্ল’ বলে গ্রিট করি। সে ফিক করে হেসে নিজেকে ইন্ট্রোডিউস করে, ‘মাই নেম ইজ এমা। আই অ্যাম ফোর ইয়ার্স ওল্ড, নট ভেরি লিটিল দো।’ রোজ জানতে চায়, ‘সো, সুইট এমা, তোমরা কি আর্ট ডিস্ট্রিক্টের দিকে বেড়াতে যাচ্ছ?’ সে জবাব দেয়, ‘ইয়েস, উই আর গোয়িং টু সি পেইন্টিংস ইন গ্যালারিজ। স্ট্রলারে শুয়ে আছে আমার ছোট্ট বোন রিমা। তার বয়স মাত্র ছয় মাস। সে ছবিটবি কিচ্ছু বুঝতে পারে না, এখনো ছোট তো।’ বাচ্চাটির কথাবার্তায় স্পষ্টত ব্রিটিশ একসেন্ট। তাই রোজ প্রশ্ন করে, ‘তোমরা কি ইংল্যান্ড থেকে বেড়াতে এসেছ।’ এমা জবাব দেয়, ‘ওহ্, ইয়েস, উই ফ্লু বাই আ হিউজ বিগ বোয়িং প্লেন … আমার মা কিন্তু সান্তা ফে-তে জন্মেছিল, উই আর লুকিং ফর মাই গ্র্যান্ডফাদার।’

এমার মা-বাবাও হেঁটে এসে আমাদের বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কথাবার্তায় অত্যন্ত হাসিখুশি ও ফ্র্যাংক কিসিমের এ-দম্পতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগে। রোজ শিশুর স্ট্রলার ঠেলা তরুণীর দিকে তাকিয়ে ‘উই জাস্ট লার্ন ইউ আর বর্ন ইন সান্তা ফে’, বলে আলাপ শুরুয়াত করলে অল্পবয়সী মা-টি জবাব দেয়, ‘ইয়েস, আই ওয়াজ বর্ন রাইট ইন দিস আর্ট ডিস্ট্রিক্ট ইন মিড সেভেনটিজ। আমার প্রয়াত জননী ছিলেন এ-শিল্পপাড়ার একজন আঁকিয়ে মহিলা’ – বলে তরুণী আমার দিকে তাকায়। আমি আলাপে যোগ দিয়ে তাকে প্রশ্ন করি, ‘সো, ইউ আর অ্যান আমেরিকান বাই বার্থ, কিন্তু তোমার বাচনভঙ্গিতে আছে নাইস অ্যান্ড ক্রিস্প ব্রিটিশ একসেন্ট, হাউ কাম?’ তরুণীটি অপ্রস্তুতভাবে হেসে জবাব দেয়, ‘আমার জন্মের সময় আমার মা ছিলেন একজন হোমলেস আর্টিস্ট। তাঁর স্বাস্থ্যও খারাপ যাচ্ছিল, তাই আমার জন্মের এক মাসের ভেতর তিনি একটি অ্যাডাপশন এজেন্সির মাধ্যমে আমাকে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সান্তা ফে-তে বেড়াতে আসা বিলাতের এক আর্ট-লাভার দম্পতি আমাকে দত্তক নেন।’ শুনে রোজ জানতে চায়, ‘মায়ের সঙ্গে তোমার কখনো যোগাযোগ হয়েছিল কি?’ মেয়েটি জবাব দেয়, ‘আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার পাঠ শেষ করে মায়ের তালাশে ২০০০ সালে একবার যুক্তরাষ্ট্রে আসি। মা মানসিকভাবে অসুস্থাবস্থায় কলোরাডোর একটি মেন্টাল হেলথ অ্যাসাইলামে বাস করছিলেন। আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি আমাকে চিনতে পারেননি।’ তার মায়ের কথা শেষ হতেই এমা হাত তুলে কিছু বলতে চায়। তো ‘হোয়াটসআপ এমা? তুমি কিছু বলবে কি?’ বলে আমি তার দিকে তাকালে সে জবাব দেয়, ‘ইয়েস, আমার ধারণা, আমার গ্র্যান্ডপা এখনো এখানকার আর্ট ডিস্ট্রিক্টেই আছেন। আমরা তাঁকে খুঁজে বের করব।’ রোজ ‘ওয়াও, রিয়েলি’ বলে তার মন্তব্যে আগ্রহ দেখায় এবং এমার মা ফের কথা বলে, ‘আমাকে দত্তক দেওয়ার অ্যাডাপশন এজেন্সির কাছ থেকে আমরা যা জেনেছি, তাতে মনে হচ্ছে আমার পিতাও হচ্ছেন এ আর্ট ডিস্ট্রিক্টের একজন ভবঘুরে চিত্রকর। কিন্তু এজেন্সি তাঁর নাম বা কোনো ঠিকানা দিতে পারেনি। দিস ইজ অল উই নো অ্যাবাউট হিম।’ মা-র কথা শেষ হতেই এমা আবার মন্তব্য করে, ‘আমার গ্র্যান্ডপার চেহারা দেখতে অনেকটা আমার মা-র মতো। আমি আর্ট ডিস্ট্রিক্টের সরণিতে হাঁটতে হাঁটতে সব স্ট্রিট আর্টিস্টের মুখের দিকে খেয়াল করে তাকিয়ে দেখব। আমার মনে হয়, তাঁকে দেখামাত্র আমি চিনতে পারব।’ আমরা এমাকে ‘গুডলাক উইথ সার্চিং ইয়োর গ্র্যান্ডপা’ বলে বিদায় দিই।

এমা ও রিমাকে নিয়ে বিলাত থেকে বেড়াতে আসা দম্পতি ক্যানিওন রোডের দিকে হেঁটে যায়। আমরা তাদের যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে আরো একটু সময় চুপচাপ বসে থাকি টোটেম পোলের কাছাকাছি বেঞ্চে। দূরের সান অ্যান্ড মুন মাউন্টেন পাড়ি দিয়ে বিকেলের সূর্য তির্যকভাবে ছড়াচ্ছে গাঢ় গোলাপিতে সোনার দ্যুতিময় আলো। তার কিছু রেণু এসে লাগে রোজের করতলে। তাতে তার অনামিকায় পরা আংটি থেকে ফুলকি ছড়ায় সবুজাভ অগ্নি। আমি তার হাত তুলে পাথরটি নিরিখ করে ‘ওয়াও, হোয়াট আ ব্রিলিয়েন্ট ব্রাইট এমারল্ড ইউ হ্যাভ রোজ’, বলে বিস্ময় প্রকাশ করলে সে প্রতিক্রিয়া জানায়, ‘অ্যাকচুয়েলি দিস রিং বিলংস টু মাই গ্র্যান্ডমা। বালিকা-বয়সে আমি আমার মাকেও এই রিং পরতে দেখেছি। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আমার সৎমাকে রিংটি গিফট হিসেবে দেন। অনেক বছর পর সৎমায়ের সঙ্গে ফের দেখা হয়, আমার সৎবোনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। তখন আমার সৎমা রিংটি আমাকে ফিরিয়ে দেন।’ আমি পাথরটি ফের পরখ করে বলি, ‘রোজ, দিস ইজ ক্যাচিং সো মাচ গ্রিন ফায়ার টুডে।’ সে চোখমুখে কৌতূহল ফুটিয়ে জানতে চায়, ‘হাউ উড ইউ ডেসক্রাইব দিস স্টোন ইন আ পোয়েট্রি।’ আমাকে তেমন একটা ভাবতে হয় না, তাকে হাত ধরে টেনে ওঠাতে ওঠাতে আমি বলি, ‘ইটস ক্যাপচারস দ্য মেমোরি অব আ ডিসঅ্যাপিয়ার্ড রেন ফরেস্ট।’ ‘কুল’ বলে আমার মন্তব্যের প্রতি কমপ্লিমেন্ট জানিয়ে সে হাঁটতে শুরু করে।

আজ আমি দ্বিতীয়বারের মতো আর্ট ডিস্ট্রিক্টের দিকে যাচ্ছি। সপ্তাহতিনেক আগেও একবার রোজের সঙ্গে ক্যানিওন রোডে এসেছিলাম। আজ ছড়া-নদীর তীরে দীর্ঘ ঘাসে ছাওয়া পাথরের চাকলা ফেলা পায়ে চলার ট্রেইল ধরে সে আমাকে ক্যানিওন রোডের ভেতরবাগে নিয়ে আসে। অনেক আর্ট গ্যালারিতে জমজমাট সরণি। ঢোকার মুখে আমি ক্যানিওন রোডের নাম ঘোষণা দিয়ে দাঁড় করানো বিশাল ফলকের সামনে দাঁড়াই। ধূসর নুড়িপাথর-ছড়ানো পরিসরে পড়ে আছে, সম্ভবত সিমেন্ট দিয়ে তৈরি একটি মানুষের মু-ু। খুলির এই ভাস্কর্য তৈরি করে শিল্পী জগৎ বা জীবন সম্পর্কে ঠিক কী প্রকাশ করতে চাইছেন বুঝতে পারি না। তাই নীরবে সরণি ধরে আমরা এগিয়ে যাই আরেকটু সামনে। সড়কের পাশেই প্লাস্টার অব প্যারিসে তৈরি একটি মোচড়ানো উলুবোড়া সাপের মতো পেল্লায় আকৃতির পেঁচানো বস্তু। তাকে রীতিমতো আঁকড়ে ধরে ছবির জন্য পোজ দিচ্ছেন জনাছয়েক পর্যটক। টোটেম পোলের কাছাকাছি বসে থাকার সময় এদের হইচই করে আর্ট ডিস্ট্রিক্টের দিকে আগুয়ান হতে দেখেছি। ফের দেখা হয়ে যাওয়ায় তারা সর্পিল বস্তুটির গায়ে হেলান দিয়ে সেলফি তুলতে তুলতে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়েন।

বিকেলের মায়াবী আলোয় অপরাহ্ণ বর্ণাঢ্য হয়ে উঠছে। গ্যালারিগুলোর জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একজন-দুজন পর্যটক। কেউ কেউ ডিজিটাল ক্যামেরায় তুলে নিচ্ছেন বারান্দায় ডিসপ্লে করে রাখা চিত্রাদির প্রতিলিপি। ফুটপাতের বেঞ্চে বসে নিবিষ্টচিত্তে চিত্র তৈরি করছেন জিন্স পরা বেইসবল ক্যাপ মাথায় এক ভবঘুরে চিত্রকর। পাশেই বেঞ্চে রাখা পেইন্ট ব্রাশ, রঙের টিউব ও নানা রকমের আঁকাজোখার সরঞ্জাম। তিনি ছবি আঁকতে আঁকতে ব্ল্যাক স্পিরিচুয়াল গাওয়ার কায়দায় গুনগুনিয়ে গাইছেন, ‘লর্ড, ফ্রি মি ফ্রম আর্ট … লর্ড …।’  রোজ হেঁটে যেতে যেতে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাঁক পাড়ে, ‘হেই পল, ডু ইউ হ্যাভ টাইম টু ডু আ কার্ড ফর মি?’ আওয়াজ পেয়ে গুনগুনানো থামিয়ে মুখ তুলে তাকান চিত্রকর পল। তাঁর দীর্ঘ সাদা দাড়িতে যেন প্রকাশ পাচ্ছে তাঁর সরলসিধা জিন্দেগি যাপনের শুভ্রতা। তিনি হাসিমুখে জবাব দেন, ‘ওহ ডিয়ার, গ্রেইসফুল রোজ … হাউ লাভলি টু সি ইউ। কার্ডে তোমার জন্য কী এঁকে দেবো?’ রোজ দ্বিধাগ্রস্তভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, ‘আই ডোন্ট রিয়েলি নো … তুমি কার্ডে আমাকে এঁকে দিতে পার পল?’ সাদা দাড়ি নাড়িয়ে পল খুশিমনে জানান, ‘শিওর আই ক্যান ড্র ইউ, তুমি এক কাজ করো, সড়কের ওপারে গিয়ে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে একটু তাকাও। দ্যাটস অ্যাবাউট ইট। … ইট উইল টেক অ্যাবাউট ফাইভ টু সেভেন মিনিটস, ইউ উইল গেট দ্য কার্ড। ওকে, ডিয়ার।’

আমরা সড়কের ওপাশে এসে একটি বিরাট আকারের ভাস্কর্যের গোড়ায় দাঁড়িয়ে পলকে নিয়ে টুকটাক কথা বলি। রোজ অনেক বছর ধরে মানুষটিকে বেশ ভালোভাবেই চেনে। তিনি ‘রোডিও পেইন্টার’ ডাকনামে আর্ট কমিউনিটিতে পরিচিত। ‘রোডিও’ হচ্ছে অশ্বারোহী কাউবয়দের দক্ষতা প্রদর্শনের মাঠবিশেষ। বছর বারো আগে, সান্তা ফের রোডিওকে বিষয়বস্তু করে তিনি কয়েকটি চিত্র আঁকেন। এতে তাঁর কিছু নামডাক হয়। ইউরোপীয় পর্যটকদের কাছে ছবিগুলো বিকোয়ও বেশ ভালো দামে। রোডিওর মাঠে স্থানীয় কাউবয়রা ঘোড়ায় চড়ে দড়ির ফাঁস ছুড়ে তাতে ছুটন্ত ষাঁড়দের আটকে কেরদানি দেখিয়ে থাকে। পল হামেশা ছবি আঁকার ব্রাশ ও পোর্টেবল ইজেল নিয়ে রোডিওর মাঠে কাউবয়দের কসরত দেখতে হাজির থাকতেন। তখন হাইবুট পরা ফ্যাশনেবল একটি কাউগার্লের সঙ্গে তাঁর ভাব হয়। মেয়েটির নাম ক্লারা। সে অপরিচিত একটি মাসটাঙ্গ প্রজাতির বুনোঘোড়াকে বাগ মানাতে গিয়ে আকস্মিকভাবে পড়ে যায়। তাতে তার মাথা পাথরে ঠুকে দারুণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। অনেকটা কোমার মতো হালতে ক্লারা একটি ক্লিনিকে মাসসাতেক কাটায়। অতঃপর চিকিৎসা – ফিজিওথেরাপি ও  একাধিকবার সার্জারিতে সে খানিকটা ভালোও হয়ে ওঠে। বর্তমানে ক্লারা একটি অ্যাসিসটেড ফেসিলিটিতে নার্সদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে বসবাস করছে। সে ওয়াকার ঠেলেঠুলে সামান্য একটু চলাফেরাও করতে পারে।

কিন্তু মেয়েটি তার মস্তিষ্কের সক্ষমতা ফিরে পায়নি। সে পরিবারের লোকজনকে চিনতে পারলেও তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে হারিয়েছে। নিজে থেকে সে কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারে না।

ক্লারার দুর্ঘটনার পর থেকে পলের জিন্দেগি-যাপনও কেমন যেন অগোছালো হয়ে পড়ে। বর্তমানে তিনি একটি হোমলেস শেল্টারের আঙিনায় তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটান। দিনে ক্যানিওন রোডে এসে স্ট্রিটের কোথাও বসে দু-চারটি কার্ড এঁকে বিক্রি করেন পর্যটকদের কাছে। এই উপার্জনে তাঁর খাওয়া-দাওয়ার খরচ চলে যায় কোনো-না-কোনোভাবে। কার্ড বিক্রির আয় থেকে কিছু পয়সা তিনি আলাদাভাবে সঞ্চয় করেন। উইকেন্ডে তা দিয়ে চমৎকার একটি গোলাপের তোড়া ও চকোলেট কিনে নিয়ে নার্সিংহোমে যান ক্লারাকে দেখতে।

পলের কার্ডে স্কেচ করা সমাপ্ত হয়েছে। তিনি রোজের দিকে ইশারা করে কার্ডটি চোখের সামনে তুলে ধরে সুরেলা গলায় হাঁক দিয়ে ওঠেন, ‘লর্ড, ওহ সুইট লর্ড … ফ্রি … ই … ই মি ফ্রম আ … র্ট।’  রোজের হাত থেকে কার্ডটি নিয়ে আমিও তা নিরিখ করি। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয়, আধডোবা এক ক্যানুজাতীয় নৌকা ভেসে যাচ্ছে আকাশের মেঘে মেঘে। রোজ আমার হাত থেকে কার্ডটি নিয়ে ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে তাকিয়ে ‘দিস ইজ কুল’ বলে ফিক করে হেসে ওঠে। আমিও এবার অন্যদিক থেকে চিত্রটির দিকে তাকাই। এবার বিষয়টি আমার কাছেও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ছবির রেখায় রোজের ড্রপ শোল্ডার টপের ফ্রিলি অংশটি বঙ্কিম হয়ে ফুটে উঠেছে। পোশাকের বাটিকে মোড়া নিগড় থেকে বেরিয়ে এসেছে তার সুগোল বাহু এবং খোলা কাঁধের কাছে উল্কির গাঢ় আঁকও ফুটেছে বর্ণিল হয়ে। রোজ খুশি হয়ে পলের কাঁধে মৃদু টেপ করে বলে, ‘হাউ মাচ ডু ইউ ওয়ান্ট ফর দিস প্রিটি কার্ড পল?’ তিনি কি একটা ভেবে বলেন, ‘আই নিড আ পিস অব পিৎসা ফর ডিনার … তার সঙ্গে গোটাদুই বিয়ার হলে মন্দ হয় না।’ রোজ পার্স থেকে টাকা বের করতে করতে ফের জিজ্ঞাসা করে, ‘ইজ দ্যাট অল ইউ ওয়ান্ট পল?’  তিনি মুখখানা রহস্যময় করে আঙুলের ইশারায় বাতাসে মারিজুয়ানা জয়েন্টের নকশা এঁকে ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘বিয়ারের সঙ্গে একটি ধূম্র শলাকা হলে খারাপ হয় না।’ রোজ দরাজ হাতে তার মুঠোয় কিছু ডলারের বিল তুলে দিয়ে কার্ডটির নকশা দেখতে দেখতে ফের সরণি ধরে হাঁটে।

আইভি লতায় ছাওয়া একটি আর্ট গ্যালারির সামনে রোজ দাঁড়িয়ে পড়ে। ছোট্ট ঘরটির পাশেই অ্যাথলেটদের খেলোয়াড়ি ভঙ্গিতে দাঁড় করানো অজানা কোনো পুরুষ মডেলের শক্ত-সামর্থ্য মূর্তি। আমরা দাঁড়িয়ে পড়তেই ভাস্কর্যটির কাঁধ থেকে উড়াল দেয় খয়েরি ডানার লেজঝোলা একটি পাখি। রোজ একটু দ্বিধা নিয়ে বলে, ‘লুক, দিস ইজ আ বিট আর্লি, এখনই আমার বন্ধু পেইন্টার বেন স্টিলকে ফ্রি পাওয়া যাবে না, ডু ইউ মাইন্ড … আমি যদি এই গ্যালারিতে থামি, বাচ্চাটিকে দেখতে আমার দারুণ ইচ্ছা হচ্ছে।’ প্রতিক্রিয়ায় আমি জানতে চাই, ‘হুজ বেবি রোজ? কী ঘটনা, কার বাচ্চা, একটু খুলে বলো তো।’ সে জবাব দেয়, ‘আমার বান্ধবী মেরিয়েনের সুইট লিটিল বয়, তাকে আমরা ফ্রগি বলে ডাকি, ব্যাঙাচির মতো দেখতে, তবে ভীষণ কিউট, আসো তার মা মেরিয়েনের সঙ্গে প্রথমে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।’ আমরা অ্যাথলেটের মূর্তিটি অতিক্রম করে গ্যালারির পেছনদিকে আসি। দেখি, আঙিনার এক কোণে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফ্রগির মা মেরিয়েন মাথায় কাউগার্ল জাতীয় হ্যাট পরে মনোযোগ দিয়ে আঁকছেন। রোজকে দেখতে পেয়ে তিনি ফুলপাতার ছবি আঁকা থামিয়ে খুশি হয়ে বলে ওঠেন, ‘লর্ড ইজ রিয়েলি প্লিজড উইথ মি টুডে … জিসাস নিশ্চয়ই তোমাকে পাঠিয়েছেন, লিটিল ফ্রগি নিডস ইউ রোজ, আমার বাচ্চাটাকে পাঁচটা মিনিট সময় দিতে পারবে … প্লিজ রোজ, ডোন্ট সে নো, আই অ্যাম ডেসপারেট টুডে।’ রোজ তাঁকে আশ্বস্ত করে বলে, ‘অলরাইট মেরিয়েন, আই অ্যাম হিয়ার, তুমি মনে হয় আজকে হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে উঠেছ?’ মেরিয়েন মাথা থেকে হ্যাটটি খুলে তা পিঠে ঝুলিয়ে দিয়ে তার খোলা চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলেন, ‘এক ইউরোপিয়ান পর্যটক আমাকে এ-ফুলপাতার ছবিটি আঁকার জন্য অ্যাডভান্স করে গেছে। বিকেল পাঁচটার মধ্যে কাজটি শেষ করতে হবে। কারণ পর্যটক সন্ধ্যা সাড়ে আটটার প্লেনে ফ্লাই করে যাবে শিকাগোর দিকে। আমি ফ্রগিকে আজ লাঞ্চ করাতে পারিনি, সে ঘুম থেকে কেবল উঠেছে।’ রোজ হাত তুলে ফের তাকে আশ্বস্ত করে বলে, ‘অলরাইট মেরিয়েন, আমি ফ্রগিকে লাঞ্চ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করছি, তার আগে … ক্যান আই ইন্ট্রোডিউস মাই ফ্রেন্ড সুলতান টু ইউ।’ মেরিয়েন আমার দিকে অস্বাভাবিক রকমের কৌতূহল এবং বিভ্রান্তি-মেশানো চোখে তাকান। কৌতূহলকে আমলে এনে আমিও তার চোখের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করি। ওখানে যেন খেলছে নির্দিষ্ট ফুলটি খুঁজে না পাওয়া পথহারা ভোমরার দিশাহীনতা। আমার বাড়ানো হাতটি মুঠোয় নিয়ে মৃদুভাবে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মেরিয়েন বলেন, ‘ইউ হ্যাভ আ নাইস ফেস ম্যান, তোমার স্কিন কালারও কেমন যেন পাকা অলিভের মতো … আমি প্রতি পূর্ণিমারাতে পাহাড়ে ক্যাম্পফায়ারের আয়োজন করি, আ রিয়েল ডেজলিং মুনলাইট ক্যাম্পফায়ার, আসবে তুমি আমার জ্যোৎস্নায় ভরপুর পার্টিতে?’ আমি ঘাড় হেলিয়ে ‘আই উড বি ডিলাইটেড টু জয়েন ইয়োর মুনলাইট ক্যাম্পফায়ার ‘মরিয়েন’, বলে সম্মতি জানাতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চুকুস করে গ-দেশে চুমো খেয়ে বলেন, ‘ম্যান, ইউ আর সো ইজি টু টক উইথ, নেক্সট পূর্ণিমায় আমি রিং করে তোমাকে মনে করিয়ে দেবো, আই নিড ইয়োর সেল নাম্বার … যদি তুমি চাও, অগ্নিকু-ের পাশে একটু আদুল গতরে দাঁড়াতে হবে কিন্তু। আমি তোমার একটি ফেবুলাস পোর্ট্রেট করে দেবো।’ আমার প্রতি মেরিয়েনের এ অযাচিত অন্তরঙ্গতা বোধ করি রোজের পছন্দ হয় না। সে ফুঁ দিয়ে মোমবাতির শিখাটি নিভিয়ে দেওয়ার মতো তার উৎসাহের ইন্ধনে পানি ঢেলে দিয়ে বলে, ‘লেটস ফিড ফ্রগি ফার্স্ট। তাকে খাওয়ানোর পর না হয় ভেবে দেখা যাবে, সুলতান তোমার মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারে যোগ দেবে কি না। ওকে?’ মেরিয়েন কোমরের হুক থেকে বেবি মনিটর বের করেন। বেবি মনিটর হচ্ছে সিসি টিভি ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির সমবায়ে তৈরি একটি যন্ত্র, যা দিয়ে দূরের কোনো জায়গায় বসে শিশুর গতিবিধির ওপর নজরদারি করা যায়, বাচ্চাটি কাঁদলেও শোনা যায়। তো মেরিয়েন মনিটরের স্ক্রিনে ফ্রগিকে দেখান। অতঃপর তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে রোজ চলে আসে গ্যালারির পেছনদিকের ছোট্ট আরেকটি চালাঘরে। দুয়ার খুলতেই আমরা দেখতে পাই একটি দোলনার কাঠের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রগি। রোজের সঙ্গে তার স্পষ্টত পরিচয় আছে। তাকে দেখতে পাওয়ামাত্র প্রতিবন্ধী বাচ্চাটি কাঠের রেলিংয়ে থাবড়া মেরে, ভোঁ ভোঁ করে সুন্দর দাঁতে হেসে ওঠে। তার ঠোঁট-মুখ থেকে ক্রমাগত ঝরে লোল। বয়সে ফ্রগি সাড়ে চার বছরের মতো, কিন্তু তার মানসিক বিকাশ অনেকটা নয়-দশ মাসের শিশুর লাহান। সে কথা বলতে পারে না, প্যাকাটির মতো সরু সরু পা দুটি নিয়ে হাঁটতেও সমর্থ নয় বাচ্চাটি।

রোজ রেফ্রিজারেটর থেকে খাবার বের করে নিপুণ হাতে তা মাইক্রোওয়েভে গরম করে খাওয়াতে শুরু করে। চামচ দিয়ে ফ্রগির মুখে ক্যারোট-মুস তুলে দিতে দিতে এক ফাঁকে সেলফোনের স্ক্রিনে একটি ছবিতে ক্লিক করে তা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘আই নো ইউ আর ডায়িং ইউথ কিউরিসিটি অ্যাবাউট মেরিয়েন। এই ছবিটি খেয়াল করে দেখো, বছরদশেক আগে মেরিয়েন এ-ধরনের চিত্র আঁকত। এসব চিত্রের বিক্রিবাট্টাও খারাপ ছিল না।’ স্ক্রিনে একটি নারীদেহের ন্যুড স্টাডির দিকে আমি তাকাই। রিয়ালিস্টিক ভঙ্গিতে আঁকা মেয়েটি নিরাভরণ হয়ে আয়নায় তার স্তনযুগলের শেইপ খুঁটিয়ে দেখছে। তার শরীর থেকে ফুলের পাপড়ি ঝরার মতো পরিবেশ সুরভিত হয়ে উঠছে রতি কাতরতায়। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির চোখমুখের অভিব্যক্তিতে যুক্ত হয়েছে আসন্ন সঙ্গমের উদ্বেগ। আমি অ্যারোতে ক্লিক করে পরবর্তী চিত্রে চোখ বোলাই। ওখানকার চিত্রের নগ্নিকাটি বোধ করি ভিন্ন এক মডেলের। আমি তার মুখ দেখতে পাই না, বালিশে ছড়ানো তার স্বর্ণাভ চুল, মেয়েটির কোমরে নাভির নিচে রেশমি একটি কুশন থাকায় দেহটি বাঁকা হয়ে তার নিতম্ব যুগলকে করে তুলেছে দারুণভাবে উত্তুঙ্গ। সারা দেহভঙ্গিটি অদৃশ্য কোনো পুরুষকে নিশানা করে ছড়াচ্ছে এক ধরনের মুখরোচক অ্যাপিল। আমি তাতে নিমজ্জিত হওয়ার আগেই রোজ হাত বাড়িয়ে সেলফোনটি তার হাতে নিয়ে বলে, ‘দ্যাটস্ শুড বি এনাফ টু ইন্ট্রোডিউস মেরিয়েন’স আর্লি পেইন্টিংস। খুব ট্যালেন্ডেড চিত্রকর সে নয়, তবে পুরুষ খদ্দেরদের মন মজাতে পারত … হোয়েন শি ওয়াজ ইয়াং অ্যান্ড ইন আ ডিফরেন্ট বডি, অলটুগেদার আ ডিফরেন্ট জেন্ডার … তখন পুরুষ চিত্রসমঝদারদের তাতিয়ে তুলতে তার কোনো সমস্যাই হতো না।’ শুনে আমার কৌতূহল উসকে ওঠে, তাই আমি এবার স্পেসিফিক্যালি জানতে চাই, ‘ডিফরেন্ট বডি অ্যান্ড ডিফরেন্ট জেন্ডার বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাইছ রোজ, প্লিজ বি ক্লিয়ার।’ রোজ আমার দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, ‘আই অ্যাম মেকিং ইট সুপার ক্লিয়ার ফর ইউ। এগারো বছর আগে মেরিয়েনের জেন্ডার পরিচিতি ছিল পুরুষ, তার নাম ছিল ড্যানিয়েল, তখন মেয়ে মডেলদের নিয়ে সে কিছু ন্যুড স্টাডিও করেছিল, তার দুটি নমুনা তো তুমি একটু আগে স্ক্রিনে দেখলে। পুরুষ-জীবন তার নানা কারণে পছন্দ হয়নি। পরে সে সার্জারি করিয়ে নারী হলো, নাম বদলিয়ে ড্যানিয়েল থেকে মেরিয়েন হলো। এক ভবঘুরে বোহেমিয়ান পুরুষের সঙ্গে লিভ টুগেদারও করেছিল মাসছয়েকের মতো। তখন তার গর্ভে জন্ম নেয় ফ্রগি। নাউ মেরিয়েন ইজ আ মাদার, সে ছবি আঁকছে অলটুগেদার ভিন্ন ফর্মে, আবার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবন্ধী বাচ্চাটিরও যত্ন নিচ্ছে।’

রোজ খাওয়ানো শেষ করে চেস্ট অব ড্রয়ার থেকে বের করে আনে ধোয়া জামাকাপড়। ফ্রগি দোলনার রেলিংয়ে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে আমাকে ছুঁতে চাইলে আমি তাকে কোলে তুলে নিই। রোজ ভেজা ন্যাকড়ার মতো ওয়াইপি দিয়ে তার চোখমুখ মুছিয়ে তাকে জামা বদলিয়ে দোলনায় তুলে দেয়। ফ্রগি খুশি হয়ে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে দেয়ালে লাগানো রুপালি ধাতুতে তৈরি জোড়া টিকটিকির দিকে ইশারা করে। আমি তাকে তুলে নিয়ে দেয়ালের কাছে গিয়ে আমার কাঁধে বসিয়ে দিই। সে হাত বাড়িয়ে টিকটিকি দুটির ধাতব নকশা ছুঁয়ে হাসিমুখে জড়িয়ে ধরে আমার গলা। কাঠের কতগুলো টয় ব্লক দিয়ে রোজ ফ্রগিকে দোলনায় ফের বসিয়ে দেয়। বাচ্চাটি পাজল পিসের মতো দেখতে ব্লকগুলোর একটার সঙ্গে আরেকটা মেলাতে মগ্ন হয়ে পড়ে। তখনই রোজ তাকে চুমো খায়, আমিও তার চুল নেড়ে দিয়ে বিদায় নিই।

গ্যালারির আঙিনা দিয়ে বেরিয়ে আসার পথে ফের দেখা হয় মেরিয়েনের সঙ্গে। সে আঁকাতে দারুণভাবে এনগেজ হয়ে আছে, তবে চোখ তুলে আমাদের গুডবাই বলতে গিয়ে ফিক করে হেসে জানতে চায়, ‘রোজ, তোমার বন্ধু সুলতান আমার মুনলাইট ক্যাম্পফায়ারে আসবে কি?’ চোখেমুখে দুষ্টুমি ফুটিয়ে সে জবাব দেয়, ‘দিস গাই ইজ ভেরি মিস্টিরিয়াস মেরিয়েন। তার কাঁধের ঝোলায় আছে একটি ক্রিস্টাল বল। সে রাতের বেলা প্রথমে ক্রিস্টাল বলের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করবে – অগ্নিকুণ্ডের পাশে তোমার ইজেলের সামনে দাঁড়ানো কতটা নিরাপদ, তারপর ভাবনাচিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেবে।’ মেরিয়েন রঙের তুলিটি রেখে তার হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘ইজ দ্যাট ট্রু? তোমার ঝোলায় সত্যিই ক্রিস্টাল বল আছে কি?’ আমি তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলি, ‘ইউ হ্যাভ আ লাভলি সান মেরিয়েন। ফ্রগিকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি চেষ্টা করব তার জন্য একটি খেলনা নিয়ে ফিরে আসতে।’ মেরিয়েন তার হাতের তেলো দিয়ে চোখ মুছে বলে, ‘ইউ আর অ্যা ওয়ান্ডারফুল গাই, থ্যাংকু সো মাচ।’

আমরা হাঁটতে হাঁটতে এবার ঢুকে পড়ি ক্যানিওন রোডের স্কাল্পচার গার্ডেনে। ভাস্কর্যের এ-বাগিচাটিতে ফুটে আছে সোনালি ও কমলালেবু রঙের ফুল। বৃত্তাকৃতির একটি বিমূর্ত ভাস্কর্যের সামনে এসে আমি ফিরে তাকাই পেছন দিকে। ধাতুতে তৈরি দীর্ঘ – অনেকটা ল্যাম্পপোস্ট ও উইন্ডমিলের মিশ্রিত আকৃতি বাতাসে মৃদু দুলে ছড়াচ্ছে রুপার ঝলমলে দ্যোতনা। ‘এক্সকিউজ মি’ বলে রোজ জানায়, রুপালি ধাতব শেইপগুলো যিনি তৈরি করেছেন, সে-ভাস্করের নাম কাজিমা পেটারসন। তিনি তাঁর গ্যালারির খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে ঝিমাচ্ছেন। সপ্তাহখানেক আগে ড্রাগসের ওভারডোজে বিপন্ন হয়ে তিনি হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বেচারি একা মানুষ, তার খোঁজখবর করার কেউ নেই। কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলাও তিনি তেমন একটা পছন্দ করেন না। তো রোজ চাচ্ছে, ছুটে গিয়ে ভাস্কর পেটারসন মহাশয়ের একটু খবর নেবে, তেমন একটা দেরি হবে না, মিনিট পনেরোর ভেতর ফিরে আসবে সে। আমি রোজকে বলি, ‘এখানে আমি একটু ঘুরপাক করব, খুঁটিয়ে দেখব মূর্তিগুলো। ফিরে এসে এখানেই আমাকে পেয়ে যাবে রোজ। যাও, তুমি ঘুরে এসো।’

রোজ চলে যাওয়ায় আমার একটু একা লাগে।  কাজিমা পেটারসনের কাজ আমার চোখের সামনে রুপালি বর্ণবিচ্ছুরণে ঝলমলাচ্ছে, এসব ভাস্কর্যে আমি তেমন একটা আগ্রহবোধ করি না, তবে শ্রীযুক্ত পেটারসন রোজের বিশেষ মনোযোগ ও সহানুভূতি পেতে যাচ্ছেন, বিষয়টা আমারও পছন্দ হয় না। কিন্তু এ-বাবদে রোজের বিরুদ্ধে আমার অন্তর্গত নালিশের কোনো ভিত্তি নেই। আমি অবগত যে, রোজ আর্ট ডিস্ট্রিক্টের তাবৎ চিত্রকর ও ভাস্করের দিনযাপন সম্পর্কে বায়োগ্রাফিক ইনফরমেশন জোগাড় করছে। সে আর্ট-লাভার পর্যটকদের জন্য একটি আকরজাতীয় গাইডবুক লিখছে। সুতরাং তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্ক রাখার প্রয়োজন আছে। এ নিয়ে খেদ করাটা অনুচিত, তাই আমার বিক্ষিপ্ত মনকে ফিরিয়ে নিয়ে মনোযোগ দিই বাদবাকি ভাস্কর্যগুলোর শোভা দর্শনে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply