সুন্দরবনে সাত বৎসর : ভুবনমোহন থেকে বিভূতিভূষণ

লেখক: আহমাদ মাযহার

ইয়োরোপীয় ভাষাগুলোর আধুনিক শিশুসাহিত্যের ইতিহাস শুরু হয় মুদ্রণযুগ শুরু হওয়ারও অনেক পরে। মোটামুটিভাবে উনিশ শতক থেকেই বিভিন্ন দেশ ও ভাষার শিশুসাহিত্য রচিত হতে শুরু করে। লক্ষ করার বিষয় যে, ইয়োরোপীয়দেরই হাতে বাংলা মুদ্রণব্যবস্থারও শুরু। আবার ইয়োরোপীয়দের হাতেই যেহেতু রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেই সূত্রে শিশুদের কীভাবে গড়ে তুলতে হবে সেই চিমত্মারও উৎস ছিল তারা। আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের উদ্ভবের ইতিহাসের সূচনাকালের ব্যবধানও ইয়োরোপের সঙ্গে খুব একটা বেশি না হওয়ার এটা একটা কারণ হতে পারে। আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যও যে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল অনেকটা ইংরেজি শিশুসাহিত্যেরই আদলে তার কারণও সম্ভবত এটাই।

বাংলা গদ্যের উদ্ভবের লগ্ন থেকেই ছোটদের শিক্ষিত করে তোলার অভিপ্রায়ে গদ্য রচনার প্রয়াস চলেছে। কিন্তু ছোটদের উপযোগী দীর্ঘ কাহিনিমূলক রচনার প্রচেষ্টা ছিল বিরল। কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বিজয়বসন্তকে (১৮৫৯) প্রথম ছোটদের উপন্যাসের প্রয়াস হিসেবে কেউ কেউ বিবেচনা করেন। কিন্তু সার্থকতার বিবেচনায় প্রকৃতপক্ষে প্রমদাচরণ সেনের ভীমের কপালই (রচনা : ১৮৮৩, গ্রন্থরূপ : ১৯৮০) প্রথম ছোটদের উপন্যাস হিসেবে বিবেচ্য। কারণ এতে আদর্শিক মূল্যবোধের কথা থাকলেও কাহিনির বিন্যাসে চমৎকারিত্ব ছিল, গঠনশৈলীতে ছিল অভিনবত্ব। কমতি ছিল না আনন্দ-উপকরণেরও। সাম্প্রতিক গবেষণায় অবশ্য অমল পাল (পাল : ২০১৭) দেখিয়েছেন, বিজয়বসন্তরও আগের ছোটদের উপযোগী কাহিনিমূলক রচনা তথা উপন্যাস রামনারায়ণ বিদ্যারত্নের লেখা সত্যোচন্দ্রোদয় (১৮৫৪)। একই লেখকের রচনা গোপাল-কামিনীও (১৮৫৬) কাহিনিধর্মী। অমল পাল একেও উপন্যাসই বলেছেন। দুটি রচনায়ই শিশুদের নীতি-শিক্ষাদানের অভিপ্রায় প্রধান ছিল। প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টি কাহিনি সংস্থানের দিক থেকে সুখপাঠ্যতর। কিন্তু এগুলো বাংলা ভাষার মৌলিক রচনা ছিল না। ছিল বিদেশি কাহিনির ভাবানুবাদ।

বিজয়বসন্তকে প্রথম প্রয়াস বা ভীমের কপালকে প্রথম সার্থক ছোটদের উপন্যাস বলার কারণ এগুলোই বাংলা ভাষার প্রধানত ছোটদের মনোরঞ্জন ও মনোগঠন অভিপ্রায়ী রচনা। আবার এগুলো বিদেশি কাহিনির অনুসরণও ছিল না। অথচ দেশীয় স্বাতন্ত্র্য সন্ধানের চেয়ে পরবর্তীকালে বাংলা শিশুসাহিত্য যেন অনেকটাই পাশ্চাত্য শিশুসাহিত্যের অনুবাদনির্ভর হয়ে উঠেছিল; হয়ে উঠেছিল অনেকটাই পাশ্চাত্যের অনুকরণনির্ভরও। এর ব্যতিক্রম লক্ষণীয় হতো খুবই কম। কালের কুলোয় ঝাড়া পড়ে সেই ব্যতিক্রমের নিদর্শন স্বল্পই উত্তরকালের কাছে পৌঁছেছে। এর কারণ হয়তো এমন হতে পারে যে, শিশুসাহিত্যকে বাংলা সাহিত্যের মূলধারা হিসেবে আমলযোগ্য মনে হতো না। বাংলা শিশুসাহিত্য নিয়ে যাঁরা আধুনিক যুগের গোড়ার দিকে চিমত্মাভাবনা শুরু করেছিলেন তাঁদের সামনে কেবল ইংরেজিবাহিত ইয়োরোপীয় সাহিত্যই ছিল আধুনিকতার দৃষ্টান্ত।

ভুবনমোহন রায় (জন্ম-মৃত্যুর তারিখ জানা সম্ভব হয়নি) তাঁর সখা ও সাথী (১৮৯৫) পত্রিকায় ‘সুন্দরবনে সাত বৎসর’ নামে একটি ধারাবাহিক কাহিনি রচনা করতে থাকেন। শিশু-কিশোরদের কাছে অভিযান-কাহিনি প্রিয় হতে পারে, এমন ধারণা তিনিও হয়তো পেয়েছিলেন ইংরেজি শিশুসাহিত্যের সূত্রেই; কিন্তু ভুবনমোহন রায় সমর্থ হয়েছিলেন তাঁর কাহিনিটিতে খাঁটি দেশীয় স্বাদ দিতে। প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে এর পরিণতি দিতে গিয়ে স্বদেশীয় বৈশিষ্ট্য থেকে ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সরে আসেননি। সুন্দরবনে সাত বৎসরের এই গুণটি রাজশেখর বসুরও চোখে পড়েছিল। গ্রন্থাকারে এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে। বইটি পড়ে রাজশেখর বসু এর প্রকাশক সুধীন্দ্র সরকারকে লেখেন :

 

 

টেলিফোন, সাউথ ৯৩২

৭২, বকুলবাগান রোড

কলিকাতা-২৫

১৫/১০/৫২

 

 

শ্রীযুক্ত সুধীন্দ্র সরকার

১৫৪ হরিশ মুখুজ্যে রোড

কলিকাতা-২৫

প্রীতিভাজনেষু

‘সুন্দরবনে সাত বৎসর’ বইখানি খুব ভাল লাগল, লেখা ছবি ছাপা কাগজ সবই উত্তম। ছোট ছেলেমেয়েরা অ্যাডভেঞ্চার পড়তে ভালবাসে। এরকম রচনা রূপকথা বা ডিটেকটিভ গল্পের চাইতে হিতকর মনে করি, কারণ, পড়লে মনে সাহস হয়, কিছু জ্ঞানলাভও হয়। সাহসিক অভিযান বা বিপৎসংকুল ঘটনাবলীর জন্য আফ্রিকায় বা চন্দ্রালোকে যাবার দরকার দেখি না, ঘরের কাছে যা পাওয়া যায় তার বর্ণনাই বাসত্মবের সঙ্গে বেশি খাপ খায় এবং স্বাভাবিক মনে হয়। সুন্দরবন রহস্যময় স্থান, নিসর্গশোভা নদী সমুদ্র নানারকম গাছপালা বন্য জন্তু আর সংকটের সম্ভাবনা সবই সেখানে আছে। এই সবের বর্ণনা এবং চিত্র থাকায় আপনার বইখানি অতি চিত্তাকর্ষক হয়েছে। যাঁদের জন্য লিখেছেন তারা পড়লে খুব খুশী হবে সন্দেহ নেই!

 

ভবদীয়

রাজশেখর বসু

 

প্রথম সংস্করণে লেখক নাম ছিল এমনভাবে –

‘সখা ও সাথী’ সম্পাদক ভুবনমোহন রায় ও ‘পথের পাঁচালী’, ‘আরণ্যক’ প্রভৃতি প্রণেতা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-প্রণীত।

অধুনা বইটির বেশ কয়েকটি সংস্করণ বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে পাওয়া যায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকী অতিক্রান্ত হওয়ার পরেই এই বইটির অনেক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। কোনো কোনো সংস্করণে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের আগে ভুবনমোহন রায়ের নাম থাকলেও তিনি কে বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতিমান লেখকের সঙ্গে তাঁর নাম কী উপলক্ষে যুক্ত রয়েছে তার পরিচয় নেই। একটি সংস্করণে রাজশেখর বসুর চিঠির উলেস্নখ থাকলেও ভুবনমোহন রায় সম্পর্কে কিছুই লেখা নেই। কয়েকটি সংস্করণে তো ভুবনমোহন রায়ের নামটিই বাদ দেওয়া হয়েছে। যেন সুন্দরবনে সাত বৎসর বইটি এককভাবে বিভূতিভূষণেরই লেখা।

এভাবে বইটি প্রকাশ করা গর্হিত অপরাধ। কেননা, এতে বইটির কাহিনিভিত্তির স্রষ্টা ও কাহিনি-অভিপ্রায়ের নির্দেশনা দানকারী ভুবনমোহন রায়ের প্রয়াসকে অস্বীকার করা হলো এবং এর দায় এককভাবে চাপানো হলো বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। অথচ বিভূতিভূষণের মৃত্যুর দুই বছর পরে প্রকাশিত হলেও এর প্রকাশক বিভূতিভূষণের লেখা ভূমিকাটি স্থাপন করা জরুরি মনে করেছিলেন। বিভূতিভূষণ নিজেও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে এর সূচনাংশ লেখককে কেবল যথাযথ স্বীকৃতিই দেননি, ‘শেষ দিকের কয়েকটি অধ্যায় লিখিয়া দিয়া এই পুসত্মকের সুন্দর গল্পটি সমাপ্ত করিবার ভার আমার উপর ন্যসত্ম হইয়াছিল’ বলে ভুবনমোহন রায়কে বিনীতভাবে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন।

ভুবনমোহন রায় সুন্দরবনে সাত বৎসর নামের কাহিনিমূলক রচনাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন ১৮৯৫ সালে তাঁর নিজের সম্পাদিত সখা ও সাথী পত্রিকায়। উলেস্নখ্য, বাংলা ভাষায় যথার্থ আধুনিক ছোটদের পত্রিকা ছিল সখা। এর সম্পাদক ছিলেন প্রমদাচরণ সেন নামে এক মহৎপ্রাণ স্কুলশিক্ষক। তিনি বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের দেশের ভবিষ্যৎ শক্তিমান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। অকালপ্রয়াণে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা সখা ভুবনমোহন রায়ের সাথী পত্রিকার সঙ্গে একীভূত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সখা ও সাথী নামে। গবেষক অমল পাল তাঁর কিশোরপাঠ্য পত্রিকাপঞ্চক বইয়ে সখা ও সাথী (১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) পত্রিকার  যে-সূচি প্রস্ত্তত করেছেন তা পাঠ করে বোঝা গেল ভুবনমোহন রায় ওই পত্রিকায় এই রচনার মোট চারটি কিসিত্ম লিখেছিলেন। বৈশাখ ১৩০২ সংখ্যায় শুরু হয়েছিল। কিন্তু প্রতি সংখ্যায়ই প্রকাশিত হয়নি। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, শ্রাবণ ও আশ্বিন সংখ্যায় কিসিত্ম কিসিত্ম হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। পৃষ্ঠানির্দেশ অনুসরণ করে বোঝা গেল যে, প্রতি সংখ্যার লেখা ছিল গড়ে চার পৃষ্ঠার। রচনাটি বিকশিত হচ্ছিল অভিযান-কাহিনি হিসেবে। এই পাঁচ কিসিত্মর পরেও বেশ কয়েকটি পত্রিকাটির সংখ্যা প্রকাশিত হলেও লেখাটি রয়ে গিয়েছিল অসম্পূর্ণ। পত্রিকাটি দীর্ঘজীবী হতে পারেনি বলে এই রচনাটি একটি সম্ভাবনাময় রচনা হিসেবেই দীর্ঘকাল পড়ে ছিল।

বহু বছর পরে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জীবনের শেষভাগে অসম্পূর্ণ এই উপন্যাস সম্পন্ন করেন। এই অভিযান-কাহিনিটি অবশ্যবই হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল বিভূতিভূষণের মৃত্যুরও দুই বছর পরে। প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে বিভূতিভূষণের লেখা একটি ছোট্ট ভূমিকাও ছিল। তাতে তিনি বলছেন :

শেষ দিকের কয়েকটি অধ্যায় লিখিয়া দিয়া এই পুসত্মকের সুন্দর গল্পটি সমাপ্ত করিবার ভার আমার উপর ন্যসত্ম হইয়াছিল। আমি সেই কার্য্যে কতদূর কৃতকার্য্য হইয়াছি জানি না, তবে অধ্যায় কয়টি লিখিবার সময় একটি রূপময় জগতের ছবি মনের চোখে দেখিয়া আনন্দ পাইয়াছি, শুধু এই কথাটি লিখিবার জন্যই এই ক্ষুদ্র ভূমিকাটুকুর অবতারণা। যাঁহারা এ সুযোগ আমায় দিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট আমি কৃতজ্ঞ।

বিভূতিভূষণ শেষদিকের কয়েকটি অধ্যায় লিখেছেন বলে বিনয়ভাষণ করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি বইয়ের অন্তত চারভাগের তিনভাগ রচনা করেছিলেন বলে অনুমান করা যায়। অনুমানের ভিত্তি এই যে, একটি সংস্করণ ঘেঁটে দেখা গেল বইটি মোট সাতাশি পৃষ্ঠার। এর রচনারীতি বিশেস্নষণ করলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, বইটির বিশতম পৃষ্ঠার প্রথম সত্মবকের পর থেকেই বিভূতিভূষণের রচনা। বর্তমান লেখকের অনুমান, এই বিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ভুবনমোহন রায়ের লেখা। কারণ এই অংশটুকু এগিয়ে গেছে বর্ণনাত্মক রীতিতে। সংলাপগুলো বর্ণনাত্মক পঙ্ক্তির ভেতরে প্রবিষ্ট অবস্থায় রয়ে গেছে। কিন্তু বিশতম পৃষ্ঠার দ্বিতীয় সত্মবক থেকে শুরু করে বইয়ের শেষ পর্যন্ত টানা বর্ণনা নেই বললেও চলে। বর্ণনার চেয়েও এই অংশে সংলাপ বেশি। প্রতিটি সংলাপ নতুন প্যারাগ্রাফ হিসেবে সাজানো হয়েছে। আবার সংলাপ-পঙ্ক্তির শুরুতে ড্যাশ ব্যবহার করা হয়েছে। বিভূতিভূষণের পাঠকদের জানা আছে যে, এটা তাঁর নিজস্ব রচনারীতির পরিচায়ক। প্রথম অংশের বর্ণনায় প্রকৃতির আদিমতার ভাগ বেশি। কাহিনির ভিত্তি এই অংশে আদিম প্রকৃতিনির্ভর। পরের তিন-চতুর্থাংশে যেমন কাহিনির ঘনঘটা আছে, তেমনি আছে চরিত্রায়ণের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণনা; আর আছে রোমহর্ষক অনুভূতি। এর রচনারীতিতে বিভূতিভূষণ যে স্বদেশিয়ানায় ও মুন্শিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। সুন্দরবন অঞ্চলের প্রাকৃতিক ইতিহাসের খবর যে তাঁর কতটা গভীরভাবে জানা ছিল তা এই বই না পড়লে হয়তো অজ্ঞাত রয়ে যেত। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, ভুবনমোহন রায়ের জন্ম বা মৃত্যু তারিখও জানা সম্ভব হয়নি। শুধু তা-ই নয়, এই মহৎপ্রাণ মানুষটি সম্পর্কে আর কোনো উৎস থেকেই কিছু জানা যায়নি।

সুন্দরবনে সাত বৎসর উপন্যাসের লেখক-রহস্য অনেকটাই দূর করে দিয়েছেন অমল পাল (পাল, ২০১৭)। এরও আগে আমরা খগেন্দ্রনাথ মিত্রের (মিত্র, ১৯৯৯) সূত্রে তথ্য পাই যে, বিশ শতকের তৃতীয় দশকে যোগীন্দ্রনাথ সরকার বইটি সম্পন্ন করার বা করাবার প্রয়াস পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন সম্ভব হয়নি। পরে যোগীন্দ্রনাথেরই এক ছাত্রের অনুরোধে (অমল পালের অনুমান তিনিই সুধীন্দ্র সরকার) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এটি সমাপ্ত করেন। এই বইটি শেষ করার আগেই বিভূতিভূষণের লেখা ছোটদের উপন্যাসগুলোও প্রকাশিত হয়ে গেছে। সেসব কাহিনিও বিচিত্র। গোয়েন্দা ও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি রচনায় প্রাকৃতিকতা ও সাংস্কৃতিকতার স্বদেশিয়ানায়
সেগুলো বাংলা শিশুসাহিত্যের মহাসম্পদ হয়ে উঠেছে। আরো লক্ষণীয় যে, এই বইটি সম্পন্ন করার আগেই বিভূতিভূষণ
সাধু গদ্যরীতি ছেড়ে চলতি গদ্যরীতিতে লিখছিলেন। কিন্তু ভুবনমোহনের লেখা যেহেতু সাধুরীতির, সেহেতু ভাষাগত সামঞ্জস্য বিধানের স্বার্থে বিভূতিভূষণ সাধুরীতির গদ্যে রচনা করেছিলেন বইটির অবশিষ্টাংশ।

সংক্ষেপে এর গল্প এরকম : নীলু নামে একটি বালক অপহৃত হয়। জীবনের সাত-সাতটি বছর তার অতিক্রান্ত হয় সুন্দরবনে। দুজন মহান বৃদ্ধের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বালকের অতিক্রান্ত সাত বছরের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রোমাঞ্চ, দুঃসাহসিকতা, রহস্য আর বিস্ময়ে পরিপূর্ণ। কখনো সাপ, কখনো বাঘ, কখনো হাঙরের আক্রমণে প্রাণনাশের উপক্রম ঘটে নীলুর। যেন প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সঙ্গে মানবিকতার দ্বন্দ্বে মানবিকতার জয়ের উপলব্ধির মধ্য দিয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে নীলু চরিত্রটি। নিজের প্রাণের চেয়ে মনুষ্যত্বের চেতনা বড় হয়ে ওঠে এই উপন্যাসের কিশোর বয়েসি চরিত্রগুলোর মধ্যে। মোটকথা এই সুন্দরবন অঞ্চলের জীবনযাত্রার মধ্যে সাত বৎসর বাস করে উপন্যাসের বালক নীলু যেমন উন্নত জীবনবোধের শিক্ষা লাভ করে, তেমনি অর্জন করে মানবিকতার বোধ। উপন্যাসটি তখন আর কেবল অ্যাডভেঞ্চার কাহিনিতে সীমিত থাকে না, হয়ে ওঠে মনুষ্যত্বে দীক্ষিত হওয়ার পাঠক্রম। আরণ্য জনপদের জীবনবৈশিষ্ট্যের মধ্য থেকে জেগে-ওঠা এই অ্যাডভেঞ্চার-কাহিনির সৌন্দর্য যে-কোনো ভাষাতেই নিতান্ত দুর্লভ!

পুরনো দিনে গঙ্গাসাগর-তীর্থ কেমন ছিল, তারও একটা মোটামুটি চিত্র উপন্যাসের সূচনা-অংশ থেকে পাওয়া যায়। বাঘ-কুমির-বুনো মহিষ-অজগর অধ্যুষিত অবিভক্ত বাংলার ভয়ংকর সুন্দরবনের পরিচিতিও মেলে।

গল্পে সবকিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ওই জায়গার একটি দ্বীপের (নাম কাছিমমারির চর) এক বৃদ্ধের চরিত্র। নায়ক-ছেলেটি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘আপনি কাছিমের খোল একত্র করেন, মুক্তা সেচেন না?’ (তাঁর উত্তর) – ‘না কাউকে দেখাই না। অনেক টাকার মাল। টাকা হলে মনে অহঙ্কার আসবে, বিলাসের ইচ্ছা আসবে। এমন সুন্দর জায়গা থেকে হবে চির-নির্বাসন।’ এই এক আঁচড়ে ফুটে উঠেছে বৃদ্ধের চরিত্র। বিভূতিভূষণ-সৃষ্ট এই চরিত্রটির জন্য
অভিযান-কাহিনিটির এক মহত্তর ক্ষেত্রে উত্তরণ ঘটে। পশ্চিমের জীবনদৃষ্টির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জীবনদৃষ্টির পার্থক্যও উপর্যুক্ত বৃদ্ধের সংলাপের সামান্য ইঙ্গিতে বিভূতিভূষণ নির্দেশ করে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে বিভূতিভূষণের বাংলাদেশ সম্পর্কে অন্তর্দর্শী মননেরও পরিচয় পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যের প্রাকৃতিক সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য ও বুর্জোয়া বিকাশের স্পৃহা মানুষকে জাগতিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বলে সেখানকার মানুষকে বস্ত্তনিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। পক্ষান্তরে বাংলার প্রাকৃতিকতায় দেখা যায় জাগতিক সমৃদ্ধির প্রতি উদাসীন ভাব; তাই এখানকার মানুষের মনে জেগে ওঠে নির্মোহ অধ্যাত্ম চেতনা। ফলে টাকার অহংকার থেকে দূরে থেকে মানবিকতার সৌন্দর্যে বৃদ্ধটি নায়ক-ছেলেটিকে যেভাবে উদ্দীপ্ত করে তোলে তার মধ্যে বাংলাদেশের মানবিক অধ্যাত্মভাব ফুটে ওঠে।

সুন্দরবনে সাত বৎসরের দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। সেই সংস্করণটিতে লেখক হিসেবে কেবল বিভূতিভূষণের নাম ছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত সংস্করণগুলো থেকে ভুবনমোহনের নাম বর্জিত হতে থাকে। এই ঘটনা বাংলা প্রকাশনাজগতের নৈরাজ্যেরই পরিচায়ক। এর দ্বারা একদিকে লেখককে তাঁর স্বত্ব থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে বাংলা ছোটদের অ্যাডভেঞ্চার-কাহিনির উপস্থাপনেও অনৈতিহাসিকতাই প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। আর যদি সঠিকভাবে দুজন লেখকেরই নাম থাকে তাহলে প্রতীকীভাবে তা খাঁটি বাংলা ছোটদের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির ইতিহাসের দুই প্রান্তকে ধারণ করে রাখে। অমল পাল যথার্থই বলেছেন (পাল, ২০১৭),

বিভূতিভূষণের নামের আগে ভুবনমোহনের নাম থাকাটা শুধু এটা জানার জন্য নয় যে, বইটি দুজনের লেখা। তার চেয়েও অনেক বড় তাৎপর্য প্রকাশ পায় ভুবনমোহন আর বিভূতিভূষণ পরপর থাকলে। প্রথমজন বাংলা ভাষায় প্রথম কিশোরপাঠ্য অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসের সূচনাকারী আর দ্বিতীয়জন আ্যাডভেঞ্চার কাহিনির সফল ও খ্যাতিমান লেখক।

 

সূত্র

বাংলা কিশোরপাঠ্য উপন্যাসের প্রথম পর্যায় এবং বিভূতিভূষণ : অমল পাল, কালের বিবর্তনে দুই বাংলার উপন্যাস, সম্পাদনা : সুব্রত পাল, শ্রীভারতী প্রেস, ৮১/৩এ রাজা এসসি মলিস্নক রোড, কলকাতা ৭০০ ০৪৭, ২৬ জানুয়ারি ২০১৭।

সখা, সখা ও সাথী – প্রথম খ- : প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ, সম্পাদনা : অরুণা চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশক : কলেস্নাল, ৫৭এ কারবালা ট্যাঙ্ক লেন, কলকাতা ৬, ১৯৯৬।

কিশোরপাঠ্য পত্রিকাপঞ্চক বইয়ে ‘সখা ও সাথী’, অমল পাল, কলকাতা, ১৮৯৫।

শতাব্দীর শিশুসাহিত্য ১৮১৮-১৯৬০ (আকাদেমি সংস্করণ) : খগেন্দ্রনাথ মিত্র, কলকাতা, ১৯৯৯ (প্রথম সংস্করণ : ১৯৫৮)।

Leave a Reply

%d bloggers like this: