১৯৫৩

লেখক:

আনিসুল হক
হেমন্তকাল। হাটখোলার সরুপথে রিকশায় চলেছেন মুজিব। সকালবেলা। রোদ উঠেছে মিষ্টি। রাস্তায় শিউলি ফুল ঝরে পড়ে আছে, পাঁচিল ডিঙিয়ে মাথা বের করা শিউলিঝাড়ে পড়েছে সকালবেলার রোদ।
শেখ মুজিব যাচ্ছেন এ কে ফজলুল হকের কাছে। কেএম দাস লেনের বাড়িটির গেট খোলাই ছিল। তিনি ভেতরে ঢুকে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, ‘নানা, আছেন নাকি।’
বিশালদেহী ৮১ বছরের ফজলুল হক বেরিয়ে এলেন। পরনে পায়জামা, পাঞ্জাবির ওপরে একটা কার্ডিগান। মুজিবের পরনে ট্রাউজার, গায়ে শার্ট, শার্টের ওপরে একটা হালকা কোট।
‘নাতি কী খবর? আসো বসো।’
মুজিব বৈঠকখানায় বসলেন।
এ কে ফজলুল হককে বাংলার লোকেরা জানে শেরে বাংলা বা বাংলার বাঘ বলে। তাঁকে বাংলার মানুষ মোটের ওপরে খুব শ্রদ্ধা করে। তিনি অখণ্ড বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কৃষক প্রজা পার্টির নেতা। মুসলিম লীগ করেননি বলে শেখ মুজিবের দল তার বিরোধিতা করত।
আজ বৈঠকখানায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুজিবের মনে পড়ে গেল বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা। মুজিব তখন কলকাতায় ছাত্র, গোপালগঞ্জ আসেন মাঝে-মধ্যে, বক্তৃতা দেন পাকিস্তানের পক্ষে। এই সময় শহরের কয়েকজন মুরব্বি মুজিবের পিতা শেখ লুৎফর রহমান সাহেবকে বললেন, ‘আপনার ছেলে যা আরম্ভ করেছে, ওকে তো জেল খাটতে হবে। তার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে, ওকে এখনই মানা করেন।’
আব্বা তখন যে উত্তরটা করেছিলেন, তা মুজিবের আজো মনে আছে। তিনি বললেন, ‘দেশের কাজ করছে। অন্যায় তো কিছু করছে না। যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে। দেশের জন্য জেল খাটবে। পাকিস্তান না করলে আমরা মুসলমানরা কি টিকতে পারব?’
একদিন মেলা রাত পর্যন্ত বাপ-বেটায় শুয়ে শুয়ে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছেন। হাবিবুল্লাহ বাহারের লেখা পাকিস্তান গ্রন্থ মুজিবের মুখস্থ। মুজিবুর রহমান খাঁর পাকিস্তান বইও তিনি হেফজ করেছেন। শেরে বাংলা লাহোরে যে-পাকিস্তান প্রস্তাব করেছিলেন, আর সেদিন যে-প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, পাকিস্তান হবে দুটা, আলাদা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র, পশ্চিম অংশ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান, আর সমস্ত বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান। কলকাতাও সেই স্বাধীন দেশে থাকবে, দার্জিলিং থাকবে, আসাম থাকবে। পিতা খুশি হলেন পুত্রের আলোচনা শুনে।
শুধু বললেন, ‘শোনো, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে কোনো রকমের ব্যক্তিগত আক্রমণ করবা না।’
একদিন মাও বললেন, ‘বাবা, আর যাই করতি চাও, করবা, কিন্তু হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলিও না। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হন নাই।’
শেরে বাংলার সামনে বসে আছেন মুজিব। দুজনের হাতেই চায়ের কাপ। কী চা? দার্জিলিং চা নাকি? দার্জিলিংও বাংলার অংশ হওয়ার কথা ছিল, খাজা নাজিমুদ্দিন সে-দাবি ছেড়ে চলে এসেছেন ঢাকায়। মুজিব মনে-মনে ভাবলেন।
মায়ের কথাটাও আজ মুজিবের মনে পড়ছে। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হন নাই। বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। আরেকদিনের কথা। শেখ মুজিব বক্তৃতা করছেন তাঁর নিজের ইউনিয়নে, বলছিলেন, ফজলুল হক সাহেব কেন মুসলিম লীগ ত্যাগ করলেন, কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করবেন, কেন তিনি পাকিস্তান চান না?
এই সময় একজন বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। মুজিব তাঁকে চেনেন। মুজিবের দাদার বন্ধু। তাদের বাড়ি প্রায়ই আসতেন। তাঁদের সবাইকে তিনি ভালোবাসেন ও শ্রদ্ধাভক্তি করেন। সেই বৃদ্ধ বললেন, ‘খোকা মিয়া, যা বলার বলেন, কিন্তু হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বইলেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? আমরা তো তাকে চিনি না। নামও শুনি নাই। হক সাহেব গরিবের বন্ধু।’
এরপর থেকে মুজিব কোনোদিনও ফজলুল হকের বিরুদ্ধে কিছু বলেন নাই।
ফজলুল হক সাহেবের আরেকটা গুণ আছে। তিনি সবার নাম ও চেহারা মনে রাখতে পারেন। বহুদিন পরে কাউকে দেখলে তার নাম ধরে ডেকে বসেন তিনি। এইভাবে নাম ধরে ডাকলে কে-না মুগ্ধ হবে। মুজিব ফজলুল হকের এই গুণটা রপ্ত করার চেষ্টা করেন। তিনিও সবার নাম ও চেহারা মনে রাখার অনুশীলন করেন। আর ফজলুল হক স্বচ্ছন্দ বোধ করেন দেশি পরিবেশ। ইংলিশকেতা, উর্দুকেতা তার পছন্দ নয়। মুজিবের সঙ্গে এদিক দিয়ে মিলে যায় ফজলুল হকের।
শেখ মুজিব চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, ‘নানা, আপনি অ্যাডভোকেট জেনারেল পদ ছেড়ে দিয়েছেন। আপনি মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছেন কেন? মুসলিম লীগ তো খুবই আনপপুলার। দেশের মানুষ তো দুই চোখে এই অযোগ্য, জালিম, অসৎ, দুর্নীতিবাজদের পছন্দ করে না।’
‘কী করতে বলো?’ সুরুত করে এক কাপ চায়ের অর্ধেকটা গিলে ফেলে ফজলুল হক বললেন।
‘আপনি আওয়ামী লীগে জয়েন করেন।’
‘করতে বলো।’
‘হ্যাঁ। আপনি শেরে বাংলা। আপনার কি শেয়ালদের সঙ্গে চলা মানায়। আমি যাচ্ছি চাঁদপুরে। আওয়ামী লীগের জনসভা করতে। আপনিও যাবেন আমার সাথে।’
‘আচ্ছা তুমি যখন বলছ।’
মুজিব জানেন, ফজলুল হক রাজি হবেন। মোহন মিয়া চেষ্টা করেছিলেন ফজলুল হককে দিয়ে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে সরিয়ে নিজেরা ক্ষমতা নিতে। পারেন নাই। কার্জন হলে বেদম মারপিট হয়েছে দুই গ্র“পে। মার খেয়ে কেটে পড়েছে মোহন মিয়ার দল।
চাঁদপুরের জনসভায় ফজলুল হক বললেন, ‘যাঁরা চুরি করবেন, তাঁরা মুসলিম লীগে থাকুন। আর যাঁরা ভালো কাজ করতে চান, তাঁরা আওয়ামী লীগে যোগদান করুন।’
মুজিব জানেন, ফজলুল হক ভালো বক্তৃতা করেন। বক্তৃতা করেন গল্পের ছলে। এই কারণেই মুসলিম লীগের সঙ্গে কৃষক প্রজা পার্টির যখন কোনো নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো, নির্বাচনী এলাকায় ফজলুল হকের জনসভা থাকলে তিনি যেন ভাষণ দিতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে কৌশল প্রয়োগ করত মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মীরা। তারা রটিয়ে দিত, শেরে বাংলা ওখানে আসছেন কেরোসিন তেল দিতে। তখন কেরোসিন তেলের খুব আক্রা। লোকজন কেরোসিনের খালি টিন হাতে আসত, আর দেখত, কেরোসিন দেওয়া হবে না, দেওয়া হবে ভাষণ। তারা বিরক্ত হতো। আর মুসলিম ছাত্রলীগের ছেলেরা ফজলুল হককে নানা প্রশ্ন করতে শুরু করত। তাদের ভয়, শেরে বাংলা যদি একবার তাঁর গল্পের ঝাঁপি খুলতে পারেন, জনতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়বে।
তাঁর গল্পের কৌশলও ছিল ভিন্ন-ভিন্ন। তিনি একবার ঢাকায় লেখাপড়া না-জানা প্রার্থী কাল্লু মিয়ার পক্ষে নির্বাচনী সভায় ভাষণ দিতে এসেছেন। লোকে তাঁকে ধরল, এই রকম মূর্খ প্রার্থীর পক্ষে আপনি কেন কথা বলছেন?
তিনি বললেন, ‘দেশ হলো একটা নৌকা। আমি হলাম তাঁর মাঝি। আমি তো হাল ধরেই আছি। আমার এখন দরকার মাল্লা। এখন শিক্ষিত লোককে আমি মাল্লা বানাব কেন? মাল্লা হিসেবে আমার দরকার কালু মিয়াকে। আমি মাঝি, দেশের হাল ধরি, এই যদি চান, মাল্লা হিসেবে কালু মিয়াকে ভোট দেন। আর যদি মাঝি বদলাতে চান, চান যে আমিই না থাকি, তাইলে কালু মিয়ার শিক্ষিত প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভোট দেন।’
এই গল্প শেখ মুজিবের অনেকবার শোনা।
আরেকবারের ঘটনা। মুর্শিদাবাদে গেছেন তিনি। উপনির্বাচন উপলক্ষে। তিনি সমর্থন জানাতে এসেছেন সৈয়দ বদরুদ্দোজাকে। ফজলুল হক ভাষণ দিতে শুরু করলেন, ‘ভাইসব, আপনারা যখন হাটে হাঁড়ি কিনতে চান, তখন হাঁড়ি বাজিয়ে দেখে নেন কিনা?’
সবাই বলল, ‘হ্যাঁ। তাই নেই।’
‘তাহলে এবার আমরা একটু বদরুদ্দোজাকে বাজিয়ে দেখব। বদরুদ্দোজা তুমি ৫ মিনিট বাংলায় বক্তৃতা করো তো।’
বদরুদ্দোজা ৫ মিনিটে কর্ডোভা, গ্রানাডা থেকে শুরু করে বাংলার নির্যাতিত মুসলমানদের ইতিহাস তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে বর্ণনা করতে লাগল।
ফজলুল হক বললেন, ‘এবার একটু উর্দুতে পাঁচ মিনিট ভাষণ দাও তো।’
বদরুদ্দোজা উর্দুতে বলতে লাগলেন।
‘এবার একটু ইংরেজিতে বলো দেখি।’
অমনি বদরুদ্দোজা ইংরেজিতে বলতে লাগলেন।
ফজলুল হক বললেন, ‘আপনারা নিজেরা বাজিয়ে দেখলেন। বদরুদ্দোজা বাজে কিনা?’
একই মানুষ, একবার শিক্ষিতের পক্ষে, একবার অশিক্ষিতের পক্ষে চমৎকার করে বলে গেলেন। মানুষ তার কথাতেই উদ্দীপিত হলো।
এখন তিনি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে, আর আওয়ামী লীগের পক্ষে বলছেন।
কিছুদিন আগে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছেন।
মুজিব ফজলুল হকের ভাষণ শোনেন আর হাসেন।
বগুড়ার পাঁচবিবি গ্রামে মওলানা ভাসানী অবস্থান করছেন। তাকে ধরে আনতে হবে। মুজিব আর খন্দকার ইলিয়াস তাই চলেছেন ট্রেনে।
ভাসানী পাঁচবিবি থেকে চিঠি পাঠিয়েছেন মুজিবের কাছে। সাধারণ সম্পাদকের কাছে সভাপতির চিঠি। ‘ময়মনসিংহে পার্টির সম্মেলন ডাকো।’
সভাপতির নির্দেশ। মুজিব অমান্য করতে পারেন না। তিনি ময়মনসিংহেই সম্মেলন ডাকলেন।
কিন্তু তিনি এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেন।
সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। সামনে পূর্ববাংলায় নির্বাচন হবে। মুজিবের হিসাব হলো, বাংলায় এখন আওয়ামী মুসলিম লীগ ছাড়া আর কোনো দল নাই। আর কোনো পার্টির কোনো জনপ্রিয়তা নাই। গণতান্ত্রিক দল নামে একটা দল খোলা হয়েছিল, কাগজ-কলমের বাইরে তার কোনো অস্তিত্ব নাই। মুসলিম লীগ ঘোরতর অজনপ্রিয়। এ অবস্থায় নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগ এককভাবে জয়লাভ করবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভেতরেই অনেকে চাইছেন যুক্তফ্রন্ট। কেউ কেউ গিয়ে ফজলুল হককে বুঝিয়েছেন, আপনি কেন আওয়ামী লীগে যোগ দেবেন। তাহলে তো আপনার লোকজন নমিনেশন পাবে না। এমএলএ, মিনিস্টার হতে পারবে না। আপনি কৃষক প্রজা পার্টিকে পুনরুজ্জীবিত করুন। আপনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারবেন। আর তা ছাড়া যদি মুসলিম লীগ কিছু আসন পায়, নির্বাচনের পরে তাদের সঙ্গেও দরকষাকষি করা যাবে।
ফজলুল হক দেখলেন, কথা ঠিক।
আর তার পেছনে গিয়ে জুটল মুসলিম লীগের বিদ্রোহী, পদত্যাগী, বহিষ্কৃত সুবিধাবাদীরা।
শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্ট চান না। বিশেষ করে ফরিদপুরের মুসলিম লীগারদের তিনি সব সময়ই অপছন্দ করে এসেছেন, তারা এসে জুটেছে ফজলুল হকের সঙ্গে।
ভাসানী কাউন্সিল ডেকে নিজে আশ্রয় নিয়েছেন বগুড়ার পাঁচবিবিতে।
ট্রেনে বসে খন্দকার ইলিয়াসকে মুজিব বললেন, ‘মওলানা সাহেবের এই এক অভ্যাস। যখনই কোনো জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয়, উনি সটকে পড়েন।’ এর আগে মুজিব ভাসানীর সঙ্গে দেখা করেছেন। ভাসানী তাঁকে বলেছেন, ‘যদি হক সাহেব আওয়ামী লীগে আইসেন, তাইলে তাঁরে গ্রহণ করা যায়। আর যদি অন্য দল করেন, তাইলে তাগো আমরা যুক্তফ্রন্টে লইমু না। যে লোকগুলান মুসলিম লীগ থাইকা বিতাড়িত হইছে, হেরা অহন হক সাহেবের কান্ধে ভর করণের চেষ্টা করতাছে। মুসলিম লীগের যত আকাম-কুকাম, তার সঙ্গে হেরা এই সেদিন পর্যন্ত জড়িত আছিল, হেরা রাষ্ট্রভাষা বাংলারও বিরোধিতা করছে, হে গো আমরা ক্যান লমু? আর শুনো, আওয়ামী লীগের মইধ্যে জানি যুক্তফ্রন্টঅলারা মাথাচাড়া দিয়া উঠতে না পারে, এইটাই দেইখো।’
মুজিব জানেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রশ্নে মাওলানা ভাসানীর অবস্থান পরিষ্কার। বাংলার জন্য তাঁর যে ভালোবাসা, তাতে কোনো খাদ নাই। তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন।
ট্রেন চলছে। প্রথমে যেতে হবে বাহাদুরাবাদ ঘাট। তারপর নদী পার হতে হবে স্টিমারে। ওপারে ফুলছড়ি ঘাট।
মওলানা ভাসানীকে নিয়ে সত্যিই মুশকিল। তাঁর জনপ্রিয়তা দারুণ, তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা তুলনাহীন, লোক ভালো কিন্তু যখন কোনো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসে, যাতে দুটো বিবদমান পক্ষ থাকে, ভাসানী আড়ালে চলে যান। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তানের জিন্নাহ এসেছিলেন আসামে। মওলানা ভাসানী তখন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি। আসামের মুসলমানেরা  পাকিস্তান আন্দোলনে পুরো সমর্থন দেবে, জিন্নাহকে আশ্বস্ত করলেন ভাসানী। সেইসঙ্গে তিনি আসামের মুসলমানদের ওপরে কী রকম অত্যাচার হচ্ছে, তার বিবরণ পেশ করতে লাগলেন। বর্ণনার এক পর্যায়ে আবেগে তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁর বর্ণনা শুনে উপস্থিত নেতাকর্মীরা সবাই কাঁদতে লাগল। পরে, জিন্নাহকে আলাদা পেয়ে, ডিনারের আগে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ইস্পাহানি জিন্নাহর সামনে মওলানা ভাসানীর প্রশংসা করতে লাগলেন। জিন্নাহ বিরক্তিভরে বললেন, ‘মওলানার মতো লোক মোটেও রাজনীতির উপযুক্ত নন। রাজনীতিতে বাজে ভাবালুতার কোনো স্থান নাই। আবেগের কোনো জায়গা নাই। রাজনীতি কঠিন দাবা খেলা। এখানে চোখ থাকবে অশ্র“হীন, যাতে বহুদূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। এ জন্য প্রয়োজন কঠিন পরিশ্রম, সাহস আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।’
মুজিবকে এই গল্প নিজের মুখে করেছেন ইস্পাহানি।
ব্যাঙ্গমা বলে, ইস্পাহানি কিন্তু বাঙালি নয়। পাকিস্তানি।
ব্যাঙ্গমি বলে, তাতে কী হইল। তাগো আদি নিবাস ইরান। তয় মুজিবের তিনি ভক্ত আছিলেন। আরো কয়েক বছর পর আইয়ুব খান যহন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হইব, আর বেসিক ডেমোক্রেসি চালু করতে চাইব, তহন একদিন ইস্পাহানি প্লেনে বসব বিশিষ্ট লেখক কলকাতাবাসী অন্নদাশংকর রায়ের পাশের আসনে। অন্নদাশংকর রায় তারে জিগাইব, পাকিস্তানের পলিটিক্সের খবর কী?
ইস্পাহানি জবাব দিব, আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি কোনো ডেমোক্রেসিই না। একে তো মাত্র ৮০ হাজার ভোটার। এর মধ্যে ৪১ হাজার ভোটার কিইনা ফেলতে কয় টাকা আর লাগে? আইয়ুব খান ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চান।
তাইলে কী করা উচিত? অন্নদাশংকর রায় পুছ করব। ইস্পাহানি জবাব দিব, গণতন্ত্র দিয়া ইলেকশন কইরা ইলেকটেড পলিটিশিয়ানদের হাতে ক্ষমতা ছাইড়া দিয়া চইলা যাওন উচিত আইয়ুব খানের।
‘পূর্ববাংলায় কে আছে যে প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হইতে পারে?’
‘কেন? শেখ মুজিব।’ ইস্পাহানি জবাব দিব।
বাহাদুরাবাদ ঘাট এসে গেল।
শেখ মুজিব আর খন্দকার ইলিয়াস নামলেন ট্রেন থেকে। এখন এই বালিভরা পথে ছুটে যেতে হবে স্টিমার ধরতে। মুজিবকে অনেকেই চেনে, তারা তাকে সালাম দিয়ে পথ করে দিতে লাগল।
শেখ মুজিবের মনে নানা দুশ্চিন্তা। সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে খবর দেওয়া হয়েছে। তিনি আসবেন। তিনি পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি। কিন্তু পূর্ববাংলার লীগের সিদ্ধান্ত নেবেন কাউন্সিলররা। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে অনেকেই ঘোট পাকিয়েছে। ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সভাপতি আবুল মনসুর আহমদ। তিনি বুঝদার লোক। কিন্তু তিনি পরিচালিত হচ্ছেন তার সাধারণ সম্পাদক হাশিমউদ্দিন সাহেবের দ্বারা। মুজিব সমস্ত জেলায় জেলায় চিঠি পাঠিয়েছেন, সব জেলার প্রতিনিধি যেন উপস্থিত থাকে। তাদের থাকার জন্য ছোটবড় সব হোটেল বুকিং দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
মুজিব জানেন, সব জেলা থেকে প্রতিনিধিরা এলে মুজিব যা বলবেন, সেটাই ভোটে গৃহীত হবে। কিন্তু মওলানা ভাসানী হঠাৎ করে চিঠি পাঠিয়েছেন, ‘আমি সভায় উপস্থিত হইতে পারিব না।’
মুজিবের মাথায় হাত। সভাপতি ছাড়া সভা হবে, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে! তিনি তাই ছুটেছেন মওলানা ভাসানীকে পাঁচবিবি থেকে ধরে আনতে।
খন্দকার মোশতাকও যুক্তফ্রন্ট সমর্থক। কমিউনিস্টভাবাপন্নরা আওয়াজ তুলেছে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে।
স্টিমার ফুলছড়ি ঘাটে পৌঁছাল।
মুজিব আর ইলিয়াস নামলেন স্টিমার থেকে। আবার দৌড়ে গিয়ে বগুড়াগামী ট্রেনে উঠতে হবে।
তারা তাদের নির্ধারিত ট্রেনে উঠেছেন। আরেকটা ট্রেন এলো বগুড়া থেকে। মুজিব যেন দেখতে পেলেন, ওই ট্রেনে দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরায় ভাসানীর মতো দেখতে কাকে যেন দেখা যায়।
ইলিয়াসকে বললেন, ‘দেখ তো কে?’
ইলিয়াস ট্রেন থেকে নেমে ওই ট্রেনের জানালায় উঁকি দিয়ে বললেন, ‘ওই তো মওলানা সাহেব।’
তখন মুজিবের ট্রেন ছেড়ে দেয়-দেয়। হুইসেল বেজে উঠেছে। তাড়াতাড়ি তিনি মালপত্রসমেত নেমে পড়লেন।
মওলানা ভাসানীও ট্রেন থেকে নেমেছেন। মুজিব আর ইলিয়াস তাঁর কাছে গেলেন। তিনি কোনো কথা না বলে হনহন করে হাঁটতে লাগলেন। মুজিবেরাও তাঁর পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগলেন।
মুজিব জিগ্যাসা করলেন, ‘ব্যাপার কী? আপনি সভা ডাকতে বললেন। আমি সভা ডাকলাম। এখন আবার আপনি উপস্থিত হবেন না কেন?’
মওলানা ভাসানী হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘তোমরা জান না, ঐক্যফ্রন্ট করার লাইগা তোমাগো নেতারা পাগল হইয়া গেছে। আমি তো নীতিছাড়া নেতাগো লগে এক হইতে পারি না। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে লোক বেশি। ভোট হইলে হাইরা যাইবা। আমি আর রাজনীতিই করুম না। আমার তো কিছুই নাই। আমি তো ভোটে খাড়ামু না। কারও ক্যানভাসও করতে পারুম না। তাই আর রাজনীতি করুম না। কাউন্সিল সভায় যোগ দেওনের কোনো ইচ্ছা তাই আমার নাই।’
মুজিব হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘আপনি তো আমার সাথে পরামর্শ না করেই কাউন্সিল ডাকতে বলে দিলেন। কাউন্সিল তো আর কিছুদিন পরে ঢাকায় হওয়ার কথা ছিল। ময়মনসিংহের বুদ্ধি আপনারে কে দিলো। তবে আপনি তো কাউন্সিলের মত জানেন না। আপনিও ইচ্ছা করলে যুক্তফ্রন্ট পাশ করাইতে পারবেন না। আওয়ামী লীগের সদস্যরা এই বিতাড়িত মুসলিম লীগ নেতাদের হাতে অনেক মাইর খেয়েছে। অনেক অত্যাচার সহ্য করেছে। তারা জানে, মুসলিম লীগের এই ননি খাওয়া নেতারা বিরোধী দল করার জন্য আসে নাই। আওয়ামী লীগের কান্ধে পাড়া দিয়া ইলেকশন পার হইতে আসছে। আপনি যদি উপস্থিত না হন, তাইলে আমি এখনই টেলিগ্রাম করে দিলাম। সভা স্থগিত। আমিও বাড়ি চলে যাব।’
মওলানার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তারা সর্দারের চর নামে একটা জায়গায় পৌঁছে গেলেন। ছোট্ট দুটি কুঁড়েঘর, একটা সামান্য আঙিনায় গিয়ে থামলেন ভাসানী। হাঁক পাড়লেন, ‘মুসা মিয়া।’
মুসা মিয়া দৌড়ে এসে কদমবুসি করল তাঁর পির সাহেবকে। ‘হুজুর, আসসালামু আলাইকুম। আস্যা পড়ছেন, খুবই ভালো করিছেন, একনা খবর দিয়া আসা লাগে না বারে হুজুর।’
তিনি এখন মওলানা আর তার সঙ্গীদের কোথায় বসতে দেন?
রাতে কোনো ট্রেন নাই ঢাকা ফেরার, মুজিব-ইলিয়াসকে এখানেই রাত কাটাতে হবে।
গাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে বসে পড়লেন মওলানা ভাসানী, মুজিব, খন্দকার ইলিয়াস। সেখানেই মুজিব-ইলিয়াসের সুটকেসও রাখা হলো। তখন সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। ডুবন্ত সূর্যের ম্লান আলো এসে পড়েছে গাছের নিচে এই আগন্তুকদের চোখে-মুখে। আস্তে আস্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। গরুর পাল নিয়ে ফিরে আসছে রাখাল। হাঁসের দল কাতারবন্দি হয়ে জলাশয় থেকে ফিরে আসছে গৃহস্থ বাড়ির আঙিনায়।
রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠে কুয়াশার সঙ্গে মিশে থমকে আছে কলাগাছের মাথায়।
মুসা মিয়া বলতে লাগলেন, ‘হুজুরদের কষ্ট হতিছে। চা খাবেন? হামি চা আনবার পাঠ্যা দিছুঁ ফুলছড়ি ঘাটত। চা আসিচ্চে।’
সন্ধ্যার সময় যে মোরগ ঘরে ফিরে এলো, সে কি জানত, কী অপেক্ষা করছিল তার অদৃষ্টে। একটু পরে মোরগের পাখা ঝাপটানোর শব্দ এলো। বোঝা গেল, মোরগ জবাই হচ্ছে।
মুসা মিয়ার তো কোনো সংস্থান নাই যে এই অতিথিদের রাতে থাকতে দেন। একজন প্রতিবেশীর একটা ঘর আছে। সেখানেই তিনজনের বিছানার ব্যবস্থা হলো। রাতের বেলা তিনজনে একবার গরম স্বরে, একবার নরম স্বরে আলোচনা চালিয়ে গেলেন। ভাসানী বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমরা যাওগা, আমি কথা দিতাছি আমিও যামু। জয়েন করুম মিটিংয়ে।’
ভাসানীর প্রতিশ্রুতি পেয়ে মুজিব আর খন্দকার ইলিয়াস ফিরলেন ময়মনসিংহ। কিন্তু আসার আগে মুসা মিয়া নামের ওই প্রায় চালচুলাহীন সহায়-সম্বলহীন কৃষকটিকে তিনি জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘মুসা মিয়া, আপনার মতো বড় হৃদয়ের মানুষ আমি জীবনেও দেখি নাই। আজকে আপনি আমাদের মতো উড়ে এসে জুড়ে বসা মেহমানদের জন্য যা করলেন, তার কোনো তুলনা নাই। আমি আপনার কথা চিরদিন মনে রাখব।’
ব্যাঙ্গমা বলল,
‘মুসা মিয়া গরিব না, অন্তরেতে ধনী।
তার কথা মুজিবর ভোলেনি কখনই॥’
ব্যাঙ্গমি বলল,
‘১৩ বৎসর পরে কারাগারে বসে।
মুজিবর স্মৃতি লেখে বিষাদে হরষে॥
কত মহারথী নাম এসে ভিড় করে।
এক নাম লেখা হয় স্বর্ণাক্ষরে॥
মুসা মিয়া নাম বাড়ি চর সরদার।
এত বড় প্রাণ আমি দেখি নাই আর॥
মুজিব লেখেন তাহা, কৃতজ্ঞতাভরে।
ইতিহাসে মুসা মিয়া জ্বলজ্বল করে॥’
(বিভিন্ন গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত। যারা ভোর এনেছিল শীর্ষক উপন্যাসধারার দ্বিতীয় খণ্ডের অংশ।)