ব্যক্তিজীবনের সীমিত আয়ু পেরিয়ে ২৪ মে ২০২১ তারিখে আমার বন্ধু কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী চিরজীবনে প্রবেশ করেছে। এখন থেকে তার সুপুষ্ট রচনাসম্ভারই তার প্রধান পরিচয়। দেখতে দেখতে পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাট পেরিয়ে সত্তর পেরিয়ে তিয়াত্তরে প্রবেশ করেছিল সিরাজী। কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ পালকটি তখন তার মুকুটে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক রূপে প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত। তারপরেই দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিরজীবনে প্রবেশ করল সিরাজী। চাপা স্বভাবের সিরাজী তার এই রোগ সম্পর্কে একটু বিলম্বেই সচেতন হয়েছিল বলে মনে হয়। শেষবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মাত্র দু-তিনদিন আগেও তার সঙ্গে মোবাইলে আলাপ হয়। তখনো রোগের এই মরণঘাতী অবস্থা সম্পর্কে তার কাছে কিছুই শুনিনি।

বিশ শতকের সেই মধ্য-ষাট থেকেই আমরা কবিতা হাতে পাশাপাশি হাঁটছি। সিরাজী আসত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে, আমি নেমে আসতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মহসীন হলের দোতলার ২৬৫নং কক্ষ থেকে। কখনো সঙ্গে থাকত আবুল হাসান।

ওর হাতে হয়তো সদ্যপ্রকাশিত তার কবিতাপত্র, নাম স্বরগ্রাম, যার শুরুতেই ছাপা হয়েছে আমার কোনো কবিতা। তেমন এক কবিতার নাম ‘মহাকবি কালিদাস শ্রদ্ধাস্পদেষু’। আমি ভালো কবি কি মন্দ কবি সেটি বড় কথা নয়, আমি যে তার বন্ধু সেটিই আসল নিক্তি।

সিরাজী অবশ্য তার একটি বিখ্যাত কবিতায় নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিজের বন্ধু বলে স্বীকার করেনি। এর ভেতর সত্য যতখানি তার চেয়ে বেশি আছে, বোধকরি, আত্মাভিমান। এটিই কবিদের প্রধান অবলম্বন। এটাকে কাব্যাভিমানও বলা যেতে পারে। এটিই স্বাতন্ত্র্য-সন্ধানী দ্বীপ-কবিদের নির্ণায়ক সম্বল। সিরাজীর ভেতর এই কাব্যাভিমান তার কবিজীবনের শুরু থেকেই অহংবিসারী। তাই সিরাজী অকপটে বলে, ‘আমার একজনই বন্ধু’ আর তার নাম হাবীবুল্লাহ সিরাজী। এটি একটি অস্তিত্বের নানা কৌণিক বিপর্যয়-সংক্রান্ত কবিতা, যা সার্ত্রীয় দর্শনজাত বলা যায়। ষাটের দশকে আত্মশনাক্তির এই সংকটটি কবিতার একটি মুখ্য বিষয় বলে ধরা যেতে পারে। শামসুর রাহমানের অনেক কবিতায় এই বিষয়টি নানাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। প্রসঙ্গত তখন মৎপ্রণীত ‘বন্ধুবিষয়ক মহত্তম কবিতা’র কথা বলা যেতে পারে যেখানে ব্যক্তির অস্তিত্ব ও সম্পর্কের ধোঁয়াশা নানাভাবে সংকেতায়িত। সিরাজী লিখেছে,

আমার একজনই বন্ধু, তার  নাম হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

বহুদিন তার সঙ্গে দেখা হয় না, সেই যেদিন

গোলাঘর ও অড়হর ক্ষেতের পাশে, রতন পালের ঘড়ার কাঁধে,

কুমারের পাতলা ঝিনুক এবং কবিরাজ বাবুর মহাঘৃত শিশির সবুজ কাচে

সে লুটোপুটি খেলো, – সেদিন থেকেই তার সঙ্গে দেখা নেই।

…       …        …

আমি গ্রাম থেকে শহরে এসে চিনি-ময়দা মেখে দেখি

বাদুড়ের বিষ্ঠার নিচে ভোর হচ্ছে চাকু ও চাবুকের।

সমাজ, পরিবেশ ও সময়বদলের সঙ্গে ব্যক্তির অবয়ব-বদলের এই উপলব্ধি সেই থেকেই তাড়া করছে এই কবিতাসম্মত মানুষটিকে। এটি তার স্বাতন্ত্র্যসন্ধানেরও একটি উপায় ভাবা যেতে পারে।

প্রথম কাব্য দাও বৃক্ষ দাও দিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তার প্রায় প্রতিটি কবিতায় বিষয়ে, প্রকরণে, শব্দে, উৎপ্রেক্ষায় বা অন্যবিধ আলংকারিক বিন্যাসে এই স্বাতন্ত্র্য বা সিরাজীত্ব বিশেষভাবে চোখে পড়ে। সমকালীন বাংলা কবিতায় নিজের মুদ্রাদোষে যারা আলাদা হতে চায়, সিরাজী তাদের মধ্যে প্রথম পঙ্ক্তিতে। আমি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের পেছন-মলাটেও খুব সংক্ষিপ্ত বয়ানে এই ইঙ্গিতটুকু দিয়েছিলাম। হাল-আমলে, অর্থাৎ ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার একটি ব্যতিক্রমী শিরোনামের কাব্য কবিরাজ বিল্ডিংয়ের ছাদ পর্যন্ত প্রয়োগকলার এই স্বাতন্ত্র্য ও পরোক্ষময়তা লক্ষ করেছি। পেশায় প্রকৌশলী ও নেশায় সুরাবিলাসী এই কবির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার মধ্যে এভাবেই নির্মাণকলা ও সৃজন-নন্দনকলার একটি বিদ্যুৎ-সার্কিট তৈরি হয়, যা তার কবিতাকে অন্যরকম একটি অবয়ব ও স্বরভঙ্গি প্রদান করে। এখানে সিরাজী তার স্বগোত্রীয় অনেক কবির চেয়ে ঈর্ষণীয়ভাবে আলাদা। তার সচেতন পাঠকসমাজ এই সিরাজীত্ব শনাক্ত করেছেন সচেতনভাবেই।

না, সিরাজী অনুপ্রাণিত বোধের ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রচল-ভাষার অচেতন কবি নয়। বরং তার সচেতন নির্মাতা-সত্তা তাকে নতুন বাকপ্রতিমা গড়ার শ্রমসাধ্য পথে ডেকে নেয়। দীর্ঘ হোক হ্রস্ব হোক, তার কোনো কাব্যভাষ্য যেমন ছন্দ-ছুট নয়, তেমনি তার কোনো কবিতা ভাষ্যহীন বাণীহীন দ্ব্যর্থক ব্যঞ্জনামাত্র নয়। মূলত অক্ষরবৃত্তের এই কারিগর সব ছন্দেই সচ্ছন্দ, তবে বাকবিন্যাসে নিয়ত সুমিতাচারী ও দ্বান্দ্বিকতায় প্রলুব্ধ। একনায়ক কবিদের মতো সিরাজীও নিজেকে জেনারেল ঘোষণা করে অসম্ভবকে সম্ভব করার কাব্যিক স্বেচ্ছাচারের সাহস দেখায়। কবিরাজ বিল্ডিংয়ের ছাদ গ্রন্থের শেষ কবিতায় এই নির্মাতা কবির উচ্চারণ : ‘অবনত হবার অপেক্ষায় চূড়া’।

শস্যপত্র নিয়ে এসেছিলো ঈষ ও কাস্তে

দেখামাত্র সরে গেছে সিঁড়ি,

একটি জুঁইও অসামান্য অনীহায়

বিলিয়েছে ঘর্মাক্ত ঘ্রাণ;

হে মধ্যাহ্ন, হে অসম্ভব হাড়

কবরের সীমা নির্ধারণ করে দাও

দায় শোধ হোক।

সন্ধ্যার পশ্চিম ও আকাক্সক্ষার এপিটাফ

সারিবদ্ধ জমা থাক

পদপ্রান্তে, করতলে, দৃষ্টি ও মস্তকে

কাচের দেয়াল ঘেরা বিম্বিত আহ্বান

কেবলমাত্র দাসেরই যোগ্য।

সম্ভব করার জন্য একটি অসম্ভব দাঁড়িয়ে আছে।

(‘সম্ভব ও অসম্ভবের স্থায়ী বয়ান’)

মিতবাক এই কবিতায় সিরাজীর কাব্যসাফল্য ও সীমাবদ্ধতার প্রায় তাবৎ বৈশিষ্ট্য প্রকীর্ণ। এ-কারণে এটি আমার কাছে তার একটি সূচক কবিতা। শব্দ কেটে কেটে পাথর ও লোহার তন্তুজালে বয়ন করে তাতে প্রাণ সঞ্চার করার এই অসম্ভবের সাধনা কেবল চূড়াআরোহী কবিকেই মানায়। ধ্রুপদ ও আধুনিকোত্তরের এই পরিণয় তার কবিতাকে লক্ষযোগ্য ভিন্নতা দিয়েছে। এই কাজে তার সমকালীনদের মধ্যে রফিক আজাদ আর পূর্বসূরিদের মধ্যে মাইকেল, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, সমর সেন, শহীদ কাদরী প্রমুখের নাম সহজেই চোখে পড়ে। সিরাজী এই কবিসম্প্রদায়ের মতোই তার কবিতাকে বাংলা কবিতার সহজিয়া গীতলতার পরিবর্তে টাইটফিট পরিধেয় পরিয়েছে। ফলে তার কবিতার শরীরে বহিরঙ্গে বেল-ফলের শক্ত আবরণ, আর ভেতরঙ্গে শরবতের সুমিষ্টতা আস্বাদ্য। আমি তার কবিতাকে বারংবার এই সশ্রম পথেই আস্বাদ করেছি।

সিরাজীর আরেকটি মুখ্য প্রবণতাও এই কবিরাজ বিল্ডিংয়ের ছাদ গ্রন্থে আছে। সেটি যেন আধুনিকোত্তর প্রায় প্রত্যেক কবির

প্রচল-শাসিত। সেটি হচ্ছে, তার আত্মজৈবনিকতা। কেবল জন্ম-বিবাহ-মৃত্যুচিন্তার বয়ান নয়, বরং তার সমসাময়িক ব্যক্তি ও সংসর্গ ও স্থানিকতা এখানে ত্রয়ী সমীকরণে এমন এক অচেনা জগৎ তৈরি করে, যা সমকালীনতাকে স্বতঃশ্চল ইতিহাসের সত্যে উত্তীর্ণ করে দেয়। একটি নমুনা :

এ কবিতা ছাদ

এ কবিতা লেজতোলা পায়রার খোপ

এ কবিতা লেবু-জিনে যৌথ ইস্তাহার

সরল-রেখার সঙ্গে সমাজ-ভূগোল

পাতালে পাথরে মেলামেশা বারোয়ারি

কাশবনে নামা দিদির প্রথম চাঁদ

এ কবিতা ছাদ

এ কবিতা মুর্তজা বশীর, মমি, ম্যাডসেন

…            …        …

এ কবিতা বার্মারাজু, কনফিডেন্স, এমপ্রুফ

…            …        …

লেবেলবিহীন শেষ রাতে ঘোলা তারা

জলবায়ু খেলা ইটে ঈশান-নৈর্ঋত

বনবাসে রেখে আসা ছত্রিশ বছর

এ কবিতা কবিরাজ বিল্ডিং-এর ছাদ

(‘কবিরাজ বিল্ডিংয়ের ছাদ’)

বলা যেতে পারে শুধু কবিতা নয়, এই কবির কাছে শুধু এই অসম্ভব সুন্দর কবিতাবয়ানই নয়, বরং পুরো পৃথিবীটাই হচ্ছে কবিরাজ বিল্ডিংয়ের ছাদ। এই ব্যক্তিছাদে দাঁড়িয়েই কবি সিরাজী তার ব্যক্তিগত প্রতিচিত্রসমূহ হজম করে নিজের এক ভিন্ন কবিতাবিশ্ব তৈরি করে।

বিশ শতকের মধ্যষাট থেকে, শরীফের ক্যান্টিন থেকে আজকের ঢাকা ক্লাবের পানাড্ডা, কিংবা জাতীয় কবিতা পরিষদের উৎসব-মঞ্চে নিয়ত পরিবর্তিত ও ক্রম-পরিণত যে-কবিকে পাই, তার আড়ালে দেখি আরেক তরুণ প্রেমিককেও, যে ঝোরা নাম্নী এক শ্যামলরং বাঙালি তরুণীর হাত ধরে হারিয়ে যাচ্ছে রমনা পার্কের অনুচ্চ ঝোপেঝাড়ে। শ্রম-প্রেম-মেধা ও সৃষ্টিসরলতার এই বিচিত্র যোগসাধনায় ব্রতী সিরাজী বয়সী বার্ধক্যকে পরাজিত করে চলেছে তার জেদোন্মত্ত অথচ বিনীত সৃষ্টিশীলতায়। হ্যাঁ, তার সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে এই হচ্ছে সহযাত্রী হিসেবে আমার বিনীত অহংকার।

দুই

তার কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। সঠিক সংখ্যা বলা এখনো কঠিন, কেননা এখনো তার বেশ-কিছু কবিতা গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত। তবে ২০১১ সালে প্রকাশিত কবিতাসমগ্র ও ২০২০ সালে প্রকাশিত কবিতামগ্র ২ – এ-দুটি সংকলনগ্রন্থে যে-৩৪টি (২৩+১১) স্বতন্ত্র কবিতাগ্রন্থের সন্নিবেশ ঘটে, তার মধ্যে চোখ বুলিয়ে তার কাব্যভুবনের একটি দ্রুতরেখ চিত্র অংকন করা যেতে পারে। এটি ভাবী আলোচক-গবেষকের কিঞ্চিৎ কাজে লাগতে পারে।  

প্রথম গ্রন্থ দাও বৃক্ষ দাও দিন (১৯৭৫) থেকে শুরু করে আমার একজনই বন্ধু (১৯৮৭) পর্যন্ত প্রথম সাতটি কাব্যে তার প্রথম পর্বের কাব্যবীক্ষণ শনাক্তযোগ্য। এখানে বয়ানগত ও বিন্যাসগত যে-সমরূপতা আছে তার অবলম্বন প্রথাগত ছন্দোবন্ধন, বাক্যরীতি, গ্রামশহরের টানাপড়েন, পরিবেশ-প্রতিবেশ, যুদ্ধ-সংঘর্ষ ও অস্তিত্বের নবায়নের প্রসঙ্গাবলি সুপ্রকটিত। স্থাপত্য ও জ্যামিতির সূত্রের মতো প্রসঙ্গও এখানে কবিতার ‘অস্তিত্ব’ হয়ে ওঠে :

আর্কিমিডিসের সূত্র মেনে

জলে কমে বস্তুর ওজন। উপচে পড়া ভালোবাসা

পাত্র ছুঁয়ে নেমে যায় নিচে,

…             …    …

একজন নিউটন অরগান বাজিয়ে

গতি ও স্থিতির ফল নির্ণয়ের কালে

ভাগ্য ও শ্রমের নুড়ি

আফ্রিকা এশিয়া ব্যেপে চলাচল করে

মাটি খোঁজে প্রস্তর যুগের এক মনুষ্য-সন্তান।

(‘অস্তিত্ব’)

বোঝা যায়, প্রাচীন-মধ্য-আধুনিকের মধ্যে এক চলনসেতু তৈরি করছেন এই কবি জ্যামিতিক বাতাবরণে। এই কাজটি বাংলা কবিতায় এর আগে বিনয় মজুমদার করেছেন বটে, তবে দুজনের দূরত্বও শনাক্তযোগ্য। বিনয় বিজ্ঞানকে কবিতামণ্ডিত করতে ব্যস্ত, আর সিরাজী কবিতায় বসাচ্ছে বিজ্ঞানের নানা চুমকি। ক্ষয় হচ্ছে মোমশিল্পের, কবি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় সূত্র ও মন্ত্রের নেশায় বুঁদ হয়ে :

একটি মানুষ জুয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে

হাওয়ার পালে গাও লাগিয়ে

দিন-দুপুরে, মধ্যরাতে হাঁটছিলো আর দুলছিলো

ভুলছিলো আর যাচ্ছিলো, খাচ্ছিলো আর গিলছিলো

                        আপন নেশায় বুঁদ ছিলো –

…              …     …

একটি মানুষ ছায়ার সঙ্গে হাঁটছিলো আর

          জোকারগুলো খুঁজছিলো, আর

          কাঁদছিলো, আর কাঁদছিলো।

(‘হাইড্রোজেন’, স্বপ্নহীনতার পক্ষে)

কিংবা –

আমার সংসারে আমি দেখে যেতে চাই এক স্বপ্ন ও কীর্তির দ্বৈরথ!

(‘এক বণিকের শেষ প্রার্থনা’, স্বপ্নহীনতার পক্ষে)

কাব্যভুবনের এই অংশে বণিক সভ্যতার সদম্ভ প্রবেশ লক্ষ করি। কলকাতায় ‘টলমল পায়ের’ শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর বিলাতের এলিয়টীয় প্রুফর্ক যেন ঢাকার রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটে। মনে পড়ে সহকবি রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে সিরাজীর দিনরাত্রির কবিতাযাপন। এই পর্যায়ে এক অবিনশ্বর কবিতার জন্ম হয় ‘চাঁদ খেয়ে ফেলে মাটির মানুষ’। মাটির ভেতর শুয়োপোকা, বীজ, পাতা, পলিমাটি, চিতলের পেট একাঙ্গে মিশে যায় আর ‘আড়িয়াল বিলে পচে মুণ্ডুহীন দেহ’। এই হচ্ছে অপস্রিয়মাণ মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি। বুভুক্ষু বণিকসভ্যতায় মানুষের অধঃপতন। আকাশের চাঁদ খেয়ে ফেলে মাটির মানুষ। সুকান্তের ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’র এক বিপরীত ভাষ্য এই সিরাজীবয়ান।

সিরাজীর কাব্যভুবনের দ্বিতীয় পর্বে আছে পোশাকবদলের পালা (১৯৮৮) থেকে একা ও করুণা (২০১১) পর্যন্ত আরো ষোলোটি কাব্য। আবার এই পর্বে অনুপর্ব আছে আরো কয়েকটি। সূক্ষ্মতর বীক্ষণে তা চেখে পড়বে সহজেই।

এখানে ‘সিংহদরজা’ ও ‘কৃষ্ণকৃপাণে’র সিরিজ কবিতাগুলো বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। কৃষ্ণকৃপাণ ধ্বংস  ও প্রতিরোধের অস্ত্র, যা নানা প্রাণী বিবর্তনের পথে আত্মরক্ষার খাতিরে বর্ম ও আহার হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর এই পর্বে এসে সিরাজী ইতিহাসকে দুশ্চরিত্র হিসেবে কটাক্ষ করে বলছে, ‘ইতিহাস বদমাশ হলে মানুষ বড় কষ্ট পায়।’ আবার উলটোভাবে বলা যায়, মানুষ বদমাশ হলে ইতিহাস বড় কষ্ট পায়। কাজেই মানুষকে লজ্জিত হতে হয়। ‘থমকে আছে বাংলাদেশ’ কবিতায় সেই দৃশ্য দেখা যায়,

মুক্তি কি কেবল ন্যাতাত্যানা, ঝুলন্ত জানালা?

ফেঁসে গেছে গুহ্যমন্ত্র, যত্রতত্র হাবিল-কাবিল;

শেয়ালেরা চর্বি চাটে, কুকুরেরা টেনে নেয় হাড়

থমকে আছে বাংলাদেশ, প্রিয় জয়ধ্বনি।

কিংবা   

       বত্রিশ নম্বর এখন রক্তের গম্বুজ

তার চূড়ায় মূল দলিল, নকশা আর পড়চা …

(‘রক্তের গম্বুজ’)

সিরাজীর কাব্যভুবনের তৃতীয় তরঙ্গে যমজ প্রণালী থেকে সুভাষিত হয়ে অগ্রন্থিত কবিতাগুলোকে পর্যায়ভুক্ত করা যায়। এখানে আছে বিষয়ের সঙ্গে কাব্যভাষার ও কাঠামোর নানা নিরীক্ষা। জো যেমন আঞ্চলিক ভাষা ও বিষয়কে অধিগ্রহণ করে, তেমনি নতুন ঈহা বা অনীহা সন্ধান দেয় ‘জেনারেল’ সিরাজী। যুদ্ধেও নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে ধ্বংসের বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে ‘জয় বাংলা বলো রে ভাই।’ ‘জেনারেল’ এখন ব্যূহ ভেদ করে সংস্কারক। তখন সাধারণ যোদ্ধাও সেনাপতি হয়ে যায়,  ‘সৈন্য শত্রুব্যূহের প্রান্ত স্পর্শ করলে সেনাপতি হয়ে যায়’ (‘চেকমেট’)। করাত ও কলম তখন সমান্তরাল সমরাস্ত্র হয়ে ওঠে। এই দুই অস্ত্র তখন ‘সৃষ্টি বল্লম’ হয়ে ওঠে (‘করাত ও কলম’)। তখন সমূহ বিপর্যয়কে রোধ করে ব্যক্তিমানুষ ও সমষ্টিমানুষের টিকে থাকাটাই আসল কথা। কবি জেনারেল সিরাজী সেই লড়াইয়ে নেমেছে তার চূড়ান্ত পর্যায়ে :

যে টেকে সে-ই একমাত্র জয়ী

অস্তিত্বের অভ্যন্তরে বিস্তারিত হতে থাকে পরবর্তী পরিচয়

অনন্ত নক্ষত্রপথ রচনার উপকরণ আহরণ শেষে

টিকে থাকাটাই বড় কথা … 

(‘টিকে থাকাটাই বড় কথা’)

এভাবেই একজন শিশুর মতো বছর কয়েকের চেষ্টায় নয়, বরং কয়েক যুগের সযত্ন চর্চায় সিরাজী শিখেছে একজন সর্বাঙ্গসুন্দর কবির মতো কথা বলতে; তারপর শিখেছে প্রয়োজনে মৌনব্রত পালন করতেও। এটিই হচ্ছে নান্দনিক কবির আরাধ্য অভিব্যক্তি। জীবন ও শিল্পকে এভাবেই একাঙ্গে যে মেলাতে পারে সে কেবল খণ্ডকালিক নয়, মহাকালিক স্রষ্টা। সিরাজীর সৃষ্টিতত্ত্বে সেই সত্যের প্রতিভাস আছে। q

০৬.০৬.২০২১

Leave a Reply