সুরসৈনিকের যুদ্ধকাহিনি

আবসার জামিল

আলতাফ মাহমুদ – প্রখ্যাত সুরকার, গায়ক। বাঙালির প্রাণের সুর বাজে যাঁর সুরারোপিত গানে। আবদুল গাফফার চৌধুরীর কথা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের দ্বিতীয় সুরকার তিনি। গানটির প্রথম সুরকার ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত রচয়িতা আবদুল লতিফ। কিন্তু আলতাফ মাহমুদের সুর শুনে তিনি সেই সুরকেই গানটির জন্য যথার্থ বলেছেন। শুধু গায়ক-সুরকার নন, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধও করেছেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনামতেই ক্র্যাক প্লাটুন ঢাকায় একের পর এক আক্রমণ করে দিশেহারা করে তুলেছিল পাকিস্তানি সেনাদের। সবই ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য দেখার ভাগ্য এই বরেণ্য অকুতোভয় সুরস্রষ্টার হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক মাস আগে, ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। জানা যায়, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। এর পর তাঁর আর কোনো হদিস পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের এই সূর্যসন্তানকে নিয়েই উপন্যাস আলতাফ। লিখেছেন অমিত গোস্বামী। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হলেও অমিতের সাহিত্যচর্চার অনেকটা জুড়ে আছে বাংলাদেশ। এদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তাঁর উপ-সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতা প্রকাশ পেয়েছে এবং পাচ্ছে। তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত পূর্বপশ্চিম পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক। আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে বেশ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। কারণ কাজটা যে বেশ সহজ ছিল না তা ঔপন্যাসিক নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান আলতাফ মাহমুদের জীবন অবলম্বনে এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে বিস্তর সমস্যায় পড়তে হয়েছে। সবার সাহায্য নিয়ে চেষ্টা করেছি এই উপন্যাসকে একটি অবয়ব দেওয়ার। কিছু জায়গায় তথ্য নিশ্চিত নয়। কিছুটা অস্পষ্ট। সেখানে অবশ্যই শোনা কথা ও কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে।’ সত্যিকার অর্থেই কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে উপন্যাস লেখা বেশ দুষ্কর। কারণ সেখানে সামান্য ভুলত্রুটি বা তথ্যের গরমিল তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। এছাড়া এ ধরনের উপন্যাসে কল্পনার আশ্রয় নেওয়ারও খুব বেশি সুযোগ থাকে না উপন্যাসকারের। তাই ইতিহাস তুলে ধরতে হয় সাবধানে, সঙ্গে মেশাতে হয় উপন্যাসের ভাষারূপ। বেশ জটিল এ কাজটি করেছেন অমিত গোস্বামী। নিজের পক্ষে তাঁর সাফাই, ‘আমি ইতিহাসবিদ নই। জীবনী লিখিনি। উপন্যাস লিখেছি। ঔপন্যাসিক কিছু স্বাধীনতা নেবেই।’

উপন্যাসের শুরু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াল রাত দিয়ে। আলতাফ মাহমুদ থাকতেন আউটার সার্কুলার রোডে। উলটোদিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স। সেখান থেকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে আলতাফকে বলেন তাঁর বাড়ি খালি করে দিতে, তাঁরা পজিশন নেবেন। উদ্দেশ্য পাকিস্তানি সেনাদের প্রথম আঘাত যতটা সম্ভব রুখে দেওয়া। আলতাফ মাহমুদ বাড়ির সবাইকে চলে যেতে বলেন, কিন্তু নিজে যান না। কারণ? দেশের যে এমন পরিস্থিতি হবে তা আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন রাজনীতিসচেতন এ সুরস্রষ্টা ও শিল্পী। তাই বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন পেট্রোলের মজুদ। যেন যুদ্ধ লাগলে পেট্রোল বোমা তৈরি করা যায় সেগুলো দিয়ে। এমনই ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। সুশিক্ষিত পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে পিছু হটার নয়, সম্মুখ সমরের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। পুলিশ সদস্যদের এবং তাঁর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের প্রথমেই আলতাফের অকুতোভয় চরিত্র ও দেশপ্রেমের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলেন অমিত গোস্বামী।

কালজয়ী এ সুরস্রষ্টার কৈশোরের ছবি উঠে এসেছে এরপরই। ‘ঝিলু’ নামে গ্রামের সবাই চিনত আলতাফ মাহমুদকে। নিবাস ছিল বরিশালের মুলাদী থানার পাতারচর গ্রামে। বাবা নাজেম আলী হাওলাদার ছিলেন মুসলিম লিগের সমর্থক। কিন্তু আলতাফ বাবার পথে হাঁটেননি। কৈশোরেই তাঁর মধ্যে সুরের দেবীর আনাগোনা। তাই বাবার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি সুরসাগরে মন-প্রাণ সঁপে দেন। এর মধ্যে কলেজ জীবনে বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পাকিস্তানি শাসকদের অনাচারের বিরুদ্ধে গান গেয়ে জানাতে থাকেন প্রতিবাদ, সচেতন করেন গণমানুষকে। সে এক অস্থির সময়। বেশ নিপুণভাবে ঘটনা-পরম্পরায় পাকিস্তান আমলের তৎকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা তুলে ধরেন এ-উপন্যাসে অমিত গোস্বামী। ফিল্মের মতো ফ্ল্যাশব্যাকে আবার মূল ঘটনায় ফিরে এসে বারবার সময়ের মধ্যে একটি সেতু রচনা করেছেন তিনি।

১৯৫০-এ ঢাকায় আসেন আলতাফ মাহমুদ, যোগ দেন ধূমকেতু শিল্পী সংঘে। তাঁর যোগদানের পর জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সংগঠনটি। এদিকে তীব্রতা পেতে থাকে ভাষা-আন্দোলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য রক্ত ঝরে বাঙালির। দুঃখভারাক্রান্ত সেই দিনটি নিয়ে রচিত হচ্ছিল একের পর এক জ্বালাময়ী গান, সুর দিচ্ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। জনমানসে তখন আলতাফ মাহমুদ একটি অতিপরিচিত ও আপন নাম। ভাষা-আন্দোলনের প্রভাব পড়ল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে। ’৫৪-এর নির্বাচনে জয়ী হলো যুক্তফ্রন্ট। মুসলিগ লিগের ভরাডুবি। এ নির্বাচনে মুসলিম লিগের প্রার্থী হয়েছিলেন আলতাফের বাবা নাজেম আলী। তিনি ছেলেকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর পক্ষে প্রচার চালাতে। কিন্তু আলতাফ তাতে রাজি হননি। দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি সে-প্রস্তাব নাকচ করে দেন। নীতির কাছে সব সম্পর্ক যে তুচ্ছ, আলতাফ মাহমুদ বেশ ভালোভাবেই তা বুঝিয়ে দেন বাবাকে। বাবা-ছেলের কথোপকথনে ব্যবহৃত হয়েছে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা। এক্ষেত্রে বেশ সতর্ক মনে হয়েছে ঔপন্যাসিককে। অনেক পঠন-পাঠন ও শ্রবণের মধ্য দিয়ে সঠিক শব্দচয়নে তিনি সচেষ্ট ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

এদিকে পাকিস্তানি শাসকদের কোপদৃষ্টিতে পড়ে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা। সামরিক বাহিনীর নির্দেশে এ-মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয়। সে-সময় হুলিয়া মাথায় নিয়ে গাঢাকা দেন আলতাফ মাহমুদ ও নিজামুল হক। দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী আলতাফ মাহমুদ হার মানা কাকে বলে জানতেন না। একসময় হুলিয়া তুলে নেওয়া হলে তিনি আবারো প্রকাশ্যে এসে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার করে তুলতে থাকেন।

গান নিয়ে আলতাফ মাহমুদের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। ১৯৫৫ সালে তাঁর ডাক পড়েছিল ভিয়েনার বিশ্বশান্তি সম্মেলনে সুরকার ও সংগীতশিল্পী হিসেবে। কিন্তু সামরিকজান্তা তাঁকে যেতে দেয়নি সে-আমন্ত্রণে। তিনি কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু দমে যাননি। ১৯৫৮ সালে বেরোয় তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। বেশ জনপ্রিয় হয় সে-রেকর্ড। এই জনপ্রিয়তাই তাঁকে সুযোগ করে দেয় চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার। বেবী ইসলামের তানহা সিনেমায় প্লেব্যাক করেন তিনি। জননন্দিত হয় তাঁর গান। পরবর্তীকালে জাগো হুয়ে সাভেরাসহ বেশ কয়েকটি উর্দু ও বাংলা সিনেমায় কণ্ঠদান ও সংগীত পরিচালনা করেন আলতাফ মাহমুদ। সুর-সংগীতে আগাগোড়া নিমজ্জিত হলেও দেশের কথা, স্বাধীনতার কথা ভোলেননি তিনি। প্রেমও এ-সময়ে দোলা দিয়েছিল তাঁর হৃদয়ে। এক গানের রিহার্সালে পরিচয় সারা আরা বিল্লাহ ওরফে ঝিনুর সঙ্গে। প্রথম দর্শনেই আলতাফের প্রণয়তরী ভিড়ে ঝিনুর ঘাটে। তিনিও হয়তো ভালোবেসে ফেলেছিলেন সুরপাগল মানুষটিকে। কিন্তু প্রথম আলতাফই জানান মনের কথা, চিঠিতে। বিয়ের প্রস্তাব যায় ঝিনুদের বাসায়। কিন্তু তাঁর মা রাজি হন না প্রথমে, কারণ আলতাফ চালচুলোহীন, এছাড়া বয়সেও অনেক বড় তাঁর মেয়ের চেয়ে। অবশেষে অসাধ্য সাধনে আলতাফ শরণাপন্ন হন কবি বেগম সুফিয়া কামালের। তাঁর কথাতেই শেষ পর্যন্ত রাজি হন ঝিনুর মা আমেনা বিল্লাহ। শুভ পরিণয় ঘটে দুজনার, সেটা ১৯৬৬ সালের ১৬ অক্টোবর। ১৯৬৮ সালে তাঁদের ঘর আলো করে আসে একমাত্র মেয়ে শাওন। এদিকে পাকিস্তানি বেতারেও নিয়মিত অনুষ্ঠান করছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠা ও সাধনার পথে বেশ সহজেই তরতর করে এগিয়ে চলেছিলেন আলতাফ মাহমুদ।

১৯৬৯-এ শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আলতাফ মাহমুদও বসে থাকেননি, পথে নেমেছিলেন পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে। এই আন্দোলনের পথ বেয়ে আসে ১৯৭১-এর ৭ মার্চ। বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চ কাল রাত্রির মধ্য দিয়ে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালিরা। সামরিক-বেসামরিক সব ধরনের মানুষের মনে তখন একটাই স্বপ্ন – স্বাধীন বাংলাদেশ। এদেশের
শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমাজও বসে নেই। যে যেভাবে পারছেন বিশ্বে তুলে ধরছেন পাকিস্তানি শোষকদের ভয়াল চিত্র। শুরু হয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এ কেন্দ্র থেকে দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে প্রচার হচ্ছে নানা অনুষ্ঠান, গান। আলতাফের কাছে গান চেয়ে পাঠান মেজর খালেদ মোশাররফ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য। চারদিকে থমথমে অবস্থা, কারফিউ, গায়ক-যন্ত্রীদের অনেকেই শহর ছেড়েছেন; কীভাবে তবে গান হবে? মানুষটি যখন আলতাফ ব্যবস্থা তখন হবেই। ঠিকই তিনি ব্যবস্থা করে ফেললেন। গান লিখলেন আবদুল লতিফ, সুর করলেন আলতাফ, গাইলেন শিমুল বিল্লাহ ও আলতাফ মাহমুদ। ব্যাপক গোপনীয়তার মধ্যে রেকর্ডিং হলো বেঙ্গল স্টুডিও ও ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন স্টুডিওতে। পাঠানো হলো খালেদ মোশাররফের কাছে। এই পুরো প্রক্রিয়া চলাকালে বিপদে পড়তে পারতেন আলতাফ মাহমুদ, সঙ্গে তাঁর পরিবার। কিন্তু তিনি কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেননি। দেশের জন্য যে-কোনো কাজ করতে সদাপ্রস্তুত ছিলেন।

পাকিস্তানি শাসকদের নির্দেশে রেডিও পাকিস্তানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন আলতাফ। অন্যদিকে তাঁর ছক অনুসারে ঢাকায় চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল ক্র্যাক প্লাটুন। এই প্লাটুনের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আজাদ, বকর, রুমী, জুয়েল, বদি ও হাফিজ। অত্যন্ত গোপনীয়তার ভেতর দিয়ে কর্মকাণ্ড চলছিল। সে-সময় আলতাফ মাহমুদের বাড়ি হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণকেন্দ্র। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ২৯ আগস্ট ১৯৭১, আলবদরের কর্মীদের তথ্যানুসারে ধরা পড়েন মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম। পরে ধরা পড়লেন আবদুস সামাদ। তাঁদের ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। সইতে পারলেন না আবদুস সামাদ, দলের অন্যদের নাম ফাঁস করে দিলেন। তৈরি হলো পাকিস্তানি সেনাদের অ্যাকশন লিস্ট – শফি ইমাম রুমী, হাফিজ উদ্দিন, মাগফার উদ্দিন আজাদ, আবদুল হালিম জুয়েল, আবু বকর, আলতাফ মাহমুদ, ফতেহ আলী ও শাহাদৎ চৌধুরী। একে একে আটক করা হলো প্রায় সবাইকে। সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজনকে। সবার ওপর চলল অকথ্য নির্যাতন।

উপন্যাসের কাহিনি অনুযায়ী, টানা কয়েকদিন আলতাফ, রুমীসহ অন্য বন্দিদের ওপর অত্যাচার চালাল মূলত আলবদর বাহিনীর সদস্যরা তাদের নেতা মুজাহিদ ও নিজামীর নেতৃত্বে। এদিকে খবর পাওয়া গেল, ৫ সেপ্টেম্বর বন্দিদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ও আলবদর নেতারা এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন, কারণ এঁদের মুক্তি দিলে তাদের সব অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাবে। তাই ঘাতকরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, নাহ, এদের বাঁচতে দেওয়া যাবে না। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগেই সবাইকে হত্যা করা হবে। ৪ সেপ্টেম্বর সব বন্দিকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা, সঙ্গে ছিল এদেশের শত্রু আলবদর বাহিনী। এরপর শুধুই খুঁজে ফেরার গল্প। আলতাফ-রুমীসহ যাঁদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররা, তাঁদের আত্মীয়-পরিজন-স্বজনকে খুঁজে ফিরেছেন এখান থেকে সেখানে। যেখানেই দেখেছেন আশার আলো, সেখানেই ছুটে গেছেন। পির-ফকিরের শরণাপন্ন হয়েছেন। অনেক আশার বাণী শুনতে হয়েছে, বুকও বেঁধেছেন আশায়। কিন্তু সবই যে বৃথা। হারিয়ে গেছেন আলতাফ, রুমীসহ সেদিন ঘাতকদের হাতে পাকড়াও হওয়া এদেশের সোনার ছেলেরা।

উপন্যাসের শেষ এভাবেই। পুরো উপন্যাসের পরতে পরতে দেশপ্রেম আর দৃঢ় সংকল্পের কথা উঠে এসেছে বারবার। আলতাফ মাহমুদকে যোদ্ধাপুরুষ হিসেবে চিত্রিত করতে বেগ পেতে হয়নি অমিত গোস্বামীকে। জীবন বাজি রেখে গান রেকর্ডিং, সেই গান মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠানো, নিজ বাড়িতে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, পেট্রোলের মজুদ গড়া যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে – এমন অসংখ্য খণ্ডচিত্রে লেখক সৃষ্টি করেছেন শহীদ আলতাফ মাহমুদের চরিত্র, সত্য চরিত্র। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে, যখন তিনি আলবদর সদস্যদের হাতে বন্দি, তখনো ভেঙে না-পড়ার মধ্য দিয়ে।

অমিত গোস্বামী বেশ সাবলীল ভাষায় ছোট ছোট প্লট সৃষ্টি করে বলে গেছেন আলতাফ মাহমুদের কথা। সঙ্গে ফুটে উঠেছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়কাল। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস। সে-সময় স্বাধীন দেশের জন্য আপামর মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস, হার-না-মানা প্রতিজ্ঞা – বেশ দক্ষতার সঙ্গে উপন্যাসের পরতে পরতে তুলে এনেছেন অমিত। তাঁর প্রচেষ্টা, তাঁর ইতিহাসের পাঠ যে সার্থক হয়েছে, তা আলতাফ পড়ে বেশ বুঝতে পারা যায়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: