চাঁদ-কাস্তে ও কাস্তের কবিতা, গান

লেখক: আহমদ রফিক

কাস্তে-হাতুড়ির সমন্বিত প্রতীকে মার্কস-এঙ্গেলসের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দর্শনের লক্ষ্য ছিল শ্রেণিশোষণ ও শ্রেণিবৈষম্যের অবসান ঘটাতে শ্রেণিসংগ্রামী বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষক-জনতার মুক্তি, সেইসঙ্গে সমাজবদল, সংস্কৃতির চরিত্রবদল ঘটানো। উনিশ শতক (১৮৪৮) থেকে এ-আহ্বান বিশ্ব-সাহিত্য-সংস্কৃতির বুদ্ধিজীবী সমাজে বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগায়। ইউরোপ থেকে এশিয়ায়, এবং বিশ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিম-লে। তিরিশের দশকে প্রগতি সাহিত্যের সূচনায় মার্কসবাদী দর্শনের নান্দনিক প্রতীকগুলো ক্রমান্বয়ে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকের চেতনা স্পর্শ করে, তাদের কারো সৃজনশীলতায় প্রভাব রাখে।
রাখে বিশেষ করে কবিতায়। কাস্তে-হাতুড়ি কৃষক-শ্রমিকের সংগ্রামী সত্তার প্রতীক। কৃষিপ্রধান দেশ বঙ্গে কাস্তেরই প্রতীকী-প্রাধান্য নানা প্রতীকী উপমায়, কখনো চাঁদের সঙ্গে, যে-চাঁদ সাধারণত রোমান্টিক প্রেমের অনুষঙ্গ হিসেবেও কবিতায়-গানে ব্যবহৃত। তিরিশের দশকের বাঙালি কবিদের দু-একজন চাঁদ ও কাস্তের উপমায় নান্দনিক প্রসাদ সৃষ্টি করে পাঠককুলকে চমকে দিয়েছিলেন।
সেখানে বিপ্লব নয়, ছিল প্রগতিচেতনার কাব্য-নান্দনিকতার সংগ্রামী প্রকাশ চাঁদকে কাস্তের প্রতীকে তুলে ধরে। যেমন তিরিশের শেষার্ধের কবি দিনেশ দাস। কবিতাটির নাম ‘কাস্তে’। কিন্তু বিদেশি শাসনে সাহিত্য-সংস্কৃতি ভুবনে সামাজিক পিছুটানের কারণে কবিতাটির প্রকাশ বিলম্বিত হয়। সময়টা ছিল প্রগতিচেতনার পাশাপাশি বাংলা কাব্যে-শিল্পসর্বস্বতার (‘আর্ট ফর আর্টস সেক’-এর) প্রাধান্য।
যেমন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বা প্রথম পর্বের বিষ্ণু দে। অন্যদিক থেকে ভিন্ন গোত্রের অমিয় চক্রবর্তী কিংবা বুদ্ধদেব বসু। দিনেশ দাস বাংলা কাব্যভুবনে শ্রেণিগত উচ্চতায় অধিষ্ঠিত না হলেও ‘কাস্তে’র মতো একাধিক কবিতা লিখে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন, সন্দেহ নেই। দুর্বোধ্য কারণে, হয়তোবা শিরোনামের কারণে, বা তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থানের কারণে লেখার পর কবিতাটির প্রকাশ বছরখানেক বিলম্বিত হয়।
অবশেষে প্রগতিবাদী কবি অরুণ মিত্রের কল্যাণে দিনেশ দাসের ‘কাস্তে’ কবিতাটি শারদীয় দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং কবি ও কবিতাপাঠকদের মধ্যে যথেষ্ট চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বিশেষ করে এর পঙ্ক্তিবিশেষ।
বেয়নেট হ’ক যত ধারালো
কাস্তেটা শান দিও বন্ধু,
এ যুগের চাঁদ হল কাস্তে।
তিরিশের রোমান্টিকতা বর্জন করে বিপ্লবীচেতনার নান্দনিক প্রকাশ ঘটায় কবিতাটি। চাঁদ নিয়ে উচ্ছ্বাস বিসর্জনের খাতায় নাম লেখায়। কবিতাটি প্রগতিচেতনায় তৎপর সাংস্কৃতিককর্মীদের উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে কবিতাটির পঙ্ক্তিবিশেষ তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত কবিদের কারো কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে প্রমুখের।
সুধীন্দ্রনাথ কলাকৈবল্যবাদী, ফরাসি শব্দবাদী কবি মালার্মের অনুসারী। লিখেছেন : মালার্মের কাব্যাদর্শই আমার অন্বিষ্ট। ‘উৎকৃষ্ট কবিতার’ শৈল্পিক সমঝদার নান্দনিক কবি সুধীন্দ্রনাথ কাস্তের অনুষঙ্গে কবিতা লেখেন তাঁর শিল্পবোধের সমান্তরালবর্তিতায়। কবিতাটি ছাপা হয় বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায়।
অবিশ্বাস্যই ঠেকে ‘এ যুগের চাঁদ হল কাস্তে’ পঙ্ক্তিটি নিয়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের নান্দনিক মাত্রায় কাব্যতৎপরতা। বিষ্ণু দে-ও কাস্তের সংগ্রামী কাব্যধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন কিছুটা দেরিতে, ‘সন্দ্বীপের চর’-এ পৌঁছে। ‘মৌভোগ’ কৃষক সম্মেলনের কথা স্মরণে রেখে ওই শিরোনামের কবিতাটি সংগ্রামী ধারায় রচিত, যদিও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা-বিরোধিতা যেখানে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, সেখানে তিনি ‘লাল নিশান’ উড়িয়ে লেখেন :
তাদের কথা হাওয়ায়, কৃষাণ কাস্তে বানায় ইস্পাতে
কামারশালে মজুর ধরে গান।
মনে রাখতে হবে, তিরিশের দশকে ভারতীয় রাজনীতি, বিশেষভাবে বঙ্গীয় রাজনীতি বিপ্লবী ধারায় একটি রক্তাক্ত সংগ্রাম এবং আত্মদানের ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল। সূর্য সেন, প্রীতিলতা, যতীন দাস থেকে বিপ্লববাদীরা বক্সা-হিজলি ক্যাম্পে বন্দিদশায়, গুলি-মৃত্যুর ঘটনাবলি, যা রবীন্দ্রনাথকেও প্রভাবিত করে, যা তাঁর কবিতায়ও প্রকাশ পায়।
কাস্তের প্রতীকে রোমান্টিক চাঁদকে সংগ্রামী ভুবনে টেনে এনে লেখা একটি কবিতা তিরিশের দুই বিপরীত ধারার কবিকে এতটাই স্পর্শ করে যে, তার প্রকাশ ঘটে তাঁদের সচেতন কাব্যপঙ্ক্তিতে। অবশ্য দুজনকে দুই তাৎপর্যে। বিষ্ণু দে এর প্রকাশ ঘটান কৃষক-শ্রমিকের শ্রেণিসংগ্রামের ধারায় নান্দনিকতা অক্ষুণœ রেখে। সেটা অবশ্য চল্লিশে পৌঁছে, গোত্রান্তর পর্যায়ে, যা ইতিপূর্বে উদ্ধৃত।

দুই
আবার কখনো হালকা চালে প্রথম দিকের কবিতায় দিনেশ দাসের পঙ্ক্তির মতো করেই সামাজিক অনাচারী চরিত্রের চিত্র আঁকেন বিষ্ণু দে এমন পঙ্ক্তি রচনায় :
আকাশে উঠল ওকি কাস্তে না চাঁদ
এ যুগের চাঁদ হল কাস্তে!
জুঁইবেলে ঢেকে দাও ঘন অবসাদ,
চলো সখি আলো করো ভাঙা নেড়া ছাদ।
এ-জাতীয় হালকা চটুলতার পাশাপাশি একই কবিতায় একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতার পরিচয়ও রাখেন বিষ্ণু দে এই বলে :
ঠগেরা বেনেরা পাতে চশমের ফাঁদ।
স্বার্থ-ছিটায় মুখে মৃত্যুর স্বাদ,
চাঁদের উপমা তাই কাস্তে। …
হৃদয়ে হাতুড়ি ঠোকে প্রেম, ওঠে চাঁদ
এ যুগের চাঁদ বাঁকা কাস্তে ॥
পর্বান্তরে ভিন্ন এক বিষ্ণু দে জনজোয়ারের টানে তেভাগার কাব্যচর্চায় এবং কৃষক-আন্দোলনের পটভূমিতে কাস্তের সংগ্রামী ভূমিকাকে কাব্যপঙ্ক্তির নান্দনিকতায় প্রকাশ করেছেন। এবং তা নানা অনুষঙ্গে। তাতে প্রকাশ পেয়েছে কাস্তের শৈল্পিক ব্যবহার :
তোমার বাউলে মিলাই বন্ধু কাস্তের মেঠো স্বর
মানব না বাধা কেউ
ঘৃণা আর প্রেমে ক্রান্তিতে চাই জীবিকার অবসর
জীবনের তটে জোয়ারভাটার ঢেউ।
এসব কাব্যপঙ্ক্তি বিষ্ণু দে-সুলভ ভিন্ন এক শিল্পচরিত্রের প্রকাশ ঘটায় – যা দিনেশ দাসের ‘কাস্তে’ থেকে অনেকটাই দূরে।
যেমন সুধীন্দ্রনাথের কাব্যপঙ্ক্তি – সেখানটায় অবশ্য বিষ্ণু দে থেকেও সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাব্যবোধের প্রকাশ, যদিও বিষয়বস্তু চাঁদ ও কাস্তে। এতে সংগ্রামীচেতনা নয়, শৈল্পিকচেতনারই প্রাধান্য। তবু কলাকৈবল্যবাদী কবি এ-উপলক্ষে অশান্ত বিশ্বপরিস্থিতির উন্মাদনাকে শিল্পের ধোঁয়াশায় ঢেকে ভিন্ন এক উপলব্ধির প্রকাশ ঘটান, যাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলা চলে না। সুধীন্দ্রনাথের ‘কাস্তে’ একেবারেই ভিন্ন চরিত্রের। এর শুরুটা এরকম :
আকাশে উঠেছে কাস্তের মতো চাঁদ
এ-যুগের চাঁদ কাস্তে।
ছায়াপথে কোন্ অশরীরী উন্মাদ
লুকাল আসতে আসতে।
গোটা ছোটখাটো কবিতাটিকে সুধীন্দ্রনাথ-সুলভ কাব্যশব্দবন্ধের জটিলতায় গতি করে উপসংহারে মানবিক চেতনার পক্ষে সংগ্রামী আভাস রেখেছেন শেষ কয়েকটি চরণে। সেখানে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নৈতিক সংগ্রামে কাস্তের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশ্নবোধক প্রকাশ রেখেছেন পৌরাণিক সূত্রের অনুষঙ্গে। উল্লেখ্য, অশুভ শক্তির প্রবলতার প্রসঙ্গে শুভশক্তির আভাস :
শুষ্ক ক্ষীরোদ সাগরে মগ্ন বিষ্ণু
নরপিশাচেরা পৃথিবীতে আজ জিষ্ণু। …
খ-াবে কবে অমৃতের অপরাধ
কালপুরুষের কাস্তে।
কবিতাটির সমাপ্তি অবশ্য ইতিবাচক প্রত্যাশায় সময়ের ওপর চোখ রেখে, তবু সংশয়ের প্রশ্নটি থেকেই যায়। অমৃতের অপরাধ তো শ্রেণিগত চরিত্রের। যতদিন প্রতীকী সুরাসুরের দ্বন্দ্বে সুরের চাতুর্য ও শক্তি লড়াইয়ের মাধ্যমে পরাজিত না হবে, ততদিন নিম্নবর্গীয়দের অমৃতের ন্যায্য অধিকার অর্জিত হবে না। এভাবেই কবি সুধীন্দ্রনাথের প্রতীকে ঢাকা প্রগতিশীলতা শৈল্পিক প্রাধান্যকে অতিক্রম করে মাঝেমধ্যে বিরল কাব্যপঙ্ক্তিতে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। সেখানে তিনি যথার্থ বাস্তববাদী শিল্পী।
যেমন দেখা যায় ‘উটপাখি’ কবিতাটিতে, গোটা বক্তব্যবিষয় অতিক্রম করে একটি অসাধারণ নৈতিক সত্যের উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটে একটি মাত্র পঙ্ক্তিতে, যা নানামাত্রিক অভিধায় ঋদ্ধ :
অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
তিরিশের দশকের ‘চাঁদ-কাস্তে’র কাব্যবিচারে তাই বলতে হয়, তৎকালীন বিবেচনায়, দিনেশ দাসের কাস্তে স্পষ্টতায় বেয়নেটের চেয়েও ধারালো। এবং তা শ্রেণিসংগ্রামের প্রত্যয় আদর্শগত চেতনায় ধারণ করে। দিনেশ দাসের কাস্তে যথারীতি সুধীন্দ্রনাথের কাব্য-পৌরাণিক উপমায় কালপুরুষের তরবারি রূপ ধারণ করেছে, যদিও তিনি সেটিকে ‘কাস্তে’ নামেই অভিহিত করেছেন।
তিরিশের দশকের কবিতার দোলাচলবৃত্তির মধ্যে কবি দিনেশ দাস কাস্তেকে চাঁদের উপমায় যুক্ত করে কবিতাকে সংগ্রামের ধারক-বাহক করে তোলেন। সেটা ছিল শ্রেণিসংগ্রামের শৈল্পিক প্রকাশ। চাঁদের প্রেমিক রোমান্টিকতাকে তিনি নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। যদিও সেখানে শৈল্পিক নান্দনিক রূপের প্রকাশে ঘাটতি ছিল না। চল্লিশের দশকের কবিরা এই ধারাবাহিকতায় কাস্তেকে নানা ভাষ্যে কবিতার উপজীব্য করে তোলেন।

তিন
তিরিশের দশকের আরেক ভিন্নমাত্রার স্বনামখ্যাত, বিরলপ্রজ কবি সমর সেন। একটিমাত্র মাঝারি আয়তনের বইয়ে তাঁর কাব্যসমগ্রের প্রকাশ, আর আত্মজৈবনিক ধারালো বিশ্লেষণে রচিত ‘বাবু বৃত্তান্ত’ – এত অল্প লিখেও বাংলা কাব্যসাহিত্যে তাঁর স্থানটি ঈর্ষণীয়। মূলত তাঁর তীব্র তীক্ষè মধ্যবিত্ত সমাজ, মূলত নাগরিক সমাজকে স্যাটায়ারি নির্মমতায় বিশ্লেষণ ও তাঁর তির্যক কাব্যিক পরিবেশনের কারণে।
তাঁর সম্পর্কে কবি ও বোদ্ধা পাঠকের অভিযোগ ছিল – এত অল্প লিখে কাব্যভুবন থেকে বিদায় নিলেন কেন? বিশ থেকে তিরিশের দশকে রাজধানী কলকাতার নাগরিক সমাজের অনাচারী, যৌনতাপ্রবণ ও দুর্নীতিপরায়ণ সমাজ সমর সেনের তীক্ষè আক্রমণের লক্ষ্য। মূল্যবোধের অবক্ষয়ে জীর্ণ, কারো বিচারে পচাগলা সমাজদর্শনের প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন মেধাবী বা প্রতিভাবান তরুণদের প্রতিক্রিয়া ছিল আত্মঘাতী; নান্দনিক বিচারেও একই কথা বলা চলে।
এদের প্রাথমিক পর্বের সৃষ্টি – কবিতা বা কথাসাহিত্য যতটা আত্মসমালোচনার, তারচেয়ে অনেক বেশি সমাজবীক্ষণ ও সমাজ-ব্যবচ্ছেদের। সে-ব্যবচ্ছেদ সমর সেনের কবিতায় সর্বাধিক দৃষ্ট, কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আমাদের আলোচ্য বিষয় যেহেতু কবিতা, বিশেষ করে সীমাবদ্ধ বৃত্তে দিনেশ দাসের কবিতায় চাঁদ ও কাস্তের প্রতীকী রূপ নিয়ে, তাই বক্তব্য ওই ছোট্ট বৃত্তে সীমাবদ্ধ।
সমর সেনের কবিতার সূচনা যেহেতু ১৯৩৪-৩৭ পর্বে, তাই পূর্বোক্ত প্রতীকী রূপের কাব্যিক প্রকাশ সমকালীন কবি সমর সেনের সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলেছে কি না তা বিবেচ্য, বিশেষ করে তিনি যখন পরবর্তী পর্যায়ে প্রগতিশীলতার ভুবনে পা রেখেছেন অবক্ষয়-বৃত্ত থেকে মুক্ত হয়ে। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা, তৎকালীন কবিদের বৃহত্তর সংখ্যা ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র এবং বিশ্বসাহিত্যের নিষ্ঠাবান পাঠক।
ব্যতিক্রম নন দুই অগ্রজ কবি, এবং কিছুটা হলেও ইংরেজ কবি টিএস এলিয়ট, অংশত ইয়েটস, এবং ফরাসি শিল্পসর্বস্ববাদী কবিদের প্রভাব সমর সেনের কাব্যচেতনায় লক্ষণীয়, তবে তা সুধীন্দ্রনাথ ও বিষ্ণু দে-র চেয়ে অনেক কম। সামাজিক অবক্ষয়ের রূপচিত্রণের কারণে সমর সেনের কবিতা প্রথম পর্বে উগ্র প্রগতি মতাদর্শে যথেষ্ট সমালোচিত, আবার বিপরীত ধারার সমালোচনাও কম নয়।
এমন এক পরিস্থিতিতে চাঁদ-কাস্তে বিষয়ক দিনেশ দাসের ‘কাস্তে’ কবিতার প্রতিক্রিয়া সমকালে লেখা সমর সেনের কবিতায় লক্ষ করা যাবে এমন সম্ভাবনা একেবারেই ভুল প্রমাণিত করে সমর সেনের কবিতা। অসুস্থ সমাজ, দূষিত সমাজ, বিকৃত মূল্যবোধে ও অবক্ষয়ে জীর্ণ নাগরিক সমাজের বিশ্লেষণে সমর সেন সমাজজীবনের চেয়ে ব্যক্তিক আচরণের জীবন বিশ্লেষণকেই প্রাধান্য দেন মূলত প্রেমকে ভিত্তি করে।
সেখানে তারুণ্যে, যৌবনে ব্যক্তিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলন প্রাধান্য পায়, সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় অশান্ত চেতনার অস্থিরতায়। সেখানে ‘অন্ধকার’ ও ‘হাহাকার’ শব্দ-দুটোর প্রাধান্য এবং ধারালো ছুরির তীক্ষè-তির্যক মন্তব্য, উপমা ও চিত্ররূপের প্রাধান্য। চাঁদ অবশ্য সেখানে মাঝেমধ্যে এসেছে, তবে কাস্তে নয়, এটা অবিশ্বাস্যই ঠেকে।
সূচনা-কবিতাটিতে পুনরুক্তি : ‘আকাশে চাঁদ নেই’ (‘নিঃশব্দতার ছন্দ’)। শহরের অবাঞ্ছিত চিত্ররূপ আঁকতে গিয়ে রাত্রিকে মনে হয় ‘নিঃসঙ্গ পশুর মতো আকাশের মরুভূমিতে’। আকাশের কোনো রোমান্টিক রূপ নেই, আকর্ষণও নেই। বরং ‘রাত্রে চাঁদের আলোয় শূন্য মরুভূমি জ্বলে/ বাঘের চোখের মতো’ – এ-উদ্ভট উপমার উপলব্ধিই প্রধান হয়ে ওঠে।
দিনেশ দাস থেকে শুরু করে সুধীন্দ্রনাথ ও বিষ্ণু দে যেখানে চাঁদকে দেখেন শাণিত কাস্তের মতো, সমর সেনের চোখে তার ভিন্নরূপ। তাঁর ভাষায় :
আজো জ্বলন্ত খড়্গের মতো আকাশে
চাঁদ ওঠে,
আজো সামনে
মৃত্যুর মতো মন্থর জীবন।
যে-খড়্গে কোনো রোমান্টিক উপলব্ধির অবকাশ নেই, নেই কোনো সংগ্রামেরও। আছে খড়্গাঘাতে নাগরিক জীবনে অনিবার্য মৃত্যুর উপলব্ধি। পরবর্তী জীবনে রক্তাক্ত শ্রেণিসংগ্রামে বিশ্বাসী ফ্রন্টিয়ার সম্পাদক সমর সেন তাঁর কবিজীবনের প্রথম পর্বে চাঁদকে কাস্তের প্রতীকে দেখেননি। দেখেছেন ব্যক্তিজীবনে, সমাজজীবনে ‘জ্বলন্ত খড়্গের’ প্রতীক রূপে, যে খড়্গের কাজ হলো জীবনকে কেটে ছিন্নভিন্ন করা।

চার
তিরিশের দশকে চাঁদ-কাস্তে বা শুধুমাত্র কাস্তে নিয়ে কবিতার আদর্শিক সংগ্রাম চালানো বা রূপচিত্র আঁকার চেষ্টা করেননি দিনেশ দাস বাদে কোনো কবি। এ-চর্চাটা চলেছে চল্লিশের দশকে। সুভাষ-সুকান্ত থেকে বিষ্ণু দে প্রমুখের হাতে। আর গণসংগীতে বিশেষভাবে স্বনামখ্যাত সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখ গুণীজন। শেষোক্তদের প্রভাব পঞ্চাশের দশকেও পূর্ববঙ্গের তরুণ-রাজনীতিমনস্ক সমাজে ব্যাপক পরিসরে দেখা গেছে।
চল্লিশের দশকে মূলত সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য কাস্তেকে কৃষকজীবনের রূপচিত্রণে এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে শ্রেণিসংগ্রামের শৈল্পিক তাৎপর্যে ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে সেই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ একই পথে পা বাড়িয়েছেন। সেখানে চাঁদের রোমান্টিক প্রতীক বা আবহ প্রায়শ অনুপস্থিত।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘ কাব্যজীবনের প্রথমদিকের পদাতিক-চিরকুট-অগ্নিকোণ পর্বে যেমন প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য বুদ্ধদেব বসুসহ একাধিক স্বনামখ্যাত কবি ও শিল্পমনস্ক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, তেমনি তাতে পরিস্ফুট রাজনৈতিক প্রগতিবাদী চরিত্র, কখনো উগ্রতা রাজনৈতিক অঙ্গনের পাঠকদের মধ্যে মুগ্ধতা ছড়িয়েছিল।
শ্রেণিশাসন-শোষণ এবং এর বিপরীতে শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রেণিশত্রু খতমের আহ্বান ছিল সুভাষের কবিতার একটি পার্শ্বমুখ। কৃষক-আন্দোলন, তেভাগা ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে সুভাষের কবিতায় কাস্তে নানা মাত্রায়, নানা ভাষ্যে বারবার এসেছে, ক্বচিৎ শিল্পের নম্রমাধুর্যে। গ্রামীণ পরিবেশের চিত্রণে এক পর্যায়ে সুভাষ এঁকেছেন একটি তাৎপর্যপূর্ণ শব্দশিল্পরূপ :
ধানের জমিরা পাশাপাশি শুয়ে
দিগি¦দিকে –
খাড়া করে কান কাস্তের শান
শুনছে নাকি
কামারশালে?
পদাতিকের কবি যেখানে কাস্তের শান শুনছেন, চিরকুটের বিপ্লবী কবি সেখানে প্রশ্ন তুলছেন দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ নিয়ে :
শানানো কাস্তে-হাতুড়ির মুখে
সোজা জিজ্ঞাসা –
দুশো বছরের রক্ত শুষেও
মেটেনি পিপাসা?
একই বিশ্বাসে বিপ্লবশেষে সম্ভাব্য সফলতার ঘোষণা চিরকুটের কবিতায় :
দিন আসে ভাই –
কাস্তের মুখে নতুন ফসল তুলবার।
এমন বহু উদাহরণ তুলে ধরা যাবে কাস্তের সংগ্রামী ভূমিকা নিয়ে, নানা প্রতীকে, নানা চিত্ররূপে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে। চল্লিশের দশকের চরিত্রমাফিক, আদর্শমাফিক কাস্তে-প্রাকরণিক কাব্যপঙ্ক্তির তিরিশের দশক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চারিত্র্যবৈশিষ্ট্যে – সরাসরি বিপ্লবী সংগ্রামী ধারায়।
একইভাবে অনুরূপ যুগোপযোগী কবিতাপঙ্ক্তির সন্ধান মেলে সুকান্তর রচনায়। সুভাষের কবিতায় যেখানে প্রাকরণিক উদ্ভাস আপন বৈশিষ্ট্যে, সুকান্তে সেখানে স্পষ্টতা, ঋজুতা, সরল-জটিলতাহীন শব্দবিন্যাস। সম্ভবত এ-কারণেই সমকালে সুকান্তর কবিতা অনেক বেশি পাঠকমন জয় করেছিল – এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল সুভাষ-সুকান্তকে নিয়ে জনপ্রিয়তার তুলাদ-ে।
সুকান্তের ‘ফসলের ডাক : ১৩৫১’ কবিতাটি শুরুই হয়েছে এভাবে সহজ-সরল শব্দভাষ্যে :
কাস্তে দাও আমার এ হাতে –
সোনালী সমুদ্র সামনে, ঝাঁপ দেব তাতে। …
আমার পুরনো কাস্তে পুড়ে গেছে ক্ষুধার আগুনে
তাই দাও দীপ্ত কাস্তে-চৈতন্য-প্রখর –
যে কাস্তে ঝলসাবে নিত্য উগ্র দেশপ্রেমে,
যে কাস্তে শত্রুর কাছে দেখা দেবে অত্যন্ত ধারালো।
এমন কিছু কাস্তেবিষয়ক কাব্য-উল্লেখের উদাহরণ মিলবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের একাধিক কবিতায়। যেমন – ‘এরই মধ্যে হেমন্তের পড়ন্ত রোদ্দুর/ কঠিন কাস্তেতে দেয় সুর’ ইত্যাদি।
তবে তিরিশ আর চল্লিশে বড় একটি পার্থক্য হলো কবি দিনেশ দাস চাঁদকে কাস্তের রূপ দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন অভিজাত কবিমহলে, অন্যদিকে সুভাষ-সুকান্ত প্রমুখ বিপ্লবী কবিরা কাস্তেকে শ্রেণিসংগ্রামের নানা ভাষ্যে হাজির করেছিলেন। তাই সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের উপমা টেনে বলতে পেরেছিলেন : ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ – যে-কাব্যপঙ্ক্তি একসময় পাঠকের মুখে মুখে ফিরতো।

পাঁচ
কাস্তে কৃষকসমাজে ফসল কাটার অতি প্রয়োজনীয় একটি হাতিয়ার। অন্যদিকে সমাজবদলের আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী অস্ত্র, যেমন শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামের প্রতীক হাতুড়ি। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গন তার সর্বোচ্চ সংগ্রামী সচেতনতার কালে (যেমন বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে) কাস্তে-হাতুড়িকে নান্দনিক সৃজনশীলতায় ব্যাপক হারে ব্যবহার করেছিল, ইতিহাস তা ধরে রেখেছে যেমন কবিতায়, তেমনি গণসংগীতে।
সে-পর্যায়ে গণসংগীতে কাস্তের সাংস্কৃতিক ব্যবহার ছিল অনেক বেশি ধারালো, যে-ধারা চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হয়ে পূর্ববঙ্গে ষাটের দশক পর্যন্ত বিস্তৃতিলাভ করে একাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠনে। কাস্তে তখন শ্রেণিসংগ্রামের প্রতীক, শ্রেণিশত্রু খতমের হাতিয়ার – যেমন কৃষক-আন্দোলনের উগ্রতায়, তেমনি তেভাগার অনুরূপ আন্দোলনে, মূলত উত্তরবঙ্গে।
ধানকাটা-ফসলকাটার হাতিয়ারকে মূলত তেভাগা তথা উত্তাল কৃষক-আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গণসংগীতে কাস্তেতে শান দেওয়ার আহ্বানে গণসংগীতকারদের মধ্যে সলিল চৌধুরী ও হেমাঙ্গ বিশ্বাস ঐতিহাসিক মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। সমাজসচেতন সাংস্কৃতিক মহলে তাঁদের জনপ্রিয়তা ছিল অপরিসীম। কবি দিনেশ দাস যার সূচনা ঘটিয়েছিলেন একাধিক কবিতায়, বিশেষ করে ‘কাস্তে’ শীর্ষক কবিতায়, তাতে কবিতায় সুভাষ-সুকান্ত প্রমুখ এবং গণসংগীতে পূর্বোক্ত দুজন বৈপ্লবিক সংগ্রামী আবহ তৈরি করেন।
সেই ঐতিহাসিক সৃজনশীলতার দু-একটি চরণের উদাহরণ আমাদের সেই ঐতিহাসিক যুগটিকে স্মরণ করিয়ে দেবে – সমাজ-সচেতন রাজনীতি-সচেতন তরুণদের মুখে মুখে এবং মাঠে-ময়দানে ক্ষেতে-খামারে সেসব গণসংগীত প্রবল আবেগ সৃষ্টি করেছে। যেমন সলিল চৌধুরীর গান – ‘হেই সামালো, হেই সামালো ধান হো/ কাস্তেটা দাও শান হো/ আর দেব না ধান মোদের প্রাণ হো’ ইত্যাদি অবিস্মরণীয় গানের চরণ। তেমনি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বহু গানের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় কাস্তের গান – ‘তোমার কাস্তেটা দিও জোরে শান,/ ও কিষাণ ভাইরে।’
শীর্ণকায় বাঁকা চাঁদ এবং কাস্তে, বিশেষভাবে কাস্তের প্রতীকে এক সময় বাংলা কবিতা ও গান সাহিত্য-সংস্কৃতির আসর মাতিয়েছিল, এখন তা বিস্মৃত ইতিহাস। সময়ের অনেক চরিত্রবদল ঘটে গেছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, এমনকি কাজে, সংগীতে।

Leave a Reply