উড়ন্ত অন্তর্বাস

লেখক: শাহীন আখতার

তিনি ছিলেন তাদের হোস্টেল সুপার। আঁশবঁটিতে কোপানো একটা লাশের ছবির দিকে তাকিয়ে আধাআধি বিশ্বাস করে সে। নামটাও আধাআধি মনে ছিল – সুরমা …। তখনো তিনি অবিবাহিত।
মৃত মহিলার নাম সুরমা রহমান। স্বামীর নাম মিজানুর রহমান। তাদের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে বিয়ের পর বিদেশ চলে গেছে। ছেলে বিদেশি ব্যাংকের কর্মকর্তা, দেশেই থাকে। সম্ভবত বিয়ের পরপর সুরমা রহমান মফস্বলের কলেজ থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। খুন হন যখন, তখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। ততদিনে রহমান সাহেবও মারা গেছেন। ছেলে সপরিবারে বারিধারা থাকে। তিনি দুটি কাজের লোক নিয়ে মধ্য-ঢাকার পঁচিশতলা ভবনের দুই হাজার স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। সুরমা রহমান খুন হওয়ার পর কাজের লোকদুটি পলাতক।
নাসিমা সুলতানা খুনের খবরটা মন দিয়ে পড়ে আরো নিশ্চিত হতে কাগজের পাতায় সুপারের ছবি খোঁজে। ৪০ বছর আগে, সুরমা রহমান যখন ২৫ বছরের যুবতী, তখনকার ছবি। সেই ছবির তালাশে পত্রিকাস্ট্যান্ডে হানা দেয় সে। অফিস আওয়ার। ফুটপাতে অসম্ভব ভিড়। পত্রিকার অস্থায়ী র‌্যাকের নিচে একসারি চটকদার ম্যাগাজিন, বাকি জায়গায় দুজন
পথচারী শুধু আড়া হয়ে চলতে পারে। নাসিমা সুলতানা ফুটপাতের পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে অস্থির হাতে পত্রিকার পাতা ওলটাচ্ছিল। ওখানে চড়া রোদ পড়তে একটুখানি সরে দাঁড়ায়। প্রথম বুঝতে পারে না, পত্রিকার ছেলেটা কাকে শাসাচ্ছে। এমন ভিড়ভাট্টায় কাস্টমারের ওপর চোখ রাখা সম্ভব নয় বলে নাসিমা সুলতানাকেই গলা চড়িয়ে স্ট্যান্ডের কাছে আসতে বলছে সে। ফের কাগজ-হাতে ছায়াহীন দেয়ালের পাশে দাঁড়াতে হয়। এবার ছোড়ার নতুন নখরা। কাগজের ভাঁজ নষ্ট হয়ে গেছে – কেউ এ-রদ্দিমাল কিনবে না। নাসিমা সুলতানা তর্ক জুড়ে দিচ্ছিল। ‘ম্যাগাজিন আপনে রাস্তায় খাড়াইয়া দিনচুক্তি দেখতে পারেন’, এক পথচারী তার মুখে যেন চপেটাঘাত করে, ‘খবরের কাগজ কি মাগনা পড়ার জিনিস?’
দশটা দলামোচড়া কাগজের দাম চুকিয়ে বাসায় ফেরে নাসিমা সুলতানা। এ যেন একটা দেখার মতো দৃশ্য। পানের পিকরাঙা, মুরগির লোম-ওড়া, মাছের আঁশ-লেপটানো, রান্নাঘরের বাসি খাবার বা ময়লা-আবর্জনার গন্ধ ঘুরপাক খাওয়া চিপা প্রায়ান্ধকার সিঁড়ি। দিনে যতবার সে ওঠানামা করে, প্রতিটি ল্যান্ডিংয়ে বাঁক নিতেই দরজার ফাঁকে কারো মুখের আদল বা চোখের কোনা, কখনো রঙিন ছাপা শাড়ির বক্র চিকন রেখার দেখা মেলে। সে বুঝতে পারে এখনকারগুলি হাউসওয়াইফদের। বাচ্চাদের ইশকুলে পাঠিয়ে দিয়েছে, খানিক বাদে চুলায় রান্না চড়াবে। মাঝখানের বিরতিতে নাসিমা সুলতানা বিনোদনের খোরাক বিলাচ্ছে। আগে ভাবত, তার চীনাপাখার মতো শাড়ির আঁচলের ভাঁজ বুঝি লোকের কৌতূহলের বিষয়। পাড়া-মাতানো হিলের খুটখুট শব্দটাও ইন্ধন জোগাতে পারে। এখন তো সে সিøপার-পায়ে হাঁটতে গিয়েও পাক খায়। শাড়ি ছেড়ে সালোয়ার-কামিজ ধরেছে তাও প্রায় এক দশক। যতই খুঁড়িয়ে হাঁটুক বা আভরণহীন হোক, বাজারের ব্যাগ হাতে একা মহিলা, বয়স ভাটিতে পড়লেও সে লোকের কাছে দেখার বস্তু।
আজ সবকিছুই যেন অন্যরকম। আজ কোনো রাখঢাক, ফিসফাস নেই। নাসিমা সুলতানা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে নিচের তলার দরজার ছিটকিনি খুলে যায়। তারপর আরেকটা দরজার। চুলার গ্যাস চলে যাওয়ায় এ বিপত্তি। সবাই বেকার হয়ে পড়েছে। আর লাকড়ির বদলে এককাঁড়ি খবরের কাগজ নিয়ে মহিলা বাসায় ফিরছে, তাই দেখে আমোদে আটখানা হচ্ছে।
‘এরা কি আমারে পাগল ভাবে! হায় আল্লাহ, কেমন মানুষ এগুলি?’ নাসিমা সুলতানা ঘরের তালা খুলে সশব্দে দরজা বন্ধ করে।
এতগুলি পত্রিকা! সুরমা রহমানের জীবৎকালের ছবি মাত্র একটা-দুইটা! তা-ও ৬৫ না হলেও কমসে কম ৬০ পেরিয়ে তোলা। তিন-তাকবিশিষ্ট চর্বিমাখা গোল চিবুক। চুল সরে যাওয়া প্রশস্ত কপাল। কিন্তু ঘোলা চোখের ওপর চুলের মতো চিকন ভুরু জানান দিচ্ছে, তিনিই ৪০ বছর আগের সুরমা …, বিয়ের পর যিনি সুরমা রহমান হয়েছিলেন। আরেকটা অখ্যাত কাগজে নাতির জন্মদিনের রঙিন ফটো, যেখানে ছোট একটা হাত তার হাঁ-করা মুখে কেকের টুকরা তুলে দিচ্ছে। এ-ছবিতে ভুরু দেখা যায় না, তবে তাঁর পছন্দের ম্যাজেন্টা কালারের লিপস্টিক ঠোঁটদুটিতে স্পষ্ট।
নাসিমা সুলতানা ছবি দুটি পাশাপাশি রেখে অতীতে চোখ ফেরায়। ২৫-এ চোখের ভ্রমরকালো পাপড়ির ওপর ধনুকের মতো বাঁকানো ভুরু ছিল। এখন পাপড়ি-ঝরা, প্রায় নাই-ভুরুতে ছবিদুটি ভুতুড়ে দেখায় না, হয়তো ঠোঁটের গাঢ় লিপস্টিকের জন্যে। আগাগোড়া সাজুনি একজন মহিলা, যে অন্যের সাজগোজ পছন্দ করত না।
২৫ বছর বয়সী সুরমা রহমানের বাঁকানো ভুরু যেন বড়শি, যাতে নাসিমা সুলতানার কামিজের নিচের প্যাড-লাগানো অন্তর্বাস, পায়ের সস্তা হাইহিল গেঁথে গিয়েছিল। ‘গ্যাঁইয়্যা মেয়ের সাজ! মনে হয় বাজার করতে শহরে আসছে, পড়তে আসে নাই!’ হোস্টেলের লম্বা বারান্দার শেষ প্রান্তে ওকে পাকড়াও করে বলেছিলেন সুরমা রহমান। কপাল খারাপ, আর দশ কদম এগোতে পারলেই নাসিমা সুলতানার পাঁচিল ডিঙানো হয়ে যেত। সহপাঠীরা একে একে দেয়াল টপকে সবাই ওপাশে। মাথা গোনা হয়ে গেলে ওরা রিকশাবোঝাই হয়ে সিনেমা হলে ছুটবে। পোকামাকড় উড়ে পড়া একটা একশ ওয়াটের বালবের নিচে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নাসিমা সুলতানা। পাশেই পুকুরপাড়ের ঝোপঝাড়ে ঝিঁঝি পোকার কলরব। সুপার দেখে এসেছেন ফার্স্ট ইয়ারের ডরমিটরি ফাঁকা। ছুটে এসে যার নাগাল পেয়েছেন, তার ওপরই চড়াও হচ্ছেন। নাসিমা সুলতানার ওদিকে কান থাকলেও চোখের দৃষ্টি কলেজে ভর্তি উপলক্ষে কেনা হাতঘড়িতে। আড়চোখে দেখছে – সেকেন্ড-মিনিটের কাঁটা ওর ইচ্ছার বিপরীতে কেমন লাগামহীন ছুটছে। মাথা গোনায় খামতি পড়লেও সহপাঠীরা পরোয়া করবে না। ব্ল্যাকে নাইট শোর টিকিট কাটা হয়ে গেছে।
ঘড়ির কাঁটা শো-র টাইমের ঘর অতিক্রম করে গেলে মাথা তোলে নাসিমা সুলতানা। সুপার বারান্দার আরেক প্রান্তের গোল থামে হেলান দিয়ে সিনিয়র একজনের সঙ্গে হেসে হেসে কথা কইছেন। ওকে নিয়েই কি? বলছেন হয়তো প্যাড-লাগানো অন্তর্বাস আর হাইহিলের কিস্সা, যা গ্রাম থেকে আসা প্রতিটা মেয়ে হোস্টেলে পা দিয়ে খরিদ করতে ছোটে। নাসিমা সুলতানাও তাদের একজন। কিন্তু সে তাদের মতো পুরোপুরি নয়। কানে তালা-লাগা ঝিঁঝির ডাকের মাঝখানে নিজেকে শোনায় সে।
প্রথম দিন ট্রাঙ্ক-বেডিং নিয়ে হোস্টেল গেটে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। রেজিস্ট্রি খাতায় নাম উঠবে, রুমের চাবি হাতে পাবে তারপর বিছানা-বাক্স দারোয়ানের মাথায় চাপিয়ে ঘাসে-ছাওয়া সবুজ মখমলি মাঠটা কোনাকুনি পাড়ি দিয়ে অন্য এক জগতে প্রবেশ। সেই জগতের সম্রাজ্ঞীকে অচিরেই দেখতে পায় সে, লাল শিফন শাড়ির নিচে জোড়া তালের মতো বুকসমেত। পড়ন্ত বেলায় শাড়ির রক্তিম আভা ছড়িয়ে তিনি গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলে গার্ড রেজিস্টি খাতা থেকে মুখ তুলে অবাক চোখে তাকায় ম্রিয়মাণ ষোড়শী নাসিমা সুলতানার দিকে। ‘সালাম দিলেন না! ইনিই কিন্তু আফনেরার সুফার।’
দুদিন পর কলেজ পালিয়ে বড়বাজারে সারি সারি উড়ন্ত অন্তর্বাস দেখে নাসিমা সুলতানার চোখ ছানাবড়া। এগুলি যেন ঝরে-পড়া বকের মতো আড়ায় ঝাপটা খেয়ে বাতাসে উড়ছে। তখনই সে সুপারের কায়কারবার বুঝে যায়। সেরকম তালমার্কা না হলেও নিজের সাইজের একটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশমাত্র দোকানি আঁকশি দিয়ে পেরে, যেন চোরাইমাল তা চটজলদি কাগজের ঠোঙায় ভরে দেয়। তাছাড়া নাসিমা সুলতানার হিলতোলা জুতার প্রয়োজন ছিল নিজের উচ্চতাটা মানানসই স্তরে আনার জন্য।
খবরের কাগজ সরিয়ে খাট থেকে মাটিতে নামে সে। শরীর টানটান করে মটমট শব্দে আড়মোড়া ভাঙে। সুপারের ওই ছবিদুটিই আজকের সম্বল।
দেয়াল-আয়নার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে – এতটা বুড়িয়ে গেছে সে! কপাল ঘিরে ক্রমশ পাতলা হতে থাকা সাদা-কালোর মিশেলে ধোঁয়া-রঙা চুল। কালো চিতি-পড়া গাল। কবে থেকে অ্যান্টি-রিংকল ক্রিম কিনবে কিনবে করছে, দোকানে যাওয়ার কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে। আজ নাইট ডিউটি আছে তার। ঘণ্টাখানেকের জন্য হলেও দিবানিদ্রার প্রয়োজন ছিল। দুপুরটা মাটি করেছে পত্রিকার পাতায় সুপারের ছবির তালাশে আর খুনের বৃত্তান্ত উলটেপালটে পড়তে পড়তে।
দুপুরের খাবার বিকেলে খেয়ে ফের পত্রিকা নিয়ে বসে সে। নতুন করে দেখা বা পড়ার মতো কিছু নেই। তার জন্য আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নাসিমা সুলতানা খবরের কাগজগুলি বিছানার একপাশে ঠেলে দিয়ে জোর করে চোখ বোজে।
লম্বা বারান্দার পর একটা প্রাপ্তবয়স্ক শিউলি গাছ। শিউলিফুল ঝরে ঝরে শিশিরভেজা ঘাসে নানা রকমের নকশা ফুটিয়েছে। সবুজে সাদায় কমলায়। কমলা সবুজ সাদায়। সাদা কমলা সবুজে। ঘাসের ডগায় হীরক-কুচির মতো শিশিরকণা। বাতাসে শিউলির সুবাস। নাসিমা সুলতানার শরতে হোস্টেলে প্রবেশ ঘটলেও, দু-দুবার ষড়ঋতুর পরিক্রমা সেখানে দেখতে পেয়েছে। তারপর হোস্টেলজীবন শেষ। পড়াশোনারও ইতি তখন। বাবার অকালমৃত্যু না হলে সে ডাক্তারই হতো, নার্স নয়। তখন এসএসসি পাশ করে যেখানে নার্সিং ডিপ্লোমা কোর্স করা যেত, নিরুপায় হয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশের পর তাকে সেই কোর্সে ঢুকতে হয়েছে।
অসময়ে চটকা ভেঙে অন্ধকারে জেগে ওঠে সে। বুকটা কেমন ধড়াস ধড়াস করছে। অবিকল সুপারের ২৫ বছর বয়সের চেহারার একজন, নাসিমা সুলতানার বাবা উবু হয়ে যার জুতা বুরুশ করছেন। এটা কি পরলোকের নিয়ম? নবাগতের প্রতি পুরাতনের শ্রদ্ধা প্রদর্শন? নাসিমা সুলতানা কোশিশ করে মাথার ঘাম ঝরায় – যদিও পরলোকবাসী দুজন ডাল-ভাঙার জাঁতা বা পৃথিবীর মতো ঘূর্ণায়মান কিছুর ওপর, ঘুরতে ঘুরতে সামনে আসছে, তবু বাবার মুখটা দেখতে পায় না সে। শুধু খয়েরি রঙের কোটের জন্য লোকটাকে বাবা ভাবছে। যে-কোটটা সড়ক দুর্ঘটনার পর তার গায়ে আঁট হয়ে লেগে ছিল, আর রক্তে ভিজে যাওয়ায় একে গাঢ় খয়েরি মনে হচ্ছিল। কোটের রং এক হলে কী – ঘুমটা পাতলা হতে থাকলে নিজেকে বোঝায় সে, আসলে তো লোকটা সুপারের স্বামী মিজানুর রহমান। এভাবে সুপারের জুতা পরিষ্কারের কাজটা তাঁর স্বামীর ঘাড়ে ন্যস্ত করতে নাসিমা সুলতানার অপমানের জ্বালা যেন কমে কিছুটা।
রেডিয়াম লাগানো দেয়ালঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। তার নাইট ডিউটি শুরু হবে রাত ৯টায়। অন্ধকারে বিছানায় বসে সে পরিকল্পনা করে – বেশিদূর তো নয়। হাসপাতালে যাওয়ার পথে একবার ঢুঁ মারবে নাকি সুপারের বাসায়! স্বপ্নটা তখনো এমন জীবন্ত যে, নাসিমা সুলতানার মনে হয় – বাসার কলবেল বাজালে ২৫ বছর বয়সী সুপার দরজা খুলে সামনে দাঁড়াবেন। ম্যাজেন্টা কালারের ঠোঁট ফাঁক করে হাসবেন একটুখানি, যেমন করে বাচ্চারা ঠোঁটে লিপস্টিক লাগালে কম হাসে বা হাসলেও সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট বুজিয়ে ফেলে; কিন্তু ঘরে লাইট জ্বলে উঠতে পরিকল্পনাটা বাতিল হয়ে যায়। সুপারের বাসায় তাকে চিনবে না কেউ। খুন হওয়া বাড়ি, ও অচেনা বলে সন্দেহও করতে পারে। খুনি তো কখনো কখনো নিজের অজান্তে এভাবেই স্পটে গিয়ে ধরা দেয়।
হাসপাতালের সার্ভিস রুমে পোশাক পালটাতে কেমন নির্ভার লাগে নাসিমা সুলতানার। মনে হয়, এখনকার ডিটারজেন্ট, ডেটল, ফিনাইল ইত্যাদির ঝাঁঝাঁ গন্ধে সুপারের ভূত ঘাড় থেকে নেমে পালিয়েছে। সে এখন একজন সেবিকা – রোগীদের ফাইল দেখতে দেখতে ভাবে নাসিমা সুলতানা, যাকে আজ রাতে দুজন মুমূর্ষের দেখভাল করতে হবে। তাকে সহযোগিতা করার জন্য জুনিয়র নার্স রয়েছে। আর ডিউটি ডাক্তার তো থাকবেনই। জরুরিভিত্তিতে স্পেশালিস্টও ডাকা যাবে। তবু মনে হয় আজ রাতে একাই তাকে আজরাইল ঠেকাতে হবে।
স্পেশাল কেয়ার ইউনিটের দরজায় লম্বা সেলাম ঠোকে ইউনিফর্মধারী গার্ড। নাসিমা সুলতানা শীতল, আলো-আঁধারি এক গুহায় প্রবেশ করে। ভাবে – এখানে জীবাণুনাশকের গন্ধ ছাপিয়ে অদ্ভুত যে-দুর্গন্ধটা, তা মৃত্যুর সঙ্গে যুঝতে থাকা শরীর থেকে নির্গত হয় বুঝি। তাদের এ আখেরি লড়াই সহজ করতে বাতিটা আরেকটু বাড়িয়ে দেওয়া যায় না! ফ্লোর মোছায় ব্যবহৃত হতে পারে আরো বেশি ফিনাইল, স্যাভলন বা প্রাকৃতিক কোনো সুগন্ধি। বেডের সারির মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে নাসিমা সুলতানা হাল ছেড়ে দেয়। অজস্র যন্ত্রসজ্জিত, ধূসর কম্বল ঢাকা মানুষগুলি যেন জিন্দা লাশ। শ্লেষ্মা, সর্দি, রক্ত, পুঁজ, বমি যেখানে, সেখানে কিছুতেই সতেজ ভাব ফেরানো যায় না।
সে কি জীবনমৃত্যু নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছে!
‘আজকের খুনের খবরটা দেখছ?’ সিটে বসে জুনিয়র সহকারীর দিকে তাকায় নাসিমা সুলতানা। মেয়েটি মাথা নাড়ে। টিভি খোলার সময় পায় নাই। প্রায় সারাদিনই হাসপাতালে। এখন তার দ্বিতীয় শিফ্ট চলছে।
‘একজন অধ্যাপিকা খুন হইছেন।’
মেয়েটি কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে একটুখানি হাসে। মৃতের প্রতি সহানুভূতিহীন অভিব্যক্তি। বা হেসে হয়তো বোঝাতে চায় – কাজের ফাঁকে সিনিয়র নার্সের কথা সে মন দিয়ে শুনছে। কিন্তু মনটা তিক্ত হয়ে ওঠে নাসিমা সুলতানার। এখানে মৃত্যু কাউকে ভাবায় না, তা স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যাই হোক।
মৃত্যু আবার স্বাভাবিক কী। আবার একে অস্বাভাবিকই বা বলা কেন, সবাইকে যখন একদিন মরতে হবে! স্পেশাল কেয়ার ইউনিট থেকে কফি খেতে বেরিয়ে নিজের সঙ্গে জেরা করে নাসিমা সুলতানা। কাগজের কাপে দুধ-চিনি মিশ্রিত কড়া মিষ্টি কফি। তাতে চুমুক দিয়ে করিডোরের কৃত্রিম আলোয় চোখ পিটপিটিয়ে তাকায়। হাত থেকে কাপ নামিয়ে চশমার কাচ মোছে। তবু খুন না হলে সুপার হয়তো আরো ১০-১৫ বছর দিব্যি বাঁচতেন। তা বাঁচতেন। তারপর মরে যেতেন চুপিচুপি। সুপারের সঙ্গে তার সম্পর্ক এমন নয় যে, তখন নাসিমা সুলতানাকে সাড়ম্বরে জানানো হতো – তোমাদের সুপার আর নেই। ইওর সুপার ইজ নো মোর। অপমৃত্যু হয়েছে বলেই তো সুপারের মৃত্যুসংবাদটা সে জানতে পেরেছে। শুধু কি তাই? এতদিন নাসিমা সুলতানার কল্পনায় সুরমা রহমান ২৫-শেই আটকে ছিলেন। তাঁর গত চল্লিশ বছরের জীবনবৃত্তান্ত – বিয়ে, ঢাকায় বদলি, সন্তান, বৈধব্য, রিটায়ারমেন্ট সবই সে জেনেছে আজকের খবরের কাগজ পড়ে।
সকালে ডিউটি থেকে ফেরার পথে পত্রিকাস্ট্যান্ডে রিকশা থামায় নাসিমা সুলতানা। বিক্রেতার বিহ্বল দৃষ্টির সামনে গোটাদশেক বাংলা-ইংরেজি পত্রিকা হাতে নিয়ে দাম মেটায়। রিকশায় উঠে ভাবে, টেলিভিশনটা না সারালেই নয়। দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়ে সে আজ বেডরুমের বিছানা পর্যন্তও যায় না, খাবার টেবিলেই বসে পড়ে। এবং কাগজ খুলে হতাশ হয়। খুনি কে – শুধু এ নিয়ে মাতামাতি। আর পুলিশের জোর তৎপরতার খবর। যদিও ঘরের কোনো মালপত্র খোয়া যায়নি, কাজের লোকদুটিকে সন্দেহ করা হচ্ছে।
একটু বোধহয় চোখের পাতা জুড়েছিল। হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হিল খটখটিয়ে হেঁটে হেঁটে নাসিমা সুলতানা হোস্টেলের লম্বা বারান্দায় পৌঁছে যায়। যার শেষ প্রান্তের থামে হেলান দিয়ে সিনিয়র এক মেয়ের সঙ্গে হেসে কথা কইছেন সুপার। সে আরেকটা থামের আড়ালে। চোরা চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ‘আমিও একদিন সিনিয়র হবো।’ ঈর্ষাকাতরতা নিয়ে থামের গায়ের পলেস্তারায় নখে দাগ কাটে নাসিমা সুলতানা। ‘ইন্টারমিডিয়েটের পর অনার্স, মাস্টার্স …’
ঠিকা কাজের মেয়ে কলবেল বাজালে নাসিমা সুলতানা দরজা খুলে দিয়ে ফের বিছানায় ফিরে আসে। আসলে সে স্বপ্নটার কাছেই ফিরতে চায়, যেখানে বাবার মৃত্যুর জন্য তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় না, সুপারের সুনজরে পড়ার মতো তার সিনিয়র হওয়াও কেউ রুখতে পারে না। এখনো তার হাতের তালুতে সিমেন্টের থামের শীতল পরশ। কেন সুরমা রহমান সিনিয়র মেয়েদের তোয়াজ করতেন? যারা তার কাপড়ের তলায় রোদে মেলে দেওয়া অন্তর্বাসের সাইজ নিয়ে হাসাহাসি করত?
পরের দিনের কাগজ খুলতে এক কোণে ছোট্ট একটা খবর – নিহত সুরমা রহমানের কন্যা দেশে পৌঁছেছেন। ইংল্যান্ড থেকে আসতে তিনদিন লেগে গেল! কেমন মেয়ে সে? মায়ের সঙ্গে চেহারা বা ফিগারে মিল আছে তার? বা পোশাক-আশাকে? এসব জানার উপায় কী, পত্রিকায় যেখানে ছবিই ছাপায় নাই! নাসিমা সুলতানা অসহায়ভাবে নষ্ট টিভির মসিলিপ্ত পর্দায় তাকায়। এটি যেন কেনার পর থেকে এমনই ছিল। তাছাড়া সুরমা রহমান ভিআইপি নন যে, তার অপমৃত্যুর খবর পেয়ে উড়ে আসা মেয়ের ছবি তুলতে টিভি ক্যামেরা রানওয়ে ছুটবে। পত্রিকা যে দয়া করে মেয়ের নাম অনামিকা রহমান জানিয়েছে, তাতেই তার খুশি হওয়া উচিত।
নামটা সুন্দর! অনামিকা রহমান।
পত্রিকা যা লেখে না বা টিভিতে যা সে দেখতে পায় না, সিনেমার মতো একটা দৃশ্য নাসিমা সুলতানার স্বপ্নে চলে আসে। সে এয়ারপোর্টে পৌঁছায় সবার শেষে। ততক্ষণে সুপারের ক্যাডাররা এয়ারপোর্টের হ্যাঙ্গারে বড়বাজারের উড়ন্ত অন্তর্বাস লাঠির আগায় দোলাতে লেগে গেছে। নাসিমা সুলতানার লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু সে লজ্জা পায় না। চল্লিশ বছর আগের একটা দৃশ্যই তো – সে স্বপ্নে ভাবে, যা এখন সিনেমায় পুনঃদৃশ্যায়িত হচ্ছে! প্লেন থেকে সানগ্লাস চোখে নামছে অনামিকা রহমান। হিল খটখট। লুটানো আঁচল। ডানা-কাটা ব্লাউজ। কোমর ছাপানো রেশম-মসৃণ বাহারি কেশ। গোলাপ-আতরের গন্ধে মাতোয়ারা বাতাস। তারপর আচমকাই ক্যামেরার চোখ ঘুরে যায়। অনামিকার মাথায় ছাতা ধরতে সাইড অ্যাকট্রেস নাসিমা সুলতানা গরম পিচের ওপর দিয়ে জোরসে ছুটছে।
এমন বাজে একটা স্বপ্ন! মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। সুপার খুন হয়েও নাসিমা সুলতানার ওপর জিতে থাকবেন? একবার তার মরহুম আব্বাজানকে দিয়ে জুতা ব্রাশ করালেন। এবার স্বয়ং নাসিমা সুলতানাই ছাতি নিয়ে ছুটছে সুপারের মেয়ের মাথায় ছায়া দিতে। যে বয়সের যা। নাইট ডিউটি বন্ধ না করলে এসব
চটকা-ভাঙা দুঃস্বপ্ন থেকে রেহাই নেই।
‘আপা, আপনি কি অসুস্থ?’ জুনিয়র নার্সের কথাটা তখনো মুখে, চেয়ার থেকে উঠতে গিয়েই ধপাস। নাসিমা সুলতানার মনে হয় নরম কার্পেটও এবার তার কোমরের হাড় বাঁচাতে পারবে না। হিপ বোনটা গেল বোধহয় চিরতরে। কী আফসোস আর মাত্র এক ঘণ্টা পর তার নাইট ডিউটি পুরা হতো!
‘এমুন টাকার খাঁই! এইবার ওনার নাইট ডিউটির হ্যাপা সামলাও!’ নাসিমা সুলতানা আবছাভাবে শোনে কথাটা। ‘ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে।’ ওকে বেহুঁশ ভেবেই হয়তো ছড়া কাটে ছোকরা বয়টা। স্ট্রেচারে তুলতে গিয়ে যাকে তার মাথার দিকের পুরা ভার বহন করতে হচ্ছে।
এক কাপ গরম দুধ খেয়ে ঘণ্টাদুই পর একাই ট্যাক্সি করে বাসায় ফেরে নাসিমা সুলতানা। আজ আর পত্রিকাস্ট্যান্ডে থামতে হয় না। হকারকে বলা আছে – বাসায় গুনে গুনে দশটা কাগজ দেবে রোজ।
দরজার নিচ দিয়ে একে একে দশটা ভাঁজ করা পত্রিকা ঠেলে দিলে, সাদা-কালো অক্ষরের নকশা ফোটে মেঝেতে। এ যেন অদ্ভুত ডিজাইনের কার্পেট বা পাপোশ। জ্বরতপ্ত কপালে হাত রেখে বিছানা থেকে দেখে নাসিমা সুলতানা। চোখ বন্ধ আর খোলার মাঝখানে ডিজাইনটা মোচড় খায় বা বদলে যায় অনিশ্চিতভাবে। ভেতরের ছবি, নিউজও পালটায় সে-অনুযায়ী। অনেকদিন পর সহপাঠীদের দেখতে পেল, হোস্টেল পালিয়ে নাইট শো দেখতে যাওয়া কজন। এখন খুনের মামলার হাতকড়া পরা আসামি। ভয়ে নাসিমা সুলতানার গলা শুকিয়ে আসে। অদৃশ্য আর গন্ধহীন আগুনে যেন দগ্ধ হচ্ছে সবকিছু। তার শরীরটাও পুড়ছে শীতল আর স্যাঁতসেঁতে জোড়া কম্বলের উত্তাপহীনতার মাঝামাঝি।
সেদিন না পরদিন, রাত-দিনের ভেদ ঘুচে গেছে বলে নাসিমা সুলতানার নির্দিষ্টভাবে মনে পড়ে না, কখন সেই কাগজের পাপোশ ডিঙিয়ে তার ছোটভাই ঘরে ঢুকেছে।
মাটির নিচে আলুর গুটি বাঁধার লগ্নে আসমানে মেঘ ডাকলে বুকটা ঢিপঢিপ করত। বীজ বোনায় পানির মতো টাকা খরচ হয়েছে। এবারে রবিশস্য মারা গেলে স্কুল-কলেজের ভর্তির ফি বা বেতন আসবে কোত্থেকে। পত্রিকাগুলি যেন সেই না-ফলা ফসল। নাসিমা সুলতানার ভাই তাকায় সেদিকে। চোখে বিস্ময় থেকে বিরক্তি বেশি। বর্ষার মৌসুম শেষে ঝিলে মাছের পোনা ছাড়বে – সেই পুঁজিটুকু দিতে বোনের কী গড়িমসি! অথচ ঘরে পত্রিকার পাহাড় গড়ছে।
এই ভাইয়ের মতো অন্য ভাইবোনরা জ্বালায়নি কখনো – ভাইকে ইশারায় স্থির হয়ে বসতে বলে ডাঙায় তোলা মাছের মতো ঠোঁট নাড়ে নাসিমা সুলতানা। বিশেষত বোনেরা তার লক্ষ্মী। বিয়ের জন্য যে-পাত্র ঠিক করে দিয়েছে, তাকেই পাখি-পড়ার মতো কবুল বলে গ্রহণ করেছে। তার হাড় কালি করছে শুধু এই ভাই। ভাইকে মাছচাষের পুঁজি দিতে গেলে তার ৮০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটা বন্ধক দিতে হবে। ভাইবোনের গতি করতে গিয়ে নিজের দুর্গতি ডেকে এনেছে নাসিমা সুলতানা। ‘ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে।’ সঞ্চয় বলতে কানাকড়ি নেই তার।
হাড়ের ভেতর ঠান্ডা কাঁপুনি অনুভব করে নাসিমা সুলতানা, যখন তার ভাই উপুড় হয়ে তাওয়ায় রুটি ভাজার মতো কাগজগুলি ওলটাতে শুরু করে। এবারের জ্বরটা মনে হয় তাকে কবরে নিয়ে যাবে। নাসিমা সুলতানা হাড়কাঁপা জ্বর নিয়েই বিছানায় উঠে বসে। ভাইকে সুপারের মার্ডারের কথা বলে থেমে থেমে। ভাইয়ের চোখদুটি বেদনায় কুঁচকে যেতে থাকলে সে যেন পোড়া ঘায়ে মলমের পরশ পায়। এখনো যে ভাইয়ের মনুষ্যত্ব টিকে আছে, তা জেনেই আরাম। ব্যাংক লোন নিয়ে হলেও সে এবার ওর মাছচাষের ব্যবস্থা করবে।
‘খুনিরাও এভাবে পত্রিকায় হত্যাকা- ফলো করে না।’ আচমকা নাসিমা সুলতানাকে অবাক করে দিয়ে শূন্যে হাত ছোড়ে ভাই। ‘আসলে কে খুনি? কাজের লোকদুটি তো বাসার ছিঁড়া ত্যানাও সরায় নাই। মনে হয়, গরিব হওয়াডাই অগো অপরাধ!’
এ-কথার মানে কী? নাসিমা সুলতানা জ্বরের ঘোরে মিউ মিউ করে – সে গরিব নয় বলে খুনের দায় থেকে রেহাই পেয়ে গেছে? আহাম্মকটা বরাবরই বোনকে বড়লোক ভাবে। এখন তো খুনি ভাবতে শুরু করেছে।
আজ চারদিনের মিলাদ হওয়ার কথা না? ইস কীভাবে যে দিন চলে যায়! আল্লাহর কাছে সুপারের মাগফিরাতের দোয়া চাইতে মিলাদে শামিল হওয়া জরুরি। তার জন্য দাওয়াত-তোষামোদের দরকার নেই। পরিচিত আত্মীয়-অনাত্মীয়রা তো উড়া খবরেই মৃতের বাড়ি ছুটে যায়।
ভাইকে ঘরের বাইরে দাঁড় করিয়ে তোরঙ্গ খোলে নাসিমা সুলতানা। ন্যাপথালিনের ভুর ভুর গন্ধঅলা, ডালায় ফুল-পাতা আঁকা কাঠের তোরঙ্গ। দুবার হাতড়াতেই বড়বাজারের উড়ন্ত অন্তর্বাস উঠে আসে। গায়েও ফিট হয় ভালো। এরপর গায়ে বোরকা চাপায় সে। ভাইয়ের সঙ্গে হিলতোলা জুতা পায়ে চলে খটখটিয়ে। চলতে চলতে মনে হয় যেন জাফরি-কাটা ছায়ার মাঝে চকরা-বকরা রোদের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। বা অগাধ জলের ভেতর সঞ্চরণশীল মাছ যেন। মনে শুধু একটুখানি অস্বস্তি, স্বামীর হাত ধরে যেতে পারলে কতই না ভালো হতো। তার জীবনে স্বামী থাকবে না – হোস্টেলের দিনগুলিতে কল্পনাও করেনি।
জায়গাটা না গ্রাম না শহর। ওখানে ঘরের চাল ফুঁড়ে গরম ভাতের গন্ধযুক্ত ধোঁয়া উঠলে সবাই বোঝে যে, এটা রান্নাঘর, এখানে রান্না হচ্ছে। বাকিটা নিজে থেকে বুঝে নিতে হয়।
চারদিনের মিলাদে সুপারের বাগানবাড়িতে ভাতের আয়োজন। কারা যেন দুঃখভরা গলায় কোরান তেলওয়াত করছে। মেয়েলি কণ্ঠ। তা এতিমখানার কিশোরদেরই হবে, কোরান খতমের পর যাদের হাতে কিছু খুচরা টাকা আর টিনের থালায় ভাত পড়বে।
‘ভাতের দাওয়াতটা ফাঁদ!’ ভাই হঠাৎ উসখুস করে। ও বাতাসে শ্বাস টেনে গরম ভাতের নয়, ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়েছে। বোনকে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘গিয়া দেখো পুলিশরে ফোন করা হয়ে গেছে।’
‘আরে না! চুলায় গ্যাস নাই। তাই দেরি।’
‘সব ভাঁওতাবাজি।’ যেন বিছায় কামড়েছে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে সে। বোরকার আড়াল নিয়ে বোন বাঁচতে পারলেও, সে পুলিশের হাতে ধরা খাবে নির্ঘাৎ! বোন মাছ চাষের পুরা পুঁজি দিলেও এখানে সে থাকবে না।
জোর করে চোখ খোলে নাসিমা সুলতানা। তার ভাই কি এসেছিল? কিন্তু ঠিকাঝি যে আসেনি, সে নিশ্চিত। তাহলে দরজার মুখে পাপোশের মতো পত্রিকা পড়ে থাকত না। দুপুর গড়ালে গ্যাস কমে যায় বলে কাগজগুলি চুলায় গুঁজে দিয়ে ভাত রাঁধতে বসত সে। একদিন দশটা পত্রিকাই চুলার পেটে গেছে, তবু ভাত সিদ্ধ হয় নাই।
নাসিমা সুলতানা খাট থেকে নেমে কাগজ টোকাতে শুরু করে। তাকে কাগজগুলি সরিয়ে ফেলতে হবে ঠিকাঝি আসার আগেই।
‘বাসায় পুলিশ আসার আগেই কাগজগুলি সরানো দরকার।’ সুপারের বাগানবাড়ি থেকে বেরিয়ে তাকে তড়িঘড়ি বুদ্ধি দেয় ভাই। নাসিমা সুলতানা ভাবে, সেইসঙ্গে কাঠের তোরঙ্গটা, যেখানে বড়বাজারের উড়ন্ত অন্তর্বাস রয়েছে। সুপার খুনের মামলার আলামত তো এগুলি।

Leave a Reply