স্টিফেন হকিং : জীবন ও গবেষণা (১৯৪২-২০১৮)

গত ১৪ মার্চ ২০১৮ সালে ভোরবেলায় ক্যামব্রিজের নিজ বাসভবনে এ শতাব্দীর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান এবং কসমোলজি বা মহাবিশ্বতত্ত্বের জগতের এক প্রবাদপুরুষ স্টিফেন উইলিয়াম হকিং ৭৬ বছর বয়সে লোকান্তরিত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে বিজ্ঞানজগৎ হারাল এক অনন্য প্রতিভা। এই প্রতিভা প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে অন্য কোনো শক্তিই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। এএলএস (Amyotrophic Lateral Sclerosis) বা মোটর নিউরনের মতো জটিল রোগ নিয়েও গত অর্ধশতাব্দী ধরে স্টিফেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও মহাবিশ্বতত্ত্বের জগতে অবদান রেখে গেছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ রজার পেনরোজ তাঁর মৃত্যুতে উল্লেখ করেন : ‘He was extremely highly regarded, in view of his many greatly impressive, sometimes revolutionary contributions to the understanding of the physics and the geometry of the universe।’

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক স্টিফেন টুপ (Stephen Toope) তাঁর মৃত্যুতে উল্লেখ করেন, ‘Professor Hawking was a unique individual who will be remembered with warmth and affection not only in Cambridge but all over the world. …His character was an inspiration to millions. He will be much missed।’ লর্ড মার্টিন রিজ (Martin Rees), একজন রাজকীয় জ্যোতির্বিদ। তিনি স্টিফেনের মৃত্যুতে উল্লেখ করেন, ‘His name will live in the annals of science; millions have had their cosmic horizons widened by his best-selling books; and even more, …have been inspired by a unique example of achievement against all the odds।’ এ-উক্তিগুলো থেকে অনুধাবন করা যায় ক্যামব্রিজ এবং বিশ্বের বিজ্ঞানজগতে স্টিফেন হকিং সম্পর্কে ধারণা কেমন ছিল।

স্টিফেন হকিংয়ের জন্ম অক্সফোর্ডে ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি, গ্যালিলিওর মৃত্যুর তিনশো বছর পর। স্টিফেন বলেছেন যে, ‘ওইদিন আরো শত শত শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, কিন্তু এদের মধ্যে কেউ জ্যোতির্বিদ্যা বা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা পড়েছে বলে আমার জানা নেই।’ তাঁর বাবা ফ্রাংক হকিং ছিলেন পেশায় ডাক্তার এবং মা ইসাবেলা হকিং প্রথমে ট্যাক্স ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করে অন্যান্য প্রশাসনিক কাজও করেছেন। বাবা ও মা দুজনই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানদের সঙ্গে ব্রিটিশদের এক চুক্তি হয়েছিল যে, ওরা অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে বোমা ফেলবে না এবং এর বিনিময়ে ব্রিটিশরা হাইডেলবার্গ এবং গটিনজেনে বোমা ফেলবে না। সে-কারণে লন্ডনের হাইগেট এলাকার বাড়ি ছেড়ে স্টিফেনের বাবা-মা সে-সময় অক্সফোর্ডে সাময়িকভাবে বসবাস শুরু করেন এবং স্টিফেনের জন্ম সেখানেই। স্টিফেনের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শুরু হয় ১৯৫৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইউনিভার্সিটি কলেজ অক্সফোর্ডে। তিন বছর পর ফল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির মাঝামাঝি। পরীক্ষার ফল ভালো না হওয়ার কারণে অক্সফোর্ডের প্রথা অনুযায়ী তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় উপস্থিত হতে হয়। মৌখিক পরীক্ষায় স্টিফেনকে প্রশ্ন করা হয় – ‘তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘যদি আমি প্রথম শ্রেণি পাই, তাহলে আমি ক্যামব্রিজে যাব। আর যদি আমি দ্বিতীয় শ্রেণি পাই তাহলে অক্সফোর্ডে থেকে যাব।’ স্টিফেন এক স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতায় উল্লেখ করেন যে, সে-সময় ব্যাকআপ পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি সিভিল সার্ভিসে আবেদন করেছিলেন। মিনিস্ট্রি অব ওয়ার্কসে কাজ করার জন্য মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; কিন্তু লিখিত পরীক্ষার তারিখ তিনি ভুলে যান, ফলে সে-চাকরি তাঁর করা হয়নি, তবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘It was lucky I didn’t become a civil servant. I wouldn’t have managed with my disability.’

অক্সফোর্ডে স্টিফেনের পদার্থবিজ্ঞানের টিউটর রবার্ট বারমান পরবর্তীকালে উল্লেখ করেন যে, আমরা স্টিফেন সম্পর্কে সবসময় উচ্চ ধারণা পোষণ করতাম, সেটা সে জানত না। স্টিফেন প্রথম শ্রেণি পান আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেনিস উইলিয়াম সিয়ামার (Dennis William Sciama) অধীনে পিএইচ.ডি করতে যান। যদিও তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি ফ্রেড হয়েলের (Fred Hoyle) অধীনে পিএইচ.ডি করবেন; কিন্তু সিয়ামাকে তাঁর জন্য নিযুক্ত করা হলো। ১৯৬৬ সালে স্টিফেন হকিংয়ের পিএইচ.ডি সন্দর্ভ প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ‘Properties of Expanding Universes’। এই সন্দর্ভে স্টিফেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের তাৎপর্য এবং ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা করেন। পিএইচ.ডি ছাত্র থাকাকালে স্টিফেন গনভিল ও কেয়োস কলেজে (Gonville and Caius College) রিসার্চ ফেলোশিপের জন্য আবেদন করেন। কারণ জেনকে (তাঁর সে-সময়কার গার্লফ্রেন্ড) বিয়ে করতে হলে চাকরি দরকার। বিখ্যাত গণিতবিদ হারম্যান বন্ডিং এবং পিএইচ.ডি সুপারভাইজার ড. সিয়ামা তাঁর আবেদনপত্রে সুপারিশ করেন। স্টিফেন মনে করেন, ‘Scientists and Prostitutes get paid for doing what they enjoy।’ স্টিফেন ফেলোশিপের চাকরি পান এবং ১৯৬৫ সালে জেন হকিংয়ের (Jane Hawking) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই রিসার্চ ফেলোশিপ তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত ছিল।

১৯৭৯ সালে স্টিফেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতশাস্ত্রের লুকাসিয়ান অধ্যাপক নিযুক্ত হন। সে-সময় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান লেখক কার্ল সাগান বলেছিলেন, তিনি নিউটন এবং পল ডিরাকের যোগ্য উত্তরসূরি। বিজ্ঞানে স্টিফেন হকিংয়ের অবদানকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় অ্যারিস্টটলের মহাবিশ্ব দর্শনে (৩৫০ খ্রিষ্টপূর্ব) যা দুই হাজার বছর ধরে আমাদের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এই বিশ্বদর্শন অনুযায়ী, পৃথিবী ছিল মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আর সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করে। টলেমি ১৪০ খ্রিষ্টাব্দে পৃথিবীকেন্দ্রিক ধারণা দিয়ে অ্যারিস্টটলের চিন্তাকে পূর্ণতা দান করেন। কিন্তু পোলিশ ধর্মযাজক কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তত্ত্ব দিয়ে টলেমির ধারণাকে বাতিল করেন। তারপর সৌরকেন্দ্রিক ধারণাকে পরীক্ষণ পদ্ধতি দ্বারা বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করেন গ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২)। A dialogue on the two great world systems বইয়ে সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেন গ্যালিলিও এবং এর জন্য তাঁকে চার্চের ধর্মযাজকদের কাছে দোষী সাব্যস্ত হতে হয়। গ্যালিলিওর পর য়োহান কেপলার (১৫৩১-১৬৩০ খ্রি.) বিভিন্ন গ্রহের গতিবিধির সূত্র প্রকাশ করেন। এতে সূর্যকেই সৌরজগতের কেন্দ্র বলে মেনে নেওয়া হয়। তারপর আইজাক নিউটন প্রকাশ করলেন মহাকর্ষতত্ত্ব (১৬৮৭) এবং তা থেকে কেপলারের সূত্রগুলো প্রমাণ করা গেল। নিউটনের মাধ্যমে সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ তত্ত্বগত ভিত্তি পেল। নিউটনের মহাকর্ষতত্ত্বের পর ১৭ এবং ১৮ শতকে শক্তির নিত্যতা ও শক্তির রূপান্তর সম্পর্কে নানা তত্ত্ব পাই। ১৮ ও ১৯ শতকে বিদ্যুৎ ও চৌম্বকশক্তির পরিচয় পাই এবং ম্যাক্সওয়েল তড়িৎচৌম্বক বলের ধারণা উপস্থাপন করেন। তারপর অণু ও পরমাণু সম্পর্কে আমরা নানা তত্ত্ব পেয়েছি, যেমন ডালটনের পরমাণুতত্ত্ব, অ্যাভোগাড্রোর আণবিক প্রকল্প এবং সেন্ডেলিয়েফের
পর্যায় সারণি। উনিশ শতকের শেষের দিকে এক্স-রে আবিষ্কার, বেকেরলের তেজস্ক্রিয়তা, থমসনের ইলেকট্রন, রাদারফোর্ডের পরমাণু কেন্দ্র, পস্ন্যাংকের কোয়ান্টামতত্ত্ব এবং আইনস্টাইনের কালজয়ী আবিষ্কার আপেক্ষিকতাবাদ নিউটনের গতিবিদ্যা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করল। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ এবং তারপর দ্য ব্রগলির তরঙ্গ-কণিকা দ্বৈতবাদ, স্রোয়েডিংগার, হাইজেনবার্গ এবং ডিরাকের কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নানা ধারণা বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

এভাবে অণু-পরমাণুর জগতে যখন নতুন তত্ত্ব ও তথ্যের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, ঠিক তখন মহাকাশবিজ্ঞান ও কসমোলজি বা মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়েও চলছে নানা কাজ। যেমন নতুন নতুন যন্ত্র তৈরি করে মহাকাশবিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন মহাকাশকে। হার্ভস স্ট্রাং এবং রাসেল (১৯১৩) তারাদের জীবন-মৃত্যু সম্পর্কে ধারণা দেন। কার্ল জানস্কি (১৯৩১) তৈরি করেন শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ। হান্স বেথে (১৯৩৮) প্রথম উল্লেখ করেন, তারাদের শক্তির উৎস হাইড্রোজেন বোমার মতো সংশেস্নষ প্রক্রিয়া। এডিংটন এবং অন্য বিজ্ঞানীদের চেষ্টায় তারার জন্মকাল ও পরিণতি, সুপার নোভা, মহাজাগতিক রশ্মি, নিউট্রন তারা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ১৯২৯ সালে এডউইন হাব্ল দেখান যে, তারকামণ্ডলী ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। এর তাৎপর্য এই যে, মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারণশীল এবং বস্তুর ঘনত্ব সময়ের সঙ্গে কমছে। তাহলে ধরে নেওয়া যায়, মহাবিশ্ব সুদূর অতীতে এক জায়গায় ছিল এবং সে-সময় পদার্থের ঘনত্ব ছিল প্রায় অসীম এবং তখন এক মহাবিস্ফোরণের ফলেই মহাবিশ্ব প্রসারণশীল। ১৯৪৬ সালে অ্যালফার, বেথে ও গ্যামো এই তত্ত্বকে বলেন ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্ব বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ১৯৪৮ সালে হয়েল, বন্ডি এবং গোল্ড মহাবিশ্ব সম্পর্কে স্থিরাবস্থা (Steady State) মডেলের প্রসত্মাব করেন। এই মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের জন্ম বা মৃত্যু নেই। সবসময়ই নতুন পদার্থ সৃষ্টি হচ্ছে এবং মহাবিশ্বে পদার্থের ঘনত্ব বাড়ছে বা কমছে না; স্থিতাবস্থায় আছে।

স্টিফেন হকিং লক্ষ করেন যে, পদার্থের স্থিতাবস্থা যদি হয় তাহলে মহাবিশ্বের সবদিকে পদার্থের ঘনত্ব মহাবিশ্বের শুরুতে যা ছিল এখনো তাই থাকবে – এই ধর্মকে পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করা যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘a critical ingredient of the scientific method’। ১৯৬৫ সালের অক্টোবর মাসে পেনজিয়াস ও উইলসন পশ্চাৎপট মাইক্রোতরঙ্গ বিকিরণের (Microwave backyard radiation) সন্ধান পান, যা বিজ্ঞানীরা আদিম উত্তপ্ত মহাবিশ্বের দীপ্তি থেকে যে-বিকিরণ হয়, তার অবশিষ্ট হিসেবে মেনে নিলেন। এই পরীক্ষালব্ধ উপাত্ত সমর্থন করে যে, মহাবিশ্বের শুরুতে পদার্থের ঘনত্ব বেশি ছিল। এটি মহাবিশ্বের আরম্ভের অনন্যতা (singularity)। এই তত্ত্ব দ্বারা এই ধারণা ও উপাত্তকে সমর্থন করার জন্য রজার পেনরোজ এবং স্টিফেন হকিং গাণিতিকভাবে দেখান যে, যদি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সত্য হয়, তাহলে অনন্যতা থাকবে এবং সেখানে থাকবে অসীম ঘনত্ব, স্থান-কালের বক্রতা এবং যেখানে সময়ের একটি শুরু রয়েছে। মহাবিশ্ব এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে শুরু হয় এবং অতিদ্রুত এটি সম্প্রসারিত হয়। স্টিফেন হকিংয়ের ভাষায় – ‘This is called inflation and it was extremely rapid. The universe doubled in size many times in a tiny fraction of a second।’ স্টিফেন হকিং-প্রস্তাবিত এই তত্ত্ব হয়েলের স্থিতাবস্থা তত্ত্বের বিরোধী এবং বিগ ব্যাং-তত্ত্বের সমর্থনকারী। স্টিফেন উল্লেখ করেন যে, মহাবিশ্বের স্ফীতি সম্পূর্ণরূপে মসৃণ নয়, সেখানে রয়েছে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিভিন্নতা (uariation)। এর ফলে সম্প্রসারণের পথে স্থানে স্থানে গ্যালাক্সি, গ্রহ, নক্ষত্র এবং সৌরজগতের সৃষ্টি। স্টিফেন মনে করেন যে, আমরা এই বিভিন্নতার কাছে ঋণী। মহাবিশ্বের শুরু এবং এর সম্প্রসারণ যদি সম্পূর্ণরূপে মসৃণ হতো, তাহলে কোনো গ্রহ-নক্ষত্র এবং প্রাণের সৃষ্টি হতো না। আমরা হচ্ছি তাঁর ভাষায়, ‘Product of Primordial quantum fluctuation।’

১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত স্টিফেন হকিং ও রজার পেনরোজ মিলে যে-গবেষণা করেছিলেন তা থেকে দেখা যায় যে, আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে কৃষ্ণগহবরের ভেতরে অসীম ঘনত্ব এবং স্থান-কালের বক্রতার অনন্যতা রয়েছে। মহাবিশ্বের সৃষ্টিলগ্নে বহু ছোট ছোট কৃষ্ণগহবর সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলো বিভিন্ন কণা-প্রতিকণা নিঃসৃত হয়ে ক্রমশ লোপ পায়। স্টিফেন তাঁর A Brief history of Time গ্রন্থে কৃষ্ণগহবরের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন, কৃষ্ণগহবরের ঘটনাদিগন্ত (event horizon) থেকে পালিয়ে আসা সম্ভব নয়। তিনি নরকের প্রবেশদ্বার সম্পর্কে কবি দান্তের কবিতার একটি লাইন – ‘যারা এখানে প্রবেশ করছো, তারা পরিত্যাগ করো সমস্ত আশা’ – উল্লেখ করে বলেন, কৃষ্ণগহবরের ঘটনা দিগন্তের অবস্থা সেইরূপ।

বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা নেচারে স্টিফেন হকিংয়ের প্রবন্ধ ‘কৃষ্ণগহবরের বিস্ফোরণ’ সত্তরের দশকে বিজ্ঞানজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ওই প্রবন্ধে স্টিফেন উল্লেখ করেন যে, কৃষ্ণগহবরে রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন টন পদার্থ; কিন্তু এর ঘনত্ব এত বেশি যে, এদের আকার অত্যন্ত সূক্ষ্ম কণার মতো। সুতরাং অতিবৃহৎ (ওজনের হিসাবে) এবং অতিক্ষুদ্রের (আকারের হিসাবে) এক সমন্বিত রূপের ফলে একে আপেক্ষিকতাবাদ (বৃহৎ বস্তুর তত্ত্ব) এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা (ক্ষুদ্র বস্তুর তত্ত্ব) দ্বারা বর্ণনা করা সম্ভব। স্টিফেন এই দুই তত্ত্বকে মিলিয়ে দেখান যে, কৃষ্ণগহবর বিকিরণ করে। এই বিকিরণের নামকরণ করা হয় ‘হকিং রেডিয়েশন’। সাম্প্রতিককালের অত্যন্ত খ্যাতিমান ইতালীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী কার্লো রভেল্লি (Carlo Rovelli) তাঁর Seven Brief Lessons on Physics গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, স্টিফেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং তাপগতিবিদ্যার সমন্বিত প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন কৃষ্ণগহবর সব সময়ই উত্তপ্ত থাকে। কিন্তু এটি এতই ক্ষীণ যে, এখনো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ২০১৬ সালে বিবিসিতে প্রদত্ত রিথ বক্তৃতায় (Reith Lecture) স্টিফেন হকিং বলেছেন, কৃষ্ণগহবর কিন্তু কৃষ্ণ নয়। কারণ কৃষ্ণগহবর থেকে বেরিয়ে আসা বিকিরণে মহাবিশ্ব সম্পর্কে অনেক তথ্য রয়েছে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘No one has found any, which is a pity because if they had, I would have got a Nobel Prize।’

আইনস্টাইনের যেমন একটি বিখ্যাত সমীকরণ হচ্ছে E = mc2, স্টিফেন হকিংয়েরও একটি বিখ্যাত সমীকরণ রয়েছে। তা হলো –

SBH = Ac 3

4 ħ G

এই সমীকরণ ঘটনাদিগন্তের ক্ষেত্রফলের ভিত্তিতে কৃষ্ণগহবরের এনট্রপি পরিমাপ করে। এনট্রপি হচ্ছে একটি তন্ত্রের (System) বিশৃঙ্খলার মাপ। যখন
কৃষ্ণগহবরের ভেতর পদার্থ পতিত হয়, তখন ঘটনাদিগন্তের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পায়। জেকব বেকেনস্টাইন নামে প্রিন্সটনের এক গবেষণাকর্মী, যিনি জন হুইলারের (John Wheeler) ছাত্র ছিলেন, তিনি প্রসত্মাব করেন যে, ঘটনাদিগন্তের ক্ষেত্রফল কৃষ্ণগহবরের এনট্রপির একটি মাপ। স্টিফেন হকিং এই ধারণার সঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, আইনস্টাইনের আলোর গতি এবং নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ ধ্রুবককে একত্র করে উল্লিখিত গাণিতিক সূত্র প্রদান করেন। এই সূত্রে S হচ্ছে কৃষ্ণগহবরের এনট্রপি, BH-কে বলা হয় ‘Black Hole’ বা বেকেনস্টাইন-হকিং, A হচ্ছে কৃষ্ণগহবরের ঘটনাদিগন্তের ক্ষেত্রফল, C হচ্ছে আলোর গতি, G হচ্ছে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ ধ্রুবক এবং ħ হচ্ছে প্ল্যাংক-ডিরাক ধ্রুবক। এই সূত্র বিজ্ঞানীমহলে অত্যন্ত সমাদৃত। কিন্তু এই সূত্রটি স্টিফেন তাঁর জনপ্রিয় গ্রন্থ এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইমে  ব্যবহার করেননি। কারণ, তাঁকে একজন বলেছিল, একটি সমীকরণ ব্যবহারের অর্থ হচ্ছে পাঠকের সংখ্যা অর্ধেক কমে যাওয়া। তাই স্টিফেন স্থির করেন E=mc2 ছাড়া অন্য কোনো সমীকরণ এই গ্রন্থে ব্যবহার করবেন না। ১৯৮৭ সালে ব্যান্টাম প্রেস এই গ্রন্থটি প্রকাশ করে, যা বিক্রি হয় এক কোটি কপি এবং স্টিফেনকে এনে দেয় জগৎ-জোড়া খ্যাতি। সানডে টাইমস পত্রিকা সে-সময় এ-বইটি সম্পর্কে লিখেছিল, ‘শিশুর সারল্য ও অনুসন্ধিৎসার সঙ্গে এ-বইয়ে যুক্ত হয়েছে অসীম প্রতিভাশালী ক্ষুরধার বুদ্ধি। আমরা অনায়াসে বিচরণ করতে পারি হকিংয়ের মহাবিশ্বে আর সেই সঙ্গে প্রশংসা করতে পারি তাঁর মানসিক ক্ষমতার।’

১৯৯৯ সালের ১২ মার্চ ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের আয়োজনে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেডি মিচেল হলে আগামী সহস্রাব্দের বিজ্ঞান বিষয়ে স্টিফেন হকিং বক্তৃতা প্রদান করেন। সেই অনুষ্ঠানে আমিও উপস্থিত ছিলাম (শৈলী পত্রিকা, ১ অক্টোবর ১৯৯৯ দ্রষ্টব্য)। ওইদিনই প্রথম জানতে ও দেখতে পারি স্টিফেন কীভাবে তাঁর শারীরিক বৈকল্য নিয়েও কথা বলেন। তার পেছনে ডেভিড মেসন এবং তাঁর ছাত্রদের অবদান রয়েছে। মেসন Cambridge Adaptive Communication-এ কাজ করেন। তিনি হকিংয়ের হুইলচেয়ারে ব্যাটারিচালিত আইবিএম কম্পিউটার স্থাপন করে দিয়েছেন। তাতে Equalizer TM নামে একটি প্রোগ্রাম রয়েছে। সেই প্রোগ্রামের সাহায্যে এবং কার্সার ব্যবহার করে স্টিফেন শব্দ নির্বাচন এবং বাক্য গঠন করেন। যখন একটি বাক্য তৈরি হয়ে যায় তখন সেটি Speech Synthesizer-এ পাঠিয়ে দেন। দর্শকরা তখন ওই বাক্যটি অনেকটা স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের ইংরেজি বলার মতো শুনতে পান। স্টিফেন যখন কোনো গাণিতিক সমীকরণ লেখেন তখন তিনি তা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। শব্দ তারপর Symbol-এ পরিণত হয়। স্টিফেন তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, বিগত সহস্রাব্দে বিজ্ঞানের যে-অগ্রগতি হয়েছে তার গতিপ্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এর পরিবর্তন প্রক্রিয়া ঘাতাংকী রেখার মতো (Exponential)। স্টিফেন উল্লেখ করেন, জনসংখ্যার বৃদ্ধি, বিদ্যুতের ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক জার্নালের সংখ্যা এবং সেইসঙ্গে মহাবিশ্বের সামগ্রিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া ঘাতাংকী রেখাসম (Exponential Curve)। অপরদিকে নিউক্লিয়ার জগতে প্রবেশ করলে দেখা যাবে বিভিন্ন কণার গতিবিধি ‘closed loop’। এই পর্যায়ে স্টিফেন ‘Casimir effect’-এর বর্ণনার মাধ্যমে কোনো কণার ‘closed loop histories’-এর বর্ণনা প্রদান করেন।

মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পূর্বে স্টিফেন তাঁর প্রাক্তন ছাত্র হারটগ (Hertog), যিনি বর্তমানে বেলজিয়ামের লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক, এর সঙ্গে যৌথভাবে এক গবেষণাপত্র রচনা করেন। যার বিষয়বস্তু হচ্ছে, পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে বহুবিশ্বকে (Multiverse) প্রমাণ করার জন্য যে গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা। আমাদের এই মহাবিশ্বের মতো আরো মহাবিশ্ব রয়েছে – এই তত্ত্ব পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলে নোবেল পুরস্কার পেতেন স্টিফেন হকিং এবং হারটগ, কিন্তু স্টিফেনের সে-সম্ভাবনা আর নেই তাঁর মৃত্যুর কারণে। হকিংয়ের মৃত্যুর দু-সপ্তাহ আগে ক্যামব্রিজে এসে হারটগ স্টিফেনের সঙ্গে বসে গবেষণাপত্র চূড়ান্ত করে জার্নালে জমা দেন। এটি এখন রিভিউ হচ্ছে। এই গবেষণাপত্রে স্টিফেন আরো উল্লেখ করেন যে, এই মহাবিশ্বের পরিণতি হবে গভীর অন্ধকার অবস্থা, কারণ সব নক্ষত্রশক্তির ক্ষয় হয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হবে। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের খ্যাতিমান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের গ্রন্থ The Ultimate fate of the Universe-এ আমরা এ-ধরনের ধারণার সন্ধান পাই। ২০১০ সালে হকিং এবং লিওনার্ড ম্লোদিনাভ কর্তৃক যৌথভাবে লিখিত গ্রন্থ The Grand Design-এ সবকিছুর তত্ত্বের একটি প্রস্তাবিত তত্ত্ব M-তত্ত্বের (M-Theory) বর্ণনা রয়েছে। এই M-কে অনেকে ‘Mysterious’ বলেন এবং M-কে বিভিন্ন তত্ত্বের একটি সেট হিসেবে দেখা হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের এই মহাবিশ্বের মতো আরো মহাবিশ্ব রয়েছে। M-তত্ত্ব এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। তাছাড়া লেখকদ্বয় আরো উল্লেখ করেন যে, ‘Their creation does not require the intervention of some supernatural being or god. Rather these multiple universes arise naturally from Physical laws।’

বহুকাল থেকেই বিভিন্ন মৌলিক বলকে একটি তত্ত্বের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। মহাবিশ্বে চার ধরনের বল আছে – অভিকর্ষ, তড়িৎচৌম্বক, সবল ও দুর্বল পারমাণবিক বল। আইনস্টাইন এই বলগুলোকে এক জায়গায় মেলানোর চেষ্টা করে সফল হননি। সালাম, ভাইবোর্গ এবং গ্লাসো ইলেকট্রোউইক এবং ইলেকট্রো নিউক্লিয়ার তত্ত্বে চৌম্বক বল এবং দু-ধরনের পারমাণবিক বলকে এক জায়গায় জুড়েছেন। স্টিফেন হকিং চেয়েছিলেন এক মহামিলনতত্ত্ব। হকিং ও পেনরোজ আপেক্ষিকতাবাদ ও কোয়ান্টামতত্ত্বের মিলন ঘটিয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ‘সব কিছুর তত্ত্বে’র দিকে প্রথম পদক্ষেপ ফেলতে সাহায্য করেন। এক বিজ্ঞানসভায় স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ‘There are some grounds for continuous optimism that we may see a complete theory within the lifetime of some of those present here।’

তাঁর অনেক বক্তৃতা শোনা এবং তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ক্যামব্রিজের লেডি মিচেল হলের সভায় আইনস্টাইনের প্রসঙ্গ টেনে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করার সময় ঈশ্বরের কি অন্যরকম কিছু করার সম্ভাবনা ছিল? হকিং বলেছিলেন, তিনি ঈশ্বরের মন বুঝতে চেষ্টা করেছেন। তবে তিনি যে সিদ্ধামেত্ম উপনীত হয়েছেন তা হলো এই যে, এই মহাবিশ্বের স্থানে কোনো কিনারা নেই, কালে কোনো শুরু বা শেষ নেই এবং স্রষ্টার করার মতো কিছুই নেই। আগামী দিনের বিজ্ঞানীরা স্টিফেন হকিংয়ের কাজের মূল্যায়ন করবেন। বিজ্ঞানজগতে তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি স্মরিত হবেন অনন্তকাল।

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যঋণ

১. Stephen Hawking & Roger Penrose, The Nature of Space and Time, Princeton University Press (1996)।

২. Stephen Hawking, A Brief History of Time, Bantam Press (1987)।

৩. Stephen Hawking (edited with Commentary), The Illustrated On the Shoulders of Giants, Running Press (2004)।

৪. Stephen Hawking, The Universe in a Nutshell, Bantam Press (2001)।

৫. Stephen Hawking and Leonard Mlodinow, The Grand Design, Transworld Publishers (2010)।

৬. Stephen Hawking, Black Holes : The BBC Reith Lectures, Bantam Books (2016)।

৭. কানন পুরকায়স্থ, ‘আগামী সহস্রাব্দের ভাবনায় তন্ময় এক সন্ধ্যা’, শৈলী, বর্ষ ৫, সংখ্যা ১৬ (১ অক্টোবর ১৯৯৯)।

Leave a Reply

%d bloggers like this: