সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে উত্তর-উপনিবেশ বয়নরীতি

লেখক:

শহীদ ইকবাল

সেলিনা হোসেন – তাঁর উপন্যাসে ইতিহাসের খাঁজে দাঁড়ান। বাঁক বদলান। ফিরে দেখেন। এবং তুলে আনেন। ক্ষেত্রটি তাঁর সৃজনের কাদামাটি। মঙ্গলকাব্যের সূত্রটিকে বাড়িয়ে দেওয়া, পুনর্গঠিত করা, সে-পুনর্গঠনে নৃ-ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রলাপনে যুক্ত করা। তাতে ঐতিহ্য আর আধুনিক শর্তটি থাকে সম্পৃক্ত। মনে হয় ‘চাঁদ’ নিমণবর্গীয় কিন্তু অশেষ আত্মবিশ্বাসে, অনবদ্য শক্তিতে প্রখর। সে একালের। এ-সময়ের মানুষের প্রতীকী ও প্রতিনিধিত্বকারী। সাহসে প্রখর সম্ভাবনাশ্রয়ী। এই অর্থারোপ আর বিপরীত প্রতিরোধ, শ্রেণিবিচ্যুতির পরিখায় দাঁড় করানো সম্ভব। চাঁদ চরিত্রটি তার শ্রেণিবিচ্যুতির ভেতর দিয়ে অনেক শক্তি সঞ্চয় করে। ভাষার অর্থ পালটায়। ভাষার স্থানচ্যুতি ঘটে। এ উগ্র স্থানচ্যুতির বৈপরীত্য (bionary opposite) দ্বারা এটি নির্মিত। অর্জিত শক্তিতে সে সমাজ অধিকারের ক্ষেত্রেও। এবং একালের আত্মমর্যাদায় স্বোপার্জিত। বিপরীতে আজু মৃধা শক্তিহীন সত্তায় পরিগণিত। উচ্চ-নীচ, ক্ষমতা-ক্ষমতাহীন,

কর্তৃত্ব-কর্তৃত্বহীন এই বৈপরীত্য সমাজের তত্ত্বসূত্রে এখন নতুনভাবে নির্ণীত – মানবাধিকারের শর্তে, শ্রেণিচেতনার আনুকূল্যে এবং আত্মমর্যাদার অধিকারে। সেখানে মানুষ শ্রেণি-বর্ণ-গোত্রের ঊর্ধ্বে। চাঁদ সে-প্রবণতায়, বিশেষ অর্থে সেলিনার উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা পায়। এরকম তাঁর অন্য উপন্যাসও। উপন্যাসের অনেক চরিত্র থেকে প্রতীকীরূপে এই ‘চাঁদ’কে ভাষার স্থানচ্যুতির ভেতরে ‘ডিজেয়ার’ বা ‘মুক্ত এলাকা’ (ভৎবব ঢ়ষধু) হিসেবে তৈরি করে নিয়েছে। এভাবে আগের উপন্যাসেও ‘ভুসুকু বাঙাল’কে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। সেও উঠে আসে স্বাধিকারের চিমত্মায় ও স্বপ্ন-প্রতিষ্ঠার প্রখরতায়। যে-কারণসমূহ অনুরম্নদ্ধ ওই উপন্যাসসূত্রে সেখানে এই অবয়বলগ্নতা লক্ষণীয় বলে মনে হয়। একইসঙ্গে সমাজতাত্ত্বিক চিমত্মাস্বরূপে উত্তর-উপনিবেশবাদী চিমত্মনও তাৎপর্যবহ হয়ে ওঠে :

Have you ever felt that the moment you said the world ‘I’, that ‘I’ was someone else, not you? That in some obscure way, you were not the subject of your own sentence? Do you ever feel that whenever you speak, you have already in some sense been spoken for? Or that when you bear others speaking, that you are only ever going to be the object of their speech? Do you sense that those speaking would never think of trying to find out how things seem to you, from where you are? That you live in a world of others, a world that exists for others?

উদ্ধৃতিটিতে ব্রিটিশ উত্তর-উপনিবেশবাদী চিমত্মক রবার্ট জে সি ইয়ং কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। যেখানে ‘আমি’/ ‘অন্য’ দর্শনে নিজস্ব (ড়নংপঁৎব) সংস্কৃতি-দর্শন-ইতিহাস সম্পর্কে দ্বিতীয় ধারণা বা প্রথাগত চিমত্মার বিপরীত ধারণার প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। প্রাচ্য প্রাধান্যের বিষয়টিও আসে, যেখানে উর্বর ও উদ্বেগময় সংস্কৃতির অর্থ দীপ্তিময় হয়ে ওঠে। এর গুরম্নত্ব ‘বস্ত্তগত উত্তরাধিকার’ ও ‘সাংস্কৃতিক সাফল্য’ – যেখানে পৃথিবীর সব মানুষের অধিকার সমান। বণ্টন সমান। বৈষম্য নেই। আধিপত্য নয়। কর্তৃত্ব নয়। সব মানুষ সমঅধিকারে মর্যাদাবান। এতে শ্রেণিপার্থক্যও থাকবে না। ‘অপর’কে তুচ্ছ করে ‘আমি’র প্রাধান্য দেওয়া নয়। শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক উচ্ছেদ করা। সেলিনার উপন্যাসে সে-চলটি দেখা যায়। ভুসুকু এদেশীয় বাঙাল। সে এক স্বরাজ্যের স্বপ্ন দেখে। স্বরাজ্যের কারণে সে বণ্টন ও উৎপাদনের অধিকারের দায়টুকু তার মতো করে কায়েম করতে পারে। স্বপ্নটি তেমনই। তা কখনো একাত্তরের আগে ছিল না। এই সেই একাত্তর। মুক্তির একাত্তর। স্বভূমির একাত্তর। একটি দেশজন্মের ভিত্তি। কলোনি-উত্তর দেশ – যেখানে অর্থের সমবণ্টন হতে পারবে সুনিশ্চিত। সেই স্বপ্নটি পুঁতে দেন আখ্যানে। অন্য উপন্যাসে চাঁদও উত্তর-উপনিবেশ চিমত্মায় সেরকম শক্তি অর্জন করে। কলোনি-উত্তর ধারণায় ভুসুকু বা চাঁদ ‘অপর’ চেতনা থেকে উঠে আসা প্রতীকী চরিত্র। এখানে চাঁদ অর্থায়িত হয়, নতুন অর্থে তার মানবী শক্তির ঘোষণা দেয়, অভিপ্রেত শক্তিতে হয়ে ওঠে সংগ্রামী, আঘাত হানে বিপরীত শক্তির অভিমুখে; চাঁদের এ অর্জিত শক্তি দিয়ে তার শ্রম-অধিকার সামাজিক অধিকার দায়িত্বের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করে। উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক ফ্রাৎস ফ্রানোনের ইষধপশ ঝশরহ ডযরঃব গধংশং গ্রন্থের কথা, যেখানে বলা হয়েছে : ÔThat, in a white society, such an extreme psychological response originates from the unconscious and unnatural training of black people, from early childhood, to associate ‘blackness’ with ‘wrongness’. That such unconscious mental training of black children is effected … which are cultural media that instill and affix, in the mind of the white child, the society’s cultural representations of black people as villains.’ এভাবেই গড়ে ওঠে অবচেতন আধিপত্যের চেতনা। যেটি নেগ্রিচুড প্রবক্তা এমে সেজেয়ার ও তার শিষ্য ফ্রানোন উলেস্নখ করেছেন। সেলিনার উপন্যাসে বৈপরীত্য তত্ত্বে এ-ভূখ–র আপামর জনতার প্রতিনিধিত্বকারী মানুষের উপেক্ষিত সংস্কৃতির পুনর্নির্ণয় করা হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণিশক্তির বিপরীতে স্বীয় সংস্কৃতি ও শক্তির অভ্যমত্মরীণ সত্মরকাঠামো। সেলিনা সে-প্রশ্নটি তুলে ধরেন স্বতঃস্ফূর্ততায়, আরোপ করে নয়। তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাও নয়, স্বভাবসুলভ রঙে রেখাচিত্র দান করেন। তাতে এ-কলোনিশাসিত বঙ্গীয় জনপদের স্বরূপটি সেখানে নতুন মাত্রা পায়, ঘোষণা করে তার আত্মমর্যাদা অধিকারের স্বরূপে। এ সূত্রে আরো কয়েকটি বিষয় উপন্যাস-নন্দনে যুক্ত হতে পারে। অ্যাল

রবগ্রীয়ে-কথিত নব্যউপন্যাসতত্ত্বে নৈর্ব্যক্তিকতা ও চলমান ঘটনার অবিকল উপস্থাপনার যে-আখ্যা নির্ধারিত হয় তাতে প্রকরণ ও রচনাবৈশিষ্ট্য ভিন্ন বস্ত্তপ্রজ্ঞা অর্জন করে। সেলিনার আলোচ্য উপন্যাসসমূহে পূর্ণাঙ্গরূপে সে দায় প্রতিষ্ঠিত না হলেও নৈর্ব্যক্তিকতার ভেতরে যে জ্ঞানপাঠটি উঠে আসতে পারে তা উপনিবেশোত্তর চিমত্মার ধারণা, যেখানে মানবস্বরূপের চিহ্নায়ক ধারণা পুনর্গঠিত হয়।

ঠিক একইরূপে সমুদ্রদ্বীপে বাসকৃত মালেক-সাফিয়ার ঝিনুক সংগ্রহ এবং মুক্তা আহরণ, শক্তিধর তোরাব আলী-গণি মিয়ার উত্থান ও নিয়ামক শক্তিতে রূপামত্মরিত হওয়া, মালেকের সমুদ্রজয়ী সংগ্রাম, স্বার্থসংশিস্ন­ষ্ট প্রেম-প্রবৃত্তি ইত্যাদির শিল্পআবহ পোকামাকড়ের ঘরবসতি (১৯৮৬) উপন্যাস। মালেক প্রতিজ্ঞায় হাঙর শিকারের সমসত্ম উপকরণ নিয়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী। মালেক ছাড়াও সালেক, বসির আলী, সুজা প্রাণবমত্ম চরিত্র। খলচরিত্র তোরাপ ও সহযোগী গণির অর্থানুকূল্যে অনেকেই তাদের অনুচর হলেও শাহপরি দ্বীপে মূলত সৎ মানুষের সংগ্রাম ও বৃত্তি-অনুষঙ্গই জয়ী হয়। এই বৃত্তি-অনুষঙ্গধৃত মানব-মানবী শ্রেণিহীন। নামেই তার স্বয়ম্প্রকাশ। লেখকের অন্য উপন্যাস কালকেতু ও ফুলস্ন­রাও (১৯৯২) সংগ্রামের অভিমুখ রচনা করে। স্বৈরশাসনের রাষ্ট্রে জনতার স্বাধীনতা নির্বাসিত। স্বাধীন নগরের প্রত্যাশা কালকেতুর; স্বপ্ন দেখে শাসকশক্তির সমসত্ম স্বেচ্ছাচারিতা অবসানের। ফুলস্ন­রাও নারী অধিকারে, লৈঙ্গিক বৈষম্যের অবসানে, জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করে। এটি বঙ্গাল ভুসুকুর রাষ্ট্র নয়, তার চেয়েও আরো জটিল হওয়া রাষ্ট্রের শোষণের ভেতর থেকে উঠে আসা ব্যক্তিচরিত্র। এমে সেজেয়ার-কথিত ‘নেগ্রিচুড’ ধারণা কালকেতুকে সমগ্রোত্রীয় করে তোলে।এক্ষেত্রে কালকেতু পুনর্নির্মিত হয়, সেখানে সে শুধু তার অধিকার নয়, গণতন্ত্র ও অধিকারের সংস্কৃতির কথা বলে। নগর নির্মাণের যে স্বপ্নদ্রষ্টা সে, তা শুধু এই বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের তাবৎ অধিকারচ্যুত জনতার। যারা স্বেচ্ছাচারীর পদাঘাতে পদদলিত, বৈষম্য আর শোষণের করালাঘাতে জর্জরিত। সেখানে সে নিজ শ্রেণির বিচ্যুতি ঘটিয়ে উঠিয়ে আনে গণতন্ত্রের নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে। এই স্থানচ্যুতি বা শ্রেণিবিচ্যুতির শক্তিটি অর্জন করে বৈপরীত্য তত্ত্বে। এ শক্তির ঐক্যে তৈরি হয় বাখতিন-কথিত কার্নিভালের। সেটি সংস্কৃতির সূত্রে যূথবদ্ধ। উচ্চস্থানচ্যুতির ফলে সে এ শক্তি অর্জন করতে সমর্থ হয়। ফুলস্নরা নারী, তার প্রতিষ্ঠা এখানে আরো জঙ্গমশাসিত। নারীবাদ নয়, নারীর প্রথাগত চিমত্মার বিচ্যুতি ঘটে। সে লৈঙ্গিক ধারণার ঊর্ধ্বে অর্জন করে মানুষের শক্তি। সেখানে বৈষম্য নয়, সমঅধিকার-সমবণ্টন শ্রম-উৎপাদন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মর্যাদা যুক্ত হতে সমর্থ হয়। একই ধারায় সেলিনার চরিত্র ইলা মিত্রও। কেন এ-নির্বাচন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ‘হোয়াইট মাস্ক’ খুলে ফেলে, সংস্কৃতির ধারাবাহিক হীনম্মন্যতার বিপরীতে এক সংগ্রামশীল অভিঘাত। সে ঘোষণা করে প্রামেত্মর টান। কেন্দ্রকে অস্বীকার করে। কেন্দ্রচ্যুতিই প্রধান লক্ষ্য। তাই ভুসুকু, কালকেতু, চাঁদ পুনর্গঠিত হয়। সেখানে প্রতীকী ও নির্বাচিত ইলা মিত্রের কঠোর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সেটি তৃতীয় বিশ্বের গণমানুষের চিমত্মাতত্ত্বে। ব্যাপক অর্থে এটি এশিয়া আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার স্থানিক সংস্কৃতির জয়ধ্বজা, ইউরোপীয় কেন্দ্র ধারণাকে অস্বীকার করে। সেলিনা উপন্যাসের চরিত্র বিন্যাসে ততদূর না পৌঁছালেও যেসব প্রামিত্মক চরিত্রকে তুলে আনতে সচেষ্ট হন তা ‘নেগ্রিচুড’ প্রবণতায় ভূমিষ্ঠ। সংগ্রামের ঝলক বিচ্ছুরিত, প্রতিবিম্বিত চিমত্মার পৈঠা সাবঅলটার্ন গোত্রের সংস্কৃতির উৎসবজাত। বঞ্চনা সেখানে বাতিল। শোষক একাকী। শোষিত ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্য একদা শুষে নেয় শোষকের রক্তচক্ষুর প্রতাপ। তুমুল শক্তি অর্জন করে – তার সংস্কৃতির ভেতর থেকে। এই সংস্কৃতির উৎসবেই কৌম জীবন এক হয়। কালকেতুরা প্রাণ পায়। ফুলস্নরা একা থাকে না। স্মর্তব্য, শুধু অধিকার বা মর্যাদাই নয়, সংস্কৃতির লোকায়ত অবয়বটুকুও আসন করে নেয় – উচ্চতা পায়, বুর্জোয়া বা হায়ারার্কি ভেঙে পড়ে। চিরদিনের অভ্যাসের ব্যত্যয়ে প্রামেত্মর এই স্থানিক বিচ্যুতি শুধু কলোনি-উত্তর ধারণাই নয়, মার্কসীয় চিমত্মাতত্ত্বেরও অভিব্যক্ত রূপরেখা। আফ্রিকার চিনুয়া আচেবি, নগুগি ওয়া থিয়োংগো আর এদেশে আখতারম্নজ্জামান ইলিয়াস। সেলিনা সে-প্রবণতায় সিদ্ধি না পেলেও স্পর্শ করতে পেরেছেন সেই বলয়ের ঔপনিবেশিতের আকর উপাদানসমূহ। তাঁর রচনাও আত্মসচেতনতার সংবেদবাহী। সে-কারণেই চরিত্র নির্বাচন এই ভূখ–র কৌম সমাজ অনুসরিত।