স্থাপত্যকাব্যের কবি ও তাঁর স্বপ্ন

লেখক:

ঋতা রহমান

সাদা গোলাকার স্তম্ভগুলোর বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব, তবু ঋজু ভঙ্গিতে দম্ভের সঙ্গে ঠায় দাঁড়িয়ে, দোতলার কাঠের লুভার প্যানেগুলোর পলিশে একটু যেন ফিকে ভাব, মনে হয় কাঁচা-পাকা চুলের আভাসে বয়স বাড়ার ইঙ্গিত; আর কাঠবাদাম গাছটিকে সাক্ষী রেখে রমণীয় ভঙ্গিতে যে-সিঁড়িটা দাঁড়ানো, তার কোমরের বাঁক জানিয়ে দেয়, সে যেন চিরনবীন, মোহনীয় নারীর ছায়া যেন তার অবয়বে। এই সেই চারুকলা ইনস্টিটিউশন ভবন, যা স্থপতি মাজহারুল ইসলামের অতিপ্রিয় স্থাপত্যকাব্য, তাঁর সৃষ্টির প্রিয় সন্তান। নিত্যদিনের মতোই ঘুম ভেঙেছিল রমনার চারুকলা ইনস্টিটিউশনের, আষাঢ়ের শেষ প্রভাতে। তখনো জানতে পারেনি সে, হাসপাতালের ঠান্ডা ঘরে তার অতিপ্রিয় পিতা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্ত্ততি শেষ করেছেন, বুঝতে পারেনি আর কয়েক ঘণ্টা পর তার এই আপনজন, প্রাণহীন দেহে কোলে মাথা রাখতে শেষবারের মতো আসবেন এই চারুকলার বারান্দায়।

৩১ আষাঢ়, ১৪১৯, ইংরেজিতে জুলাই মাসের ১৫ তারিখ। সদা ব্যস্ত এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অনন্তকালের আসল ঠিকানার উদ্দেশে পাড়ি দিলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। এই চলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, হয়তোবা সবচাইতে গভীর প্রত্যাশিত সত্য, তবু মায়ার ঘোরে বিভোর আমরা মরণকে খুশিমনে বরণ করে নিতে পারি না, নিরঞ্জনের সঙ্গে মিলনের প্রতীক্ষাই যে জীবনের শেষ নৈবেদ্য, এটা জেনেও এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই মিলনের ঘটনাটা যখন ঘটেই যায়, তখন, এই পৃথিবীর মানুষ, আমরা, স্বজন হারানো বেদনায় বিভোর হই। কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারি না এই চলে যাওয়াটাকে।

এমনটাই হয়েছিল মাজহারুল ইসলাম স্যারের বেলায়, তিনি চলে যাওয়ার পর আমরা মন খারাপ করলাম, নতুন করে অনুভব করলাম, তিনি ‘কে’ ছিলেন আর আমরা কোন মানুষটিকে হারালাম। জীবনের          যে-সময়ে তিনি তাঁর সৃষ্টির মহিমায় আমাদের আরও বেশি করে আলোকিত করতে পারতেন, এক অজানা রাজনৈতিক জটিলতায় সেই সময়গুলোতে তিনি বারবার নিগৃহীত হলেন, না-বলা অভিমানে দূরে সরে থাকলেন, একসময় বয়সের বোঝাকে মনের তারুণ্য দিয়ে আটকাতে ব্যর্থ এই সদা-চঞ্চল মানুষটি তিল তিল করে নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকলেন… এই সব কালো মেঘে ঢাকা অসময়গুলোতে আমরা কতজন পেরেছি তাঁর খোঁজখবর নিতে? হয়তো এর সঠিক উত্তর দিতে আজ আমরা সংকোচ বোধ করব। কিন্তু তবু আমরা মন খারাপ করি, সত্যিই মন খারাপ করি।

আমাদের জীবনে তাঁকে পেয়েছিলাম একজন বড়মাপের মানুষ হিসেবে, একজন আধুনিকমনস্ক স্থপতি-স্থাপত্যশিল্পী হিসেবে, স্থাপত্য দিয়ে কাব্য রচনার একজন কবি হিসেবে, অথচ প্রাত্যহিক সান্নিধ্যের মধ্যে আলিঙ্গন না করে তাঁকে আমরা দূরে সরিয়ে রাখলাম নির্বাসনের এক দূরদ্বীপপুঞ্জে। তাই তাঁকে নিয়ে কলম ধরতে গিয়ে অপরাধবোধে বিদ্ধ হই বারবার। অন্য বোধের অন্যরকম বিশেষ মানুষগুলোর প্রতি এহেন ব্যবহার কবে ঘুচবে, কে জানে! মূল্যবান এক একজন মানবরত্ন চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পর আমরা জহুরি হয়ে তাঁদের মূল্য কষতে টানাটানি শুরু করি, এই নিয়ম থেকে আজো যে বের হতে পারলাম না, এটাই দুঃখ।

কারো কাছে মজুভাই, কারো কাছে ইসলাম সাহেব বা ইসলাম স্যার আবার কারো কাছে শুধুই স্যার (যেন এই সম্বোধনটা শুধু তাঁকেই মানায়), ৮৯ বছর বয়সের এই চিরনবীন মানুষটি কাঠের বাক্সবন্দি হয়ে তাঁর পঞ্চাশোর্ধ্ব সন্তানের লাল ইটের দেয়ালঘেরা খোলা বারান্দায় শেষবারের মতো এসে পৌঁছালেন নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা দেরিতে। সেদিন ঢাকার রাস্তা যানজটে জর্জরিত। তাই ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে চারুকলার মধ্যবর্তী পথ আরো বেশি দীর্ঘতর। মনে পড়ল রাস্তা ও গাড়ির মাপের অনুপাত নিয়ে স্যার  মন্তব্য করেছিলেন, বলেছিলেন, ‘রাস্তা ডিজাইন করা হয়, কিন্তু কী গাড়ি চলবে, তার কোনো চিন্তা নেই! ডাবল ডেকার বাস চওড়ায় ১০-১১ ফুট, অথচ দুটো গাড়ির জন্য রাস্তা করা হয়েছে ১৫ ফুট, কীভাবে যাবে দুটো বাস?’ নিজের দেশের প্রতিটি ইঞ্চিকে স্থাপত্যশিল্প আর যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে সাজানোর স্বপ্ন লালন করে যে-মানুষটি কাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন, তাঁর মাথায় এমন শত শত উত্তরবিহীন প্রশ্ন গুমরে গুমরে ধাক্কা খেত। আষাঢ়ের শেষ সকালে এমনভাবেই ধাক্কা খেয়েছিল সন্তানসম চারুকলার সামনের মুক্ত প্রবেশ বারান্দার গোলাকার কলামগুলো, কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না পিতার এই অবধারিত অন্তর্ধান, তাই শোকবার্তা লেখা কালো ব্যানারটিকে দড়ি দিয়ে কলামের চারদিকে আটকানোর চেষ্টা, দড়িটাকে ছিঁড়ে দিয়ে বারবার ব্যাহত করে দিচ্ছিল সে, থমকে যাচ্ছিল বারবার। কিন্তু আর সবার মতো কঠিন বাস্তব তো একসময় মেনেই নিতে হয়! তাই কালো ব্যানার টাঙানো হয়ে যায় একসময়।

এর আগে স্যারের এই বিদায় আগমনের আয়োজনকে পরিপূর্ণ করার জন্য স্থাপত্যের কিছু ছাত্রছাত্রীর ভিড় জমানো আর ছোটাছুটি দেখে মনটা ভরে যায়, এই ছেলেমেয়েগুলো স্যারকে কখনো সামনাসামনি দেখেনি, তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগও তাদের হয়নি। অথচ চারুকলা-চত্বরে ভিড় জমবার অনেক আগেই তারা এসেছে, স্যারকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে, তাঁকে এক নজর দেখতে। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, কেউ ছুটছে ব্যানারের কালো কাপড় আনতে, কেউবা মন্তব্য খাতা। স্যারের প্রত্যক্ষভাবে না পাওয়া অভিভাবকত্বের গভীরতা যেন তাদের অন্তরকে স্পর্শ করেছে এক বিনা সুতার বন্ধনে, তাঁর অদৃশ্য হাত যেন তাদের মাথার ওপর। এই ডাক তো কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।

নরম রোদেলা সকাল গড়িয়ে মধ্যাহ্ন উঁকি দিচ্ছে। স্যারের ডিজাইনে গড়ে ওঠা আর্ট কলেজ বা আজকের চারুকলা ইনস্টিটিউশন ততক্ষণে স্থপতি, স্থাপত্যের নবীন ছাত্রছাত্রী, শিল্পী ও সুধী সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিবিদ-আপন পরিবার-পরিজনের ভিড়ে অস্থির… শেষবারের মতো আসবেন এই অসাধারণ ভবনের অসাধারণ স্থপতি – যার পেনসিলের অাঁকিবুঁকিতে কাগজে আর কলমের দক্ষ অঙ্কনে ট্রেসিং পেপারে মূর্ত হয়ে উঠেছিল মুক্তির প্রতিভূ এই খোলামেলা আধুনিক ভবন। অবশেষে, সকলের অপেক্ষার সমাপ্তি টেনে এলেন স্যার, বন্ধ চোখ দুটি আর মেলে দেখলেন না তার কফিনের ওপর উপচেপড়া মানুষের কাতারের মাঝে অগণিত ভক্ত, পরিচিত কিংবা অপরিচিত মুখগুলোকে, স্নেহভরে তার দুটি হাত স্পর্শ করল না তার প্রিয় ভবনের দেয়ালগুলোকে। হয়তো তখন তিনি অন্য পারে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত অথবা মুচকি হাসি হেসে তৃতীয় নয়নে দেখছেন, কীভাবে অনেক শিষ্য আর ভক্তের মাঝে আরো অনেকে এসেছেন যাঁরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে শেষ বিদায় দিতে নয়, বরং রাজনীতির  ব্যানার নিয়ে কফিনে কে আগে ফুল দিতে পারেন, সে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। বিখ্যাত মানুষগুলোর মহাপ্রয়াণে এমনটিই বোধহয় এ-জগতের নিয়মে স্বাভাবিক। কিন্তু মরণের পর এ-জগতে ফিরে আসার ক্ষমতা থাকলে স্যার হয়তো এহেন ঘটনার প্রতিবাদ করতেন সবার আগে। রাজনীতি তিনি পছন্দ করতেন, নিজেও জড়িয়েছিলেন; ন্যাপের  (মোজাফ্ফর) মাধ্যমে বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দলের পরিসরে নিজেকে কখনো সীমাবদ্ধ রাখেননি।  দল-মত নির্বিশেষে দেশের জন্য, স্বাধিকার আন্দোলনের প্রয়োজনে, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় কখনো মিছিলের অগ্রভাগে, কখনো গোপন মিটিংয়ের আয়োজনে, কখনো বা মুক্তিযুদ্ধের নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে তিনি ছিলেন সদা সক্রিয়। শুধু তাই নয়, দেশের যে-কোনো দুর্যোগে, ত্রাণকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে তিনি সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। এমনই ছিল তাঁর দেশসেবার আন্তরিকতা। এমনই নিবেদিতপ্রাণ ও জীবন সৌন্দর্যে সুন্দর ছিল তাঁর মন।

মুর্শিদাবাদের সুন্দরপুর গ্রামে মামাবাড়িতে ১৯২৩ সালের ২৫  ডিসেম্বর যে-শিশু জন্ম নিয়েছিল, তাকে নিয়ে শিক্ষক বাবা অধ্যাপক ওমদাতুল ইসলাম বা মা জাকিয়া খাতুন কী স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু সুন্দরপুরের এই শিশুটি জন্মকে সার্থক করতে সবদিক দিয়ে একজন সুন্দর, সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে সকলের মন ছুঁয়ে গেলেন, সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের স্বাভাবিক স্বপ্নকেও অতিক্রম করে উঁচু স্তরে পৌঁছে গেলেন তাঁর বহুগুণের সমারোহে।

স্যারের চিরঘুমন্ত মুখটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, সকলের কত আপন একজন মানুষ, অথচ মৃত্যু তাঁকে কত দূরে, কোন অজানার পানে নিয়ে গেল। স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সাহস আর সুযোগ কোনোটাই আমার হয়নি। আমার  জন্মের সময় আমার নানা বেইলি রোডের গুলফিশান সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন আর স্যার থাকতেন একই কলোনির কাহকাশান ভবনে। দুই পরিবারের মধ্যে তখন বেশ আসা-যাওয়া, আমার নানি,          খালা-মামাদের সঙ্গে স্যারের পরিবার সদস্যদের ভারি ভাব; কলোনির ছেলেমেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন তাঁরা। জন্মের পরপর আমি সেই নানাবাড়িতে মায়ের সঙ্গে থেকেছি বেশ কিছুটা সময়। শুনেছি স্যারের মেয়ে, ডালিয়া খালা (তখন অল্প বয়স যাঁর) প্রায়ই চলে আসতেন ছোট্ট শিশু সেই আমাকে একটু দেখত, একটু কোলে নিত। পেছনে ফেলে আসা এই অন্তরঙ্গ আলাপের জের ধরে স্যারের বাসায় আসা-যাওয়া করতেই পারতাম, কিন্তু কেন জানি হয়ে ওঠেনি। আমার খালাদের কাছে শুনেছি, স্যারের সেই সময়কার সরকারি বাসাও ছিল ছিমছাম করে সাজানো-গোছানো, কোনো আতিশয্য নেই, সিমেন্ট-ফিনিশ মেঝেগুলো আজকালকার টালির মতো ঝকঝক করত। এমনই পরিপাট্যে ভরা ছিল তাঁর চারপাশ। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে কথা বলতে; বেশ সহজ, সুন্দর গোছানো ঘরটি। খালাদের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল।­ এত বছর পরও তেমনটিই; সত্যি কোনো অতিরিক্ত কিছু নেই, কেমন যেন আপন করা একধরনের অন্তরঙ্গতা। স্যার যখন ঘরে প্রবেশ করেছিলেন, তখন সাদা ফতুয়া-পরা চেহারায় অসুস্থতার ক্লান্তি থাকলেও আপাদমস্তকে মার্জিত ভাবের কোনো অভাব ছিল না। বসতে বললেন, থেমে থেমে কিছু কথাও বললেন স্যার, আর বারবার তাগাদা দিতে থাকলেন আমাদেরকে চা-নাশতা দিতে। ওই সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা খুব ভালো না। তিনি কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে থেমে যান, কথা বলতে বলতে ভুলে যান, কিন্তু আতিথেয়তা করতে ভোলেননি।

চারুকলার যেই অবয়বে স্যার মুক্তির মূক-প্রতিভূ সৃষ্টি করেছিলেন, যেই খোলা আঙিনা, বারান্দা বা ঘরগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যেন দুর্লভ সতেজ নিশ্বাস এলোমেলো ঘোরাঘুরি করে নিঃসংকোচে, সেখানেই আজ নিঃশ্বাসবিহীন দেহে তিনি শেষ কিছু সময় কাটাচ্ছেন… স্যার কি পারছেন এই মনখারাপ করা চারপাশকে অনুভব করতে? দেখতে কি পাচ্ছেন প্রিয়জনদের হৃদয়ের নীরব অশ্রুর পাশাপাশি আঙিনার গাছগুলো থেকে সবার আড়ালে ঝরে পড়ছে গাছের পাতা, ফুলের পাপড়ি? আজ সকল কিছু যেন শোকে মুহ্যমান। স্যার যে সকল অনুভূতির ঊর্ধ্বে… অথচ বরাবরই তিনি তো একজন প্রচন্ড অনুভূতিপ্রবণ মানুষ ছিলেন! কোনো কিছুই যে তাঁর মনের দৃষ্টির আড়াল হতো না। সাধারণ মানুষের জন্য যাঁর অনেক ভাবনা, দেশকে যিনি হৃদয়ে ধারণ করে বসান মায়ের আসনে, পরের উপকার করাটাই যাঁর চিন্তা-চেতনা আর কাজের মূলমন্ত্র, তিনি যে অনুভূতিপ্রবণ এক অন্যরকম মানুষ, তাতে আর সন্দেহ কি!

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা করার সুযোগ স্যার কেন পেলেন না, জানি না। এই না পাওয়া আমাদের এক বড় ক্ষতি। তাঁকে কেন্দ্র করে যখন ‘চেতনা’ স্টাডি গ্রুপ গড়ে উঠেছিল, তখন আমি বুয়েটে স্থাপত্যের ছাত্রী, তার ওপর অল্প বয়সে সংসারে জড়িয়ে পড়েছি। মনে মনে খুব ইচ্ছা ছিল ‘চেতনা’র আলোচনা সভায় উপস্থিত থেকে স্যারের কথা শুনব, কিন্তু পড়াশোনা আর সাংসারিক টানাপড়েনের কারণে তা আর কখনো হয়ে ওঠেনি। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁর সান্নিধ্য পেলাম না; বিভিন্ন পত্রিকা, বই প্রভৃতির মাধ্যমে স্যারকে, স্যারের কাজকে জানার চেষ্টা করেছি। সেখান থেকে জেনেছি, কীভাবে সহজ-সরল প্রকাশে আধুনিকতার ছোঁয়া আর প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব তাঁর কাজগুলোকে অসাধারণ করে তুলেছে বারবার।  তিনি নিজে শুধু শিল্পমনা ছিলেন না, সুকুমার শিল্পের সমন্বয়ে তাঁর স্থাপত্য হয়ে উঠেছে অনন্যভাবে সমৃদ্ধ। স্থপতি হিসেবে শুধু দেশে নয়, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছিল তাঁর নামডাক ও সম্মান অর্জন। স্যার ছিলেন সৎ ও সত্যের পথের এক অবিচল কান্ডারি। তিনি ছিলেন পেশায় স্থপতি, মননে শিল্পী, নির্দলীয়ভাবে অন্তর দিয়ে ভালোবাসা একজন দেশপ্রেমিক, মানুষের সমতায় বিশ্বাসী একজন রাজনৈতিক সচেতনকর্মী, সংস্কৃতিমনা এক খাঁটি বাঙালি। ধর্মকে, অন্ধভাবে নয়, বরং জ্ঞানলব্ধ বিশাল এক প্রেক্ষাপটে, বিচার করে সৃষ্টিকর্তাকে কাছে পাবার চেষ্টা করেছেন অন্য বোধে। এমন মানুষ কালজয়ী হয়ে ওঠেন নির্দ্বিধায়। শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়, এমন এক সৌম্য দর্শন অবয়ব নিয়ে তিনি শুধু স্থপতিগুরু ছিলেন না, তিনি যেন আমাদের সকলের অভিভাবক, সকলের বাবা। ঘরে-বাইরে সবখানে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন নতুন নতুন আইডিয়া ভাগ করে নিয়ে, সূক্ষ্ম রসবোধ ও আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা আর সৃজনশীলতার আনন্দে। কিন্তু হাসিখুশিতে মেতে থাকা এই মানুষটির ক্ষোভেরও অন্ত ছিল না; যা কিছু মলিন ও সংকীর্ণ, যেখানে আন্তরিক চেষ্টার অভাবে অদক্ষতা, সামান্যতা, যেখানে অবিচার, সত্যের অপলাপ, তার সঙ্গে স্যারের ছিল জন্মের বিরোধ, সদা আমুদে মানুষটি এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন যোদ্ধা, ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী। যে মনুষ্য সমাজে অসত্য আর অনিয়মের জয়জয়কার, সেখানে এমন মানুষ অবহেলিত হবেন, গঞ্জনা সইবেন – সেটাই বোধহয় প্রথাসিদ্ধ, আর তাই এমন অসামান্য কাজের মানুষটি অভিমানের চার দেয়ালে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। হৃদয় দিয়ে অনুভব করা দেশপ্রেমের শক্তি দিয়ে যা তাঁর দেওয়ার ছিল  দেশ ও দেশবাসীকে, তার অনেকটাই বুঝি তিনি দিয়ে যেতে পারলেন না। আর আমরা বঞ্চিত হলাম আরো অনেক পাওয়া থেকে। দেশকে ভালোবাসতেন ভীষণভাবে। দেশের মূল খুঁজতে, প্রাচীন ঐতিহ্যকে খুঁড়ে আনতে তিনি কখনো চলে গেছেন মাটির গভীরে নিহিত প্রাচীন জ্ঞান-ভান্ডারে আবার কখনো সময়কে ছাড়িয়ে দূরদর্শী হয়ে বিচরণ করেছেন অসীম আকাশে। এভাবে তাঁর শিল্পীসত্তা জেগে উঠেছে স্বভাবসিদ্ধভাবে, যেখানে শিল্প ও শিল্পী, উভয়ের প্রতি মান-মর্যাদা অপরিসীম।

সময় পার হয়ে জানাজার সময় চলে আসে, তবু যেন স্যারকে শেষবারের মতো দেখার জন্য আসা মানুষের প্রতীক্ষা শেষ হয় না। স্যার চলে গিয়ে আমাদের হৃদয়ে আরো বেশি স্থায়ী হয়ে থেকে গেলেন, রেখে গেলেন অনেক দায়িত্ব আর স্বপ্ন দেখবার শক্তি। দেশকে নিয়ে তিনি যেসব ছোট-বড় স্বপ্ন দেখতেন, যেভাবে ভাবতেন কাজ আর চেতনা দিয়ে বদলে দেবেন এ-দেশটাকে, দেশের মানুষের ভাগ্যটাকে, যেন পৃথিবীর বুকে গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে এই দেশের মানুষ বলতে পারে, ‘আমরা বাঙালি, এই আমাদের সোনার বাংলা’… আজ দুই চোখ বন্ধ করে স্যার যেন সেই স্বপ্ন আমাদের চোখে দিয়ে গেলেন। অলিম্পিকের মশালধারীর মতো তাঁর হাতের মশাল দিয়ে গেলেন এই প্রজন্মের স্থপতি, শিল্পী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সর্বোপরি সেসব মানুষের কাছে, যারা মানুষ হিসেবে সৎ ও নির্ভীক, যারা মনেপ্রাণে বাঙালি ও দেশকে ভালোবাসেন অকৃত্রিমভাবে। প্রিয় সন্তান তার পিতাকে হারাল, আমরা হারালাম আমাদের অভিভাবক, স্থপতিগুরুকে, দেশ হারাল মনেপ্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি দেশপ্রেমিক, সাহসী সন্তানকে। কিন্তু স্যারের মতো ক্ষণজন্মা মানুষ কি কখনো হারিয়ে যান? নাকি যেতে পারেন? আকাশের ধ্রুবতারা হয়ে তিনি যে নতুন করে স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোর সঙ্গে হেঁটে পথ দেখাবেন। এটা যেমন স্যারের স্বপ্ন, তেমনি আমাদেরও…