সৃজনে-সংগ্রামে হাসান আরিফ

একই সঙ্গে সৃজনে নিরন্তর ক্রিয়াশীল আবার সংগ্রামেও দৃপ্তপদে এগিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে খুবই নগণ্য। অনেককে দেখি তাঁরা শিল্পসৃষ্টিতে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতবিদ্য, কিন্তু সংগ্রাম-প্রতিবাদে অংশ নিতে তাঁদের অনীহা। তাঁরা মনে করেন, এটা তাঁদের কাজ নয়। অন্যদিকে আমাদের চারপাশে অযুত সংস্কৃতিকর্মীকে দেখি যাঁরা সাংগঠনিক কাজে আগ্রহী, অনেকে বেশ দক্ষ; কিন্তু সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ নেই। অনেকেই নেতৃত্বটা উপভোগ করেন, যার ফলে আমাদের কয়েকটি জাতীয় সংগঠন তাদের চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। এতে একটা ক্ষতি হয়েছে, আমাদের সৃষ্টিশীল তরুণেরা সাংগঠনিক কাজে যুক্ত হতে চাইছেন না। এ-ধারা চলতে থাকলে আমাদের সংস্কৃতির সাংগঠনিক জায়গাটা মেধাহীনদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।

কী আশ্চর্য এক ব্যতিক্রম হাসান আরিফ (৮ ডিসেম্বর ১৯৬৩ – ১ এপ্রিল ২০২২)। মাত্র ৫৭ বছরের এক ঝড়ো জীবন। সম্মিলিত

সাংস্কৃতিক জোটেই আরিফের সঙ্গে আমার পরিচয়। ধীরে ধীরে সে-পরিচয় বয়সের ব্যবধানকে অগ্রাহ্য করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-ভালোবাসা মেশানো এক বন্ধুত্বে পরিণত হয়। কখনো আমার মনে প্রশ্ন জাগেনি, ওর বাড়ি কোথায়, কোথা থেকে ও এলো? পরে ওর কাছে জানতে পারি কুমিল্লায় আমার বউদি গীতশ্রী (ঘোষ, পরে মজুমদার) আর আরিফের মা সহপাঠী ছিলেন। আরিফ জন্মেছিল কুমিল্লায় ওর নানাবাড়িতে। প্রাথমিক লেখাপড়াও কুমিল্লাতেই। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করে বি.কম ডিগ্রি অর্জনের পর। বাণিজ্য বিষয়ে ওর কি কোনো আগ্রহ ছিল? মনে হয় না। ও লক্ষ্মীর আশীর্বাদ চায়নি, সরস্বতীর বরপুত্র হতে চেয়েছিল।

হাসান আরিফের বন্ধুভাগ্য ঈর্ষণীয়। ও অসুস্থ হওয়ার পর অবাক হয়ে দেখলাম কত ছেলেমেয়ে ওর জন্যে উৎকণ্ঠায় কাল কাটাচ্ছে। ওর চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। চার মাস হাসপাতালে থাকার ফলে ওর চিকিৎসা ব্যয় প্রায় কোটি টাকা ছুঁয়েছিল। কিন্তু সবার ঐকান্তিক চেষ্টায় সে-ব্যয়ও নির্বাহ হয়ে গেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই দিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা। তাছাড়া বড় অংকের অর্থ সহায়তা করেছেন আইএফআইসি ব্যাংক এবং বাংলাদেশ পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক হাবিবুর রহমান। পরিবারের বাইরে অনেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও আরিফের সুহৃদরা ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে এসেছেন হাসপাতালের বিল মেটাতে। এমন ভাগ্য কজনের হয়?

হাসান আরিফ তার হৃদয়ের আলো দিয়ে অনেক তরুণের হৃদয়ে আলো জ্বালাতে পেরেছিল। সে-আলো কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার দূর করে তাদের মনে শুভচেতনার সঞ্চার করতে পেরেছিল। সেদিন (১২ মে) হাসান আরিফের পরিবার আয়োজিত স্মরণসভায় গিয়ে নানাজনের স্মৃতিচারণে যে-কথাটা বারবার বেরিয়ে এলো, তা হচ্ছে, সবাই আরিফকে নিজেদের আপনজন হিসেবে বিবেচনা করত। তার ভাইঝিদের সকল আবদার মেটানোর জন্যে ছিল তাদের কাকা। আবার কাকার কাছেই বন্ধুর মতো সব কথা বলা যেত। সবাইকে নিয়ে এভাবেই হাসান আরিফ ‘আমাদের’ হয়ে উঠেছিল। এর তিনদিন পর মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরাম মিরপুরের মুকুল ফৌজ মাঠে কবিতা-গান ও কথায় হাসান আরিফকে স্মরণ করার এক অসাধারণ নান্দনিক আয়োজন করেছিল। সবাই প্রাণের আবেগ ও আরিফের শিক্ষা নিয়ে কাজটা করেছিল বলে অনুষ্ঠানটা এতো সুন্দর হয়ে উঠেছিল। মন ভরে গিয়েছিল ২১শে মে শহিদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নাগরিক স্মরণসভায় গিয়ে। শহিদ মিনারের চারদিকে আরিফের হাস্যোজ্জ্বল ছবি নান্দনিকভাবে সাজানো। সবার বক্তব্যও ছিল আন্তরিক। অনুষ্ঠান আয়োজনে হাসান আরিফের শিক্ষা বিফলে যায়নি।

আজকাল মন খুলে কথা বলার মতো বন্ধু আমার জীবনে কমে এসেছে। আবুল হাসনাত ও শামসুজ্জামান খানের সঙ্গে কত বিষয়ে কথা বলেছি, যা বাইরে বলতে পারি না। পরচর্চা করিনি, তবে কিছু মানুষের স্খলন দেখে বেদনার্ত হয়েছি। দুজনই অকালে চলে গেলেন অতিমারির কবলে পড়ে। হাসান আরিফও ছিল এমন একজন যার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারতাম, কারণ নানা বিষয়েই আমরা একমত পোষণ করতাম। ওর সঙ্গে এমনসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো, যা বাইরে করা যাবে না। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য যে, লিখতে বা কথা বলতে গেলে আমাদের অনেকটা রেখে-ঢেকে বলতে হয়। যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা আমাদের নেই। যার ফলে বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী আজ হয় নীরবতা পালন করেন, নতুবা ক্ষমতার আশ্রয়ে থাকতে নিরাপদ বোধ করেন। সমাজটা ধীরে ধীরে প্রতিবাদহীন হয়ে উঠেছে। আর যারা প্রতিবাদ করছে তাদের শতকরা ৯৯ ভাগই করছে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। কবীর চৌধুরী বা আনিসুজ্জামান চলে যাওয়ার পর আরেকজন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী খুঁজে পাই না। আশা করব এমন বন্ধ্যা সময় কেটে যাবে।

হাসান আরিফ দুই বাংলায় আবৃত্তিকার হিসেবে একটা ঈর্ষণীয় জায়গায় পৌঁছেছিল। তার দরাজ কণ্ঠ এবং কবিতা বা গদ্যাংশকে আত্মস্থ করে পাঠের ফলে তার পরিবেশনা এতো হৃদয়গ্রাহী হতো। একবার বেঙ্গল  শিল্পালয়ে তার একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেদিন লক্ষ করেছি, কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে তার পরিবেশনাকে শ্রোতার মনোগ্রাহী করে তুলতে পারে। আরিফ সবসময়েই আবৃত্তি নিয়ে নিরীক্ষা করতে পছন্দ করত। একটি কবিতার সঙ্গে আরেকটি কবিতা বা গানকে মিলিয়ে ও নতুন অর্থ খোঁজার চেষ্টা করত। কবিতার মাঝে নিজেই গান ধরত। পরে জেনেছি ও বাফাতে এক বছর গান শেখার পর সংগীতজ্ঞ কলিম শরাফীর সংগীত ভবনে চার বছর গানের ক্লাস করেছে। পারিবারিক পরিমণ্ডলে সংস্কৃতিচর্চা ছিল বলে হাসান আরিফ ছোটবেলা থেকেই সুস্থ সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠে।

১৯৮৫ সালে আরিফ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আবৃত্তি চক্র আয়োজিত একটি কর্মশালায় যোগ দেওয়ার পর স্বরিত আবৃত্তি চক্রের সদস্য হিসেবে যোগ দেয়। এভাবেই তার সাংগঠনিক আবৃত্তিচর্চার শুরু। এ সময়েই আরিফ যুক্ত হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সঙ্গে। আপন যোগ্যতা ও মেধার পরিচয় দিয়ে প্রথমে জোটের নির্বাহী পরিষদ সদস্য, পরে সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং শেষে পরপর দুবার ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। মৃত্যুকালেও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিল হাসান আরিফ।

১৯৮৮ সালে আবৃত্তিচর্চায় নিবেদিত সংগঠনগুলিকে নিয়ে আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ গঠনে আরিফ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এখানেও ধারাবাহিকভাবে ও সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাধারণ সম্পদকের দায়িত্ব পালন করে। আবৃত্তির মানোন্নয়নে দেশব্যাপী কর্মশালা আয়োজনে নিরলস পরিশ্রম করেছে আরিফ।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকা সর্বজন প্রশংসিত। এ সময়ে হাসান আরিফ কবিতাকে হাতিয়ার করে আন্দোলনে নিজেকে অপরিহার্য করে তোলে।

পথে-প্রান্তরে, প্রতিবাদী সমাবেশে হাসান আরিফের দৃপ্ত উচ্চারণ মানুষকে সাহস জুগিয়েছে। সহযাত্রীদের নিয়ে আয়োজন করেছে কত বৃন্দ-আবৃত্তি অনুষ্ঠানের। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তার সংগ্রামের পথনির্দেশ করে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রাজপথই ছিল হাসান আরিফের ঠিকানা। সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, জঙ্গিবাদ – সবকিছুর বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম করে গেছে আরিফ সংস্কৃতির শক্তি নিয়ে। মানবতার মুক্তিই ছিল তার আরাধ্য।

২০১২ সাল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আরিফ আবৃত্তি সংগঠন ‘শ্রুতিঘরে’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করে। নিজের সংগঠনের বাইরেও বৈকুণ্ঠ আবৃত্তি একাডেমি, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, বোধন, স্বরব্যঞ্জন আবৃত্তি সংগঠনের অনেক শ্রোতা-দর্শকনন্দিত প্রযোজনা নির্দেশনা দিয়েছে আরিফ। আবৃত্তি অনুষ্ঠান প্রযোজনার বেলায় সবসময়েই আরিফ গতানুগতিকতাকে পরিহার করেছে, নতুন কিছু করতে চেয়েছে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেও আরিফ যেসব অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করেছে তার মধ্যে তার মেধা ও নান্দনিকবোধ ফুটে উঠতো। বাহুল্য বর্জন করে একটা অনুষ্ঠানকে এমনভাবে সাজাতো যাতে দর্শকদের মনোযোগ অন্যদিকে না যায়। জোটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কোনো সমাবেশে আরিফ যখন স্বাগত বক্তব্য রাখতো, তখন তার বাচনভঙ্গি ও যুক্তিপূর্ণ কথার ফলে অনুষ্ঠানের একটা মেজাজ তৈরি হয়ে যেত। আমার অনেক সময়েই মনে হয়েছে, এরপর আমাদের বক্তব্য বাহুল্যমাত্র। আমাদের দুর্ভাগ্য, সংস্কৃতিক্ষেত্রের এই মেধাবী মানুষটিকে আমরা অকালে হারিয়ে ফেললাম।

আমি আবৃত্তিচর্চা করি না। কিন্তু হাসান আরিফ অনেকদিন থেকেই বলছিল, আমি আর ও মিলে একটা অনুষ্ঠান করব – যার বিষয় হবে ‘পথ’। আমরা দুজনে পথবিষয়ক গদ্য ও কবিতা পড়ব আর আমাদের সঙ্গে পথ নিয়ে গান করবেন বুলবুল ইসলাম। কিন্তু এখন আমার অবস্থা যেন ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফিরে একা’। তবে আরিফের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অনুষ্ঠানটি আমরা করব।

বেশ কিছুদিন ধরেই হাসান আরিফ সংস্কৃতিকর্মীদের একটি জাতীয় সম্মেলন করার কথা ভাবছিল। ওর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতা, নারী নির্যাতন – এসব নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের করণীয় ঠিক করা। আরিফ ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছিল, সারাদেশের সংস্কৃতিকর্মীরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কোন পথে এগোলে এসবের মোকাবিলা করা যাবে। চারদিকে এতো স্তাবকতা। সঠিক পথের সন্ধান আমরা তাদের দিতে ব্যর্থ হয়েছি। তাই এ-সময়ের করণীয় নির্দেশ করা খুবই জরুরি।

হাসান আরিফের জন্মই যেন হয়েছিল দেওয়ার জন্যে, নেওয়ার জন্যে নয়। ও কেবল মানুষকে দিয়েই গেছে, বিনিময়ে পেয়েছে ভালোবাসা। কোনো পার্থিব লাভের প্রতি ওর কোনো আকর্ষণ ছিল না। জীবিকার প্রয়োজনে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করেনি। মাঝে মাঝে কয়েকটি টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছে, বেশ কয়েকবার আমাকেও আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেছে। ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে আমি অনেকবারই বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্যে ধারাবর্ণনা করেছি। একসময়ে আমি অনুষ্ঠানটি আর করতে চাইলাম না। আমার জায়গায় হাসান আরিফকে নিতে বললাম এবং আরিফ অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে সে-দায়িত্ব পালন করেছে। কোনো সরাসরি টিভি অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আরিফ ছিল একজন নির্ভরযোগ্য দায়িত্ববান সঞ্চালক।

আবৃত্তিশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্যে ২০১৯ সালে হাসান আরিফ ‘শিল্পকলা পদক’ লাভ করে। তবে এসব পদক-পুরস্কারের প্রতি কোনো আগ্রহই ছিল না আরিফের। মনে আছে, আমি যখন নির্বাচকমণ্ডলীর সভাশেষে ওকে ফোন করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানালাম, ও বেশ অবাকই হলো। নানা পদকের জন্যে তদ্বির যখন একটা স্বাভাবিক নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে, তখন একজন হাসান আরিফ আশ্চর্য ব্যতিক্রম – যাকে অনুসরণ করলে সমাজে সুস্থতা ফিরে আসবে। পদকের জন্যে ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের দেখতে হবে না।

রবীন্দ্রনাথের বাণী কণ্ঠে ধারণ করে আজ আরিফের উদ্দেশে গাইতে ইচ্ছা করে :

পান্থ তুমি পান্থজনের সখা হে,

  পথিকচিত্তে তোমার তরী বাওয়া।

দুয়ার খুলে সমুখ-পানে যে চাহে

   তার চাওয়া যে তোমার পানে চাওয়া।

বিপদ বাধা কিছুই ডরে না সে,

   রয় না পড়ে কোনো লাভের আশে,

যাবার লাগি মন তারি উদাসে –

   যাওয়া সে যে তোমার পানে যাওয়া॥