স্বপ্নের সারস ওড়ে সুবর্ণপুরাণে

লেখক:

পারভেজ হোসেন

দুনিয়া ঘুরে এসে সুবর্ণগ্রামের মাটিতে প্রথমবারের মতো পা রাখলেন ভিন্ন দুটি সংস্কৃতি থেকে আসা দুই পর্যটক ইবনে আল আসাদ আর ফ্রান্সিস নাহিয়ান। একজন মরক্কোর মুসলমান, অন্যজন পর্তুগিজ খ্রিষ্টান হলেও বসবাস মালাক্কায়। জাহাজেই পরস্পরের পরিচয়। জাহাজেই তাদের বন্ধুত্ব। একুশ দিন একটানা জলে কাটিয়ে ডাঙায় নামতেই বিস্ময়ে ভরে উঠেছে তাদের চোখ, ঐশ্বর্যময় বন্দরের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেছে মন।

এদেশীয় এবং ভিনদেশি নাবিক-বণিক আর কুলিদের ভিড়ে মোগরা বন্দর হইহই করছে। ঘাট পেরিয়ে বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সুবিশাল সব ইমারত, প্রকা- বাজার আর দূরে প্রশস্ত রাজপথের ওধারে ফোয়ারার জলে বিকেলের নুয়ে পড়া সূর্যের শেষ আভার ঝিলিক চোখে পড়ে।

ঘোড়ার গাড়িগুলো কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে সম্মুখে নগরকেন্দ্রের দিকে ছুটছে। গলার ঘণ্টায় টুং-টাং শব্দে পথচারী সতর্ক করে মাহুতের নির্দেশে হেলেদুলে চলছে নানা কারুকাজখচিত হাওদাবাহী কয়েকটি হাতি। এরই মধ্যে মাথায় বা কাঁধে বোঝা নিয়ে পথ চলছে মানুষ। এত কোলাহল, এত ব্যস্ততা তবু কোথায় যেন এক অদ্ভুত প্রশামিত্ম নিয়ে প্রাচ্যের এ-নগরী রহস্যময় হয়ে উঠেছে।

ঘাট ছেড়ে চবুতরা বা কাস্টম অফিসের খাতায় নাম লিখিয়ে পরিচয়পত্র পাওয়ার পর এখন তারা এগিয়ে চলেছেন আপাতত বিশ্রামের জন্য কোনো পান্থশালা যদি পাওয়া যায়, তারই খোঁজে।

মূল রাস্তা ধরে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে এমনভাবে হাঁটছেন যেন চোখের পাতায় স্বপ্নে পাওয়া কোনো নগরের ছবি ভাসছে। অনেকটা পথ এগোতেই যথেষ্ট সন্দেহ নিয়ে উর্দি পরা দুই প্রহরী বেসামাল ঘোড়ার রাশ টেনে এগিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়, জিজ্ঞেস করে, মহাশয়, আপনারা এই নগরে কি প্রথম?

একটু থতমত খেয়ে নাহিয়ান বলেন, জি হ্যাঁ, আমরা পরিব্রাজক, বহু পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। আপাতত বিশ্রামাগারের খোঁজে আছি।

সৈনিক দুজন অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে কুর্নিশ জানায়, আমাদের নগরে সুস্বাগত। তারপর একটু দূরে জাফরি ইটে তৈরি একটি খয়েরি অট্টালিকার দিকে আঙুল তুলে বলে, ওটিই বন্দরের অতিথিশালা। আপনারা গিয়ে ওখানে

বিশ্রাম নিতে পারেন।

সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি নেই। বহু দূরে নহবতখানার ঢং-ঢং ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠে। আর না দাঁড়িয়ে প্রহরীদ্বয় অশ্বপৃষ্ঠে চেপে নগরমধ্যে মিলিয়ে যায়।

 

পান্থশালার নোকর-বাকরের সেবাযত্নে দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লামিত্ম যেন আরো গাঢ় হয়ে চেপে বসেছে এখন। কিন্তু শুধু বিশ্রামে সময়ক্ষয় পরিব্রাজকের কাম্য হতে পারে না। তার ওপর রাত্রির অন্ধকার ফুঁড়ে হাজারো আলোকমালায় জ্বলজ্বল করছে পানাম। পোতাশ্রয়ে নোঙর করা জাহাজগুলোর আকাশচুম্বী মাস্ত্তলের ওপারে জেগে-ওঠা চাঁদ জোয়ারের নিস্তরঙ্গ জলেই শুধু ছায়া ফেলেনি, নগরজুড়ে কোমল আলোর মসলিন বিছিয়েছে যেন। ধূলিধূসর রাজপথে ক্ষেপ্র ঘোড়সওয়ার আর আমির-ওমরাদের নিয়ে পাইক-বরকন্দাজের হাঁকডাকে দিনের পানাম একেবারে পালটে গেছে। পান্থশালা খালি করে অনেকেই তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়েছে এখন। আবু আসাদ আর নাহিয়ানের মনে খটকা লাগে, রাত গভীর হতে না-হতেই এরা যাচ্ছে কোথায়? পান্থশালার আরাম কেদারায় এলিয়ে দেওয়া আলস্য ভেঙে নগরের রাস্তায় নেমে পড়েন তারা।

 

শাহ কড়োরি বা কর আদায়কারীর বাসভবন ছাড়িয়ে পূর্ব-দক্ষিণমুখী রাস্তা ধরে কিছুটা নির্জনে হাঁটতে থাকেন দুই বন্ধু। সামনেই নহবতখানা, অর্থাৎ সময় জানাবার ঘর। দ্বিতল এই ঘরটির ওপরতলায় মস্ত এক পেতলের ঘণ্টা বা নহবত ঝুলছে। পাশেই ঝোলানো আছে গোবদা একটা মুগুর।

এখানের সময় বিভাজনটা এরকম : দিন ও রাত মিলে হয় মোট আট প্রহর। চার প্রহর দিন, চার প্রহর রাত। আবার আট ঘড়িতে হয় এক প্রহর। এই প্রহর মাপার জন্য নহবতখানার নাদার জলে ভাসিয়ে রাখা আছে তলায় নির্দিষ্ট মাপে ফুটো করা একটা ঘটি। ওই ছোট্ট ফুটো দিয়ে জল ভরে-ভরে ঘটিটা যখন ডুবে যাবে, তখনই সময় এক ঘড়ি পূর্ণ হবে। এভাবে চলতে-চলতে আট ঘড়িতে হবে এক প্রহর।

নহবতখানার ঘণ্টায় নহবত-বাদকেরা পালা করে দিন-রাত বিশেষ ঢঙে আটবার ঘণ্টা পেটাবার পর অনবরত কিছু পিটুনি দিয়েই একেক প্রহর পুরো হওয়াকে জানান দেয়।

একটু এগিয়েই টাঁকশাল আর খাজাঞ্চিখানার প্রশস্ত দেয়াল। ডানে নির্জন মাঠে একখানা বড় কালো পাথরের উঁচু বেদি। তার ওপর মাথাতোলা আরেকখানা কালো পাথরের কারুকাজে গড়া বাংলার লোকপ্রসিদ্ধ স্বাধীন শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের কবর। পারস্যের কবি হাফিজের বন্ধু ছিলেন তিনি। চরিত্রবান, বিদ্যোৎসাহী এ-মানুষটি গজলও লিখতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যে-মানুষটি তাঁর শাসনামলে প্রজাকল্যাণ ছাড়া আর কিছুই ভাবেননি, তিনি কিনা সিংহাসনে বসেই সৎভাইদের চোখ উপড়ে রেকাবি ভরে বিমাতার কাছে পাঠিয়েছিলেন! তার কবরের শিয়রে বেলে পাথরের চেরাগদান জ্বলছে। বেদির কার্নিশে বুটাদার অলংকার। আরো নিচে সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম কারুকাজ। তার নিচে শিকল দিয়ে ঝোলানো প্রতিটি কুলুঙ্গিতেও জ্বলছে প্রদীপ। বাংলায় কালো পাথরের ব্যবহার তেমন নেই। এটিই এক ব্যতিক্রম।

বাঁদিকে শিবমন্দিরের চূড়ায় নিশান উড়ছে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে চন্দনপোড়া ধোঁয়ার মিষ্টি গন্ধ আর ছোট্ট ঘণ্টির একটানা আওয়াজ। দেয়াল এত উঁচু যে, ভেতরে উঁকি দেওয়ার উপায় নেই। বোঝা যায়, পুজোয় নিমগ্ন আছেন পুরোহিত। কাছের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে গলাভাঙা মোয়াজ্জিনের এশার আজান।

 

এতক্ষণে চাঁদ পশ্চিমের নগরপ্রাচীরঘেঁষা বাঁশঝাড়ের মাথায় উঠে পড়েছে। বেঘোরে আলোয়-অন্ধকারে হাঁটতে-হাঁটতে প্রায় পাঁচ-ছয় ক্রোশ দূরের নির্জনে চলে এসেছেন এরা।

ওই তো সুফি সাহিত্যের সাধক প–ত শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার খানকা শরিফ আর ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র। প্রায় দুশো বছরের ভবনগুলোকে যথেষ্ট মস্নান মনে হচ্ছে আবু আল আসাদের। তাওয়ামার সমাধিও এদিকে থাকবে কোথাও – দেয়ালের বাইরে থেকেই চারদিকটায় উঁকি দিয়ে খুঁজতে লাগলেন তিনি। বললেন, তাওয়াসার-রচিত সুফি মতবাদের বিখ্যাত গ্রন্থ মঞ্জিলে মাকামাতের খবর কে না জানে বন্ধু। আর তার এই ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রে বিদ্যার্থীদের উদ্দেশে যে-জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিতেন, সেই বক্তৃতামালার সংকলন নামে-ই-হকও সমান গুরুত্বপূর্ণ রচনা। বুঝলেন, চিন্তায় মহাজ্ঞানী ওই মানুষটি কথোপকথনেও ছিলেন সরল কৃষকের মতো। সুফিতত্ত্বের গভীর জ্ঞানগুলোর কথা সাধারণের জীবনযাপন দিয়েই ব্যাখ্যা করতেন। সে-কারণেই বোধ করি এই জলাদেশের নরম-কোমল মানুষগুলোর কাছ থেকে আর নড়েননি তিনি। ওদের মধ্যে মিলিয়েছিলেন। তার সুবাদে সুফি কবি-দার্শনিকদের মিলনমেলা বসত এখানে। এখন কী হালে চলছে কে জানে – বলতে-বলতে আবু আসাদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়েন। বিমূঢ়ের মতো নাহিয়ানও ভরা চাঁদের আলো-ছায়ায় এই আশ্চর্য সঙ্গীর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবেন, গোটা দুনিয়ার সবকিছুই কি মুখস্থ নাকি ওর? পরপরই মনে হলো, এখানটায় দাঁড়িয়ে দিল যেন একেবারে কাদা হয়ে উঠেছে আসাদের। বিড়বিড় করে বলছেন, হানাফি ধর্মতত্ত্ববিদ, হাদিসবেত্তা, রসায়নবিদ, প্রকৃতিবিজ্ঞানী কী ছিলেন না বোখারার এই মহান মানুষটি। আর তাঁর লেখার কী যে ভক্ত ছিলেন আমার দাদু আবু ইবনে আল আববাস! পারস্য আর আরবের বন্দরে-বন্দরে ব্যবসা করতেন দাদু। জ্ঞানপিপাসাও ছিল অসীম। পর্তুগিজরা যখন মরক্কো আক্রমণ করে, তখন সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গড়ে তোলা তাঁর বিশাল কিতাবখানা জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাষ-রা। ওই ঘটনার পর আর বেশিদিন বাঁচেননি দাদু। বলতে-বলতে আবারো উঁকিঝুঁকি মারলেন; কিন্তু কোনো সমাধির হদিস পেলেন না আর।

 

এদিকের শেষ প্রামেত্ম শানবাঁধানো ঘাটের বড়-বড় দুটো দিঘি ছাড়িয়ে আম-জাম-বেল আর তাল-নারিকেলের বাগান। মুসা খাঁর বাগানবাড়ি বাগে-ই-মুসা। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। পুরো প্রাচীরের গায়ে টেরাকোটা। পোড়া মৃত্তিকার কারুকাজ আর নানা মুদ্রায় নৃত্যরতা নারীমূর্তি।

চারদিকে কোথাও কেউ নেই। ভেড়ানো প্রকা- শাহি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাচঘেরা প্রদীপ আর জোছনার হালকা আলোয় যতটুকু দেখা যায়, দেখে নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারেন না নাহিয়ান, কি অপূর্ব, তাই না? পোড়া মৃত্তিকার হলেও কত খরচ করে যে বানিয়েছে! একেবারে বিশুদ্ধ প্রাচ্যকলা।

তা যা বলেছেন, এ কেবল ভারতবর্ষেই সম্ভব! তবে যে বললেন, একেবারে বিশুদ্ধ, তা কিন্তু নয়। সভ্যতার কিছুই বিশুদ্ধ হয় না, বন্ধু।

মন দিয়ে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছেন আবু আল আসাদ আর মাথা তুলে চোখ নেড়ে-নেড়ে বলছেন, প্রাচ্যের এ-মুলুকের সভ্যতার আত্মা হচ্ছে এর কোমলতা আর শিষ্টতা, যা সর্বদা অন্যের কথা ভাবে। এর হৃদয় বড়ই উদার। যুগ যুগ ধরে অকাতরে নিচ্ছে যেমন, দিচ্ছেও তত। ফলে এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই, এতে দেশি-বিদেশি উপাদানের মিলন ঘটছে প্রচুর। এক অঞ্চলের আলো আরেক অঞ্চলের আলোর মধ্যে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আলো এসে জড়ো হচ্ছে এর প্রদীপে। সেই কোন যুগে হাজার বছরের স্থানীয় জনবসতির জীবনযাপনের মধ্যে এসে মিশে ছিল আর্যদের সৌন্দর্য। পরে আরব, পারস্য আর তুর্কিরা যখন এখানে আসতে শুরু করল, সঙ্গে করে আনতে লাগল তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। নৃত্যের এই যে ভঙ্গিমাগুলো দেখছেন, এ হলো হিন্দুস্থানি আর্যধারা আর এই যে চারপাশজুড়ে নকশা, এগুলো আরবীয় অথবা পার্সিয়ান। পৃথিবীজুড়ে পোড়ামাটির ব্যবহার সুপ্রাচীন

হলেও এখানকার কুমোরদের এই কারিগরিটি কিন্তু খাঁটি বঙ্গাল।

এটুকু বলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন আবু আসাদ। গম্ভীর হয়ে কী যেন ভাবেন একবার। আবার বলতে শুরু করেন, এখান থেকে বিহার, লখনৌ, দিলিস্ন, লাহোর – যেখানেই যাবেন, দেখবেন, সবাই বহন করছে আর্যের উত্তরাধিকার। আবার আরব, পারস্য, তুর্কিরাও তাই। ফলে ওরা যখন এসে এদের সঙ্গে মিলছে, তখন তো দুই অপরিচিতের মিলন ঘটছে না। ঘটছে দীর্ঘ অদর্শনের পর দুই আত্মীয়ের মিলন এমন আত্মীয়, যারা প্রজন্মের দিক থেকে অভিন্ন। হিন্দুস্থানজুড়ে যে-জনপদেই যাবেন, এ-মিলন চোখে পড়বে আপনার।

বলতে-বলতে হঠাৎই যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন আবু আল আসাদ। বললেন, শোনেন নাহিয়ান, আমরা বোধহয় নগরের একটি প্রামেত্ম এসে পড়েছি আর বকতে-বকতে আপনার যথেষ্ট বিরক্তিও ঘটিয়েছি। এভাবে রাত করে নির্জনে ঘোরাফেরা করতে দেখে পাহারাদাররা যদি বিদেশি গুপ্তচর ভাবে আমাদের? কোনো কথা শুনবে না, ধরে নিয়ে যাবে। সে এক ফ্যাসাদ।

কেন, আমাদের তো পরিচয়পত্র আছে। বললেন নাহিয়ান।

ওর কথায় মৃদু হাসলেন আবু আল আসাদ, কাগজপত্র যতই থাকুক, একবার সন্দেহ হলে কাজির দরবার থেকে ফিরে নগর কোটালের ফের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত গারদে পচতে হবে।

নাহিয়ান বুঝি ভয় পেলেন, বললেন, তাহলে চলেন বন্ধু, আজকের মতো পান্থশালায় ফিরে যাই। কাল জাহাজ থেকে মালপত্র ছাড়িয়ে তবে বের হবা।

 

দুই

খালাসিদের হইচইয়ে মোগরাঘাটের ঘুম তখনো ভাঙেনি। কাঠের বিশাল পাটাতনের প্রকা- সব খুঁটির সঙ্গে মোটা-মোটা দড়া দিয়ে বাঁধা জাহাজগুলোকে ঘিরে ছোট-ছোট অসংখ্য নৌকা ঢেউয়ের তালে দুলছে। দূরবিসত্মৃত নদীর অপর কিনার এখনো স্পষ্ট নয়। গরমকালেও সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় আবু আসাদ আর নাহিয়ান গায়ে চড়ানো জোববাজাবিব নিয়ে কিছুটা শীতবোধ করেন। যে-জাহাজে চড়ে ওনারা এসেছেন, তার পাটাতনের খোলে মালখানায় রাখা পেঁটরাগুলো বুঝে নিতে হবে। উপযুক্ত শুল্ক দিয়ে মালপত্র ছাড়াবার হাঙ্গামা শেষ হতে দুপুর হয়ে গেল।

ভাদ্র মাসের তপ্ত রোদের তালপাকা গরমে আলখালস্নার নিচে কাপড় ভিজে গেছে। ঠান্ডা পানীয়ের দোকানে নকশা-তোলা পিতলের সোরাই থেকে রুপার পানপাত্রে ঢেলে দেওয়া পেস্তার শরবতে গলা ভিজিয়ে পাগড়ির খুঁট দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন আবু ইবনে আসাদ। নাহিয়ানও বেজায় ঘামছেন আর পান করছেন। ঘাম আর গরমের তোয়াক্কা না করে অবশেষে মালপত্র কুলির মাথায় তুলে দিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট পান্থশালায় ফিরলেন তারা।

 

কাপড়ের পুঁটলিতে মূল্যবান পাথরের কিছু জিনিসপত্র আছে। ওরা ভাবলেন, এখানকার বাজারে দাম মিলবে ভালো; কিন্তু বণিক ছাড়া আড়তের বাজারে কেউ বেচাকেনা করে না। তাছাড়া এগুলো এখানে বিকোবেও না। এসব জেনে দুই বন্ধু এবার পাইকারি আড়ত ছেড়ে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে নগরমধ্যে ছুটলেন বেচাকেনার উদ্দেশ্যে। মসলিনের নেকাবে ঢাকা পানামের নারীরা যেখানে তাদের বিখ্যাত পণ্যসম্ভারের পসরা সাজিয়ে বসেছে।

এ যে এক অভূতপূর্ব বাজার – নাহিয়ান বলেন।

আবু আসাদের চোখ তো ছানাবড়া।

আবে রওয়াঁ, শাবনাম, মলমল খাস, মলবুল খাস, সরকার-ই-আলির মতো উঁচু দরের খাস মসলিন বাজারে বিকোয় না। তা শুধু বাদশা, সুবাদার, নবাবদের জন্যই বোনা হয়। কিন্তু নয়নসুখ, বদনখাস, সরবুটি, সরবন্দের মতো নানা জাতের মসলিন আর রং-বেরঙের মেঘ-উদুম্বর শাড়ির তো অভাব নেই। আছে চোখ-ধাঁধানো জাফরানি রঙের আলোয়ান, অসাধারণ সব টুপি, কাঁসা-পিতল-চাঁদির বাহারি তৈজস, হাতির দাঁতের তৈরি পাটি, কারুকাজ করা দুর্লভ গয়না, নকশিকাঁথা আর আছে মিহি মসলিনের আড়াল থেকে সুরমামাখা বিপণিবালাদের মদির কটাক্ষ।

আমার অনেক চাই, এসব আমি মালাক্কায় নিয়ে যাব, একেবারে বেহুঁশের মতো কা- করে বসেন নাহিয়ান।

একটু ঘুরেটুরে দেখি, বন্ধু। তারপর না হয় কিনব, হাঁটতে-হাঁটতে বলেন আবু আল আসাদ।

অচেনা কত দেশের কত-না সামগ্রী আর স্থানীয় এতসব পণ্যে বাজারটি যেমন জমকালো হয়ে উঠেছে, তেমনি পারস্য, আর্মেনীয়, গ্রিক এমনকি রো বণিকরাও আছে। তাদের কেনাবেচার শোরগোলে আর দালালদের টানাহেঁচড়ায় কে কোনদিক থেকে কোনদিকে যাবে, বুঝে উঠতেই দিশেহারা একেকজন।

নয়নসুখ আর বদন-খাসের বিপণি পেরিয়ে ছায়াঘেরাবিসত্মৃত এক কালীকড়ই বৃক্ষ। তারই নিচে ছুরি-কাঁচিসহ বিবিধ তৈজসপত্র আর অলংকারের বিরাট ঘরগুলোতেই একসময় ছিল ক্রীতদাস-দাসীদের বেচাকেনা।

তখন ছিল সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহর রাজত্বকাল। প্রায় আড়াইশো বছর আগের ঘটনা। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা এখানের কোনো এক ঘর থেকেই হয়তো স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়েছিলেন অপূর্ব এক রমণী আশুরা আর এক বালক লুলুকে; কিন্তু সেদিন আর নেই। শুনেছি মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁ মানুষ কেনাবেচা একদমই বরদাশত করেননি। কারণ বাল্যকালে তাকে এবং তার ভাইকে কিনে নিয়ে পাঠানো হয়েছিল পারস্যে। তাদের চাচা অনেক পরে উদ্ধার করে আনেন তাদের।

বলতে-বলতে ইবনে আল আসাদের অন্তর ছটফট করে। নাহিয়ানকে তিনি সংক্ষেপে তাদের পর্যটক ইবনে বতুতার দাসী কেনার গল্প শোনান। বলেন, যদি থাকত, আমিও না হয় একজনকে কিনে নিতাম। মরক্কোয় নিয়ে মরুর অপ্সরী বানাতাম তাকে।

বলেন কি বন্ধু, পর্তুগিজ আর মগরা গোপনে বঙ্গালের উপকূল থেকে নিরীহ মানুষ ধরে-ধরে দাস বানিয়ে উৎকৃষ্ট দামে বিক্রি করছে, সে নিয়ে তো জাহাজে বসে এতদিন কত কী বললেন। আমার সঙ্গে কত ক্ষোভ দেখালেন। আর আজ বলছেন থাকলে এক দাসীকে কিনতেন আপনি?

হায় খোদা, আমি কি ওরকম বলেছি? ও তো কথার কথা। আর  আপনি কিনা এই কথাকে এত শক্ত করে জাপটে ধরলেন!

এরই মধ্যে ফারসি ভাষায় পারদর্শী অল্পবয়সী একটি বালক পটিয়ে ফেলেছে ওদের। ছেলেটি দেখতে যেমন সুন্দর, চোখে-মুখে তেমনি বুদ্ধির ঝিলিক। বেশভূষা ও সুরত দেখেই সে অনায়াসে চিনতে পারে কোন লোকটা আরবি আর কেইবা আর্মেনি। চীনা ও আরাকানিদের চেহারার তফাৎ সে যেমন ধরতে পারে, তেমনি পর্তুগিজ, ওলন্দাজদের চিনতেও তার ভুল হয় না। আর কারো সাজগোজের বৈশিষ্ট্যও অজানা নয় ছেলেটির। এমন তালেবর এ-বাজারে আরো ঢের আছে; কিন্তু এটির জাত একেবারে আলাদা। সে-ই ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে সব দেখায় আর বলে, কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধ বাধবে, গোটা মুলুকে তার প্রস্ত্ততি চলছে। সস্তায় সব পাওয়া যাচ্ছে এখন; যদি পারো তো আরো কিছু কিনে নাও।

সত্যি-সত্যি দাম যা পাবে ভেবেছিল, তার চেয়ে অনেক কম দামে ওদের জিনিসগুলো বিক্রি করতে হলো আর কিনলও বেশ কমে।

ইবনে আসাদের কেনাকাটা এত বেশি হয়েছে যে, দুজনে তা বহন করা অসাধ্য। এরই মধ্যে এক ঝাঁকাওয়ালা মুটেকে জোগাড় করে ফেলেছে ছেলেটি। সে-ই মালপত্র ওদের আস্তানায় পৌঁছে দেবে বলে ঠিক হলো।

 

নগরে ঘুরেফিরে কেনাকাটা করে দুদিন কেটে গেছে। নগরের বাইরে গিয়ে ওরা দেখে এসেছে লাক্ষার চরে মোষের লড়াই আর তাড়িখোরদের বেশুমার হুলেস্নাড়। গাঁয়ের পথে, গৃহসেত্মর উঠানে ভিড় করা মানুষের মধ্যে বেদিয়াদের বাঁশবাজি, দড়িবাজি আর সাপ খেলাও দেখেছে।

বর্ষাকাল শেষ। শরতের শুরুতেই বেদিয়ারা গাঁয়ের পথে-পথে রোজগারে নেমে পড়েছে। আশ্চর্য যাযাবরজীবন এই জলবেদেদের। বিশ থেকে পঞ্চাশটি নাওয়ের বহর নিয়ে একেকটি বেদের দল ঘুরে ঘুরে যুগ-যুগ ধরে জলের ওপর কাটিয়ে দিচ্ছে। সে-জল হোক জোয়ারের কি ভাটার, গাঙের কি খালের। জলই জীবন, জলই তাদের ভিটা। জন্ম-মৃত্যু সবই ওই জলের ওপর! এদের নারীরা যেমন বুদ্ধিমতী, কথায়, ভাবে-ভঙ্গিতে তেমনই চতুর। তারা দলবেঁধে পাড়ায়-পাড়ায় বেহুলা-লখিন্দরের গীত গেয়ে সাপের খেলা দেখায়। সাপে কাটা রোগীর বিষ ঝাড়ায় আর বাতের ওষুধ, দাঁতের ওষুধ, বাঁজা মেয়েমানুষের সন্তানবতী হওয়ার ওষুধ বেচে জীবন চালায়। জগতের সেরা হাতসাফাই ওদের আর মুখের ভাষার গড়নটিও তেমন – গাঁয়ের সরল গৃহিণীরা কি তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারে? গাঁয়ের পথে পথে ঘুরে এসবের পরিচয় নিয়ে পানশালায় ফিরল ওরা।

অর্ধরাতে পানশালার আসর ফুরিয়ে এলে বাজাদারের বেসামাল বাজন থেকে ওদের কান রক্ষা পেল যেন। একে-একে চলে যেতে       থাকল নর্তকীরা। নেশায় চুর-চুর গলায় আবু আসাদ নাহিয়ানকে কাছে ডেকে কানে-কানে বললেন, বন্ধু, চার-চারটা বছর আমি হিন্দুস্থানি গানবাজনার মধ্যে কাটিয়েছি। এরা আর কী নাচবে, কী গাইবে এরা, বলুন? যদি যেতেন লখনৌ, এলাহাবাদ কি লাহোর তো দেখতেন! সে এক অভিজ্ঞতা। যদিও এদের অনেকে সেখান থেকেই আসা। আমার প্রাণ ভরেনি, বন্ধু। একদম না। টোকা দিয়ে তৃষ্ণাটা চাগিয়ে দিয়েছে মাত্র।

লাল হয়ে-ওঠা চোখের পাতা দুটো বুজে আসছে তার, তবু বলছেন, এদের নৃত্যগীতে ফুর্তি আছে, মদিরার আমোদ আছে, তার অতিরিক্ত কিছু নেই, যা আপনাকে সম্মোহিত করবে, আপনার চোখে জল এনে দেবে। চোখের জলও তো বৃষ্টি, কী বলেন? তা কজন পারে চোখের জলের বরষাত নামাতে? ঘুঙুরের আওয়াজে নর্তকীর হৃদয়ের রক্ত যদি ছলকে না পড়ে, কণ্ঠের ভাঁজে-ভাঁজে উপচে না যায় যদি মধু, দেহভঙ্গিমায়-মুদ্রায়-চোখের বাণ নিক্ষেপে যদি মনে না হয় এ-স্বপ্নঘোর – কী করে নাচ-গান হলো তবে, বন্ধু? বলে আর লাভ কী, মোগরাঘাট হয়তো তার উপযুক্তও নয়।

নাহিয়ানও তার ক্লান্ত হাত ওর কাঁধে ফেলে বেসামাল পায়ে বেরিয়ে যেতে-যেতে জড়ানো কণ্ঠে ভেঙে-ভেঙে বলেন, কী যে বলেন, বন্ধু। আপনি হয়তো একটু উতলা আছেন। আমার কিন্তু খুব মনে ধরেছে। কী জাদুকরী কণ্ঠ! কী দেহভঙ্গিমা! আহ্, মরে যাই!

 

যুদ্ধ নিয়ে নগরজুড়ে কানাঘুষা কিছু আছে বটে, কিন্তু দৃশ্য তেমন কিছু চোখে পড়েনি তাদের। মসনদ-ই-আলার কোনো ফরমানও জারি হয়নি। তবু আবু ইবনে আসাদের প্রাণ ফরফর করে।

সরাইখানার সুরা, গীত, নৃত্য – কোনো কিছুতেই তিনি আর মন বসাতে পারছেন না। হিন্দুস্থানের ভাটির বঙ্গালে আগমন প্রথম হলেও রাঢ়বঙ্গে থেকেছেন অনেকবার। যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে পড়ে নাজেহালও হয়েছেন। সে-অভিজ্ঞতা আর কাম্য নয় তার। ফলে যে-জাহাজটি কাল সকালে সুতোলার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে, সেটিতে চেপে বসতেই উদ্গ্রীব তিনি। পান্থশালায় মালসাও গোছানো হয়ে গেছে। সুতোলা হয়ে জাহাজ বদলে তবে যাবেন মরক্কোয়। এ-যাত্রায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রায় এক বছর নয় মাস হতে চলল, হঠাৎ করেই বাড়ির জন্য অন্তরে তীব্র একটা হাহাকার বোধ করছেন আবু আসাদ।

তিন

অসংখ্য পরিখা, খাল, দিঘি আর প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সোনারগাঁ নগরের বাইরের গ্রামগুলোও যে কী অপরূপ! প্রকৃতি যেন দুই হাতে ঢেলে সাজিয়েছে। কিন্তু নগরের বাইরের এই জনপদে মানুষেরা নিতান্তই সাধারণ খেটে-খাওয়া তাঁতি, কামার, কুমোর, জেলে, ক্ষেত্রকর।

পঙ্খিরাজ খালের ঝুলন্ত সেতু পার হয়ে অনন্তমুসা মৌজার কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে নাহিয়ান দেখেন, রাস্তার দুই পারে দিগন্তবিসত্মৃত ঘন সবুজ কার্পাস তুলা আর ধানের ক্ষেত। একেকখানা লম্বা কাপড় গায়ে পেঁচিয়ে কালো কি শ্যামবর্ণা জনপদবধূরা রোদে তুলা শুকাচ্ছে। খালি পা তাদের, কানে কচি তালপাতার মাকড়ি, তেল-জবজবে চুল আর কোমরে তাগা। কোনো কোনো বাড়ির মাটিলেপা বারান্দায় সুতা কাটছে কেউ-কেউ। কারো বারান্দায় জাঁতা ঘুরিয়ে ফুটকলাই ডাল পিষছে কেউ। দুকুলা, কার্পাসিকা আর করন্তা ফুলের নকশা-তোলা শাড়ি বুনতে মাকু নিয়ে নিবিষ্ট আছে কারিগর। খালি গায়ে শিশুরা বাড়ির উঠানে খেলছে। কোনো এক বিদেশি হেঁটে যাচ্ছে না দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছে, সে নিয়ে কারো কোনো কৌতূহল নেই। বোঝা যায়, এমন মানুষ তারা হরহামেশাই দেখে থাকে। গ্রামে একটুখানি ঘুরে যখন আবার তিনি ফিরে আসেন নগরে, তখন পানামে রাত্রির উৎসব উথলে উঠেছে।

আজ পান্থশালা থেকে পালকি চড়ে নাহিয়ান যাবেন নাচমহলে। কোনো এক ধনাঢ্য নৃপতির আয়োজনে লখনৌসুন্দরী জদ্দন বাইয়ের মেয়ে কুমারী রওশন আরার মুজরা হবে আজ। আমির, ওমরা, সর্দার, জমিদার, বণিক, পর্যটক – কে না হুমড়ি খেয়ে পড়বে! নাহিয়ানও পর্যটক হিসেবে নগর কোটালের দরবার থেকে কোনোমতে একখানা দাওয়াত জোগাড় করে নিয়েছেন আর যাওয়ার জন্য ভাড়া করেছেন পালকি।

পোশাক পরে পান্থশালার বাইরে এসেই পালকিবাহকদের দেখে বুক কেঁপে উঠল তার। মুখ শুকিয়ে গেল। বেহারারা নিশ্চয়ই হাবসি! বসে-বসে হাতের তালুতে খইনি পিষছে। কুচকুচে কালো রং, কোঁকড়া চুল আর বিশ্রী রকম মোটা ঠোঁটের পালোয়ানতুল্য লোক দুটোকে কিছু বলার আগেই উঠে এসে পালকির পর্দার ফিনফিনে ঝালর টেনে ধরে কুর্নিশ করল।

 

দৈলুরবাগের শেষ মাথায় বিরাট দিঘির পাড়ে নাচমহলের থামগুলোর মোজাইকের কাজ মশাল আর শত-শত মোমের আলোয় ঝকঝক করছে। সে-আলোর ছায়া পড়েছে দিঘির স্থির জলে।

পারস্য চিত্রকলার নকশা-আঁকা কাঠের বিশাল দেউড়ি। তার ওপর মতির ঝালরের আড়ালে কোমরে খঞ্জর গুঁজে থির হয়ে আছে তাকে বহনকারী বেহারাদের মতোই দেখতে হাবসি দুটি দারবান। হাতে রুপার দ-। সে-দ–র মাথায় সোনালি বলস্নম। হাজার তারার ঝাড়বাতির আলোয় ফুটে থাকা মহলের ভেতরটা সমাগতের ভিড়ে থইথই করছে। মালাক্কার ঐতিহ্যবাহী শিরবন্ধটি ঠিক করতে করতে মৃদু পায়ে সামনে এগিয়ে গেলেন নাহিয়ান।

পুরো মহলের মেঝজুড়ে বিছানো বিশাল গালিচা। তার ঠিক মধ্যিখানে আরেকখানা বাহারি গালিচার ওপর বসে আছেন এক বয়োবৃদ্ধ ওস্তাদ, অঙ্গে জরিদার চাপকান, মাথায় দোপলিস্ন চিকেনের কাজ করা টুপি, পরনে চুড়িদার চোস্ত সালোয়ার। কোলের ওপর তানপুরা। তাতে আঙুল চালাতে চালাতে ধ্যানমগ্ন হয়ে মধ্যলয়ে তিন তালের লখনৌই বোলবাটের ঠুংরি গাইছেন তিনি। গায়কের বাঁপাশে বসে সংগত দিচ্ছে সারেঙ্গিয়া, তবলিয়া আর পাখোয়াজি।

ডানপাশে গালিচার প্রামেত্ম সোনালি জরির নকশা-তোলা বেগম-খাসপরিহিত এক চলিস্নশোর্ধ্ব নারী। পারস্য গালিচায় ধবধবে ফরসা পা ছড়ানো তার, নরম পালকভরা মলমলের তাকিয়ায় হেলান দিয়ে চোখ মুদে এক মনে গান শুনছেন।

নিমন্ত্রিত আমির-ওমরারা যাদের কারো গালে রাজপুত-মার্কা গালপাট্টা, কারো কালো-মোটা পাকানো গোঁফ, মাথায় মসলিনের

পাগড়ি। কারো কপালে চন্দনের ফোঁটা আর চোখ দুটি গোল গোল রক্তবর্ণ। কেউ-কেউ নিজ-নিজ বিবি-বারাঙ্গনা বগলদাবা করে গালিচার ভিড় ছেড়ে কয়েকধাপ সিঁড়ি ভেঙে একটু ওপরে মহলের চারদিকের ঘোরানো বারান্দায় আসন নিয়েছেন। খাঞ্জায় মুক্তাচূর্ণে মেশানো শরাবের পেয়ালা, রেকাবিতে বাদাম, মনক্কা, শুকনো মেওয়া নিয়ে তাদের কাছে কাছে ঘুরঘুর করছে মাথায় লাল পাগড়ি আর সাদা আলখালস্না পরা বাঁদি ও গোলাম।

চন্দন আর ধূপ-পোড়ানো হালকা গন্ধে মহলের বাতাস স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। ওস্তাদজি তার নরম গলায় নানানভাবে গাওয়া পদটি পূরণ করছেন কখনো ছোট-ছোট মীড় দিয়ে, কখনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র টপ্পার কাজ আর কখনো বা বাট করে পদটিকে ভেঙে ভেঙে। এতক্ষণে তার চোখের কোণে ফুটে উঠেছে আবিরের আভাস – আসরের আবহাওয়া কী, মেজাজ কেমন, কোনো কিছুতেই খেয়াল নেই তার। কী করেই বা থাকে? সংগীতের এমন পরিবেশনা তো মনের অন্য স্তরের ভাষা। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে সেই ভাষার প্রকাশ যখন পূর্ণ করলেন ওস্তাদজি, তার পেছনের রেশমি পর্দা কেঁপে উঠে সরে গেল। দুজন সুসজ্জিত বাঁদি ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে পর্দা-ওঠা পথে এগিয়ে আসতেই ওদের মাঝ দিয়ে ছিটানো পাপড়ি মাড়িয়ে প্রায় বিদ্যুচ্চমকের মতো ঘুঙুরের রুমঝুম আওয়াজ তুলে নীল রেশমের পটভূমিতে উদ্ভাসিত হলো এক প্রাচ্যসুন্দরী। ফুলদার স্বচ্ছ ওড়নার ভেতর থেকে প্রসারিত গোলাপধোয়া তরঙ্গায়িত দীর্ঘ বাহু তার। আলতারাঙানো ঘুঙুরবাঁধা পায়ের ছোট-ছোট পদক্ষিপ। এগিয়ে এসে তাকিয়ায় হেলান দেওয়া নারী আর ওস্তাদজির পদধূলি নেয় সে। এরপর জরি-চুমকি, মণি-মুক্তার ঢেউতোলা দীপ্তি ছড়িয়ে নকশাদার গালিচায় বসে উপস্থিতির ইজাজত চায়।

বাজাদারেরা তাদের যন্ত্রে ক্ষীণ আওয়াজ তুলতেই সোনার কাঁকন, বাজুবন্ধ আর আঙুলের মূল্যবান পাথরের আংটির ঝিলিক দেওয়া ঝলমলে হাতটি গালে চেপে ধীরলয়ে কণ্ঠে সুর তোলে সুন্দরী। হাততালিতে ফেটে পড়ছে পুরো মহল।

অভিভূত, স্থির, নিশ্চল দৃষ্টি নাহিয়ানের। এই তাহলে জদ্দন বাইয়ের কন্যা রওশন! আহ্, রূপের কী বৈভব!

রাত কত হলো কে জানে। আসর একেবারে তুঙ্গে উঠেছে এখন। একটু পরপরই মহলজুড়ে আওয়াজ উঠছে, ‘বহুৎ খুব’, ‘মারহাবা’। রওশন আরার সঙ্গে এখন নাচে সঙ্গী হয়েছে আরো দুজন। ওদের মাঝে নৃত্যের তালে-তালে রওশনের ঘুঙুরবাঁধা পায়ে ছন্দের কী দ্যুতি! দেহভঙ্গিমা আর কণ্ঠেও কী অভূতপূর্ব মায়া! বাজাদারের তালের সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েটি বারবার ঘুরেফিরে আসা ওর সবকটা মুদ্রায় রক্তমাখা হৃদয়টাকেই যেন চোখের সামনে মেলে ধরছে। এর সবটাই ঘটছে বাকি দুজন দ্বারা অদ্ভুত আড়াল রচনা করে। আর ওই আড়ালের সৌন্দর্য এমন একটা মোহ ছড়াচ্ছে, যেন চাঁদের আলোয় ধোয়া মসলিনের আবডালে জেগে উঠছে এক অভিনব খোয়াব। পান্থশালায় আবু আসাদের সেদিনের কথাগুলো স্মৃতি থেকে সরে যায়নি নাহিয়ানের। তখন বিরোধিতা করলেও পরে ওর মনে হয়েছিল, কোনো দিনও মেটবার নয় এমন এক আশ্চর্য খিদে যেন পরানে জিইয়ে রেখে গেলেন মরক্কোর বন্ধু আবু আল আসাদ। আর  হ্যাঁ, এই তো সে নৃত্য, এই তো সে-গীত, বন্ধু আসাদ পানামের মোগরাঘাটের এক পানশালায় যার হদিস না পেয়ে আফসোস করেছিলেন।

 

রাত কত হলো সে-হিসাব এখানে অর্থহীন। লোবানের নির্যাসে এখনো আয়েশি গন্ধের ছাপ রয়ে গেছে। ঝাড়বাতি নিভে গেছে মহলের। মোমদানিগুলোতে পিটপিট করছে ফুরিয়ে আসা আলোর শিখা। পঙ্খিরাজ খাল থেকে ঝুলন্ত সেতু আজকের মতো তুলে ফেলা হয়েছে।

চারদিকের পরিখাবেষ্টিত দুর্ভেদ্য এ-নগরের অভিজাত মানুষেরা রংমহল ছেড়ে এলোমেলো পায়ে তাদের ঘরে ফিরে গেছে কখন। নাহিয়ানও নৃত্যগীতে পরান পুড়িয়ে পালকি চড়ে পান্থশালায় আসেন। কিন্তু ঘুম নামে না তার চোখে। বারবার আবু আসাদকে মনে পড়ছে আজ। বলতে ইচ্ছা করছে, ইবনে আসাদ, আপনি তো দেখেননি বন্ধু, পানামের লখনৌ-তরঙ্গ কতটা দ্যুতি ছড়াতে পারে!

 

চার

নাচমহলের ঠিক পেছনেই দ্বিতল ও ত্রিতল বাড়িগুলোর একটিতে জদ্দন বাইয়ের বাস। বাড়িভর্তি যে-নারীদের দেখা মিলছে, তাদের পরনে মেঘ-উদুম্বর শাড়ি, পায়ে মল, কানে সোনার মাকড়ি, গলায় মুক্তার মালা, কাঁচা হলুদ আর চন্দনপঙ্কে ঘষা মুখ, চুলের এলায়িত খোঁপায় গোঁজা তরতাজা ফুল। দিনের কয়েক প্রহর কাটে তাদের আগ্রার ওস্তাদজির সঙ্গে রেওয়াজ আর গানের তালিম নিয়ে। আরো কয়েক প্রহর নকশাকারকের কাছে নকশার কাজ শিখে খাঞ্চাবোঝাই পাথর, জরি-চুমকি দিয়ে ফুল তুলে পর্দার কাপড়ে। তার ওপর ফারসি কাব্য আর সংস্কৃত শাস্ত্রবিদ্যাচর্চা তো আছেই। এর অবসরে দুপুর গড়িয়ে গেলে গোধূলিবেলায় হাতির দাঁতের চিররুন দিয়ে চুল আঁচড়িয়ে, বেণি বেঁধে মোজাইক করা মেঝেতে ষোলো ঘুঁটি বা বাঘবন্দি খেলা তো আছেই।

আজ আর খেলা হলো না। মালাক্কার এক যুবক এসেছেন গত রাতের আসরে মুগ্ধ হয়ে জদ্দনবাই আর তার মেয়ে রওশনের দেখা পেতে। এখন ওই মেহমানের খেদমতে লেগে পড়েছে সবাই। একে তো বিদেশি, তার ওপর কত রকম উপঢৌকন যে এনেছেন! জদ্দনের বুক গর্বে ভরে গেছে।

 

রওশন আরা অন্দর থেকে কপাট ঠেলে বেরিয়ে এলো সিল্কের সালোয়ার-কোর্তা পরে। কোর্তার বুকে সোনা আর রুপোর জরির কাজ করা বাহারি নকশা। মুখ ঢাকা তার এমন হালকা ওড়নায়, যেন একখ- কুয়াশা ছড়িয়ে রেখেছে মুখের ওপর। অল্প কিছু গয়না যা পরেছে, ঝলসাচ্ছে দিনের আলোয়। বিমূঢ়ের মতো আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান নাহিয়ান, অসময়ে আপনাদের বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।

না না, বিরক্ত কেন হব, এ তো আমাদের সৌভাগ্য। অচিন দেশের বণিক হয়েও আপনি প্রাণ দিয়ে আমাদের আসর উপভোগ করেছেন। বিনয়ের সঙ্গে নাহিয়ানকে বসতে বলে নিজেও একটা গদিঅলা আসন টেনে বসে আলগোছে মুখ থেকে ওড়না সরিয়ে নেয় রওশন।

আমি বণিক নই, পর্যটক। জাতে পর্তুগিজ খ্রিষ্টান। নগর মালাক্কা থেকে এসেছি, ওকে শুধরে দিয়ে বলেন নাহিয়ান। বলেন, গত রাতে আপনার পরিবেশনায় আমি এতটাই মুগ্ধ যে, অভিনন্দন জানাতে এলাম।

হিন্দুস্থানি এ-নৃত্যগীতে পূর্বপরিচয় কি আছে মহাশয়ের?

তা নেই, তবে হিন্দুস্থানি নৃত্যগীতের কথা কে না জানে। এর প্রশংসা শুনেছি অনেক। তাছাড়া জগতের যে-প্রামেত্মরই হোক, শিল্পকলার ভাষা তো একটাই। হৃদয় স্পর্শ করাতেই তো তার সার্থকতা।

রওশন আরার সুরমামাখা চোখের দ্যুতি ঝলকে ওঠে। নাহিয়ানের দিকে দৃষ্টি ফেলে বলে, সে তো আমাদের জন্য গৌরবের। একজন পর্যটককে আমি মুগ্ধ করতে পেরেছি। আমার ওইটুকু পরিশ্রম তবে ধন্য হলো।

সরু, লম্বা নাক আর সুরমামাখা ওই চোখ, অমন চোখ বুঝি এ-পৃথিবীতে আর কখনো দেখেননি নাহিয়ান। মনে হলো, সূর্যের একটা রশ্মি এসে রওশনের চোখের পাতায় আটকে আছে।

মেয়েরা তশতরিতে সাজিয়ে শরবত, হালুয়া আর রাংতা দিয়ে মোড়া শাহি পান দিয়ে গেল।

নাহিয়ান ওর আম্মা জদ্দনের কথা জিজ্ঞেস করলে রওশন বলে, আম্মাজানের তো বয়স হয়েছে। শরীরটা সবসময় ঠিক থাকে না। উনি বিশ্রামে আছেন। আপনার কথা বলেছি আম্মাকে।

কবে এসেছেন আপনারা এ মুলুকে? নাহিয়ান প্রশ্ন করেন।

ওর হাতে শরবতের কাচপাত্র তুলে দিয়ে রওশন বলে, বঙ্গাল মুলুকে সোনাদানা নাকি পানিতে ভেসে বেড়ায়, তাই শুনে আম্মা সেই দূর লখনৌ থেকে এখানে আসেন তার বত্রিশ বছর বয়সে। বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁ মসনদ-ই-আলার তখন প্রবল প্রতাপ। কিন্তু

এক যুদ্ধের পর এখানে অস্থিরতা দেখা দিলে আবার লখনৌ চলে যান আম্মা। এর কয়েক বছর পর আমাকে নিয়ে আবার আসেন। তা-ও দশ-এগারো বছর তো হলো।

তার মানে লখনৌয়ে আপনি তখন একা ছিলেন?

তা কেন? নানিজান ছিলেন না? তার সঙ্গেই তো ছিলাম।

নাহিয়ানের চোখেমুখে একরাশ প্রশ্ন উঁকি দিতে দেখে রওশন নিজে থেকেই বলে, সে অনেক কথা, অল্পতে ফুরোবে না।

কারুকাজ করা রুপার বাটিতে ঘিয়ের গন্ধভরা হালুয়া পরিবেশন করতে থাকে রওশন। নাহিয়ান মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে ওর হাতের দিকে তাকিয়ে আছেন। মহলের আলোয় চুড়ি, জরি, আংটির জমকালো সাজের মধ্যে গতকাল এই স্নিগ্ধ হাতদুটি তিনি দেখেননি। মেহেদিরাঙা উজ্জ্বল হাতের দীর্ঘ আঙুলগুলোও যেন পাপড়িমেলা পদ্মকলি।

রওশন বলে, নানাজান ছিলেন পারস্যের মানুষ। কবিতা লিখতেন। হাফিজের রুবাইয়াত, মুখামমিস, কাসাইদ ছিল তাঁর মুখস্থ। ভাগ্যান্বেষণেই এসেছিলেন হিন্দুস্থানে। দিলিস্ন থেকে লখনৌ এসে থিতু হলেন নানাজান। তখন নানিজান তো অল্প বয়সের একটি লাজুক মেয়ে, ভজন গাইতেন লখনৌর মন্দিরে-মন্দিরে। ওই যুগে কীভাবে দেখা হয়েছিল দুজনার, নানিজান তা কখনো বলেননি। গোঁড়া হিন্দুর ঘর ছেড়ে একজন মন্দির-সেবিকা এক ভিনদেশি মুসলিম কবির হাত ধরে পালালেন। সেই জীবনযুদ্ধের ফসল আম্মাজান তাদের একমাত্র সন্তান। আর আমিও তো আম্মার একটিই চোখের মণি। আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তো তিনি এসেছিলেন এই এতদূর।

মসনদ-ই-আলার মৃত্যুর পর তার পুত্র মুসা খাঁ এখন মসনদের অধিকারী। আম্মা তো আফসোস করে বলেন, জলাদেশের এই শানদার নগরীতে স্বর্ণালি যুগের সেই জৌলুস আর নেই। মনে হয় পুরনো জৌলুস ফুরিয়ে গিয়ে সূর্যাসেত্মর শেষ আভাটুকু লেগে আছে মাত্র। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। হবে কী করে, আমি তো আর অতীতের সেই জৌলুসে বড় হইনি।

কথা বলতে-বলতে রেকাবির ওপর ফিনফিনে রঙিন রুমাল সরিয়ে এক খিলি পান তুলে নেয় রওশন, মুখে পুরে দিয়ে বলে, ভূঁইয়াদের মধ্যেও আর সেই ঐক্য নেই এখন। কতকটা কাবু হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ তলে তলে মোগলদের শরণাপন্নও আছেন। একের পর এক যুদ্ধ, মগ আর পর্তুগিজ জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য, নানা মুলুকের আক্রমণ, লুণ্ঠন। কী করবে তারা? ওদিকে শুনছি দিলস্নীশ্বর আবার বিশাল সেনাবহর পাঠিয়েছেন। রাজমহলে বসে তারা শলা করছে। যুদ্ধ লাগতেই বা কতক্ষণ। এ-নগর এখন ক্লান্ত। আপনি নতুন মানুষ, কতটুকুই বা বুঝবেন জানি না। নাচ-গানের তরিকারই বা এখন আর কী আছে, বলুন? জলসাঘরও মোগরাঘাটের বাজার হয়ে গেছে। দু-চারটা আসর দেখলেই আন্দাজ পাবেন। আপনার যদি আগ্রহ হয়, আম্মার কাছে শুনবেন আগের দিনের কথা। ঘোর লেগে যাবে।

পানের রসে রওশনের ঠোঁট টুকটুক করছে। প্রাচ্যের এ-বস্ত্তর সঙ্গে নাহিয়ানের পরিচয় মধ্যে নেই, তাই বিনয়ের সঙ্গে তাম্বুল চর্বণ থেকে বিরত থাকলেন। কথায়-কথায় বিস্তর কথা হলো। শুধু গল্পে নয়, রওশন আরার রূপ আর বলার বাক্ভঙ্গিমায় গভীর ঘোর লেগে গেল নাহিয়ানের। এটুকু বয়সে পৃথিবীর কত দেশ ঘুরেছেন, কত কত রমণীকে দেখেছেন তিনি; কিন্তু প্রাচ্যের রহস্যঘেরা জনপদের মতো এর নারীরাও কি তবে  মোহময়ী? এক অবোধ্য অন্তরালের আলো-ছায়ায় রওশন আরাকে খুঁজবার চেষ্টা করছেন নাহিয়ান।

রওশন আরাও আমির, ওমরা, বণিক, জমিদার, সর্দার, কবির সান্নিধ্যে তো কম আসেনি। তা ছাড়া পর্তুগিজদের সম্পর্কে তার ধারণা তো সুখকর নয়। কিন্তু এক লহমার পরিচয়ে যতটুকু আলাপ হলো মালাক্কীয় এই পর্তুগিজ খ্রিষ্টানের গভীর নীল নয়নের দৃষ্টিপথে হাজার সারস উড়ে যাওয়ার ছবি দেখতে পেল যেন সে। ওর বিনীত ব্যবহারে আর অভাবনীয় শালীনতায় মুগ্ধ হয় রওশন। মানুষটা যেমন সুপুরুষ, তেমনি সংবেদী তার হূদয়। আর সংযমও তারিফযোগ্য।

পাঁচ

অসময়ে প্রবল বৃষ্টি হওয়ায় চারদিক পানিতে থইথই করছে আজ। পানামার সব খাল কানায়-কানায় পূর্ণ। সর্বজনের প্রবেশাধিকার নেই এমন একটা গুপ্ত খাল আকালিয়া দিয়ে বাহারি ডিঙিতে চেপে নাহিয়ানকে খাসনগর মসলিনপাড়ায় নিয়ে যাচ্ছে রওশন। ভুবনবিখ্যাত এই কাপড়ের কারিগরদের যেমন দেখা হবে, ওর জন্য একখানা উড়ানিরও ফরমাশ দিয়ে আসবে। খালটির দুই পাড়ে অগনিত গাছগাছালির ডালপালা, ঝোপঝাড় স্নিগ্ধ জল ছুঁয়ে এমনভাবে নুয়ে আছে, মনে হচ্ছে এটা জঙ্গলের সুড়ঙ্গপথ যেন। এ-পথেই নৌকা একসময় চলে আসে খাসনগর দিঘির তাঁতিপাড়ায়।

রওশন আরার আগমনে প্রবীণ তাঁতি গৌরীপ্রসাদের উঠানের বেলতলায় বউ-ঝিদের জটলা পড়ে গেল। আবছায়া অন্ধকার মেটেঘরের মাকু ছেড়ে উঠে এসেছে গৌরীপ্রসাদ। সারাজীবন ওই ছায়া-ছায়া অন্ধকার ঘরে বসে বসে আবে রওয়াঁ, শবনম, কাসিদা আর মলমল খাস বুনতে-বুনতে কোমর বেঁকে গেছে তার।

ওর একমাত্র মেয়ে মায়াময়ী এ-পাড়ায় আবে রওয়াঁর সেরা কাটুনি। কাষ্ঠাসন পেতে খাস মেহদের বসতে দিয়েছে সে। পাড় উপচে এখন ভিটার কাছাকাছি বর্ষার জল। দিঘির অথই সে-জলে অগণিত লাল-লাল শাপলা ফুটেছে। গৌরীপ্রসাদের এই মেয়েটিও যেন জলের শাপলার মতোই কোমল আর সুস্থির। কলাপাতায় সাজিয়ে পায়েস পরিবেশনকালে ওকে তেমনই মনে হলো নাহিয়ানের। অথচ এটা কি কেউ বিশ্বাস করবে, সুতা কাটতে গেলে ওর হাতেই ডলনকাঠির দ্রুত সঞ্চালনে কেমন বিদ্যুৎ খেলে যায়! না দেখলে বোঝা দুষ্কর।

গৌরীপ্রসাদ হাতজোড় করেই বসেছিল। আপ্যায়ন শেষ হলে বলল, মা জননী, এই গরিবের কী খেদমত চাই?

গৌরীদাদা, এ আমার মেহমান। মালাক্কা থেকে এই দেশ দেখতে এসেছেন। ওর জন্য একখানা উড়ানির ফরমাশ দিতে চাই। আমি জানি, আপনি অন্তর দিয়ে বুনবেন।

জে আজ্ঞা, মা জননী। কিন্তু কটা দিন সময় লাগবে যে।

তা লাগুক, ও তো আর চলে যাচ্ছে না, বলেই মখমলের থলে থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা তুলে গৌরীপ্রসাদের হাতে দিলো সে। গৌরীপ্রসাদ এমনটা কল্পনাও করেনি। মুষ্টিবদ্ধ মুদ্রাটা কপালে ঠেকিয়ে মাকুর দিকে উঠে যায়। আবার ফিরে এসে বলে, আমির-ওমরাদের খবর তো আপনি রাখেন মা, শুনছি দিলস্নীশ্বর নাকি সেনা পাঠিয়েছে। শিগগিরই যুদ্ধ বাধবে। এমন যদি হয়, সোনারগাঁ যে শ্মশান হবে!

তা কেন হবে? মসনদ-ই-আলা অন্য ভূঁইয়াদের জড়ো করছেন, সৈন্যরা সব ইছামতির মোহনা ডাকছড়ায় শক্ত ঘাঁটি বানিয়েছে। মীর্জা মোমিনের মতো বীর সেখানে আছে, ভয় কী গৌরীদাদা। তা ছাড়া খাজা ওস, মজলিশ দেলোয়ার, মজলিশ কুতুব, বায়েজিদ কররানি, আনোয়ার গাজিরা মসনদ-ই-আলার সঙ্গে আছেন। আর সোনারগাঁ রক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী শামসুদ্দিন বাগদাদির ওপর আপনাদের কি আস্থা নেই?

ওদের কথাবার্তার ফাঁকে মাটিতে পোঁতা বড় বড় গর্তে রঙের চাড়ি, শনে-ছাওয়া মাটির ঘর, মাকু, চরকা – সব খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছিলেন নাহিয়ান। আর ভাবছিলেন, বয়নশিল্পীদের কী অদ্ভুত জীবন! কী অসম্ভব অভিনিবেশ! একেবারে মাটির সঙ্গে সংলগ্ন, প্রকৃতির মতো কোমল আর জলের মতো সরল।

ফেরার পথে রওশনের হাত চেপে ধরেন নাহিয়ান, এ তুমি কী দেখালে আমাকে?

কেন? জগৎখ্যাত মসলিনের কারিগর। তুমি তো কয়েক ঘর মাত্র দেখেছ, এমন হাজার আছে।

সবার জীবনযাপনই কি এমন?

হ্যাঁ, এমনই। ওরা ওতেই আনন্দ পায়। একখানা কাপড় বুনে যদি অমাত্যজনের বাহবা আসে, তাতেই ওরা ধন্য। এই ধরো আমি নেচে-গেয়ে যেদিন তারিফ পাই, মনে হয় আর কিছু চাই না, আমার জীবন সার্থক হলো।

 

পুরো নগরেই চলছে মৃদু গুঞ্জন। যুদ্ধ কি তবে অত্যাসন্ন? বণিক আর উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের অন্দরমহলের বাতাস ভারী হয়ে আছে। বাঁদি, গোলাম আর খেদমতগারদের চালচলনেই যেন বেশি আতঙ্ক। নগরের আশপাশ ছাড়া দূর গ্রামের জনপদে এসবের আঁচ খুব একটা লাগে না। দৈনন্দিনের মধ্যে তারা শুধু এক রাজার চলে যাওয়া আর এক রাজার আগমনের বার্তা শোনে।

 

ছয়

জদ্দন বাই তার সুরম্য খাটে আধশোয়া হয়ে কারুকার্যখচিত রুপার পানদান থেকে এক খিলি শাহি পান মুখে পুরে বাঁদিকে ইঙ্গিত করলেন। বাঁদি এসে আখরোট কাঠের চৌপায়ায় রাখা রেকাবিতে পেস্তা, কাজু, খুবানির বাটিগুলো সাজিয়ে গেল।

নাহিয়ান তাঁতিপাড়ায় শোনা যুদ্ধের আশঙ্কার কথা তুললে জদ্দন বাই মুখের পান চিবাতে থাকায় নীরব রইলেন।

ভবনের পেছনে চবুতরা। এখান থেকে জালালি কবুতরের গমগমে বাক্বাকুম-বাকুম-বাক্ ডাক শোনা যায়। সেইসঙ্গে ওদের পাখা ঝাপটানোর শব্দ।

মক্কাশরিফ থেকে বের হয়ে বহু দেশ-জনপদ ঘুরে দরবেশ শাহজালাল তখনকার বাদশাহ আলাউদ্দিন খিলজির দিলিস্নতে এলেন এবং কয়েক দিন দরবেশ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার আস্তানায় কাটালেন তিনি। দিলিস্ন ত্যাগের সময় হজরত নিজামউদ্দিন তাকে ধূসর বর্ণের একজোড়া কবুতর উপহার দিলেন। শাহজালাল তিনশো ষাটজন আউলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে দিলিস্ন থেকে এসে আসামের অন্তর্ভুক্ত শ্রীহট্টকে জয় করে বিসমিলস্নাহ বলে উড়িয়ে দেন সেই কবুতর।

তিনশো বছর পূর্বের সেই কবুতরের বংশধরই এই জালালি কবুতর। এই পায়রা পোষা দরবেশবাবার প্রতি বিশেষ ভক্তির নিদর্শন।

দ্বিপ্রহরে ওই জালালি পায়রাদের একডালা ধান খাইয়ে তবে গোসল সেরেছে রওশন আরা। এখন মাখনরঙা মিহি সুতায় বোনা সালোয়ার-কামিজ আর হালকা গয়না পরে প্রসাধনহীন এক অপ্সরীর বেশে আম্মার কোল ঘেঁষে গভীর আলস্য নিয়ে আধশোয়া হয়েছে সে। তার মুখাবয়ব থেকে কাঁচা হলুদের রং ঠিকরে পড়ছে। মাথা থেকে ওড়না সরিয়ে মেলে দিয়েছে কোঁকড়ানো ঘন কালো ভেজা চুল। মনে হচ্ছে যেন পানপাত্র ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে সুরা।

পিকদানিতে পান চিবানো খয়েরি পিক ফেলে এবার জদ্দন বাই বললেন, যুদ্ধ আমি দেখেছি বেটা। রক্তপাত, লুণ্ঠন আর অগ্নিসংযোগ জীবনের সব আয়োজন ছারখার করে দেয়। এর হাত থেকে রক্ষা নেই মানুষের। মুসা খাঁ কদ্দুর কী করতে পারবে জানি না, তবে তার বাবা এই সোনারগাঁর মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁ একবার কৌশলী রাজনীতি আর বীরত্বের যে-নজির রেখেছিলেন, তার তুলনা নেই।

আমি তাকে দীর্ঘদিন ধরে দেখেছি, তার অনুগ্রহ নিয়েছি। আমার গানে মুগ্ধ হতেন। খাঁ রওশনকেও আদর করতেন খুব। অকুতোভয় বীর, বিরাট হূদয় ছিল তার। বঙ্গাল মুলুক মুক্ত রাখতে বারো ভূঁইয়াদের সঙ্গে নিয়ে কি না করেছেন তিনি!

বিরাট এক বাহিনী গড়েছিলেন। রাজধানীর চারপাশে চক্রাকারে দেওয়ানগঞ্জ, হাজীগঞ্জ, শেরপুর, ডাকছড়া, এগারোসিন্ধু, টোক, কত্রাভূ, জঙ্গলবাড়ি, রাঙামাটিতে দুর্গ বানিয়েছিলেন, যাতে যে-কোনো দিকের আক্রমণ অনায়াসে ঠেকাতে পারেন। মোগল সম্রাট আকবরের তা পছন্দ হয়নি। বারবার তার সেনারা পরাজিত হয়ে ফিরে গেছে। এত বিত্ত, এত ঐশ্বর্যের বঙ্গাল মোগলদের হাতছাড়া থাকবে কত দিন? এবার তাঁর শ্রেষ্ঠ সিপাহসালার  সিংহকে পাঠালেন ঈশা খাঁকে দমন করতে। এগারোসিন্ধু দুর্গের বাইরে ঘোরতর যুদ্ধ হলো। সাতদিন ধরে সে-যুদ্ধে কত যে প্রাণ গেল! নদীর পানি লালে লাল। তবু জয়-পরাজয় কিছুই নিশ্চিত হলো না।

রাত নেমে গেছে। পরদিন আবার যুদ্ধ হবে। কিন্তু এমন রক্তপাতে আর যেতে চাইলেন না ঈশা খাঁ। দূত পাঠিয়ে সিংহকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহবান জানালেন। রাজপুত সেনাপতি মান সিংহও সে-আহবানে রাজি। এটাও যে ঈশা খাঁর এক অদ্ভুত রাজনীতি-কৌশল সিং সেদিন তা ধরতে পারেননি।

মুখে পানের রস জমে গেলে জদ্দন বাই আবার পিকদানিতে পিক ফেলে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে-মুছতে বলতে লাগলেন, এরকম কৌশল আর বিল-খাল, নদী-নালার সহায়তা উনি এমন করেই কাজে লাগাতেন। যে-কারণে কোনো দিনও কারো কাছে তাকে মাথানত করতে হয়নি। সে যা-ই হোক, পরের দিন অশ্বপৃষ্ঠে দুই বীর নাঙা তলোয়ার নিয়ে প্রস্ত্তত। সৈন্যরা নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। চলল লড়াই। একপর্যায়ে সিংহ ঘোড়া থেকে গেলেন পড়ে। দ্বৈরথ যুদ্ধে ওর জয় তো হয়েই গেছে, এখন ক্ষত্রিয়সুলভ মহানুভবতা দেখাতে দোষ কি। ঈশা খাঁ তাড়াতাড়ি তার ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ভূপতিত সেনাপতিকে টেনে তুললেন। খাঁয়ের শৌর্যে মুগ্ধ হলেন মোগল সেনাপতি। এমনটা কোনো দিন কল্পনাই করেননি রাজপুত বীর। বিনা বাক্যব্যয়ে ঈশা খাঁকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। সে এক আশ্চর্য অনুভূতি! এদিকে শিবির থেকে সবার সঙ্গে বসে সবই দেখছিলেন  সিংহ-পত্নী। ভীত হয়ে সব রীতি-রেওয়াজ ভুলে ঝড়ের বেগে ছুটে এলেন রাজপুতানি। লুটিয়ে পড়লেন ঈশা খাঁর পায়ে। মিনতি জানালেন, তার স্বামী পরাজয়ের কলঙ্ক নিয়ে দিলিস্ন ফিরে গেলে নিশ্চিত শিরশ্ছেদ হবে। কারণ পরাভূতের প্রতি আকবরের ক্ষমা নেই। ঈশা খাঁ কি তাকে পতিহারা আর তার সন্তানদের পিতৃহারা হতে দেখে খুশি হবেন? ব্যাকুল কণ্ঠে বিজয়ীর করুণা প্রার্থনা করলেন তিনি। দুই চোখে তার উথলে ওঠা কাতর সে-আকুতি। রাজপুতানির দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কথা আর অমন আকুতি শুনে ঈশা খাঁর চিত্ত বিগলিত হলো। মান সিংহের সঙ্গে দিলিস্ন গিয়ে সম্রাটের কাছে ক্ষমা চাইতেও রাজি হলেন। সেটাও যে ছিল ভূঁইয়াপ্রধানের সময়ক্ষেপণের আরেক কৌশল, আমরা কি আর তখন তা বুঝে উঠতে পেরেছি। আমরা এতে অস্থির হয়ে উঠলাম। ঈশা খাঁর অনুপস্থিতিতে এখানকার পরিস্থিতি কী হয় না-হয় বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চলে গেলাম লখনৌ।

ততদিনে প্রচার হলো, দিলিস্ন গিয়ে বন্দি হন ঈশা খাঁ। পরে তাঁর কৃতিত্ব আর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট আকবর তাকে বঙ্গালের বাইশটি পরগনার জমিদারি আর ‘মসনদ-ই-আলা’ খেতাব দিয়ে পাঠিয়েছেন।

আসলে ওসবই ছিল সিংয়ের ছড়ানো গুজব। ঈশা খাঁ কোনোদিনই দিলিস্নর সম্রাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াননি। নিজের বাহুবল, প্রখর বুদ্ধি আর রাজনীতির কৌশল দিয়েই বাইশ পরগনার মালিক হয়েছিলেন তিনি। ‘মসনদ-ই-আলা’ খেতাবও তার নিজেরই দেওয়া। মোগলদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তো আরামেই থাকতে পারতেন, কিন্তু উনি কি তা চেয়েছেন? চাইলে তো আর এত রক্তপাতের দরকার ছিল না। বঙ্গের অধিকার আর সম্পদ লুটে নেওয়ার মোগলি তৎপরতা মেনে নেওয়ার মতো লোক ছিলেন না ঈশা খাঁ।

তবে কি জানো, ভূঁইয়াপ্রধান কখনো পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করা নানা কারণেই সংগত বোধ করেননি। আবার কারো অধীনতাও স্বীকার করেননি কোনো দিন। তারই তো সুযোগ্য পুত্র আমাদের মসনদ-ই-আলা মুসা। বঙ্গাল মুলুকের ঐশ্বর্য এত সহজে কেউ কেড়ে নিতে পারবে বলে মনে করো?

একটু দম নিয়ে জদ্দন বাই আবারো পানের পিক ফেললেন। নাহিয়ান বিমূঢ়ের মতো শুনছিলেন। বললেন, সত্যি, এ যে রূপকথাকেও হার মানায়।

ঈশা খাঁ আর সোনাবিবির কাহিনি তো শোনোনি। শুনলে বুঝতে! আম্মা বলেন না ওকে। ছোট্ট খুকির মতো বহুবার শোনা সে-গল্প আবারো শোনার সুযোগ হারাতে চায় না রওশন।

আজ আর না, আম্মি। খাবার সময় হয়ে এলো। তোমরা গল্প করো, আমি বরং গোসলে যাই, যা গরম পড়েছে আজ! r