আমৃত্যু আবুল হাসনাত স্বভাবে ছিলেন নিভৃতচারী এক কর্মযোগী। তাঁর বহুপল্লবিত সৃষ্টিশীল সুকৃতি ও উত্তম সম্পাদনা সারস্বত সমাজে ক্রমশ সুখ্যাত হয়ে ওঠে। তাঁর মতো তন্নিষ্ঠ, পরিশ্রমী, পরিচ্ছন্ন সাহিত্য সম্পাদক বরাবর এদেশে বিরল। প্রকৃত সাহিত্য-শিল্পের নিপুণ সমঝদার ছিলেন এই স্বল্পবাক মানুষটি। প্রকাশযোগ্য লেখা নির্বাচন তিনি নিয়ত যত্নশীল পাঠে নির্ধারণ করতেন। অধ্যবসায় থেকে তিনি অর্জন করেন নিজস্ব ধীশক্তি। দেশের বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন প্রিয়জন। দূরদৃষ্টি নিয়ে আবুল হাসনাত তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টির বিষয়েও অনুমোদনের হাত বাড়িয়ে রেখেছিলেন। মাহমুদ আল জামান নামে তিনি অধুনাতন জ্ঞানময় কবিতা লিখেছেন, আবুল হাসনাত নামে শিল্প-সাহিত্য ও কৃতী-পুরুষদের নিয়ে বুদ্ধি-বুনোট প্রবন্ধ লিখেছেন, সম্পাদক হিসেবেই তিনি পৌঁছেছেন অধিক উচ্চতায়। পত্রিকার যথাসম্ভব মুদ্রণ, সাময়িকীর অঙ্গসজ্জা দৃষ্টিনন্দনে ও তা শিল্পগ্রাহ্য করে তোলার প্রয়োজনে তাঁর নিরন্তর ভাবনা ছিল। লেটারিং থেকে মেকআপ – উজ্জ্বল পরিকল্পনায় লেখা আরো তিনি সৌন্দর্যময় করে তুলতেন। এ-কথাও অস্বীকারের নয়, কবিতা-গল্প-উপন্যাসের সচিত্রীকরণ, অলংকরণ করে দেশের অনেক শিল্পী আবুল হাসনাতের মাধ্যমে বাড়িয়েছেন তাঁদের শিল্পোৎকর্ষের পরিধি। পাঠক রুচি পালটাতে লেখার গুণ-সন্ধানে ও প্রকাশে তিনি প্রচলিত প্রাক্তন অভিনিবেশ বর্জন করেছেন। 

আমরা আড্ডা, বৈঠক, মজলিসে আবুল হাসনাতের উপস্থিতি দেখে ওপর থেকে মনে করেছি – ‘সকল লোকের মাঝে বসে/ আমার নিজের মুদ্রা দোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা (জীবনানন্দ দাশ/ ‘বোধ’)।’ অথচ ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন একজন কর্মক্ষম, সময়জয়ী সামাজিক মানুষ। অপার সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে নীরবে প্রতিকূলতার মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে কোনো কিছু প্রাপ্তির আশা না-করে কাজ করেছেন। বাঙালি জাতিসত্তার সহায়ক শুদ্ধতম নাগরিক উদ্যোগে অন্তরালের এই মানুষটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কুক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধাচার উপেক্ষা করে তিনি রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় ও প্রসারে ছায়ানটের সঙ্গে ছায়া হয়ে থেকেছেন। 

গত শতাব্দীর আশির দশকে আবুল হাসনাতের সঙ্গে আমার পরিচয়। পুরনো ঢাকার নিশাত সিনেমা হলের সামনে দৈনিক সংবাদের তৎকালীন অফিসে আমি নাটক বিষয়ে একটি প্রবন্ধ নিয়ে গিয়েছিলাম। লেখাটি সম্পাদনা করে ছেপে তিনি আমাকে উৎসাহিত করেন। সেই শুরু আবুল হাসনাতের সঙ্গে আমার সখ্য। সংবাদের সাধারণ ও বিশেষ সংখ্যা থেকে পরবর্তী সময়ে তাঁর সম্পাদনার কালি ও কলম মাসিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে আমার অনেক গল্প। বর্তমান মহামারি করোনার মধ্যে আমার একটি গল্প কালি ও কলমের অনলাইনে তিনি প্রকাশ করেন। আমার লেখালেখির জন্য তাঁর প্রেরণা-প্রদান কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে শেষ করা যাবে না। 

আবুল হাসনাতের আর-একটি বড় গুণ তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-সজ্ঞান মানুষ। সন্ধানী প্রকাশনী মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য প্রকাশে এ-দেশে পথিকৃৎ। জাতির শ্রেষ্ঠ কীর্তি নিয়ে কবি-সাহিত্যকদের আয়ুষ্মান ও সফল সাহিত্য অংশ গ্রন্থাকারে আবুল হাসনাতের সম্পাদনায় একই বাক্সে দুই ভলিউমে সন্ধানী প্রকাশনী থেকে প্রথম বের হয়। দেখে ও পড়ে পরিষ্কার বোঝা যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনে আবুল হাসনাতের ছিল নিবিড় অঙ্গীকার। এখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও অর্জিত চেতনা যখন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, নস্যাৎ হচ্ছে সুফল তখন মুক্তিযুদ্ধ, সর্বস্তরের এই কর্মকে অক্ষরে বেঁধে রাখতে আবুল হাসনাত আরো বড় কলেবরে সম্পাদনা করেন অবসর প্রকাশনা সংস্থা থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। স্বাধীনতা পূর্বাপর আমাদের অর্জন ও বঞ্চনা, স্বপ্ন ও আশাভঙ্গ, হাস্যমাধুরী ও অশ্রুধারার সন্নিপাতে তৈরি হয়ে-ওঠা সে-দুঃসময়ের চলচ্ছবি এই গ্রন্থের গল্পমালা। ভবিষ্যতে আবুল হাসনাত মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে নতুন সংকলনের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর উপলব্ধি, বোধোদয়, অন্তর্দৃষ্টি থেকে আমরা জেনেছি, মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবনযন্ত্রণার বহুকৌণিক দিক আর আবেগকে এক শিল্পিত প্রকরণে রূপায়িত হতে তিনি দেখেছেন। যতই দিন যাচ্ছে – আমাদের কথাসাহিত্যিকরা মুক্তিযুদ্ধকে একটি নির্মোহ নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে অবলোকন করছেন। আমাদের শিল্প ও সাহিত্যে তার অনিবার্য উপস্থিতি আবুল হাসনাত চেয়েছেন গ্রন্থাকারে প্রতিনিধিত্বশীল ও পূর্ণাঙ্গ করতে। 

আমার মতো যারা মফস্বলবাসী, রাজধানীতে আসার পর তাদের ইট-কাঠ-পাথরের জড়জগৎ থেকে মানুষ দেখা ও জানার কৌতূহল বেশিই হয়। আর মানুষটা যদি হয় হিতৈষী, সহৃদয়জন, সৃষ্টিকর্মে জড়িত, তাঁর সম্পর্কে আরো আগ্রহী হওয়া স্বাভাবিক। আবুল হাসনাতকে নিয়ে জেনেছি, ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী। ষাটের দশকে বহুমুখী সাংস্কৃতিক কর্মে শ্রম দিয়েছেন। সাহিত্য ও সংগীত চর্চার প্রসারে সৃজনী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রথমে যান আগরতলায়, পরে কলকাতায়। এখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি শরিক হন। এই মুক্তিযুদ্ধই আমৃত্যু তাঁকে প্রভাবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বাঙালি মধ্যবিত্তের সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলার রুচি নির্মাণে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদে ছিলেন সংশ্লিষ্ট।

কবি আবুল হাসনাতের স্বদেশ ভালোবাসা ও মানবতার জয়গান তাঁর কবিতায় শিল্পশৈলীতে রূপান্তরিত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশের মতো তাঁর আপাত সুবোধ কবিতার চরণ, নীলকণ্ঠ স্বরগ্রাম হয়ে ওঠে অন্তর্লীন আত্মোপলব্ধির অংশ। তাঁর গীতল কবিতার ছত্রে তিনি প্রেম-বিরহের স্বাক্ষর যেমন রেখেছেন তার চেয়ে বেশি সাড়া দিয়েছেন সমাজ-রাষ্ট্রের বিবিধ তরঙ্গে। দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে চরম ত্যাগ, শরণার্থী জীবন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও সংসার তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে হৃদয় ও মননস্পর্শী দীপ্তিমান আধুনিক পঙ্ক্তিমালা। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা লিখে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্প্রসারিত করেছেন। মাহমুদ আল জামান নামে আবুল হাসানতের কাব্যগ্রন্থ জ্যোৎস্না দুর্বিপাক, কোনো একদিন ভুবনডাঙায়, ভুবনডাঙার মেঘ নধর কালো বেড়ালে নিহিত হয়েছে বাইরের সকল ঘটনার তাৎপর্য, সকল বিরোধ ও তার সংগতি, সকল বৈষম্য ও তার ঐক্য। এ-কথা অতিশয়োক্তি হবে না, আবুল হাসনাতের মতো স্রষ্টা-অন্বেষী, পরোপকারী, গুণাগুণ বিচারের সহজাত ক্ষমতার অধিকারী সম্পাদক কোনো দেশেরই ডজন ডজন থাকেন না। আত্মপ্রচারকামী, প্রতিষ্ঠালোভী, সুযোগ গ্রহণে চৌকষ, নিজ প্রশস্তি মুখর কলমবাজদের দৌরাত্ম্যের কালে আবুল হাসনাত ষোলো আনা সুসংগত যোগ্যতা নিয়েও কোনো স্বীকৃতির প্রত্যাশা করেননি।

Leave a Reply