সালিশের মানুষ

হাসনাত আবদুল হাই
জইতুনের স্বামী জব্বর যখন আর একটা বিয়ে করে অন্য গ্রামে গিয়ে নতুন সংসার পেতে বসলো তখন তার মাথায় বাজ পড়ার মতো হলো। তার স্বামী জব্বর যে সৎ মানুষ না সেটা জইতুন বিয়ের পরই বুঝতে পেরেছে। গঞ্জ থেকে দেরি করে বাড়ি ফেরে, হেরে গলায় গান গায়, কিছু বললে খিস্তি তোলে, এমনকি কুৎসিত গালও দেয়, এই অভিজ্ঞতা হতে দেরি হয়নি জয়তুনের। আশেপাশের দু-তিনজন   বউ-ঝিকে বলার পর তারা হেসে বলেছে, জোয়ান পুরুষরা এমনই। বাড়িতে থাকে না বেশিক্ষণ। কাজের পর যেটুকু অবসর পায় গঞ্জে গিয়ে কাটায়, নানা রকম ফুর্তি করে। তার মধ্যে নেশা আছে, জুয়া আছে। মেয়েলোকের ব্যাপারও থাকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সহ্য
করে চলতে হয় বউদের, ঝগড়া করে লাভ হয় না। বদ স্বভাবের স্বামীর সামনে মুখ বুঁজে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। ভাতার বাড়ি ফিরে আসলো কিনা রাতের বেলা সেটাই বড় কথা।
জয়তুন প্রথম প্রথম আপত্তি করেছে, এ নিয়ে ঝগড়াও হয়েছে স্বামীর সঙ্গে। লাভ হয়নি। ধমক দিয়েছে জব্বর উঁচু গলায়, তখন সে যে নেশাগ্রস্ত তা বেশ বোঝা গিয়েছে। জইতুনের গায়ে দু-একবার হাতও তুলেছে সে। জইতুন তখন অন্যসব বউ-ঝির মতো চুপ করে গিয়েছে। বিয়ের এক বছর পর তার কোলে মেয়ে এসেছে, শখ করে নাম রেখেছে পাখি। তারপর থেকে পাখিকে নিয়েই সে সব দুঃখ ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে। বাড়ির পেছনের লাগোয়া জমিতে সবজি লাগিয়েছে নিজের হাতে। নিজেরা খেয়েছে, বাড়তি সবজি পাঠিয়েছে গঞ্জে বিক্রির জন্য। প্রতিবেশীরা দেখে বলেছে, জইতুনের হাতে জাদু আছে। যা লাগায় সেই সবজিই হয়, তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে। জইতুন জানে, এই গুণ সে পেয়েছে তার মায়ের কাছ থেকে। সবজি-বাগানটা তার মায়েরই তৈরি। ভিটেবাড়ি আর ওই একটুকুরো জমি তার বাবা রেখে গিয়েছিল। জব্বর বিয়ে করে সেই বাড়িতে এসে উঠেছে। পাশের গ্রামের বাসিন্দা ছিল সে, এই গ্রামে এসে চোখ পড়ে জইতুনের ওপর। তারপর কয়েকদিন ঘোরাঘুরি, লোকজনকে বলার পর বিয়ে। জইতুনের মা তখন বেঁচে ছিল, তার অপছন্দ হয়নি জামাইকে। প্রথম প্রথম বেশ ভালো মানুষের মতো চলেছে জব্বর। জইতুনের মা মারা যাবার পর সে যেন স্বাধীন হয়ে গেল, বেশ বেপরোয়া। শাশুড়িকে যে সে খুব ভয় পেত তা না। হয়তো লজ্জা-শরমের মাথা খেতে চায়নি তখন, হয়তো সঙ্গী-সাথি জোটেনি সঙ্গে সঙ্গে।
সবই কপাল বলে মেনে নিয়েছিল জইতুন। কিন্তু জব্বর যখন তাদের বিয়ের তিন বছর পর আরেকটা বিয়ে করে নতুন বউকে এ-বাড়িতে আনতে চেয়েছে তখন সেটা মেনে নিতে পারেনি সে। তার সহ্য হয়নি এবং নিজেকে বেশ অপমানিত মনে করেছে।  পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে সে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে চরিত্রহীন স্বামীর বিরুদ্ধে। কোমড়ে কাপড় পেঁচিয়ে বলেছে, সতিনের সঙ্গে থাকবে না সে। জব্বর চলে যাক যেদিকে ইচ্ছা হয়। তার মুখ দেখার ইচ্ছে নেই জইতুনের। জব্বর বেশিদূর যায়নি, পাশের গ্রামেই জমি কিনে ভিটে করেছে, সেখানেও একটা লাগোয়া বাগান। তার দ্বিতীয় বউ বাগানের সবজি করুক জইতুনের মতো, সেই সবজি বিক্রি করে দুটো পয়সা আসুক ঘরে এমন ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু নতুন বউয়ের হাতে জাদু নেই, তার লাগানো চারা বেশিদিন বাঁচে না। তখন জব্বর নতুন বউকে কাঁথা সেলাই করতে বলে। বাজারে কাঁথাও বিক্রি করা যায়।
জব্বর চলে যাবার পর শুধু সবজির বাগান করে দিন চলে না জইতুনের। সে পাখিকে সঙ্গে নিয়েই গ্রামের অবস্থাপন্ন গেরস্ত বাড়ি গিয়ে কাজ করে। একবেলা খেয়ে, রাতের খাবার সঙ্গে নিয়ে আসে বাড়িতে জইতুন। মায়ে-মেয়েতে মিলে খায়। এই করে করে জব্বর চলে যাবার পর এক বছর পার হয়ে যায়। পাখির তখন তিন বছর বয়স। প্রতিবেশী রাহিলা বলে, ও জইতুন মুরগি পালো না কেন?
ক্যান? মুরগি দিয়া কী হবে? জইতুন জিজ্ঞাসা করে।
মুরগি ডিম দেবে। সেই ডিম বাজারে বেচতে পাঠাইবা। দুইটা পয়সা পাইবা। সংসারের চেহারা অল্প হলেও ফিরবে।
জইতুন ভেবেচিন্তে তাই করে। কয়েকটা মুরগি কেনে সে সবজি বিক্রির টাকা দিয়ে। মুরগিগুলো ডিম পাড়তে শুরু করলে পাশের বাড়ির খলিল নামের ছেলেটাকে দিয়ে বাজারে পাঠায় সে-ডিম বিক্রি করতে। খলিল আঠারো-উনিশ বছরের তরুণ, হাতে পাঁচ টাকা পেলেই খুশি হয়। বেশিক্ষণ লাগে না তার গঞ্জে গিয়ে ডিম বিক্রি করতে। শুধু যাওয়া-আসার যা সময় লাগে, তার বেশি খরচ করতে হয় না। গঞ্জের দোকানে ডিমের বেশ কদর।
জইতুন দেখে ডিমের দাম বাড়ছে। তখন সে মুরগির সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। এখন কাপড়ের ঝোলায় না, ঝাকায় করে ডিম নিয়ে যায় খলিল। তার আয়ও বেড়েছে, পাঁচ থেকে দশ টাকা এখন। এই ব্যবসায় সে বেশ আনন্দ পেতে শুরু করেছে, গঞ্জে যায়, সেখানে নানা রকমের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। কাজ শেষ হলে কোনো দোকানে বসে কথাবার্তা বলে, কখনো চায়ের দোকানে গিয়ে চা খায় লাঠি বিস্কুটের সঙ্গে। আঠারো-উনিশ বছরের তরুণ হলেও সুন্দর স্বাস্থ্যের জন্য তাকে যুবক মনে হয়। চেহারাটাও মোটামুটি সুশ্রী। গোসল করে যখন সে আয়নায় চেহারা দেখে, চিরুনি দিয়ে চুলে সিঁথি কাটে, সে-সময় তার মনে বেশ ফুর্তির ভাব এসে যায়। নিজের অজান্তেই গুনগুনিয়ে গান গায় সে।
খলিল থাকে তার মায়ের সঙ্গে। এতদিন বলতে গেলে বেকারই ছিল, কোনো কাজেই মন বসেনি তার। তার মায়ের জমি আছে কিছুটা, সেই জমি বরগা দিয়ে চলে তাদের সংসার। খলিলের জমিজমার কাজে টান নেই। চাষবাসে মন ভরে না। ব্যবসা দেখে তার মনে জবর ফুর্তি হয়। সে ঠিক করেছে কিছু টাকা জমাতে পারলে নিজেই ব্যবসা শুরু করবে।
জব্বর একদিন এসে জইতুনকে বলে, বেশ ভালো ব্যবসা ধরিছো। ডিমের ব্যবসা ভালোই চলতিছে। অন্যের বাড়ি কাম ছাড়ি দিছো হুনতে পাই। নিজের পায়ে খাড়ায়ে গেছো এহন। বেশ বেশ। তা হুশিয়ার থাইকো, খলিল ছোড়াটা টাকা-পয়সা মাইরা দেয় কিনা ঠিক নাই। কাচা টাকা হাতে পড়লে চরিত্র ঠিক থাকে না।
জইতুন হেসে বলে, থাক। আমার লাগি অত দরদ দেখাইতে হবে না। আমার ভালো-মন্দ আমি ভালোই বুঝি। তোমার মাথা ব্যথার কারণ নাই।
জব্বর বলে, না আইসে পারি না। হাজার হোক পেরথম বউ তুমি। কিছুটা দরদ থাকেই মনের ভেতর। তুমি খারাপ থাকলি কি মনে শান্তি পামু?
যাও। যাও। নতুন করি সোহাগের কথা শোনাতে হবে না। যার সঙ্গে আছো অহন তারে গিয়া শোনাও।
প্রায় ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে জব্বরকে জইতুন। সে মুরগির খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। জব্বরের প্যাঁচাল শোনার সময় নাই। লোকটাকে দেখলে তার গায়ে জ্বলুনি ধরে, যেন বিছুটি-পাতা লেগেছে। জব্বরকে ধূর্ত শেয়ালের মতো দেখায়। শেয়ালগুলো যেমন সন্ধে হলেই তার মুরগির খাঁচার আশেপাশে ঘোরে, ঠিক তেমুন দেখায় জব্বরকে।
খলিল একদিন বলে, শুধু ডিম বিক্রি করলি হবি না।
তা হলি? জইতুন তাকায় তার দিকে।
মুরগির বাচ্চা বেচতি হবে। বাজারে খুব চাহিদা। পাইকাররা বাড়িতে আসি নিয়া যাবে। আমি খোঁজ নিছি। তাদের সঙ্গে কথাবার্তাও হইছে। তারাই পরামর্শ দিলো।
কিন্তু পুঁজি? পুঁজির জোগাড় হবে ক্যামনে? বেশ টাকা লাগবে ওই ব্যবসায়। অনেক মুরগি, আরো খাঁচা কিনতি হবি।
খলিল বলে, আমি এক পাইকারের লগে কথা কইছি। সে টাকা দাদন দেবে। পুঁজি। মুরগির বাচ্চা বিক্রি কইরা সে দাদন শোধ করতে পারবা তুমি।
দাদন? না বাবা। ওর মধ্যি আমি নাই। শুনিছি মহাজনরা দাদনের প্যাঁচে ফেইলা বাড়ি-ঘর, ভিটে-মাটি সব দখল কইরা নেয়। আমি অমন ঝুঁকি নিতে পারমু না।
খলিল হেসে বলেছে, বেশ তাহলে ডিম বিক্রির টাকা দিয়েই মুরগির বাচ্চা বিক্রির ব্যবসা শুরু করা যাক। ছোটখাটো ব্যবসা দিয়েই শুরু হোক না হয়। তোমারে একট্টু হিসাব কইরা চলতে হইবো। হয়তো গেরস্তবাড়ি গিয়া কামও করতি হইবো কিছুদিন। আমারেও একটু বেশি টাইম দিতে হইবো মুরগির বাচ্চার খামারে। তা না হয় দিলাম। আমার তো অন্য কাম নাই। জমিতে চাষবাস বর্গাদারই করে। ফসল কাটার পর মায়েরে ধান বুঝায়া দেয়। তাইতে আমাদের খোরাকি চলে, কিছু ধান বিক্রিও হয়। তার জন্যি আমারে খুব বেশি টাইম দেওয়া লাগে না। আমার হাতে অনেক সময়। তোমারে সাহায্য করবো। আমার এই ব্যবসা খুব ভালো লাগিছে।
জইতুন কিছুক্ষণ ভাবে। খলিলকে ভালো করে দেখে। না, বেশ ভালো মনেই কথাগুলো বলছে সে। কোনো বদ বুদ্ধি নেই মনে। তাকে ঝামেলায় ফেলবে না। সে খলিলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।
আস্তে আস্তে জইতুনের বাড়ির পেছনে একের পর এক মুরগির খাঁচার সংখ্যা বাড়তে থাকে। মুরগির ডাক শোনা যায় অনেকদূর থেকে। কাছে এলে মুরগির বাচ্চাদের নিচু স্বরের কিচির-মিচির শব্দও শোনা যায়। জইতুনের খামারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, তার বেশ নামডাক হয়ে যায়। অনেকে দেখতে আসে তার খামার। একদিন উপজেলা থেকে ইউএনও সাহেব থানার দারোগাকে নিয়ে তার বাড়ি হাজির। তাদের দেখে জইতুন তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে ঢোকে, অজানা আশঙ্কায় তার বুক দুরুদুরু করে। সে কি কোনো অপরাধ করে ফেলেছে? কিংবা খলিল? সে ঘরের ভেতর থেকে ভয়ে বের হয় না। খলিলই তাদের সঙ্গে কথা বলে স্বাভাবিকভাবে। কোনো ভয়ডর নেই ছেলেটার। বেশ চটপটে হয়ে কথা বলে যায়।
ইউএনও আর দারোগা সাহেব চলে গেলে খলিল জইতুনকে ডেকে বলে, মিনিস্টার সাহেব আসতিছেন।
ক্যাডা আসতিছে? বুঝতে না পেরে জইতুন ঘরের ভেতর থেকে বার হয়ে তাকায় খলিলের দিকে। গ্রামের কিছু মানুষ তখনো কৌতূহল নিয়ে তার বাড়ি আর তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ একটা গুঞ্জন শোনা যায়। কয়েকটা কাক কর্কশ স্বরে ডেকে উড়ে যায় উঠোনের ওপর দিয়ে। কাছের মাঠে গরুর হাম্বা ডাক শোনা যায়। সেই ডাকে দুপুরটা যেন আরো বড় আর গভীর হয়।
খলিল বলে, মিনিস্টার। মানে মন্ত্রী। তোমার মুরগির খামার দেখতে আসবেন।
ক্যান দেখবেন? দেখার কী আছে? বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে জইতুন।
সে তারাই জানে। ইউএনও সাহেব বেশি কিছু কন নাই। শুধু কয়ে গেলেন অমুক তারিখে মিনিস্টার আসবেন। তারপর একটু ভেবে বলে, এই খামারের নামডাক হয়েছে তো। হয়তো তাদের কানে পৌঁছাইছে এ-খামারের কথা। তাই দেখতে আসতিছেন।
হু। তা আমাদের কী করা লাগবে? জইতুনের স্বরে কিছুটা দুশ্চিন্তা।
আমাদের পরিষ্কার কাপড়-চোপড় পইরা থাকতে হইবো। তাদেরকে খোশ আমদেদ জানাইতে হইবো। তারপর তারাই জানেন কী করবেন এহানে আইসা।
শুনে জইতুন বলে, আমার ডর করতিছে। তাদেরকে তুমি সামলাইবা।
খলিল হেসে বলে, তুমিও সামলাইতে পারবা। তোমারই তো খামার। আমি থাকমু লগে লগে।
মিনিস্টার আসেন কয়েকদিন পর তার দলবল নিয়ে। সঙ্গে টেলিভিশন, ক্যামেরাম্যান। তিনজন বিদেশিও রয়েছে। একজন মেয়ে, দুইজন পুরুষ।
মিনিস্টার সাহেব হাসিমুখে জইতুনের খামার দেখেন। জইতুনের সঙ্গে কথা বলেন। টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে বিদেশিদের উদ্দেশে বলেন, এই যে দেখছেন জইতুনের খামার। সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে স্থাপিত। কারো কাছ থেকে ঋণ নেয় নাই সে। স্বনির্ভর, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সব করেছে সে। ডক্টর ইউনূস মিছাই বলেন, তারে ছাড়া কোনো দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি হয় নাই এই দেশে। একমাত্র তিনিই গরিবের বন্ধু। এখন নিজের চোখেই দেখেন সত্য-মিথ্যা। জইতুনকে প্রশ্ন করেন কী করে, কারো সাহায্য ছাড়াই সে নিজে এতদূর এসেছে। তার মুখ থেকেই শোনেন দারিদ্র্য বিমোচনের ইতিহাস। ডক্টর ইউনূসের প্রচারণা যে কত মিথ্যা জইতুনের দৃষ্টান্ত থেকেই বুঝতে পারবেন আপনারা।
এরপর বিদেশিরা জইতুনকে প্রশ্ন করে। মন্ত্রীর দলের একজন তা তরজমা করে দেয় বাংলায়। ঘোমটা মাথায় জইতুন প্রশ্নের উত্তর দেয়। সেই উত্তরও বাংলায় তরজমা হয়। বিদেশিরা ব্যস্ত হয়ে কাগজে লেখে। হাতের ক্যামেরা তুলে ছবি তোলে। টেলিভিশনে ছবি তোলা হয়। মন্ত্রী মুরগির বাচ্চা খাঁচা-হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকেন ছবি তোলার জন্য জইতুনের সঙ্গে মন্ত্রীর এবং বিদেশিদের ছবি তোলা হয়। বিদেশিদের হাতেও তুলে দেওয়া হয় মুরগির বাচ্চার খাঁচা।
বেশ কয়েকটা গাড়ি নিয়ে এসেছেন মন্ত্রী। গ্রামের লোকজন, খালি গায়ে থাকা ছেলেমেয়েরা একবার সে গাড়ি দেখে আরেকবার মন্ত্রী যেখানে সে উঠোনে এসে ভিড় করে। তাদেরকে দূরে রাখার জন্য থানার পুলিশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝেই তাদের ধমক শোনা যায়। কয়েকটা কুকুর দূরে দাঁড়িয়ে ভিড়ের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করতে থাকে। কিছু পর মন্ত্রী দলবল নিয়ে চলে গেলে গ্রামের মাতুব্বর কয়েকজন হাফাতে হাফাতে আসেন। বেশ অসন্তুষ্ট স্বরে তারা জইতুনকে বলেন, এই যে মিনিস্টার সাহেব আইলেন তোমার বাড়ি এ-খবরটা আমাদের দেবা না? আমরা হলাম গ্রামের মুরুব্বি। আমাদের ছাড়া মিনিস্টারের লগে একা একা কথা কইলা ক্যামনে তুমি? একটা নিয়মকানুন আছে না? মিনিস্টার সাহেব গ্রামে আইলেন অথচ আমরা তার খাতির যতœ কিছুই করতে পারলাম না। আমাদের গ্রামের ইজ্জত মারা গেল তোমার নির্বুদ্ধিতার লাগি। মন্ত্রীরা কি রোজ রোজ আসেন? গ্রামের জন্য এইটা কতবড় সম্মানের বিষয় তা তোমরা বুঝলা না। বুঝলে গ্রামের মুরুব্বিদের আগেই খবর দিতা বলে তিনি বেশ অসন্তুষ্টির সঙ্গে খলিল আর জইতুনের দিকে তাকান।
খলিল হাত কচলে বলে, আমরা কি জানি মন্ত্রী সাহেব সত্যি সত্যি আইবেন? ইউএনও সাহেব একদিন আইসা কইয়া গেলেন আইতে পারেন। এই উড়া কথা আপনাদের কইয়া আহাম্মক বনি ক্যামনে?
ওয়ার্ড মেম্বার কসিমুদ্দি বলেন, আইজ যখন আইলেন সেই সময়ও আমাদেরকে খবর দিতে পারতা। আমরা মিছিল কইরা আইতাম। স্লোগান দিতাম : মিনিস্টার সাহেব যেখানে আমরা আছি সেখানে। মিনিস্টারের আগমন, শুভেচ্ছার স্বাগতম।
খলিল আগের মতোই হাত কচলে বলে, মন্ত্রী এমন হঠাৎ কইরা আইবেন আমরা ভাবতে পারি নাই। খুব ঘাবড়াইয়া গেছি। আর তিনি তো বেশিক্ষণ এখানে থাকেন নাই যে কাউরে দিয়া আপনাদের খবর দিই।
ওয়ার্ড মেম্বার কসিমুদ্দি মাথা নেড়ে বলেন, কাজটা ভালা করলা না মিয়া।
একদিন জব্বর এসে জইতুনের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে তাকে ডেকে বলে, জইতুন তোমার লগে জরুরি কথা আছে।
কী কথা? জইতুন ঘরের ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করে।
সামনে আইসো। সব কথা কি দূর থেকে কওয়া যায়? খুব জরুরি কথা।
জইতুন কিছুপর ঘোমটা মাথায় বাইরে এসে ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে বলে, কও শুনি। কী কথা কইতে চাও।
জব্বর গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে বলে, কতিছি কি একটা ভুল হইয়া গ্যাছে। এই যে তোমারে তালাক দেওয়া। তা সেই ভুল শোধরানো যায়। তুমি তো কাউরে বিয়া করো নাই। তোমারে বিয়া করতে বাধা নাই আমার। হিল্লা বিয়া না হয় নাই হইল। মুরুব্বিদের বুঝায়া কমু।
শুনে হাসে জইতুন। তারপর বলে, আমি তোমারে বিয়া করমু এই কথা ভাবতে পারলা ক্যামনে?
মেয়েলোকের একজন পুরুষ মানুষ লাগে। স্বামী লাগে। একা একা থাকবা ক্যান? কত কষ্ট একা থাকার। জব্বরের স্বরে দরদ ঝরে পড়ে।
কোনো কষ্ট হতিছে না আমার। হ্যাঁ, পেরথম পেরথম হইছে। এখন কোনো কষ্ট নাই। জইতুন বেশ দৃঢ় স্বরে বলে।
আছে। আছে। মেয়ে মানুষের রক্ষা করতি পুরুষ মানুষ লাগে একজন। সংসার বড় কঠিন জায়গা। কখন কী হয় কিছুই কওয়া যায় না। বলে জব্বর ধূর্ত শেয়ালের মতো মুরগির খাঁচাগুলোর দিকে তাকায়।
জইতুন বলে, শুনলাম। তবে আমার কথাও শুইনা রাখো। তোমারে বিয়া করার কোনো ইচ্ছা নাই আমার। একবার যহন বিদায় নিয়া গ্যাছো, আমারে ছাইরা গ্যাছো, তারপর আর কাম নাই এক হওনের। ভাঙা পাতিল জোড়া লাগে না।
লাগে। লাগে। সংসারে সব কিছুই হয়। না হইলে সংসার এত বিচিত্তির হয় ক্যামনে? জব্বর মুখে মোলায়েম হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
জইতুন এবার জোর গলায় বলে, যাও। হুনছি তোমার কথা। আমার কথাও হুনছো তুমি। তোমার লগে সংসার করার কোনো সাধ নাই আমার। আমি বেশ ভালো আছি।
গ্রামের মাতুব্বর, মৌলভী এবং ওয়ার্ড মেম্বার জব্বরের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে যান। মাতুব্বর শেখ মুর্শিদ বলেন, হ, ব্যাপারটা আমাদের চোখেও পড়ছে। জোয়ান মাইয়া মানুষ। জোয়ান এক অনাত্মীয় মাইনষের লগে দিন-রাত সময় কাটায়। ব্যবসা করে এক লগে। খুবই বেশরিয়তি কাম। কী কন হুজুর? বলে তিনি মৌলভী এবাদুর রহমানের দিকে তাকান।
মৌলভী এবাদুর রহমান আঙুল দিয়ে দাড়িতে বিলি কাটতে কাটতে বলেন, হ। বিষয়টা বড়ই আপত্তির। বেশরিয়তি কাম হইতাছে, এ-বিষয়ে সন্দেহ নাই।
মাতুব্বর শেখ মুর্শিদ উৎসাহের সঙ্গে বলেন, এই যে দেখেন তার বাড়িতে মিনিস্টার সাহেব, শহরের লোকজন ডাইকা আনলো। আমাদের কাউরে কিছু জানাইল না। কিরকম বেতমিজ মাইয়া আর পোলা। এইটা সহ্য করা যায় না। দুইজনে আমাদের চোখের সামনে ঢলাঢলি করতাছে। আমরা দেইখা চুপ থাকি ক্যামনে?
ওয়ার্ড মেম্বার কসিমুদ্দি সায় দিয়ে বলেন, হাচা কথা কইছেন শেখ সাহেব।
মৌলভী এবাদুর রহমান দাড়ি থেকে তার হাত নামিয়ে বলেন, তা হইলে একটা সালিশ ডাকা হোক। দোররা মারা হইবো। গ্রাম থাইকা তাড়াইয়া দেওয়া হইবো। কী মনে করছে হ্যারা? সমাজ নাই? সালিশ-আদালত উইঠা গ্যাছে? গ্রামের মুরুব্বিরা নাকে তেল দিয়া ঘুমাইতেছেন? এ্যা! তার স্বর ক্রমে বাড়তে থাকে, তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তার কথা শুনে জব্বরের মুখে ক্রূর হাসি জেগে ওঠে। বুঝুক হারামজাদি, কত ধানে কত চাল। তার ব্যবসা করা বার হইবো এহন। খলিল পোলাটারও বারোটা বাজবো। দুইজনেরই দফা রফা হইবো।
গ্রামের ঢ্যাড়া পিটিয়ে সালিশের দিন-তারিখ জানানো হয়। বিষয়টা সবার মুখে মুখে ঘোরে। অনেকদিন কোনো সালিশ হয়নি গ্রামে। তাই খবর শুনে সবার মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। মাতুব্বর শেখ মুর্শিদ মৌলভী এবাদুর রহমান আর ওয়ার্ড মেম্বার কসিমুদ্দির কাছে গিয়ে কৌতূহলীদের কেউ কেউ বিশদভাবে সব জানতে চায়। তারা তিনজনই একই কথা বলেন : সবই জানতে পারবা। কয়টা দিন সবুর করো। সালিশের দিন উপস্থিত থাইকো সবাই। তখন নিজ কানে শুনতে পাইবা। সবার সামনেই বিচার হইবো। কিছুই গোপন থাকবো না। বেশরিয়তি কাম করার নতিজা কী হয় তা দেখতে পাইবো সবাই।
সালিশের কথা জইতুন আর খলিলও শোনে। তারা প্রথমে গম্ভীর হয়ে যায়, কিছুটা শঙ্কিতও হয়। নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে দুইজন। কয়েকদিন মুরগির বাচ্চা বিক্রিতে ভাটা পড়ে। চার বছরের মেয়ে পাখি মায়ের কাছে এসে বলে, মুরগির বাচ্চা। বলে সে হাত দিয়ে খাঁচার দিকে দেখায়। জইতুন তাকে আদর করে বলে, হ। মুরগির বাচ্চা। যাও খেলো গিয়া ওদের সামনে। কথা কও। মুরগির বাচ্চা তোমার কথা হুইনা হাসবো।
কয়েকদিন খুব ব্যস্ত থাকে জইতুন আর খলিল। গঞ্জে গিয়ে কাপড় কেনে তারা। খাসি কেনে দুটো। খলিল শহরে গিয়ে কার্ড ছাপায়। তাদেরকে এখন বেশ নিশ্চিন্ত দেখায়।
খলিল কার্ডটা দেওয়ার পর মাতুব্বর শেখ মুর্শিদ প্রায় বোমার মতো ফেটে পড়েন। চিৎকার করে বলেন, এ্যা। এইডা কী? খুব চালাক হইছো। না? এভাবে ফাঁকি দিতে চাও? আমাদেরকে বুরবক বানাইবা? সাহস তোমাদের কম না। তারপর মাথা নেড়ে বলেন, বড় বেশি বাড়াবাড়ি করতাছো তোমরা দুইজন।
খলিল হাত কচলে বলে, বাড়াবাড়ির কী আছে হুজুর? সবই তো শরিয়ত অনুযায়ী হইবো। কোনো ফাঁক রাখা হইবো না। গ্রামের সব মুরুব্বিদের দাওয়াত দিমু আমরা। আপনারে দিয়া শুরু। আপনারাই তো আমাদের মুরুব্বি। তার কথা শুনে শেখ মুর্শিদ কটমটিয়ে তাকান। রাগে তার শরীর কাঁপছে।
ফিরে আসার সময় খলিল হাত লম্বা করে সালাম দিয়ে বলে, আসবেন কিন্তু হুজুর। আইসা দোয়া করবেন আমাদের। আপনারাই আমাদের মুরুব্বি। মুরুব্বিদের দোয়া ছাড়া কি কিছু হয়?
মাতুব্বর শেখ মুর্শিদ চোখ কটমট করে খলিলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার মুখে রক্ত জমে উঠেছে। যেন কেউ একটা চড় মেরে গেল।
খলিল কার্ডটা দেওয়ার পর মৌলভী এবাদুর রহমান প্রায় বোমার মতো ফেটে পড়েন। চিৎকার করে বলেন, এ্যা। এইডা কী? খুব চালাক হইছো। না? এইভাবে ফাঁকি দিতে চাও? আমাদেরকে বুরবক বানাইবা? সাহস তোমাদের কম না। তারপর মাথা নেড়ে বলেন, বড় বেশি বাড়াবাড়ি করতাছো তোমরা দুইজন।
খলিল হাত কচলে বলে, বাড়াবাড়ির কী আছে হুজুর? সবই তো শরিয়ত অনুযায়ী হইবো। কোনো ফাঁক রাখা হইবো না। গ্রামের সব মুরুব্বিকে দাওয়াত দিমু আমরা। আপনারে দিয়া শুরু। আপনারাই তো আমাদের মুরুব্বি। তার কথা শুনে মৌলভী এবাদুর রহমান কটমটিয়ে তাকান। রাগে তার শরীর কাঁপছে।
ফিরে আসার সময় খলিল হাত লম্বা করে সালাম দিয়ে বলে, আসবেন কিন্তু হুজুর। আইসা দোয়া করবেন আমাদের। আপনারাই আমাদের মুরুব্বি। মুরুব্বিদের দোয়া ছাড়া কি কিছু হয়?
মৌলভী এবাদুর রহমান চোখ কটমট করে খলিলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার মুখে রক্ত জমে উঠেছে। যেন কেউ একটা চড় মেরে গেল।

১ thought on “সালিশের মানুষ

Leave a Reply

%d bloggers like this: