একটা মৃত কুকুর অথবা সূর্যোদয়ের গল্প

লেখক: নাহিদা নাহিদ

আমাদের শুরুটা বেশ ছিল, অনেকটা সত্তর বা আশির দশকের সিনেমার মতো, ধরতে গেলে নিজের হাতেই সাজানো-গোছানো স্ক্রিপ্ট। যেসময় পার্কে রাত কাটানোর অভ্যেস অথবা নিরুপায়তা আমার ছিল; সে-সময়ের ঘটনা। ‘কুকুর হইতে সাবধান’ এই নীতিতে বিশ্বাস করে পার্কের পাশে ঘেউ-ঘেউ করা দুই কুকুরের উত্তেজিত বাকবিতণ্ডায় নিজ দায়িত্বে রাস্তা হতে সরে গিয়েছিলাম অনেকটা। নিরাপদ বলতে যতটা দূরত্ব বোঝায় ঠিক ততটাও না। রাস্তার দুপাশের সড়কবাতির আলোহীন গোমড়া মুখ আমার বিপদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রকৃতিও ছিল বিরাগ, না হয় সেই ভুতুড়ে সন্ধ্যায় আমার চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ উন্মাদ (শব্দটা ক্রেজিও হতে পারে) কেউ আমার ঘাড়ে কেমন করে লাফিয়ে পড়ে (নাকি আমিই পড়েছিলাম!), সেও এক বিস্ময়!এই ছেলে গায়ের ওপর পড়ছিস কেন?

– কুকুরের তাড়া খেয়েছি!

– এখানে!

– হুঁ। এখানেই।

– এখানে কেন?

– আমি কেমন করে বলব, কুকুর কেন আমায় এখানে তাড়া করল?

– তো কুকুরকে জিজ্ঞেস কর?

– করে কী লাভ, মূর্খ কুকুরের মগজে কি আর স্থানের নামধাম মুখস্থ থাকে!

– থাকে না?

– উহু, এদের স্কুল খুলে জিওগ্রাফি পড়ানো উচিত।

– ইয়ার্কি মারিস?

– আরে না না, কী বলছেন!

– আচ্ছা বেশ! তা আশেপাশে আমি তো কোনো কুকুর দেখছি না!

তাহলে কুকুর নয়, আমারই হয়তো মতলব খারাপ! মেয়েছেলে দেখলে গায়ে পড়ি।
আমার সাহসী কথাবার্তায় ছায়ামানবী মজা পেয়ে যায়, সরে আসে এদিকে; কৌতূহলে বলে

– এই ছেলে এত রাত করে এখানে কী তোর?

– ওমা! এই তো সন্ধে ছিল, রাত হয়ে গেল!

– কী খেয়েছিস? গাঁজা? তোর গংফং নাই তো?

– আছে আশেপাশে, আমি তো ওদের গডফাদার, পার্কে ঘুমোতে এলে ডিস্টার্ব করে না।

– বুঝেছি, তোর পেটভরা বদমতলব!

– বদ? ছিঃ কী বলেন, আমি যোশেফ সন্তু ভবঘুরিয়া, ওসব আমার নেই।

– হাতে কাগজ কীসের! ভাবুক, না আর্টিস্ট।

– অনেক বড়মাপের সাহিত্যিক, শোনেননি, ‘প্রকৃত শিল্পীদের পার্কের’ বেঞ্চিই সব, ওখানেই শিল্প, ওখানেই গল্প, কবিতা, গান – অ্যারিস্টটল বলেছেন।

– হু শুনেছি, তবে প্লেটোও বলে গেছেন, ‘কেউ কেউ শিল্পীর ভাব ধরে মেয়েছেলে ঘাঁটে, স্বভাব-দোষ।’
– আরে বাহ! মেয়েটাকে আমি যতটা মূর্খ ভেবে গুল মারছিলাম ততটা নয় সে, এর পেটে তো দেখি অনেক বিদ্যে।

এর বেশ কদিন পরের ঘটনা, ইতোমধ্যে তার বসার ঘরে আমি নিয়মিত। বসে থাকি অনেকক্ষণ, ঘরের মধ্যে একতালে বাজতে থাকে কত কী! বেখাপ্পা, চটুল হিন্দি, সফট, হার্ড সবই ! বেগমজাদির গুলবাগিচার শেরও শোনা যায়। একদিন মনে হলো রবীন্দ্রনাথও বাজছে। ওর দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো বিচিত্ররকম ছবি, কোনোটায় গদিতে শুয়ে থাকা মদ্যপ মাতাল পুরুষ, কোনোটায় উলঙ্গ লাস্যময়ী, কোনোটায় আবার স্টারি নাইট। গান, গজল, শের, চিত্রকর্ম সব মিলিয়ে এক বিশ্রী ভজঘট অবস্থা। গা শিরশির করে। মনে হয় পরিপাটি করে সাজানো সবকিছুর মাঝে কোথায় যেন লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর অসুন্দর, ঠিক তার চিবুকের নিচের কাটা দাগটার মতো। একটা ঘর বাইজিপাড়ার মতো মনে হলে, অপর ঘর মনে হবে হন্টেড হাউজ। সর্বশেষ ঘরটাকে মনে হয় প্রার্থনাঘর বা এমন কিছু। আমেরিকান ফক্সহাউন্ড শিকারি কুকুর দশ হাত জিভ বের করে থাকে ওর শোবার ঘরে। তবে আশ্চর্য, কুকুরটাকে আমার ভয়ংকর লাগে না। ঢাকার রাস্তার নেড়ি কুত্তার মতোই কৌতুককর আমুদে মনে হয়। হয়তো আমার মতোই সে স্বেচ্ছাবন্দি হতে এসেছে এই ফ্রেমে। ওর ঘরে ঘুরে ঘুরে আমার এসবই দেখার কথা; কিন্তু দেখি না। বসে থাকি ঘাপটি মেরে, ঝিমাই। শুধু হঠাৎ হঠাৎ ও আমার কোলের কাছে ধপ করে বসে গেলে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হয়, শিরশির করে গা। এক মন বলে ছুঁয়ে দেখি একটু, আগাই। আরেক মন বিমুখতায় সিঁটিয়ে যায়, সেই প্রথম দিনের মতো। – আপনার হাত থেকে পায়ের কাছে আগুন পড়ছে।

– পড়ুক।

সিগারেটের আগুন সিনথেটিকের সালোয়ারে লাগতে পারে।

লাগলে লাগুক, তাতে তোর কী রে ছোকরা। অযথা কথা বলতেই হবে।

হ্যাঁ হবে। এটা পাবলিক প্লেস, কথা বলায় সমানাধিকার।

উফ্ কেন যে এসেছিলাম এখানে।
মেয়েটা বিরক্ত হয়।
তার অসৌজন্যকর আচরণ আমার ভেতরে গজিয়ে থাকা কোনো রাশভারী ব্যক্তিত্বকে আহত করে না। অপমানে মন কেমন করেও ওঠে না, বরং মনে মনে কৃতজ্ঞ হই কুকুরের তাড়া খেয়ে এই অজায়গায় চলে আসার জন্য। এই অনুজ্জ্বল নগরবাতি আর এই ছায়াসদৃশ রমণী সংসর্গ আমার ভালোই লাগছিল শুধু তার মুখ-নিঃসৃত অনাকাঙ্ক্ষিত তুই সম্বোধনটা ছাড়া।

দেয়াশলাই হবে? এটা শেষ।
আমার দিকে না তাকিয়েই সে আগুন চায়, আমি দেখতে পাই মেয়েটা তার হাতের অকেজো অগ্নিযন্ত্র ছুড়ে মারছে সম্মুখের স্থির জলতরঙ্গ লক্ষ করে। জলে ঢেউ উঠে আবার থেমেও যায়।
আমি কাঠি এগিয়ে দিই, আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে আধো-অন্ধকারে সে আমার বয়স মাপে।

অভ্যেস আছে দেখছি, এইটুকু বয়সেই বিড়ি-আগুন মজুদ! বাহ!

এইটুকু কোথায় দেখলেন পড়ালেখার পাট চুকিয়েছি কবে, পয়সার অভাবে শুধু বিয়ে করতে পারছি না। আর তাছাড়া বিড়ি-সিগারেটের ক্ষেত্রে আমি আপনার মতো অপরিণামদর্শী নই, হিসেবি মজুদদার।

এই ডেঁপো ছেলে, তুই তো দুদিন পর ইয়াবা ধরবি।

সে সম্ভাবনা প্রচুর!
আমি বুঝে যাই, মেয়েটার দক্ষ বক্রোক্তি, তাচ্ছিল্য আমায় উদ্দীপ্ত করার জন্যই –

বাসা কোথায়?

জানা প্রয়োজন?

নাহ এমনি!
রমণী ছটফটায়। ঘটনার ক্লাইমেক্স আরো জমাতে ফস করে সে আমার কাছ থেকে নেওয়া দেয়াশলাই কাঠিতে আগুন জ্বেলে দেয়, এবার সে আমার মুখোমুখি।
ওর হাতে জ্বলে-ওঠা বারুদের উজ্জ্বল আলোয় আমি দেখতে পাই সেই প্রথম তাকে।
হায়! এতক্ষণ যাকে আমি সমবয়সী বা কাছাকাছি ভেবে একধরনের রোমান্টিক আলাপে এগোচ্ছিলাম, তার তুই-তোকারিতে বিরক্ত হয়ে ‘তুমি’ চাইছিলাম। সে তো রীতিমতো প্রায় চল্লিশর অনাকর্ষণীয় এক বুড়োটে মহিলা।
তার গালের বাঁ-পাশটায়, চিবুকের নিচে সেলাইসমেত একটা বড় কাটা দাগ, আর একটু কাছে গেলে পারফিউম ভেদ করে গায়ের কুৎসিত বোঁটকা গন্ধ। বগলের নিচে ঘাম ও ঘামাচি উভয়ই দৃশ্যমান। তার সহজ তরলতার মানে এবার বুঝলাম পুরোটা। আমার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে, হোক মেয়েটা যে কেউ, ঘরের বা পরের। তবু অষ্টাদশী সুন্দরী তরুণী হলে খুব কি ক্ষতি হতো কারো? নিদেনপক্ষে বাইশ-পঁচিশ হলেও মানা যেত, তাই বলে এই! সুন্দর তো না-ই, কেমন ধ্যাবড়ানো, স্থূল শরীর। যথেষ্ট যৌবনবতী আর তারুণ্যে ঝলমল কেউ না হওয়ার অপরাধে তাকে আমি ক্ষমা করতে পারছিলাম না। জঘন্য অপমানকর গালাগাল করতে ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। মেয়েটাকে নিয়ে অবচেতনে নিজের ভেতরে রোমান্টিক চিন্তা উদ্রেক হওয়ার অবৈধতায় নিজের গালেই নিজে চড় লাগাই কষে। তাকে কিছু একটা করার বা বলার জন্য শরীর রি-রি করতে থাকে। তার গায়ের আঁটসাঁট করে পরা অর্ধকামিজ বা টপস, নগ্নগোড়ালির জিনস, কড়া মেকআপ আমার মগজ জ্বালিয়ে দেয়, পুড়িয়ে দেয় সব। রমণী এবার পুরোটা ঘুরে দাঁড়ায়, কাছে আসে, তার চোখ লাল, কিছুক্ষণ আগে কেঁদেছে বোধহয়, কাজল গলে গলে পড়েছে চিবুকে। কাঁদলে কাঁদুক। বুড়ো মাগির ঢ্যামনামো ঢং ভাল্লাগে না। আমি মুখ ফেরাই।
মেয়েটা আঁচ করে কিছু।

খারাপ মেয়ে ভাল্লাগে?

হু লাগে, আমার তো লাগারই বয়স।
আমি জানতাম ইতিবাচক উত্তর আর আমার আহ্লাদি স্বর পালটে যাওয়াটা তার আত্মসম্মানে লাগবে, সংযত হবে। না লাগলে বুঝতে হবে সে নিশ্চিত তৃতীয় শ্রেণির বেশ্যাদের কেউ। সস্তা।

কেন লাগে?
আমি অন্যদিকে তাকিয়ে আমার চুপসে যাওয়া নিম্নাঙ্গ হাতাই।
মেয়েটা আমার এই আকস্মিক অসদাচরণে পুরোপুরি হতভম্ভ হয়ে যায়। রেগে যায় খুব। চটাস শব্দে গালে সত্যি সত্যি চড়ের অনুভূতি অনুভব করি।

হারামজাদা একটু লাই দিলেই এমন হাতাহাতি। মেয়ে মানেই এই! তোর বয়সী আমার হালি হালি ভাইবোন, বাচ্চা থাকার কথা। পকেটে টাকা আছে, এখনি শুবি আমার সঙ্গে? আয় শুই।
আমি তখন আর বুঝে উঠতে পারি না এর সাথে কিরূপ আচরণ করা আমার জন্য নিরাপদ। তবে ঘটনার আকস্মিকতায় আমার ক্রোধ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে এটা বুঝি।
মেয়েটার ব্যক্তিগত গণিকালয়ে সেই আমার প্রথম রাত। এরপরও ও আমায় যত্ন করে ভাত রেঁধে খাওয়ায়, ধবধবে পরিষ্কার কাপড় দেয় পরতে, এমনকি মধ্যরাতে অন্তর্বাসের ভেতর থেকে দু-তিনটা হুক খুলে বুকের ভাঁজে আমার নাক চেপেও ধরে, আমি ভাই থেকে, বাচ্চা থেকে একলাফে আবার তার পুরুষ হওয়ার ঘৃণ্য লোভে ছটফট করি। সে সজোরে বাঁধে আমায়। বালিশে গেঁথে দেয় মাথা, হাঁটু গেড়ে বসে আমার পেটের ওপর। তার গায়ে দারুণ জোর! আমার পেটে দলা পেকে যায়, উগরে আসে ভাত।

এই বয়সে এত পারফিউম লাগান কেন, গন্ধ লাগে। বাজে গন্ধ, মাংস পচা, মেছো। লাগাবেন না আর।

লাগাব, এ কামড়ায় ও কামড়ায়, ঘা হয়, পুঁজ হয়। আতর, সুরমা, গোলাপজল না লাগালে চলে? আমাদের ভেতরটা সদরঘাট হলেও ওপরে ফিটফাট লাগে।
ওর কথায় আমার মেজাজ খারাপ হয়, আবার মায়াও লাগে। একদিনেই ও আমার এত কাছে আসছে কেন বুঝি না, দ্বিধা, ভয়, বুদ্ধি কোনোটাই আর কাজ করে না। মেয়েটা আরো কাছে আসে। জোর করে নিশ্বাস ছাড়ে মুখে। ওর শরীরের তাপ ও চাপ আমার পাকস্থলীর ভেতরটা উলটে দেয়। ক্ষয়ে যাওয়া হলুদ ভাত দলা পাকায়, উঠে আসতে চায়, হজম হতে চায় না ওর দেওয়া অযাচিত সঙ্গম। কেন এমন হচ্ছে তাও বুঝি না, অথচ এই আমিই কত যে ঘুরঘুর করেছি সস্তার কোনো বেশ্যালয়ের পাশ ধরে সে আমি নিজেই জানি। পুরুষকে আবার ধর্ষণ কী, সবটাই তো উপভোগ। ধরতে গেলে আমার জীবনে ওর আগমন বহু প্রাপ্তির সম্মিলনও হতে পারে – এইসব আগুপিছু ইতিবাচক ভাবনায় তার নিশ্বাসের ভালোবাসা-মন্দবাসা অনুভব করার চেষ্টা করি। একটু একটু কাতরও হই। ওর রুক্ষহাত হাত চেপে ধরতে যাই বুকে। কিন্তু পারি না। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, হাঁসফাঁস করি, একসময় মুখ তুলি, শ্বাস নিই জোরে, চোখ চলে যায় তার বুকের সাদা চামড়ায়; সেখানে অজস্র ক্ষত হওয়া দাগ, একপাশের স্তনে বোঁটা নেই, কী বীভৎস, কী করুণ! কোনো মানুষের পক্ষে কী এত হিংস্র হয়ে ওঠা সম্ভব! আমি অস্থির হয় উঠি। মিনতি করি – আপা আজ আমায় যেতে দিন, অন্য একদিন আসি, সেদিন এসে আপনার সব কথা শুনব, ঝগড়া করব, অপমান করব, আবার ভালোওবাসব। আজ আমায় ক্ষমা করে দিন। হজম করি এইটুকু।
সে সময় দিয়েছিল। ওর বসার ঘরে জমে ওঠা অশ্লীল জলসা, যৌনতাকেন্দ্রিক অন্ধকার জগৎ, অ্যালকোহলের তরল শরবত এগুলো আমার সয়েছিল আরো একটু পরে। ছোটখাটো ফাইফরমাস খেটে খেটে আমি বড় হয়ে উঠছিলাম ওর চোখের সামনেই। তার সঙ্গে থাকা সেই আত্মবিস্মৃত পরাবাস্তব জগৎ থেকে শেষরাতে যখন ফিরতাম নিজের আস্তানায়, তেজকুনিপাড়ার বন্ধ ঘরে ফিরতে ফিরতে স্মৃতিময় ঢাকার বন্ধ গলির আনাচে-কানাচে আমি তখন নতুন করে আমার পরিচয়ের হিসাব মেলাতে শুরু করতাম, কী আমি হতে চেয়েছি কেনইবা এসেছি এই এখানে। অন্ধকারের গোপন ঠিকানায় কী আছে রাখা। আলোহীন পথের কোথায় ছায়া। লুকিয়ে রাখা গোপন পকেটে খুঁজি কিছু একটা, ছিপহীন কলমের শরীর পড়ে থাকে একটা। ছুড়ে মারি রাস্তায়, ভেঙে চুরচুর হয় সব। কাব্যের শরীর, প্রেমের শরীর আমার ধুলায় লুটায়। আসলে তার দিকে ধাবিত হয়েছিলাম শুধু প্রেম বা কামের কাতরে না, আত্মস্বার্থ রক্ষাও ছিল উদ্দেশ্য। এই শহরে করার মতো তেমন কিছু নেই আমার! অর্থহীন সময় যায় এখানে-ওখানে। চারপাশে শুধু ব্যর্থতা, ওর মতো আমিও যদি শরীর বেঁচে চালাই তেল-নুনের খরচ তো সমস্যা কী। আমি মানুষটা মোটামুটি হতদরিদ্র আর অলস। নামমাত্র খরচে এখানকার এক গ্যারেজের দারোয়ানের সঙ্গে আমার মেসবাড়ির সংসার। দুজনের মধ্যে খুব একটা আত্মীয়তা নেই। দুজন দুরকম, তবু চলে যায়। দুয়েকটা পত্রিকায় লিখি, পয়সা পাই না। এখন বরং মাল সাপ্লাইয়ে চলে যাচ্ছে দিন। আমি জানি, আমার প্রধান সমস্যা আমি জীবন দেখতে চেয়েছি, জীবনের বহুরূপ বহুভঙ্গি। আমি কাফকা হতে চেয়েছি, চেয়েছি হতে বুড়ো তলস্তয় অথচ হয়ে উঠছি গ্রেগর সামসার মতো অতি ক্ষুদ্র পোকা। নোংরা জীবন, কালো জীবন, সাদা জীবন দেখছি তো দেখছিই। হচ্ছে না কিছুই, বরং রাশি রাশি বয়সী মানুষের বয়স্যপাঠ এখন আমার বয়স বাড়িয়ে তুলছে রোজ।
নারীশরীরে এখন কেমন যেন লেজেগোবরে অবস্থা আমার। ইদানীং নেশাতুর রাতে টাকা না থাকলে ফুটপাতের পাগলি শরীরও চোখ টানে। কী যেন হয়েছে আমার, কেমন আধপাগলা কুৎসিত থোক থোক অন্ধকার সব। প্রেমহীন অস্থিরতা। এমন কেন আমি। অস্বীকার করার উপায় নেই ওর ক্ষেত্রে শরীরের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের মতো বাড়তি কিছু সংস্থানের প্রত্যাশা আছে বলেই আমি এগিয়েছি, আর তাছাড়া মেয়েটা যেন কেমন, মা, বোন টাইপ, আবার প্রেমিকাও।
চুমোচুমি, ছোঁয়াছুঁয়ির মতো কিছু আবেগময় অনুভূতি ছাড়াও এই শহরে আমাদের সম্পর্ক এখন পেশাগত ও নেশাগত। কখনো কখনো ওর খাঁটি বিশুদ্ধ প্রেমিক হওয়ার ইচ্ছেও যে হয় না তা নয়। ওকে ফ্রি পেলে দুয়েকদিন জমেও যাই প্রেমে। অভ্যস্ত করি অসংলগ্ন অভ্যাস। অবশ্য এজন্য প্রায়ই ওর ঘরের বিভিন্ন দরজায় চোখ পেতে রাখতে হয়। ওকে অথবা ওর পোষ্যদের দেখি, মাতালদের মচ্ছবে প্রেম খোঁজার ধান্দা খারাপ না। পর্নো দেখার চেয়েও সেগুলো বেশি রোমাঞ্চকর। আমার দিন ভালোই কাটছিল এইসব সুখে-অসুখে।

কোনো সুখ চিরস্থায়ী নয়, মস্তিষ্কের সকল যাত্রা এমনসব সুড়ঙ্গপথে যেখানে অন্ধকার গুহায়ও নিমজ্জিত থাকে কোনো চকিত বজ্র, যন্ত্রণার দহন, পতঙ্গের পুড়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এমনিসব মন্দ হাওয়ার রাতে এমনই এক বিষ-জমানো ঘরে চোখ পেতে রেখেছিলাম আমি কাঁচাপাতার মাদক সুখে। দেখলাম, চার-পাঁচজন বিবস্ত্র পুরুষ চাটছে এক উলঙ্গ শরীর। মেয়েটা আমার বুড়োটে গালভাঙা দালাল প্রেমিকা নয়, কিশোরী মেয়ে। পুঁইপাতার মতো সবুজ মুখ। কেউ তার হাত, কেউ তার পা, কেউ তার নিতম্ব, চাটছে। মেয়েটার স্তন একেকটা পুরুষ কামড়ে কামড়ে ধরছে, আর পাগলা উচ্ছ্বাসে কুকুরের মতো চিৎকারে বলছে – চিয়ার্স। ওদের হাসি, ওদের হুল্লোড় বুনো শুয়োরের মতো। আমি দরজার ফাঁকে দেখি তাদের করাত করাত দাঁত। মেয়েটা ব্যথায় গোঙায়, কেউ শোনে না। দরজার পাশে লুকিয়ে দেখি সব। মেয়েটার সঙ্গে ওসব যাচ্ছিল না। এই ছেনালিপনার মধ্যে ওকে আমার মনে হয় শ্বেতশঙ্খ, পদ্মিনী। মেয়েটার ভয়ার্ত চোখ এদিক-ওদিক তাকায়। আমার গলার কাছে দলা পাকায় আতংক। এই মেয়েটাকে এখন ছিঁড়বে ওরা? মেয়েটাকে কেমন অসুখী লাগে, বিষাদ ঘোরগ্রস্ত, ভয়ে কাঁদতেও পারছে না। আমার কেন যেন মনে হতে থাকে মেয়েটার অদৃশ্য চোখ তরঙ্গের মতো জ্বলছে নিভছে, ওর অপুষ্ট কামহীন শরীর সুইয়ের মতো বিঁধে আমায়। বয়স কত ওর। পিরিয়ড হয়েছে এখনো? আমার বুকের ভেতর গলিত হৎপিণ্ড ধক্‌ধক্ করে। আহারে আহারে। মেয়েটা হয়তো মনে মনে বলছে কিছু, শুধু আমি শুনতে পাচ্ছি না। সে-রাতে আমার কী হয় আমি জানি না। সেই প্রথমবারের মতো আমি অবাধ্য হই নিজের কাছে, অবাধ্য হই আমার প্রেমিকা, আমার মা, আমার বোন হয়ে উঠতে চাওয়া মধ্যবয়সিনীর কাছে। টেনেহিঁচড়ে ঘরে এনে আকুল হয়ে জাপটে ধরি তাকে, ব্যথাতুর অসহায়ের মতো বলি — মেয়েটাকে ছেড়ে দাও আপা, তোমার পায়ে পড়ি, ওকে ছেড়ে দাও।
গুলনাহার আমাকে কুকুরের মতো তাড়ায়, লাথি ছুড়ে ফেলে দেয় বিছানা থেকে। আমি স্বর পালটাই, গুলনাহার রেগে গেলে বিপদ! ওকে তো হারাবই। মেয়েটাও মরবে। ও আচ্ছা, আমার প্রেমিকা বা আপার নামটা তো বলা হয়নি এখনো, ওর নাম গুলনাহার! যার গায়ের পচা মাংসের গন্ধ ঢাকতে পারে না কোনো দামি পারফিউম! যাক সেসব। তবু আমি গুলনাহারের হাত টেনে বুকের কাছে আনি, নরম করে বলি, আমি ভালো নেই আপা। আমার মাথায় বজ্রপাত হয়েছে, পুড়ে যাচ্ছে সব। আমাকে বাঁচাও। তোমার কাছে রেখে দাও পুরোপুরি। আমি মরে যাচ্ছি। বাঁচাও।
আমার অসহায় আত্মসমর্পণে গুলনাহার কেঁপে ওঠে, এই পাপী-তাপি মেয়েটার ভেতর এখনো যে এত আবেগ বেঁচে ছিল কে জানত! ও আমায় উলটো প্রশ্ন করে, সইতে পারবি সব? এখানে নরক, নিত্যই এমন আগুন ফুটবে। পুড়বি আরো।

– জানি, তবু আমি চাই, মরব তো বেশ, একবার আগুন নিয়ে খেলেই মরি, জীবন একটাই। হয় ডুবে যাব অন্ধকারে, না হয় দেখবো আঁধারশেষে আলো কোথায়!
গুলনাহার তাকায় অদ্ভুত চোখে, তুই চলে যা আজ। কাল আমি তোর মেসে যাব।

– ঠিক যাবে?

– হুঁ।

– আচ্ছা।
আমি ফিরে আসি গুলনাহারের বাসা থেকে! কিন্তু কেন যেন আমার সন্দেহবাতিক মন সহজে বিশ্বাস করতে পারছিল না ও যাবে আমার কাছে! অথবা ওরা যেতে দেবে। আমার ভেতরটা কাঁদে। দ্বিধা নিয়ে আবার ফিরে আসি কিছু একটা বলার জন্য। কিন্তু এবার ঢোকার রাস্তা বন্ধ। রাতপ্রহরী ভয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তায়, কড়া নিরাপত্তা প্রহরা চলছে।
রাস্তায় নেমে আমার কেবলই মনে হয় ওই মেয়েটাকে আর জীবিত পাব না। আমার গায়ে মেয়েটার নীরব কান্নার রং লেগে থাকে, আমি দ্বিধায় পড়ি – কেন আমার এমন লাগছে। এক অন্ধক্রোধ আমার মগজ কামড়ায়। আমি হাঁটতে হাঁটতে থেমে যাই। অস্থির লাগে। দৌড়াব এখন, ক্লান্ত হবো, ঘাম ঝরাব তারপর নিস্তেজ হয়ে বসে থাকব অনেকক্ষণ। তাকিয়ে দেখি আমার ঠিক পাশেই একটা কুকুরও প্রস্তুত হচ্ছে সমানতালে দৌড়ানোর। গুলনাহারের ঘরে টাঙানো সেই কুকুরটা নয় তো এটা? শুঁকে দেখি আমার গায়েও আজ পচা মাংসের গন্ধ! পচুক, পচে যাক আমার সব, হাত-পা, হৃৎপিণ্ড সব। মগজ তো আগেই পচেছে, না হয় এত কুৎসিত দৃশ্য রোজ দেখেও হাঁটি, চলি, খাই। আমি তো মানুষই। মেয়েটার মুখ আবার মনে পড়ে। হু-হু করে। রাত এখনো শেষ হতে অনেক বাকি। এত ঘৃণা, এত হাহাকার নিয়ে আজ আমি কোথায় যাব! আমার কি মরে যাওয়া উচিত? মেয়েটাকে কি ওরা ছেড়েছে এতক্ষণে? আমি হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন পরিচিত গণ্ডি ছেড়ে আধভাঙা পলেস্তারাখসা একটা পুরনো ব্রিজের কাছে চলে এসেছি। শেষরাত সমাগত প্রায়। নিঃশব্দ নগরে যান্ত্রিক ভোঁতা শব্দ ক্রমশ ধেয়ে আসছে কাছে। একে একে চলে যাচ্ছে দানব ট্রাক পাশ কাটিয়ে। হঠাৎ গাঢ় চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে যায়। ঘাড় ফেরাতেই দেখতে পাই পেছনে ব্রিজের মাথায় সেই কুকুরটার মাথা থেঁতলে দিয়ে গেছে কোনো একটা ট্রাক। মগজ ছিটকে আছে এদিক-সেদিক। আমার কেমন লাগে, কী করব এখন! পৃথিবী এত অসুন্দর! আগে কেন দেখিনি এসব, ছিঃ! দৃশ্যটা আড়াল করতে ভূতে-পাওয়া মানুষের মতো দৌড়াই। ব্রিজ ফেলে, রাস্তা ফেলে, আলো ফেলে, অন্ধকার ফেলে ছুটে যাই মহাখালি, ট্রেন আসবে এখুনি। ভোরের ট্রেন। কমলাপুর ছাড়িয়ে যে-ট্রেনটা রোজ ছুটে যায় এ-পথ দিয়ে, আজ সেটায় আমি হারিয়ে যাব শূন্যে। আমি কান পাতি। দূরে কিসের যেন শব্দ! ওই তো ট্রেন আসছে; কিন্তু আশ্চর্য এই ব্যস্ত ট্রেনের কোলাহলের মাঝেও ঝমঝম করে বাজছে একটা সুর, করুণ মৃত্যুর সুর। একটা কুকুর মরেছে আজ। শব্দটা একটানা বেজেই চলছে! ট্রেনটা এসে আমার পাশে দাঁড়ায়, আমি তাকিয়ে দেখি ট্রেনের গায়ে কত-শত ধুলো, পথে পথে নেমে যাওয়া মানুষের স্মৃতি। এই ট্রেনটা এর আগে আমার দেখা হয়নি। আমি কি দুপুরের যাত্রী! কত কী ভেবে ট্রেনটা দাঁড়ায় না, হুশহুশ করে চলে যায়, জেনে যায় সব পাখি নীড়ে ফেরে না, ইস্টিশনে দাঁড়ানো কেউ কেউ থাকে এমন নিঃসঙ্গ! ব্যর্থ! যার যাওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিগত জংশন নেই। অথচ আজ আমার একটা আশ্রয় কত প্রয়োজন।

গুলনাহারের ঘর ধানমন্ডি সাতাশ নম্বর। ভোরের আলো ফুটতেই আমি আবার ওর পায়ের কাছে পড়ি। গুলনাহারও গোঙায় – – দেখ মেয়েটার প্রেমিকই তো ওকে এখানে বেঁচে দিয়েছে, আমার কী দোষ!
তাই তো দোষ তো মেয়েটার, এখনো কেন কাঁদে ও ব্যথায়, ভর্ৎসনা দেয় নীরবে আমায়। এতদিনে তো সয়ে যাওয়ার কথা এসব। গুলনাহার তো হাসিমুখেই সয়েছে সব। পেটে বিদ্যে থাকার পরও কীসের যন্ত্রণা কীসের অভিমানে গুলনাহারের এই আত্মপ্রবঞ্চনা তা কী আর বুঝি না। আহা আমার গুলনাহার।
গুলনাহার ও আমার যৌথ ইচ্ছেয় সেই থেকে আমরা একঘরে থাকতে শুরু করি। অপরাধজগতের হাজার রকম পুলিশি সিন্ডিকেট। একক ইচ্ছায় কিছু হয় না। রাতে ওর যে ঘরগুলো ভয়ংকর হয়ে থাকে দিনের শুরুতে সেই ঘরেই শুরু হয় আমাদের এক অন্যরকম যৌথজীবন। আমার ভেতরে বদলে গেছে অনেক কিছু, টের পাই। এই প্রথম আমি পুরোপুরি পুরুষের দায় অনুভব করতে শুরু করি। মনে মনে চাইতে থাকি আমার যা কিছু কর্তব্য, যা কিছু ব্যর্থতা সবকিছুর শুরু হোক নতুন করে; এখান থেকেই। এখানেই তো আমার পুরুষ হওয়ার প্রথম পাঠ। গুলনাহারের পোষ্য হিসেবে মানিয়ে নেওয়ার মতো বয়স এবং অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে বলেই মনে হয় এখন। তো শুরু করেই দেখি না কী হয়।
গুলনাহারের আশ্রয় মেসবাড়ির তুলনায় যথেষ্ট আরামদায়ক। এখানকার সবই ভালো লাগে। কেবল আমাদের দুজনের সঙ্গমকালে পাশের ঘরের মেয়েটার কান্না ভালো লাগে না। ঘরটা বাইরে থেকে তালা আটকানোই থাকে। এমনই থাকবে হয়তো মাসতিনেক। রাতের বেলা দুয়েকজন করে পুরুষ এলে খুলে দেওয়া হয়, এছাড়া ওদেরকে ঠিকঠাক হ্যান্ডলিংয়ের জন্য গুলনাহারের আলাদা লোক আছে। তাদের সমস্যা কিছু হলেই মেয়েগুলোর গায়ে হাত তোলে। মেয়েটা গোঙায়, আমি শুনি না, ও কি আমার ঔরসজাত কন্যা যে কাঁদলেই শুনতে হবে, দুধ-পানি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে কান্না থামাতে! কানে বালিশচাপা দিয়ে রাখি। সময় কাটে না এভাবে। আচ্ছা, এ-মেয়েটা এখনো বিক্রি হচ্ছে না কেন। অনেকদিন তো হলো। নতুন কেউ এলে হয়তো এমন করে আর কাঁদবে না। ভবিষ্যতের সেই নির্ভার সম্ভাবনায় আমি এখনই আশ্বস্ত হই, হাতের কাছে কাগজ থাকে, তুলে নিই। কলম ঘষে ঘষে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করি, কিছুই হয় না, না কবিতা, না গল্প! বন্ধ্যত্বের যন্ত্রণায় ছটফট করি কিছুক্ষণ, রাগে-দুঃখে কলমের মাথা ঘষে দিই শক্ত ইটের গায়। কলমের নৃশংস হত্যাপ্রক্রিয়ায় কিছুটা হলেও শান্ত হয় মন। আমি তাহলে কিছু একটা পারি! গুলনাহার ট্যুরে যায়, ফিরেও আসে। পাহাড়-সমুদ্রবাস কত কী! সুদূর, চীন, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড থেকেও লোক আসে, লোক যায়! যাক। আমারও ব্যস্ততা অনেক। সংসার এখন আমিই দেখছি। নীলক্ষেত ঘুরে সস্তায় কিনে আনি বই। গত কদিন ধরে পড়ছি গার্হস্থ্যশাস্ত্র। এরপর ধরব চাণক্যবিদ্যা অথবা মানবশিশুর পরিচর্যা। ওর যৌথ কারবারি সংসারে আমিই হয়তো হবো ওর ভবিষ্যৎ একমাত্র স্বামী অথবা অংশীদার। আমার এখন থেকেই সিরিয়াস হওয়া উচিত। ও যখন ফোনের ওপাশে অন্য কারো সঙ্গে বেগুনবাড়ি বা কল্যাণপুর বস্তি থেকে কিছু একটা সাপ্লাই নিয়ে খিস্তি-খেউর করে তখন আদর্শ প্রেমিকের মতো তাকে অনুসরণ করি, রপ্ত করি ব্যবসা সামলানোর কৌশল। গুলনাহার খুশি হয়, বুঝি আমার এই বাড়তি আগ্রহ ওর ভালো লাগছে। মাঝে মাঝে ওর মতো ফেন্সি, ইয়াবা, তামাক সম্রাজ্ঞী হওয়ার স্বপ্ন নিয়েও আলোচনা করি, এমনকি বন্ধ ঘরের ওই মেয়েটাকে বেচে দেওয়ার চেয়ে ম্যানপাওয়ার বিজনেসের ডিলারদের কাছে পাঠানোকেই যুক্তিযুক্ত মনে করি। বলিও সে-কথা, মেয়েটা সমন্ধে আমার অতিরিক্ত আগ্রহে ওর মুখ কালো হয়ে যায়। আমি আর ঘাঁটাই না। কে যেন বলেছিল – man is born free, and evrywhere he is in chain। হু, চেইনই তো। ভেবে দেখলাম, এখন আমার পায়ের কাছে লোহার শেকলের নাম গুলনাহার। মধ্যরাতে কান্না করা ওই মেয়েটার নাম আমার জানা নেই, সুতরাং তার সঙ্গে তুলনা করে কোনো লাভ নেই। গুলনাহারের একটা বিষয় খুব ভালো। সে হয়তো খুব খারাপ মেয়েলোক, তবু ইদানীং যত জায়গায়ই যাক, ট্যুর শেষে ঠিক এই ঘরটায় ফিরে আসে নিয়ম করে এবং সঙ্গে করে যখন-তখন কোনো ব্যাটাছেলে নিয়েও আসে না। এজন্যই তাকে এখন আমার আদর্শ গৃহিণীর মতো লক্ষ্মী লাগে। মনে হয়, সে আমার একদম আপন বউ। ওর আচরণে কিঞ্চিৎ সন্দেহও হয়, সে এবার সত্যি সত্যি সংসারী হওয়ার কথা ভাবছে না তো। আহা স্বপ্ন! তুমি মানুষকে কেমন করে এত বোকা করে দাও, মূর্খ হয়ে যায় একদম। গুলনাহার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে ঈশ্বরের মতো অসীম ক্ষমতায় আমিই হয়তো পালটে দেব তার জীবননাট্য! হা ঈশ্বর! হা গুলনাহার!
সেদিন রাতের অন্ধকারে গুলনাহার আমার বুকের কাছে সরে আসে। তার কণ্ঠে দরদ!

– আচ্ছা, আমি মরে গেলে তুই কাঁদবি না?

– হু, কাঁদব অনেক। তোমার লাশ নিয়ে ছুটব আকাশ-পাতাল, পুনর্জীবিত করব তোমাকে, সেই মৃত লখিন্দরের মতো! আমি হবো তোমার বেহুলা।

– তোর সেন্স অব হিউমার ভালো জানি, তবে সবসময় সেগুলোর প্রয়োগ না করলেই নয়!

– আচ্ছা, করব না। তুমি আমার আশ্রয়দাতা, পালনকর্তা, গৃহকর্তা। তুমিই মা, তুমিই বাপ, তুমি যা বলবে তাই সই।

– ধ্যাত্! ভাল্লাগে না। যা, এসব প্রসঙ্গ বাদ।

– আচ্ছা বাদ।

– কতদিন বাড়ি যাস না তুই?

– সে অনেকদিন! হঠাৎ এ-প্রশ্ন?

– এই যে তোর কখনো কোনো ফোন আসে না, কেউ কখনো কোনো খবর নেয় না, এসব আমার অদ্ভুত লাগে!

– ও আচ্ছা। আসলে মা প্যারালাইজড, বাবার সঙ্গেও দূরত্ব অনেক। অর্থ না থাকলে বাপ-মাও আর বাপ-মা থাকে না।

– আচ্ছা ধর, তুই যদি হঠাৎ দুম করে মরে যাস, আমি খোঁজ না জানালে কেউ কি জানবে তুই কোথায় আছিস? কেউ কি কাঁদবে তোর জন্য আমার মতো করে? কেউ কি অস্থির হবে কারণে-অকারণে? আছে তেমন কেউ তোর? প্রেমের, বা স্নেহের?

– আরে থামো থামো, এত প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে দেওয়া যায়! একটা একটা করে বলি?

– নাহ্, বলা লাগবে না, থাক।
গুলনাহার বিষণ্ন হয়! কেমন উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে জানালা ছেড়ে ফাঁকা রাস্তায়! ছলছল চোখে বলে, আমি জানি তুই মরে গেলে তবু কেউ কাঁদবে আর আমি মরলে? কেউ না, এমনকি তুইও না। তোর চোখ শীতল, কেমন নিষ্ঠুর পাষাণ পাষাণ! গুলনাহার উঠে চলে যায় পাশের ঘরে।
যাক, শুরু থেকেই সে এমন! মধ্যরাতে প্রায়ই দরজা আটকে একা একা কাঁদে।
কাঁদুক। কার কী! আমি ওর অভিমানে কান দিই না, আলো জ্বেলে আবার পাঠে মনোযোগ আনার চেষ্টা করি। গত দুদিনের কঠোর পরিশ্রমে রাশান একটা অনুবাদ দুই পাতা পড়েছিলাম, ছেঁড়া পৃষ্ঠাগুলো কল্পনা করে নেওয়াটা আমার জন্য খুব একটা কঠিন না। নীলক্ষেতের সস্তার বই এমনই, মাঝে মাঝে পৃষ্ঠা হাওয়া। আমার তাতে সমস্যা হয় না। আমি তো জানি, আমার লেখক হওয়ার কথা ছিল, পৃথিবীর সকল মহৎ সাহিত্য রচনার পেছনে আমার অনুভূতির দাম সমান। তবে এই মাঝরাতে সেসব মহৎ-টহৎ ভালো লাগে না, বহুবার পড়া পুরনো একটা বই টেনে আনি হাতে। আমার মনে পড়ে যায় আমার কৃতিত্ব। গতরাতে না যেন কবে কোন এক রাতে আমিই বুড়ো সান্তিয়াগোকে ঠেলে দিয়েছিলাম প্রতিক‚ল সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে, উত্তাল সমুদ্রের গর্জন মুখে আবার আমিই তাকে ফিরিয়ে এনেছি ডাঙায়। আমিই তো শিখিয়েছি, man can be destroyed, but not defeated।
কী যেন এর অর্থ! ভুলে গেছি। মানুষ ধ্বংস হয় না, একথা ঠিক তবে প্রতারিত হয়, ব্যর্থ হয়! পরাজিত হয়। পড়তে পড়তে ভাবতে ভাবতে আমি কানের ভেতর শুনতে পাই সমুদ্রের গর্জন, শিকারি হাঙর দাঁত বের করে কাটছে কারো নরম ঊরুর মাংস। মেয়েটা কাঁদছে, কী যেন বলছে, আমি শুনতে পাই অস্পষ্ট, ‘ভাইয়া, ভাইয়ারে আমি আর পারছি না। এবার মুক্তি এনে দে, দেখ আমার ফ্রক জুড়ে শুধু রক্তের দাগ, অন্ধকার! বন্ধ ঘরে আলো নেই কত দিন, সূর্যের মুখ দেখি না অনন্তকাল। নোনা পানি চারপাশে! আমার খুব শীত করছে ভাইয়া, একটু আলো দিবি? জানিস আমি তোর মেলায় হারিয়ে যাওয়া সেই ছোটন, তোর কৌটোয় জমিয়ে রেখে এসেছিলাম একশ একটা সূর্য, সেখান থেকে দিবি একটা?’
আমি শুনি না সে ভ্রান্তির ডাক। আমি তো কারো ভাই হওয়ার যোগ্য নই। কানে বালিশচাপা দিই। ঘুমিয়ে পড়ি! ঘুমের মাঝে স্বপ্ন আরো গাঢ় হয়, মেয়েটা এবার আসে অন্যরূপে। ঘুমিয়ে গেলি? আচ্ছা বেশ! দেখ তো আমায় চিনিস কি না? আমি তানি। সেই যে ক্লাস নাইনে একবার তুই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমার ছবি এঁকে দিয়েছিলি, আমার গায়ে ছিল লাল জামা, আমি ছিলাম লালপরী। তোর প্রথম প্রেমিকা। মেয়েটা হাসে তাচ্ছিল্যের হাসি, যেন আমি কারো প্রথম প্রেমিক হওয়ারও যোগ্য নই। মেয়েটা খলবল করে বলে যায়, ‘আচ্ছা স্কুলে পড়ার সময় তুই তো এত ভীতু ছিলি না, এত স্বার্থপরও ছিলি না। নাকি ছিলি, আমি কেন টের পাইনি, ছিঃ!’ তানি ঘুরে ঘুরে থু দেয় আমায়, সঙ্গে আসে ছোটন। ঘুরতে ঘুরতে ওদের কাপড় খুলে খুলে পড়ছে। চেয়ে দেখি তাদের স্তনের বোঁটা থাকে না কারো। এমনটা রোজ রাতেই ঘটে, আমি জেগে উঠি আতংকে, পানি খেয়ে আবার ঘুমাই, গুলনাহার পরম নিশ্চিন্তে বুকে পড়ে থাকে।
আবার ঘুমে আমার স্বপ্ন পালটায়! আমরা আর ঘরে থাকি না, দৌড়াই শহর নগর বন্দর ছেড়ে খোলা মাঠে। আমি ছোটন অথবা আমি তানি অথবা আমার সঙ্গে ওই বন্ধ ঘরের মেয়েটা – আমরা ছুটতে থাকি ছুটতেই থাকি। ওই তো সামনে জ্বলছে সূর্য! ছোটনকে, তানিকে, ওই মেয়েটাকে আমার দেখাতেই হবে আলো, আর একটু এগোলেই পলেস্তারা খসা সেই ব্রিজটা। এখানে একটা কুকুরের লাশ থেঁতলে দিয়েছিল দানব ট্রাক। আজ ছোটনকে অথবা তানিকে অথবা ওই বন্ধ ঘরের মেয়েটাকে আমি আরেকটা নতুন কুকুরের লাশ দেখাব, যে-লাশটা অনেকদিন ধরে মরে পচে আছে সেই মৃত কুকুরের সঙ্গে। ওদের প্রতারক প্রেমিক গভীর আলস্যে গন্ধ ছড়াচ্ছে এখানে অনেককাল! দেখাব আজ। আমি আর কোনো কিছু ভাবার মতো সময় নিই না, আমায় যেতে হবে অনেক দূর! আমি সে-রাতেই আধোঘুম আধোজাগরণে ভেঙে ফেলি নিষিদ্ধ সে-ঘরের তালা, পরিপূর্ণ জাগরণে মেয়েটার দিকে হাত বাড়াই, বলি – চলো। মেয়েটা তাকায় শুধু, দৃষ্টি পবিত্র। আজ আর ঘুমোব না। বিভ্রান্তির ঘুম শেষ।
ইস্টিশনে আজ ভোরের সেই ট্রেনটা আসবে নিশ্চিত, ট্রেনের জানালায় আমি ছোটনকে অথবা তানিকে অথবা বন্ধ ঘরের এই মেয়েটাকে নিয়ে বসব। ওকে ভোরের নতুন সূর্য দেখাব কথা দিয়েছি। এই আধোঘুম আধোজাগরণের মাঝেও আমি বিস্মৃত হই না সে-প্রতিজ্ঞা। ট্রেন আসছে। আমাদের নিয়ে যাবে নতুন কোথাও, নতুন কোনো স্টেশনে। সেখানে অন্যদেশ, অন্যরাত, অন্যসকাল, আমরা ভুলে যাব সব, ভুলে যাব পেছনে পড়ে থাকা মৃত কুকুর অথবা গুলনাহারের লাশ। সূর্য উঠছে, উঠুক!

Leave a Reply