জলের জীবন

লেখক: সুশান্ত মজুমদার

প্রায় চার দশক আগে, তখনো খরজলের হিংস্র নোনা গন্ধময় রূপসার শরীরে পরানো হয়নি ব্রিজ-অলংকার। যাত্রীপারাপারে না ছিল ডিজেলচালিত পরিচ্ছন্ন ফেরির ইস্পাত-মেশিনের ক্রীড়া। কাজ উদ্ধারে ছিল নিকৃষ্ট লক্কড়মার্কা কলযান – ওই তখন গালভরা নামের ফেরি। ভয়ংকর স্রোত পাড়ি দিয়ে আদৌ সহজ ছিল না এপার-ওপার যাত্রা। রূপসার গর্জনতোলা শত ঢেউয়ের ফণায় মোচার খোলার মতো তুচ্ছ হয়ে থাকে নৌকো আর নৌকো; তার ওপর গা জড়াজড়ি করে দাঁড়ানো বিচলিত মানুষ।
ঘোলাজলে কচুরিপানার দঙ্গল জোয়ারে আসে, ভাটায় ভাসতে ভাসতে যায় দূর-সমুদ্রের টানে। মাথার ওপর খাড়া সূর্যের তীব্র দহন। কুমার আকাশে চিলের ওড়াউড়ি – ডানা তার গুটিয়ে নিতে নিতে পশ্চিমের পাড় লাগোয়া স’মিলের পাশের গাছের মগডালে গিয়ে বসে। রূপসার পুব অংশ যখন-তখন ভেঙে অতল জলে হারিয়ে যায়। ভাঙন যেন রূপসার প্রধান চরিত্র; আর কূলের দোকানপাট, রেলের জমি ও দূর্বাঘাসের পাড় ভেঙে চরম খিদে মেটায়। তখন রূপসার পশ্চিমে না ছিল বৈধ-অবৈধ এত দালানকোঠা, দু-পাশে বিটুমিনের হাইওয়ে রাস্তা, অন্ধকার শাসন করা বৈদ্যুতিক আলো। দক্ষিণের ছোট্ট বৃক্ষশোভিত শহর বাগেরহাট ছেড়ে ন্যারোগেজের রেলওয়ের ট্রেন রূপসায় মন্থরচালে এসে দাঁড়ায়। কামরার পেট ছেড়ে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসে আটপৌরে মানুষ। পায়ের সঙ্গে পায়ের সংঘর্ষ। কনুই চালিয়ে কে কার আগে নদী পারাপারের খোলা নৌকোর পাটাতনে উঠবে। নিশ্চিত জায়গা চাই। এই আখ্যান সেই সময়ের এখন যা আমাদের ধূসর স্মৃতির খণ্ডাংশ। নতুন প্রবংশ দেখেনি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কষ্টজর্জর নদী পারাপারের অসহ্য কোশেশ। পাঠক, আমরা এখন ফিরে যাই নদী ও খেয়াযানের কাছে; সেই মাঝি ও তাঁদের সন্তানদের কাছে যাদের শ্রম ও ঘামের শেষবিন্দুও শুষে নেয় রূপসা।

রূপসা নদীতে এখন পুরো ভাটা। সাগরের টান, রাক্ষুসে জোর টান চোঁ-চোঁ পানি টেনে নেয়। জোয়ারের ঢের দেরি তবু স্রোতের তেজ কী কম! বেপরোয়া ঘূর্ণির আবিল ভাটার স্রোত হেলা করে এমন সাধ্যি কার। পানির সঙ্গে পানির আছাড়ি-পিছাড়ি। টানের কাদাঘোলা পানির বেগের মধ্যে নৌকো কেবল টলে – বৈঠা বলো দাঁড় বলো সব ধীর, এগিয়ে যাওয়া মুশকিল। যাত্রীরা কেউ কেউ বসে পড়ে নৌকোর পাশ ধরে, কেউ এ-ওর গা ধরে টাল সামাল দেয়। গলুইয়ের মাথায় দোলে মাঝি। ভাটায় রূপসার পানি যত সরে পশ্চিম পাড়ে উঁকি মারতে মারতে জেগে ওঠে বিশাল লম্বা চর। দূরে উঁচু আকাশছোঁয়া এক চোঙ গলগল কালো ধোঁয়া ছাড়ে। বাতাসে বেঁকে বেঁকে ধোঁয়া উড়ে যায়। ওই ধোঁয়ার কাছাকাছি জায়গা থেকে প্যাঁচ খেয়ে বাঁক নিয়েছে রূপসা, আগামাথা সবটাই শ্যাওলাধরা কুমিরের পিঠের মতো চরের পর চর। অথই জোয়ারের সময় চটাশ চটাশ শব্দে পাড়ের গা চেটে চলে রূপসার প্রাণহারক পানি। উত্তরের বাতাস পেলে আক্রোশে ফুঁসে রীতিমতো বুনো হয়ে ওঠে নদী। একদিকে নদী, আরেকদিকে বাতাসের খ্যাপা ঝাপটা – দুই দৈত্য যেন উচ্ছৃঙ্খল বাহু মেলে নাচে। চারপাশে ধ্বংসের মরিয়া আয়োজন। নোনা মাটির ভাঁজে ভাঁজে ভাঙনের ইশারা। তবু চৈত্রের ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুরে উল্লসিত একপাল লিকলিকে ছেলে উদোম গায়ে রূপসার চরের কাদায় নেমেছে। জোয়ার নেমে যাওয়ার পর কাদার পাতলা সরে আটকেপড়া গুঁড়ো মাছ ধরে তারা। কনুই-অবধি হাত কাদার ভেতর ভরে দিলে কখনো দুই-একটা মাঝারি গোছের মাছ মেলে। – ‘পাইছি, আমি এডা পাইছি’ বলে, বিচির মতো দাঁত দেখিয়ে খ্যাকখ্যাক হাসে আর কাদার ওপর লুটোপুটি খায়। খুশি উপচে রূপসার পানিতে গিয়ে পড়লে কল্লোল বেড়ে যায়। কাবু আঙুলের মুঠোয় চেপে জনে জনে মাছটা দেখানোর পর কোমরের ন্যাকড়ার ঘেরে চলে যায়।
একদিকে সুচালো, একদিকে চওড়া এই চরাচরে একসময় ছিল বিষণ্ন নির্জনতা। গায়ে গায়ে জড়িয়ে গাছপালা আকাশের গায়ে সটান খাড়া। বুনো ছায়ার তলে বাতাসে ভাসত লতাপাতার গন্ধ। সেই সুন্দরপুর গাঁ ছেড়ে অজানায় নৌকো ভাসিয়েছিল ফজর। কুয়াশায় পথ হারিয়ে যায় তার। উজান চলে যায় খলবল খলবল শব্দে নৌকোর কান ছুঁয়ে। সে কি আজকের কথা। ঠান্ডা শরীরে চনচন করে ওঠে গরম। চোখে ধার ছিল ফজরের। গলুই থেকে লাফ মেরে চরের কাদা ভেঙে ওপরে উঠে মাটি চিনতে পারে সে। সেই মাটি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, রূপসা তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
পুবপাড়ের দুজন যাত্রী নিয়ে আসে ফজর। তাদের কোথায় নামায় – একটু শুকনো জায়গা না পেয়ে তাদের চরে ছেড়ে দেয়। কিন্তু নৌকো যে চরে উঠে আর নামছে না। নাছোড় পেড়িকাদায় আটকে গেছে নৌকোর তল। লগি তুলে নেয় হাতে। জোর জড়ো করে সে প্রাণপণে ঠেলে যায়। ঝুলেপড়া বুড়ো পেশি তিরতির কাঁপে – কাজের কাজ কিছুই হয় না। কী সমস্যা, শক্ত মাটির অভাবে লগি এখন কাদার মধ্যে হিড়হিড় করে ঢুকে যায়। এদিক-ওদিক অসহায় মুখ ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ চোখ আটকে যায় পেছনের চরে। লগি ঠেলা বন্ধ রেখে সে শিরদাঁড়া সোজা করে। – ‘কেডা ওইডা?’ ভ্রু কুঁচকে সে ভালো করে ঠাওর করে। না, চোখের নজর এখনো পুরো ঝরে যায়নি, ভুল দেখছে না সে। লগি নৌকোর গায়ে পুঁতে রেখে চরের কাদায় পা নামায় ফজর। ডান পা টেনে তুললে বাঁ-পায়ের ওপর ভর পড়ে। আরো কাদার মধ্যে পা ডুবে যায়। মেজাজ খিঁচড়ে যায় ফজরের – তোড়ে শুরু হয় মুখখিস্তি। তার মাথার গরম ঠোঁটে নেমে এসেছে; আর ওই গরমে বুঝি চরই শুকিয়ে যাবে। ফজরের খুন করা রোখে পা এলোমেলো হয়। – ‘কোবাদ, তোর বাপ আসতিছে।’ শুনে চরের কাদা থেকে মাথা তোলে ন্যাড়ামাথার ছেলেটা। বিপদ তেড়ে আসছে দেখে কাদা-পানি চিরে কোবাদ নিস্তার পেতে লম্বা লম্বা পা ফেলে। – ‘দাঁড়া, তোরে আইজ চরের মদ্যি পুঁইতে ফেলাবো।’ ফজরের গর্জনে কোবাদ বড় বেশি ভয় পায়। তার চামড়া প্যাঁচানো হাড়ের বুক হরদম হাঁপর টানে। নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে থেমে গাল ভরে বাতাস নিয়ে কোবাদ ফের পায়ের জোর বাড়িয়ে দেয়। ছেলেরা আমোদে চরে হেলে হেলে পড়ে। মজা পেয়ে একজন একদলা কাদা তুলে কোবাদের পেছন লক্ষ করে ছুড়ে মারে। ফজর থমকে যায়। কোমরের লুঙ্গি আলগা হয়ে গেছে। শক্ত করে কাছা টেনে ফিরতে ফিরতে সে টের পায় তার মাথা ঝিনঝিন করছে। আজকাল সে আগের মতো গায়ে আর বল পায় না। ভেতরের শাঁসে কমতি। শরীরের বাঁধুনি ঢিলা হয়ে পিঠে খানিকটা বাঁক রেখে নেমে এসেছে। মাথায় পাকধরা চুল – চাঁদির কাছে এক খাবলা ফাঁকা। রোগ-শোকের হিজিবিজি দাগ গালের ভাঁজে ভাঁজে। নৌকোর গলুইয়ে বসে পানির মধ্যে পা ঝুলিয়ে দিয়ে ঘষে ঘষে কাদা ছাড়ায় ফজর। নিরিবিলি একা হলে মনেরই বিভিন্ন পাড় থেকে খুলে আসে পুরনো দিনের কথা।
সেই বিগত দিনে ফজর ছিল তেজালো তাগড়া জোয়ান – মুখে ডাঁসা পেয়ারার চেকনাই। হঠাৎ বাতাসে উড়ে আসে পুবপাড় থেকে ফেরি চালু হওয়ার আওয়াজ। ফজরের মাথার ভেতর ঝাঁজ ছড়িয়ে যায়। রেগে পানির ওপর লাথি ছোড়ে সে। পানি ছিটকে চোখ-মুখ ভিজে যায়। কোত্থেকে যেন শরীরে শক্তি এসে যায়। লগির ঠেলায় নৌকো এবার নদীতে নেমে সামনের ঘুরপাকে পড়ার আগেই বৈঠা ধরে নৌকো আয়ত্তে আনে সে। রাগের উষ্ণতা এখনো কমেনি। অবাধ্য ছেলের মুণ্ডু মনে মনে চিবিয়ে চলে সে। ধুর, বয়সের অর্ধেক পার, এত বয়সে এসে বউটা পোয়াতি হয়ে আরেকটা খাউয়ে গোঁজামিলের সংসারে ছেড়ে দিলো। ভাবনা ডিগবাজি দিলে রাগ ঘুরে ফেরির ওপর হামলে পড়ে। আরো তেতে ওঠে ফজর। বড়লোকগো গাড়ি পার করতি ফেরি লাগে, তার জন্যি ঘাট হয়। আর আমাগো জন্যি? নদীর পাড় ভাঙতি ভাঙতি নাইমে যাতিছে তার কোনো খ্যাল আছে? মাঝি গো জন্যি আইজো একডা পাকা ঘাট গাঁথতি পারলো না।
মাত্র বিশ কিলোমিটার দূরত্ব – বাগেরহাট ছেড়ে সকাল সাতটার ঠুনকো ট্রেনটা হাঁপাতে হাঁপাতে রূপসায় পৌঁছে নটায়। শেষ প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে তখন তার বেশ তেজ, হুংকারের মতো কুক দিয়ে কয়লার বাষ্প ছাড়ে ইঞ্জিনটা। বগিতে যাত্রী ধরে জনাচল্লিশ, কোনো বগিতে দশ-বারোজন। উঠেছে শ্বাসের বাতাস ফেরানোর অসুবিধা নিয়ে শ’র ওপর। ঘাটে একটা মাত্র দুর্বল ফেরি – গাড়ি ছাড়া যাত্রী পারাপার করে না। এই ফেরিতে উঠেপড়া মানুষ চেহারা বেশভূষায় কুলীন। কাদাপানি দারুণ নোংরা, বাইরের বাতাস কার্বন জ্ঞান করে ফেরিতে গাড়ি ওঠার পর তাঁরা নিজের গাড়িতেই বসে আঙুর-আপেল খায়। আরেক পাশে শস্য আটকানো ভিড় – চলছে ভীষণ টানাহেঁচড়া। কাঁধের ফাঁক দিয়ে সুড়ুৎ করে ঢুকে নৌকোর পেটে বসে তবে দম ফেলা – বাঁচলাম, জাগা পাইছি। ওরে ছ্যামড়াডা কি উঠতি পারিছে? যাত্রীর বগলের নিচে আটকে কেউ কেউ তারস্বরে চেঁচায় – ওরে ধর আমারে, কাদায় পড়ে যাবানে। কেউ হাত বাড়িয়ে দেয় না – যে যার বোচকা-বান্ডিল নিয়ে নিজেকে সামাল দিতে মরিয়া। মাঝিরা যাত্রীর হাত টেনে গাদাগাদির ভেতর তাকে গুঁজে দেয় – সকাল সকাল পয়সা কামানোর বড় খ্যাপ। পায়ের নিচে মাটিতে গোপন ফাটল। নিমিষে কখন কী বিপদ ঘটে। পশ্চিম পাড়ে ওলটানো নৌকোর তলের মতো চর বাড়ছে – পুবপাড় ভাঙতে ভাঙতে সামনে আগুয়ান। কবে এক রাতে নদী আস্ত স্টেশনঘরটি টপ করে খেয়ে ফেলবে। রূপসার মতিগতি বোঝা দুষ্কর – নিজের গরজে যতটুকু জায়গা ছাড়ে ঢের গ্রাস করে বড় হয়। ঢেউয়ের ছোবলে পানির মধ্যে ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দে যখন-তখন ভেঙে পড়ে মাটির চাঙ। পাড়ের খুব নিচে ভয়ানক বিরাট খোঁড়ল।
পুবপাড়ে মাটির এই লুকানো খোঁড়লের মরণ অঘটন আচমকাই ঘটে। রূপসার পুরনো মাঝিরা এক লহমায় মানুষের ডুবে যাওয়ার শিউরে ওঠা দৃশ্য ইহজনমেও দেখেনি। দিনটা ছিল মেঘলা। দস্যু বাতাসে রূপসা আগে থেকে ফুঁসে ছিল চরম অবাধ্য। গাড়ল নদীটা যেন মাতাল হয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। পানির ওপর রাশি রাশি ফেনা। ভাব-লক্ষণ ভালো না বুঝে ফজর ছিল হুঁশিয়ার। তার পাকা হাত পর্যন্ত নৌকো সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খায়। গুলটি পাকানো পেশির শিরা যেন ছিঁড়ে যাবে। যথারীতি সকালের ট্রেনের হাজার যাত্রী পাড়ে এসে জড়ো হয়। খাটুয়ে থ্যাবড়া পায়ের মিলিত চাপ চোরা খোঁড়লের ওপরের মাটির সহ্য হয়নি। ভেঙে পড়বে পড়বে, হয়তো অনেক দিন ধরে প্রস্তুত হয়েছিল। আকাশ-বাতাস আর নদী মিলিয়ে একাকার ছিল ধ্বংসের আয়োজন। ঢেউয়ের শাসানো ধাক্কায় পাড়টা চরাচরে ত্রাহি আওয়াজ ছড়িয়ে ভেঙে পড়ে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেক স্বরের কাতর চিৎকার ডুবে গেল পানির গভীরে। মায়ের অসহায় হাত থেকে শিশি-বোতলের ছিপির মতো ছিটকে পড়ে বাচ্চাকাচ্চা। কচি কচি আঙুল নির্ভয়ের আশায় ওপরে ছোড়ে, দেখা গেল ডুবুডুবু হওয়া চুল, তারপরই টুপ করে তলিয়ে গেল সব। নখ পালিশ করা আঙুল, শাঁখা পরা হাত ক-বার ওঠা-নামার পর আর দেখা যায়নি। শাড়ি পরা মেয়েছেলে কী সাঁতরে উঠতে পারে! তাঁদের নিরুপায় দুরবস্থা দেখে খলখল হেসে ওঠে বুঝি করাল রূপসা। পানির ভেতরে যারা খাবি খাচ্ছিল তাদের কজনকে মাঝিরা নৌকোয় টেনে তোলে। বাকিদের উদ্ধারেও তারাই হাত বাড়িয়ে দেয়, অথচ ফেরিটা স্টার্ট বন্ধ করে উদ্ধারকাজে খানিক দাঁড়াতে পারত। কান্না, বিলাপ, চেঁচামেচি মিলেমিশে অখণ্ড উঁচু নিনাদ রূপসার পশ্চিম পাড়ও ছুঁয়ে ফেলে। নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়ানো বিস্মিত মানুষের চোখের পলক আর পড়ে না। রূপসার খেলার রহস্যের কাছে, পানির কৌশলের কাছে মানুষ হেরে গেল। ফজর নির্বাক, যেন আজন্মের বোবা সে। সেই কবে, বছর চল্লিশ আগে নদীর থেকে জীবিকা, নদীর সঙ্গে জীবনের সম্বন্ধ তার, কখনো চোখের সামনে জীবন্ত এত প্রাণের অকালমৃত্যু সে দেখেনি। আহা, একটা পাকা ঘাট যদি হতো, যাত্রী-পাটনি দুয়েরই জন্য মঙ্গল। ঘাট পাকা হোক, ঘাট পাকা হোক বলে ফজরের হা-পিত্যেশ কী তাই খামোকা।

যাত্রী যখন থাকে না নৌকোয় বসে থাকতে থাকতে ঢেউয়ের দোলায় আজকাল ফজরের তন্দ্রার ঢুলুনি আসে। মুখে বাতাস টেনে হাই তুলে ঘুম তাড়ায় সে। কবে নৌকো থেকে টুপ করে সে খসে পড়ে। চিরকালের জন্য রূপসা তাকে টেনে নেবে। সেও ভালো – একলা মানুষ সংসারের পেরেশানে নুন-জর্জর। নদীর পানিতে ভেসে, কখনো তলদেশের ঠান্ডায় হাতড়াতে হাতড়াতে আবার সে সুন্দরপুর তার গাঁয়ে চলে যাবে। আচ্ছা, সেই গ্রাম কি আজো ঝোপঝাড়ে, থিকথিকে কাদায় ভর্তি আছে? দূরে দূরে গোলপাতার ঝুঁকেপড়া দোচালাগুলো কি বসতযোগ্য হয়েছে ? ফজরের মন ঘুরে যায়। হঠাৎ গাঁয়ের কথা কেন? ওপরের ডাঙ্গার মায়া-মহব্বত সে অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে, নদী কি পরিষ্কার জানে না? সে এই নদীরই সন্তান অথচ তাঁকে অপত্য স্নেহ দানে রূপসা এখন নাখোশ। আদৌ সে নদীর বুকে অধর্মে নেই, ফাজলামো হট্টগোলে নেই, স্রেফ রক্ত নিংড়ানো নির্বোধ প্রাণী। বৈঠা মারতে মরতে তালুতে, প্রতি আঙুলে তার কড়া পড়ে গেছে। কাণ্ড দেখো, হালের মাঝিরা তাকে আর এখন আমল দেয় না। দিন বদলেছে – পানিতে পাট জোয়ান নয়া মাঝির পোক্ত নতুন নতুন নৌকো ভাসে। ভেতর থেকে তার ঝামটা উঠে আসে – আরে, দুদিনের যুগী ভাতরে বলে অন্ন। মনের চাপে তাচ্ছিল্য করে এখুনি বৈঠা ছেড়ে দিয়েছিল ফজর। বুড়ো বয়সে পৌঁছে নৌকো ঠেলা কি কম ঝক্কি! হঠাৎ পড়িমরি তেড়ে এলো শাঁই শাঁই ছুটকো দুরন্ত বাতাস। ফজরের সঙ্গে চূড়ান্ত বোঝাপড়ার জন্য যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ঘুরে গেল নৌকো। পেছন গলুই থেকে ছিটকে পড়তে পড়তে সামলে নেয় সে। সর্বনাশ, নৌকো ঘূর্ণিস্রোতে পড়ে প্রায় ডুবছিল। ভয়ে সারা গায়ে তার কাঁটা দেয়। ফের কড়া হাতে নৌকো কব্জায় নিয়ে আসতে সময় নেয় ফজর।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পালা যখন শুরু, জল-স্থলের লড়াইয়ে নিশ্চিত পরাজয় জেনে শত্রু পিছু হটছে, রূপসার খেয়াঘাটের পশ্চিমে পাকবাহিনীর পলাতক একটা গানবোট, কেউ বলে লঞ্চ মুক্তিবাহিনী ঘায়েল করে। কোনো কোনো মুখের ভাষ্য : যুদ্ধ নৌযানটি ছিল মিত্রবাহিনীর। মিত্রবাহিনীর প্লেন ভুল করে পাক আর্মিভর্তি লঞ্চ ভেবে ওপর থেকে বোমা মেরে এটা খতম করে। শত্রুর হোক বা মিত্রের হোক সেই থেকে অকেজো লঞ্চটা আধো পানি আধো চরে পড়ে আছে। ভরা জোয়ার-প্লাবনের ছলছল পানিতে কেবল লঞ্চের ভগ্নমাথার সামান্য দেখা যায়। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয়, উঁচু হয়ে আছে ওই যে কাঠের শিং। দিন দিন কাদাপানির যথেচ্ছ আক্রমণে লঞ্চের সারা গায়ে শুরু হয় পচন। ছোপ ছোপ পিচ্ছিল শ্যাওলা জমে যাওয়ায় বদলাতে থাকে বডির রং। ভেতরের কলকব্জা গা-ঢাকা অন্ধকারে পাকা হাতে কারা লোপাট করেছে। খাঁচার কাঠও সুযোগ করে খুলে নেয় ধুরন্ধর মনুষ্যি। লোকের চোখ এড়িয়ে মাঝে মাঝে ফজর হাতের চাপে লঞ্চটার এক খাবলা পচকুটে অংশ নিয়ে নিজের ঝুপড়িতে ফেরে – রান্নায় দাউদাউ জ্বলে। এত কিছু নষ্টের পরও শক্তজাতের খুঁটি একটা এখনো টিকে আছে। ফজর রোজ এই খুঁটির সঙ্গে নৌকো বেঁধে লঞ্চটার মচমচে কাঠামোয় পা দিয়ে ডাঙায় ওঠে, ফের নৌকোয় ফেরে। ভয় হয়, এই বুঝি মচাৎ শব্দে নরম পরত ভেঙে লঞ্চের খোলের মধ্যে পড়ে হাতে-পায়ে জংধরা পেরেকে সে রক্তারক্তি হয়।
এখানের পাড় লাগোয়া এবড়ো-খেবড়ো উঁচু টুকরো মাটিতে ফজরের ঘর। কিসের কি ঘর, লতাপাতা, ডালপালা, পুরনো গোলপাতার ছাউনি দেওয়া আস্ত ঝুপড়ি। চালের বড় ফোকরে আবার খড়-বিচালি গুঁজে দেওয়া। সেলাই করা লম্বা এক ফালি চট টানিয়ে ভেতরটা আড়াল করা গেছে। গেল সনের চৈত্রের ঝড়ো হাওয়ায় ঝুপড়িটা ঝুঁকে আসে; আর সোজা করা হয়নি। আজো নৌকোটা বেঁধে লঞ্চের ওপর সাবধানে পা ঘষে ঘষে এগোতে গিয়ে ফজর মেয়ের বাজখাঁই গলা শোনে। আজকাল মেয়েটা চেঁচাচ্ছে খুব। আহা, কত সাধে হাত খালি-খরচা করে মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিল খালিশপুরের এক মজুর মরদের সঙ্গে। কী হলো, দামড়া জামাইটা সেই যে হা-কপালে হা-ভাতে বাপের কাছে মেয়েটাকে ফেলে গেল কস্মিনকালেও আর এ-মুখো হলো না। জামাইকে একটা রেডিও দেওয়া হয়নি অজুহাতে মেয়েটার শাস্তি ভোগ চলছে। ফজরের বুকের ভেতর, খুব ভেতরে অসমর্থতার পোড়ানি অষ্টপ্রহর খাক করে যাচ্ছে। চোখের সামনে শক্তসোমত্ত মেয়েটা একটু একটু গলে যাচ্ছে। নেতিয়ে পড়ো পড়ো স্বামীকে জড় পায়ে দেখে মদিনা রং ফিকে পরনের কাপড় টেনেটুনে মাথায় ঘোমটা দিতে চায়।হইছেডা কী? আমেনা চেঁচায় ক্যান?

– ‘কী আর হবে।’ ঠান্ডা গলার ধ্বনি ছেড়ে মদিনা স্বামীর ওপর নজর নিড়িয়ে আনে। কাপড়ের জমিনে খণ্ড ছেঁড়া। পিঠের বাঁপাশ খানিক হাঁ খোলা থাকে। টেনেও মদিনা কাপড় বাড়াতে পারে না। আব্রু আড়াল করতে বুঝি ভিন্ন বিষয়ে সে কথা গড়িয়ে নিয়ে যায় – ‘ব্যাডারা আবার আইছিলো। কয়, এখানে থাকতি পারবা না। ঝুপড়ি খুইলে না নিলি ভাইঙে ফেলাবো।’ বউয়ের সহায়শূন্য কথার এক বর্ণও ফজর শোনে না। সে সঠিক জানে, লোকগুলো তার গর-হাজিরের সুযোগ নিয়ে আবার আসবে, ফের কী কী বলবে। চারপাশে এত জায়গা-জমিন আকামে-কুকামে নষ্ট, নিয়ত ছারখার, অথচ আজ-অবধি একচিলতে বাস্তুভিটে তার নিজের হলো না। ধস, অবাধ ভাঙনে রূপসার পুবপাড় তড়িঘড়ি সে ছেড়ে এসেছে। নদীর শাসানির ত্রাসে পাততাড়ি গুটিয়ে এখন এপারে এসেও আদৌ শান্তি নেই। শুরু হয়েছে বদ-বাজে লোকের চোখ রাঙানি। ফজর পোড়খাওয়া পুরুষ, পুরুষের মতিগতি, হাঁকডাক, তৎপরতা আকারে-ইঙ্গিতে নির্ভুল জানে। কিসের পাড় দখল, মতলববাজ লালস ব্যাটাদের লোভী নজর এখন আমেনার ওপর। দিন-দুনিয়ার মালিক আল্লাহ কি অন্ধ হয়ে গেছে? তার বিচার-আচার কি বন্ধ?
এতক্ষণ কিছু শোনার আশায় স্বামীর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে ছিল মদিনা। ফজর ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট ছেলেকে খোঁজে – ‘কোবাদ কোহানে?’ মদিনা এবার ভেতরে সরে যায় – ঝুপড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে উত্তরে কী বলে বোঝা যায় না। এ-সময় নদীর হাওয়া ঝুপড়ির ভেতর ঢুকে মদিনার কণ্ঠ আরো ক্ষীণ করে তোলে। বেড়ার গায়ে শলা দিয়ে লাগিয়ে রাখা কুড়োনো কাগজে ফরফর শব্দ হয়। এর কোনো কিছু ফজর ভ্রুক্ষেপ করে না। গোঁয়ার স্বভাবে ফজরের গলা গজগজ করে – ‘পাইছে কী? খাবে আর টইটই ঘুইরে বেড়াবে। এখন থেইকা ও নৌকোর দাঁড় টানবে।’ রাগে নিজের কণ্ঠ নিজে চিনতে পারে না সে। এতে আরো ক্ষেপে গেলে স্বরে গরম গরম ফোঁড় পড়ে বেআক্কেল স্বার্থপর বড় ছেলের পর – ‘আর এট্টা তো বউ বগলে লইয়ে ভাগিছে। খাওয়ায়ে-পরাইয়ে লায়েক করাইয়ে দিছি, এখন হাবড়া বাপটারে চিনতি যাবে ক্যান। একপাল জানোয়ার জন্ম দিছি।’ শেষের বাক্যে তার ব্যর্থতা যেন বিলাপের মতো শোনায়। পরমুহূর্তে গলার উনুনের নেমে আসা আগুন নতুন জ্বাল পেয়ে ফের জ্বলে ওঠে। এবার মেয়ের উদ্দেশে মেজাজ ছুটে যায় তার – ‘অত চিল্লানির হইছেডা কি? এই হাত দুডো সম্বল। আর আছে কি? তাও জোর পইড়ে গ্যাছে। ভালো বেবস্তার ক্ষ্যামতা নেই। চিল্লাচিল্লি যেন শুনি না আর।’ মাটির শানকিতে মোটা ভাত পেয়ে ধীরে ধীরে ফজরের গর্জানি জুড়িয়ে আসে। পেট ফাঁকা ছিল – ভাত দেখে ঘুমন্ত খিদে যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওপর মুখে টক টক স্বাদের জোগান দেয়। গোগ্রাসে খাওয়ার সময় তাঁর মুখ বেয়ে চাকুম-চুকুম আঠালো আওয়াজ গড়িয়ে নামে। ওই শব্দ আর নদীর হাওয়ার ধেই ধেই নাচ জড়াজড়ি করে ঝুপড়ির মধ্যে বাজনা তৈরি করে।
খেয়ে উঠে ফজর না নদী না পরিবার কোনো কিছুতেই আর নজর দেয় না। ঝুপড়ির পাশের পাকুড় গাছের ছায়ায় খেজুর পাতার চাটাই পেতে টানটান মাথার নিচে হাত রেখে শুয়ে পড়ে সে। বেলা কত আর কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ঠাহর করতে পারে না ফজর। চোখের সামনে হাতের ছাউনি তুলে বোঝে মাথার ওপরের খাড়া সূর্য হেলে পড়েছে। দুপুর তাহলে ঘুরে গেছে। ভাঙা ঘুম জোড়া পেতে চোখ তবু বুঁজে আসতে চায়। মেহনতভাঙা শরীরের কী দোষ, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা – এই চিমসে শরীরের ওপর দিয়ে যায়, ঘোরে যখন-তখন ঝিমুনি আসে। আমেনার ডাকাডাকিতে চোখ কচলাতে কচলাতে সে উঠে পড়েছে। – ‘তুই কি ঠিক শুনিছিস মা?’ বাপের সামনে আমেনা স্বরে জোর দেয় – ‘ট্রেনের কুক শুনিছি বাজান।’ ফজরের সন্দেহ যায় না। নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায়। তার মগজ ট্রেনের টাইম নিয়েও প্যাঁচ লাগিয়ে বসে আছে।
এত বছরের মুখস্থ সময়জ্ঞান কি লোপ পেয়েছে?
ভরা জোয়ারের পানিতে পুরো থইথই করছে নদী। পূর্ণ পুষ্টি নিয়ে রূপসা যেন যুবতী সেজে ফিকফিক হাসছে। আর স্থির থাকতে পারে না ফজর। তাঁর ব্যস্ত পায়ের চাপে লঞ্চের ক্ষয়ধরা কাঠে শব্দ হয়। ভাঙবে নাকি! সাবধানে লাফিয়ে নেমে নৌকোর দড়ি খোলে সে। কান পেতে ফজর – ঝকঝক ঝকঝক বাতাসে ট্রেনের হালকা শব্দ, রেলের পাতের ওপর চাকা ঘষটাচ্ছে। রূপসায় আসি আসি করছে। এখন ব্যস্ততা নিয়ে ট্রেনের যেন দারুণ ছটফটানি। ভরা পানিতে রূপসার স্রোতের দর্প খাটো হয়ে আসে, তবু নৌকোর গতি বড় ধীর। ওইদিন কি তার আছে যে নৌকোয় গতি দেবে সে।
ফজর পুবপাড়ে পৌঁছে গেলে তখুনি ট্রেনও এসে থামে। প্লাটফর্ম থেকে ধীর গোটানো পায়ে নেমে আসে সামান্য ছড়ানো-ছিটানো যাত্রী। এ-সময়ের ট্রেনযাত্রী বরাবর কমই থাকে। সন্ধ্যার পরের ট্রেনে ফের যাত্রী আসবে – কাল খুলনায় জরুরি যাদের কাজ আছে। ফজর বিকেলেও খেপ ছাড়া খালি ফেরে না। এখন সে নিজের নৌকোটা ভেড়ানোর উচিত জায়গা খোঁজে। নজর পড়ে গনির নৌকোর ঠিক ফাঁকের পাশে। চেষ্টা করলে ঠেলেঠুলে নৌকোটা ঢুকাতে পারবে সে। কিন্তু গনি কেন জানি রুক্ষস্বরে ক্ষেপে ওঠে – ‘বুড়ো হচ্ছো আর আক্কেল হারাচ্ছো। হবে না, হবে না, তোমার নৌকাডা সরাও।’ যতটা পারে কাতর সুরে ফজর মিনতি করে – ‘দে বাপ, একফোঁডা জাগা তো।’ ফজরের অনুরোধ গায়ে না মেখে নৌকোয় গনি যাত্রী ওঠাতে থাকে। বাধ্য হয়ে শেষ মাথায় ধলুর পাশে এসে নৌকো ভেড়াতে হয়। পুবপাড় ফাঁকা হয়ে গেল। রোদ্দুরে ইঞ্জিনের লম্বা মাথাটা চোখে পড়ে। হাঁপাচ্ছে, গাদা গাদা ধোঁয়া ছেড়ে ইঞ্জিনটা চারপাশে কালি উগরে দিচ্ছে। বাতাসে পাড়-অবধি ওই কালি উড়ে আসে। সামনে কালি ও কয়লার কুঁচি সরিয়ে আর যাত্রী আছে কি না ফজরের চোখে ধরা পড়ে না। ইঞ্জিনটা কি ইচ্ছে করে তার উদ্দেশে চোখ টিপছে? পড়িমরি এসে একটাও ভাড়া পায়নি দেখে তার সঙ্গে ইয়ার্কি করছে? হতাশায় ফজর চুরচুর হয়। গায়ের তাকত খরচ হয়ে যাওয়ায় গলার গোড়া শুকিয়ে বেশ খসখসে হয়ে গেছে। চোখ-মুখ ধোয়ার সুযোগ হয়নি – এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত মুখে দিয়ে আসেনি। ঝুঁকে পড়ে আঁজলায় রূপসার পানি তোলে সে। – ‘যাবে নাকি কেউ, রিজার্ভ?’ ফজরের আঙুলের ফাঁক দিয়ে পানি ঝরে যায়। পাড়ে গাট্টাগোট্টা এক যুবক দাঁড়ানো – বাঁ হাতে প্যাকেট, ডান হাতে স্যুটকেস। বাচ্চাকাচ্চা, মেয়েছেলে নিয়ে ভিড়-ভাট্টা এড়ানো কঠিন জেনে কেউ কেউ রিজার্ভে নদীর হাওয়ায় ফাঁকা ফুরসতে যেতে আগ্রহী। কেউ ভাড়া বেশি দিয়ে একা পার হবে – আঙুলে সিগারেট, ঠোঁটে শিস, চুলে টেড়ি, ডাট কী তার। – ‘যাবো। বারো আনা।’ তৎক্ষণাৎ ধলু সাড়া দিলে বিস্ময়ে ফজর হাঁ হয়ে যায়। বরাবর রিজার্ভের ভাড়া এক টাকা। – ‘কিরে, কম চালি ক্যান?’ ফজরকে পাত্তা না দিয়ে ধলুর স্বরে তাচ্ছিল্য ফোটে – ‘তোর কিরে বুড়ো?’ মুহূর্তে গম্ভীর চড়ানাদে গর্জে ওঠে ফজরের গলা – ‘কি কলি তুই? বুড়ো? আমি বুড়ো?’ তার চোখে বহুদিন পর আগুনের ভাটি জ্বলে। এক সিকি কম ভাড়া বলে ধলু যাত্রী সরিয়ে নিচ্ছে, আবার তুই-তোকারি, বুড়ো বলে অপমান, কোনো মান্যিগণ্যি নেই। দু-হাতে বৈঠা উঁচু করে ফজর। ফজরের এই রাগী মূর্তির পরোয়া করে না ধলু। শরীর ঝাড়া দেয় সে। যাত্রী তুলে বৈঠার খোঁচা মেরে পাড় থেকে সরিয়ে আনে নৌকো। এখনো ফজরের নাগালের মধ্যে ধলু। বৈঠা মেরে ধলুর গোল মাথা দু-ফাঁক করে দিতে পারে সে। কিন্তু বৈঠা মারবে কি, তেড়ে আসা ঢেউয়ের বিপদ থেকে পাকা হাতে ধলুর নৌকো সামাল দেওয়া দেখে ফজর। এমন খেলুড়ে হাত বুঝি জোয়ানদেরই থাকে। ধীরে ধীরে বৈঠা ধরা হাত তার ঠান্ডা হয়ে আসে। ধলু কই? ধলুকে তো দেখতে পাচ্ছে না সে। নৌকোর মাথায় বসে ছপছপ বৈঠা মারছে – ও কি ধলু? না, ফজর নিজে? বৈঠা ওঠাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলে ফুলে উঠছে বাহু – মাথা খাড়া, দু-চোখে সমান বুঝি গাঙচিলের ধার। ঝাপসা পানসে চোখে ফজর দেখে, একদৃষ্টে দেখে, তার বয়সকালের যৌবন এইমাত্র যাত্রী নিয়ে উন্মত্ত রঙিলা রূপসায় আলোড়ন তুলে শাঁ-শাঁ এগিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply