হাওয়ার সংকেত

লেখক:

মণিকা চক্রবর্তী

আমিন অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে মেইন সড়কে। মেইন সড়ক মানে বিশ্বরোড। চারদিক থেকে চারটি রাস্তা এসে মিশেছে এই সড়কটিতে। জব্বর মিয়ার চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়া সরু রাস্তার পুবপাশের খোলা জায়গায় অনেকটা জমির ওপর একটা বড় বটগাছ, সঙ্গে আরো কয়েকটা গাছ মিলে একটা আশ্রয় তৈরি করেছে। সড়কের পাশে এই জায়গাটি ঘিরে প্রতি সোমবার আর শুক্রবারে হাট বসে। সে-সময়টায় এখানে মানুষের ভিড়, হাসি, গান, কান্না, মারধর, হল্ল­া, গাড়ির ধোঁয়া, হর্ন। আজ তেমন লোকজন নেই। কে একজন একটা তরকারির ঝুপরি এনে রেখেছে। লোকটি বসে আছে বটতলায়। আমিন অন্ধ। ছোটবেলায় টাইফয়েডজ্বরে তার চোখ গেছে। ষোলো বছর ধরে সে মায়ের মুখে এ-কথাটি অসংখ্যবার শুনেছে। শুনতে-শুনতে টাইফয়েড নামক জ্বরকেও তার অন্ধ চোখের মতো নিজস্ব কিছু একটা মনে হয়। সে দেখে তার অনুভব দিয়ে। একটু আগে তরকারির ঝুপরি নিয়ে বসে থাকা লোকটিকে সে অনুভব করেছে সবজির গন্ধ আর কিছু সাংকেতিক আওয়াজ থেকে।

কিন্তু লোকটি কে হতে পারে, এটা নিয়ে সে ভাবছে। পরিচিত কেউ কি?  আজ এই সুনসান দুপুরে মেইন সড়কে এসে সে দাঁড়িয়েছে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। নিজের জীবনটা আর সইতে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে। প্রতিদিন তার রিকশাচালক বাপ তাকে একটা কথাই বলতে থাকে। আর তা হলো ‘ভিক্ষা কর, অহনে আমার বয়স হইছে। তোরে খাওয়াবে কে? ওই বটগাছের তলায় গিয়া বস-গা। হাত পাতলেই দিব। এত-এত ট্যাহা।’ আমিনের নিচ মুখে চেয়ে থাকা টানা চোখের পাতার তল থেকে জল পড়ে টপ্টপ্। মা-বাপ কেউ বোঝে না, আমিন ভিক্ষা করতে চায় না। সে অনেক আকুতি করে বাপকে বলে, ‘আমারে ওই এনজিওর স্কুলে দিয়া পাডাও আব্বা। আমি মাইনষের কাছে হাত পাততে চাই না।’

ও তুই দিগ¦জ হবি! আরে বটগাছের তলে দু-একখান হাটবারে গিয়া বস। দেখ ট্যাহা কেমনে হাইট্যা-হাইট্যা আহে।

অমিনের চোখের পাতার তলের চোখদুটো উদাস হয়ে কী যেন খোঁজে। সে বড় চোখদুটো মেলে আকাশের দিকে তাকায়। সে-চোখে আলো নেই আকাশ দেখার, তবু তার মন যেন আকাশটাকে ছুঁয়ে দেখতে চায়। সে অনুনয়-বিনয় করে বলে, ‘আব্বা আফনে আমারে এনজিও আফার স্কুলে যাইতে দেন। ওইহানে আমি ব্রেইল সিস্টেমে পড়ালেহা কিছু শিখছি আব্বা! কেলাস সিক্সের স্কুলডায় যাইবার চাই।’

‘হ্, এহন তোরে বিশ মাইল দূরের স্কুলে গাড়ি দিয়া পৌঁছামু? কী সখ? উনি কানা হইয়া জজ-ব্যারিস্টার হইব! আর একদিন যদি তোর মুহে এসব পিতলা খায়েশের কথা শুনছি তো এক্কেরে হাত-পা বাইন্ধা বটগাছের তলে থুইয়া আসুম। এহনি গাছের তুন ঠাইল ভাইঙা আনতাছি! দাঁড়া, পিডের ছর-চামড়া সব তুইল্যা ফালামু। তিনডা বড় বইন ঘরের ভিতরে, বিয়া-শাদি দিওন লাইগব। বটগাছের তলে বইলে একমাসেই হাজার ট্যাহা। বয়স হইছে, এহন আমার শইলডা এট্টু আরাম চায়। আর কত রিকশা টানবাম আমি? দামড়া ব্যাডা! আইজই তোর হাউস মিটামু হারামজাদা!’ তারপর অনেকগুলো চড়, কিল-থাপ্পড়। আমিনের মা দৌড়ে আসে। মায়ের পায়ের গোড়ালি সবসময় ফাটা। তাতে এক ধরনের রস বের হয় আর এই তীব্র আঁশটে গন্ধটি তাকে নিশ্চিত করে যে, মা দৌড়ে আসছে তাকে বাপের হাত থেকে বাঁচাতে।

আমিনের মুখে কোনো জবাব নেই। রাস্তায় এসে দাঁড়াবার আগে রাগে-দুঃখে সে ছোট্ট পেঁপেগাছটিকে খুবলে-খুবলে ছিঁড়েছে। টেনে-টেনে মাটির ভিতর থেকে আলগা করে দিয়েছে গোড়াটাকে। ছোট বোনটা এসে দাঁড়িয়েছিল তার পাশে। গাছটা ওরই লাগানো। হাতের মধ্যে লেগে থাকা পেঁপেগাছের কষে আমিনের হাতটা তখনো জ্বলছিল। সেই জ্বলা হাত নিয়েই সে দৌড়াতে-দৌড়াতে বের হয়ে আসে বাড়ি থেকে। কিছুটা পথ দৌড়ানোর পর রাস্তার কোণ-ওঠা ইটগুলো যখন পায়ের পাতায় খোঁচাতে শুরু করল, তখন সে বাধ্য হয়েই বসে পড়েছিল একটু দূরে কালভার্টের ওপর। সব ভাবনা এসে জড়ো হলো মাথায়। ‘আব্বার কথাও তো ঠিক। আর কতদিন রিকশা টানব!’ সত্যিই তো, কেমন করে সব সমস্যার সমাধান করা যায়? কিন্তু আমিন জানে, একবার ভিক্ষে করতে বসলে আর সে মানুষ থাকবে না। একটা অসম্ভব যন্ত্রণাকে ঢোক গিলে সে সাবলীল হতে চায়। তবু চোখের গভীরে অনেক দূরবিস্তৃত অন্ধকার কাঁপে। মায়ের গায়ের গন্ধটা নাকে বাজে। ‘এমন জন্ম দিলা কেন মা? এইরম বাঁইচ্যা কী লাভ!’ ‘কয়দিন আগে তাদের গ্রামের এক মেয়ে বিষ খেয়ে মরেছিল। আমিন সে-কথা মনে করে। ‘তয় কি বিষ খামু! এরুম বাঁচনের তুন মইরা যাওন ভালা’। তারপর আবার ভাবে, মায়ের কী দোষ! ছুডুবেলায় টাইফয়েডে চোখ নিছে। আর পাশাপাশি সে অনুভব করতে থাকে এনজিওর আপাকে, যার মুখ সে দেখেনি; কিন্তু হাতের স্পর্শে সে একটু-একটু করে আবিষ্কার করেছে জীবনের বাইরের অন্য জীবন। এনজিওর আপা আরো অনেক সুন্দর-সুন্দর কথা বলে। একজন অন্ধ মেয়েই নাকি অন্ধদের পড়া আবিষ্কার করেছিল। আপা ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা বলে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে বসে লেখাপড়া শিখেছিল। এসব সুন্দর-সুন্দর কথা বলতে-বলতে আপা তার আঙুলগুলো বসিয়ে দিত ডটের ওপর। আর সেসব ডট তাকে চিনিয়ে দিত নানা রঙের রং, মুখ, আনন্দ, ব্যথা, সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রকে। চোখের অন্ধকার থেকে যায়, তবু আলো জ্বলে আত্মায়। সকালবেলার ঘাসের ওপর পা ফেলার আনন্দের মতো কী এক উচ্ছ্বাসে সে মাত্র দুবছরে শিখে নিয়েছিল অনেক কিছু। মাত্র সতেরো বছরে সে দেখেছিল জীবনের না-দেখা অনেক দিক। এনজিওর আপা বলে ব্রেইল সিস্টেম। সে সিস্টেমের  মধ্যে দিয়ে তার এই অন্ধকার কালো রঙের জীবন কেমন স্বপ্নময় গোলাপি হয়ে ওঠে। ভেতরে ভেতরে একটা তীব্র প্রতিবাদ তাকে তাড়া করে। না, এই দুঃস্বপ্নের জীবন তার নয়। সে বড় ক্লাসে পড়বে। তাকে যেতেই হবে। যদিও অনেক দূরের সেই পথ।

অন্ধ নিয়তিকে সঙ্গে নিয়েই সে কালভার্টের ওপর থেকে নেমে এসে  দাঁড়ায় মেইন সড়কে। যতদিন এনজিওর স্কুলটা তাদের পাশের গ্রামে ছিল, ততদিন আমিনের সমস্যা ছিল না। এখন স্কুলটা বড় হওয়ায় অনেক দূরে চলে গেছে। শুনেছে, এনজিওর স্কুলটা বিশ মাইল দূরে। কোন বাসে উঠে সে যেতে পারবে তা বুঝতে পারছে না। তাছাড়া স্কুলটি সম্পর্কে আশপাশের নিরীহ লোকেরা কিছুই জানে না। এ-বিষয়টি নিয়ে সে কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে পারছে না। কারণ ওর এই স্কুল যাওয়ার তাড়নার কথা বাপের কানে গেলে ওর মাকেও নানা গঞ্জনা সইতে হবে। নানা প্রকার ভাবনার শেষে কিসের এক তীব্র হাতছানিতে শেষ পর্যন্ত যে-কোনো একটা বাসে সে উঠেই পড়ে। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। মেইন সড়কে দাঁড়িয়ে থেকেই সে টের পাচ্ছিল দিনের শেষের হাওয়া। কোন বাস কোনদিকে যাচ্ছে কিছু না জেনেই সে উঠে পড়ে বাসে। বাসে খুবই ভিড়। বসার জায়গা পাচ্ছিল না সে। একজন মহিলার পায়ে পা লাগতেই মহিলাটি চেঁচিয়ে উঠল। ‘দেহস না! কানা নাহি!’ ‘আমিন চুপ করে থাকে। ওর বুকটা মুচরে ওঠে, গলার স্বর বন্ধ হয়ে আসে। পকেটে দশটা  টাকা ছাড়া তার কাছে আর কিছু নেই। তবে ঠিক এ-মুহূর্তে তার নিজেকে খুব স্বাধীন মনে হতে থাকল। তারপর মহিলার কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ই সে বলল, ‘খালা আমি আন্ধা মানুষ। সত্যই চোক্ষে দেহি না। মাফ কইরা দিয়েন।’ আমিনের কথা কয়টি বাসের নানা হট্টগোলের মধ্যেও মহিলার কানে গেল। যদিও সে বলছিল খুব মৃদুস্বরে।

হাছাই দেহস না! কী কস! তোর চোখগুলান তো ভাসা। কী সুন্দর! আহা রে, এই চক্ষে আন্ধার দেহস!  বস, বস, আমার লগে বস। এই কথা বলার পর মহিলাটি নিজে বেশ খানিকটা চেপে বসে আমিনের জন্য সামান্য জায়গা বের করে নিজের পাশেই বসতে দেয় তাকে। একটু পর বাসের কন্ডাক্টর এলে আমিন তার জমানো একমাত্র সম্বল দশ টাকা পকেট থেকে বের করে দেয়। কন্ডাক্টরকে গন্তব্য ও ভাড়া সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না করে দশ টাকা বের করে দেওয়ার ভঙ্গি দেখেই মহিলাটি আঁচ করে নিল, আমিন ঘর-পালানো ছেলে। আর সে এও বুঝে নিল এই ছেলেটি তার গন্তব্য সম্পর্কে কিছুই জানে না। মহিলাটি কন্ডাক্টরকে বলল, ‘হে আমার লগে যাইব। ওর ট্যাকা ওরে ফিরাইয়া দেন। ওর ভাড়া আমি দিতাছি।’ আমিন কোনো কথা বলার সুযোগই পেল না। মহিলার গায়ের ঘাম থেকে ভেসে আসা ঝাঁঝের গন্ধে মনে হয় এই মহিলাটি তার মায়েরই বয়সী হবে। বাসের জানালা দিয়ে আসা ধুলোময় বাতাসে সন্ধ্যার গন্ধ লেগে আছে। একটু পরেই রাত নামবে। সে ভাবল, ‘ভালোই হলো, আজকের রাতটা খালার বাসায় থাইকাই স্কুলের খবর নেওয়া যাইব। আর যদি এনজিও আপার লগে সাক্ষাৎ হয় তাইলে তো কথাই নাই। দরকার পড়লে এনজিও আপার বাসায় কাম-কাজ করুম। তবু পড়াডা শিখুম।’ অনেক ভিড়ের মধ্যে, বাস থামার স্টপেজের মধ্যে, না জানা মহিলার বিরাট শরীরের উষ্ণতার ওমের মধ্যে, চলতি বাসের দুলনিতে আমিনের সমস্ত মন জুড়ে উথাল-পাতাল স্বপ্ন ভাসে। সন্ধ্যার পরপরই বাসস্টপেজে নেমে সেই মহিলার সঙ্গে আমিন যেতে থাকে। অচেনা পথ, তবু সব পথের মতোই সে পায়ের পাতা দিয়ে অনুভব করতে থাকে পথের মসৃণতা আর কখনো-কখনো ইট-সুড়কির যন্ত্রণা। আকাশে মনে হয় চাঁদ উঠেছে। হঠাৎ একটা স্নিগ্ধ হাওয়া বয়ে যায়, আর তাকে নিশ্চিত করে ওরা যে-পথে যাচ্ছে তার চারপাশের গাছের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে জোছনা। পথে যেতে-যেতে আরো পদশব্দে ব্যস্ত হয়ে ওঠে রাস্তা। এক চেনা লোক জিগ্যেস করে বসে, ‘হানিফার মা, এই ছ্যারাডা কেডা? আমাগো ভাটপাড়া গেরামের বইলা তো মনে হয় না! বুজি, আফনে যে বাসের তুন নামলেন হেই বাসের তুন আমিও নামলাম। দেখলাম ছেড়াডা আফনের লগ ধরছে। ‘হানিফার মা তাৎক্ষণিকভাবেই উত্তর দিলো, ‘হ, হে আমার ভাইপুত। দূরসম্পর্কের। অনেকদিন যাওয়া-আসা নাই। গাড়িত উইঠা পড়ছে, পোলাপাইন মানুষ, তাই তারে বাড়িত লইয়া যাইতাছি। দুইদিন রাইখা বাড়িত খবর দিমু।’

আমিন খুব অবাক হলো হানিফার মায়ের এই তাৎক্ষণিক উত্তরে। সেইসঙ্গে গাছের উপর থেকে তীব্র কর্কশভাবে অন্ধকারে ডেকে উঠল একটা পাখি। কী যেন এক আশঙ্কায় ওর ছোট্ট বুকটা ধক্ করে উঠল হঠাৎ। কী জানি সে যাচ্ছে কোথায়? কতগুলো রাস্তা পেরিয়ে, ধানক্ষেতের সীমানা পেরিয়ে!

 

দুই

খালার বাড়িতে গিয়ে দুদিনের মধ্যেই আমিনের ভালো লাগতে শুরু করল। খালার দশ বছরের মেয়ে হানিফা আর তার দাদি ছাড়া সংসারে আর কোনো পুরুষ নেই। হানিফা বয়সে তার একটু ছোটই হবে। হানিফা সারাদিন একা-একা কথা বলে আর ঘরের কাজ করে।  তাতে আমিনের সুবিধা হয়। সে কান খাড়া করে শোনে, হানিফা কী- কী বলে। সে বোঝে, তার ডাইনে-বাঁয়ে হানিফা অনবরত চলাফেরা করে। দাদিকে বকে, খারাপ প্রতিবেশীকে গালি দেয়। শালিক পাখি উঠোনের ময়লা বাসনে বসে কিচির-মিচির করলে হানিফা তাকেও গালি দেয়। আর চুলে দু বেণি দুুলিয়ে সারাক্ষণই ছোটাছুটি করে। সেসব বেণিতে থাকে প্যারাসুট তেলের গন্ধ। হানিফা পাশ দিয়ে গেলে তার গা-টা কেমন যেন ছমছম করে। গা গরম হয়ে ওঠে। হলুদ রোদে তাতানো পুকুরের পানির ওপরটাও এমন গরমই থাকে  চৈত্র মাসে। একবার পানির তলে ঢুকে পড়ো, তারপর কেবল ঠান্ডা। হানিফারে তার এমনই মনে হয়। হানিফার শরীরের থেকে একটা সুবাস ভাসে নাকে। ঠান্ডা মিষ্টি সুবাস। ওই সুবাস সে-বাড়ির উঠানের তারে শুকাতে দেওয়া হানিফার জামা-কাপড়ের মাঝেও পায়। কখনো ছোটাছুটি থামিয়ে গোমড়া মুখে সে দাদিকে প্রশ্ন করে, ‘দাদি, আমার বাপ আমাগোরে থুইয়া হেই যে নিরুদ্দেশ হইল, আর আহেনা কে? জ্ঞান হইছে, তলক দেখলাম না আব্বারে। হে কি আর আইবো না?’

দাদি কয়, ‘সবই কপাল। একদিন বেহান বেলায় কইল ঢাকা যাইতাছি আম্মা, দোয়া করেন। আমরা হক্কলডি বেক্কল হইয়া কইলাম কী কস! তোর গেন্দা আর বউ পালব কেডায়?’ ‘হে কইল, চিন্তা কইরেন না। মাসে-মাসে ট্যাহা পাডামু। ঢাকা শহরে মেলা ট্যাহা। ‘কোন কতা হুনল নারে বইন! হেই যে গেল আর গেল। তর মায় বলে তোর বাপেরে একদিন ঢাকা শহরে খোঁজ পাইছিল। একটা মরা মানুষ রে সাদা কাফনে ঢাইক্যা ফুটপাতে বইসা মাইনষের কাছ থেইকা ট্যাহা উডাইতেছিল। তর মায় কয়, ওই ব্যাডা ঠিক তোর বাপের লাহান। তর মায় সামনে গেল, অনেক কথা জিগ্যাইল কিন্তু হে কোনো কথাই কইল না। পরদিন তোর মায় আমাগো গেরামের এক ব্যাডারে লইয়া গেল, যাইয়া দেহে হে ওইহানে নাই। আর খুঁইজ্যা পায় নাই। এহন তর মায় ঢাকায় ব্যবসা করে, কত ব্যাডাগুনের লগে চলে, একদিন ঠিক তোর বাপেরে বাড়িত লইয়া আইব। তুই চিন্তা করিস না বইন। যা যা, কাম কর। আমিন ছেড়াডারে খাইতে দিছস!’

হানিফার সেদিন খুবই মন খারাপ। সে বলতে থাকে, ‘ছেড়াডা আমাগো বাইত আর কয়দিন থাকবো? হে রে আম্মা কেন ধইরা আনল? নিজে ঢাকা যাইয়া কী করতাছে? এই কানা ছেড়ারে আমার ওপর থুইয়া গেল! ’

আমিন মাত্রই বাড়ির একটু দূরে পুকুর থেকে গোসল সেরে ফিরেছে। সে অবাক হয়ে শুনতে পেল দাদি আর হানিফার কথা। ‘এই ছেড়াডারে মায়া করিস বইন। তোর মায় হেরে তোর লগে বিয়া দিয়া ঘরজামাই রাখব। তারপর ঢাকা শহরে একবার ভিক্ষায় বইলে ট্যাহার অভাব নাই। তর মায় আর কত গেরামের মাইয়াগোরে নিয়া শহরের কামে দিব? বেগম সাহেবেরা ধইরা-ধইরা মারে। খাওনও দেয় না ঠিকঠাক। এহন হক্কলে গার্মেন্টে যায়। বাসাবাড়ির কাম করতে চায় না। হের লাইগা বুদ্ধি কইরা ছেড়াডারে আনছে। মায়া কইরা রাহিস। ভারি ভদ্দর পোলা। কেমন সুন্দর মুখখান! মায়া করিস।

গোসল সারার পর আমিন নিজের গায়ের গন্ধ শুকতে ভালোবাসে। হানিফা মাঝে-মাঝে আমিনের মুখের সামনে আয়না ধরে বলে, গোসল সাইরা নিজের মুখখান আয়নায় দেখেন না কেন? আবার হতাশ হয়ে নিজেই বলে, ‘দেখবেন ক্যামনে? আপনে তো কানা। আপনে তো আমারেও দেহেন নাই। মায় কয় আমি বলে পরীর লাহান সুন্দর। আমার গায়ের রং শ্যামলা। তবু মায় কয় কত  সুন্দর। তয় আপনে কিন্তু কানা হইলেও চেহারা ভালা। আপনার কিন্তু ঠোঁটের আগায় মুচ উঠছে। এই যে এহানে। আপনে তো দেখতে পারেন না, তাই আমিই দেখাইয়া দিলাম।’ হানিফা তার ঠোঁটের আগা টিপে দেয় তার বুড়ো আঙুল দিয়ে। একধরনের মুগ্ধতার বোধ তৈরি হয় আমিনের। একটা মিষ্টি আর তীব্র অনুভবে সে আর কথা বলতে পারে না। কেমন অবশ-অবশ লাগে।

গোসল সেরে এসে আজো আনমনা হয়ে বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে নিজের গন্ধ নিচ্ছিল আমিন।  ঠিক সেই সময়ে হানিফার সঙ্গে দাদির কথাবার্তাগুলো ওর কানে আসে। হতাশায় তার কপালে ঘাম ফুটে ওঠে। তার মনে হয় এক্ষুনি সে দৌড়ে পালাবে; কিন্তু পালাবে

কোথায়? তবু সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে না। ভাতের গন্ধ, দাদির পান-তামাকের মিশ্র গন্ধ মিলেমিশে চারদিকের বাতাসটা ভারি হয়ে আসে। আমিন টলতে-টলতে পুকুরের ধারে গিয়ে বসে পড়ে। হাতের কাছে পাওয়া দু-চারটি ঢিল পরপর মারতে থাকে পুকুরের জলে। সে বসে থাকে চুপচাপ, আলোহীন দুচোখে নামে জলের ধারা। সবাই তাকে দিয়ে ভিক্ষাই করাবে! বড় একা লাগে। তবু এক স্বপ্নের আবেশ তাকে জড়িয়েই থাকে। তার বারো বছরের মন যেন হঠাৎ পরিণত হয়ে নতুন উদ্যোগ নিতে চায়। পুকুরের ধারের মাটির ওপর উঠেছে কিছু সবুজ ঘাস। আমিন চোখের জল মুছে সেই ঘাসে হাত বুলায়। তার মনের ভেতর জেগে-ওঠা এক তীব্র হাহাকারকে সে ছড়িয়ে দিতে চায় নীরবে। তারপর সে সিদ্ধান্ত নেয়, আর এক মুহূর্ত সে এখানে থাকবে না। পেটের ভেতর তীব্র ক্ষুধা নিয়েও সে হেঁটে এগোতে থাকে। সে ভাবে, তার চোখ অন্ধ কিন্তু তার মন এখনো অন্ধ হয়ে যায়নি। অথচ চারপাশের চতুর লোকেদের চোখ ও মন দুটিই অন্ধ হয়ে গেছে। এসব ভাবনা নিয়ে সে কোনো এক অজানা পথের দিকে হাঁটতে থাকে। যে-পথ দিয়ে সে এসেছিল এটা সে-পথ নয়। তার পায়ের পাতা তাকে ভিন্ন অনুভবের কথা বলতে থাকে। বেলা যেতে কতক্ষণ! আবার কখন সে গাড়িতে উঠে পড়তে পারবে এই ভাবনা অচেনা পথেও তার চলার গতি বাড়িয়ে দেয়। অচেনা রাস্তায় দ্রুত চলতে গিয়ে সে হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ততক্ষণে সে গ্রাম পেরিয়ে অনেকটুকু এসে গেছে। পড়ে যাওয়াতে তার হাঁটুর অনেকটুকু ছিঁড়ে গিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। বোকার মতো সে দাঁড়িয়েই থাকে কিছুক্ষণ। ওর পাশ দিয়ে হুন্ডা নিয়ে যাওয়ার সময়  কেউ একজন হুন্ডা থামিয়ে এসে তাকে বলে, ‘আরে বেটা, বহুত রক্ত ঝরতাছে। চল, তোরে স্বাস্থ্য কিলনিকে লইয়া যাই। ডাক্তার আপায় ব্যান্ডেজ দিয়া দিব।’ একটু ভয়ে-ভয়ে সে উঠে পড়ল অন্যের হোন্ডায়। যদিও এই ছোট বয়সেই সে জেনে গেছে, জীবনে বাঁচতে গেলে তার কোনো ভয় থাকতে নেই। তার আছে একমাত্র নিজস্ব একটু স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার লড়াই।

 

তিন

স্বাস্থ্য ক্লিনিকে যাওয়ার পথেই সে তার স্কুলের ঠিকানাটা হোন্ডায় চড়ে বসা মোটাসোটা ভালো লোকটির কাছ থেকে জেনে নেয়। লোকটি যে খুব মোটা আর ভালো, সে হোন্ডায় বসে টের পেয়েছিল। ভালো লোকদের গায়ের গন্ধটা অন্যরকম। কেমন করে জানে! হাওয়া কি? কী এক অজানা হাওয়ার সংকেত তাকে চালিত করে। সেই লোকটিই তাকে স্কুল চিনিয়ে দেয়। আমিন খুব অনুনয় করে স্কুলটির কথা বলেছিল একটু সময়ের ফাঁক-ফোকরের মধ্যে দিয়ে। অন্ধকার এসে আজকের দিনটি শেষ হয়ে যাওয়ার ঠিক একটু আগেই সে নির্দিষ্ট স্কুলটিতে পৌঁছে গিয়েছিল লোকটির হোন্ডায়। ব্যান্ডেজ দেওয়ার পরও পা ছিলে যাওয়ার ব্যথাটা তাকে তখনো ভোগাচ্ছিল। সে একবারও ভালো লোকটির নাম জানতে চায়নি, অথচ তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া খারাপ বিষয়গুলোর কোনো নোনতা স্বাদকেও মনে রাখতে চায়নি। সে শুধু অনুভব করেছিল গতি আর গতিহীনতাকে। স্কুলে এসে আমিন নিশ্বাস ভরে নিয়েছিল সুগন্ধ।

বাড়িতে ফিরে গেছে আমিন। স্কুল বাড়ি থেকে সতেরো মাইল দূরে। দিনের কিছুটা সময় তাদের এলাকার ছনু মাতবরের আলুবাগানে সে কাজ করে। যা কয় টাকা পায় মায়ের হাতে দেয়। আর রাত বারোটার পর সে হাঁটতে থাকে তার স্কুলের পথে। রাতের রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। সে নিরাপদ বোধ করে। স্নিগ্ধ চাঁদের আলোয়, অথবা ঘোর অন্ধকারে হাঁটতে থাকে সতেরো মাইল পাড়ি দেওয়ার জন্য। হুতুমপেঁচা গাছের ওপর বসে ডাকে। রাস্তা জুড়ে ইউক্যালিপটাসের পাতারা দিয়ে যায় কুয়াশা আর ধোঁয়ার সংকেত। অনেক পথ। পা ঘষে-ঘষে সে চলতে থাকে। কারণ সে জানে, ওই স্কুলটায় সে জন্ম নেবে নতুন করে।