স্থির আনন্দ

লেখক:

sthir-anandaসমরেশ মজুমদার

সোমলতা বলেছিল, ‘আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সুখ হয় না।’ শোভনলাল জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সেকি! কেন?’
‘এই যে দেখুন, কখন ফুড়ুৎ করে কুড়িটা মিনিট চলে গেল অথচ মনে হচ্ছে মাত্র দুমিনিট কথা বলেছি। সাধ মিটিয়ে যদি অনন্তকাল আপনার কথা শুনতে পেতাম।’
সোমলতার কথায় পুলক এল মনে, শোভনলাল গদগদ হলেন, ‘আমার কথা শুনতে তোমার ভাল লাগে?’
‘খু-উ-ব। কখনো মনে হয় ঝরনার পাশে বসে আছি, কখনো মনে হয় মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছি। অনায়াসে প্রতিটি শব্দে রুচির মোড়ক লাগিয়ে দেন। আমার কাছাকাছি বয়সের কোনো পুরুষের এই যোগ্যতা নেই।’ হাসলেন শোভনলাল, ‘হায়! কথাগুলো যদি বানানো হয় দোষ কি, হিরে বসানো সোনার ফুল সত্যি? তবু কি সত্যি নয়? তবে যদি তোমার এইসব কথা অন্তত কুড়ি বছর আগেও শুনতে পেতাম!’
‘ইস্। আপনি এমন কথা বলবেন না। বয়স তো একটা সংখ্যা মাত্র। তাই না। উঁহু! এইভাবে টেলিফোনে নয়, মুখোমুখি বসতে চাই, সময় দেবেন?’
‘কবে?’
‘আমার তো ইচ্ছে করছে এখনই। না, আপনার কবে সময় হবে।’
‘শনিবারের বিকেলে?’
‘বাঃ। ঠিক রইল বিকেল পাঁচটায়।’ শহরের একটি দামি কফিশপের নাম বলল সোমলতা। শোভনলালের মনে হল, শনিবারের এখনো চারদিন বাকি। এই ভাবনা আপাতত মুলতবি রাখা যেতে পারে।
কিন্তু পরের সকালেই শোভনলালের মনে একটা অস্বস্তি তৈরি হল। হাঁটার সময় জুতোয় চোখা পেরেকের ডগা পায়ের তলায় ঠোকরালে যে অনুভূতি হয় অনেকটা সেই রকমের। কেবলই মনে হচ্ছিল, শনিবার বিকেলে তাকে ওই কফিশপে যেতে হবে। সোমলতার গলা খুব মিষ্টি, হোয়াটসআপে যে-ছবি পাঠিয়েছে তা মনের ভেতরে চলে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল তাকে শনিবারে যেতে হবে।
একটি সুন্দরী, সুভাষিণী যুবতী তাঁর জন্যে নির্জন কফিশপে অপেক্ষা করবে জেনে প্রথমে যে রোমাঞ্চ তৈরি হয়েছিল তা
ধীরে-ধীরে মিইয়ে যাচ্ছিল। অথচ জীবনানন্দ তাঁকে বিষণ্ণ সুখের সন্ধান দেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রতিটি দিনের অক্সিজেন জোগান। যখনই তিনি এঁদের ভুবনে পৌঁছে যান তখন তৈরি হয় একের পর এক কৌতূহল। আর সহজেই ভাবতে পারেন, কবে সে শব্দবিহীন পায়ে এসে চোখ টিপে ধরবে হঠাৎ পেছন থেকে। ভাবলেই সুখের ঢেউ ছড়িয়ে যায় ধমনী থেকে ধমনীতে।
এখনো শোভনলালের সঙ্গ পেতে তাঁরা আসেন। অন্তত শোভনলাল সেইরকমই ভাবেন। ধলেশ্বরী নদীর ধারে পিসির দেওরের মেয়ের মুখ কেমন ছিল? ঢাকাই শাড়ি যাকে চমৎকার মানাতো তার সিঁথি কি এখনো সাদা? ভররাতে ঘুমের ছায়ায়-ছায়ায় সেই মেয়ে আসে, চলে যায়; কিন্তু শোভনলাল তাঁর সিঁথিটিকে দেখতে পান না। বরং কামিনী যখন আসে তখন বেশ গুছিয়ে বসে সে। কথা বলে, কত কথা, যে-কথা লাবণ্যও বলতে পারে না। কোনো কোনো মহিলা শুধু নিজের চারপাশে গ– এঁকে তার ভেতর আলো ছড়িয়ে বাস করতে পছন্দ করে। ভালবাসার মানুষের দিকে আড়চোখে চায়, দূরত্ব বাড়ানোই তাদের বিলাস, দুহাতে জড়িয়ে বুকে মুখ রাখতে বড় কুণ্ঠা – ! শোভনলাল ভরপুর থাকেন যখন বনলতা সেন ঠোঁটের কোণে হাসেন। সেই হাসিতে একাকার হয়ে বেঁচে থাকেন শোভনলালের নায়িকারা, যাঁরা বইয়ের পাতা থেকে কখন মনের জমি জুড়ে থেকে গেছেন।
ওইসব নারী যাঁদের কথা মনে এলেই বুকের ভেতর নবীন আকাশ তৈরি হয়ে যায় আপনাআপনি, তাঁদের সঙ্গে সোমলতার কোথাও কি মিল নেই? যদি আগামী শনিবারের বিকেলে ওই কফিশপে বনলতা বা কামিনী তার জন্যে অপেক্ষা করবেন বলে তিনি জানতেন তাহলে কি উৎসাহের ঢেউ আকাশ ছুঁয়ে যেত না?
পরের দিন। যখন আর দুদিন বাকি, তখন শোভনলালের মনে হল, বোধহয় হত না। প্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে তিনি বসবাস করে আসছেন প্রায় পঞ্চাশ বছরের ওপর। তাঁরা তার রক্তে মিশে গেছেন একটু-একটু করে। এখন তাঁদের কথা তিনি অভ্যেসে ভাবেন। ব্যবহার করা প্রিয় বিছানায় যেতে যে-আরাম, প্রিয় কলমে দীর্ঘকাল লিখে যে-স্বস্তি, ওঁরা তেমনি তার অভ্যেসের আনন্দে চলে এসেছেন। প্রথম পাঠের চমক ধীরে-ধীরে নতুনত্ব হারিয়ে আটপৌরে ঘরের লোক হয়ে গেছে। প্রথম চুম্বনের রোমাঞ্চ বেশি বছর থাকে না কিন্তু সেকথা ভেবে টইটম্বুর হওয়া যায়, সে আছে এটা জেনেই তো অঢেল তৃপ্তি। সোমলতা কাছে গেলে তাকে মাথা নুইয়ে কাছাকাছি হতে হবে। দীর্ঘাঙ্গ সুপুরিগাছকে দড়ি দিয়ে টেনে নিম্নমুখী করতে হবে বকুলের ঘ্রাণ দিতে। কিন্তু সেই বাধ্যবাধকতার বাঁধন যদি আনন্দেরও হয় তাহলে তা নিশ্চয়ই নির্মম আনন্দের।
শুক্রবারে সোমলতার ফোনের শরণাপন্ন হলেন শোভনলাল। কণ্ঠস্বরে ঘন বর্ষা ফুটিয়ে বললেন, ‘শরীর খুব কাহিল, বেদম জ্বরে শয্যাশায়ী, কী যে করি!’
‘একি! জ্বর বাধালেন কী করে?’ উদ্বিগ্ন সোমলতা।
‘আমি কি বাধালাম? বেধে গেল।’
‘ডাক্তার দেখিয়েছেন? ওষুধপত্র? আমি কি যাব?’
‘দেখিয়েছি। এটা নাকি ভাইরাল ফিভার। ভালো হয়ে গেলে সেরে যাবে!’
‘সত্যি! কী কথা শোনালেন। ঠিকঠাক ওষুধ খাবেন। যাক, কাল আর বেরুতে হবে না। আপনার জ্বরপোড়া মুখ নিশ্চয়ই অন্যরকম কিন্তু এখনই ওই মুখ দেখতে চাই না। আমি পরে ফোনে খবর নেব। রাখছি।’
রিসিভার রাখতেই শোভনলাল খুব অবাক হলেন। একি? তাঁর ভেতরে জমে-জমে ওঠা অস্বস্তিগুলো এক পলকে উধাও হয়ে গেল? কী রকম হালকা, স্বচ্ছন্দ লাগছে। মনে হচ্ছে এক মুহূর্তে তিনি মুক্ত হয়ে গেছেন। কেন? কেন এমন লাগছে তার? চোখ বন্ধ করতেই রবীন্দ্রনাথের মুখ। শোভনলালের ঈশ্বর। সাতষট্টিতেও যাঁর হৃদয়ের একূল-ওকূল দুকূল ভেসে গিয়েছিল ঠিকঠাক নদীর পাশে পৌঁছে যাওয়ায়। আচ্ছা, তাঁর বয়সে পৌঁছানোর পর রবীন্দ্রনাথ কি সোমলতাকে এড়িয়ে যেতেন? এড়িয়ে গিয়ে নিজেকে ভারমুক্ত মনে করতেন?
হঠাৎ মনে এল তাঁদের কথা, যাঁরা এককালে সংসার ছেড়ে হিমালয়ে চলে যেতেন ঈশ্বরের সাধনায় মত্ত হতে। তাঁদের সন্ন্যাসী বলা হত। কিন্তু এমন কোনো সরকারি বা বেসরকারি তথ্য জানা নেই যা থেকে হদিস পাওয়া যেতে পারে আজ অবধি কত মানুষ হিমালয়ে সন্ন্যাসী হতে চলে গিয়েছেন। সেখানে তাঁদের জীবনযাপন কী রকম ছিল? মাথার ওপর ছাদ, প্রচ- ঠান্ডায় উত্তাপ এবং দিনে অন্তত একবার খাদ্যের দরকার অবশ্যই হত। প্রথম দুটোর ব্যবস্থা যদিও বা হতে পারত কিন্তু খাবার, খাবার কোথায় পেতেন তাঁরা? হিমালয়ের ওপরে যে অরণ্য সেখানে দু-এক মাস খাওয়া যায় এমন ফল পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারত কিন্তু বাকি মাসগুলোয় তো খেতে পেতেন না তাঁরা। হিমালয়ে যেসব অভিযাত্রী গিয়েছেন তাঁরা এইসব সন্ন্যাসীর জীবিত অথবা মৃতদেহের কঙ্কাল দেখতে পাননি। তাহলে কি তাঁরা হিমালয়ে সন্ন্যাসী হতে যাননি? তাঁরা কি হরিদ্বার বা ওই অঞ্চলের আশ্রমে বাকি জীবন কাটিয়েছেন সংসার ত্যাগ করে? পঞ্চাশের পর বনবাসে যাওয়ার উপদেশ দেওয়া হত! এই বনবাস কি কোনো সংসারত্যাগীদের আশ্রম?
কিন্তু একসময় এই পাগলামি বন্ধ হয়। শোভনলাল লক্ষ করেছেন কোনো নারী সন্ন্যাসিনী হতে হিমালয়ে চলে যাননি। হয়তো নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন তাঁরা। তাঁদের কেউ-কেউ সংসার ত্যাগ করে মঠ বা আশ্রমে গিয়ে থেকে একসময় সন্ন্যাসিনী হয়ে গিয়েছেন। অর্থাৎ যাঁরা সংসার ত্যাগ করেছেন তাঁরা জীবন থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। জাগতিক সমস্যার ভার কি তাঁদের পক্ষে বেশি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল?
এই যে তাঁর মনে ছায়ার পাখি হয়ে সেইসব নায়িকা উড়ে বেড়ান, কৈশোর থেকে তাঁরা তাঁকে সঙ্গ দিয়ে চলেছেন, জেনে গেছেন আমৃত্যু তাঁরা সেতু বেঁধে থাকবেন। কিন্তু জীবনের জটিল জলস্রোত থেকে ছিটকে উঠে আসা রুপোলি ফসল, যার নাম সোমলতা, তাকে গ্রহণ করতে এত দ্বিধা কেন? গ্রহণ মানে তো অর্জন। তাঁর বাস্তবের একাকিত্ব এক লহমায় দূর করে দিতে পারে সোমলতা।
শনিবার সকালে নিজের সঙ্গে লড়াই করে জিততে চাইলেন শোভনলাল। কিংবা, সেই গানের লাইন স্মরণ করে এমনও বলা যেতে পারে, আমি তো হার মেনেই আছি, সোমলতা, দেখি তুমি জয় করো কী করে। সংসারত্যাগী সেইসব অলৌকিক সন্ন্যাসীর মতো নিজের নিশ্চিত গ– থেকে বেরিয়ে সোমলতার কাছে পৌঁছানো তো আর এক রকমের হিমালয়যাত্রা। পঞ্চাশ পার করার পর যে-বনযাত্রা তার আর এক নাম যদি সোমলতা হয়, তো হোক না।
দুপুর একটায় ফোন করলেন শোভনলাল। সোমলতার মোবাইলের সুইচ অফ করা আছে। শোভনলাল হাসলেন, এ যেন সেই ঠিক ‘দুপ্পুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলা’ হয়ে গেল। ভূত ঢেলা না মারুক, ঘাড়ে না চড়লে কথা নেই বার্তা নেই, মাঝদুপুরে ফোন করে? অবশ্য করে কী রকম রোমাঞ্চ লাগছে। প্রথম লুকিয়ে চরিত্রহীন পড়ার মতো, বন্ধুদের সঙ্গে বসে মুখ নিচু করে সিগারেটে একটা টান দেওয়ার মতো অন্যায়ের স্বাদ নেওয়া।
দুটোর সময় ঝনঝনিয়ে উঠল শোভনলালের মোবাইল ফোন। হাত বাড়িয়ে যন্ত্রটা তুললেই পর্দায় নাম দেখলেন, সোমলতা। এই বয়সেও গলার স্বর নবীন করে জানান দিলেন শোভনলাল।
‘একি! জ্বর কি বেড়ে গেছে?’ সোমলতার গলায় রাশিরাশি উদ্বেগ।
‘না। কাল জ্বর চলে গিয়েছে।’
চিলতে হাসি সোমলতার গলায়, ‘কোথায় গেল?’
‘বাঃ, সুন্দর প্রশ্ন।’ মনে-মনে মাথা নাড়লেন শোভনলাল।
‘হুঁ! হঠাৎ আমাকে মনে এল?’
‘আজ বিকেল পাঁচটায় কফিশপে -!’
‘ইস্স্।’ প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সোমলতা।
‘মানে?’
‘জ্বর তাই আসা হবে না শুনে আমি যে রাজি হয়ে গেলাম। মা-বাবা-ভাই মাসির বাড়ি। আমি থেকে গিয়েছি পাহারায়।’ সোমলতা বলল।
‘তাহলে তো -!’
‘বারে! আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করলে এই বাড়িতে চলে আসা যেতে পারে। ওরা রাত্রের খাবার খেয়ে ফিরবে।’ নিজের বাড়িতে পৌঁছাবার পথ বলে দিলো সোমলতা।
মোবাইল রেখেই ঢোঁক গিললেন শোভনলাল। তারপরেই নিজেকে শাসন করলেন। ভীরুরা কখনো জগতের দায়িত্ব পায় না!

দরজা খুলল সোমলতা, হেসে বলল, ‘আসুন, আমার কী ভাগ্য!’
‘এভাবে বলো না।’ পা বাড়ালেন শোভনলাল।
দরজা বন্ধ করল সোমলতা। তারপর যত্ন করে সোফায় বসাল শোভনলালকে, ‘কফি করে নিয়ে আসি?’
‘না। এখন থাক।’ হাত নাড়লেন শোভনলাল। তারপর তাকালেন সোমলতার দিকে।
‘কী দেখছেন?’ সোমলতার চোখে কৌতুক।
‘কিছু না।’
‘কিছুই না?’
‘দেখে থৈ না পাওয়ার চেয়ে দেখতে না পাওয়াই তো সংগত!’
‘এই যে আপনি এলেন, দেখা পেলাম, এই দিনটা আমার সম্পদ হয়ে থাকবে।’
‘তারপর?’
‘তারপরের কথা আমি ভাবতে চাই না।’
‘ভাল। কদিন ধরে আমি ভেবে চলেছি, তোমার দেখা কেন বিশ-পঁচিশ বছর আগে পেলাম না! খুব আফসোস হয়!’ শোভনলাল সত্যি কথা বললেন।
‘কেন?’
‘এখন তো আমার জীবন প্রায় সন্ন্যাসীর মতো।’
‘আপনার গলায় আফসোস? আমার ভাল লাগছে না।’ সোমলতা চলে এল শোভনলালের পাশে। তারপর তার কাঁধে মাথা রাখল আলতো করে। শোভনলাল অনুভব করলেন ধীরে-ধীরে চাপ ভারী হচ্ছে।
আহা রোমাঞ্চ, একি রোমাঞ্চ! প্রবল সুখের ঢেউয়ে দুলছেন শোভনলাল, আবেগে তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে গেল। এই মুহূর্তে কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে দেখা না হওয়ার আফসোস উধাও হয়ে গিয়েছে। পাশ ফিরে দুহাতে সোমলতার মুখ তুলে ধরলেন তিনি। সোমলতা মাথা নাড়ল।
তারপর করুণ গলায় বলল, ‘না, আমি কষ্ট পেতে চাই না। আপনিও কষ্ট পান তা আমি চাই না।’ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উলটোদিকের সোফায় বসল সোমলতা, ‘তার চেয়ে আপনি কথা বলুন। আপনার কথা শুনতে এত ভালো লাগে, এমন অভিজ্ঞতা কখনো আমার হয়নি। কিন্তু’ – উঠে দাঁড়াল সোমলতা, ‘দেখছেন, আমি কি খারাপ হোস্ট, আপনাকে এক গ্লাস জল দিতে ভুলে গিয়েছি। এক মিনিট -!’ দ্রম্নত ভেতরে চলে গেল সে।
ঢোঁক গিললেন শোভনলাল। সোমলতার শরীরের গন্ধ, স্পর্শ তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখলেও শরীর যে শীতল থেকে শীতলতর হয়ে যাচ্ছে। শোভনলাল আবিষ্কার করলেন, তাঁর শরীরের ভেতরে ঘুম-ঘুম ভাব ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আর তখনই জল নিয়ে ফিরে এল সোমলতা। ‘একি! আপনি উঠলেন কেন?’
‘আমার খুব শীত করছে -।’
‘সেকি! আবার জ্বর আসছে নাকি!! এই শরীর নিয়ে কেন যে আপনি বের হলেন। দাঁড়ান, আমি ট্যাক্সি ডেকে দিই।’ সোমলতা এগিয়ে এসে কপাল ছুঁতে চাইল। শোভনলাল সরে দাঁড়ালেন।

ট্যাক্সিতে বসে শোভনলালের মনে হল সোমলতা সত্যি কথাটা না জেনে বলে ফেলেছে। এই শরীর নিয়ে তার আসা উচিত হয়নি। তিনি যে নায়িকাদের স্বপ্ন দ্যাখেন তাদের তো মাটিতে পা পড়ে না। তিনি তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেই চলেছেন কিন্তু বোঝেননি, মনে যতই উত্তাপ জমুক শরীর হিমে মুড়ে যাচ্ছে। এই শরীর নিয়ে এখন শুধু বেঁচে থাকা। সন্ন্যাসীদের মতন, মনের বাগানে খেলা করে যাওয়া। তফাৎ একটাই, তাঁকে সংসারেই থেকে যেতে হবে। 