হাওলাতের বহি

লেখক:

haolater-bohiসৈয়দ শামসুল হক

আমরা আমাদের বাপো দাদার মুখে শুনেছি দালান তৈরিতে ইট লাগে আর সেই ইট তৈরি হয় ইটের ভাঁটায়। আমরা ইটের ভাঁটা চোখে দেখি নাই। কাগজে ছবি দেখেছি। কাগজেই পড়েছি পরিবেশবিদ নামে নাকি একটা দঙ্গল আছে তারা ইটের ভাঁটি বসাতে দিতে চায় না।

আমাদের জলেশ্বরীতে তার দরকারই নাই। বাংলাদেশের আগে মাত্রই দুটো দালান ছিল জলেশ্বরীতে। এক. মনীষ মজুমদারের দোতলা ইটের বাড়ি –

তাও নিজের থাকবার জন্যে নয় – মহকুমার বড় বড় সরকারি কর্মচারীদের ভাড়া দেবার জন্যে।

আর হ্যাঁ, নিজে থাকবার জন্যে নিজের একতলা দালান বাড়ি ছিল হাসপাতাল রোডে – রায়সিংহ বাবুদের। তাঁরা থাকতেন কলকাতায়, পুজোর ছুটিতে আসতেন, সম্বৎসর তাদের আত্মীয়স্বজন বাড়িটি দেখাশোনা করত। সেই বাড়িতে আমাদের জন্যে ছিল এক আশ্চর্য ভাণ্ডার। বইয়ের – বাংলা বইয়ের ছোট্ট একটি পাঠাগার। আমরা গিয়ে বসতাম, বই পড়তাম, নিচু গলায় আড্ডাও দিতাম, আর দু-একখানা বই যে বগলের তলায় ফেলে চুরি করে আনিনি, সে-কথা এখনো মনে পড়ে। তবে ভরসা পাই কার মুখে যেন একথা শুনে যে, বই চুরি নাকি চুরিই নয়। আমাদের সামাদ বলে, জ্ঞানের রাজ্যে চুরি ডাকাতি বলে কোনো অপরাধ নাই।

দালানের কথা থেকে কথায় কথায় কতদূর সরে এসেছি। শুনেছি ইটের ভাঁটি করতে মাটি কাটতে হয়।

রায়সিংহ বাবুদের দালান তুলতে মাটিকাটা হয়েছিল তখনকার জনবিরল জলেশ্বরীর বুকের মাঝখানে। সেটি এখন মজাপুকুর হলেও তার নাম দশদিকে – চাঁদবিবির পুকুর। আহা, একাত্তরে চাঁদবিবি এখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল পাঞ্জাবি মিলিটারির হাত থেকে বাঁচতে। এই শোকের কথা এখনো লোকের মুখে-মুখে ফেরে।

মাটিকাটা পুকুরের এই দুঃখকথা জলেশ্বরীর মনে আছে বলেই কি ইটের দালান এখানে আর কেউ করে না। মাটি কাটে না। মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরি করে না।

জলেশ্বরীর বাড়ি তৈরির একটা ধারা আমরা লক্ষ করি। টিনের চাল, সিমেন্টের পাকা মেঝে আর বেড়ায় বাঁশের বাখারি চ্যাটালো করে লাগানো, তার ওপরে সিমেন্ট-বালুর আস্তর।

এরি মধ্যে একটা গল্প ঢুকে যাচ্ছে। এতকাল গল্প-প্রবন্ধ লিখেছি, এবার বোধহয় এটিকে গল্প পট বলতে পারি। পটচিত্রের মতোই তার বিসত্মার, তার উজ্জ্বল রঙের ভেতরে তার উড্ডয়ন।

পাখি ওড়ে। সূর্য ওঠে। পাখি ঘরে ফিরে আসে। সূর্য ডুবতে থাকে। কালচক্র ঘুরে যায় জলেশ্বরীর দিকে।  এখন আমাদের এই শহরে একজন ধনী মানুষ আছেন। মোজাফ্ফর মিয়া মার্চেন্ট। শহরের সবচেয়ে বড় ইম্পোর্টার-এক্সপোর্টার ফার্মের মালিক। এখন তিনি পৌঢ়। প্রথম স্ত্রী বিনা সমত্মানে, কি কারণে আমরা জানি না, কত কথাই তো অবিদিত থেকে যায়, বধূটি ভোররাতে গায়ে কেরোসিন লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। মোজাফ্ফরের তখন উঠতি বয়স। কোনো প্রণয় কলহ নাকি সাংসারিক অভাবের তাড়নায় বধূটি আত্মঘাতী হয়, এ নিয়ে আমরা গল্পকথা রচনা করতে পারি। কিন্তু সত্যকে ছুঁতে কি পারব?

দীর্ঘদিন একা মোজাফ্ফর মিয়া, ধীরে ধীরে তার শ্রমে ঘামে গড়ে ওঠে ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসাটি।  কী সখ হয়, কেন হয়, মনে কেন নতুন কথার উদয় হয় – হয় বলেই তো মানুষ মানুষের জীবন পায়।

সেই জীবনের সন্ধানে মোজাফ্ফর মিয়া নীলফামারী যায়। ব্যবসার জন্যে যায় কিন্তু পূর্ণিমার মতো একটি ব্যবসা তাকে উত্তরের শীতের মধ্যে গরম চাদরের মতো জড়িয়ে ধরে। নীলফামারীতে এক যুবতী নারীর সন্ধান সে পায়। যুবতীর নাম মফস্বলের পক্ষে একটু আধুনিক – জহরৎ বিবি। উজ্জ্বল জহরতের মতোই রূপবতী সে। তাকে নিয়ে খুব সলজ্জ ভঙ্গিতে জলেশ্বরীর ইস্টিশনে নামে নতুন দম্পতি। আমরা তখন হানিফ ভাইয়ের দোকানে চা খেয়ে উঠেছি, ট্রেন এসেছে, ট্রেনের যাত্রী দেখতে গিয়েছি। মোজাফ্ফর মিয়ার পাশে এক যুবতীকে দেখে তার মেহেদি রাঙা হাত আর লাল শাড়িটা চোখে পড়তে বুঝে যাই সব।

চাচা, বিয়া কইরা আইলেন বুঝি?

হয়। হয়। কতদিন আর একা থাকা যায় রে। একা থাকা বড় কষ্টের।

আমরা হাত তুলে চাচিকে সেলাম করি। আর তখুনি আমাদের চোখে পড়ে অপরূপ ঐ মুখটিতে যে চোখ দুটি – যেন বেড়ালের চোখ। যেন একটা সুন্দর পুতুলে কোনো এক ছোট্ট মেয়ে রঙিন বোতাম খুঁজে মুখটিতে বসিয়ে দিয়েছে। আমরা মুগ্ধ হয়ে যাই।

আমরা ঘুরে ঘুরে মোজাফ্ফর চাচার বাড়িতে যাই। চাচিও আমাদের হাতের পিঠা খেতে দেন। সে-পিঠা বড় সুস্বাদু। যাকে ভালো লাগে তার সবই ভালো আমরা দেখে উঠি।

কিন্তু না, একদিন গিয়ে দেখি চাচি বারান্দায় চেয়ারের ওপর আচ্ছন্নের মতো বসে আছেন আর উঠান পেরিয়ে অন্য দিকের বারান্দায় চাচা বসে আছেন মাটির ওপরে। চাচার দুটি হাত তার নিজের কপালে রাখা যেন পাহাড় ভাঙা অশ্রম্নকে সামাল দিতে।

দুই বারান্দার মাঝখানে উঠানের ওপর, আমরা একেবারে পাথর ভাঙা অবাক হয়ে যাই, দেখে যে একটা তোরঙ্গ উল্টে আছে, তার ভেতরে জিনিস ছত্রখান হয়ে; আর সেই বিশৃঙ্খল জিনিসপত্রের ভেতরে আকাশের দিকে মুখ তুলে চেয়ে আছে কাচচূর্ণ একখানা ফটো। মুহূর্তের মধ্যে আমরা চিনে যাই এ আমাদের প্রথম চাচি। মোজাফ্ফর চাচা ছবিটিকে টিনের তোরঙ্গের তলদেশে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কী করে হঠাৎ সেটি আবিষ্কার করে বসেন জহরৎ চাচি। আমরা মাথা নিচু করে মানে মানে সরে আসি।

কিছুদিনের মধ্যেই জহরৎ চাচির মিষ্টি সুরেলা গলাটি কর্কশ চিৎকারে পরিণত হয়। সারা শহর শুনতে পায় তিনি চিৎকার করে বলছেন – ইয়ার জন্যে হামাকে হেথায় আনিয়াছিলেন? দালানবাড়ি হতে টিনের এই ভাঙা বাড়িতে?

আমরা আরো শুনতে পাই জহরৎ বিবি ধমকি দিয়েছেন সাত দিনের মধ্যে দালান না উঠিলে তাঁই নীলফামারী ফিরিয়া যাইবেন, আর আসিবেন না।

সাত দিনে তো দালান ওঠে না। বিশ্বকর্মারও সাধ্য নাই সাতদিনে দালান ওঠায়। মোজাফ্ফর চাচা জহরৎ বিবির পায়ে ধরে সময় চেয়ে নেন।

আগঝাগ না করেন। দালান উঠিবে। তোমার মনের মতো দালান উঠিবে। মন্ত্রী মিনিস্টার থাকিবার মতো দালান তোমাকে তুলি দিমো। আধকোশা নদীর পশ্চিমে দূর ঝাউবনে মাটিকাটা শুরু হয় দালানের জন্যে ইটের ভাঁটি বসাতে।

দ্যাখ না দ্যাখ, আগুন জ্বলে, মাটি পোড়ে, মাটির থান, ইটের থান হয়ে যায়। রংপুর থেকে ওসত্মাদ মিসিত্মরি এনে দালানের কাজ শুরু করেন মোজাফ্ফর চাচা। দালান উঠে যায়। দেখবার মতো দালান। মেঝেতে লাল পালিশ। দেয়ালে সোনার মতো হলুদ রং। আর ছাদের চূড়ায় ডানা ছড়ানো একটা পাখি – যেন সে পাখি তার ঠোঁটে করে এই দম্পতির জন্যে গান বয়ে এনেছে।

পুরনো বাড়ির জিনিসপত্র কিছুই এ-দালানে ওঠে না। জহরৎ চাচি আনতে দেন না। বলেন, সব নত্তুন, নত্তুন। হেথায় পুরানের কোনো জায়গা নাই।

নাই বললে তো আর নাই হয়ে যায় না সব। ঠাঁই নাড়া করতে গিয়ে মোজাফ্ফর চাচার হাতে একদিন কাপড়ের একটা জীর্ণ থলি উঠে আসে। লালশালুর থলি পোকায় কেটে ঝুরঝুরে করে ফেলেছে। তার ভেতরে ছোট্ট একটি খাতা। খাতাটি পোকায় কাটা হলেও মোফাফ্ফর চাচার নিজের হাতে লেখা হাওলাতের বহি স্পষ্ট পড়া যায়।

মোজাফ্ফর চাচা তার ব্যবসার প্রথম জীবনে কত মানুষের কাছে কত টাকা ধার করেছিলেন সব এই খাতায় লিখে রেখেছিলেন। এখন তার অধিকাংশই পোকায় খেয়ে ফেলেছে। ব্যবসা জমে ওঠার পর সবাইকে হাওলাতি টাকা শোধ করে দিয়েছিলেন বলে মনে পড়ে। বড় তৃপ্তি হয় কথাটা ভেবে যে, তিনি কারো সঙ্গে বেইমানি করেন নাই।

জীর্ণ হাওলাতি বহিটির পাতা ওলটাতে ওলটাতে কোনো নাম বা টাকার অংক আর চোখে পড়ে না। কালের পোকা সবই খেয়ে গেছে। শুধু –

আবার শুধু একটি নামের দুটি অক্ষর পড়া যাচ্ছে। স্বরে আ আর ল। আর একটু দূরেই টাকার অংক লেখা ২,৭০০।

সংখ্যাটির পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন লাল কালিতে। তবে কি ঐ স্বরে আ আর ল যার নামের আদ্য অক্ষর, টাকাটা তাকে শোধ করা হয় নাই? মোজাফ্ফর চাচা ভাবতে থাকেন। ভাবতে থাকেন। ভাবতেই থাকেন। কোনো মুখ তার মনে পড়ে না। দুহাজার সাতশো টাকা তার কাছে এখন কোনো টাকাই নয়, তবু সেই টাকা বৃহৎ হতে হতে এই পঁয়ত্রিশ বছরে দুলক্ষ সাত হাজার টাকা হয়ে ওঠে।

ওরে বাবা, এত টাকা? লোকটিকে যদি মনে পড়ে। যদি তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে তার নীতিবলে এত টাকাই সুদে-আসলে ফেরত দেতে হবে।

কিন্তু কে এই স্বরে আ আর ল নামের অধিকারী? স্বজন পরিজন কারও মধ্যে নামের এই আদ্যাক্ষর দুটি নাই। তিনি ভাবেন দুলক্ষ সাত হাজার টাকা তিনি দান করে দেবেন। আবার ভাবেন, দান যে নেয় সে তো পরের মুহূর্তেই দাতাকে লাথি মারে। আবার ভাবেন, টাকাটা দিয়ে তিনি প্রাইমারি স্কুলের টিনের চাল, নতুন দেয়াল করে দেবেন। পরে পরেই তার মনে হয়, লোকে বলবে, শালার শালা এতদিনে নাম ফুটাচ্ছে। তার এ সংকল্প বাতিল হয়ে যায়। সবশেষে ভাবেন, স্বরে আ আর ল, স্বরে আ আর ল তাকে এই হাওলাত শোধের বরাত থেকে মুক্তি দেবে না।

জহরৎ বিবির সমত্মান হয়। কন্যাসমত্মান। আর বিবি তার কন্যাটিকে আদর করে ডাকনাম দেন, আলতা।

আলতা! সঙ্গে সঙ্গে সোনার দরোজা খুলে যায় মোজাফ্ফর চাচার মনে। সোনার ধুলোর মতো তার মুখের ওপর আছড়ে পড়ে একটি নাম – তার দূরসম্পর্কের ফুপাতো বোনের নাম, আলতা বিবি। এই তো সেই আলতা এই তো সে তার সোনার বাজু দুটি বন্ধক দিয়ে তুলে দিয়েছিল দুহাজার সাতশো টাকা।

আঃ – আঃ – মোজাফ্ফর চাচা এপাশ-ওপাশ করতে থাকেন। তারপর মনে পড়ে যায় হসিত্মবাড়ি, মান্দারবাড়ি, হাওরার হাট পেরিয়ে দূর সেই ভারত সীমান্তের হরিষাল গ্রামে তার বোন আলতা থাকে। তারই তো সমান বয়সী। মুখখানা কি এখনো কি টলটলে মায়াময় আছে তার?

খুব ভোরে নিজেই জিপ চালিয়ে হরিষালের দিকে যাত্রা করেন মোজাফ্ফর চাচা। তাকে খুঁজে পেতে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে তার বোনের সন্ধান পাওয়া যায়।

তাঁই তো বিমারে বিমারে বয়সের আগে বৃদ্ধ হয়া কবে হতে বিছানায় পড়ি আছে। কাঁইও না আছে তাকে দেখার। হরিষালের মাজার হতে তাকে শিন্নি পাঠান হয়। কাঁই তাবিজ করা হয়। তবু না সে ভালো হয়। মোজাফ্ফর চাচা কুঁড়েঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। বিছানায় লীন হয়ে শুয়ে আছে আলতা বিবি। ভাই বোনে দেখা হয়। কোনো কথা উচ্চারণের দরকার হয় না। দেখা মাত্র চিনে যায় এই দুটি প্রাণ। আলতা বিবির মুখ স্বর্গের হাসিতে ভরে যায়। বলে, আসিছিস ভাই?

আলাম রে বোন। তোরে আমি মরতে দেব না। তোর চিকিৎসা আমি করাবো। নিজের টাকায় নয়। তোরে টাকায়। এই দ্যাখ, তোর সেই দুহাজার সাতশো টাকা।

নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মোজাফ্ফর মিয়া আকাশভাঙা অবাক হয়ে যান। কাগজের টাকা কখন কোন জাদুমন্ত্রে রুপার টাকা হয়ে গেছে। সেই ইংরেজ আমলে মহারানীর রুপার টাকা।

মোজাফ্ফর মিয়ার হাত থেকে একের পর এক টাকা পড়তে থাকে আর মহারানীর রুপার টাকাগুলো বদলে যেতে থাকে আকবর বাদশার মোহরে, আমরা শুনেছি। আমরা আরও শুনেছি, হাওলাতের বহি থেকে লাল প্রশ্ন চিহ্নটি মুছে গিয়ে সোনার অক্ষরে লেখা ফুটে ওঠে, এই হোক, এই তবে হোক। পৃথিবীর সমস্ত কাগজ সোনা হয়ে উঠুক