হিসাব

লেখক: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

দুবাই থেকে ছ-সাত ঘণ্টা উড়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট নেমে ট্যাক্সিতে হোটেলে যেতে যেতে ড. তানজিম হাসানের মনে হলো, এরকম বিষণ্ণ শহর সে কখনো দেখেনি। ফেব্রুয়ারি মাস শেষের পথে, কিন্তু শীত প্রচণ্ড । সকাল থেকে তুষার ঝরেছে। এখন বেলা এগারোটা। রাস্তায় এক ফোঁটা রোদ নেই, আলো ফুটেছে, তবে আঁধারের শর্ত মেনে। দুদিকের দালানগুল মাথায় তুষার মেখে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে। পাতাহীন উঁচু গাছগুলো ধূসর, যেন অকাল-বার্ধক্যজ্বরে ধুঁকছে। ট্যাক্সিচালক সুরেলা শিস দিচ্ছে, নিজেকে না তার গাড়িকে চাঙ্গা রাখতে, কে জানে। তানজিমের বিরক্তি লাগছে। কিন্তু লোকটাকে শিস থামাতে বলবে, সে-সাহস নেই। হোটেল পর্যন্ত সহ্য করতে হবে।

এয়ারপোর্টে মামুন আসার কথা ছিল, ছোটবেলার বন্ধু, ডাক্তার, যে থাকে খুব কাছেই, লিমবার্গে। কিন্তু দুবাই থাকতেই ই-মেইল খুলে দেখেছে, সে লিখেছে, স্ত্রী অসুস্থ। তানজিমকে ট্যাক্সি নিতে হবে। চোখ বুজে মামুনকে দেখেছে সে, দুবাইতে বসেই, নাঈমার কপালে পট্টি লাগাচ্ছে, দু-এক অবাধ্য চুল সরিয়ে দিচ্ছে। নাঈমার চোখ বোজা, ঠোঁট দুটিতে ক্লান্তি । কিন্তু সেই ক্লান্তি মুছে দিচ্ছে মামুনের সতেজ ঠোঁট, পালক ছোঁয়ায়।

শালা ফ্রাঙ্কফুর্ট – মনে মনে শহরটাকে একটা গাল দিলো তানজিম।

ত্রিশ বছর বয়সেই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের পরিচিতি জুটে গিয়েছিল তানজিমের। ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডিখেতাব নিয়ে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিল, এক থিংক-ট্যাংকেও ঢুকে পড়ল বুদ্ধিদাতা হিসেবে। বুদ্ধি তার প্রচুর ছিল, জ্ঞানও – সেসব এখনো আছে। দু-এক গোলটেবিলে দেশের অর্থনীতি নিয়ে সে যেসব মমত্মব্য করল, সেগুলি পড়ে বিশেষজ্ঞরা বুঝলেন, ছেলেটি থাকতে এসেছে। একে নজরে রাখতে হবে।

চৌত্রিশ বছর বয়সে ড. তানজিম বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক হয়ে চমক দেখাল। ফেসবুকে গাঁদাফুলের মালা গলায় তার হাসিমুখ ছবিতে কয়েকশো লাইক পড়ল। এর দুদিন পর উপাচার্য তাকে ডেকে অভিনন্দন জানালেন। রহস্যময় এক হাসি হেসে বললেন, ‘এবার দেশের উন্নয়নে নামতে হবে।’

অবশ্যই। দেশের উন্নয়ন তো তানজিমও চায়। কে না চায়।

উপাচার্য খুশি হলেন।

এর মাসখানেক পরই ঝলমলে আয়োজন করে, মিডিয়া ডেকে, ফিতা কেটে, অর্থনৈতিক পলিসি অধ্যয়ন কেন্দ্রের উদ্বোধন করলেন। উপাচার্য লম্বা বক্তৃতা দিলেন। বললেন কেন্দ্রের সভাপতি, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ, ড. তানজিম হাসানের হাত ধরে এই কেন্দ্র বাংলাদেশকে উন্নয়নের রাস্তায় নিয়ে যাবে।

বক্তৃতার মঞ্চে উপাচার্যের পাশে বসে ড. তানজিমের মনে হচ্ছিল, উন্নয়নটা বোধহয় দরজা পর্যমত্ম এসেই গেছে। দরজা খুললেই স্লোগান দেওয়া যাবে ‘উন্নয়নের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম।তোর মনটা আনন্দে ভরে গেল। সে একটা ঘোরের মধ্যে দরজার দিকে তাকাল। দরজা খুলল। কিন্তু যিনি ঢুকলেন, তিনি উন্নয়ন নন, তিনি ড. হাদীউজ্জামান। আরেক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। তানজিম থেকেও বিশিষ্ট, বয়সেও এগিয়ে। আটত্রিশ।

তাকে দেখে তানজিমের ঘোর ভেঙে টুকরো হলো, আনন্দের ভাবটা উবে গেল। একটা অস্বস্তি বরং পেয়ে বসল।

কেন?

কারণটা জটিল।

একটা কারণ মহুয়া। তবে সে-কারণে পরে যাওয়া যাবে। আপাতত কারণ আরো দুটো। একটা অগ্রাহ্য করা যায়, অন্যটা গ্রাহ্য করতে হয়।

অগ্রাহ্য করার মতো কারণ হচ্ছে, ড. জামান দাবি করছেন, সম্প্রতি বিদেশের এক নামী জার্নালে ড. তানজিম ফিসক্যাল পলিসির ওপর যে একটি প্রবন্ধ লিখেছে, তার মূল ধারণা সে ড. হাদীর এক বক্তৃতা থেকে নিয়েছে। ড. তানজিম জানে, এই অভিযোগ ধোপে টেকে না। বিষয়টিতে তার পাণ্ডিত্য অগাধ, পিএইচডিও করেছে এ-বিষয়ে। আর ড. হাদী কিনা তাঁর বক্তৃতায় কথা বলছিলেন মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

আর গ্রাহ্য করার মতো কারণটা হলো, গতবার বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির নির্বাচনে ড. জামান সভাপতির পদে দাঁড়িয়েছিলেন, এবং তানজিমকে বলেছিলেন, তাঁর প্যানেলে সাধারণ সম্পাদক পদে দাঁড়াতে। তাতে ঢাকা-চট্টগ্রামের যোগসূত্রটার গুরম্নত্ব বাড়বে। তাঁকে বিনয়ের সঙ্গে তানজিম বলেছে, সম্ভব নয়। যিনি এই পদে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর পক্ষ কথা দেওয়া হয়ে গেছে। ড. জামান হেরেছিলেন, এবং হারের জন্য তানজিমকে দায়ী করেছিলেন। তানজিম জানে লোকটা একটা বদলা নেওয়ার মওকায় আছে।

তবে ড. জামানকে বিনয়ের সঙ্গে কথাগুলো বললেও ভেতরে ভেতরে রেগে ছিল তানজিম। রাগার কারণ মহুয়া।

সেই কারণে একটু পরে যাওয়া যাবে।

অধ্যয়ন কেন্দ্রের উদ্বোধনপর্ব শেষ হলে উপাচার্য দূর থেকে ড. জামানকে ডাকলেন। ‘আসেন, আসেন, জামান সাহেব।’ তিনি আন্তরিকভাবে ডাকলেন, ‘চা খান। কতদিন আপনাকে দেখি না।’

তানজিমের বিভাগে একটা চাকরির জন্য কিছুদিন উপাচার্যের কাছে নিয়মিত ধরনা দিয়েছেন ড. জামান, আজ একগুচ্ছ ফুল নিয়ে এসেছেন ড. জামান। ‘অভিনন্দন। আবারো।’ তিনি তানজিমকে বললেন।

ফুলের গোছা হাতে নিতে নিতে তানজিমের মনে হলো, পথের পাশের কোনো আবর্জনার সত্মূপ থেকে যেন তিনি এগুলো তুলে এনেছেন। ফুলগুলো মরা, পাপড়িতে কালো ভাঁজ। তিনদিনের বাসি ফুল।

‘কাল একুশে। কোথাও তাজা ফুল নেই। স্যরি। এক দোকানে তা-ও এগুলি পেলাম’ – ড. জামান বললেন।

তানজিমের ইচ্ছা হলো ফুলগুলো মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দেয়।

‘ধন্যবাদ।’ শুকনো গলায় সে বলল।

বিবর্ণ ফুল হাতে, উপাচার্য আর ড. জামানের সঙ্গে সহকর্মী সুলতানার তোলা তানজিমের ছবিটা রাতে সে ফেসবুকে দিলো। একটা রাগ থেকেই। রাগটা তৈরি হয়েছে উপাচার্য ড. জামানকে পেয়ে তাকে সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়ার কারণে। ড. জামান বছরখানেক থেকে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে এক আমত্মর্জাতিক সংস্থায় মোটা বেতনে কাজ করছেন। উপাচার্যের শ্যালক সেই সংস্থায় চাকরি পেতে আগ্রহী। ড. জামানকে ফোন করে তাই তিনি আসতে বলেছিলেন। তাঁর শ্যালকও ছিল ধারেকাছেই আর কৃপাপ্রার্থীর মতো ড. জামানের পায়ে পায়ে ঘুরছিল।

 

দুই

ফ্রাঙ্কফুর্টে তানজিমকে থাকতে হবে পাঁচদিন। এই পাঁচদিন তাকে ঘুরতে হবে, কথা বলতে হবে, খাবার খেতে হবে, সভায় উপস্থিত থাকতে হবে, শপিং করতে হবে ড. হাদীউজ্জামানের সঙ্গে। ফ্রাঙ্কফুর্ট নেমেই যে-শহরটাকে তার বুড়া আর বিষণ্ন মনে হয়েছিল, তার মূল কারণ এই হাদীউজ্জামান। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের সঙ্গে একটা মূল্যবান সভা আছে, সভা চলবে দুদিন। তিন নাম্বার দিনে মন্ত্রী আসবেন। চার নাম্বার দিনে একটা চুক্তি সই হবে। চুক্তিটা হওয়া-না-হওয়ার ওপর মন্ত্রীর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি আদাজল খেয়ে নেমেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও কর্তাব্যক্তিরা এসেছেন, তবে তারা কোথায় থাকবেন, কোন হোটেলে, তানজিম জানে না। জানার আগ্রহও নেই। তার আগ্রহ শুধু একটা : আলোচনার দাবাখেলায় নৌকা উল্টে দেওয়া। তার বিশ্বাস আছে, সে পারবে।

মন্ত্রী তাকে বলেছেন, আলোচনার সফলতার ওপর, চুক্তি হওয়ার ওপর ড. তানজিমেরও অনেক পাওয়া নির্ভর করছে।

অনেক পাওয়া?

হ্যাঁ। যোগ্যতার পুরস্কার দিতে কোনো কার্পণ্য তাঁর নেই, তাঁর সরকারেরও নেই।

তানজিম অবশ্য এই পুরস্কার সম্পর্কে জানে। এটি, যাকে বলে, প্রকাশ্য গোপনীয়তা। অনলাইন কাগজগুলিতে এ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য যে একটা উচ্চক্ষমতার কমিটি হতে যাচ্ছে, যা করার জন্য তাড়া দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, তার প্রধান হতে যাচ্ছেন ড. তানজিম হাসান। এত অল্প বয়সেই!

আরেকটি নামও অবশ্য আলোচনায় আছে। তিনি আমাদের হাদীউজ্জামান। একসময় ওই নামটিই সবার ওপরে ছিল। এবং যতদিন ছিল, মানুষজন ধরে নিয়েছে পদটা তিনিই পেতে যাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রীর গ্রামের মানুষ, সরকারি দলের শিক্ষক-নেতা, খবরের কাগজে সরকারের পক্ষ কলমধরা মানুষ, আবার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদও। তিনিই তো পদের দাবিদার।

কিন্তু মাসদুয়েক থেকে ড. তানজিমের পালে বাতাসটা বেশি। কারণ তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। ব্যাংক খাত নিয়ে তার চিন্তাভাবনাগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন সব পশ্চিমা সংস্থা আর রাষ্ট্রদূতরা। ব্যাংক খাত সংস্কার নিয়ে যত গোলটেবিল হচ্ছে, তাতে প্রধান বক্তা তানজিম। বিষয়টি অর্থমন্ত্রী তাঁর খাতায় টুকে রেখেছেন। ফ্রাঙ্কফুর্টের এই মূল্যবান সভায় তিনি তাঁকে ডেকেছেন।

ড. হাদীউজ্জামানও যে ডাক পাবেন, তানজিম তা জানতো। কিন্তু তাই বলে থাকতে হবে একই হোটেলে? ফ্রাঙ্কফুর্টে এক-দেড়শো হোটেল তো আছে, কিন্তু এই এক লিওনার্দো রয়েল হোটেলেই?

অর্ধেক রাস্তা আসতে না আসতেই ড. তানজিমের বমির ইচ্ছা জাগল। কিন্তু বমি যে করবে, কীভাবে? একি আর ঢাকা যে গাড়ির জানালা খুলে মাথা গলিয়ে দিলেই হলো? বাকিটা দেখার জন্য আছে বেচারা রাস্তা। অথবা রাস্তায় ঘুরঘুর করে যে নেড়ি কুকুরের দল, তারা।

অবাক, নেড়ি কুকুরগুলোর কথা মনে পড়লে একটা ভিন্ন বিষাদ চেপে ধরল তানজিমকে। এই বিষাদের উৎস স্মৃতিকাতরতায়। ঢাকাকে তার প্রবলভাবে মনে পড়ল। তার ভেতরের শূন্যতাটা আরো বাড়ল। শূন্যতাটা একটা খসখস স্পর্শ নিয়ে এলো, যেন ছুঁয়ে দিলে রক্ত ঝরবে।

‘শালা জামান।’ সে বলল।

শিস থামিয়ে ট্যাক্সিচালক বলল, ‘কিছু বললেন?’

‘আর কতদূর?’

‘এই একটুখানি’, ট্যাক্সিচালক বলল, ‘পাঁচ-সাত মিনিট’।

 

তিন

হোটেলে ঢুকতেই তানজিমের বিরক্তিটা বাড়ল। কাউন্টারে লম্বা লাইন। হোটেলের দুই মাঝবয়সী কেরানি লাইনের লোকগুলিকে সামলাচ্ছে, কিন্তু তাদের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, একটা লঙ্গরখানায় যেন তারা ভুখা মানুষকে খাবার দিচ্ছে। এক ফোঁটা হাসি নেই মুখে। লাইনে দাঁড়িয়ে লোকদুটোকে একটা গালি দিলো তানজিম। তার ধারণা হলো, আধাঘণ্টা লেগে যাবে কাউন্টারে নাম লিখিয়ে রম্নমের চাবি পেতে। একটা আশঙ্কাও দেখা দিলো : ড. হাদীউজ্জামান যদি হঠাৎ উদয় হন। যেরকম নাক গলানো মানুষ। তার ওপর তানজিমের মুহূর্তগুলিকে বিষময় করে তুলতে তাঁর বিরল কুশলতা। একটা শয়তান লোক, তানজিম এভাবেই ড. হাদীউজ্জামানকে ভাবতে ভালোবাসে। তাঁর থেকে একশ হাত দূরে থাকাই ভালো।

দূরে থাকার ব্যবস্থা একটা সোনালি চুলের মেয়েই করল। কখন সে একটা নতুন কাউন্টার খুলে তানজিমকে ডাকছে, সে দেখেনি। মেয়েটি মুখে মধু ঢেলে বলল, ‘এদিকে চলে আসুন’।

এ-ও তাহলে সম্ভব, তানজিম ভাবল। মেয়েটি একগাল হেসে বলল, ‘লিওনার্দো রয়েলে আপনাকে স্বাগতম’।

তানজিম হাসল। হাসি বড়ই সংক্রামক। কিন্তু হাসতে হাসতে তার মনে হলো, হাদীউজ্জামান আশপাশেই আছেন। তিনি তার সব হাসি কেড়ে নিয়েছেন। তার ইচ্ছা হলো, মেয়েটার হাত ধরে বলে, আপা গো, রক্ষা করো। লোকটাকে হোটেল থেকে বের করে দাও।

তানজিমের হাতে রম্নমের কার্ড বুঝিয়ে দিয়ে মেয়েটি বলল, ‘এই নিন’, এবং তার পেছনের লোকটির দিকে মুখে মধু-হাসি মেখে তাকাল, বলল, ‘লিওনার্দো রয়েলে আপনাকে স্বাগতম।’ তানজিমকে সম্পূর্ণ ভুলে গেল মেয়েটি। যেন সে মানুষই নয়, মানুষের পরিবর্তে একটা চাকা লাগানো স্যুটকেস মাত্র। ঠেললে চলতে শুরু করে।

এভাবেই মানুষ মানুষকে ভুলে যায়, তানজিম ভাবল।

কিছু মুহূর্ত থাকে হাসি দিয়ে মোড়া, সোনা দিয়ে মোড়া। সেগুলো আসে মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ নিয়েই, ঘুমের ওষুধ অথবা বাতের মলমের মতো। মেয়াদ যেদিন শেষ, হাসি-আনন্দ শেষ।

সোনা হয়ে যায় তামা। অথবা তামাতে জমা কলুষ। কলুষের রূপে বিষ।

সে নিঃশব্দে লিফটের দিকে এগোল।

 

চার

রম্নমে ঢুকে প্রথমেই তার চোখ গেল বিছানার দিকে। নরম, পরিপাটি বিছানা, একটা পেলব ভাব তার বালিশে-চাদরে, তাকে যেন ডাকছে, বলছে, তোমার স্পর্শের জন্য বসে আছি।

জুতা জোড়া খুলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিছানাটা তাকে জড়িয়ে ধরল। এমন বিছানায় ঘুমটাও আসে একটা সূক্ষ্ণ তৃষ্ণার মতো। অনেক সময় নিয়ে যা মেটাতে হয়।

বিছানা তাকে ছাড়ল ঘণ্টাতিনেক পর, যখন সতেরো তলার জানালার বাইরে আকাশটাতে বিকেলের আলো মরে ভূত হতে শুরম্ন করেছে। শুয়ে শুয়ে তার মনে হলো, কিছু একটা খেতে হয়। সকাল থেকে এক গস্নাস পানিও তো খাওয়া হয়নি।

লিফটে নিচে নেমে রেস্টুরেন্টের দিকে যাবে, একটা প্রসারিত হাত তাকে থামাল। ‘এই যে তানজিম সাহেব, সব ঠিকঠাক?’

‘জি।’

‘আমি বসে আছি, বুঝেছি ঘুমাচ্ছেন। কিন্তু জানতাম, একবার তো নামবেনই।’

‘জি, নামলাম।’

‘কোথাও যাবেন?’

‘খেতে যাব।’

‘চলুন।’

তানজিমকে সুযোগ না দিয়েই টেনে নিলেন ড. হাদীউজ্জামান। তানজিম জানে, এখন সে যা খাবে, যতবার খাবে, বিলটা তিনিই দেবেন। এদিক থেকে মানুষটার হৃদয় বেশ চওড়া। কিন্তু তানজিমের টাকা বাঁচানোর প্রয়োজন নেই। তার প্রয়োজন নির্জনতার। জামানের সঙ্গ থেকে নিস্তার পাওয়ার।

খাওয়ার টেবিলে বসে ড. হাদীউজ্জামান বললেন, ‘কাল কী নিয়ে আলোচনা হবে, জানেন তো’?

তানজিম মাথা নাড়ল। না জানার কোনো কারণ নেই।

‘কোথায় যেতে হবে জানেন তো?’

‘সনম্যানস্ট্র্যাসে। ইসিবি হেড কোয়ার্টারে।’

‘আরে নাহ্’, বিরক্তি নিয়ে বললেন জামান, ‘ওখানে ভিন্ন অফিস। আমরা যাব কাইজারস্ট্র্যাসে’।

তানজিম তর্ক করল না। সে জানে কাল বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিচালক এসে তাদের নিয়ে যাবেন। কোথায় কোন স্ট্র্যাসে তারা যাবে, এ মাথাব্যথা তার।

‘বলুন তো এই হোটেল কোন রাস্তায়’? জামান জিজ্ঞেস করলেন।

ঘোড়ার ডিম রাস্তায়, মনে মনে বলল তানজিম।

‘মাইল্যান্ডারস্ট্র্যাসে। স্ট্র্যাস মানে স্ট্রিট।’

`তাই?’ তানজিম জিজ্ঞেস করল।

‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক আসতে পারবেন না। তার হোটেল শহরের ওই মাথায়।’

‘তাহলে কাইজারস্ট্র্যাসেতে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমি চলে যাব।’

‘আমি না, আমরা’, জামান তানজিমের কথাটা ঠিক করে দিলেন।

খোদা, রক্ষা করো, কাতর কণ্ঠে বলল তানজিম।শব্দহীন একটা প্রার্খনার মতো।তার মনে হলো, লোকটা যদি এখন অপঘাতে মরে যায় অথবা তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, তাহলে দেশে ফিরে কাঙাল খাওয়াবে সে। কিন্তু এরকম ভেবেও সে কেন জানি নির্ভার হতে পারল না। তার মনে হলো, যত বিরক্তিকর এবং বিষময় হোক লোকটার উপস্থিতি, যতরক্ষণ সে বসে থাকবে, স্মৃতির একটা বিপন্ন গলিতে সে অন্ধের মতো হাতড়াতে হাতড়াতে বেড়াবে, অথবা একটা খঞ্জের মতো পা ফেলার ভূমি খুঁজবে – যা পাওয়ার সম্ভাবনা, গলিটা যত এলোমেলো হবে, দিকচিহ্নহীন হবে, ততই শূন্য হতে থাকবে।

এই গলির নাম মহুয়া। গলিতে ঢোকার মুখে লাঠি হাতে যে চৌকিদার দাঁড়িয়ে, যাকে ডিঙিয়ে সে-গলিতে পা রাখতে পারে, পা হড়কাতে পারে অথবা পা ভেঙে পড়েও থাকতে পারে, তার নাম হাদীউজ্জামান।

 

পাঁচ

তিনদিনের দিন মন্ত্রী এসে বললেন, ‘ড. তানজিম, আপনি দুর্দান্ত পারফর্ম করলেন, আপনার কোনো দুর্বলতা অথবা ব্যর্থতা ছিল না, কিন্তু চুক্তিটা এবার হলো না।’

‘আমি চেষ্টার কোনো কমতি করিনি স্যার’, তানজিম বলল ।মন্ত্রী তাকে সস্নেহে আলিঙ্গন করলেন। আপনি আপনার কাজ করেছেন, ড. তানজিম। সমস্যাটা ওদের। ওরা একগাদা শর্ত দিয়েছে। আমি জানিয়ে দিয়েছি, এত শর্ত মানা আমাদের সম্ভব না। একটা কড়া বাণী তাদের দিলাম। বাংলাদেশের হাত কচলানোর দিন শেষ।’

‘ধন্যবাদ স্যার। আমিও এই কথাটা প্রকারান্তরে তাদের বলেছি’, তানজিম বলল।

মন্ত্রী চলে গেলেন। বললেন, দেশে গিয়ে যেন সে দেখা করে। একটা বড় দায়িত্ব তার জন্য অপেক্ষা করছে।

মন্ত্রী একটা বিরাট উপকার করলেন, ড. হাদীউজ্জামানকে নিয়ে একদিন আগে দেশে উড়াল দিলেন। একটা দিন তানজিম একা থাকবে।

 

ছয়

পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ল ড. তানজিম। ঠান্ডা কিছুটা কমেছে, বাতাসও পড়েছে। যেসব গরম কাপড় নিয়ে এসেছে, সেগুলো গায়ে চাপিয়ে বাইরে যাওয়া যাবে, কিছুক্ষণ হাঁটাও যাবে। মামুন ফোন করেছে, বলেছে, সে এসে তাকে লিমবার্গ নিয়ে যাবে। কিন্তু তানজিম না করে দিয়েছে, বলেছে সারাদিন ইসিবিতে মিটিং, কাইজারস্ট্র্যাসেতে। তাতে কাজ হয়েছে। মামুনের কাছে সত্যিই মনে হয়েছে, বিরাট মিটিং, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। তানজিম সময় পাবে না। সে দুঃখিত-টুঃখিত বলে একটা আমন্ত্রণ দিয়ে রেখেছে পরের বারের জন্য।

তানজিম হেসেছে। পরের বার কেন, পরের পরের বারও সে যাবে না। নাঈমা যেভাবে সারাক্ষণ লেপ্টে থাকে মামুনের সঙ্গে, মামুন নাঈমার সঙ্গে, সারাদিন তাদের হাসি আর প্রীতি আর পুলক বিনিময় চলে এবং তাদের প্রতিটি মুহূর্তে ভালোবাসার মধু জমতে থাকে, তাতে তানজিমের ভেতর একটা আর্তনাদের কারখানাই চালু হয়ে যায়।

বেদনা জাগাতে কে চায়, হায়, কোন শালা চায়?

ড. হাদীউজ্জামান চলে গেছেন, তানজিমের সঙ্গে তার শেষ দৃষ্টিবিনিময়ে সে বিষ দেখেছে, বিষের হিসহিস শুনেছে।মন্ত্রী যখন তাকে বলেছিলেন,বড় দায়িত্ব অপেক্ষা করছে তার জন্য, জামানের চোখ সাপ হয়ে ফনা তুলেছে, বিষ ছুড়েছে। সেই বিষ বাতাসের সতেজ ভাবটা মেরে ফেলেছে।

তার রাতের ঘুমে সেই বিষ হানা দিয়েছে।

কিন্তু আজ সকালে জামান আর নেই। মহুয়া গলির মাথায় চৌকিদারটা আর নেই, গলিটা পড়ে আছে Ñ অন্ধ হোক, তাকে আহ্বান করছে। তানজিম হোটেল থেকে বের হয়ে মাইল্যান্ডারস্ট্র্যাসে পা রাখল। এই রাস্তাটার নাম আজ মহুয়া গলি।

তানজিম হাঁটছে। দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। তার পা হড়কাচ্ছে। চোখ পুড়ে যাচ্ছ। সে দেখছে, রাস্তার পাশের একটা ক্যাফেতে মহুয়া বসে কফি খাচ্ছে। ক্যাফেটা নতুন। কিন্তু যে মানুষটার সঙ্গে সে বসে আছে, সে পুরনো। মহুয়ার কাছে তিন বছরের পুরনো। তার নাম তানজিম।

কথাবার্তাও পুরনো। বাবা অপেক্ষা করতে রাজি নন, মহুয়া বলছে।

একটা বছর। তারপর স্কলারশিপ। তানজিম বলছে, আমেরিকা।

বাবা সেটল্ড ছেলে চান। একজনকে পেয়েছেন। তার ব্যবসাপাতি আছে। বিত্তশালী পরিবার।

ছেলেটা কী চায়? তানজিম জানতে চেয়েছে।

মহুয়া হেসেছে। কিছু একটা করো। ইউনিভার্সিটি টিচারের বেতন নেই। এনজিওতে চাকরি নাও। একটা ব্যাংকে চাকরি নাও।

এসব।

মহুয়া গলিটা এবার একটা বাঁক নিল। আরো সরম্ন হলো। এর ম্যানহোলগুলো খুলে গেল। গলির মোড়ে একটা রিকশা থামিয়ে মহুয়া উঠল। তানজিমকে বলল, কী হলো? ওঠো? যাবে না?

কোথায় যাব?

জানি না। কিন্তু ওঠো। আজ সারাদিন ঘুরব।

বলল বটে, কিন্তু মহুয়ার মন পড়ে থাকল একটা সুসংবাদের দিকে। সুসংবাদটা আজ তাকে তানজিমের দেওয়ার কথা। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে একটা চাকরির।

কিন্তু তানজিম বলল, চাকরিটা আমি করব না। আমার স্বাধীনতা থাকবে না।

গলায় দুঃখ জড়িয়ে মহুয়া বলল, আমিও চাই, তোমার স্বাধীনতা নিয়ে কোনো আপস না করো। কিন্তু বাবা শুনবেন না।

রিকশা চলল।

আচ্ছা এক কাজ করো, চাকরিটা নাও। বিয়ের পর ছেড়ে দিও।

নাহ্, তানজিম বলল। তোমার বাবাকে ঠকাতে পারব না।

মহুয়া গলিতে জট। রিকশা। ঠেলাগাড়ি।গরু। মুরগি। মানুষ।

মহুয়া বলল, তোমাকে ছাড়া জীবনটা ভাবতে পারি না।

পুলকে তানজিম গলতে শুরম্ন করল। যেন সে জন্মদিনের মোম। কেউ তাকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত গলতেই থাকবে।

মহুয়া ফুঁ দিলো। তাতে মোমবাতিটাকে যেন উসকেই দিলো। চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি। সে বলল।

তানজিম হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। মহুয়াকে এতো সুন্দর লাগছে। কেন এতো সুন্দর লাগছে? কেন তাকে এত সুন্দর লাগতে হবে? কেন তার বুকের ভেতরটা ভরাট করে সে একটা নদীর মতো দুলতে থাকবে?

এক্ষুনি চলো না। ওইখানে একটা কাজি অফিস আছে। তুমি তোমার বন্ধু জসিমকে ডাকো। আমি আমার বন্ধু সেঁজুতিকে ডাকব।

না, তানজিম বলল। কাজি অফিসে না। আমি বিয়ে করব ঘটা করে, কার্ড ছাপিয়ে, মানুষ খাইয়ে, আতশবাজি পুড়িয়ে, উৎসব করে।

মহুয়া হাসল। তুমি আমার বাবাকে চেনো না। ছোট্ট করে সে বলল।

মহুয়া গলির ক্যাফেটাতে বসে তানজিমের হাত থেকে তার ডায়েরিটা আর পকেট থেকে কলমটা নিয়ে মহুয়া একটা বিয়ের কার্ডের মুসাবিদা করল।মহুয়ার হাতের লেখা সুন্দর। খোদা! মানুষের হাত, মানুষের আঙুল এমন সুন্দর হয়! সে মহুয়ার হাতে আসেত্ম একটু চাপ দিলো।

এই, কী করো? মহুয়া বলল, আমি আমাদের বিয়ের কার্ড লিখছি। তোমার বাবা-মায়ের পুরো নাম জানি কী? আরে ধুর, তোমার কলমের কালি নেই। ইডিয়ট কলম।

তানজিমের কলমটা সে মেঝেতে ফেলে দিয়ে ব্যাগে রাখা তার কলম খুঁজল। কলমটা ব্যাগের গভীরে। বিরক্ত হয়ে ব্যাগটাই উলটো করে টেবিলের ওপর ঢালল মহুয়া। ব্যাগ থেকে কাগজ, টাকা-পয়সা বেরোল, চিরুনি বেরোল, বেরোল কলমটাও।

তানজিম আসেত্ম করে লিপস্টিকটা তুলে নিল। রেভলনের।

এটা আমি নেই? তানজিম বলল।

লিপস্টিক দিয়ে কী করবে?

তোমার ঠোঁটের গন্ধ পাব, দুষ্টুমি করে তানজিম বলল। কাচভাঙার মতো হাসল মহুয়া। দাঁড়াও, সে বলল, একটা কিছু লিখে দিই।

লিপস্টিকের নিচে গোল একটুখানি কাগজ। তাতে ছোট করে লেখা রেভলন।মহুয়া শক্ত হাতে লিপস্টিকটা ধরে ওই কাগজে  লিখল, মহুয়া। নিচে লিখল ‘তান…।’ ‘তান’ লিখতেই কাগজ ফুরোল, ‘জিম’ পড়ে থাকল অসম্ভবের আড়ালে।

ফ্রাঙ্কফুর্টের আকাশে শীত জমছে। তানজিম দেখল, মহুয়া গলিতে শীত আর্তনাদ জাগাচ্ছে। আর সামনে যাওয়া যাবে না। এবার ফিরতে হবে। ফেরার পথটা বিরান। গলিটা শূন্য। মহুয়া নেই।

মহুয়া হঠাৎ কিছুদিন চুপচাপ হয়ে ছিল। একদিন তার বিভাগে ফোন করল, মোবাইল ফোনে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে। ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে, নতুন ফোন যে কিনবে, সেই সময়টা তানজিম বের করতে পারছিল না।

ল্যান্ডফোনটা চেয়ারম্যানের ঘরে, তিনি বসে আছেন চেয়ারে, যেমন বিচারক বসেন এজলাসে। কঠিন রীতিনীতি। সব মানতে হয়। মহুয়া বলল, স্যরি তানজিম। তোমাকে সরাসরি বলতে চেয়েছিলাম। বলা হলো না।

মানে? তানজিম বলল।

মানে তো বোঝোই। বাবা চাইছেন তার ব্যবসায়ে আমি যাতে তাকে সাহায্য করি।

ভালোই তো। তাতে তো কোনো সমস্যা নেই।

সমস্যা আছে। আমাকে যেতে হবে চট্টগ্রাম।

সমস্যা নেই তো, চট্টগ্রামে কী অসুবিধা।

পরে বলব, মহুয়া বলল এবং ফোন রেখে দিলো।

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল তানজিম। সব ঠিকঠাক? কে একজন বলে উঠলেন।

হাদীউজ্জামান। কানাডা থেকে পিএইচডি করে দেশে ফিরেছেন। চেষ্টা করছেন এই বিভাগে যোগ দিতে। কিন্তু জায়গা খালি নেই। তারপরও চেয়ারম্যানকে জানাতে এসেছেন।

কেন ঠিকঠাক থাকবে না? তানজিম বলল। তারপর উঠে দাঁড়াল।

চট্টগ্রামে কারো কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।চট্টগ্রাম ভালো জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়টা ভালো। আমি ওখানেই যাব, ড. জামান বললেন।

কিছু না বলে বেরিয়ে গেল তানজিম। আপনি পাতালে গেলেও আমার কী? সে মনে মনে বলল। নিজের নাকটা নিজের সীমানায় রাখতে পারেন না?

 

আট

তানজিম এখন মাঝরাতের মহুয়া গলিতে হাঁটছে, যেহেতু তার চোখ জুড়ে আঁধার নেমেছে। ফ্রাঙ্কফুর্টের শীত-বাতাস তার ভেতরে কাঁপুনি তুলছে, কিন্তু কাঁপুনিটা কি তুলছে তার সকল স্নায়ুতে শুরু হওয়া এক ভয়ানক তোলপাড়, যার উৎস টেলিফোনের এক ভূগোলহীন দূরত্ব থেকে ভেসে আসা মহুয়ার কণ্ঠ, এক ব্যস্ত সন্ধ্যায়? ব্যস্ত, কারণ এক মাসও হাতে নেই, তানজিম বিদেশে পাড়ি জমাবে, একশ রকমের কাজ হাতে। সে ভেবেছিল চট্টগ্রাম যাবে, মহুয়ার সঙ্গে দুটি দিন কাটাবে, পতেঙ্গার বালিতে বসে সমুদ্রের জলে সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখবে আর তাদের জীবনে হারিয়ে যাওয়া ছন্দটা আবার জাগিয়ে তুলবে। কিন্তু মহুয়া জানাল, সে ব্যসত্ম। একটা ফ্যাক্টরির সম্প্রসারণ হচ্ছে। সময় নেই।

সময় আর কোনোদিন হয়নি মহুয়ার। চিঠি লেখার, একটা ফোন করার। আমেরিকা গিয়ে তানজিম ফোন করেছে। মহুয়াকে পায়নি। একদিন শোনা গেল, টেলিফোনটি আর মহুয়ার নয়, এটি ব্যবহার করছে তার ম্যানেজার। ম্যাডামের নাম্বার কাউকে দেওয়া যাবে না, লোকটা মোটা গলায় বলল।

তানজিম বুঝল, মহুয়া এখন নিজের জীবন নিয়ে ব্যসত্ম। ঠিক আছে, সে ভাবল। দেশে ফিরে দেখা যাবে।

কিন্তু দেশে ফিরে কিছু দেখার আগে যা তানজিম শুনল, তার জন্য মোটেও সে প্রস্তুত ছিল না –  যেমন প্রস্তুত থাকে না কোনো মানুষের মাথার ওপর একদিন আকাশটা ভেঙে পড়ার জন্য। তানজিম শুনল, মহুয়া এখন একা নেই, চট্টগ্রামেই সংসার পেতেছে, জনৈক হামিদুলের সঙ্গে। তানজিম চাকরিতে যোগ দিতে তার বিভাগে গিয়েছিল, নতুন চেয়ারম্যান ড. জেসমিন খান, হামিদুলের আত্মীয়।মহুয়াকে তার খুব পছন্দ হয়েছে। মহুয়া তাকে বলেছে, তার বিভাগের তরুণ অধ্যাপক। তানজিম তার বন্ধু। ‘তোমার বন্ধুকে আমার কাজিন, বুঝেছ, যাকে বলে সোনায় মুড়ে রেখেছে,’ ড. খান বললেন।

চেয়ারম্যানের ঘরে আরেকজন ছিলেন। তিনি হাদীউজ্জামান। একটা সেমিনারে তিনি জার্মানি যাচ্ছেন। ড. খানের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, তার ইচ্ছা একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াবেন। হাদীউজ্জামানও মহুয়ার প্রশংসা করলেন। ‘ওয়ান্ডারফুল গার্ল’, তিনি বললেন, ‘দেখতেও চিত্রনায়িকাদের মতো।’

ড. খান হাসলেন। তাঁর হাসিটা হয়তো কিছুটা বাঁকা হতো, যদি হাদীউজ্জামান অবিবাহিত হতেন। কিন্তু না, হাদীউজ্জামান বিয়ে করেছেন।সস্ত্রীক জার্মানি যাচ্ছেন।

তানজিমকে বসে বসে হামিদুলের টাকার গল্প, তিনটি গাড়ি আর চবিবশটি স্যুটের গল্প, তার ঘুরে বেড়ানোর এবং গলফ খেলার নেশার গল্প শুনতে হলো। ড. খান বলে যান, হাদীউজ্জামান কিছু যোগ করেন। এভাবে আধাঘণ্টা চলল।

এই আধাঘণ্টায় তার স্নায়ুগুলোতে জট লেগে গেল। তার চোখ একটা ঝামা দিয়ে ঘষে ঘষে কেউ যেন সব আলো নিভিয়ে দিলো, জন্মের মতো অন্ধ করে দিলো।

 

নয়

মহুয়া গলির শেষ মাথায় এসে তানজিমের মনে হলো, তার মাথাটা জমে গেছে। কোনো চিন্তা তৈরি হচ্ছে না। তার শরীর যে অসাড় হয়ে গেছে, তা বোঝার ক্ষমতাটাও যেন চলে গেছে।

তার গহিন ভেতরে একটা স্মৃতির কলি যেন শুধু বেজে যাচ্ছে, যার সঙ্গে মহুয়ার দীর্ঘ নীরবতার একটা যোগসাজশ আছে।

মহুয়া চট্টগ্রামেই স্থায়ী হয়ে গেল। এবং তানজিমের জীবন থেকে হারিয়ে গেল।

সে যে-শূন্যতা রেখে গেল, অথবা রেখে দিলো, তানজিমের জন্য, তার চোখাচোখি হওয়াটা কি কোনোদিন তার পক্ষ সম্ভব?

মহুয়া গলি কী বলে? এর ধূলিবালি কী বলে? মাথাটা যদি এর ধূলিবালিতে গুঁজে দিয়ে শুয়ে থাকা যায়, একটা উত্তর কি পাওয়া যায়?

 

দশ

লিওনার্দো রয়েলের বারটেন্ডার কার্লোস হোটেলে ঢুকতে গিয়ে দেখল, একটা লোক রাস্তায় শুয়ে আছে, তাকে ঘিরে দুতিন পথচারী। কার্লোস একঝলক দেখে লোকটাকে চিনল। গতরাতে বারে এসেছিল, যদিও সে কোক-টোক খাচ্ছিল। তার সঙ্গে একটা লোক ছিল, সে যা পান-টান করার তা করছিল আর উত্তেজিত গলায় কথা বলছিল। কার্লোস এক পথচারীকে বলল, লোকটাকে হোটেলে নিয়ে যেতে তাকে সাহায্য করতে। শীতে কাবু হয়ে লোকটা পড়ে গেছে, ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটুখানি সেবাযত্ন করলে ভালো হয়ে যাবে।

ভালো হতে খুব দেরিও হলো না তানজিমের। কিন্তু ভালো হতে হতে, মাথাটা পরিষ্কার হতে হতে সে টের পেল, যে-সত্যটা তাকে একটা বিরাট ধাক্কা দিয়ে মহুয়া গলির মাটিতে ফেলে দিয়েছিল, তা হলো, ড. হাদীউজ্জামান গতরাতে তাকে জানিয়েছিলেন, লিয়োনার্দো রয়েলের বারে, জ্যাক ডানিয়েল খেতে খেতে যে, মহুয়ার বিয়ে ভেঙে গেছে। তার নিজেরও ভেঙেছে, মহুয়ার কিছু আগেই। এখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মহুয়াকে তিন প্রস্তাব দেবেন। জীবনসঙ্গী হওয়ার প্রস্তাব। উত্তেজিত গলায় ড. জামান বললেন, মহুয়া জানিয়েছে, সে রাজি। এখন এক-আধটু আনুষ্ঠানিকতাই যা বাকি।

কথাটা অর্থনীতি সমিতির নির্বাচনে সে জেতার পরপরই তাকে বলেছিলেন ড. জামান। এবং তার গায়ে বাঘা বোলতার হুলের মতো ফুটেছিল। তারপরও জীবনটা তার যে একটা গর্তে পড়ে হারিয়ে যায়নি তার একটা কারণ তার কাজ – আরো নির্দিষ্ট করে বললে তার কাজপাগল স্বভাব। অর্থনীতি সমিতির এক বছরের কাজ যেন এক সপ্তাহে শেষ করে দেবে, এমন সংকল্প নিয়ে সে পথে নামল।ব্যাংক খাত সংস্কারের যুদ্ধটা সে শুরু করল কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে। তারপরও মহুয়া গলির শেষ মাথায় পৌঁছানোর আগে সে ভাবতে পারেনি ড. জামান একটা শোরগোলের মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই যে-কথাগুলো তাকে বলেছিলেন, তা কত বড় একটা বিপর্যয়ের রূপ নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে।

ট্যাক্সিতে এয়ারপোর্টে যেতে যেতে, বিষাদে ছাওয়া শহরটাকে বিদায় জানাতে গিয়ে তার মনে হলো, মহুয়াকেও তাহলে বলতে হবে, বিদায়। তার জন্য একটা সম্মানের জীবন অপেক্ষা করছে।এই জীবনে মহুয়াকে, হাদীউজ্জামানকে সে আর দেখতে চায় না।

চায় না বললেই যদিও সবকিছু না হয়ে যায় না। তারপরও।

 

এগারো

এপ্রিলের শুরুতে তানজিমকে ফোন করে জানালেন ড. হাদীউজ্জামান, তার ভাগ্যলক্ষ্মী শুধুই হাসছেন। যে-পদটার জন্য তানজিমকে তৈরি থাকতে বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী, এটা এখন তার। একটু সময়ের ব্যাপার, এই যা। মহুয়াও এখন বলতে গেলে তার – এক-আধটা আনুষ্ঠানিকতাই শুধু যা বাকি। একটু দম নিয়ে বললেন জামান, ‘আপনি তো মহুয়ার ভালো বন্ধু ছিলেন। এই কদিন সে অনেকবার আপনার কথা বলেছে। আপনি যে এতদিনে সংসার পাতেননি, তাতে অবাক হয়েছে। আমাকে বলেছে, আপনার জন্য  সে একটা পাত্রী খুঁজছে। তবে বড় সংবাদ, তিনি তানজিমের বিভাগে যোগ দিচ্ছেন, উপাচার্য তাঁকে কথা দিয়েছেন।মহুয়া আর তিনি এখন থেকে গুলশানবাসী হবেন।

কিছু না বলে টেলিফোন রেখে দিল তানজিম। শালা জামান।

তাঁর উচ্ছ্বাসটা গায়ে আগুন ধরাচ্ছে।

ল্যাপটপ খুলে সে মাসদুয়েক আগের এক ই-মেইলে ঢুকল, ই-মেইলটা পাঠিয়েছে তার এককালের সহপাঠী রবিউল, যে আমেরিকায় ভ্যান্ডারবিল্টে মাস্টারি করছে। ই-মেইলের সঙ্গে একটা ফাইল। ফাইলটাতে একটা ছোটখাটো বোমা আছে হাদীউজ্জামানের জন্য। সেটি পাঠাতে হবে তার হলজীবনের বন্ধু সাংবাদিক গুলজারের কাছে। বাকিটা গুলজার দেখবে।

দৈনিক সারা বেলায় কদিন পর একটা খবর বেরোল : অন্যের প্রবন্ধ নিজের নামে চালিয়ে দিলো যে-লোক, সে কিনা প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে অধ্যাপক হতে যাচ্ছে।

এর দুদিন পর সারা বেলা জানাল, উপাচার্য বলেছেন, ড. হাদীউজ্জামানকে বিবেচনা করার প্রশ্নই ওঠে না। যারা প্রকাশনা জালিয়াতি করে, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড তাদের মুখের ওপর তার দরজা বন্ধ করে দেয়। এর পবিত্র আঙিনায় এদের পা পড়তে দেওয়া যায় না ইত্যাদি। বিভাগের চেয়ারম্যান ড. খানও বললেন তানজিমকে, যে আন্তর্জাতিক সংস্থায় ড. জামান কাজ করতেন, তারা তাকে অব্যাহতি দিয়েছে। ‘বেচারা’ ড. খান বললেন, ‘এখন তাকে চট্টগ্রাম ফিরে যেতে হবে। সেখানেও একটা যে তদমত্ম হবে না তার বিরম্নদ্ধে, কে জানে।’

তার টেবিলের একদিকে বসা এক সহকর্মী বললেন, ‘ছিঃ।’ অন্যদিকে বসা আরেকজন, বললেন, ‘লজ্জা।’

 

বারো

এক সকালে অর্থমন্ত্রীকে ফোন করল তানজিম, বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ স্যার, কিন্তু আমি ব্যাংক সংস্কার কমিটিতে থাকতে চাই না। এক বছর শিক্ষকতা ছেড়ে থাকার কথা ভাবতে পারি না।’

অর্থমন্ত্রী হতাশ হলেন। দু-একবার এ নিয়ে ভাবতে বললেন, কিন্তু তানজিম বিনয়ের সঙ্গে তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকল। শেষমেশ অর্থমন্ত্রী ‘মাই লস, ইউনিভার্সিটিজ গেইন’ বলে ফোন রেখে দিলেন।

কার লাভ কার ক্ষতি, এসব নিয়ে অবশ্য তানজিম আর ভাবে না। এসব টুকটাক হিসাব তার কোনো খাতাতে আর জায়গা পাবে না।

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথাবার্তা শেষে তানজিম আরেকটা কাজ করল। তার পুরনো ডায়েরি থেকে মহুয়ার মুসাবিদা করা তাদের বিয়ের কার্ডের পৃষ্ঠাটি ছিঁড়ল। তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারের তলদেশে পড়ে থাকা মহুয়ার লাল লিপস্টিকটা বের করল, তারপর সেগুলি একটা ম্যানিলা খামে ঢোকাল।

খামের ওপর মহুয়ার নাম-ঠিকানা গোটা গোটা অক্ষরে লিখল। এই ঠিকানা সে পেয়েছে পাঁচদিন আগে। চট্টগ্রাম পুলিশে তার এক বন্ধু আছে, সে একদম নিশ্চিত হয়ে সেটি পাঠিয়েছে।

খামটা সে আজ কুরিয়ারে পাঠাবে।

খামের মুখটা ডাকটেপ দিয়ে লাগাতে লাগাতে সে বলল, ‘বিদায় মহুয়া।’

যদিও, কাউকে বিদায় জানালেই যে বিদায় বিষয়টা নিষ্পন্ন হয়ে যায় না, তার মনে এই ধারণাটাও থেকে গেল। খামটা পেয়ে মহুয়াও নিশ্চয় বলবে, ‘তোমাকেও বিদায়, তান্নু।’

তানজিমকে সে মাঝেমধ্যে তান্নু বলে ডাকত, যখন তার মাথায় কোনো দুষ্টুমি জাগত। সেরকম দুষ্টুমি, যা মাথায় এলে সে যে কী করে বসতে পারে, নিজেও তা সে জানতো না।

যাকগে। এসব নিয়ে সে ভাববে না। অর্থনীতির কোনো হিসাবেই এসব পড়ে না।

শেয়ার করুন

Leave a Reply