স্টিফেন হকিংয়ের জন্য দশটি প্রশ্ন

টাইম সাময়িকীর নভেম্বর ১৫, ২০১০ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত।
অনুবাদ : সুব্রত বড়ুয়া

প্রশ্ন : যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে তাঁর অস্তিত্বের ধারণা কেন সর্বজনীন?-বসন্ত বোরাহ, বেসেল (BASEL), সুইজারল্যান্ড।

হকিং : ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই এমন দাবি আমি করি না। যে-কারণে আমরা এখানে আছি সেই কারণটিকেই মানুষ ঈশ্বর নামটি দিয়েছে। তবে আমি মনে করি, আমরা ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি এমন কোনো ব্যক্তিস্বরূপের পরিবর্তে বরং এই কারণটি হচ্ছে পদার্থবিদ্যার সূত্রাবলি।

প্রশ্ন : মহাবিশ্বের শেষ কি কোথাও আছে? যদি থাকে তাহলে তারপর কী আছে? – পল পিয়ারসন, হাল (HULL), ইংল্যান্ড।

হকিং : যাবতীয় পর্যবেক্ষণ নির্দেশ করে যে, মহাবিশ্ব ক্রমবর্ধমান হারে প্রসারিত হয়ে চলেছে। এটি চিরকাল প্রসারিত হতে থাকবে এবং আরো বেশি শূন্যতার সৃষ্টি করবে ও বেশি করে অন্ধকার তৈরি হতে থাকবে। যদিও  মহাবিশ্বের কোনো শেষ নেই, তবু বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়েই এর সূচনা ঘটেছিল। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে – মহাবিস্ফোরণের আগে কী ছিল। এর উত্তর হচ্ছে – মহাবিস্ফোরণের আগে কিছুই ছিল না, যেমন দক্ষিণ মেরু বা কুমেরুর পর দক্ষিণে আর কিছু নেই।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন – আরো বেশি গভীর মহাশূন্যে পৌঁছার মতো যথেষ্ট সময় পর্যন্ত আমাদের সভ্যতা টিকে থাকবে? – হার্ভে বিথিয়া, স্টোন মাউন্টেইন, জিএ।

হকিং : আমি মনে করি, সৌরজগতে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য যথেষ্ট দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুযোগ আমাদের থাকবে। তবে পৃথিবীর মতো উপযুক্ত পরিবেশ সৌরজগতের আর কোথাও নেই। অতএব পৃথিবীকে যদি আমাদের বসবাসের অনুপযুক্ত করে ফেলা হয়, তাহলে আমরা বেঁচে থাকতে পারব কিনা সে-বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার নয়। সুদীর্ঘকাল ধরে আমাদের বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে আমাদের অবশ্যই অন্যান্য নক্ষত্রলোকে পৌঁছতে হবে। এর জন্য অনেক দীর্ঘ সময় লাগবে। আশা করতে হবে, আমরা যেন ততদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারি।

প্রশ্ন : আপনি যদি আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, তাহলে আপনি তাঁকে কী বলতেন? – জু হুয়াং, স্ট্যামফোর্ড, কন।

হকিং : আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম, কেন তিনি কৃষ্ণবিবরের ব্যাপারটি বিশ্বাস করতেন না? তাঁর আপেক্ষিকতা-তত্ত্বের ক্ষেত্র-সমীকরণগুলো এ-কথাই বলে যে, একটি বিশাল নক্ষত্র অথবা গ্যাসমেঘ নিজে নিজেই ভেঙে পড়বে এবং কৃষ্ণবিবর সৃষ্টি করবে। আইনস্টাইন এ-বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং নিজেকে কোনোভাবে বিশ্বাস করাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে, ভর ছুড়ে ফেলার মতো বিস্ফোরণ বা সেরকম কিছু একটা সবসময় ঘটবে এবং এভাবেই কৃষ্ণবিবর গঠন প্রতিহত হবে। যদি তেমন কোনো বিস্ফোরণ না ঘটে, তাহলে কী হবে?

প্রশ্ন : আপনার জীবদ্দশায় আপনি কোন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অথবা অগ্রগতি দেখে যেতে চান? – লুকা জানজি, অলস্টন, ম্যাস।

হকিং : আমি চাই নিউক্লীয় সংযোজন অর্থাৎ ফিউশন প্রক্রিয়া শক্তির ব্যবহারিক উৎসে পরিণত হোক। এই আবিষ্কার সম্ভব হলে দূষণ বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়াই শক্তির অফুরন্ত সরবরাহ আমাদের করায়ত্ত হবে।

প্রশ্ন : মৃত্যুর পর আমাদের চেতনার কী ঘটে বলে আপনি বিশ্বাস করেন? – এলিয়ট গিবারসন, সিয়াটল।

হকিং : আমার মনে হয়, আমাদের মস্তিষ্ক অবশ্যই একটি কম্পিউটার এবং চেতনা হচ্ছে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম। কম্পিউটারটি যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে প্রোগ্রামও বন্ধ হয়ে যাবে। তাত্ত্বিকভাবে, প্রোগ্রামটি পুনরায় সৃষ্টি করা যাবে নিউরয়্যাল অর্থাৎ স্নায়বিক নেটওয়ার্কে। কিন্তু তা হবে অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ, যেহেতু এর জন্য একজন মানুষের সব স্মৃতির প্রয়োজন হবে।

প্রশ্ন : যেহেতু আপনি একজন অত্যন্ত মেধাবী পদার্থবিদ, অতএব আপনার সাধারণভাবে ভালো লাগার কোন বিষয়টি মানুষকে চমকে দিতে পারে? – ক্যারল গিলমোর, জেফারসন সিটি, মো।

উত্তর : আমি সব ধরনের সংগীত ভালোবাসি – পপ, ধ্রুপদী ও অপেরা। আমার ছেলে টিমের সঙ্গে সঙ্গে আমিও ফর্মুলা ওয়ান রেসিংয়ের ব্যাপারে আগ্রহী।

প্রশ্ন : আপনি কি অনুভব করেন যে, আপনার দৈহিক সীমাবদ্ধতা আপনার অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজে সাহায্য অথবা বাধা সৃষ্টি করেছে? মেরিয়ানে ভিককুলা, এসপু, ফিনল্যান্ড।

হকিং : যদিও মোটর নিউরন অসুখের কারণে আমি অত্যন্ত দুর্ভাগা, তবু অন্য প্রায় সব ব্যাপারে আমি খুবই সৌভাগ্যবান। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় আমি ভাগ্যবান ছিলাম, কারণ এ-বিষয়টি সেসব বিরল বিষয়ের অন্যতম, যেখানে আমার শারীরিক অসামর্থ্য গুরুতর বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। এছাড়া আমার জনপ্রিয় বইগুলো পাঠক সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে বলেও আমি সৌভাগ্যবান।

প্রশ্ন : জীবনরহস্যের সকল প্রশ্নের উত্তর যে মানুষ আপনার কাছ থেকে পাবে বলে আশা করে, তা কি আপনার কাছে বিরাট দায়িত্ব বলে মনে হয়? – সুসান লেসলি, বোস্টন।

হকিং : অবশ্যই। জীবনের সকল সমস্যার উত্তর আমার জানা নেই। পদার্থবিদ্যা ও গণিত আমাদের হয়তো বলে দিতে পারে – এ-মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল, তবে মানুষের আচরণ সম্পর্কে আগেভাগে বলে দেওয়ার কাজে এ-দুটি বিষয় তেমন কাজে আসে না, যেহেতু সেক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি সমীকরণ সমাধান করার প্রয়োজন থাকে। মানুষের বিশেষত মহিলাদের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি কাজ করবে সেটি বুঝতে পারার ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে অধিক পারঙ্গম আমি নই।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন একদিন এমন একটা সময় আসবে যখন মানবজাতি পদার্থবিদ্যা বিষয়ে যা কিছু অনুধাবনযোগ্য তার সবটাই জেনে যাবে? – কারস্টেন কুর্জে, বাড হনীফ, জার্মানি।

হকিং : আমি মনে করি, তেমনটি কখনো ঘটবে না। যদি ঘটে, তাহলে আমার চাকরিটা আমি হারাব।

শেয়ার করুন

Leave a Reply