স্মৃতির সড়ক ধরে দৃশ্য-অদৃশ্যের ভুবনে

লেখক:

রশীদ আমিনNazma Akter

এ-কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, একটা মূর্ত-বিমূর্তের দ্বন্দ্বের মধ্যেই আমাদের বসবাস। আমরা অনবরত দেখা-অদেখার ভুবনে ছুটে বেড়াই। যা দেখি তার পর্দা ভেদ করে অদেখার পানে ছুটে যাই। মানুষের আত্মা-মন সর্বদা এক অসীমের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। তবে সেই অসীমতা কোথায়? কোথায় গেলে সেই অপরূপের সন্ধান পাবো? শিল্পী মাত্রই হয়তো এ-ধরনের ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়। শিল্পী কান্দিনস্কি সীমার মাঝে অসীমের সন্ধান করতে চেয়েছিলেন, তাই মজেছিলেন বিমূর্ত ভাবধারায়। তিনি সংগীতের ভাষার সঙ্গে শিল্পের ভাষা একাকার করে দিয়েছিলেন। রং-রেখায় ক্যানভাসে সুরের ইন্দ্রধ্বনিকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন। এবং অবশেষে দৃশ্যমানতার বাইরে কিংবা সমস্ত বস্ত্তজগৎকে ছাপিয়ে তিনি শিল্পে এক ভাব-জগতের দরজা খুলে দিলেন। ক্যানভাসে উঠে এলো মনোজগতের ছবি, অবচেতনের আলো-ছায়ার কাব্য। ঠিক সেই ধরনের আলোছায়ার কাব্যই উঠে এসেছে শিল্পী নাজমা আক্তারের সাম্প্রতিক চিত্রমালায়। বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত শিল্পী নাজমা আক্তারের সাম্প্রতিক প্রদর্শনীর ছবিগুলো দেখতে দেখতে আমরা যেন সত্যি এ-রকমের এক ভাব-জগতের দরজা-জানালা খুলে এক নতুন শিল্পভুবনের সন্ধান পাচ্ছিলাম। এ-কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমরা অনবরত এক দৃশ্যমান জগতে ভ্রমণ করি, আমাদের চোখের সামনের যে-জগৎ, এই যে বৃক্ষরাজি, মানবকুল, আকাশের মেঘমালা, স্রোতস্বিনী নদী, দিগন্তজুড়ে শস্যক্ষেত, কখনো গনগনে সূর্যের উত্তাপ, কখনো রাতের আঁধারে তারকারাজির শোভা, পাখির গান – এসবই যেন আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধিজাত হয়ে অবলোকনের সেতু ধরে আমাদের অবচেতনে বাসা বাঁধে। প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমাদের বোধে নাড়া দেয়। আর সেই বোধের তাড়নায় আমরা উদ্দীপ্ত হই, আর হাতে উঠে আসে তুলি; আঁচড়ে আঁচড়ে বর্ণে বর্ণে ক্যানভাস চিত্রময় হয়ে ওঠে। যদিও এই ক্যানভাস আমাদের দৃশ্যমান জগতের কোনো চিত্র তুলে ধরে না, তবে তাতে উঠে আসে আমাদের চিরচেনা ভুবনের এক গভীরতম ছায়া। শিল্পী নাজমা আক্তার সেইরকম এক চিরচেনা ভুবনের ছবি এঁকেছেন, তবে তা স্পষ্টভাবে বস্ত্তজগতের কোনো কিছুই চিহ্নিত করে না। বৃক্ষমালা, নিসর্গ, মানুষের ছায়া, ঘরবাড়ি, প্রকৃতি – সবকিছুই যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ক্যানভাসে, একধরনের ভাবের অনুষঙ্গে। নাজমার ছবির মূল প্রেরণাই প্রকৃতি। তাঁর সমস্ত ভাবনা প্রকৃতি থেকেই উৎসারিত। প্রকৃতির রঙেই তিনি ছবি আঁকেন, প্রকৃতির ঋতুরঙ্গ উঠে আসে তাঁর ক্যানভাসে। ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো আমাদের পরিপার্শ্বের আলোছায়ার খেলা – সবই যেন তাঁর শিল্পের অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে আসে। কখনোবা শিল্পী হয়ে ওঠেন স্মৃতিকাতর, স্মৃতির সড়ক বেয়ে হেঁটে যান ফেলে আসা ভুবনে। স্বপ্ন ও স্মৃতির মিশেলে নির্মাণ করেন এক স্মৃতির শহর – রং ও রেখায়। শিল্পী নাজমা কথা বলেন রঙের ভাষায়, রেখার ভাষায়। স্তরের পর স্তর রং সাজিয়ে রেখার যুগলবন্দিতে তিনি নির্মাণ করেন নিজস্ব শিল্পভাষা, গড়ে তোলেন এক নিজস্ব পৃথিবী, আর এই পৃথিবী একান্তই তাঁর নিজস্ব শিল্পভুবন। তিনি নান্দনিকতার এক বিশুদ্ধ স্তরে আমাদের পৌঁছে দিতে চান, যেখানে সংগীতসম এক ধরনের ভাবের জন্ম দেয়। বিশিষ্ট শিল্প-সমালোচক সামসুল ওয়ারেস যথার্থই বলেছেন, ‘শিল্পী নাজমা আক্তার একজন জাত শিল্পী। তাঁর রং-তুলির স্পর্শে ক্যানভাস হয়ে ওঠে কাব্যময়। তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালে আমাদের কাছে টানে, ছবির সাথে গড়ে উঠে একধরনের সংলাপ। রং, রেখা আর কম্পোজিশনের সূত্র ধরে ছবির অনেক গভীরে পৌঁছে যেতে পারি।’ তিনি আরো ব্যক্ত করেন, ‘শিল্পী নাজমার ছবির গঠনশৈলী অনেক মজবুত, মোটেই ভঙ্গুর নয়, যা শিল্পের উচ্চমানকে নির্দেশ করে।’

শিল্পী নাজমা আক্তারের ছবির নির্মাণশৈলীতে তাঁর বর্ণ-প্রয়োগের ভূমিকা অপরিসীম। তাঁর পরিশীলিত বর্ণ-প্রয়োগ ছবির শিল্পগুণকে যেন অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই প্রদর্শনীর দু-একটি ছবি ছাড়া অধিকাংশ ছবিই বর্ণের ব্যবহারে উচ্চকিত নয়। কালো রঙের প্রাধান্য এক ধরনের রহস্যময়তাকেই ইঙ্গিত করে। আর নাজমা ক্যানভাসে অনবরত এক রহস্যের মায়াজাল তৈরি করতে সচেষ্ট। কালো বর্ণের নানা স্তর তৈরিতে তিনি সচেষ্ট। তাঁর হাত ধরে বিবর্ণ স্মৃতির সড়কে আমাদের পৌঁছে দেন তিনি। কালো ছাড়াও বাদামি, সবুজাভ, লাল, খয়েরি ইত্যাদি রঙেরও প্রাধান্য দেখা যায় তাঁর কাজে। তবে কোনো বর্ণই উচ্চকিত নয়। চোখে এনে দেয় স্বস্তি আর মনে জাগায় এক ধরনের বিশুদ্ধ আনন্দ। বিশেষ করে সবুজাভ রঙের ব্যবহার অসাধারণ। এই রঙের মধ্য দিয়ে দেশকে চেনা যায়। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে ভেজা সবুজ উঠে আসে নাজমার চিত্রপটে।

আমাদের এই দেশের বর্ষা, যা ফুটে ওঠে শ্যাওলা বিছানো পথে, নোনা ধরা দেয়ালে জলের অাঁকিবুকিতে, তাও ভেসে ওঠে শিল্পীর ক্যানভাসে। তুলি হাতে শিল্পী অনবরত মেতে ওঠেন নিরীক্ষায়। কখনো নানা ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আঁকিবুকিতে মেতে ওঠেন, আবার টেক্সচারের প্রয়োগে ক্যানভাসে ঘটে যায় এক ধরনের রিলিফ সৌন্দর্য। শিল্পী নাজমা আক্তার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন অ্যাক্রিলিক – এই সময়ের মাধ্যম, শিল্পসৃষ্টির আধুনিক অনুষঙ্গ। প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক শিল্পী নাজমার শিল্পমাধ্যম নিয়ে আলোচনা করেছেন, ‘জলরঙের ব্যবহারে তিনি খুবই স্বচ্ছন্দ, তবে এই ছবিগুলোতে ব্যবহার করেছেন অ্যাক্রিলিক। জলরঙের খুব কাছাকাছি; কিন্তু জলরঙে যে একটা উধাও বিলীয়মানতার ছোঁয়া থাকে, সেটা এখানে নেই। বদলে পাওয়া গিয়েছে চেপে-বসা একধরনের স্থিরতা।’

অ্যাক্রিলিক রঙের ব্যবহারে নাজমা আক্তার হয়ে উঠেছেন সিদ্ধহস্ত। স্তরের পর স্তর রং ব্যবহার করে গড়ে তোলেন অনেক চিত্রতল। উপরিতল নিম্নতলের সঙ্গে মিলেমিশে রঙে-রেখায় গড়ে তোলেন ঠাস বুনোট, যা ভাব-আবেগের সঙ্গে যূথবদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করে অপরূপ এক দৃশ্যময়তা। বিষয় ও আঙ্গিকের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি। প্রতিমুহূর্তে রং বদলানো প্রকৃতি যথার্থভাবেই ধরা দেয় ক্ষিপ্র তুলির আঁচড়ে এবং যথার্থভাবেই অ্যাক্রিলিক রঙের জাদুতে।

‘এখন নাজমার কাজগুলো দেখি একটির পর একটি। তিনি রেখে দিয়েছেন তাঁর ‘ভিতরের অনুভব, উপলব্ধি’, নিঃশব্দ সংগীতে, শান্ত নিবিড়, সশব্দ বিষণ্ণতার অমূর্ত জগৎ তাঁর একেকটি চিত্রকর্মের পাত্রে।’ – হাসান আজিজুল হক।